ব্রিটিশ শাসন ও ঔপনিবেশিক বাংলা ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ — কোম্পানি শাসন, রাজশাসন ও স্বাধিকার চেতনার ক্রমধারা |
চ্যাপ্টার সারসংক্ষেপ |
পলাশীর যুদ্ধে (২৩ জুন ১৭৫৭) বাংলার শেষ স্বাধীন নওয়াব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে এ ভূখণ্ডে শুরু হয় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) বিজয়ের পর ১৭৬৫ সালে কোম্পানি দিউয়ানি লাভ করে এবং ক্লাইভ-প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন (১৭৬৫–১৭৭২) শুরু হয়। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেন। ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের পর ১৮৫৮ সাল থেকে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটিয়ে সরাসরি ব্রিটিশ রাজশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। উনিশ শতকের নবজাগরণ (রামমোহন, বিদ্যাসাগর), ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮), তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৮৩১) ও নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯–৬০) ঔপনিবেশিক বাংলার চেতনা গঠনে সহায়তা করে। বিশ শতকের সূচনায় প্রথম বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫), নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা (১৯০৬), বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা (১৯২১) এবং লাহোর প্রস্তাব (১৯৪০) এর ধারাবাহিকতায় ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। |
১. প্রেক্ষাপট আলোচনা
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাংলা বলতে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত প্রায় ১৯০ বছরের শাসনকালকে বোঝানো হয়। এই সুদীর্ঘ সময়কে দুটি প্রধান পর্বে ভাগ করা যায়: (১) কোম্পানি আমল (১৭৫৭–১৮৫৮), যখন ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রীয় শাসকে রূপান্তরিত হয়; এবং (২) ব্রিটিশ রাজশাসন বা ক্রাউন রুল (১৮৫৮–১৯৪৭), যখন ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ রাজমুকুট সরাসরি ভারত শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৭১৭ সালে মুর্শিদকুলি খান বাংলার দিউয়ান থেকে স্বাধীন নওয়াব হয়ে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন; পরবর্তীতে সুজাউদ্দীন, সরফরাজ খান, আলীবর্দী খান হয়ে ১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলা বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। নওয়াবের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও কোম্পানির সঙ্গে দুর্গ-প্রতিরক্ষার বিরোধের পরিণতিতে ২৩ জুন ১৭৫৭ পলাশীর প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন কোম্পানি বাহিনী সিরাজকে পরাজিত করে। মীর জাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ ও জগৎ শেঠদের ষড়যন্ত্রের ফলে সিরাজের বিশাল সৈন্যবাহিনী যুদ্ধে যোগ দেয়নি। পলাশীর পর প্রায় আট বছর কোম্পানি মীর জাফর ও মীর কাসিমকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিয়ন্ত্রণ চালায়। বক্সারের যুদ্ধে (১৭৬৪) মীর কাসিম, অযোধ্যার নওয়াব ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের যৌথ বাহিনীকে পরাজিত করার পর ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদ চুক্তিতে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানি (রাজস্ব আদায় ও দেওয়ানি বিচারের অধিকার) লাভ করে। প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বৈত শাসন — রাজস্ব ও বিচার কোম্পানির হাতে, প্রশাসন নওয়াবের হাতে। ফলস্বরূপ ১৭৭০ সালে দেখা দেয় বাংলার ভয়াবহ মন্বন্তর, যাকে 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বলা হয়; বাংলার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা প্রাণ হারায়। কোম্পানি শাসনের ভিত্তি গড়ে তোলেন ওয়ারেন হেস্টিংস (প্রথম গভর্নর জেনারেল, ১৭৭৩) ও লর্ড কর্নওয়ালিস (চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ১৭৯৩)। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে (১৮২৮–৩৫) সতীদাহ বিলোপ ও ম্যাকলের ইংরেজি শিক্ষানীতি প্রবর্তিত হয়। লর্ড ডালহৌসির আমলে (১৮৪৮–৫৬) ভারতে রেলপথ, টেলিগ্রাফ ও ডাকব্যবস্থার সূচনা হয়। ১৮৫৭-এর সিপাহি বিদ্রোহের পরিণতিতে ১৮৫৮ সালের 'অ্যাক্ট ফর দ্য বেটার গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া' আইনে কোম্পানি শাসন বিলুপ্ত হয় এবং রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র (১ নভেম্বর ১৮৫৮) অনুযায়ী ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজের অধীনে আসে। উনিশ শতকে বাংলায় গড়ে ওঠে দুটি সমান্তরাল প্রতিরোধ ধারা: একদিকে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখের নেতৃত্বে সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন (বঙ্গীয় নবজাগরণ); অন্যদিকে হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন, তিতুমীরের বারাসাত বিদ্রোহ ও কৃষকদের নীল বিদ্রোহ। বিশ শতকের সূচনায় ১৯০৫ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গ বাঙালির রাজনৈতিক চেতনাকে নতুন মাত্রা দেয় — পশ্চিম বাংলায় স্বদেশী আন্দোলন এবং পূর্ব বাংলায় ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ এবং ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর — উভয় সিদ্ধান্ত পঞ্চম জর্জের দিল্লি দরবারে ঘোষিত হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ এ. কে. ফজলুল হক উত্থাপিত 'লাহোর প্রস্তাব' পরবর্তীতে পাকিস্তান-চিন্তার ভিত্তি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সংকট, ১৯৪৩-এর পঞ্চাশের মন্বন্তর, ১৯৪৬-এর কলকাতা ও নোয়াখালী দাঙ্গা এবং র্যাডক্লিফ কমিশনের সীমানা নির্ধারণের ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে; পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। |
২. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
২.১ কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠা (১৭৫৭–১৭৭৩)
● পলাশীর যুদ্ধ: ২৩ জুন ১৭৫৭; স্থান নদীয়া জেলার পলাশী, ভাগীরথী নদীর তীরে; ব্রিটিশ পক্ষে রবার্ট ক্লাইভ; বাংলা পক্ষে নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা; ফরাসিরা সিরাজের পক্ষে ছিল। ● পলাশীর কুশীলব: সিরাজবিরোধী ষড়যন্ত্রে — মীর জাফর (সেনাপতি), রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, জগৎ শেঠ, উমিচাঁদ ও ঘসেটি বেগম; বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর মদন ও মোহনলাল যুদ্ধে নিহত হন। ● যুদ্ধপরবর্তী নওয়াব: মীর জাফর (১৭৫৭–১৭৬০), মীর কাসিম (১৭৬০–১৭৬৩), পুনরায় মীর জাফর (১৭৬৩–১৭৬৫); সিরাজকে হত্যা করেন মীর জাফরের পুত্র মিরন। ● বক্সারের যুদ্ধ: ২২ অক্টোবর ১৭৬৪; স্থান বিহারের বক্সার; ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে মীর কাসিম, অযোধ্যার নওয়াব শুজা-উদ-দৌলা ও মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম-এর যৌথ বাহিনী; ব্রিটিশ পক্ষে হেক্টর মুনরো; ব্রিটিশদের বিজয়। ● দিউয়ানি লাভ: ১২ আগস্ট ১৭৬৫; এলাহাবাদ চুক্তি অনুযায়ী দ্বিতীয় শাহ আলম কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানি প্রদান করেন; মুঘল সম্রাটকে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা পেনশন। ● দ্বৈত শাসন: ১৭৬৫–১৭৭২; প্রবর্তক রবার্ট ক্লাইভ; রাজস্ব ও দেওয়ানি বিচার কোম্পানির হাতে, ফৌজদারি বিচার ও প্রশাসন নওয়াবের হাতে; বিলোপ করেন ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২)। ● ছিয়াত্তরের মন্বন্তর: ১৭৭০ খ্রি. / ১১৭৬ বঙ্গাব্দ; বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ; প্রায় এক কোটি (বাংলার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ) মানুষ প্রাণ হারায়; দ্বৈত শাসনের ব্যর্থতার পরিণতি। ● রেগুলেটিং অ্যাক্ট: ১৭৭৩; এর মাধ্যমে ওয়ারেন হেস্টিংস ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিযুক্ত হন; ১৭৭৪-এ কলকাতায় সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠা। ● পিটের ভারত আইন: ১৭৮৪; ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা; বোর্ড অব কন্ট্রোল গঠন। |
২.২ স্থায়ী শাসনের ভিত্তি ও সংস্কার (১৭৭৩–১৮৫৭)
● চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: ১৭৯৩; প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস; প্রস্তাবক জন শোর; বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় কার্যকর; জমিদারকে চিরস্থায়ী মালিকানা; কোম্পানি পেত মোট রাজস্বের ১০/১১ অংশ, জমিদার ১/১১ অংশ; ২২ মার্চ ১৭৯৩ গৃহীত। ● সূর্যাস্ত আইন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের শর্ত — নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যাস্তের আগে রাজস্ব না দিলে জমিদারি নিলামে উঠত; ফলে বহু পুরোনো জমিদার পরিবার ধ্বংস হয় এবং কলকাতার ধনিক শ্রেণি জমিদার হয়। ● ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ: ১৮০০; প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ওয়েলেসলি; কলকাতা; ১৮০১ সালে বাংলা বিভাগ খোলা হয়, প্রধান উইলিয়াম কেরী; এ কলেজ থেকে আধুনিক বাংলা গদ্যের সূচনা। ● হিন্দু কলেজ: ১৮১৭; কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত; প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড হেয়ার ও রাজা রামমোহন রায়সহ অন্যান্য সংস্কারক; পরে ১৮৫৫ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ নামকরণ। ● ব্রাহ্ম সমাজ: ২০ আগস্ট ১৮২৮; প্রতিষ্ঠাতা রাজা রামমোহন রায়; কলকাতা; একেশ্বরবাদী সংস্কার আন্দোলন; প্রাথমিক নাম 'ব্রাহ্ম সভা'। ● সতীদাহ বিলোপ: ৪ ডিসেম্বর ১৮২৯; রেগুলেশন XVII; প্রবর্তক লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক; রামমোহন রায়ের প্রবল সমর্থনে। ● চার্টার অ্যাক্ট ১৮১৩: চা ও চীনা বাণিজ্য ছাড়া কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া ক্ষমতা বাতিল; খ্রিস্টান মিশনারিদের ভারতে প্রবেশের অনুমতি। ● চার্টার অ্যাক্ট ১৮৩৩: বেন্টিঙ্ক হন ভারতের (শুধু বাংলা নয়) প্রথম গভর্নর জেনারেল; কোম্পানির সব বাণিজ্যিক অধিকার বাতিল। ● ম্যাকলে মিনিটস: ২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫; টমাস ব্যাবিংটন ম্যাকলের প্রস্তাবে ইংরেজি ভাষাকে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ; কার্যকর করেন বেন্টিঙ্ক (৭ মার্চ ১৮৩৫)। ● উড সনদ: ১৮৫৪; স্যার চার্লস উডের শিক্ষাবিষয়ক বিবরণপত্র; ভারতে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার ম্যাগনা কার্টা; ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ● হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন: ১৮৫৬; লর্ড ক্যানিং কর্তৃক স্বাক্ষরিত; ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় প্রবর্তিত। ● ভারতে রেল ও টেলিগ্রাফ: লর্ড ডালহৌসির আমলে — প্রথম রেলপথ ১৮৫৩ (বোম্বে–থানে), প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন ১৮৫৩ (কলকাতা–আগ্রা), ১৮৫৪-তে ডাকটিকেট প্রবর্তন। |
