বাংলা ব্যাকরণ বাংলা ভাষার রীতি সাধু ও চলিত রীতি — সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, পার্থক্য, রূপান্তর ও পরীক্ষার প্রস্তুতি |
বাংলা ভাষার রীতি কী? |
সংজ্ঞা: ভাষার রীতি ভাষার রীতি বলতে বোঝায় ভাষা ব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা ধরন। একই ভাষায় কথা বলা ও লেখার সময় শব্দচয়ন, ক্রিয়াপদের রূপ, সর্বনামের রূপ এবং বাক্যগঠনের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এই ভিন্নতাই ভাষার রীতি তৈরি করে। বাংলা ভাষায় প্রধানত দুটি লিখিত রীতি প্রচলিত — সাধু রীতি ও চলিত রীতি। মৌখিক ভাষায় এ ছাড়া আঞ্চলিক রীতিও আছে, তবে লিখিত ভাষায় সাধু ও চলিত এই দুটিই মান্য। |
একটি সহজ উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। 'আমি বাড়ি যাচ্ছি' — এটি চলিত রীতি। একই কথা সাধু রীতিতে হবে 'আমি বাটিকায় যাইতেছি' বা 'আমি গৃহে যাইতেছি'। দুটো বাক্যের অর্থ একই, কিন্তু ক্রিয়াপদ ও শব্দের রূপ ভিন্ন। এই ভিন্নতাই ভাষার রীতিগত পার্থক্য।
বাংলা ভাষার রীতি সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে — সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য মূলত তিনটি জায়গায়: (১) ক্রিয়াপদের রূপ, (২) সর্বনামের রূপ, এবং (৩) অনুসর্গ ও কিছু বিশেষ শব্দের রূপ। বিশেষ্য, বিশেষণ, অব্যয় ইত্যাদি শব্দ সাধারণত উভয় রীতিতে একই থাকে।
★ পরীক্ষায় আসে বাংলা ভাষার রীতি থেকে BCS প্রিলিমিনারি ও লিখিত উভয় পরীক্ষায় প্রশ্ন আসে। প্রিলিতে সাধু→চলিত বা চলিত→সাধু রূপান্তর, রীতি চিহ্নিতকরণ, গুরুচণ্ডালী দোষ — এগুলো কমন প্রশ্ন। লিখিত পরীক্ষায় ভাষারীতি মিশ্রণ করলে নম্বর কাটা যায়। |
সাধু রীতি |
সংজ্ঞা: সাধু রীতি বাংলা লিখিত ভাষার যে রূপটি তৎসম (সংস্কৃত) শব্দবহুল, ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ রূপে ব্যবহৃত হয় এবং যার গঠন গুরুগম্ভীর ও আভিজাত্যপূর্ণ, তাকে সাধু রীতি বা সাধু ভাষা বলে। এটি বাংলা গদ্যের প্রাচীনতর রূপ। উনিশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকেন্দ্রিক পণ্ডিতদের হাতে এই রীতি পূর্ণতা পায় এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত এটিই ছিল লিখিত বাংলার প্রধান মাধ্যম। |
◆ সাধু রীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ |
সাধু রীতির কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে যা একে চলিত রীতি থেকে আলাদা করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভালোভাবে বুঝলে যেকোনো বাক্য দেখেই বলা যাবে সেটি কোন রীতিতে লেখা:
বৈশিষ্ট্য | বিবরণ ও উদাহরণ |
