১৯৭০-এর নির্বাচন ও অসহযোগ আন্দোলন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচন • ৭ মার্চের ভাষণ • বঙ্গবন্ধুর চার দফা • অপারেশন সার্চলাইট |
চ্যাপ্টার সারসংক্ষেপ ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের পদত্যাগের পর ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন এবং LFO (Legal Framework Order) প্রণয়নের মাধ্যমে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ ও ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন দেন। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়—জাতীয় পরিষদে ১৬৭ এবং প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮ আসন। কিন্তু ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার চক্রান্তে ক্ষমতা হস্তান্তর না হলে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন (১ মার্চ–২৫ মার্চ ১৯৭১)। ৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু চার দফা দাবি উপস্থাপন করেন এবং 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম' ঘোষণা করেন। ২ মার্চ ১৯৭১ প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। ২৫ মার্চ রাতে 'অপারেশন সার্চলাইট'-এ পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর হত্যাকাণ্ড শুরু করে। |
পটভূমি: ইয়াহিয়া খান ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি
১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ আইয়ুব খান পদত্যাগের পর জেনারেল আগা মুহাম্মদ ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট (মার্শাল ল' প্রশাসক) হিসেবে ক্ষমতা নেন। ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন—তিনি সত্বর সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
Legal Framework Order (LFO) — আইনগত কাঠামো আদেশ
LFO পরিচিতি Legal Framework Order (LFO) হলো ইয়াহিয়া খান কর্তৃক ৩০ মার্চ ১৯৭০ জারিকৃত নির্বাচনী আইন, যার ভিত্তিতে ১৯৭০-এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছিল: (১) জাতীয় পরিষদ = ৩১৩ আসন; পূর্ব পাকিস্তান = ১৬৯ আসন (১৬২ সাধারণ + ৭ মহিলা), পশ্চিম পাকিস্তান = ১৪৪ (১৩৮+৬)। (২) প্রাপ্তবয়স্কদের প্রত্যক্ষ ভোট ('One Man One Vote')। (৩) পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা-অনুপাতে প্রথমবারের মতো আসন বরাদ্দ। |
ভোলার মহাঘূর্ণিঝড় ১৯৭০
তারিখ — ১২-১৩ নভেম্বর ১৯৭০ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলে আঘাত হানে।
ক্ষয়ক্ষতি — সরকারি হিসাবে ৩ লক্ষ, অনানুষ্ঠানিক হিসাবে ৫ লক্ষ+মানুষ নিহত।
রাজনৈতিক প্রভাব — কেন্দ্রীয় সরকারের দেরিতে ও অপর্যাপ্ত সাড়া বাঙালির ক্ষোভ আরও বাড়ায়; নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে সহানুভূতির ভোট।
ভুট্টোর মন্তব্য — পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ত্রাণকাজে আসেননি—এটি বাঙালির মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে।
✨ বিশেষ নোট 📌 ভোলা সাইক্লোন ও নির্বাচন ঘূর্ণিঝড়ের মাত্র তিন সপ্তাহ পরে ৭ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এই ঘূর্ণিঝড়ে সহায়তায় কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যর্থতা নির্বাচনে বাঙালির রায়কে আরও একমুখী করে দেয়। |
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন ও ফলাফল
নির্বাচনের মূল তথ্য
বিষয় | তথ্য |
জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের তারিখ | ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ |
প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের তারিখ | ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ |
মোট জাতীয় পরিষদ আসন (পাকিস্তান) | ৩১৩টি (৩০০ সাধারণ + ১৩ মহিলা) |
পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ আসন | ১৬৯টি (১৬২ সাধারণ + ৭ মহিলা) |
পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ আসন | ৩০০টি |
প্রধান নির্বাচন কমিশনার | বিচারপতি আবদুস সাত্তার |
