ছয় দফা আন্দোলন ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ১৯৬৬ – ১৯৬৯ • বাঙালির মুক্তির সনদ • ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান |
চ্যাপ্টার সারসংক্ষেপ ১৯৬৫-র পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা ও কেন্দ্রীয় শোষণ চরমে পৌঁছালে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলীয় সম্মেলনে বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ ছয় দফা পেশ করেন। ২৩ মার্চ ১৯৬৬ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে এটি গৃহীত হয়। আইয়ুব-মোনেম খান চক্র ছয় দফাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ ঘোষণা করে ১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে—প্রধান আসামি বঙ্গবন্ধুসহ মোট ৩৫ জন। মামলার বিচার চলাকালে ১৯৬৯-এর ১৭ জানুয়ারি ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা ঘোষণা করে; ২০ জানুয়ারি শহীদ আসাদ, ১৮ ফেব্রুয়ারি অধ্যাপক শামসুজ্জোহার মৃত্যুতে আন্দোলন তীব্র হয়। ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তি পান; ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করে। ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হন। |
পটভূমি ও প্রেক্ষাপট
১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বরখাস্ত হওয়ার পর পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন আরও কঠোর হয়। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সামরিক আইন জারি করেন; ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে দশ বছরের সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় পূর্ব বাংলার গভর্নর ছিলেন আবদুল মোনেম খান (১৯৬২-১৯৬৯), যিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ দমনে সক্রিয় ছিলেন।
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে ১৭ দিনের পাক-ভারত যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট প্রকট হয়। অঞ্চলটি কার্যত প্রতিরক্ষাহীন ছিল—কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পূর্ণ মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে। যুদ্ধশেষে তাশখন্দ চুক্তি (১০ জানুয়ারি ১৯৬৬) পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়। এ পটভূমিতেই ছয় দফার ধারণা জন্ম নেয়।
অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য
বৈদেশিক মুদ্রা আয় — পূর্ব পাকিস্তানের পাট থেকে অর্জিত আয়ের ৬০-৭০% পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হতো।
উন্নয়ন বরাদ্দ — ১৯৫০-১৯৭০ পর্যন্ত মোট উন্নয়ন বরাদ্দের ৩০%-এরও কম পেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান, যদিও জনসংখ্যা ছিল ৫৬%।
সরকারি চাকরি — কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদে বাঙালির অংশ ১৫%-এর নিচে; সামরিক বাহিনীতে ৫%-এরও কম।
মুদ্রানীতি — একক মুদ্রাব্যবস্থা পূর্ব বাংলার সম্পদ পশ্চিমে স্থানান্তরে কাজ করত।
রাজধানী — কেন্দ্রীয় রাজধানী করাচি (পরে ইসলামাবাদ); পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসনিকভাবে দূরবর্তী।
✨ বিশেষ নোট 📌 প্রাসঙ্গিক স্মরণীয় ১৯৬০-এর দশকে আইয়ুব খান ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ (Basic Democracy) ব্যবস্থা চালু করেন—যেখানে ৮০,০০০ নির্বাচিত প্রতিনিধি (Basic Democrats) পরোক্ষভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতেন। এ ব্যবস্থা সরাসরি গণতন্ত্রকে সংকুচিত করে এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর কণ্ঠরোধ করে। |
ছয় দফা পেশ ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলন ডাকা হয়। উদ্দেশ্য ছিল আইয়ুব খানের শাসন ও পাক-ভারত যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা। আওয়ামী লীগের পক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান এ সম্মেলনে যোগ দেন।
🔑 মূল ঘোষণা ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, লাহোরে বিরোধী দলীয় সম্মেলনের বিষয়সূচি কমিটির বৈঠকে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির ‘মুক্তির সনদ’ হিসেবে ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেন। সম্মেলনে এটি গৃহীত না হলে তিনি লাহোরেই ৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে দাবিগুলো জনসমক্ষে প্রকাশ করেন। ২৩ মার্চ ১৯৬৬ ঢাকায় আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় কর্মসূচি হিসেবে গৃহীত হয়। |