২.৩ স্বদেশী প্রতিরোধ ও কৃষক বিদ্রোহ
● ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ: ১৭৬০–১৮০০-এর দশক; মূল নেতা মজনু শাহ, ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরাণী; বাংলার প্রথম সংঘবদ্ধ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন; বঙ্কিম রচিত 'আনন্দমঠ' এ আন্দোলন কেন্দ্রিক। ● ফরায়েজী আন্দোলন: ১৮১৮ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহ কর্তৃক সূচিত; জন্মস্থান শামাইল গ্রাম, শিবচর, মাদারীপুর জেলা (পুরাতন ফরিদপুর); 'ফরাইজ' (ফরয দায়িত্ব) থেকে নাম; কেন্দ্রস্থল ফরিদপুর, ঢাকা, বাকেরগঞ্জ ও কুমিল্লা; উদ্দেশ্য — ইসলামের পবিত্রতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অনৈসলামিক প্রথা পরিহার। ● দুদু মিয়া (১৮১৯–১৮৬২): প্রকৃত নাম মুহসিনউদ্দিন আহমদ; পিতা হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর (১৮৪০) ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ; আন্দোলনকে কৃষক-শ্রেণির রাজনৈতিক প্রতিরোধে রূপান্তর; ঘোষণা — 'জমির মালিক একমাত্র আল্লাহ'। ● তিতুমীর: প্রকৃত নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী; জন্ম ২৭ জানুয়ারি ১৭৮২, চাঁদপুর গ্রাম, ২৪ পরগনা (পশ্চিমবঙ্গ); মৃত্যু ১৯ নভেম্বর ১৮৩১; 'বাঁশের কেল্লা' নির্মাণ — ২৩ অক্টোবর ১৮৩১, নারিকেলবাড়িয়া (বারাসাত-সংলগ্ন); কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বাহিনী ১৯ নভেম্বর ১৮৩১ কেল্লা গুঁড়িয়ে দেয়। ● নীল বিদ্রোহ: ১৮৫৯–১৮৬০; সূচনা চৌগাছা গ্রামে, কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা; নেতৃত্বে দিগম্বর ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস; বিস্তার যশোর, পাবনা, খুলনা, মুর্শিদাবাদ ও ফরিদপুরে; ফলস্বরূপ ১৮৬০-এ নীল কমিশন গঠন ও ১৮৬২-তে নীল আইন। ● নীল দর্পণ নাটক: ১৮৬০; রচয়িতা দীনবন্ধু মিত্র; ঢাকা থেকে বেনামে প্রকাশিত; ইংরেজি অনুবাদক মাইকেল মধুসূদন দত্ত; প্রকাশক রেভারেন্ড জেমস লং কারাদণ্ড ও জরিমানা ভোগ করেন। ● সিপাহি বিদ্রোহ: ১০ মে ১৮৫৭; মিরাটে সূচনা; মঙ্গল পান্ডে (ব্যারাকপুর, ২৯ মার্চ ১৮৫৭) প্রথম প্রতিরোধ; ভারতে বিদ্রোহকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং; ঢাকার লালবাগ কেল্লা ও পরে বাহাদুরশাহ পার্ক এই বিদ্রোহের স্মৃতিজড়িত; ১৮৫৮-তে কোম্পানির অবসান। ● রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র: ১ নভেম্বর ১৮৫৮; এলাহাবাদ; ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজের অধীনে; ধর্মীয় হস্তক্ষেপ না-করার অঙ্গীকার; কোম্পানি শাসন আনুষ্ঠানিক অবসান। |
২.৪ বঙ্গভঙ্গ ও বিশ শতকের রাজনৈতিক চেতনা
● ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস: ২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৫; বোম্বের গোকুলদাস তেজপাল সংস্কৃত পাঠশালায়; প্রতিষ্ঠাতা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম (এ. ও. হিউম); প্রথম সভাপতি উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়; প্রথম অধিবেশনে ৭২ জন প্রতিনিধি। ● প্রথম বঙ্গভঙ্গ: ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ কার্যকর; ঘোষণা ১৯ জুলাই ১৯০৫; ভাইসরয় লর্ড কার্জন; উদ্দেশ্য প্রশাসনিক সুবিধা; ফলে দুটি প্রদেশ — (১) পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা (রাজধানী কলকাতা); (২) পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী ঢাকা)। ● পূর্ববঙ্গ ও আসাম: নতুন প্রদেশটির জনসংখ্যা ৩.১ কোটি; মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ; প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর ব্যামফিল্ড ফুলার; প্রদেশটির পক্ষে নেতৃত্ব দেন ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ। ● স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন: বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে ১৯০৫–১৯১১ কালজুড়ে চলে; নেতৃত্বে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল; ১৬ অক্টোবর 'রাখী বন্ধন' উৎসব রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে; 'আমার সোনার বাংলা' রচিত (১৯০৫)। ● নিখিল ভারত মুসলিম লীগ: ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬; ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত নবাবদের বাগানবাড়ি 'ইশরাত মঞ্জিল'-এ (বর্তমান মধুর ক্যান্টিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর); সভাপতিত্ব করেন নবাব ভিকার-উল-মুলক; প্রস্তাবক নবাব সলিমুল্লাহ, সমর্থক হাকিম আজমল খান; প্রথম সভাপতি স্যার সুলতান মুহম্মদ শাহ আগা খান, সহসভাপতি নবাব সলিমুল্লাহ। ● মুসলিম লীগের প্রথম অধিবেশন: ২৯ ডিসেম্বর ১৯০৭; করাচিতে; সভাপতি আদমজি পীরভাই। ● মর্লে-মিন্টো সংস্কার: ১৯০৯ ভারত শাসন আইন; মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী; সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। ● বঙ্গভঙ্গ রদ: ১২ ডিসেম্বর ১৯১১; দিল্লির রাজকীয় দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জের ঘোষণা; কারণ — স্বদেশী আন্দোলনের চাপ ও সন্ত্রাসবাদের উত্থান; পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা পুনরায় একীভূত; বিহার-উড়িষ্যা পৃথক প্রদেশ; আসাম স্বতন্ত্র। ● রাজধানী স্থানান্তর: ১৯১১-এর ঘোষণা অনুযায়ী ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরিত; নতুন দিল্লি ১৯৩১-এ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। ● ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ১ জুলাই ১৯২১ যাত্রা শুরু; প্রথম উপাচার্য পি. জে. হার্টগ; প্রথম প্রস্তাব নবাব সলিমুল্লাহর (১৯১২-এ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে বৈঠকে); বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে গৃহীত। |