ভোটদান পদ্ধতি | সর্বজনীন প্রত্যক্ষ ভোট (One Man One Vote) |
নির্বাচনী ফলাফল
দল | জাতীয় পরিষদ (পূর্ব পাকিস্তান) | প্রাদেশিক পরিষদ |
আওয়ামী লীগ | ১৬৭টি (১৬২ সাধারণের মধ্যে ১৬০ + ৭ মহিলা) | ২৮৮টি (৩০০-এর মধ্যে) |
পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি | ১টি | — |
স্বতন্ত্র | ২টি | — |
অন্যান্য | — | ১২টি |
পাকিস্তান পিপলস পার্টি (ভুট্টো) | ৮১টি (পশ্চিমে) | পশ্চিমেই সীমিত |
নুরুল আমিন (পূর্ব থেকে একমাত্র বিরোধী বিজয়ী) | ১টি | — |
📊 লাইভ আপডেট 📊 মূল সংখ্যা মুখস্থ রাখুন আওয়ামী লীগ: জাতীয় পরিষদে ১৬৭ | প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮। পূর্ব পাকিস্তানের মোট জাতীয় আসন: ১৬৯। সমগ্র পাকিস্তান: ৩১৩। নির্বাচনের তারিখ: ৭ ডিসেম্বর (জাতীয়), ১৭ ডিসেম্বর (প্রাদেশিক)। |
⚡ এক্সাম-টিপ ⚡ এক্সাম-টিপ — আসন সংখ্যার বিভ্রান্তি Excel-এ জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের আসন নিয়ে ভিন্ন বিকল্প আছে: ১৬০, ১৬২, ১৬৭, ১৭২, ১৭৭। সঠিক = ১৬৭ (১৬০ সাধারণ + ৭ মহিলা)। প্রাদেশিক পরিষদে: ২৮৮ (৩০০-এর মধ্যে)। R400 এ 'সঠিক উত্তর ১৬৭'—কিন্তু সেটি বিকল্পেই আছে। |
নির্বাচনের তাৎপর্য
পাকিস্তানের ২৩ বছরের ইতিহাসে প্রথম নির্দলীয় সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক সাধারণ নির্বাচন।
আওয়ামী লীগ সমগ্র পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল—সরকার গঠনে সক্ষম।
ছয় দফার গণআদেশ হিসেবে বিবেচিত—বাঙালি ভোটে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে সুস্পষ্ট রায়।
পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেবল নুরুল আমিন (মুসলিম লীগ) একটি আসন জেতেন—বাকি সবই আওয়ামী লীগের।
ক্ষমতা হস্তান্তরে সংকট
নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পর পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন—তিনি জাতীয় পরিষদে যোগ দেবেন না এবং পশ্চিম পাকিস্তানের PPP সদস্যদের যোগ দিতে নিষেধ করেন। ভুট্টোর দাবি ছিল—ক্ষমতা ভাগ করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগকে একা সরকার গঠন করতে দেওয়া যাবে না।
তারিখ / সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
জানুয়ারি ১৯৭১ | বঙ্গবন্ধু-ভুট্টো আলোচনা; ভুট্টো দাবি করেন 'ক্ষমতা ভাগ' | বাঙালির প্রতি প্রতারণার সূচনা |
১ মার্চ ১৯৭১ | ইয়াহিয়া খান হঠাৎ ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন | ঢাকায় স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ শুরু |
২ মার্চ ১৯৭১ | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে আ. স. ম. আবদুর রব প্রথমবার স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন | প্রতীকী স্বাধীনতার ঘোষণা |
৩ মার্চ ১৯৭১ | পল্টন ময়দানে 'স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ' স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে; বঙ্গবন্ধু উপস্থিত ছিলেন | শাজাহান সিরাজ ইশতেহার পাঠ করেন |
৭ মার্চ ১৯৭১ | রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ; চার দফা দাবি ও অসহযোগের ডাক | স্বাধীনতার অঘোষিত ঘোষণা |
১৬-২৪ মার্চ ১৯৭১ | ঢাকায় ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো তিন পক্ষের আলোচনা; কোনো সমঝোতা হয়নি | সামরিক ব্যবস্থার প্রস্তুতি চলছিল |
২৫ মার্চ ১৯৭১ রাত | অপারেশন সার্চলাইট শুরু; বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার; হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি হত্যা | মুক্তিযুদ্ধের সূচনা |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ 'ইশতেহার' বনাম 'ঘোষণাপত্র'—দুটি ভিন্ন দলিল স্বাধীনতার ইশতেহার → ৩ মার্চ ১৯৭১, পল্টন ময়দান, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ কর্তৃক (আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় দলিল নয়)। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র → ১০ এপ্রিল ১৯৭১ গৃহীত ও ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পাঠ করা হয় (আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় দলিল)। পরীক্ষায় এ দুটি গুলিয়ে ফেলা খুব সাধারণ ভুল। |