ছয় দফার দাবিসমূহ
ছয়টি দফার সারসংক্ষেপ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
দফা | প্রকৃতি | প্রধান দাবি |
১ম দফা | শাসনতান্ত্রিক | লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রীয় সংবিধান; সংসদীয় গণতন্ত্র; প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার। |
২য় দফা | শাসন-কাঠামোগত | কেন্দ্রের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র; বাকি সব বিষয় প্রদেশের। |
৩য় দফা | অর্থনৈতিক (মুদ্রা) | দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক মুদ্রা; অথবা একই মুদ্রা হলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিমে মূলধন পাচার রোধে কঠোর সংরক্ষণ ব্যবস্থা। |
৪র্থ দফা | অর্থনৈতিক (কর) | কর/রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা প্রদেশের হাতে; কেন্দ্র প্রদেশ-প্রদত্ত অংশে চলবে। |
৫ম দফা | অর্থনৈতিক (বৈদেশিক) | প্রতিটি প্রদেশের পৃথক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব; স্বাধীন বৈদেশিক বাণিজ্য ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে অর্থনৈতিক চুক্তি। |
৬ষ্ঠ দফা | নিরাপত্তা (সামরিক) | পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আঞ্চলিক সেনাবাহিনী বা প্যারামিলিটারি বাহিনী। |
⚡ এক্সাম-টিপ ছয় দফার মধ্যে ১টি শাসনতান্ত্রিক, ১টি শাসন-কাঠামোগত, ৩টি অর্থনৈতিক (৩য়, ৪র্থ, ৫ম দফা), ১টি নিরাপত্তা সংক্রান্ত। BCS-এ ‘ছয় দফার কয়টি অর্থনৈতিক?’ প্রশ্নের উত্তর = ৩টি। FFF8E1 |
📊 লাইভ আপডেট 📊 মূল তারিখ-পরিসংখ্যান পেশ: ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, লাহোর | আনুষ্ঠানিক ঘোষণা: ২৩ মার্চ ১৯৬৬, ঢাকা | ৬ দফা দিবস: ৭ জুন (১৯৬৬-র ৭ জুনের হরতাল ও শহীদদের স্মরণে)। ৭ জুন ১৯৬৬-এ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ১১ জন শহীদ হন। |
ছয় দফার তাৎপর্য
‘ম্যাগনাকার্টা’র সমতুল্য — ছয় দফাকে বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ (Charter of Freedom) ও ব্রিটিশ ম্যাগনাকার্টার সঙ্গে তুলনা করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো — পাকিস্তানকে দুটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপান্তরের প্রস্তাব।
স্বাধীনতার অগ্রসূচী — ছয় দফা ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা নয়, তবে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবির মাধ্যমে স্বাধীনতার ভিত্তি তৈরি করে।
‘এক ইউনিট’ পদ্ধতির অবসান — ১৯৫৫-তে পশ্চিম পাকিস্তানের চার প্রদেশকে একীভূত করে যে ‘এক ইউনিট’ চালু হয়েছিল, ছয় দফা পরোক্ষভাবে তার বিরোধিতা করে।
ছয় দফার প্রচার ও সরকারি দমন
ছয় দফা ঘোষণার পর শেখ মুজিবুর রহমান সারা পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জনসংযোগ শুরু করেন। প্রায় প্রতিটি জেলায় তিনি জনসভা করেন। জনগণের মধ্যে ছয় দফার প্রতি ব্যাপক সমর্থন গড়ে ওঠে—যা দেখে আইয়ুব সরকার আতঙ্কিত হয়।
সরকারের প্রতিক্রিয়া
তারিখ / সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
মার্চ ১৯৬৬ | আইয়ুব খান ছয় দফাকে ‘অস্ত্রের ভাষায়’ মোকাবিলার ঘোষণা দেন | সরকারের কঠোর অবস্থান প্রকাশ |
এপ্রিল-মে ১৯৬৬ | শেখ মুজিবকে দফায় দফায় গ্রেফতার ও মুক্তি (৮ বার) | নেতৃত্বকে কোণঠাসা করার চেষ্টা |
৮ মে ১৯৬৬ | শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ | তিনি মুক্তি পান ১৯৬৯-র ২২ ফেব্রুয়ারি |
৭ জুন ১৯৬৬ | ছয় দফার সমর্থনে সর্বাত্মক হরতাল; পুলিশের গুলিতে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে ১১ জন শহীদ | ৭ জুন → ‘ছয় দফা দিবস’ |
১৯৬৭ | আইয়ুব সরকার পরবর্তী ‘ইসলামি আদর্শ পরিষদ’ গঠন করে ছয় দফাকে ‘ইসলাম-বিরোধী’ চিহ্নিত করতে চেষ্টা চালায় | মতাদর্শিক দমন |
📌 মনে রাখুন 📌 ৭ জুন: ছয় দফা দিবস ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ছিল মঙ্গলবার। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, তেজগাঁও, টঙ্গী—সর্বত্র হরতাল। ঢাকা মেডিকেল এলাকায় ছাত্র মনু মিয়া ও মালেক, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আবুল হোসেন—এদেরসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। এ দিনই ছয় দফা ‘গণদাবি’তে পরিণত হয়। |
