মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের ভূমিকা Role of Major Powers in the Liberation War — USA, USSR, China & India |
চ্যাপ্টার সারসংক্ষেপ
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু পাকিস্তান-বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ছিল না; এটি ছিল শীতল যুদ্ধকালীন বিশ্ব রাজনীতির ছায়াপথে অনুষ্ঠিত একটি জটিল কূটনৈতিক রণক্ষেত্র। চারটি বৃহৎ শক্তি— ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন— এই যুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছিল। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে; যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছিল পাকিস্তানের পক্ষে।
ভারত শরণার্থী আশ্রয়, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ অভিযানের মাধ্যমে সবচেয়ে সরাসরি ভূমিকা পালন করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তিনবার ভেটো দিয়ে কূটনৈতিকভাবে রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারিভাবে পাকিস্তানপন্থী 'টিল্ট পলিসি' গ্রহণ করলেও, মার্কিন নাগরিক সমাজ, সিনেটর কেনেডি, সাংবাদিক ও শিল্পীরা বাংলাদেশের পক্ষেই ছিলেন। চীন পাকিস্তানের কৌশলগত মিত্র হিসেবে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদে প্রথম ভেটো প্রয়োগ করেছে। এই অধ্যায়ে চারটি দেশের অবস্থান, প্রধান ব্যক্তিত্ব, ঘটনাপ্রবাহ ও বাংলাদেশ স্বীকৃতি দানের তারিখ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
📘 চারটি বৃহৎ শক্তির অবস্থান এক নজরে • বাংলাদেশের পক্ষে: ভারত (সরাসরি সামরিক ও কূটনৈতিক), সোভিয়েত ইউনিয়ন (কূটনৈতিক ছাতা) • পাকিস্তানের পক্ষে: যুক্তরাষ্ট্র (টিল্ট পলিসি, সপ্তম নৌবহর), চীন (কৌশলগত মিত্র, পরবর্তীতে ভেটো) • বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের ক্রম: ভারত (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) → সোভিয়েত ইউনিয়ন (২৪ জানুয়ারি ১৯৭২) → যুক্তরাষ্ট্র (৪ এপ্রিল ১৯৭২) → চীন (৩১ আগস্ট ১৯৭৫)। |
চারটি দেশের কূটনৈতিক অবস্থান: তুলনামূলক ছক
শক্তি | অবস্থান | প্রধান কৌশল | স্বীকৃতি দানের তারিখ |
ভারত | বাংলাদেশের পক্ষে | শরণার্থী আশ্রয়, মুক্তিবাহিনী প্রশিক্ষণ, যৌথ সামরিক অভিযান | ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ |
সোভিয়েত ইউনিয়ন | বাংলাদেশের পক্ষে | জাতিসংঘে ৩টি ভেটো, ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি | ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ |
যুক্তরাষ্ট্র | পাকিস্তানের পক্ষে (সরকার) | টিল্ট পলিসি, সপ্তম নৌবহর প্রেরণ, জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব | ৪ এপ্রিল ১৯৭২ |
চীন | পাকিস্তানের পক্ষে | কৌশলগত মিত্রতা, প্রথম ভেটো বাংলাদেশের UN সদস্যপদে | ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ |
ভারতের ভূমিকা |
ক. প্রেক্ষাপট আলোচনা
ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে সক্রিয় ও সরাসরি ভূমিকা পালনকারী বৃহৎ শক্তি। ভৌগোলিক নৈকট্য, ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঐতিহাসিক বোঝা, এবং পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘদিনের শত্রুতা— এসব কারণে ভারত বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হলে লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসামে গড়ে ওঠে শরণার্থী শিবির।
ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই সংকটকে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করেন। তিনি অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি ও বেলজিয়াম সফর করে বিশ্ব জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। ৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি ভারতকে কৌশলগত নিরাপত্তা প্রদান করে, ফলে চীনা হস্তক্ষেপের আশঙ্কা হ্রাস পায়। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে অগ্রিম আক্রমণ চালালে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধে যোগ দেয়, এবং মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে মিলে গঠন করে 'মিত্রবাহিনী'। মাত্র ১৩ দিনের যুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।
যুদ্ধোত্তর সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। ১৯ মার্চ ১৯৭২ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা ২৫ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা সীমান্ত চুক্তি (Land Boundary Agreement) দুই দেশের সীমানা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করে।
📘 মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী মুক্তিবাহিনী: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে গঠিত গেরিলা ও নিয়মিত বাহিনী; সর্বাধিনায়ক জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী। মিত্রবাহিনী (Allied Forces): ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর পর ভারতীয় সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত যৌথ বাহিনী; পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক ছিলেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। |
খ. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
শরণার্থী আশ্রয়: মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) বাঙালি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে; প্রধান আশ্রয়স্থল ছিল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও আসাম।
মুজিবনগর সরকারের সদর দপ্তর: ৮ নং থিয়েটার রোড, কলকাতা; মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ১০ এপ্রিল ১৯৭১, শপথ গ্রহণ ১৭ এপ্রিল ১৯৭১।
ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি: ৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত; ২০ বছর মেয়াদি; চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা হ্রাস করে।
ভারতের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে অংশগ্রহণ: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে (পাঠানকোট, আম্বালা, আগ্রা প্রভৃতি) অগ্রিম আক্রমণ চালালে ভারত আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে যোগ দেয়।
মিত্রবাহিনী গঠন: ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১; পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১; ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় ঘোষণা দেন। ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় (কিছু সূত্রমতে প্রথম, ভুটানের কয়েক ঘণ্টা পর) দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে; পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণ করেন লে. জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি, গ্রহণ করেন লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশের পক্ষে গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার।
মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি: ১৯ মার্চ ১৯৭২, ঢাকা; ২৫ বছর মেয়াদি; অনুচ্ছেদ ৮ অনুযায়ী কোনো আক্রমণ মোকাবেলায় উভয় দেশ পরামর্শ করবে।
মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি (LBA): ১৬ মে ১৯৭৪, নয়াদিল্লি; ছিটমহল বিনিময়ের ভিত্তি স্থাপিত।
ভারতীয় শহীদ: মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩,৯০০ ভারতীয় সেনা শহীদ হন (সরকারি হিসাব অনুযায়ী)।
গ. প্রধান ভারতীয় ব্যক্তিত্বদের তালিকা
ব্যক্তিত্ব | পদ / ভূমিকা | অবদান |
ইন্দিরা গান্ধী | প্রধানমন্ত্রী, ভারত | বিশ্ব সফর, কূটনৈতিক ক্যাম্পেইন, যুদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ |
জেনারেল স্যাম মানেকশ | সেনাপ্রধান, ভারতীয় সেনাবাহিনী | মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও মিত্রবাহিনীর কৌশল প্রণয়ন |
লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা | পূর্বাঞ্চল কমান্ডের অধিনায়ক | ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ গ্রহণ |
লে. জেনারেল জে. এফ. আর. জ্যাকব | চীফ অফ স্টাফ, পূর্বাঞ্চল কমান্ড | ঢাকা পতনের পরিকল্পনা ও আত্মসমর্পণের শর্ত প্রণয়ন |
মেজর জেনারেল জে. এস. অরোরার অধীনে অন্যান্য | চারটি কোরের সমন্বিত অভিযান পরিচালনা | |
সমর সেন | জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি | জাতিসংঘে বাংলাদেশের পক্ষে কূটনৈতিক ভূমিকা |
ডি. পি. ধর | পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা | ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির স্থপতি |
সর্দার শরণ সিং | পররাষ্ট্রমন্ত্রী | জাতিসংঘে ভারতের অবস্থান উপস্থাপন |
জগজীবন রাম | প্রতিরক্ষামন্ত্রী | যুদ্ধকালীন সামরিক সমন্বয় |
ঘ. ভারত-সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ (টাইমলাইন)
তারিখ | ঘটনা | তাৎপর্য |
২৫ মার্চ ১৯৭১ | অপারেশন সার্চলাইট শুরু; শরণার্থী প্রবাহ শুরু | ভারতে শরণার্থী চাপ |
এপ্রিল-মে ১৯৭১ | মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ শুরু; ভারতীয় বিএসএফ সহায়তা | সশস্ত্র প্রতিরোধের ভিত্তি |
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ | মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ মেহেরপুর জেলায় | সরকারের আনুষ্ঠানিকতা |
২৮ জুন ১৯৭১ | ভারতে শরণার্থীর সংখ্যা ৬০ লাখ ছাড়ায় | মানবিক সংকট চরমে |
৯ আগস্ট ১৯৭১ | ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর | চীন-যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপের আশঙ্কা হ্রাস |
অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৭১ | ইন্দিরা গান্ধীর বিশ্ব সফর | আন্তর্জাতিক জনমত গঠন |
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ | পাকিস্তানের ভারতীয় বিমানঘাঁটিতে অগ্রিম আক্রমণ | ভারত আনুষ্ঠানিক যুদ্ধে যোগ |
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান | প্রথম দেশগুলোর একটি |
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ | মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় |
১২ মার্চ ১৯৭২ | ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহার | সার্বভৌমত্বের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠা |
১৯ মার্চ ১৯৭২ | মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি (২৫ বছর) | দ্বিপাক্ষিক ভিত্তি |
২ জুলাই ১৯৭২ | ভারত-পাকিস্তান সিমলা চুক্তি | যুদ্ধপরবর্তী বন্দি ফেরত প্রক্রিয়া শুরু |
১৬ মে ১৯৭৪ | মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি (LBA) | ছিটমহল বিনিময়ের ভিত্তি |
ঙ. মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
📌 সূত্র-১: ভারতের যুদ্ধে প্রবেশের তারিখ মনে রাখার ট্রিক 📌 "৩-৬-১৬" সূত্র: ৩ ডিসেম্বর (পাকিস্তানের আক্রমণ), ৬ ডিসেম্বর (ভারতের স্বীকৃতি), ১৬ ডিসেম্বর (বিজয়)। তিনটি তারিখই ডিসেম্বরে। 📌 "১০-১৭ এপ্রিল": মুজিবনগর সরকার গঠন (১০ এপ্রিল) ও শপথ (১৭ এপ্রিল)— ৭ দিনের ব্যবধান। 📌 ভারতের প্রধান ৪ ব্যক্তিত্ব মনে রাখার সূত্র: "ইন্দিরা-মানেকশ-অরোরা-জ্যাকব" — রাজনৈতিক, সামরিক প্রধান, পূর্বাঞ্চল কমান্ডার, চীফ অফ স্টাফ। |
📌 সূত্র-২: চুক্তি ও সালের ছন্দ 📌 "৯-৮-৭১ = ইন্দো-সোভিয়েত" (৯ আগস্ট ১৯৭১) 📌 "১৯-৩-৭২ = মুজিব-ইন্দিরা" (১৯ মার্চ ১৯৭২) 📌 "২-৭-৭২ = সিমলা চুক্তি" (২ জুলাই ১৯৭২) 📌 "১৬-৫-৭৪ = LBA চুক্তি" (১৬ মে ১৯৭৪) |
চ. বিশেষ নোট
⚠ কনফিউজিং তথ্যের পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রশ্ন: বাংলাদেশকে কোন দেশ প্রথম স্বীকৃতি দেয়— ভুটান নাকি ভারত? উত্তর: বাংলাদেশ সরকারের সরকারি অবস্থান অনুযায়ী ভুটান প্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে সকাল ১১টার আগে; ভারত একই দিন কয়েক ঘণ্টা পরে স্বীকৃতি দেয়। তবে BCS প্রিলিতে কোনো এক বিকল্পে শুধু 'ভারত' থাকলে ভারতই উত্তর; কোনো এক বিকল্পে 'ভুটান' থাকলে ভুটান উত্তর। উভয় থাকলে— ভুটান। সতর্কতা: 'মিত্রবাহিনী' = ভারত + মুক্তিবাহিনী; 'মুক্তিবাহিনী' = শুধু বাংলাদেশের গেরিলা ও নিয়মিত বাহিনী। ভারত মুক্তিযুদ্ধে যৌথ বাহিনী গঠন করে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে। |
ছ. সতর্কতা: জোড়া তথ্যের ফাঁদ
⚠ পরীক্ষায় বিভ্রান্তিকর জোড়া তথ্য ❌ ভারতের প্রথম স্বাধীন প্রধানমন্ত্রী = জওহরলাল নেহরু (১৯৪৭); মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী = ইন্দিরা গান্ধী। ❌ মিত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি = লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা; সম্পূর্ণ ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান = জেনারেল স্যাম মানেকশ। ❌ পাকিস্তান বাহিনীর পক্ষে আত্মসমর্পণপত্রে স্বাক্ষরকারী = লে. জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি; পশ্চিম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট = ইয়াহিয়া খান। ❌ "ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি" (১৯৭১) ≠ "মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি" (১৯৭২) ≠ "সিমলা চুক্তি" (১৯৭২)। তিনটি ভিন্ন চুক্তি। ❌ "১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা স্থল সীমান্ত চুক্তি" নয়াদিল্লিতে স্বাক্ষরিত (অপশনে 'ঢাকা' থাকলে ভুল)। |
ঝ. পরীক্ষার প্রশ্ন (Q&A)
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন? উত্তর: ইন্দিরা গান্ধী (Indira Gandhi)। |
প্রশ্ন: আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি কে ছিলেন? উত্তর: সমর সেন। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডের প্রধান কে ছিলেন? উত্তর: লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। |
প্রশ্ন: পাকিস্তান বাহিনী কার নিকট আত্মসমর্পণ করে? উত্তর: ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করেন লে. জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি। |
প্রশ্ন: ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয়? উত্তর: ৯ আগস্ট ১৯৭১, নয়াদিল্লিতে। |
প্রশ্ন: ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি কোথায় স্বাক্ষরিত হয়? উত্তর: নয়াদিল্লিতে (১৬ মে ১৯৭৪)। |
প্রশ্ন: ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সিমলা চুক্তি কত সালে স্বাক্ষরিত হয়? উত্তর: ১৯৭২ সালে (২ জুলাই)। |