অসহযোগ আন্দোলন (১ মার্চ – ২৫ মার্চ ১৯৭১)
১ মার্চ ১৯৭১ সকালে ইয়াহিয়া খান রেডিওতে জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া মাত্রই ঢাকাসহ সারা পূর্ব পাকিস্তানে বিক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। বঙ্গবন্ধু সেদিনই দুই দিনের হরতাল ঘোষণা করেন এবং ৭ মার্চ জনসভার ডাক দেন।
অসহযোগ আন্দোলন পরিচিতি কার্যকাল: ২ মার্চ – ২৫ মার্চ ১৯৭১। বৈশিষ্ট্য: কেন্দ্রীয় সরকারের সকল নির্দেশ প্রত্যাখ্যান; ব্যাংক, আদালত, অফিস, সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের অসহযোগ; বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান পরিচালিত। কার্যত পূর্ব পাকিস্তান এ সময় আলাদা সত্তায় পরিচালিত হচ্ছিল। |
অসহযোগের বৈশিষ্ট্যসমূহ
সরকারি অফিস বয়কট — কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে কেউ কাজ করেনি।
ব্যাংক বন্ধ — পশ্চিম পাকিস্তানে অর্থ পাঠানো বন্ধ।
রেডিও-টেলিভিশন — বাঙালি কর্মীরা পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত প্রচার করতে অস্বীকার করেন।
স্বাধীন প্রশাসন — বঙ্গবন্ধু নির্দেশিকা দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পরিচালনা করছিলেন—এটি ছিল অঘোষিত স্বাধীনতা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান — বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে আন্দোলনের প্রস্তুতি চলছিল।
কর দেওয়া বন্ধ — বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকারকে কোনো ট্যাক্স বা রাজস্ব প্রদান স্থগিত।
৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ (রবিবার) বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দেন—তা পৃথিবীর ইতিহাসে মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে স্বীকৃত।
ভাষণের মূল তথ্য
বিষয় | তথ্য |
তারিখ | ৭ মার্চ ১৯৭১ (রবিবার) |
সময় | বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে শুরু |
স্থান | রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) |
ভাষণের দৈর্ঘ্য | প্রায় ১৯ মিনিট (১৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ড) |
ভাষণের শেষ লাইন | “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” |
UNESCO স্বীকৃতি | Memory of the World International Register, ৩০ অক্টোবর ২০১৭ |
বাংলাদেশের সংবিধানে | পঞ্চম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত (১৫তম সংশোধনী, ২০১১) |
ভাষণভিত্তিক চলচ্চিত্র | 'তর্জনী' (পরিচালক: মুহাম্মদ কাউসার) |
ভাষণের চার দফা দাবি
ক্রম | দাবি |
১ম | সামরিক আইন (Martial Law) প্রত্যাহার করতে হবে। |
২য় | সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। |
৩য় | সেনাবাহিনীর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। |
৪র্থ | নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। |
⚡ এক্সাম-টিপ ⚡ এক্সাম-টিপ — ভাষণে কত দফা? ৭ মার্চের ভাষণে চার দফা দাবি। '৬ দফা', '১১ দফা', '৭ দফা' — সবই ভিন্ন কর্মসূচি। BCS-এ এ প্রশ্ন বারবার আসে। ৭ মার্চের ভাষণ = ৪ দফা। |
ভাষণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য
অঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণা — 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'—এ বাক্যটি আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা না হলেও কার্যত স্বাধীনতার পথপ্রশস্তকারী।
গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশ — 'তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো' — এ নির্দেশনা বাঙালিকে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতিতে উদ্বুদ্ধ করে।
অসহযোগের কর্মসূচি — হরতাল, ট্যাক্স-খাজনা বন্ধ, সরকারি অফিস বয়কটের স্পষ্ট নির্দেশ।
RTC প্রতিক্রিয়া — ভাষণে 'RTC' (Round Table Conference)-এর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত ছিল।