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
ছয় দফার অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা দমাতে ব্যর্থ হয়ে আইয়ুব-মোনেম খান চক্র শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় করার নতুন কৌশল নেয়। ১৯৬৮ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার ঘোষণা করে—ভারতের আগরতলায় বৈঠক করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার ষড়যন্ত্র করেছেন একদল বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, যাঁদের নেতৃত্বে রয়েছেন শেখ মুজিব।
⚖️ মামলার পরিচিতি মামলার সরকারি নাম: ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ (State vs. Sheikh Mujibur Rahman and Others)। জনপ্রিয় নাম: ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ (Agartala Conspiracy Case)। দায়েরের তারিখ: ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ (অভিযোগপত্র দাখিল ১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮)। অভিযোগ: বাঙালি কর্মকর্তারা ভারতের আগরতলায় কর্নেল মেনন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার ষড়যন্ত্র করেছেন। |
আসামিদের পরিসংখ্যান
বিষয় | তথ্য |
মোট আসামি | ৩৫ জন (বঙ্গবন্ধুসহ) |
প্রধান আসামি | শেখ মুজিবুর রহমান (১নং আসামি) |
সামরিক কর্মকর্তা | ১৪ জন |
বেসামরিক কর্মকর্তা | ২১ জন |
মামলার ধারা | Pakistan Penal Code-এর ১২১, ১২১-A, ১২৪-A (রাষ্ট্রদ্রোহ) |
সম্ভাব্য সাজা | মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
বিচারক | বিশেষ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এস. এ. রহমান |
সরকারি কৌঁসুলি | মনজুর কাদের |
বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রধান আইনজীবী | ব্যারিস্টার আবদুস সালাম খান ও টমাস উইলিয়ামস (ব্রিটিশ QC) |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ আসামি সংখ্যা বিভ্রান্তি Excel ও অনেক বইয়ে ‘৩৪ জন’ বা ‘৩৫ জন’ উভয় সংখ্যা দেখা যায়। সঠিক হিসাব: বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জন (বঙ্গবন্ধু = ১নং আসামি; বাকি ৩৪ জন)। BCS-এ প্রশ্ন ‘বঙ্গবন্ধুসহ মোট কতজন আসামি’ → ৩৫; প্রশ্ন ‘বঙ্গবন্ধু ছাড়া’ → ৩৪। যত্নসহকারে পড়ুন। |
মামলার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ
তারিখ / সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ | সরকার ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ আবিষ্কারের ঘোষণা; প্রাথমিক অভিযোগপত্র | মামলার সূচনা |
১৮ জানুয়ারি ১৯৬৮ | শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার থেকে এনে নতুনভাবে গ্রেফতার দেখানো; ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে স্থানান্তর | প্রতীকী পুনর্গ্রেফতার |
১৯ জুন ১৯৬৮ | ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের প্রকাশ্য বিচার শুরু | ঐতিহাসিক বিচার সূচনা |
আগস্ট-ডিসেম্বর ১৯৬৮ | ব্যারিস্টার সালাম খান ও টমাস উইলিয়ামস বঙ্গবন্ধুর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন | আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ |
৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত (১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯ ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ১১ দফা ঘোষণা করেছিল) | আন্দোলন তীব্র |
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে হত্যা | জনরোষ চরমে |
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | জহুরুল হকের লাশ নিয়ে বিক্ষোভ; ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের ‘স্টেট গেস্ট হাউস’-এ অগ্নিসংযোগ | মামলা টলমল |
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | আইয়ুব খান নিঃশর্তভাবে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার; শেখ মুজিবসহ সব আসামি মুক্ত | ঐতিহাসিক বিজয় |
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে ১০ লাখ জনতার সমাবেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান | উপাধি দান করেন তোফায়েল আহমেদ |