২.৫ স্বাধিকার আন্দোলন ও দেশভাগ (১৯২০–১৯৪৭)
● রাওলাট আইন: ১৯১৯; বিনাবিচারে আটক রাখার আইন; জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড — ১৩ এপ্রিল ১৯১৯, অমৃতসর, জেনারেল ডায়ারের নেতৃত্বে। ● খেলাফত আন্দোলন: ১৯১৯–১৯২৪; ভারতীয় মুসলিম নেতৃত্বে — মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মুহাম্মদ আলী; অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ● অসহযোগ আন্দোলন: ১৯২০–১৯২২; নেতৃত্বে মহাত্মা গান্ধী; চৌরিচৌরা ঘটনার পর (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২২) আন্দোলন প্রত্যাহার। ● সাইমন কমিশন: ১৯২৮; সর জন সাইমনের নেতৃত্বে; ভারতীয় সদস্য না-থাকায় ব্যাপক বিরোধিতা; 'সাইমন গো ব্যাক' স্লোগান। ● আইন অমান্য আন্দোলন: ১৯৩০; ডান্ডি অভিযান (১২ মার্চ ১৯৩০); লবণ সত্যাগ্রহ; নেতৃত্বে গান্ধী। ● পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা: ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০; লাহোর কংগ্রেস; সভাপতি জওহরলাল নেহরু; এ দিনটি পরে ভারতে 'প্রজাতন্ত্র দিবস' হিসেবে গৃহীত। ● ভারত শাসন আইন ১৯৩৫: প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান; ১৯৩৭-এ প্রাদেশিক নির্বাচন; বাংলায় কৃষক প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের জোট সরকার, মুখ্যমন্ত্রী এ. কে. ফজলুল হক। ● লাহোর প্রস্তাব: ২৩ মার্চ ১৯৪০; লাহোরের মিনার-ই-পাকিস্তান-এর স্থানে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের ২৭তম অধিবেশনে গৃহীত; প্রস্তাবক এ. কে. ফজলুল হক (শের-এ-বাংলা); সভাপতি মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ; ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ধারণা। ● পঞ্চাশের মন্বন্তর: ১৯৪৩; বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দ; ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে আনুমানিক ৩০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। ● প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস: ১৬ আগস্ট ১৯৪৬; কলকাতা; পরিণতিতে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা; অক্টোবর ১৯৪৬-এ নোয়াখালী দাঙ্গা। ● ৩ জুন পরিকল্পনা: ৩ জুন ১৯৪৭; ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ভারত বিভাজন পরিকল্পনা ঘোষণা। ● র্যাডক্লিফ কমিশন: ১৯৪৭; স্যার সিরিল র্যাডক্লিফের নেতৃত্বাধীন সীমানা নির্ধারণ কমিশন; ১৭ আগস্ট ১৯৪৭ র্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড প্রকাশিত। ● ভারত-পাকিস্তান স্বাধীনতা: পাকিস্তান ১৪ আগস্ট ১৯৪৭, ভারত ১৫ আগস্ট ১৯৪৭; পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে 'পূর্ব পাকিস্তান' গঠিত (১৯৫৬ থেকে এ নাম)। |
৩. তুলনামূলক ছক
৩.১ পলাশী বনাম বক্সারের যুদ্ধ
বিষয় | পলাশীর যুদ্ধ (১৭৫৭) | বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪) |
তারিখ | ২৩ জুন ১৭৫৭ | ২২ অক্টোবর ১৭৬৪ |
স্থান | পলাশী, নদীয়া (ভাগীরথী তীর) | বক্সার, বিহার |
ব্রিটিশ সেনাপতি | রবার্ট ক্লাইভ | হেক্টর মুনরো |
বিরোধী পক্ষ | সিরাজউদ্দৌলা (বাংলা) | মীর কাসিম + শুজাউদ্দৌলা (অযোধ্যা) + দ্বিতীয় শাহ আলম |
চরিত্র | কূটচাল ও বিশ্বাসঘাতকতা (মীর জাফর) | সম্মুখ-যুদ্ধ |
পরিণতি | বাংলায় কোম্পানির রাজনৈতিক প্রভাব শুরু | ১৭৬৫-এ দিউয়ানি লাভ; প্রকৃত শাসনের সূচনা |
চুক্তি | — | ১৭৬৫ এলাহাবাদ চুক্তি |
৩.২ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বনাম রায়তওয়ারি বনাম মহলওয়ারি
বিষয় | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত | রায়তওয়ারি | মহলওয়ারি |
সাল ও প্রবর্তক | ১৭৯৩; লর্ড কর্নওয়ালিস | ১৮২০; টমাস মুনরো | ১৮২২; হল্ট ম্যাকেঞ্জি |
এলাকা | বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা | মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সি | উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ, পাঞ্জাব |
কর-প্রদানকারী | জমিদার | রায়ত বা প্রকৃত কৃষক | গ্রাম-সম্প্রদায় (মহল) |
মালিকানা | জমিদার | রায়ত | গ্রাম যৌথ |
রাজস্বের হার | অপরিবর্তনীয় (চিরস্থায়ী) | ৩০ বছরে পুনর্নির্ধারণ | পর্যায়ক্রমে পুনর্নির্ধারণ |
ফলাফল | জমিদারি প্রথার স্থায়িত্ব | কৃষক-শোষণ | গ্রাম-ভিত্তিক রাজস্ব |
৩.৩ ফরায়েজী আন্দোলন বনাম তিতুমীরের আন্দোলন
বিষয় | ফরায়েজী আন্দোলন | তিতুমীরের আন্দোলন |
সূচনাকাল | ১৮১৮ | ১৮২৭ (প্রচার শুরু), ১৮৩১ বাঁশের কেল্লা |
প্রতিষ্ঠাতা | হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১–১৮৪০) | সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর (১৭৮২–১৮৩১) |
জন্মস্থান | শামাইল, শিবচর, মাদারীপুর | চাঁদপুর গ্রাম, ২৪ পরগনা |
কেন্দ্রস্থল | ফরিদপুর, ঢাকা, বাকেরগঞ্জ | নারিকেলবাড়িয়া, বারাসাত-সংলগ্ন |
চরিত্র | প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় সংস্কার, পরে কৃষক প্রতিরোধ | ধর্মীয় সংস্কার ও সশস্ত্র প্রতিরোধ |
উত্তরসূরি | দুদু মিয়া (মুহসিনউদ্দিন আহমদ) | গোলাম মাসুম (নিহত) |
পরিণতি | ১৮৬২-তে দুদু মিয়ার মৃত্যুর পর দুর্বল | ১৯ নভেম্বর ১৮৩১ ব্রিটিশ আক্রমণে কেল্লা ধ্বংস; তিতুমীর শহিদ |
৩.৪ প্রথম বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) বনাম দেশভাগ (১৯৪৭)