✍️ লিখিত পরীক্ষার জন্য (Critical View) “৭ মার্চের ভাষণ একটি অসাধারণ রাজনৈতিক ভারসাম্যের দলিল: একদিকে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে সামরিক আক্রমণের সুযোগ না দেওয়া, অন্যদিকে জনগণকে প্রস্তুত করা। UNESCO ২০১৭ সালে এটি 'Memory of the World'-এ অন্তর্ভুক্ত করে কারণ এতে একটি নিপীড়িত জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অদম্য আকাঙ্ক্ষার বিশ্বমানবিক দলিল রয়েছে।” |
ভাষণের ওপর UNESCO স্বীকৃতি
বিষয় | তথ্য |
স্বীকৃতির নাম | UNESCO Memory of the World International Register |
স্বীকৃতির তারিখ | ৩০ অক্টোবর ২০১৭ |
প্রস্তাবকারী দেশ | বাংলাদেশ |
তাৎপর্য | বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণের জন্য নির্বাচিত |
পূর্বে এ রেজিস্টারে বাংলাদেশের | বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণই প্রথম বাংলাদেশী দলিল এ তালিকায় |
স্বাধীন বাংলার পতাকা ও স্বাধীনতার ইশতেহার
প্রথম পতাকা উত্তোলন — ২ মার্চ ১৯৭১
বিষয় | তথ্য |
তারিখ | ২ মার্চ ১৯৭১ |
স্থান | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে |
পতাকা উত্তোলনকারী | আ. স. ম. আবদুর রব (DUCSU ভিপি) |
পতাকার বর্ণনা | সবুজ পটভূমিতে লাল বৃত্তের মাঝে সোনালি মানচিত্র (পরে মানচিত্র বাদ দেওয়া হয়) |
প্রেক্ষাপট | ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিতের প্রতিবাদে |
বিদেশে প্রথম পতাকা উত্তোলন | কলকাতা (বাংলাদেশ মিশনে) |
স্বাধীনতার ইশতেহার — ৩ মার্চ ১৯৭১
বিষয় | তথ্য |
তারিখ | ৩ মার্চ ১৯৭১ |
স্থান | পল্টন ময়দান, ঢাকা |
ঘোষণাকারী সংগঠন | স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ |
ইশতেহার পাঠকারী | শাজাহান সিরাজ |
বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি | হ্যাঁ (মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন) |
প্রকৃতি | ছাত্রদের অনানুষ্ঠানিক ঘোষণা; সরকারি/আন্তর্জাতিক স্বীকৃত দলিল নয় |
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (Proclamation of Independence) — ১০ এপ্রিল ১৯৭১
বিষয় | তথ্য |
গৃহীত হওয়ার তারিখ | ১০ এপ্রিল ১৯৭১ |
পাঠ করা হয় | ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ (মুজিবনগর, বৈদ্যনাথতলা) |
পাঠকারী | অধ্যাপক ইউসুফ আলী |
সংবিধানের তফসিল | পঞ্চম তফসিল (Fifth Schedule) |
সংবিধানের কত তম সংশোধনীতে | পঞ্চদশ সংশোধনী (২০১১) |
বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য নেত্রীদের নাম | ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম ছাড়া অন্য কোনো নেতার নাম নেই |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ তিনটি আলাদা দলিল গুলিয়ে যায় ১) স্বাধীনতার ইশতেহার (৩ মার্চ ১৯৭১, পল্টন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, শাজাহান সিরাজ পাঠ করেন)। ২) স্বাধীনতার ঘোষণা (২৬ মার্চ ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসে, মেজর জিয়া চট্টগ্রাম বেতার থেকে পাঠ করেন)। ৩) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র (১০ এপ্রিল গৃহীত/১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পাঠ, অধ্যাপক ইউসুফ আলী পাঠ করেন)। তিনটি ভিন্ন ঘটনা। |
মনে রাখার কৌশল
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 নির্বাচনের মূল সংখ্যা '৭-১৭-৩১৩-১৬৭-২৮৮' ৭ ডিসেম্বর → জাতীয় পরিষদ নির্বাচন | ১৭ ডিসেম্বর → প্রাদেশিক পরিষদ | ৩১৩ → সমগ্র পাকিস্তান জাতীয় আসন | ১৬৭ → আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে | ২৮৮ → আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক পরিষদে। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 মার্চের তারিখ ক্রম '১-২-৩-৭-২৫' ১ মার্চ → অধিবেশন স্থগিত (ইয়াহিয়া) | ২ মার্চ → পতাকা উত্তোলন (আবদুর রব) | ৩ মার্চ → স্বাধীনতার ইশতেহার (পল্টন) | ৭ মার্চ → বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ | ২৫ মার্চ → অপারেশন সার্চলাইট। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 ৭ মার্চের ভাষণ '৭-৪-১৯-পঞ্চম-UNESCO' ৭ মার্চ ১৯৭১ | চার দফা দাবি | ১৯ মিনিটের ভাষণ | পঞ্চম তফসিল (সংবিধান) | UNESCO Memory of the World (২০১৭)। |