ক্রিয়াপদ দীর্ঘ | সাধু রীতিতে ক্রিয়াপদ পূর্ণ ও দীর্ঘ রূপে থাকে: করিয়াছিলেন, যাইতেছে, বলিয়াছিল, খাইতেছি, দেখিয়াছিলাম, পড়িতেছিলেন |
সর্বনাম দীর্ঘ | তাহার, তাহাকে, তাহাদের, ইহা, ইহার, উহা, উহাকে, যাহা, যাহার, কাহাকে |
অনুসর্গ পূর্ণরূপ | হইতে, দিয়া, হইয়া, থাকিয়া, করিয়া, বলিয়া, চলিয়া |
তৎসম শব্দবহুল | সংস্কৃত শব্দের প্রাধান্য: গৃহ (বাড়ি), জল (পানি), চক্ষু (চোখ), হস্ত (হাত), মস্তক (মাথা), অট্টালিকা (দালান) |
গুরুগম্ভীর ভাব | বাক্যের গঠন দীর্ঘ, জটিল ও আনুষ্ঠানিক। সভা-সমিতি, আইনি দলিল, ধর্মগ্রন্থের ভাষায় উপযুক্ত |
সুনির্ধারিত ব্যাকরণ | সাধু রীতির ব্যাকরণ কঠোরভাবে সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসরণ করে, তাই এতে নমনীয়তা কম |
পরিবর্তনশীল নয় | সাধু রীতি একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো মেনে চলে এবং কালের সাথে তেমন পরিবর্তিত হয় না |
প্রচলন | বর্তমানে প্রায় অপ্রচলিত। বাংলাদেশের সংবিধান ও কিছু সরকারি দলিলে এখনো ব্যবহৃত হয় |
প্রধান সাধু রীতির লেখকবৃন্দ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বাংলা গদ্যের জনক। 'বেতাল পঞ্চবিংশতি', 'শকুন্তলা' — সাধু গদ্যের আদর্শ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: 'দুর্গেশনন্দিনী', 'কপালকুণ্ডলা', 'বিষবৃক্ষ' — সাধু গদ্যে উপন্যাস মীর মশাররফ হোসেন: 'বিষাদ সিন্ধু' — মুসলমান লেখকদের মধ্যে সাধু গদ্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: প্রথম দিকে সাধু গদ্যে লিখলেও পরে চলিত রীতিতে সরে আসেন |
চলিত রীতি |
সংজ্ঞা: চলিত রীতি বাংলা লিখিত ভাষার যে রূপটি মুখের কথ্যভাষার কাছাকাছি, ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম সংক্ষিপ্ত রূপে ব্যবহৃত হয় এবং যার গঠন স্বাভাবিক, সহজবোধ্য ও প্রাঞ্জল, তাকে চলিত রীতি বা চলিত ভাষা বলে। এটি বর্তমানে বাংলা লিখিত ভাষার প্রমিত ও সর্বজনস্বীকৃত রূপ। প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'সবুজপত্র' পত্রিকার (১৯১৪) মাধ্যমে চলিত গদ্যরীতি প্রতিষ্ঠা করেন বলে তাঁকে চলিত রীতির প্রবর্তক বলা হয়। |
◆ চলিত রীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ |
বৈশিষ্ট্য | বিবরণ ও উদাহরণ |
ক্রিয়াপদ সংক্ষিপ্ত | চলিত রীতিতে ক্রিয়াপদ সংক্ষিপ্ত ও সহজ: করেছিলেন, যাচ্ছে, বলেছিল, খাচ্ছি, দেখেছিলাম, পড়ছিলেন |
সর্বনাম সংক্ষিপ্ত | তার, তাকে, তাদের, এটা, এর, ওটা, ওকে, যা, যার, কাকে |
অনুসর্গ সংক্ষিপ্ত | থেকে, দিয়ে, হয়ে, রেখে, করে, বলে, চলে |
তদ্ভব শব্দবহুল | কথ্য ভাষার কাছাকাছি শব্দ: বাড়ি, পানি, চোখ, হাত, মাথা, দালান |
স্বাভাবিক ও প্রাঞ্জল | বাক্যের গঠন সহজ, স্বাভাবিক এবং কথ্যভাষার মতো প্রবাহমান |