✨ বিশেষ নোট 📌 মামলা প্রত্যাহারের কারণ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের চাপ; সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যাকাণ্ডে জনরোষ; অভিযুক্তদের পক্ষে ব্যাপক জনসমর্থন; আন্তর্জাতিক চাপ (ব্রিটিশ আইনজীবী টমাস উইলিয়ামসের আন্তর্জাতিক উপস্থিতি); আইয়ুব-শাসনের পতনের সম্ভাবনা—এসব কারণে আইয়ুব খান বাধ্য হয়ে মামলা প্রত্যাহার করেন। |
১১ দফা ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান
আগরতলা মামলার প্রতিবাদে এবং ছয় দফার ভিত্তিতে আরও বিস্তৃত গণআন্দোলন গড়ে তুলতে ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। এতে ছয় দফার সবগুলো দাবিই অন্তর্ভুক্ত ছিল; অতিরিক্ত যুক্ত হয় ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও মধ্যবিত্তের দাবি-দাওয়া।
📚 ১১ দফা পরিচিতি ঘোষণার তারিখ: ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯। ঘোষণাকারী: ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ (DUCSU-র তোফায়েল আহমেদ আহ্বায়ক)। ১১ দফায় ছয় দফার সব দাবি ছিল ১ম দফায় অন্তর্ভুক্ত। বাকি দফাগুলোতে ছিল শিক্ষানীতি সংস্কার, ছাত্র বেতন হ্রাস, কৃষক ঋণ মওকুফ, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি, পাকিস্তান থেকে বের হয়ে SEATO-CENTO চুক্তি বাতিল, রাজবন্দীদের মুক্তি, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ইত্যাদি। |
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ
তারিখ / সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯ | ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা | আন্দোলনের নতুন রূপ |
২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (আসাদ) পুলিশের গুলিতে শহীদ | ‘শহীদ আসাদ দিবস’ → ২০ জানুয়ারি |
২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ | মতিউর রহমান মল্লিক (নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র) ও রুস্তম আলী পুলিশের গুলিতে শহীদ | ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ → ২৪ জানুয়ারি |
১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যা | মামলার বিরুদ্ধে জনরোষ চরম |
১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহা ছাত্র-পুলিশের মাঝে এসে গুলিবিদ্ধ ও শহীদ | শিক্ষকদের আন্দোলনে যোগদান |
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | আইয়ুব খান আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবসহ সব আসামিকে মুক্তি | প্যারোলে নয়, নিঃশর্ত মুক্তি |
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ | ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান (তোফায়েল আহমেদ কর্তৃক) | ঐতিহাসিক সমাবেশ |
২৫ মার্চ ১৯৬৯ | ব্যাপক চাপের মুখে আইয়ুব খান পদত্যাগ; জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা গ্রহণ | ১১ বছরের আইয়ুব-যুগের অবসান |
৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ | শেখ মুজিব ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেন (সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে) | নাম-পরিবর্তনের প্রস্তাব |
ঊনসত্তরের শহীদগণ
শহীদ | পরিচয় | শহীদ হওয়ার তারিখ |
আমানুল্লাহ মো. আসাদুজ্জামান (আসাদ) | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের এম.এ. ছাত্র; পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতা | ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ |
মতিউর রহমান মল্লিক (কিশোর মতিউর) | নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র (১৬ বছর) | ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ |
রুস্তম আলী | শ্রমিক | ২৪ জানুয়ারি ১৯৬৯ |
সার্জেন্ট জহুরুল হক | পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট; আগরতলা মামলার অভিযুক্ত | ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ (ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে) |
ড. মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা | রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রক্টর | ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ (রাজশাহী) |