প্রশ্ন: ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করে কত তারিখে? উত্তর: ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। |
প্রশ্ন: মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি কত মেয়াদি ছিল? উত্তর: ২৫ বছর মেয়াদি (১৯ মার্চ ১৯৭২ স্বাক্ষরিত)। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে কত শরণার্থী আশ্রয় নেয়? উত্তর: প্রায় ১ কোটি (১০ মিলিয়ন)। |
ঞ. লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক ও নির্ণায়ক— মানবিক (এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়), সামরিক (মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও যৌথ অভিযান) এবং কূটনৈতিক (ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ও বিশ্ব জনমত গঠন)। ইন্দিরা গান্ধীর দৃঢ় নেতৃত্ব এবং স্যাম মানেকশর সামরিক দূরদর্শিতা মাত্র ১৩ দিনে যুদ্ধ পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনে সহায়ক হয়েছে।” “তবে ভারত-নির্ভরতা পরবর্তীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে 'ভারসাম্যনীতি' রক্ষার চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে; বিশেষ করে গঙ্গার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও ছিটমহল ইস্যুতে।” |
২. সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা |
ক. প্রেক্ষাপট আলোচনা
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক মিত্র। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র-চীন-পাকিস্তান অক্ষশক্তি গঠিত হওয়ায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন কৌশলগতভাবে ভারত ও বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করে। ১৯৬৯ সালের সিনো-সোভিয়েত সীমান্ত সংঘাতের পর সোভিয়েত-চীন সম্পর্ক চরম শত্রুতায় রূপ নেয়; ফলে চীনপন্থী পাকিস্তানকে দুর্বল করা সোভিয়েত পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারে পরিণত হয়।
সোভিয়েত নেতৃত্বে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক লিওনিদ ব্রেজনেভ, প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি। তাঁরা ৯ আগস্ট ১৯৭১ সালে ভারতের সাথে ২০ বছর মেয়াদি মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন; এই চুক্তি ভারতকে কূটনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা প্রদান করে যাতে চীন পাকিস্তানের পক্ষে হস্তক্ষেপ না করে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হলে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত ইয়াকভ মালিক তিনবার ভেটো প্রয়োগ করে প্রস্তাব আটকে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের 'অপারেশন ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ' অর্থাৎ বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর প্রেরণের জবাবে সোভিয়েত নৌবাহিনী ভ্লাদিভোস্টক থেকে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রসজ্জিত দুটি যুদ্ধজাহাজের দল প্রেরণ করে, যা ১৮ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি ১৯৭২ পর্যন্ত মার্কিন টাস্ক ফোর্স-৭৪-কে অনুসরণ করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে; এটি ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় (পূর্ব জার্মানির পরে— ১১ জানুয়ারি ১৯৭২) স্বীকৃতি।
📘 ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া/সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন) যে কোনো প্রস্তাবে 'না' ভোট দিয়ে তা অকার্যকর করার ক্ষমতা রাখে— এটিই ভেটো ক্ষমতা। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩ বার ভেটো প্রয়োগ করে: ৪ ডিসেম্বর, ৫ ডিসেম্বর এবং ১৩ ডিসেম্বর। |
খ. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি: ৯ আগস্ট ১৯৭১, নয়াদিল্লি; ২০ বছর মেয়াদি 'Treaty of Peace, Friendship and Cooperation'। সোভিয়েত পক্ষে স্বাক্ষর করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমিকো; ভারতের পক্ষে সর্দার শরণ সিং।
জাতিসংঘে ভেটো: মুক্তিযুদ্ধকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ৩ বার ভেটো প্রয়োগ করে (৪, ৫ ও ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১) যাতে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস না হয়।
সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত: জাতিসংঘে সোভিয়েত স্থায়ী প্রতিনিধি ইয়াকভ মালিক ভেটো প্রয়োগ করেন।
নৌশক্তি প্রদর্শন: মার্কিন সপ্তম নৌবহরের জবাবে সোভিয়েত নৌবাহিনী ভ্লাদিভোস্টক থেকে দুটি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী জাহাজের দল প্রেরণ করে (৬ ও ১৩ ডিসেম্বর)।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২; ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রথম।
জুলিও কুরি শান্তি পুরস্কার: ১৯৭২ সালের ২৩ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়; ১০ অক্টোবর ১৯৭৩ ঢাকায় প্রদান করা হয়। জুলিও কুরি পুরস্কার সমাজতান্ত্রিক ব্লক-প্রভাবিত World Peace Council প্রদান করে।
অর্থনৈতিক সহায়তা: যুদ্ধোত্তর সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ, রূপপুর পরমাণু কেন্দ্রের প্রাথমিক সমীক্ষা ও ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সহায়তা করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ: ১৯৭২-১৯৭৪; সোভিয়েত নৌবাহিনীর 'অপারেশন ক্লিয়ারেন্স' (Operation Lima); ১২ জন সোভিয়েত নৌ-সদস্য এই অপারেশনে মারা যান।
গ. প্রধান সোভিয়েত ব্যক্তিত্ব
ব্যক্তিত্ব | পদ | অবদান |
লিওনিদ ব্রেজনেভ | সাধারণ সম্পাদক, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি | প্রকৃত নীতিনির্ধারক; বাংলাদেশের পক্ষে কৌশল প্রণয়ন |
আলেক্সেই কোসিগিন | প্রধানমন্ত্রী | ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তির আলোচনায় ভূমিকা |
নিকোলাই পদগর্নি | প্রেসিডেন্ট | আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান |
আন্দ্রেই গ্রোমিকো | পররাষ্ট্রমন্ত্রী | ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তিতে সোভিয়েত পক্ষে স্বাক্ষর |
ইয়াকভ মালিক | জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি | ডিসেম্বর ১৯৭১ এ ৩ বার ভেটো প্রয়োগ |
নিকোলাই ফিরিউবিন | উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী (এশিয়া) | ঢাকায় কূটনৈতিক যোগাযোগ |
ঘ. সোভিয়েত ইউনিয়ন-সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ
তারিখ | ঘটনা | তাৎপর্য |
মার্চ-এপ্রিল ১৯৭১ | সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগর্নির প্রতিবাদপত্র ইয়াহিয়া খানকে | মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা |
৯ আগস্ট ১৯৭১ | ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর | চীন-যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তি ভাঙার কৌশল |
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ | জাতিসংঘে প্রথম ভেটো (রেজোলিউশন S/10416) | যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব আটকে দেয় |
৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ | জাতিসংঘে দ্বিতীয় ভেটো | আবার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নাকচ |