পরিবর্তনশীল | চলিত রীতি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। নতুন শব্দ ও প্রয়োগ যুক্ত হতে পারে |
সর্বত্র প্রচলিত | বর্তমানে সকল পত্রিকা, সাহিত্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মিডিয়া চলিত রীতি ব্যবহার করে |
চলিত রীতি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস চলিত রীতি একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক আছে: ১. প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮৫৮): 'আলালের ঘরের দুলাল' উপন্যাসে প্রথম কথ্যভাষার কাছাকাছি গদ্য ব্যবহার করেন ২. প্রমথ চৌধুরী (১৯১৪): 'সবুজপত্র' পত্রিকায় চলিত গদ্যকে সাহিত্যের ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁকে চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক বলা হয় ৩. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: 'সবুজপত্র'-এর সমর্থনে চলিত রীতিতে লেখা শুরু করেন এবং এর জনপ্রিয়তা ব্যাপক করেন ৪. বিশ শতকের মধ্যভাগ: ধীরে ধীরে পাঠ্যপুস্তক, পত্রিকা ও সরকারি কাজে চলিত রীতি প্রাধান্য পায় |
সাধু ও চলিত রীতির তুলনামূলক পার্থক্য |
সাধু ও চলিত রীতির মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য নিচের বিশদ তুলনা দেখুন। এই পার্থক্যগুলো পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি আসে:
বিষয় | সাধু রীতি | চলিত রীতি |
ক্রিয়াপদ | পূর্ণ ও দীর্ঘ: করিয়াছিলেন, যাইতেছে | সংক্ষিপ্ত: করেছিলেন, যাচ্ছে |
সর্বনাম | তাহার, ইহা, উহা, যাহা, কাহার | তার, এটা, ওটা, যা, কার |
অনুসর্গ | হইতে, দিয়া, হইয়া, করিয়া | থেকে, দিয়ে, হয়ে, করে |
শব্দভাণ্ডার | তৎসম (সংস্কৃত) শব্দ বেশি | তদ্ভব ও কথ্য শব্দ বেশি |
বাক্যের ধরন | দীর্ঘ, জটিল, গুরুগম্ভীর | সংক্ষিপ্ত, সরল, প্রাঞ্জল |
ব্যবহার ক্ষেত্র | সংবিধান, পুরনো সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ | আধুনিক সাহিত্য, পত্রিকা, শিক্ষা, মিডিয়া |
প্রবর্তক | বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র (পরিমার্জন) | প্রমথ চৌধুরী (সবুজপত্র, ১৯১৪) |
পরিবর্তনশীলতা | পরিবর্তনশীল নয়, স্থির | কালের সাথে পরিবর্তনশীল |
আঞ্চলিক ভেদ | সর্বত্র অভিন্ন, আঞ্চলিক রূপ নেই | আঞ্চলিক রূপভেদ থাকতে পারে |
বর্তমান অবস্থা | প্রায় অপ্রচলিত | সর্বজনীন ও প্রমিত |
ক্রিয়াপদের সাধু → চলিত রূপান্তর |
মূল নীতি সাধু রীতির ক্রিয়াপদ থেকে চলিত রীতির ক্রিয়াপদ পাওয়ার মূল কৌশল হলো — সাধু রূপের মধ্যে থাকা 'ই' ধ্বনি (ি-কার) বা '-ইয়া' অংশটি সংক্ষিপ্ত করে 'এ' (ে-কার) বা '-ে' করা এবং দীর্ঘ রূপকে ছোট করা। তবে কিছু ক্রিয়াপদে রূপটি একটু ভিন্ন হয়, তাই নিচের টেবিলটি ভালোভাবে আয়ত্ত করুন। |