🧠 মনে রাখার কৌশল 🧠 ইশতেহার-ঘোষণাপত্র পার্থক্য '৩-১০-১৭' ৩ মার্চ → ইশতেহার (পল্টন, শাজাহান সিরাজ) | ১০ এপ্রিল → ঘোষণাপত্র গৃহীত | ১৭ এপ্রিল → ঘোষণাপত্র পাঠ (মুজিবনগর, ইউসুফ আলী)। |
'প্রথম-প্রথম' তথ্য
যেটি প্রথম / মূল তথ্য | উত্তর |
১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের তারিখ | ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ |
প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের তারিখ | ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭০ |
প্রধান নির্বাচন কমিশনার | বিচারপতি আবদুস সাত্তার |
আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে মোট আসন | ১৬৭টি |
আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক পরিষদে মোট আসন | ২৮৮টি |
পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিরোধী একমাত্র বিজয়ী | নুরুল আমিন (মুসলিম লীগ) |
ভোলার ঘূর্ণিঝড়ের তারিখ | ১২-১৩ নভেম্বর ১৯৭০ |
জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা | ১ মার্চ ১৯৭১ (ইয়াহিয়া) |
প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী | আ. স. ম. আবদুর রব (২ মার্চ ১৯৭১) |
স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠকারী | শাজাহান সিরাজ (৩ মার্চ ১৯৭১) |
৭ মার্চের ভাষণের দৈর্ঘ্য | প্রায় ১৯ মিনিট |
৭ মার্চের ভাষণের দাবি সংখ্যা | ৪টি |
৭ মার্চের ভাষণ UNESCO স্বীকৃতি | ৩০ অক্টোবর ২০১৭ |
৭ মার্চের ভাষণ সংবিধানের তফসিল | পঞ্চম তফসিল (১৫তম সংশোধনী, ২০১১) |
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠকারী | অধ্যাপক ইউসুফ আলী (১৭ এপ্রিল ১৯৭১) |
ঘোষণাপত্র কোন তফসিলে | পঞ্চম তফসিল |
সতর্কতা ও বিশেষ নোট
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ১ — আসন সংখ্যা আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ২ — ৭ মার্চের 'তফসিল' ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ৩ — কে প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন ২ মার্চ ১৯৭১: আ. স. ম. আবদুর রব (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে)। শাজাহান সিরাজ পতাকা তোলেননি—তিনি ৩ মার্চ পল্টনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন। দুটি ভিন্ন তারিখে, দুটি ভিন্ন স্থানে, দুটি ভিন্ন ঘটনা। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ৪ — প্রধান নির্বাচন কমিশনার ১৯৭০-এর নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার: বিচারপতি আবদুস সাত্তার। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী → UN-এ বাংলাদেশের প্রতিনিধি (১৯৭১) ও পরে রাষ্ট্রপতি। দুজন আলাদা। |
⚠️ সতর্কতা ⚠️ সতর্কতা ৫ — ভারতের অসহযোগ আন্দোলন বনাম বাংলাদেশের ভারতের অসহযোগ আন্দোলন → মহাত্মা গান্ধী নেতৃত্বে ১৯২০-২২। বাংলাদেশের অসহযোগ আন্দোলন → বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে ১৯৭১। দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ঐতিহাসিক ঘটনা। |
✨ বিশেষ নোট 📌 ৭ মার্চের ভাষণের 'RTC' ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু 'RTC' (Round Table Conference) প্রসঙ্গে বলেছিলেন—তিনি এমন কোনো বৈঠকে যেতে চান না যা মুক্তির পথ রোধ করে। 'RTC' = Round Table Conference। |
✨ বিশেষ নোট 📌 ভাষণের স্থায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন তথ্য ১৯ মিনিট (সাড়ে আঠারো মিনিট)। |
প্রশ্ন ও উত্তর (Q&A) |
১৯৭০-এর নির্বাচন ও ফলাফল
প্রশ্ন 1: ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কতটি আসন লাভ করে? উত্তর: ১৬৭টি (১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টি + ৭টি মহিলা আসন)। |
প্রশ্ন 2: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক পরিষদে কতটি আসনে জয়ী হয়? উত্তর: ২৮৮টি (৩০০টির মধ্যে)। |
প্রশ্ন 3: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মোট আসন কতটি ছিল? উত্তর: ১৬৯টি (১৬২ সাধারণ + ৭ মহিলা)। |