📌 মনে রাখুন 📌 আসাদ গেট ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় ‘আসাদ গেট’ শহীদ আসাদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সাথে সম্পর্কিত। অনেকে ভুল করে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের সাথে যুক্ত করেন—এটি ভুল। |
ফলাফল ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য
স্বল্পমেয়াদি ফলাফল
আইয়ুব-শাসনের পতন — ১১ বছরের সামরিক শাসন ২৫ মার্চ ১৯৬৯-এ অবসান।
আগরতলা মামলা প্রত্যাহার — ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ নিঃশর্ত মুক্তি; শেখ মুজিব জাতীয় নেতায় পরিণত।
‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি লাভ — ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ রেসকোর্স ময়দানে; প্রদানকারী: তোফায়েল আহমেদ।
রেসকোর্স ময়দানের নামকরণ — ১৯৭২ সালে ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান’ নামকরণ; ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯-এ শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের নাম ‘বাংলাদেশ’ ঘোষণা করেন।
সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তুতি — ইয়াহিয়া খান ১৯৭০-এর ৭ ডিসেম্বর নির্বাচনের ঘোষণা দেন; এতে আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় পায়।
দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ছয় দফা বাঙালির রাজনৈতিক চিন্তাকে স্থায়ীভাবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এ রূপান্তরিত করে।
পাকিস্তানের ‘একতা’র দ্বিজাতিতত্ত্বের পরিবর্তে স্বায়ত্তশাসন-ভিত্তিক ফেডারেল কাঠামোর দাবি প্রাধান্য পায়।
১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় ছয় দফার গণআদেশ হিসেবে গণ্য।
পরবর্তীতে কেন্দ্র যখন ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধা দেয়, তখন ছয় দফাই হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রামের রাজনৈতিক ভিত্তি।
৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধুর ‘চার দফা’ মূলত ছয় দফার সংশোধিত ও পরিমার্জিত রূপ।
✍️ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “ছয় দফা ছিল বাঙালির রাজনৈতিক আত্ম-নির্ধারণের প্রথম পূর্ণাঙ্গ দলিল। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তা সংরক্ষণের সংগ্রাম হলে, ১৯৬৬-র ছয় দফা ছিল সেই সত্তার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির রূপরেখা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা এই দাবিকে স্তব্ধ করার আইয়ুবী চক্রান্ত হলেও পরিণামে তা শেখ মুজিবকে ‘বাঙালির নেতা’ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’তে রূপান্তরিত করে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করে—গণমানুষের ঐক্য সামরিক শাসনের বিরুদ্ধেও বিজয়ী হতে পারে; এ অভিজ্ঞতাই ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত হয়।” |
মূল ব্যক্তিত্ব
ছয় দফার রূপকার-গোষ্ঠী
শেখ মুজিবুর রহমান — ছয় দফার আনুষ্ঠানিক উত্থাপনকারী ও প্রবক্তা।
রুহুল কুদ্দুস — সাবেক সরকারি কর্মকর্তা; ছয় দফার খসড়া প্রস্তুতিতে অর্থনৈতিক দিকের পরামর্শদাতা।
নুরুল ইসলাম (অর্থনীতিবিদ) — যুক্তফ্রন্টের প্রাক্তন উপদেষ্টা; অর্থনৈতিক বৈষম্যের পরিসংখ্যান সরবরাহ।
তাজউদ্দীন আহমদ — খসড়া তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা; পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রচারে নেতৃত্ব।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতৃত্ব
তোফায়েল আহমেদ — DUCSU-র ভিপি; ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক; ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ বঙ্গবন্ধু উপাধি প্রদানকারী।
আবদুর রউফ — DUCSU-র জিএস।
নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ.স.ম. আবদুর রব — পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনে ভূমিকা।
সিরাজুল আলম খান — ‘নিউক্লিয়াস’ গোষ্ঠীর নেতা; বাঙালির স্বাধীনতার জন্য গোপন রাজনৈতিক প্রস্তুতি।
আইয়ুব-শাসনের প্রতিপক্ষ
ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান — পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট (১৯৫৮-১৯৬৯)। ২৫ মার্চ ১৯৬৯-এ পদত্যাগ।