ক্র. | সাধু রূপ | চলিত রূপ | কাল / বিবরণ |
১ | করিতেছি | করছি | বর্তমান অসমাপ্ত |
২ | করিতেছে | করছে | বর্তমান অসমাপ্ত (৩য় পুরুষ) |
৩ | করিতেছিলাম | করছিলাম | অতীত অসমাপ্ত |
৪ | করিয়াছি | করেছি | বর্তমান সমাপ্ত (পুরাঘটিত) |
৫ | করিয়াছিলাম | করেছিলাম | অতীত পুরাঘটিত |
৬ | করিব | করব | ভবিষ্যৎ |
৭ | করিলাম | করলাম | সাধারণ অতীত |
৮ | করিলে | করলে | সাধারণ অতীত (তুমি) |
৯ | করিও | কোরো / করো | অনুজ্ঞা |
১০ | যাইতেছি | যাচ্ছি | বর্তমান অসমাপ্ত |
১১ | যাইয়াছি | গেছি | বর্তমান পুরাঘটিত |
১২ | যাইতেছিল | যাচ্ছিল | অতীত অসমাপ্ত |
১৩ | দেখিয়াছিলেন | দেখেছিলেন | অতীত পুরাঘটিত (আপনি) |
১৪ | বলিয়াছিল | বলেছিল | অতীত পুরাঘটিত (সে) |
১৫ | খাইতেছে | খাচ্ছে | বর্তমান অসমাপ্ত |
১৬ | খাইয়াছি | খেয়েছি | বর্তমান পুরাঘটিত |
১৭ | পড়িতেছিলাম | পড়ছিলাম | অতীত অসমাপ্ত |
১৮ | শুনিয়াছিলেন | শুনেছিলেন | অতীত পুরাঘটিত |
১৯ | লিখিতেছে | লিখছে | বর্তমান অসমাপ্ত |
২০ | হইয়াছে | হয়েছে | বর্তমান পুরাঘটিত |
২১ | চলিয়া গিয়াছে | চলে গেছে | যৌগিক ক্রিয়া |
২২ | ধরিয়া রাখিয়াছে | ধরে রেখেছে | যৌগিক ক্রিয়া |
২৩ | বসিয়া আছে | বসে আছে | যৌগিক ক্রিয়া |
২৪ | করিয়া দিয়াছে | করে দিয়েছে | যৌগিক ক্রিয়া |
সর্বনাম ও অনুসর্গের রূপান্তর |
◆ সর্বনামের সাধু → চলিত রূপ |
সাধু রূপ | চলিত রূপ | সর্বনামের ধরন |
তাহার / তাঁহার | তার / তাঁর | ব্যক্তিবাচক (সম্বন্ধ) |
তাহারা / তাঁহারা | তারা / তাঁরা | ব্যক্তিবাচক (বহুবচন) |
তাহাকে / তাঁহাকে | তাকে / তাঁকে | ব্যক্তিবাচক (কর্ম) |
তাহাদের / তাঁহাদের | তাদের / তাঁদের | ব্যক্তিবাচক (সম্বন্ধ, বহু) |
ইহা | এটা / এ | নির্দেশক |
ইহার | এর / এটার | নির্দেশক (সম্বন্ধ) |
ইহাতে | এতে / এটাতে | নির্দেশক (অধিকরণ) |
উহা | ওটা / ও | নির্দেশক (দূরবর্তী) |
উহার | ওর / ওটার | নির্দেশক (সম্বন্ধ) |
যাহা | যা | সম্বন্ধবাচক |
যাহার | যার | সম্বন্ধবাচক (সম্বন্ধ) |
যাহারা | যারা | সম্বন্ধবাচক (বহুবচন) |
কাহার | কার | প্রশ্নবাচক (সম্বন্ধ) |
কাহাকে | কাকে | প্রশ্নবাচক (কর্ম) |
কাহারা | কারা | প্রশ্নবাচক (বহুবচন) |
সকলে | সবাই | নির্দেশক (বহুবচন) |
কিছু | কিছু | অনির্দিষ্ট (অপরিবর্তিত) |
◆ অনুসর্গ ও বিশেষ শব্দের রূপান্তর |
সাধু রূপ | চলিত রূপ | শব্দের ধরন |
হইতে | থেকে / হতে | অনুসর্গ |
দিয়া | দিয়ে | অনুসর্গ |
হইয়া | হয়ে | অনুসর্গ |
করিয়া | করে | অনুসর্গ |
বলিয়া | বলে | অনুসর্গ |