প্রশ্ন 4: ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে ছিলেন? উত্তর: বিচারপতি আবদুস সাত্তার। |
প্রশ্ন 5: ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন কত তারিখে অনুষ্ঠিত হয়? উত্তর: ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০। |
প্রশ্ন 6: পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদে মোট কতটি আসন ছিল? উত্তর: ৩০০টি। |
প্রশ্ন 7: পাকিস্তানের ১৯৭০-এর নির্বাচনে সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে মোট কতটি আসন ছিল? উত্তর: ৩১৩টি। |
অসহযোগ আন্দোলন, পতাকা ও ইশতেহার
প্রশ্ন 8: ১ মার্চ ১৯৭১ কী ঘটে? উত্তর: ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন; ঢাকাসহ সারা পূর্ব পাকিস্তানে স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ শুরু। |
প্রশ্ন 9: বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম কবে উত্তোলন করা হয়? উত্তর: ২ মার্চ ১৯৭১। |
প্রশ্ন 10: কে প্রথম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন? উত্তর: আ. স. ম. আবদুর রব (DUCSU ভিপি)—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে। |
প্রশ্ন 11: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করা হয় ১৯৭১-এর কত তারিখে? উত্তর: ৩ মার্চ ১৯৭১। |
প্রশ্ন 12: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইশতেহার কোথায় ঘোষণা করা হয়? উত্তর: পল্টন ময়দান, ঢাকা। |
প্রশ্ন 13: বঙ্গবন্ধুর ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ভাষণের সময়কালে কোন আন্দোলন চলছিল? উত্তর: পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন। |
৭ মার্চের ভাষণ
প্রশ্ন 14: ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ কোথায় দেন? উত্তর: রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান), ঢাকা। |
প্রশ্ন 15: ৭ ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কয় দফা দাবি পেশ করেন? উত্তর: ৪ দফা। |
প্রশ্ন 16: ৭ ই মার্চের ভাষণের স্থায়িত্বকাল কত? উত্তর: প্রায় ১৯ মিনিট (সাড়ে আঠারো মিনিট)। |
প্রশ্ন 17: ৭ মার্চ ১৯৭১-এর বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মূল বক্তব্য কী? উত্তর: স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা মুক্তি সংগ্রামের ঘোষণা। |
প্রশ্ন 18: বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়? উত্তর: UNESCO (Memory of the World, ৩০ অক্টোবর ২০১৭)। |
প্রশ্ন 19: বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ বাংলাদেশের সংবিধানের কোন তফসিলে অন্তর্ভুক্ত? উত্তর: পঞ্চম তফসিল (Fifth Schedule)। |
প্রশ্ন 20: বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে 'RTC' মানে কী? উত্তর: Round Table Conference (গোলটেবিল বৈঠক)। |
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
প্রশ্ন 21: আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কবে জারি করা হয়? উত্তর: ১০ এপ্রিল ১৯৭১ (গৃহীত); ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ (মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিক পাঠ)। |
প্রশ্ন 22: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র কে পাঠ করেন? উত্তর: অধ্যাপক ইউসুফ আলী। |
প্রশ্ন 23: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানের কততম তফসিলে সংযোজন করা হয়েছে? উত্তর: পঞ্চম তফসিল। |
প্রশ্ন 24: স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র সংবিধানের কততম সংশোধনীতে সংযোজিত হয়? উত্তর: পঞ্চদশ সংশোধনী (15th Amendment, ২০১১)। |
প্রশ্ন 25: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু ছাড়া অন্য কতজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম ছিল? উত্তর: ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধুর নাম ছাড়া অন্য কোনো নেতার নাম নেই। |
প্রশ্ন 26: বিদেশের কোন মিশনে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়? উত্তর: কলকাতায়। |