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | সোভিয়েত নৌবাহিনীর প্রথম জাহাজ-দল ভ্লাদিভোস্টক ত্যাগ | মার্কিন সপ্তম নৌবহরের জবাব |
১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ | জাতিসংঘে তৃতীয় ভেটো (রেজোলিউশন ৩০৩) | শেষ চেষ্টা ব্যর্থ; বিজয় নিশ্চিত |
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ | সোভিয়েত কূটনৈতিক বিজয় |
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ | বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি | আন্তর্জাতিকীকরণে সহায়ক |
২৩ মে ১৯৭২ | বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি পুরস্কারের সিদ্ধান্ত | শান্তির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি |
১৯৭২-১৯৭৪ | চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণ অভিযান | যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে সহায়তা |
ঙ. মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
📌 সূত্র: সোভিয়েত ৩ ভেটোর সিরিয়াল 📌 "৪-৫-১৩" সূত্র: সোভিয়েত ভেটোর তারিখ— ৪ ডিসেম্বর, ৫ ডিসেম্বর, ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। 📌 মনে রাখুন: "স-ভ-চ-ছি" — সোভিয়েত (সোভিয়েত ইউনিয়ন), ভ (ভেটো), চ (চারটি ডিসেম্বরে), ছি (ছিটিয়ে দেয় যুদ্ধবিরতি)। 📌 "২৪-১-৭২" = সোভিয়েত স্বীকৃতি তারিখ; ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২। 📌 জুলিও কুরি = জুলাই-অক্টোবর সম্পর্কিত নয়; এটি ফরাসি বিজ্ঞানীদের নামে; ব্রেজনেভের সোভিয়েত প্রভাবের অধীনে World Peace Council প্রদান করে। |
চ. বিশেষ নোট
⚠ কনফিউজিং তথ্য প্রশ্ন: জাতিসংঘে ক'টি দেশ বাংলাদেশের পক্ষে ভেটো দিয়েছিল? উত্তর: একটিই দেশ— সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে ৩ বার ভেটো দেয় (ডিসেম্বর ৪, ৫ এবং ১৩, ১৯৭১)। কোনো পরীক্ষায় 'কতবার ভেটো' প্রশ্ন এলে উত্তর = ৩। সোভিয়েত ইউনিয়ন = USSR; পূর্ণরূপ Union of Soviet Socialist Republics; ১৯৯১ সালে বিলুপ্ত হয়। প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন আর সাধারণ সম্পাদক ব্রেজনেভ— পরীক্ষায় প্রায়ই এই দুজনকে গুলিয়ে ফেলা হয়। প্রকৃত শাসক ছিলেন ব্রেজনেভ। |
ছ. সতর্কতা: জোড়া তথ্যের ফাঁদ
⚠ পরীক্ষায় বিভ্রান্তিকর জোড়া তথ্য ❌ সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম স্বীকৃতিদানকারী নয়; স্বীকৃতিদানকারী ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় (পূর্ব জার্মানির পর)। ❌ "ভেটো" দেয় শুধু নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্য; সাধারণ পরিষদে ভেটো নেই। ❌ ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি ২০ বছর মেয়াদি; মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি ২৫ বছর মেয়াদি— গুলিয়ে যাওয়া যাবে না। ❌ সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট = পদগর্নি (নামমাত্র), প্রকৃত নেতা = ব্রেজনেভ (সাধারণ সম্পাদক)। ❌ জুলিও কুরি পুরস্কার = ১৯৭২ সালে ঘোষণা; প্রদান ১০ অক্টোবর ১৯৭৩। |
ঝ. পরীক্ষার প্রশ্ন (Q&A)
প্রশ্ন: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতিসংঘে কোন দেশ বাংলাদেশের পক্ষে 'ভেটো' প্রদান করেছিল? উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR)। |
প্রশ্ন: সোভিয়েত ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধকালে কতবার ভেটো প্রয়োগ করে? উত্তর: ৩ বার (৪ ডিসেম্বর, ৫ ডিসেম্বর ও ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)। |
প্রশ্ন: ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয়? উত্তর: ৯ আগস্ট ১৯৭১, নয়াদিল্লি। |
প্রশ্ন: সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে কখন স্বীকৃতি দান করে? উত্তর: ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২। |
প্রশ্ন: বঙ্গবন্ধু কবে জুলিও কুরি পুরস্কার লাভ করেন? উত্তর: ১৯৭২ সালে ঘোষণা; ১০ অক্টোবর ১৯৭৩ সালে প্রদান। |
প্রশ্ন: সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকৃত নেতা মুক্তিযুদ্ধকালে কে ছিলেন? উত্তর: লিওনিদ ব্রেজনেভ (সাধারণ সম্পাদক, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি)। |
প্রশ্ন: চট্টগ্রাম বন্দরের মাইন অপসারণে কোন দেশ সহায়তা করে? উত্তর: সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৭২-১৯৭৪)। |
প্রশ্ন: সোভিয়েত নৌবাহিনীর জাহাজ কোথা থেকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করে? উত্তর: ভ্লাদিভোস্টক বন্দর থেকে। |
ঞ. লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৌশলগতভাবে অপরিহার্য ছিল। ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি (৯ আগস্ট ১৯৭১) মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে কূটনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করে; জাতিসংঘে তিনবার ভেটো প্রয়োগ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব আটকে দিয়ে চূড়ান্ত সামরিক বিজয়ের পথ উন্মুক্ত রাখে।” “সোভিয়েত হস্তক্ষেপ ছিল মূলত পরোক্ষ কিন্তু সিদ্ধান্তমূলক— সরাসরি সামরিক না হলেও কূটনৈতিকভাবে এটি ছিল বাংলাদেশের জন্য রক্ষাকবচ। শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এটি প্রমাণ করে যে ক্ষুদ্র জাতির স্বাধীনতা বৃহৎ শক্তির স্বার্থের সাথে কীভাবে আন্তঃসম্পর্কযুক্ত।” |
৩. যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা |
ক. প্রেক্ষাপট আলোচনা
মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল দ্বিধাবিভক্ত— সরকারিভাবে পাকিস্তানপন্থী, বেসরকারিভাবে বাংলাদেশপন্থী। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) হেনরি কিসিঞ্জারের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ছিল তিনটি স্বার্থ: প্রথমত, চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন (পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী); দ্বিতীয়ত, ভারতে সোভিয়েত প্রভাব রোধ; তৃতীয়ত, পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা।
এই কারণেই হোয়াইট হাউস 'অপারেশন সার্চলাইট' এর গণহত্যাকে আভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে কোনো প্রকাশ্য নিন্দা জানায়নি। কংগ্রেস কর্তৃক পাকিস্তানে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও নিক্সন প্রশাসন গোপনে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্র USS Enterprise নেতৃত্বাধীন সপ্তম নৌবহর (Task Force 74) বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ করে— এটি ছিল ভারতকে চাপ দেওয়ার সর্বশেষ চেষ্টা।
তবে মার্কিন সরকারি অবস্থানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল মার্কিন নাগরিক সমাজ। ঢাকায় নিযুক্ত কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড 'ব্লাড টেলিগ্রাম' প্রেরণ করে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। সিনেটর এডওয়ার্ড (টেড) কেনেডি ১৯৭১ সালের আগস্টে কলকাতার শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেন। ১ আগস্ট ১৯৭১ সালে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে অনুষ্ঠিত হয় 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ'— ইতিহাসের প্রথম দাতব্য রক কনসার্ট। যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ৪ এপ্রিল ১৯৭২ সালে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।