লইয়া | নিয়ে | অনুসর্গ |
চাহিয়া | চেয়ে | অনুসর্গ |
রাখিয়া | রেখে | অনুসর্গ |
ফেলিয়া | ফেলে | অনুসর্গ |
সহিত | সাথে / সঙ্গে | অনুসর্গ |
নিকটে | কাছে | অনুসর্গ |
মধ্যে | ভেতরে | অনুসর্গ |
পক্ষে | পক্ষে | অপরিবর্তিত |
গুরুচণ্ডালী দোষ — রীতির সংমিশ্রণ |
সংজ্ঞা: গুরুচণ্ডালী দোষ একই বাক্যে বা অনুচ্ছেদে সাধু রীতি ও চলিত রীতি মিশিয়ে ব্যবহার করলে যে ভাষাগত ত্রুটি সৃষ্টি হয়, তাকে গুরুচণ্ডালী দোষ বলে। এই নামটি এসেছে 'গুরু' (শ্রেষ্ঠ) ও 'চণ্ডাল' (নীচ) — দুটি বিপরীত শ্রেণির অনুচিত মিশ্রণ থেকে। এটি বাংলা গদ্য লেখার একটি মারাত্মক দোষ এবং পরীক্ষায় এটি সম্পর্কে প্রায়ই প্রশ্ন আসে। |
গুরুচণ্ডালী দোষ মূলত ক্রিয়াপদ ও সর্বনামে ঘটে। কারণ বিশেষ্য ও বিশেষণ উভয় রীতিতে প্রায় একই। তাই একই বাক্যে যদি একটি ক্রিয়াপদ সাধু রীতিতে এবং আরেকটি চলিত রীতিতে থাকে, তাহলে গুরুচণ্ডালী দোষ হয়।
◆ গুরুচণ্ডালী দোষের উদাহরণ ও সংশোধন |
✗ দোষযুক্ত বাক্য (মিশ্র রীতি) | ✔ শুদ্ধ বাক্য |
আমি যাইতেছি কিন্তু সে আসছে না। | আমি যাচ্ছি কিন্তু সে আসছে না। (চলিত) |
তাহার বাড়ি অনেক দূরে, কিন্তু সে যায়। | তার বাড়ি অনেক দূরে, কিন্তু সে যায়। (চলিত) |
সে বলিয়াছিল যে সে আসবে। | সে বলেছিল যে সে আসবে। (চলিত) |
ছেলেটি পড়ছে কিন্তু কিছুই বুঝিতে পারিতেছে না। | ছেলেটি পড়ছে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। (চলিত) |
আমি তাহাকে বলেছি কাজটা করতে। | আমি তাকে বলেছি কাজটা করতে। (চলিত) |
ইহা করিলে ভালো হবে। | এটা করলে ভালো হবে। (চলিত) |
তিনি আসিয়াছেন এবং বসে আছেন। | তিনি এসেছেন এবং বসে আছেন। (চলিত) |
⚠ মনে রাখুন গুরুচণ্ডালী দোষ এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো — পুরো রচনায় একটি মাত্র রীতি অনুসরণ করা। বর্তমান প্রমিত বাংলায় চলিত রীতিই গ্রহণযোগ্য। BCS লিখিত পরীক্ষায় সাধু-চলিত মিশ্রণ করলে নম্বর কাটা যায়। উদ্ধৃতিতে ভিন্ন রীতি থাকলে সমস্যা নেই, তবে নিজের লেখায় একই রীতি বজায় রাখতে হবে। |
সাধু → চলিত বাক্য রূপান্তর (অনুশীলন) |
নিচে কিছু পূর্ণাঙ্গ বাক্যের সাধু থেকে চলিত রূপান্তর দেওয়া হলো। এই ধরনের রূপান্তর প্রশ্ন BCS লিখিত পরীক্ষায় আসে:
সাধু রীতি | চলিত রীতি |
আমি তাহাকে বলিয়াছিলাম যে এই কাজ করিতে হইবে। | আমি তাকে বলেছিলাম যে এই কাজ করতে হবে। |
তাহারা যখন আসিল তখন আমরা খাইতেছিলাম। | তারা যখন এলো তখন আমরা খাচ্ছিলাম। |
বালকটি বিদ্যালয়ে যাইবে এবং পড়াশুনা করিবে। | ছেলেটি স্কুলে যাবে এবং পড়াশোনা করবে। |
ইহা আমার পক্ষে করা সম্ভব হইবে না। | এটা আমার পক্ষে করা সম্ভব হবে না। |
