বাংলা সাহিত্য
🌇
বিহারীলাল চক্রবর্তী
☀ ভোরের পাখি | রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু | গীতিকাব্যের পথিকৃৎ ☀
☀ জীবন পরিচয় ☀
▼ জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
১৮৩৫ সালের ২১ মে কলকাতার জোড়াবাগান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন বিহারীলাল চক্রবর্তী। তাঁর পিতার নাম দীননাথ চক্রবর্তী — পেশায় পুরোহিত। মাত্র চার বছর বয়সে মাতৃহারা হন বিহারীলাল। সেই থেকে পিতার স্নেহছায়ায় বড় হয়েছেন।
পরিবারের আদি নিবাস ছিল ফরাসডাঙ্গায়। পারিবারিক পদবি মূলত 'চট্টোপাধ্যায়' — কিন্তু বিহারীলালের প্রপিতামহ এক স্বর্ণকারের দান গ্রহণ করেন বলে সমাজচ্যুত হন এবং পদবি 'চক্রবর্তী' হয়।
বিহারীলাল মূলত নিজের স্বাক্ষরে লিখতেন 'বেহারীলাল'। সুকুমার সেন লিখেছেন — 'বস্তুত নামটি বেহারীলাল হওয়া উচিত। সাধুভাষার খাতিরে এবং রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছিলেন বলিয়া আমরা বিহারীলাল লিখিয়া আসিতেছি।'
⚡ বিহারীলালের জন্ম — ২১ মে ১৮৩৫, জোড়াবাগান, কলকাতা। পিতা — দীননাথ চক্রবর্তী।
▼ শিক্ষাজীবন
বিহারীলালের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন বেশি নয়। শৈশবে নিজ গৃহে সংস্কৃত, ইংরেজি ও বাংলা সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। পরে কলকাতার সংস্কৃত কলেজে তিন বছর পড়াশোনা করেন।
সংস্কৃত কলেজে থাকার সময়ই তিনি 'পূর্ণিমা' পত্রিকায় প্রথম গদ্যগ্রন্থ 'স্বপ্নদর্শন' (১৮৫৮) প্রকাশ করেন।
বন্ধু কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্যের সৌজন্যে ইংরেজি কাব্য সাহিত্যে — শেলি, কীটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ প্রমুখ কবিদের রচনার সাথে পরিচিত হন। এই পাশ্চাত্য প্রভাব তাঁকে গীতিকবিতার দিকে আকৃষ্ট করে।
⚡ বিহারীলাল সংস্কৃত কলেজে মাত্র তিন বছর পড়েছেন — প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম।
▼ বিবাহজীবন
উনিশ বছর বয়সে মাত্র দশ বছরের অভয়া দেবীর সাথে বিবাহ হয়। কিন্তু অভয়া দেবী অকালে মারা যান। এই বিয়োগবেদনাই পরে 'বন্ধুবিয়োগ' কাব্যে ধরা পড়েছে। কাব্যে অভয়া দেবী 'সরলা' নামে উল্লিখিত।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সাথে বিহারীলালের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'সঙ্গীত শতক' পড়ে মুগ্ধ হয়ে আলাপ করেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। কাদম্বরী দেবী ছিলেন তাঁর বিমুগ্ধ ভক্ত।
⚡ বিহারীলালের প্রথম স্ত্রী অভয়া দেবী — 'বন্ধুবিয়োগ' কাব্যে 'সরলা' নামে।
▼ ঠাকুরবাড়ির সাথে সম্পর্ক ও রবীন্দ্রনাথের স্বীকৃতি
তরুণ রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের কবিতায় মুগ্ধ ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'জীবনস্মৃতি' গ্রন্থে বিহারীলালের কথা উল্লেখ করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালকে 'কাব্যগুরু' আখ্যা দিয়েছেন। 'ভোরের পাখি' অভিধা দিয়ে লিখেছেন — 'সে প্রত্যুষে অধিক লোক জাগে নাই এবং সাহিত্যকুঞ্জে বিচিত্র কলগীত কূজিত হইয়া উঠে নাই। সেই ঊষালোকে কেবল একটি ভোরের পাখি সুমিষ্ট সুন্দর সুরে গান ধরিয়াছিল। সে সুর তাহার নিজের।'