📘 টিল্ট পলিসি (Tilt Policy) ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে নিক্সন-কিসিঞ্জারের পাকিস্তানের পক্ষে নেওয়া পররাষ্ট্রনীতিকে 'Tilt towards Pakistan' বা টিল্ট পলিসি বলা হয়। মূল উদ্দেশ্য: চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে পাকিস্তানের মাধ্যমে; সোভিয়েত-ভারত অক্ষশক্তি দুর্বল করা। ফলাফল: মার্কিন জনমত নিক্সনের বিরুদ্ধে; কিসিঞ্জার পরে স্বীকার করেন এটি ছিল 'misjudgement' (ভুল বিচার)। |
খ. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
মার্কিন সরকারের অবস্থান: প্রকাশ্যে পাকিস্তানের সমর্থন; পাকিস্তানে গোপনে অস্ত্র সরবরাহ; কংগ্রেসের নিষেধাজ্ঞা অমান্য।
সপ্তম নৌবহর প্রেরণ: ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১; USS Enterprise নেতৃত্বাধীন Task Force 74 বঙ্গোপসাগরে প্রেরণ; ভারতকে চাপ প্রদানের চেষ্টা।
সপ্তম নৌবহরের সদর দপ্তর: জাপানের ইয়োকোসুকা (Yokosuka); প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন নৌশক্তির কেন্দ্রবিন্দু।
জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব: ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ থেকে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে; প্রতিবারই সোভিয়েত ভেটোতে নাকচ।
ব্লাড টেলিগ্রাম: ৬ এপ্রিল ১৯৭১; ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড ও তাঁর সহকর্মীরা স্বাক্ষরিত প্রতিবাদপত্র; পাকিস্তানি গণহত্যাকে 'selective genocide' বলে আখ্যা।
কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১; নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। আয়োজক জর্জ হ্যারিসন (বিটল্স) ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর। অংশগ্রহণকারী: বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রিস্টন। অনুপস্থিত ছিলেন: জন লেনন।
কনসার্টের অর্থ: প্রায় ২,৪৩,৪১৮ মার্কিন ডলার সংগ্রহ; ইউনিসেফের মাধ্যমে শরণার্থী সাহায্যে ব্যবহৃত।
সিনেটর টেড কেনেডি: ১৯৭১ সালের আগস্টে ভারতের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন; মার্কিন কংগ্রেসে প্রতিবেদন উপস্থাপন; বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু।
মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ: ১৯৭১ সালে যশোর রোডের শরণার্থী শিবির ভ্রমণের পর রচনা করেন বিখ্যাত কবিতা 'September on Jessore Road'।
মার্কিন গায়িকা জোয়ান বায়েজ: মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে 'Song of Bangladesh' গান গান।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ৪ এপ্রিল ১৯৭২; অর্থাৎ স্বাধীনতার প্রায় ৪ মাস পরে; পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে দেরিতে স্বীকৃতিদানকারী।
মার্কিন কংগ্রেসের অবস্থান: ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের সাংসদরা— কেনেডি, ফ্রাঙ্ক চার্চ, উইলিয়াম স্যাক্সবি— নিক্সন প্রশাসনের সমালোচনা করেন।
গ. প্রধান মার্কিন ব্যক্তিত্ব
ব্যক্তিত্ব | পদ / পরিচয় | অবদান |
রিচার্ড নিক্সন | প্রেসিডেন্ট, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৬৯-৭৪) | পাকিস্তানপন্থী টিল্ট পলিসির স্থপতি |
হেনরি কিসিঞ্জার | জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা / পররাষ্ট্রমন্ত্রী | চীনের সঙ্গে গোপন কূটনীতিতে পাকিস্তানকে ব্যবহার; পরে "misjudgement" স্বীকার |
এডওয়ার্ড (টেড) কেনেডি | ডেমোক্র্যাট সিনেটর, ম্যাসাচুসেটস | বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু; শরণার্থী শিবির পরিদর্শন; অর্থ সংগ্রহ |
আর্চার কে. ব্লাড | ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল | "ব্লাড টেলিগ্রাম" প্রেরণ; গণহত্যার নিন্দা |
জর্জ হ্যারিসন | ব্রিটিশ-মার্কিন সংগীতশিল্পী (বিটল্স) | "কনসার্ট ফর বাংলাদেশ" এর প্রধান আয়োজক |
বব ডিলান | মার্কিন সংগীতশিল্পী | কনসার্ট ফর বাংলাদেশে অংশগ্রহণ; বছরের পর প্রথম প্রকাশ্য পারফরম্যান্স |
অ্যালেন গিন্সবার্গ | মার্কিন কবি (Beat Generation) | "September on Jessore Road" রচনা |
জোয়ান বায়েজ | মার্কিন লোকসংগীত শিল্পী | "Song of Bangladesh" পরিবেশন |
ফ্রাঙ্ক চার্চ | ডেমোক্র্যাট সিনেটর | নিক্সনের নীতি সমালোচনা; কংগ্রেসে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব |
উইলিয়াম স্যাক্সবি | রিপাবলিকান সিনেটর | পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদ |
ঘ. যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ
তারিখ | ঘটনা | তাৎপর্য |
৬ এপ্রিল ১৯৭১ | ব্লাড টেলিগ্রাম প্রেরিত | মার্কিন কূটনৈতিক বিদ্রোহ |
জুলাই ১৯৭১ | কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফর (পাকিস্তান হয়ে) | চীন-যুক্তরাষ্ট্র পুনর্মিলন উদ্যোগ |
১ আগস্ট ১৯৭১ | কনসার্ট ফর বাংলাদেশ, নিউইয়র্ক | প্রথম দাতব্য রক কনসার্ট |
আগস্ট ১৯৭১ | টেড কেনেডির ভারত সফর | শরণার্থী শিবির পরিদর্শন |
অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৭১ | মার্কিন কংগ্রেসে পাকিস্তানে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা | নিক্সন প্রশাসনের ওপর চাপ |
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ | জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব | সোভিয়েত ভেটোতে নাকচ |
১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ | USS Enterprise বঙ্গোপসাগরে প্রেরিত | ভারতকে চাপ; কূটনৈতিক প্রদর্শন |
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | মার্কিন কৌশল পরাজিত | — |
৪ এপ্রিল ১৯৭২ | বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি | দেরিতে স্বীকৃতি |
১৮ মে ১৯৭২ | ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস উদ্বোধন | কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন |
ঙ. মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
📌 সূত্র: কনসার্ট ফর বাংলাদেশ 📌 "১-৮-৭১": ১ আগস্ট ১৯৭১ — কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। 📌 স্থান: নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। 📌 আয়োজক: জর্জ হ্যারিসন + পণ্ডিত রবিশঙ্কর (Beatles + ভারতীয় সেতার)। 📌 অংশগ্রহণকারী: বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, রিঙ্গো স্টার, বিলি প্রিস্টন। 📌 অনুপস্থিত: জন লেনন (Beatles সদস্য হলেও যোগ দেননি— ইয়োকো ওনোর সাথে মতানৈক্য)। |
📌 সূত্র: USS Enterprise / সপ্তম নৌবহর 📌 USS Enterprise = পরমাণু-চালিত বিমানবাহী রণতরী। 📌 সপ্তম নৌবহর = US 7th Fleet; সদর দপ্তর ইয়োকোসুকা, জাপান। 📌 Task Force 74 = ১৯৭১ সালে বঙ্গোপসাগরে প্রেরিত নৌবহরের নাম। 📌 আগমনের তারিখ: ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১। 📌 ছন্দ: "৭ নৌবহর — ইয়োকোসুকার বহর"। |
📌 সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি 📌 "৪-৪-৭২" = ৪ এপ্রিল ১৯৭২; দ্বিগুণ "৪" মনে রাখুন। 📌 USA-র স্বীকৃতি অন্যান্য বৃহৎ শক্তির তুলনায় দেরিতে এসেছে। |