আবদুল মোনেম খান — পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৬২-১৯৬৯)। ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ দমনে কঠোর। পরবর্তীতে ১৯৭১-এ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত (১৩ অক্টোবর ১৯৭১)।
জেনারেল ইয়াহিয়া খান — আইয়ুবের পর প্রেসিডেন্ট (২৫ মার্চ ১৯৬৯ – ২০ ডিসেম্বর ১৯৭১)। ১৯৭০-এর নির্বাচন ঘোষণা ও ১৯৭১-এর গণহত্যার নায়ক।
মনে রাখার কৌশল
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 ছয় দফার বিষয়বস্তু (১-২-৩) ১ → শাসনতন্ত্র (লাহোর প্রস্তাব); ২ → কেন্দ্রের ক্ষমতা; ৩ → পৃথক মুদ্রা; ৪ → কর; ৫ → বৈদেশিক মুদ্রা; ৬ → সেনাবাহিনী। ‘শা-কে-মু-ক-বৈ-সে’ অক্ষর-সূত্রে মুখস্থ করুন। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 অর্থনৈতিক দফা চিহ্নিত ছয় দফার মধ্যে ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম দফা = ৩টি অর্থনৈতিক। ‘মুদ্রা-কর-বৈদেশিক’ — তিন M-Tax-F সূত্র। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 মূল তারিখ ‘৫-৭-২৩’ ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ → ছয় দফা পেশ। ৭ জুন ১৯৬৬ → ছয় দফা দিবস (হরতাল)। ২৩ মার্চ ১৯৬৬ → আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 আগরতলা মামলা ‘৩৫-৩-১৮’ ৩৫ → মোট আসামি (বঙ্গবন্ধুসহ)। ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ → মামলা দায়ের। ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ → শামসুজ্জোহা শহীদ; ২২ ফেব্রু → মামলা প্রত্যাহার। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 ১৯৬৯-এর শহীদ ‘আ-ম-জ-শা’ আ → আসাদ (২০ জানু); ম → মতিউর (২৪ জানু); জ → জহুরুল হক (১৫ ফেব্রু); শা → শামসুজ্জোহা (১৮ ফেব্রু)। ক্রমিক তারিখে স্মরণ করুন। |
‘প্রথম-প্রথম’ তথ্য
যেটি প্রথম | উত্তর |
ছয় দফা পেশের স্থান | লাহোর (৫ ফেব্রু ১৯৬৬, বিরোধী দলীয় সম্মেলন) |
ছয় দফার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা | ঢাকা (২৩ মার্চ ১৯৬৬, আওয়ামী লীগ কাউন্সিল) |
ছয় দফা দিবস | ৭ জুন |
শহীদ আসাদ দিবস | ২০ জানুয়ারি |
গণঅভ্যুত্থান দিবস | ২৪ জানুয়ারি |
আগরতলা মামলায় প্রধান আসামি | শেখ মুজিবুর রহমান |
মামলা দায়েরের তারিখ | ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮ |
মামলা প্রত্যাহারের তারিখ | ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ |
‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানের তারিখ | ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ |
উপাধি প্রদানকারী | তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রনেতা) |
১১ দফা ঘোষণার তারিখ | ১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯ |
আইয়ুব খানের পদত্যাগ | ২৫ মার্চ ১৯৬৯ |
‘বাংলাদেশ’ নামকরণের তারিখ | ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ (শেখ মুজিব কর্তৃক) |
🌐 Keywords ও পরিভাষা
English Term | বাংলা ব্যাখ্যা |
Six-Point Programme | ছয় দফা কর্মসূচি — বাঙালির ‘মুক্তির সনদ’ |
Charter of Freedom | মুক্তির সনদ — ছয় দফার প্রচলিত নাম |
Magna Carta of Bengali Nation | বাঙালির ম্যাগনাকার্টা — ছয় দফার আন্তর্জাতিক তুলনামূলক নাম |
Provincial Autonomy | প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন — ছয় দফার মূল লক্ষ্য |
Federal Structure | যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো — দ্বি-প্রদেশ ব্যবস্থা |
Agartala Conspiracy Case | আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা — State vs. Sheikh Mujib & Others |
High Treason / Sedition | রাষ্ট্রদ্রোহিতা — মামলার মূল ধারা (১২১-A) |
Basic Democracy | মৌলিক গণতন্ত্র — আইয়ুবের পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা |
Mass Upsurge (Gono Obhyutthan) | গণঅভ্যুত্থান — ১৯৬৯-এর জনআন্দোলন |
Eleven-Point Programme | ১১ দফা — ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মসূচি (১৭ জানু ১৯৬৯) |
Bangabandhu (Friend of Bengal) | বঙ্গবন্ধু — শেখ মুজিবের উপাধি (২৩ ফেব্রু ১৯৬৯) |
Tashkent Declaration | তাশখন্দ চুক্তি — পাক-ভারত যুদ্ধাবসান (১০ জানু ১৯৬৬) |
সতর্কতা ও বিশেষ নোট