বিষয় | প্রথম বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) | দেশভাগ (১৯৪৭) |
ঘোষণাকারী | লর্ড কার্জন (ভাইসরয়) | লর্ড মাউন্টব্যাটেন (ভাইসরয়) |
কার্যকর তারিখ | ১৬ অক্টোবর ১৯০৫ | ১৪–১৫ আগস্ট ১৯৪৭ |
ঘোষিত কারণ | প্রশাসনিক সুবিধা | দ্বিজাতিতত্ত্ব ভিত্তিতে ধর্মীয় বিভাজন |
ভিত্তি | প্রশাসনিক | ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক |
পশ্চিমাংশ | বাংলা (বিহার-উড়িষ্যা সহ), রাজধানী কলকাতা | পশ্চিম বঙ্গ (ভারত) |
পূর্বাংশ | পূর্ববঙ্গ ও আসাম, রাজধানী ঢাকা | পূর্ব বাংলা (পরে পূর্ব পাকিস্তান) |
আয়ুষ্কাল | ৬ বছর (১৯১১-তে রদ) | ২৪ বছর (১৯৭১ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান) |
সীমানা কমিশন | — | র্যাডক্লিফ কমিশন |
৩.৫ ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেলগণ ও তাঁদের কাজ
গভর্নর/গভর্নর জেনারেল | কার্যকাল | প্রধান কাজ |
রবার্ট ক্লাইভ (গভর্নর) | ১৭৫৭–৬০; ১৭৬৫–৬৭ | পলাশী বিজয়, দিউয়ানি লাভ, দ্বৈত শাসন প্রবর্তন |
ওয়ারেন হেস্টিংস | ১৭৭২–৮৫ | ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল; দ্বৈত শাসন বিলোপ; ১৭৮৪-এ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সমর্থন |
লর্ড কর্নওয়ালিস | ১৭৮৬–৯৩; ১৮০৫ | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩); সিভিল সার্ভিস পদ্ধতি |
লর্ড ওয়েলেসলি | ১৭৯৮–১৮০৫ | অধীনস্থ মিত্রতা নীতি; ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮০০) |
লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক | ১৮২৮–৩৫ | সতীদাহ বিলোপ (১৮২৯); ইংরেজি শিক্ষানীতি (১৮৩৫); ১৮৩৩ থেকে 'ভারতের' গভর্নর জেনারেল |
লর্ড ডালহৌসি | ১৮৪৮–৫৬ | রাজ্য-গ্রাস নীতি; প্রথম রেলপথ (১৮৫৩); টেলিগ্রাফ ও ডাকটিকেট |
লর্ড ক্যানিং | ১৮৫৬–৬২ | সিপাহি বিদ্রোহকালীন; বিধবা বিবাহ আইন (১৮৫৬); শেষ গভর্নর জেনারেল ও প্রথম ভাইসরয় |
লর্ড কার্জন | ১৮৯৯–১৯০৫ | প্রথম বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) |
লর্ড হার্ডিঞ্জ | ১৯১০–১৬ | বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯১১); রাজধানী দিল্লিতে স্থানান্তর |
লর্ড মাউন্টব্যাটেন | ১৯৪৭ | ভারতের সর্বশেষ ভাইসরয় ও প্রথম গভর্নর জেনারেল; ৩ জুন পরিকল্পনা; দেশভাগ |
৪. টাইমলাইন: ১৭৫৭ — ১৯৪৭ ঘটনাপ্রবাহ
৪.১ কোম্পানি আমল (১৭৫৭–১৮৫৭)
সময় | ঘটনা | তাৎপর্য |
২৩ জুন ১৭৫৭ | পলাশীর যুদ্ধ; সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়। | বাংলায় কোম্পানির আধিপত্যের সূচনা। |
২২ অক্টোবর ১৭৬৪ | বক্সারের যুদ্ধ; ব্রিটিশ পক্ষের বিজয়। | কোম্পানির প্রকৃত রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠা। |
১২ আগস্ট ১৭৬৫ | এলাহাবাদ চুক্তি; বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার দিউয়ানি। | অর্থনৈতিক ভিত্তি অর্জন। |
১৭৬৫–১৭৭২ | দ্বৈত শাসন (Dual Government)। | প্রবর্তক রবার্ট ক্লাইভ; বিলোপ ওয়ারেন হেস্টিংস। |
১৭৭০ | ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১১৭৬ বঙ্গাব্দ)। | বাংলার এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার মৃত্যু। |
১৭৭৩ | রেগুলেটিং অ্যাক্ট; হেস্টিংস ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল। | প্রশাসনিক কাঠামোর সূচনা। |
১৭৮৪ | পিটের ভারত আইন। | বোর্ড অব কন্ট্রোল গঠন। |
২২ মার্চ ১৭৯৩ | চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত; লর্ড কর্নওয়ালিস। | জমিদারি প্রথার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। |
১৮০০ | ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ; লর্ড ওয়েলেসলি। | আধুনিক বাংলা গদ্যের ভিত্তি। |
১৮১৭ | হিন্দু কলেজ, কলকাতা। | প্রথম আধুনিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান (পরে প্রেসিডেন্সি)। |
১৮১৮ | ফরায়েজী আন্দোলন (হাজী শরীয়তুল্লাহ)। | পূর্ব বাংলায় ইসলামী সংস্কার-প্রতিরোধ। |
২০ আগস্ট ১৮২৮ | ব্রাহ্ম সমাজ (রাজা রামমোহন রায়)। | আধুনিক হিন্দু সংস্কারের সূচনা। |
৪ ডিসেম্বর ১৮২৯ | সতীদাহ বিলোপ (লর্ড বেন্টিঙ্ক)। | প্রথম বড় সামাজিক সংস্কার আইন। |
১৯ নভেম্বর ১৮৩১ | নারিকেলবাড়িয়ার বাঁশের কেল্লা ধ্বংস; তিতুমীর শহিদ। | প্রথম সংগঠিত সশস্ত্র গ্রাম-প্রতিরোধ। |
১৮৩৫ | ম্যাকলের ইংরেজি শিক্ষানীতি। | ভারতে ইংরেজি-মাধ্যম শিক্ষার সূচনা। |
১৮৫৩ | বোম্বে-থানে রেলপথ; কলকাতা-আগ্রা টেলিগ্রাফ। | আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা। |
১৮৫৪ | উড সনদ; বিধবা বিবাহ আইনের প্রস্তুতি। | ভারতে আধুনিক শিক্ষার ম্যাগনা কার্টা। |
১৮৫৬ | হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন (বিদ্যাসাগর)। | নারী-সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। |
১০ মে ১৮৫৭ | সিপাহি বিদ্রোহের সূচনা; মিরাট। | ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রথম বড় চ্যালেঞ্জ। |
১ নভেম্বর ১৮৫৮ | রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র; কোম্পানি শাসনের অবসান। | ব্রিটিশ রাজশাসন প্রতিষ্ঠা। |
৪.২ ব্রিটিশ রাজশাসন (১৮৫৮–১৯৪৭)
সময় | ঘটনা | তাৎপর্য |
১৮৫৯–১৮৬০ | নীল বিদ্রোহ; নদীয়া-যশোর-পাবনা। | কৃষক প্রতিরোধের শক্তি প্রদর্শন। |
১৮৬০ | দীনবন্ধু মিত্রের 'নীল দর্পণ' নাটক প্রকাশ। | ঔপনিবেশিক নিপীড়নের প্রথম সাহিত্যিক প্রতিরোধ। |
২৮ ডিসেম্বর ১৮৮৫ | ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা; বোম্বে। | ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সাংগঠনিক সূচনা। |