চ. বিশেষ নোট
⚠ কনফিউজিং তথ্য প্রশ্ন: কনসার্ট ফর বাংলাদেশের প্রধান শিল্পী/আয়োজক কে? উত্তর: প্রধান আয়োজক ছিলেন দু'জন— জর্জ হ্যারিসন (পাশ্চাত্য সংগীত পক্ষ) ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর (ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত পক্ষ)। তবে BCS প্রিলিতে শুধু একজনের নাম দেওয়া বিকল্পে— জর্জ হ্যারিসন উত্তর। উভয় থাকলে— উভয়েই সঠিক। প্রশ্ন: জর্জ হ্যারিসন কোন দেশের নাগরিক? উত্তর: যুক্তরাজ্য (ব্রিটিশ); তবে তিনি কনসার্টের সময় আমেরিকায় বসবাস করতেন। পরীক্ষায় 'যুক্তরাজ্য' বা 'বৃটেন' উত্তর। মার্কিন সরকার ও মার্কিন জনগণের অবস্থান ছিল ভিন্ন— সরকার পাকিস্তানের পক্ষে, কিন্তু কংগ্রেস, মিডিয়া, শিল্পী, কবি ও বুদ্ধিজীবীরা বাংলাদেশের পক্ষে। |
ছ. সতর্কতা: জোড়া তথ্যের ফাঁদ
⚠ পরীক্ষায় বিভ্রান্তিকর জোড়া তথ্য ❌ মুক্তিযুদ্ধকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট = নিক্সন; মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী/উপদেষ্টা = কিসিঞ্জার। ❌ "কনসার্ট ফর বাংলাদেশ" = ১ আগস্ট ১৯৭১, নিউইয়র্ক; কনসার্টের অর্থ সংগ্রহকারী জর্জ হ্যারিসন (ব্রিটিশ, মার্কিন নয়)। ❌ "সপ্তম নৌবহরের সদর দপ্তর" = ইয়োকোসুকা, জাপান (হাওয়াই বা গুয়াম নয়)। ❌ মার্কিন স্বীকৃতির তারিখ ৪ এপ্রিল ১৯৭২, ৪ ফেব্রুয়ারি বা ১৬ ডিসেম্বর নয়। ❌ "কনসার্টে অনুপস্থিত" = জন লেনন (বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন উপস্থিত ছিলেন)। ❌ "যশোর রোড" এর কবিতা = অ্যালেন গিন্সবার্গ; বব ডিলান নয়। |
ঝ. বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন (Previous Q&A)
প্রশ্ন: স্বাধীন বাংলাদেশকে কখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দান করে? উত্তর: ৪ এপ্রিল ১৯৭২ (অপশনের মধ্যে যদি এটি না থাকে, নিকটতম সঠিক উত্তর; নোট: বহু প্রশ্নপত্রের অপশনে "৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২" ভুলভাবে দেওয়া আছে— সঠিক উত্তর ৪ এপ্রিল ১৯৭২)। |
প্রশ্ন: প্রশান্ত মহাসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহরের সদর দপ্তর কোথায়? উত্তর: ইয়োকোসুকা (Yokosuka), জাপান। |
প্রশ্ন: 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' কবে ও কোথায় অনুষ্ঠিত হয়? উত্তর: ১ আগস্ট ১৯৭১, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে। |
প্রশ্ন: কনসার্ট ফর বাংলাদেশের প্রধান আয়োজক/শিল্পী কে? উত্তর: জর্জ হ্যারিসন (Beatles); সহ-আয়োজক পণ্ডিত রবিশঙ্কর। |
প্রশ্ন: 'কনসার্ট ফর বাংলাদেশ' খ্যাত বাদকদলের নাম কী? উত্তর: বিটল্স (Beatles)। |
প্রশ্ন: জর্জ হ্যারিসন কোন দেশের নাগরিক? উত্তর: যুক্তরাজ্য (Britain)। |
প্রশ্ন: কনসার্ট ফর বাংলাদেশে কে অনুপস্থিত ছিলেন? উত্তর: জন লেনন। |
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন কে? উত্তর: জর্জ হ্যারিসন এবং সিনেটর এডওয়ার্ড (টেড) কেনেডি। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কোন পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল? উত্তর: পাকিস্তানের পক্ষে (সরকারিভাবে); মার্কিন কংগ্রেস ও জনমত বাংলাদেশের পক্ষে। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা কে ছিলেন? উত্তর: প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন; জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। |
প্রশ্ন: 'September on Jessore Road' কবিতার রচয়িতা কে? উত্তর: অ্যালেন গিন্সবার্গ (Allen Ginsberg), মার্কিন কবি। |
ঞ. লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিক বিতর্কিত ও দ্বিধাবিভক্ত অধ্যায়। নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের পাকিস্তানপন্থী 'টিল্ট পলিসি' এবং বঙ্গোপসাগরে USS Enterprise প্রেরণ ছিল কৌশলগত ভুল— পরবর্তীতে কিসিঞ্জার নিজেই একে 'misjudgement' বলে স্বীকার করেন।” “তবে মার্কিন রাষ্ট্র ও মার্কিন জনগণের মধ্যে যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল, তা গণতান্ত্রিক সমাজের শক্তি প্রকাশ করে— সিনেটর কেনেডি, কনসাল আর্চার ব্লাড, কবি গিন্সবার্গ, শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ও বব ডিলান, গায়িকা জোয়ান বায়েজ— এই বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক জাগরণ বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে অপরিসীম অবদান রেখেছে।” |
৪. চীনের ভূমিকা |
ক. প্রেক্ষাপট আলোচনা
মুক্তিযুদ্ধে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবে পাকিস্তানের পক্ষে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত সীমান্ত যুদ্ধের পর চীন ও পাকিস্তান কৌশলগত মিত্রে পরিণত হয়; ১৯৬৩ সালে চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তদুপরি, ১৯৬৯ সালের সিনো-সোভিয়েত সীমান্ত সংঘাতের পর চীন সোভিয়েত-ভারত অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেয়।
চীনের প্রধান নেতা মাও সে-তুং (Mao Zedong) এবং প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই (Zhou Enlai) মুক্তিযুদ্ধকে 'ভারত-পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়' হিসেবে অভিহিত করেন এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষাকে সমর্থন করেন। ২৫ অক্টোবর ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন জাতিসংঘে স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে (তাইওয়ানের পরিবর্তে); ফলে চীন সর্বপ্রথম জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাও পায়।
১৯৭২ সালের ২৫ আগস্ট তারিখে চীন তার জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম ভেটো প্রয়োগ করে— এবং এই ভেটোটি ছিল বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদের আবেদনের বিরুদ্ধে। এই ভেটোর কারণে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ পর্যন্ত বিলম্বিত হয়। চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ সালে— বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের (১৫ আগস্ট ১৯৭৫) মাত্র ১৬ দিন পর। ১৯৭৫ সালের জিয়াউর রহমান সরকার চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং পরবর্তীতে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারে পরিণত হয়।
📘 সিনো-পাকিস্তানি অক্ষশক্তি ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর গঠিত চীন-পাকিস্তানের কৌশলগত মৈত্রী; ভারতকে ঘিরে রাখার ('encirclement') ভূ-রাজনৈতিক কৌশল। ১৯৬৩ সালে স্বাক্ষরিত চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তির মাধ্যমে কাশ্মীরের কিছু অংশ (Trans-Karakoram Tract) চীনকে হস্তান্তরিত হয়। ১৯৭০-৭১ সালে চীন পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখে। |
খ. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
চীনের সরকারি অবস্থান: পাকিস্তানের পক্ষে; বাংলাদেশকে 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' হিসেবে অভিহিত।
প্রধান নেতৃত্ব: চেয়ারম্যান মাও সে-তুং; প্রধানমন্ত্রী চৌ এন-লাই।
চীনের সামরিক হস্তক্ষেপ: প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ চীন করেনি; তবে পাকিস্তানকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রাখে।