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ১ — তারিখ গুলিয়ে যাবেন না ছয় দফা ‘পেশ’ → ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, লাহোর। ‘আনুষ্ঠানিক ঘোষণা’ → ২৩ মার্চ ১৯৬৬, ঢাকা। ‘ছয় দফা দিবস’ → ৭ জুন (হরতাল ও শহীদ স্মরণে)। তিনটি তারিখ আলাদা। প্রশ্নে কী চাচ্ছে—পেশ, ঘোষণা, না দিবস—মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ২ — আসামি সংখ্যা আগরতলা মামলায় ‘বঙ্গবন্ধুসহ মোট আসামি’ = ৩৫ জন। ‘বঙ্গবন্ধু বাদে অন্য আসামি’ = ৩৪ জন। Excel-এর R3329 প্রশ্নে ‘৩৪ জন’ থেকে ‘৩৬ জন’ পর্যন্ত বিকল্প আছে—সঠিক উত্তর ৩৫ (বঙ্গবন্ধুসহ)। প্রশ্নটি সাবধানে পড়ুন। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ৩ — দুই ‘মতিউর রহমান’ ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ‘মতিউর রহমান মল্লিক’ (নবকুমার ইনস্টিটিউটের কিশোর ছাত্র, ১৬ বছর) — ১৯৭১-এর বীরশ্রেষ্ঠ ‘ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান’-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলবেন না। দু’জন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ৪ — দুই ‘হামিদুর রহমান’/‘জহুরুল হক’ আগরতলা মামলায় শহীদ ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক’ — পাকিস্তান বিমান বাহিনীর সার্জেন্ট, ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিহত (১৫ ফেব্রু ১৯৬৯)। তাঁর নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সার্জেন্ট জহুরুল হক হল’। ‘জহুর আহমদ চৌধুরী’ ভিন্ন রাজনীতিবিদ। |
✨ বিশেষ নোট 📌 বিশেষ নোট ১ — ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির পেছনে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রস্তাব করেন আবদুল মতিন চৌধুরী; প্রদান করেন তোফায়েল আহমেদ। তারিখ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, রেসকোর্স ময়দান। প্রস্তাবের আগে ‘শেখ সাহেব’ বলে সম্বোধন করা হতো। |
✨ বিশেষ নোট 📌 বিশেষ নোট ২ — ‘বাংলাদেশ’ নাম ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শেখ মুজিব এক জনসভায় ‘পূর্ব পাকিস্তান’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশ’ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন। সরকারিভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এই নামকরণের প্রস্তাব এসেছিল। |
প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A) |
ছয় দফার ঘোষণা ও স্থান
প্রশ্ন 1: ঐতিহাসিক ছয় দফা কত সালে পেশ করা হয়? উত্তর: ১৯৬৬ সালে (৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, লাহোর)। |
প্রশ্ন 2: ১৯৬৬ সালে বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ দাবি কোথায় উত্থাপন করা হয়? উত্তর: লাহোরে। |
প্রশ্ন 3: ছয় দফা কে পেশ/ঘোষণা করেন? উত্তর: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। |
প্রশ্ন 4: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবে আনুষ্ঠানিকভাবে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন? উত্তর: ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ (লাহোরে পেশ); আনুষ্ঠানিক দলীয় ঘোষণা: ২৩ মার্চ ১৯৬৬ (ঢাকা)। |
প্রশ্ন 5: ৬ দফা আনুষ্ঠানিকভাবে কত তারিখে ঘোষণা করা হয়? উত্তর: ২৩ মার্চ ১৯৬৬ (ঢাকা আওয়ামী লীগ কাউন্সিল)। |
প্রশ্ন 6: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবে ও কোথায় ছয় দফা ঘোষণা করেন? উত্তর: ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ সালে লাহোরে (পেশ)। |
প্রশ্ন 7: ঐতিহাসিক ছয় দফা ১৯৬৬ সালের কোন মাসে ঘোষণা করা হয়? উত্তর: ফেব্রুয়ারিতে (পেশ); মার্চে (দলীয় ঘোষণা)। |
প্রশ্ন 8: ৬ দফা দাবি প্রথম কোথায় উত্থাপন করা হয়? উত্তর: লাহোরে। |
ছয় দফার বিষয়বস্তু
প্রশ্ন 9: ছয় দফার ১ম দফা কী ছিল? উত্তর: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা; প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন। |
প্রশ্ন 10: ১৯৬৬ সালের ৬ দফার কতটি দফা অর্থনীতি বিষয়ক ছিল? উত্তর: ৩টি (৩য়, ৪র্থ ও ৫ম দফা—মুদ্রা, কর ও বৈদেশিক মুদ্রা)। |
প্রশ্ন 11: ছয় দফার ২য় দফা কী ছিল? উত্তর: কেন্দ্রের হাতে শুধু প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র; বাকি সব ক্ষমতা প্রদেশের হাতে। |