তাহার কথা শুনিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছিলাম। | তার কথা শুনে আমি অবাক হয়েছিলাম। |
যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। | যা হওয়ার তাই হয়েছে। |
তিনি গৃহ হইতে বাহির হইয়া বাজারে গিয়াছিলেন। | তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে গিয়েছিলেন। |
কাহারও কিছু বলিবার ছিল না। | কারো কিছু বলার ছিল না। |
সে যদি আসিত তাহা হইলে ভালো হইত। | সে যদি আসতো তাহলে ভালো হতো। |
উহা লইয়া তাহারা ঝগড়া করিতেছিল। | ওটা নিয়ে তারা ঝগড়া করছিল। |
বৃষ্টি থামিলে আমরা বাহির হইব। | বৃষ্টি থামলে আমরা বের হব। |
তোমাকে এই কাজ করিতে হইবে, নতুবা শাস্তি পাইবে। | তোমাকে এই কাজ করতে হবে, নইলে শাস্তি পাবে। |
আঞ্চলিক রীতি |
সংজ্ঞা: আঞ্চলিক রীতি সাধু ও চলিত রীতি ছাড়াও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ভিন্ন ভিন্ন কথ্যভাষা প্রচলিত, তাকে আঞ্চলিক রীতি বা উপভাষা বলে। আঞ্চলিক রীতি মূলত মৌখিক ভাষায় ব্যবহৃত হয়, লিখিত ভাষায় এটি মান্য নয়। তবে সাহিত্যে চরিত্রের সংলাপে আঞ্চলিক রীতি ব্যবহৃত হতে পারে। |
অঞ্চল | আঞ্চলিক রূপ | চলিত রূপ | বৈশিষ্ট্য |
সিলেট | আমি খাইতাছি | আমি খাচ্ছি | '-তাছ' প্রত্যয় |
চট্টগ্রাম | তুঁই কোয়ানে যাওর? | তুই কোথায় যাচ্ছিস? | ভিন্ন সর্বনাম ও ক্রিয়া |
রংপুর/রাজশাহী | মুই যাইতাছি | আমি যাচ্ছি | 'মুই' সর্বনাম |
বরিশাল | আমি হেডায় যামু | আমি সেখানে যাব | 'হেডায়' = সেখানে |
নোয়াখালী | হামি যাইয়ুম | আমি যাব | 'হামি' সর্বনাম |
ময়মনসিংহ | আমি যাইতাছি | আমি যাচ্ছি | সিলেটের কাছাকাছি |
★ পরীক্ষায় আসে পরীক্ষায় মূলত সাধু ও চলিত রীতি নিয়ে প্রশ্ন আসে। তবে 'আঞ্চলিক রীতি কোনটি?', 'আঞ্চলিক রীতি মান্য ভাষা কি না?' — এই ধরনের প্রশ্নও আসতে পারে। উত্তর: আঞ্চলিক রীতি মান্য লিখিত ভাষা নয়। |
সারসংক্ষেপ — এক নজরে |
বিষয় | মূল তথ্য |
সাধু রীতি | দীর্ঘ ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম, তৎসম শব্দবহুল, গুরুগম্ভীর, অপরিবর্তনশীল |
চলিত রীতি | সংক্ষিপ্ত ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম, তদ্ভব শব্দবহুল, প্রাঞ্জল, পরিবর্তনশীল |
চলিত রীতির প্রবর্তক | প্রমথ চৌধুরী (সবুজপত্র পত্রিকা, ১৯১৪) |
গুরুচণ্ডালী দোষ | একই রচনায় সাধু ও চলিত রীতির মিশ্রণ |
পার্থক্যের ক্ষেত্র | মূলত ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গে; বিশেষ্য-বিশেষণ সাধারণত অভিন্ন |
আঞ্চলিক রীতি | মৌখিক ভাষায় ব্যবহৃত, লিখিত মান্যভাষায় গ্রহণযোগ্য নয় |
বাংলাদেশের সংবিধান | সাধু রীতিতে লিখিত (ব্যতিক্রমী প্রয়োগ) |
প্রশ্ন ও অনুশীলনী |
1. চলিত রীতির প্রবর্তক কে?
ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
খ) ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
গ) প্রমথ চৌধুরী
ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
✔ উত্তর: গ) প্রমথ চৌধুরী
ব্যাখ্যা: প্রমথ চৌধুরী 'সবুজপত্র' পত্রিকার (১৯১৪) মাধ্যমে চলিত গদ্যরীতি প্রতিষ্ঠা করেন।
2. 'করিয়াছিলেন'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) করেছিলেন
খ) করেছেন
গ) করছিলেন
ঘ) করছেন
✔ উত্তর: ক) করেছিলেন
ব্যাখ্যা: 'করিয়াছিলেন' সাধু অতীত পুরাঘটিত → চলিতে 'করেছিলেন'।
3. 'তাহার'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) তাহা
খ) তারা
গ) তার
ঘ) তাদের
✔ উত্তর: গ) তার
ব্যাখ্যা: সাধু 'তাহার' → চলিত 'তার'।
4. গুরুচণ্ডালী দোষ কী?
ক) ব্যাকরণগত ভুল
খ) বানান ভুল
গ) সাধু-চলিত মিশ্রণ
ঘ) অর্থহীন বাক্য
✔ উত্তর: গ) সাধু-চলিত মিশ্রণ
ব্যাখ্যা: একই রচনায় সাধু ও চলিত রীতি মেশানোকে গুরুচণ্ডালী দোষ বলে।
5. 'হইতে'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) হতে
খ) থেকে
গ) হয়ে
ঘ) হয়ে থেকে
✔ উত্তর: খ) থেকে
ব্যাখ্যা: সাধু অনুসর্গ 'হইতে' → চলিতে 'থেকে' (বা 'হতে')।
6. কোনটি সাধু রীতির বৈশিষ্ট্য?
ক) সংক্ষিপ্ত ক্রিয়াপদ
খ) পরিবর্তনশীল
গ) তৎসম শব্দবহুল
ঘ) কথ্যভাষার কাছাকাছি
✔ উত্তর: গ) তৎসম শব্দবহুল
ব্যাখ্যা: সাধু রীতিতে সংস্কৃত (তৎসম) শব্দের প্রাধান্য থাকে।
7. 'সবুজপত্র' পত্রিকা কত সালে প্রকাশিত হয়?
ক) ১৯০৫
খ) ১৯১৪
গ) ১৯২১
ঘ) ১৯৩৫
✔ উত্তর: খ) ১৯১৪
ব্যাখ্যা: প্রমথ চৌধুরী ১৯১৪ সালে 'সবুজপত্র' পত্রিকা প্রকাশ করেন।
8. নিচের কোন বাক্যটি গুরুচণ্ডালী দোষমুক্ত?
ক) সে যাইতেছে কিন্তু আমি যাচ্ছি না
খ) তাহারা আসিয়াছিল কিন্তু আমরা ছিলাম না
গ) সে বলেছিল যে সে আসবে
ঘ) উহা লইয়া তারা ঝগড়া করছে
✔ উত্তর: গ) সে বলেছিল যে সে আসবে
ব্যাখ্যা: এই বাক্যে সব ক্রিয়া ও সর্বনাম চলিত রীতিতে আছে, তাই দোষমুক্ত।
9. 'ইহা'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) এটি
খ) এটা
গ) এই
ঘ) ইহাকে
✔ উত্তর: খ) এটা
ব্যাখ্যা: সাধু 'ইহা' → চলিত 'এটা' বা 'এ'।
10. সাধু ও চলিত রীতিতে কোনটি সাধারণত অভিন্ন থাকে?
ক) ক্রিয়াপদ
খ) সর্বনাম
গ) বিশেষ্য ও বিশেষণ
ঘ) অনুসর্গ
✔ উত্তর: গ) বিশেষ্য ও বিশেষণ
ব্যাখ্যা: বিশেষ্য ও বিশেষণ উভয় রীতিতে প্রায় একই থাকে। পার্থক্য মূলত ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গে।
11. বাংলাদেশের সংবিধান কোন রীতিতে লেখা?