১৬ অক্টোবর ১৯০৫ | প্রথম বঙ্গভঙ্গ; লর্ড কার্জন। | পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠন। |
৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ | নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা; শাহবাগ ইশরাত মঞ্জিল, ঢাকা। | মুসলিম রাজনৈতিক চেতনার আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। |
১৯০৯ | মর্লে-মিন্টো সংস্কার। | মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলী। |
১২ ডিসেম্বর ১৯১১ | বঙ্গভঙ্গ রদ; পঞ্চম জর্জের দিল্লি দরবার। | রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা। |
১৩ এপ্রিল ১৯১৯ | জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড; অমৃতসর। | জনরোষের জোয়ার। |
১৯২০–১৯২২ | অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলন। | প্রথম দেশব্যাপী আন্দোলন। |
১ জুলাই ১৯২১ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। | পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষার ভিত্তি। |
১৯২৮ | সাইমন কমিশন; 'সাইমন গো ব্যাক'। | ভারতীয় সদস্য না-থাকায় বয়কট। |
১৯৩০ | ডান্ডি অভিযান; পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা। | আইন অমান্য আন্দোলন। |
১৯৩৫ | ভারত শাসন আইন। | প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন। |
১৯৩৭ | প্রাদেশিক নির্বাচন; বাংলায় ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী। | নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার। |
২৩ মার্চ ১৯৪০ | লাহোর প্রস্তাব; এ. কে. ফজলুল হক। | পাকিস্তান-চিন্তার ভিত্তি। |
১৯৪৩ | পঞ্চাশের মন্বন্তর; ৩০ লক্ষ মৃত্যু। | ব্রিটিশ যুদ্ধকালীন নীতির পরিণতি। |
১৬ আগস্ট ১৯৪৬ | প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস; কলকাতা দাঙ্গা। | সাম্প্রদায়িক বিভাজন তীব্র। |
৩ জুন ১৯৪৭ | মাউন্টব্যাটেনের ভারত বিভাজন পরিকল্পনা। | দেশভাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। |
১৪ আগস্ট ১৯৪৭ | পাকিস্তান স্বাধীনতা; পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ। | ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। |
৫. মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
⚡ স্মৃতিকৌশল ও মনে রাখার সূত্র |
● পলাশী থেকে স্বাধীনতা: ১৯০ বছর — ১৯৪৭ – ১৭৫৭ = ১৯০। ● পলাশীর ত্রিভুজ: 'কালী-জাগ-উমি': ক্লাইভ + জগৎ শেঠ + উমিচাঁদ — ব্রিটিশদের তিন স্তম্ভ। ● বেইমান বুঝতে 'মিরা-রায়-লতিফ': মীর জাফর + রায়দুর্লভ + ইয়ার লতিফ। ● দিউয়ানির তিন প্রদেশ — 'বা-বি-উ': বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা। ● দ্বৈত শাসন সময়: ৭ বছর — ১৭৬৫ থেকে ১৭৭২। ● চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত: '১৭৯৩ — কর্নওয়ালিসের ফাঁদ': সাল ও প্রবর্তক একসাথে মনে রাখা যায়। ● সতীদাহ আইন: 'বেন্টিঙ্কের ১৮২৯': '১৮২৯' = 'বে-ন-টিং-ক' — চার অক্ষর, চার সংখ্যা। ● বঙ্গভঙ্গ-সাল ছন্দ: '০৫-এ ভাঙল, ১১-তে জুড়ল, ২১-এ ভার্সিটি জন্মাল' — ১৯০৫ বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১ রদ, ১৯২১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ● মুসলিম লীগ: ০৬-৩০-০৬ ('শূন্য-ছ', তিনে': ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর; প্রথম দুই অংক ৩০, পরের দুই অংক ০৬। ● লাহোর প্রস্তাব: '২৩ মার্চ ১৯৪০, ফজলুল হক': '৪০-এর তেইশে' — মনে রাখা সহজ; তেইশ মার্চ পরে পাকিস্তান দিবস। ● ফরায়েজী-তিতুমীর জোড়া: 'হাজী-তিতু' উভয় জন্ম ১৭৮২; ফরায়েজী ১৮১৮ (১৮+১৮), তিতুমীরের কেল্লা ১৮৩১। ● সিপাহি বিদ্রোহ: '১৮৫৭, দশই মে': '৫-৭'-এর দশকের সিগনেচার বছর; ৫-এ-৭, সংখ্যাগুলো ক্রমিক। ● নীল বিদ্রোহ: '১৮৫৯-৬০': ব্রিটিশরা গদিতে গেছে ১৮৫৮-তে, পরের বছরই কৃষক বিদ্রোহ। ● ভাইসরয় তিন বড়: 'কা-হা-মাউ': কার্জন (বঙ্গভঙ্গ), হার্ডিঞ্জ (বঙ্গভঙ্গ রদ), মাউন্টব্যাটেন (দেশভাগ)। ● কোম্পানি→রাজশাসন: '৫৮-এ মুক্তি, ছয়-আট': ১৮৫৮ সালে কোম্পানি শাসনের অবসান। |
৬. বিশেষ নোট
📌 কনফিউজিং তথ্যের পরিষ্কার ব্যাখ্যা |
● দিউয়ানি বনাম দ্বৈত শাসন: দিউয়ানি লাভ হয়েছিল ১৭৬৫-তে এলাহাবাদ চুক্তিতে; দ্বৈত শাসন শুরু হয় ১৭৬৫ থেকে এবং চলে ১৭৭২ পর্যন্ত। অর্থাৎ দিউয়ানি লাভের ফলাফল হিসেবেই দ্বৈত শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ● ভারতের গভর্নর জেনারেল বনাম ভাইসরয়: লর্ড ক্যানিং (১৮৫৮ পর্যন্ত) ছিলেন শেষ গভর্নর জেনারেল ও প্রথম ভাইসরয় (১৮৫৮ থেকে); দুটি পদ একই ব্যক্তির হাতে থাকলেও পদের চরিত্র ভিন্ন — গভর্নর জেনারেল ছিলেন কোম্পানির, ভাইসরয় ব্রিটিশ রাজের। ● বেন্টিঙ্কের পদমর্যাদা পরিবর্তন: ১৮২৮-৩৩ পর্যন্ত তিনি ছিলেন 'বাংলার গভর্নর জেনারেল'; ১৮৩৩-এর চার্টার আইনে তিনি হলেন প্রথম 'ভারতের গভর্নর জেনারেল' (১৮৩৩-৩৫)। ● ফরায়েজী আন্দোলনের প্রকৃত জন্মস্থান: হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম শামাইল গ্রামে (বর্তমান শিবচর, মাদারীপুর জেলা); বহু পাঠ্যবইয়ে 'ফরিদপুর' বলা হয়, যা প্রকৃতপক্ষে পুরাতন বৃহত্তর ফরিদপুর বিভাগ — এর মধ্যেই মাদারীপুর জেলা পড়ে। তাঁর নামে ১৯৮৪-তে শরীয়তপুর জেলা গঠিত। ● তিতুমীরের জন্মস্থান বাংলাদেশ নয়: তিতুমীরের জন্ম পশ্চিম বাংলার (বর্তমান ভারত) উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চাঁদপুর গ্রামে; বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলা নয়। ● সর্বপ্রথম রাজধানী বনাম প্রথম ভারতীয় রাজধানী: ১৭৭৩-এ কলকাতা কোম্পানির রাজধানী; ১৮৫৮ থেকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী; ১৯১১-তে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা; নয়াদিল্লি ১৯৩১-এ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। ● দিল্লি দরবার ও পঞ্চম জর্জ: ১২ ডিসেম্বর ১৯১১ দিল্লি দরবারে রাজা পঞ্চম জর্জ একই দিনে দুটি ঘোষণা দেন — (১) বঙ্গভঙ্গ রদ, (২) রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর। ● লাহোর প্রস্তাবের তারিখ: অধিবেশন ২২-২৪ মার্চ ১৯৪০, কিন্তু প্রস্তাবটি গৃহীত হয় ২৩ মার্চ ১৯৪০; এ কারণে কিছু সূত্রে ২২ মার্চ পাওয়া যায়, তবে গৃহীত হওয়ার তারিখ ২৩ মার্চ। ● পাকিস্তান শব্দ লাহোর প্রস্তাবে নেই: 'লাহোর প্রস্তাব' (Lahore Resolution) এ সরাসরি 'পাকিস্তান' শব্দটি ছিল না; ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে 'স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ' গঠনের কথা বলা হয়েছিল। ● দ্বিজাতিতত্ত্বের উৎস: দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণাগত ভিত্তি দিয়েছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৯ শতক); জিন্নাহ ১৯৪০-এ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। |
৭. সতর্কতা
⚠️ জোড়া তথ্য — সাবধানে মুখস্থ করুন |
● মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাস্থান: সঠিক উত্তর — ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত নবাবদের বাগানবাড়ি 'ইশরাত মঞ্জিল' (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন এলাকা)। অনেক বইয়ে 'আহসান মঞ্জিল' বলা হয়েছে — এটি সঠিক নয়। আহসান মঞ্জিল ছিল নবাব সলিমুল্লাহর আবাসিক প্রাসাদ, কিন্তু সম্মেলনটি হয়েছিল শাহবাগে। সূত্র: বাংলাপিডিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ। ● দ্বৈত শাসনের প্রবর্তক বনাম বিলোপকারী: প্রবর্তক রবার্ট ক্লাইভ (১৭৬৫); বিলোপকারী ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২)। দুটো গুলিয়ে ফেলা সাধারণ ভুল। ● প্রথম গভর্নর বনাম প্রথম গভর্নর জেনারেল: বাংলার প্রথম গভর্নর — রবার্ট ক্লাইভ (১৭৫৭); বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল — ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩); ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল — লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (১৮৩৩); ভারতের প্রথম ভাইসরয় — লর্ড ক্যানিং (১৮৫৮)। ● চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রস্তাবক বনাম প্রবর্তক: প্রস্তাবক — জন শোর; প্রবর্তক — লর্ড কর্নওয়ালিস; সাল ১৭৯৩। ● সতীদাহ বিলোপ বনাম বিধবা বিবাহ: সতীদাহ — ১৮২৯, লর্ড বেন্টিঙ্ক; বিধবা বিবাহ — ১৮৫৬, লর্ড ক্যানিং (বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টায়)। দুটি ভিন্ন আইন। ● নীল বিদ্রোহ বনাম নীল দর্পণ: বিদ্রোহ ১৮৫৯-৬০-এ; নাটক ১৮৬০-এ; বিদ্রোহ আগে, নাটক পরে। ● সিপাহি বিদ্রোহের গভর্নর জেনারেল: লর্ড ক্যানিং; অনেকে ভুল করে কার্জন বা ডালহৌসি বলেন। ● লাহোর প্রস্তাবের প্রস্তাবক বনাম সমর্থক: প্রস্তাবক — এ. কে. ফজলুল হক; সমর্থক — চৌধুরী খালেকুজ্জামান, জাফর আলী খান। সভাপতিত্ব — মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। প্রায়শই প্রস্তাবক জিন্নাহ বলে বিভ্রান্ত হয়। ● পাকিস্তান দিবস বনাম প্রজাতন্ত্র দিবস: ২৩ মার্চ পাকিস্তানে 'পাকিস্তান দিবস' (লাহোর প্রস্তাব দিবস); ২৬ জানুয়ারি ভারতে 'প্রজাতন্ত্র দিবস' (১৯৩০-এ পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণা)। ● দিল্লি স্থানান্তর — ঘোষণা বনাম বাস্তবায়ন: ঘোষণা ১৯১১ (পঞ্চম জর্জের দিল্লি দরবার); নতুন দিল্লির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ১৯৩১। ● ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বনাম পঞ্চাশের মন্বন্তর: ছিয়াত্তর — ১১৭৬ বঙ্গাব্দ = ১৭৭০ খ্রি.; পঞ্চাশ — ১৩৫০ বঙ্গাব্দ = ১৯৪৩ খ্রি.। দুটোই বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, কিন্তু আলাদা। |
৮. কি-ওয়ার্ড ও টার্মিনোলজি
🌐 Keywords | |||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|
৯. প্রশ্ন (Q&A)
📚 প্রশ্ন |
প্রশ্ন: পলাশীর যুদ্ধ কত সালে সংঘটিত হয়? উত্তর: ১৭৫৭ সালে; ২৩ জুন। প্রশ্ন: পলাশীর যুদ্ধে কে পরাজিত হন? উত্তর: নওয়াব সিরাজউদ্দৌলা; ব্রিটিশ পক্ষে নেতৃত্ব দেন রবার্ট ক্লাইভ। প্রশ্ন: কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দিউয়ানি লাভ করে কত সালে? উত্তর: ১৭৬৫ সালে; এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে দ্বিতীয় শাহ আলম থেকে। প্রশ্ন: 'দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা'র প্রবর্তক কে? উত্তর: রবার্ট ক্লাইভ (১৭৬৫); বিলোপ করেন ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২)। প্রশ্ন: ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন? উত্তর: ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩-৮৫)। প্রশ্ন: ছিয়াত্তরের মন্বন্তর কত খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত হয়? উত্তর: ১৭৭০ খ্রি.; বঙ্গাব্দ ১১৭৬। প্রশ্ন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কে প্রবর্তন করেন? উত্তর: লর্ড কর্নওয়ালিস (১৭৯৩)। প্রশ্ন: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কত সালে প্রবর্তিত হয়? উত্তর: ১৭৯৩ সালে; ২২ মার্চ গৃহীত। প্রশ্ন: সতীদাহ প্রথা কে বিলুপ্ত করেন? উত্তর: লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক (৪ ডিসেম্বর ১৮২৯, রেগুলেশন XVII)। প্রশ্ন: সতীদাহ প্রথা কত সালে বিলুপ্ত