প্রশ্ন 12: ছয় দফার ৬ষ্ঠ দফা কী ছিল? উত্তর: পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আঞ্চলিক সেনাবাহিনী বা প্যারামিলিটারি বাহিনী গঠন। |
প্রশ্ন 13: ঐতিহাসিক ৬ দফাকে কিসের সাথে তুলনা করা হয়? উত্তর: ম্যাগনাকার্টার (Magna Carta) সাথে। |
প্রশ্ন 14: ঐতিহাসিক ছয় দফা দিবস কবে? উত্তর: ৭ জুন। |
প্রশ্ন 15: ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কয় দফা দাবি পেশ করেন? উত্তর: ৪ দফা। |
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা
প্রশ্ন 16: আগরতলা ভারতের কোন রাজ্যের রাজধানী? উত্তর: ত্রিপুরা। |
প্রশ্ন 17: আগরতলা মামলা কোন সালে হয়? উত্তর: ১৯৬৮ সালে (মামলা দায়ের: ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮)। |
প্রশ্ন 18: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামী করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয় কবে? উত্তর: ৩ জানুয়ারি ১৯৬৮। |
প্রশ্ন 19: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কতজনকে আসামী করা হয়? উত্তর: ৩৫ জন (বঙ্গবন্ধুসহ)। |
প্রশ্ন 20: How many accused were in 'Agartala Conspiracy case' including Bangabandhu? উত্তর: 35. |
প্রশ্ন 21: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি কে ছিলেন? উত্তর: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। |
প্রশ্ন 22: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কতজনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়? উত্তর: ৩৫ জন। |
প্রশ্ন 23: আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কবে প্রত্যাহার করা হয়? উত্তর: ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। |
প্রশ্ন 24: আগরতলা মামলায় শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক কোথায় ও কবে নিহত হন? উত্তর: ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। |
১১.৪ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও শহীদগণ
প্রশ্ন 25: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান দিবস কোনটি? উত্তর: ২৪ জানুয়ারি। |
প্রশ্ন 26: ‘শহীদ আসাদ’ কত সালে নিহত হন? উত্তর: ১৯৬৯ সালে (২০ জানুয়ারি)। |
প্রশ্ন 27: শহীদ আসাদ দিবস পালিত হয় কবে? উত্তর: ২০ জানুয়ারি। |
প্রশ্ন 28: ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে যুক্ত হতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র শহীদ হয়েছিলেন? উত্তর: শহীদ আসাদ (আমানুল্লাহ মো. আসাদুজ্জামান)। |
প্রশ্ন 29: আসাদ গেট কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে সম্পর্কিত? উত্তর: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান। |
প্রশ্ন 30: ‘ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ ১৯৬৯-এ কত দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে? উত্তর: ১১ দফা (১৭ জানুয়ারি ১৯৬৯)। |
প্রশ্ন 31: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন অধ্যাপক ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হন? উত্তর: ড. মুহাম্মদ শামসুজ্জোহা (রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ও প্রক্টর)। |
‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি ও পরবর্তী ঘটনা
প্রশ্ন 32: কত তারিখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়? উত্তর: ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। |
প্রশ্ন 33: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি পান কত সালে? উত্তর: ১৯৬৯ সালে। |
প্রশ্ন 34: ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি কে প্রদান করেন? উত্তর: তোফায়েল আহমেদ (DUCSU-র ভিপি; ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক)। |
প্রশ্ন 35: বঙ্গবন্ধু উপাধি কোথায় প্রদান করা হয়? উত্তর: ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। |
প্রশ্ন 36: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কত তারিখে পূর্ব বাংলার নামকরণ ‘বাংলাদেশ’ করেন? উত্তর: ৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯। |
প্রশ্ন 37: আইয়ুব খান কত তারিখে পদত্যাগ করেন? উত্তর: ২৫ মার্চ ১৯৬৯। |
প্রশ্ন 38: ছয় দফার পক্ষে ১৯৬৬-র ৭ জুনের হরতালে কতজন শহীদ হন? উত্তর: ১১ জন (ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে)। |