ক) চলিত রীতি
খ) সাধু রীতি
গ) মিশ্র রীতি
ঘ) আঞ্চলিক রীতি
✔ উত্তর: খ) সাধু রীতি
ব্যাখ্যা: বাংলাদেশের সংবিধান সাধু রীতিতে রচিত।
12. 'যাইতেছিল'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) যাচ্ছিল
খ) যাচ্ছে
গ) গিয়েছিল
ঘ) যেত
✔ উত্তর: ক) যাচ্ছিল
ব্যাখ্যা: সাধু 'যাইতেছিল' (অতীত অসমাপ্ত) → চলিত 'যাচ্ছিল'।
13. 'দিয়া'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) দিয়ে
খ) দিই
গ) দেই
ঘ) দিলে
✔ উত্তর: ক) দিয়ে
ব্যাখ্যা: সাধু অনুসর্গ 'দিয়া' → চলিত 'দিয়ে'।
14. 'বলিয়াছিল'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) বলছিল
খ) বলেছিল
গ) বলেছে
ঘ) বলে
✔ উত্তর: খ) বলেছিল
ব্যাখ্যা: সাধু 'বলিয়াছিল' (অতীত পুরাঘটিত) → চলিত 'বলেছিল'।
15. কোনটি সাধু রীতির ক্রিয়াপদ?
ক) করেছি
খ) করছি
গ) করিতেছি
ঘ) করব
✔ উত্তর: গ) করিতেছি
ব্যাখ্যা: 'করিতেছি' সাধু রীতির বর্তমান অসমাপ্ত। চলিত রূপ 'করছি'।
16. আঞ্চলিক রীতি সম্পর্কে কোনটি সঠিক?
ক) লিখিত ভাষায় মান্য
খ) সর্বত্র অভিন্ন
গ) মৌখিক ভাষায় ব্যবহৃত
ঘ) সাধু রীতির অংশ
✔ উত্তর: গ) মৌখিক ভাষায় ব্যবহৃত
ব্যাখ্যা: আঞ্চলিক রীতি মূলত মৌখিক ভাষায় ব্যবহৃত হয়, লিখিত মান্যভাষায় গ্রহণযোগ্য নয়।
17. 'কাহাকে'-এর চলিত রূপ কোনটি?
ক) কাকে
খ) কাহার
গ) কারা
ঘ) কে
✔ উত্তর: ক) কাকে
ব্যাখ্যা: সাধু 'কাহাকে' → চলিত 'কাকে'।
18. প্রথম চলিত গদ্যে উপন্যাস লেখেন কে?
ক) বঙ্কিমচন্দ্র
খ) প্রমথ চৌধুরী
গ) প্যারীচাঁদ মিত্র
ঘ) রবীন্দ্রনাথ
✔ উত্তর: গ) প্যারীচাঁদ মিত্র
ব্যাখ্যা: প্যারীচাঁদ মিত্র 'আলালের ঘরের দুলাল' (১৮৫৮) উপন্যাসে কথ্যভাষার কাছাকাছি গদ্য ব্যবহার করেন।
19. চলিত রীতি কোন রূপভেদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে?
ক) বরেন্দ্রী
খ) বঙ্গালী
গ) রাঢ়ী
ঘ) কামরূপী
✔ উত্তর: গ) রাঢ়ী
ব্যাখ্যা: চলিত রীতি মূলত রাঢ়ী উপভাষার (কলকাতা-নদীয়া অঞ্চলের) কথ্যরূপের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
20. সাধু ও চলিত রীতির পার্থক্য মূলত কোথায়?
ক) বিশেষ্য ও বিশেষণে
খ) ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গে
গ) অব্যয়ে
ঘ) সমাসে
✔ উত্তর: খ) ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গে
ব্যাখ্যা: বিশেষ্য-বিশেষণ প্রায় অভিন্ন। পার্থক্য মূলত ক্রিয়াপদ, সর্বনাম ও অনুসর্গে।