জাতিসংঘে প্রথম ভেটো: ২৫ আগস্ট ১৯৭২; বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আবেদন (Resolution S/10771); চীনের ইতিহাসে এটিই প্রথম ভেটো প্রয়োগ।
জাতিসংঘে চীনের প্রবেশ: ২৫ অক্টোবর ১৯৭১ (Resolution 2758); তাইওয়ানের আসন চীন লাভ করে।
বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ: চীনের ভেটোর কারণে বিলম্বিত; অবশেষে ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগ দেয়।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি: ৩১ আগস্ট ১৯৭৫; বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর; পরবর্তী সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক।
পাকিস্তানের পক্ষে কূটনৈতিক চাপ: চীন তার প্রভাবিত দেশগুলোকে (যেমন আলবেনিয়া) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দিতে চাপ দেয়।
যুদ্ধোত্তর সম্পর্ক: ১৯৭৫ সালের পর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্রমে উন্নত হয়; বর্তমানে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অংশীদার (পদ্মা সেতু রেল, বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু ইত্যাদি)।
গ. প্রধান চীনা ব্যক্তিত্ব
ব্যক্তিত্ব | পদ | অবদান |
মাও সে-তুং (Mao Zedong) | চেয়ারম্যান, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি | প্রধান নীতিনির্ধারক; পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান |
চৌ এন-লাই (Zhou Enlai) | প্রধানমন্ত্রী | পাকিস্তানকে কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন প্রদান |
হুয়াং হুয়া (Huang Hua) | জাতিসংঘে চীনের স্থায়ী প্রতিনিধি (১৯৭১-৭৬) | ২৫ আগস্ট ১৯৭২ এ বাংলাদেশের সদস্যপদে ভেটো প্রয়োগ |
চিয়াও কুয়ান হুয়া | উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী | পাকিস্তান-পন্থী বিবৃতি |
ঘ. চীন-সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহ
তারিখ | ঘটনা | তাৎপর্য |
এপ্রিল ১৯৭১ | চৌ এন-লাইয়ের ইয়াহিয়া খানকে সমর্থন বার্তা | পাকিস্তানপন্থী অবস্থান প্রকাশ্যে |
জুলাই ১৯৭১ | কিসিঞ্জারের গোপন বেইজিং সফর | চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ; পাকিস্তান মাধ্যম |
২৫ অক্টোবর ১৯৭১ | জাতিসংঘে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রবেশ (Resolution 2758) | ভেটো ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্থায়ী সদস্য |
ডিসেম্বর ১৯৭১ | চীন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত | শীতকালীন হিমালয় সীমান্ত ও ভারতীয় প্রস্তুতি কারণ |
২৫ আগস্ট ১৯৭২ | বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদে চীনের প্রথম ভেটো | চীনের ইতিহাসে প্রথম ভেটো প্রয়োগ |
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ | চীনের ভেটো প্রত্যাহার; বাংলাদেশ ১৩৬তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগ | আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্পূর্ণ |
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ | বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড; পট পরিবর্তন | চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন অধ্যায় |
৩১ আগস্ট ১৯৭৫ | চীনের বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি | কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন |
ঙ. মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
📌 সূত্র: চীনের প্রথম ভেটো ও বাংলাদেশ 📌 "২৫-৮-৭২" = চীনের প্রথম ভেটো; ২৫ আগস্ট ১৯৭২; বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ। 📌 "১৭-৯-৭৪" = বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য। 📌 "৩১-৮-৭৫" = চীনের স্বীকৃতি; বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ১৬ দিন পর। 📌 ছন্দ: "চীনের ভেটোয় ব্যর্থ চেষ্টা, পরে স্বীকৃতির সম্পর্ক স্বচ্ছ"। |
📌 সূত্র: মাও-চৌ জুটি 📌 চীনে দুই প্রধান নেতা: চেয়ারম্যান মাও (নীতিনির্ধারক) + প্রধানমন্ত্রী চৌ (নির্বাহী)। 📌 বাংলায় উচ্চারণ: মাও সে-তুং, চৌ এন-লাই; ইংরেজিতে Mao Zedong, Zhou Enlai। |
চ. বিশেষ নোট
⚠ কনফিউজিং তথ্য প্রশ্ন: চীন কত তারিখে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়? উত্তর: ৩১ আগস্ট ১৯৭৫। (১৯৭৪, ১৯৭৬ বা ১৯৭৭ ভুল।) প্রশ্ন: চীন কতবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভেটো দেয়? উত্তর: ১ বার (২৫ আগস্ট ১৯৭২, বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদের বিরুদ্ধে); সেটি ছিল চীনের ইতিহাসে প্রথম ভেটো। মুক্তিযুদ্ধকালে চীন প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি; তবে পাকিস্তানকে অস্ত্র ও কূটনৈতিক সমর্থন প্রদান করেছে। চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ১৯৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় (জিয়াউর রহমান সরকারের সময়)। |
ছ. সতর্কতা: জোড়া তথ্যের ফাঁদ
⚠ পরীক্ষায় বিভ্রান্তিকর জোড়া তথ্য ❌ চীনের স্বীকৃতি = ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ (১৫ আগস্ট ১৯৭৫ নয়; ১৫ আগস্ট = বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড)। ❌ চীনের প্রথম ভেটো = বাংলাদেশের বিরুদ্ধে (অন্য কোনো বিষয়ে নয়); ২৫ আগস্ট ১৯৭২। ❌ "মাও সে-তুং" = চেয়ারম্যান (রাষ্ট্রপতি নয়); "চৌ এন-লাই" = প্রধানমন্ত্রী। ❌ চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ভিত্তি = ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ। ❌ গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ও তাইওয়ান (Republic of China)— দুটি ভিন্ন রাষ্ট্র; জাতিসংঘে চীনের আসন ১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন লাভ করে। |
ঝ. পরীক্ষার প্রশ্ন (Q&A)
প্রশ্ন: চীন কত তারিখে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দান করে? উত্তর: ৩১ আগস্ট ১৯৭৫। |
প্রশ্ন: গণচীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় কোন সালে? উত্তর: ১৯৭৫ সালে। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধকালে চীনের প্রধান নেতা কে ছিলেন? উত্তর: চেয়ারম্যান মাও সে-তুং (Mao Zedong)। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন? উত্তর: চৌ এন-লাই (Zhou Enlai)। |
প্রশ্ন: চীন প্রথম কোন প্রস্তাবে ভেটো প্রয়োগ করে? উত্তর: বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ আবেদনে (২৫ আগস্ট ১৯৭২)। |
প্রশ্ন: বাংলাদেশ কোন তারিখে জাতিসংঘের সদস্য হয়? উত্তর: ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪, ১৩৬তম সদস্য হিসেবে। |
প্রশ্ন: মুক্তিযুদ্ধে চীন কোন পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল? উত্তর: পাকিস্তানের পক্ষে। |
প্রশ্ন: চীন ও পাকিস্তানের কৌশলগত মৈত্রী কখন গঠিত হয়? উত্তর: ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর। |