হয়? উত্তর: ১৮২৯ সালে। প্রশ্ন: ফরায়েজী আন্দোলনের উদ্যোক্তা কে? উত্তর: হাজী শরীয়তুল্লাহ; ১৮১৮ সালে। প্রশ্ন: হাজী শরীয়তুল্লাহ কোন জেলার অধিবাসী ছিলেন? উত্তর: বৃহত্তর ফরিদপুর (বর্তমান মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার শামাইল গ্রামে জন্ম)। প্রশ্ন: তিতুমীরের প্রকৃত নাম কী? উত্তর: সৈয়দ মীর নিসার আলী। প্রশ্ন: তিতুমীরের 'বাঁশের কেল্লা' কোথায় ছিল? উত্তর: নারিকেলবাড়িয়া (বারাসাত-সংলগ্ন, উত্তর ২৪ পরগনা)। প্রশ্ন: সিপাহি বিদ্রোহ কত সালে সংঘটিত হয়? উত্তর: ১৮৫৭ সালে; ১০ মে মিরাটে সূচনা। প্রশ্ন: সিপাহি বিদ্রোহকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন? উত্তর: লর্ড ক্যানিং। প্রশ্ন: ঢাকায় সিপাহি বিদ্রোহের স্মৃতিজড়িত স্থান কোনটি? উত্তর: বাহাদুরশাহ পার্ক (পুরাতন বিক্টোরিয়া পার্ক)। প্রশ্ন: নীল বিদ্রোহ কখন সংঘটিত হয়? উত্তর: ১৮৫৯-৬২ সালে; সূচনা চৌগাছা গ্রামে (নদীয়া)। প্রশ্ন: 'নীল দর্পণ' কে রচনা করেন? উত্তর: দীনবন্ধু মিত্র (১৮৬০)। প্রশ্ন: 'নীল দর্পণ' নাটকের ইংরেজি অনুবাদক কে? উত্তর: মাইকেল মধুসূদন দত্ত। প্রশ্ন: কত সালে বঙ্গভঙ্গ হয়? উত্তর: ১৯০৫ সালে; ১৬ অক্টোবর কার্যকর। প্রশ্ন: ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের সময় ভারতের ভাইসরয় কে ছিলেন? উত্তর: লর্ড কার্জন। প্রশ্ন: ১৯০৫ সালে নবগঠিত প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর কে ছিলেন? উত্তর: ব্যামফিল্ড ফুলার। প্রশ্ন: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়? উত্তর: ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর; ঢাকার শাহবাগে। প্রশ্ন: মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তা কে ছিলেন? উত্তর: নবাব সলিমুল্লাহ; প্রস্তাবক ও মূল আয়োজক। প্রশ্ন: নিখিল ভারত মুসলিম লীগ কোন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়? উত্তর: ঢাকায়। প্রশ্ন: বঙ্গভঙ্গ রদ হয় কত সালে? উত্তর: ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর; দিল্লির রাজকীয় দরবারে পঞ্চম জর্জের ঘোষণায়। প্রশ্ন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়? উত্তর: ১৯২১ সালের ১ জুলাই; প্রথম উপাচার্য পি. জে. হার্টগ। প্রশ্ন: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব কে উত্থাপন করেন? উত্তর: এ. কে. ফজলুল হক; ২৩ মার্চ ১৯৪০। প্রশ্ন: লাহোর প্রস্তাব কোন সালে গৃহীত হয়? উত্তর: ১৯৪০ সালে। প্রশ্ন: লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০-এর মূল বিষয় ছিল কী? উত্তর: ভারতের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব। প্রশ্ন: এ. কে. ফজলুল হক কোন উপাধিতে পরিচিত? উত্তর: শের-এ-বাংলা। প্রশ্ন: ১৯৪৭ সালে ভারত-বাংলাদেশ সীমা নির্ধারণের মূল ভিত্তি কী ছিল? উত্তর: র্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড (Cyril Radcliffe Commission)। প্রশ্ন: উপমহাদেশের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল কে ছিলেন? উত্তর: লর্ড মাউন্টব্যাটেন। প্রশ্ন: কলকাতা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা কে? উত্তর: জব চার্নক (১৬৯০)। প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগ খোলা হয় কোন সালে? উত্তর: ১৮০১ খ্রি.; প্রধান উইলিয়াম কেরী। প্রশ্ন: বাংলা গদ্যের জনক কে? উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। প্রশ্ন: সিপাহি বিদ্রোহের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি কে ছিলেন (ব্যারাকপুরে)? উত্তর: মঙ্গল পান্ডে (২৯ মার্চ ১৮৫৭)। |
১০. লিখিত পরীক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি (Critical View)
✍️ লিখিত পরীক্ষার জন্য |
পলাশীর যুদ্ধ কেবল একটি সামরিক পরাজয় নয় — এটি বাংলার অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পরিসমাপ্তি ও দীর্ঘস্থায়ী ঔপনিবেশিক শোষণের সূচনা। কেমব্রিজ ঐতিহাসিক স্যার পার্সিভাল স্পিয়ারের মতে, পলাশী 'a transaction, not a battle' — একটি ষড়যন্ত্র, যেখানে কামানের চেয়ে কূটচাল অধিক কার্যকর ছিল। বাংলার বুনন-শিল্প, জাহাজনির্মাণ ও কৃষিকে কোম্পানি যুক্তরাজ্যের কাঁচামাল-সরবরাহকারী ও পণ্যের বাজারে রূপান্তরিত করে; বাংলার সমৃদ্ধি দ্রুতই দারিদ্র্যে পরিণত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) প্রকৃতপক্ষে বাংলার ভূমি-ব্যবস্থায় একটি কৃত্রিম জমিদার শ্রেণি সৃষ্টি করে যাদের স্বার্থ ব্রিটিশ শাসনের অনুগত ছিল। কোম্পানির পক্ষে এটি একটি স্থিতিশীল রাজস্ব-উৎস হলেও কৃষকদের জন্য তা ছিল সূর্যাস্ত-পূর্ব আতঙ্ক ও 'অনুপস্থিত জমিদারি'র (absentee landlordism) যন্ত্রণার সূচনা। ১৯৫০-এর জমিদারি বিলোপ পর্যন্ত বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতি এ ব্যবস্থার ভারে আক্রান্ত ছিল। ১৯০৫-এর প্রথম বঙ্গভঙ্গ ব্রিটিশ 'বিভেদ ও শাসন' নীতির একটি ক্লাসিক প্রকাশ। ব্রিটিশ লেখক হার্বার্ট রিজলির কুখ্যাত মন্তব্য — 'Bengal united is a power; Bengal divided will pull in different ways' — থেকেই এ নীতির অভিপ্রায় স্পষ্ট। কিন্তু পরিহাসজনকভাবে এই বিভাজনই বাঙালি জাতীয়তাবোধ ও স্বদেশী চেতনাকে উদ্দীপিত করে; বঙ্গভঙ্গ রদের পরও সে চেতনা ক্ষীণ না হয়ে বরং ১৯২১-এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯৪০-এ লাহোর প্রস্তাবে রূপান্তরিত হয়। এ অর্থে বঙ্গভঙ্গের ছায়া ১৯৪৭-এর দেশভাগ এবং ১৯৭১-এর স্বাধীনতা — দুইদিকেই বিস্তৃত। |
১১. চটজলদি রিভিশন
⚡ এক নজরে সম্পূর্ণ চ্যাপ্টার | ||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||
|