ঞ. লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “চীনের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে ছিল কৌশলগতভাবে পাকিস্তানপন্থী এবং বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধ এবং সিনো-সোভিয়েত বিভাজন চীনকে বাধ্য করে পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বনে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদে চীনের প্রথম ভেটো প্রমাণ করে যে তখনকার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বাংলাদেশকে কেবলমাত্র আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অঙ্গনেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।” “১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ ঘটে এবং বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো বিনিয়োগকারী— এই বিবর্তন প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে 'কোনো স্থায়ী মিত্র নেই, আছে শুধু স্থায়ী স্বার্থ'।” |
৫.তুলনামূলক ছক ও চটজলদি রিভিশন |
ক. চারটি বৃহৎ শক্তির পূর্ণাঙ্গ তুলনা
বিষয় | ভারত | সোভিয়েত ইউনিয়ন | যুক্তরাষ্ট্র | চীন |
অবস্থান | বাংলাদেশের পক্ষে | বাংলাদেশের পক্ষে | পাকিস্তানের পক্ষে | পাকিস্তানের পক্ষে |
প্রধান নেতা | ইন্দিরা গান্ধী | ব্রেজনেভ / কোসিগিন | নিক্সন / কিসিঞ্জার | মাও সে-তুং / চৌ এন-লাই |
প্রকৃতি | প্রত্যক্ষ সামরিক | কূটনৈতিক ছাতা | কূটনৈতিক চাপ | কূটনৈতিক বিরোধিতা |
মূল ঘটনা | ৩ ডিসে. যুদ্ধে যোগ; ১৬ ডিসে. বিজয় | জাতিসংঘে ৩ ভেটো | সপ্তম নৌবহর প্রেরণ | জাতিসংঘে প্রথম ভেটো |
চুক্তি/পদক্ষেপ | মিত্রবাহিনী গঠন | ইন্দো-সোভিয়েত চুক্তি | টিল্ট পলিসি, USS Enterprise | পাকিস্তানে অস্ত্র সরবরাহ |
স্বীকৃতির তারিখ | ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ | ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ | ৪ এপ্রিল ১৯৭২ | ৩১ আগস্ট ১৯৭৫ |
স্বীকৃতির ক্রম | ২য় (ভুটানের পর) | ৪র্থ ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তি | ৪৫তম সাধারণভাবে | পরবর্তী, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর |
খ. বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী প্রথম ১০টি দেশের তালিকা
ক্রম | দেশ | তারিখ |
১ | ভুটান | ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ (কয়েক ঘণ্টা আগে) |
২ | ভারত | ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ |
৩ | পূর্ব জার্মানি (GDR) | ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৪ | পোল্যান্ড | ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৫ | বুলগেরিয়া | ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৬ | মঙ্গোলিয়া | ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৭ | চেকোস্লোভাকিয়া | ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৮ | মায়ানমার (বার্মা) | ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ |
৯ | যুগোস্লাভিয়া | ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ |
১০ | ইউক্রেন SSR | ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২ |
⚠ সতর্কতা: প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশ সম্পর্কে ❶ বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি অবস্থান: ভুটান প্রথম (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, সকালে ওয়্যারলেস বার্তা)। ❷ ভারত দ্বিতীয় (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১, কয়েক ঘণ্টা পর— ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় ঘোষণা দেন)। ❸ আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী = ইরাক (৮ জুলাই ১৯৭২)। ❹ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে প্রথম = সেনেগাল (২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)। ❺ ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী = পূর্ব জার্মানি (GDR), ১১ জানুয়ারি ১৯৭২। ❻ ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে প্রথম = পোল্যান্ড ও পূর্ব জার্মানি। ❼ সোভিয়েত ব্লকের বাইরে প্রথম পশ্চিমা দেশ = যুক্তরাজ্য (৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)। |
গ. সমগ্র চ্যাপ্টারের 'চটজলদি রিভিশন'
⚡ ৩০-সেকেন্ড রিভিশন: ১৫টি মূল তথ্য ১. মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দুই বৃহৎ শক্তি: ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন। ২. মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে দুই বৃহৎ শক্তি: যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ৩. ইন্দো-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি: ৯ আগস্ট ১৯৭১, নয়াদিল্লি, ২০ বছর মেয়াদি। ৪. মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী: ইন্দিরা গান্ধী। ৫. মিত্রবাহিনীর পূর্বাঞ্চল কমান্ডার: লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। ৬. সোভিয়েত ইউনিয়ন জাতিসংঘে ৩ বার ভেটো প্রয়োগ করে (৪, ৫ ও ১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)। ৭. মার্কিন সপ্তম নৌবহর (USS Enterprise) বঙ্গোপসাগরে আসে ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১। ৮. সপ্তম নৌবহরের সদর দপ্তর: ইয়োকোসুকা, জাপান। ৯. কনসার্ট ফর বাংলাদেশ: ১ আগস্ট ১৯৭১, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। ১০. কনসার্টের আয়োজক: জর্জ হ্যারিসন (বিটল্স, ব্রিটিশ) ও পণ্ডিত রবিশঙ্কর। ১১. ব্লাড টেলিগ্রাম: ৬ এপ্রিল ১৯৭১; প্রেরক আর্চার কে. ব্লাড। ১২. চীনের প্রথম ভেটো: ২৫ আগস্ট ১৯৭২; বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদের বিরুদ্ধে। ১৩. বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ: ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪; ১৩৬তম সদস্য। ১৪. বঙ্গবন্ধু জুলিও কুরি পুরস্কার লাভ: ১৯৭২ সালে ঘোষণা; ১০ অক্টোবর ১৯৭৩ প্রদান। ১৫. স্বীকৃতির ক্রম: ভুটান → ভারত (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) → পূর্ব জার্মানি (১১ জানুয়ারি ১৯৭২) → সোভিয়েত ইউনিয়ন (২৪ জানুয়ারি ১৯৭২) → যুক্তরাজ্য (৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২) → যুক্তরাষ্ট্র (৪ এপ্রিল ১৯৭২) → চীন (৩১ আগস্ট ১৯৭৫)। |
ঘ. সামগ্রিক লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সংঘাত নয়; এটি ছিল শীতল যুদ্ধের কৌশলগত প্রক্ষেপণ। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী মার্কিন-চীন-পাকিস্তান অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে সফল পাল্টা-অবস্থান গড়ে তোলে। বঙ্গোপসাগরে USS Enterprise এবং জাতিসংঘে সোভিয়েত ভেটোর সমান্তরাল ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের জন্ম শুধু সাহস ও আত্মত্যাগের ফল নয়, বরং কৌশলগত কূটনৈতিক ভারসাম্যেরও ফল।” “এই কূটনৈতিক বাস্তবতার শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক— বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র 'সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়' (Friendship to All, Malice to None) এই অভিজ্ঞতারই ফসল। বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে স্বাধীন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার শিক্ষা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চিরন্তন উত্তরাধিকার।” |
✓ অধ্যায় সমাপ্ত |