“সে প্রত্যুষে অধিক লোক জাগে নাই... সেই ঊষালোকে কেবল একটি ভোরের পাখি সুমিষ্ট সুন্দর সুরে গান ধরিয়াছিল। সে সুর তাহার নিজের। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”
⭐ রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালকে 'ভোরের পাখি' ও 'কাব্যগুরু' বলেছেন।
▼ পত্রিকা সম্পাদনা
বিহারীলাল কাব্যচর্চার পাশাপাশি পত্রিকা সম্পাদনার কাজও করেছেন।
⮚ পূর্ণিমা — পাক্ষিক সাহিত্য পত্রিকা (১২৬৫ বঙ্গাব্দ থেকে)।
⮚ অবোধবন্ধু — ১৮৬৩ সালে সম্পাদনা করেন।
⮚ সাহিত্য-সংক্রান্তি — আরেকটি সম্পাদিত পত্রিকা।
⚡ পূর্ণিমা, অবোধবন্ধু, সাহিত্য-সংক্রান্তি — বিহারীলাল সম্পাদিত তিনটি পত্রিকা।
▼ মৃত্যু
১৮৯৪ সালের ২৪ মে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন বিহারীলাল চক্রবর্তী। তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।
বিষয় | তথ্য |
পূর্ণ নাম | বিহারীলাল চক্রবর্তী |
জন্ম | ২১ মে ১৮৩৫ |
জন্মস্থান | জোড়াবাগান, কলকাতা |
মৃত্যু | ২৪ মে ১৮৯৪ |
পিতা | দীননাথ চক্রবর্তী (পুরোহিত) |
আদি নিবাস | ফরাসডাঙ্গা |
প্রথম স্ত্রী | অভয়া দেবী (কাব্যে 'সরলা' নামে) |
শিক্ষা | সংস্কৃত কলেজ (তিন বছর) |
উপাধি | ভোরের পাখি (রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক) |
পরিচিতি | রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু |
বিশেষত্ব | বাংলা গীতিকাব্যের প্রথম সচেতন কবি |
সম্পাদিত পত্রিকা | পূর্ণিমা, অবোধবন্ধু, সাহিত্য-সংক্রান্তি |
শ্রেষ্ঠ কাব্য | সারদামঙ্গল (১৮৭৯) |
প্রথম কাব্যগ্রন্থ | সঙ্গীত শতক (১৮৬২) |
☀ প্রথম রচনা ও সঙ্গীত শতক ☀
✿ স্বপ্নদর্শন — ১৮৫৮ [প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ — গদ্যরচনা]
▼ পটভূমি ও বিষয়বস্তু
১৮৫৮ সালে 'পূর্ণিমা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিহারীলালের প্রথম রচনা 'স্বপ্নদর্শন'। এটি একটি গদ্যগ্রন্থ — কাব্যগ্রন্থ নয়। সংস্কৃত কলেজে পাঠরত অবস্থায় এটি রচনা করেন।
গ্রন্থটির বিষয়বস্তু ছিল দেশ ও দেশমাতৃকার দুর্ভাগ্যের জন্য গভীর আক্ষেপ। একজন দেশপ্রেমিক কবির প্রথম কণ্ঠস্বর এতে শোনা যায়। 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকা ১৮৫৮ সালের ৩ আগস্ট এই গ্রন্থের প্রশংসা করে।
⭐ স্বপ্নদর্শন = বিহারীলালের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (১৮৫৮) — গদ্যরচনা, কাব্য নয়।
⚡ স্বপ্নদর্শন প্রথম গ্রন্থ, কিন্তু প্রথম কাব্যগ্রন্থ হলো সঙ্গীত শতক (১৮৬২)।
✿ সঙ্গীত শতক — ১৮৬২ [প্রথম কাব্যগ্রন্থ]
▼ কাব্যগ্রন্থের পরিচয় ও ভাবার্থ
১৮৬২ সালে প্রকাশিত 'সঙ্গীত শতক' বিহারীলালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। 'শতক' মানে একশত — এই গ্রন্থে একশতটি গান বা কবিতা আছে।
কবি নিজেই এই গ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন — '১৫ হইতে ২৫ বৎসর পর্যন্ত আমার মনে যে যে ভাবোদ্গম হইয়াছিল এবং জীবনে যে যে ঘটনা হইয়াছিল, তাহার অধিকাংশ সঙ্গীত শতকে বর্ণিত আছে।' এটি তাই তাঁর প্রথম দশ বছরের জীবনের কাব্যিক দলিল।
বৈষ্ণব পদাবলীর গীতিকাব্যের ধারাকে নতুন করে প্রবাহিত করেছেন এই গ্রন্থে। সুকুমার সেন লিখেছেন — 'নিধুবাবু, শ্রীধর কথক, রামবসু প্রভৃতি টপ্পায় অর্থাৎ ক্ষুদ্র প্রণয়সঙ্গীতে আসিয়া স্তব্ধ হইয়া গিয়াছিল, তাহাকে বিহারীলাল নূতন করিয়া প্রবাহিত করিলেন সঙ্গীত শতকে।'
দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর এই গ্রন্থ পাঠ করে বিহারীলালের সাথে আলাপ করতে আগ্রহী হন। এই গ্রন্থই বিহারীলালকে ঠাকুরবাড়ির সাথে পরিচিত করিয়ে দেয়।
⭐ সঙ্গীত শতক = বিহারীলালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ১০০টি গান/কবিতার সমষ্টি।
⚡ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর 'সঙ্গীত শতক' পড়েই বিহারীলালের সাথে আলাপ করেন।
❓ বিহারীলালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ? ➤ সঙ্গীত শতক (১৮৬২)
❓ সঙ্গীত শতকে কতটি গান? ➤ একশতটি (১০০টি)
☀ বঙ্গসুন্দরী : প্রথম সার্থক গীতিকাব্য ☀
✿ বঙ্গসুন্দরী — ১৮৭০ [প্রথম সার্থক গীতিকাব্য]
▼ কাব্যের পরিচয় ও গুরুত্ব
১৮৭০ সালে প্রকাশিত 'বঙ্গসুন্দরী' বিহারীলালের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য। এই কাব্যে তিনি নারীকে বিভিন্ন রূপে দেখেছেন — মাতা, জায়া ও কন্যা।
কাব্যটি দশটি সর্গে বিভক্ত। প্রতিটি সর্গে একটি বিশেষ নারী চরিত্র বা নারীর বিশেষ রূপ তুলে ধরা হয়েছে।
▼ দশটি সর্গের বিবরণ
সর্গ | বিষয় |
উপহার | কাব্যের ভূমিকাস্বরূপ নারীর প্রতি উপহার |
নারীবন্দনা | নারীর সর্বাঙ্গীণ গুণের প্রশংসা |
সুরবালা | স্বর্গীয় সুন্দরের প্রতীক সুরবালা |
চিরপরাধিনী | সমাজে নারীর পরাধীনতার চিত্র |
করুণাসুন্দরী | মাতৃরূপা করুণাময়ী নারী |
বিষাদিনী | বিরহ ও বিষাদে মগ্ন নারী |
প্রিয়সখি | বান্ধবী-নারীর সম্পর্ক |
বিরহিণী | বিরহের কষ্টে কাতর নারী |
প্রিয়তমা | প্রেমিকারূপী নারীর বন্দনা |
অভাগিনী | ভাগ্যবঞ্চিত দুর্ভাগ্যময় নারী |
প্রথম সংস্করণে নয়টি সর্গ ছিল। দ্বিতীয় সংস্করণে 'সুরবালা' সর্গটি যোগ করা হয়। প্রতিটি সর্গের প্রারম্ভে কালিদাস, ভবভূতি, ভারবি ও বায়রনের উদ্ধৃতি আছে।
▼ কাব্যের সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'বঙ্গসুন্দরী' কাব্যে বঙ্গনারীকে সৌন্দর্যের প্রতীকরূপে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলার গৃহচারিণী নারী — যিনি সন্তান লালন করেন, স্বামীর সেবা করেন, সংসার সামলান — তাঁকেই কবি দেখেছেন 'বঙ্গসুন্দরী' রূপে।
কাব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো — বিহারীলাল নারীকে শুধু প্রেমের পাত্রী হিসেবে নয়, তাঁর বহুমাত্রিক সত্তায় দেখেছেন। মা হিসেবে, স্ত্রী হিসেবে, কন্যা হিসেবে — প্রতিটি রূপেই নারীর সৌন্দর্য তুলে ধরেছেন।
⭐ বঙ্গসুন্দরী = বিহারীলালের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য। নারীকে মাতা-জায়া-কন্যারূপে দেখা।
⚡ বঙ্গসুন্দরী-তে ১০টি সর্গ। প্রথম সংস্করণে ছিল ৯টি।
❓ বিহারীলালের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য? ➤ বঙ্গসুন্দরী (১৮৭০)
❓ বঙ্গসুন্দরীতে নারীকে কীভাবে দেখা হয়েছে? ➤ মাতা-জায়া-কন্যাসহ বিচিত্র রূপে
☀ বন্ধুবিয়োগ ও প্রেমপ্রবাহিণী ☀
✿ বন্ধুবিয়োগ — ১৮৭০ [শোককাব্য]
▼ কাব্যের পরিচয় ও ভাবার্থ
'বন্ধুবিয়োগ' ১৮৭০ সালে প্রকাশিত একটি শোককাব্য। কাব্যটি প্রথম 'পূর্ণিমা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পয়ার ছন্দে লেখা, চারটি সর্গে বিভক্ত।
▼ চারটি সর্গের বিবরণ
⮚ প্রথম সর্গ 'পূর্ণ-বিজয়': বন্ধু পূর্ণচন্দ্র ও বিজয়ের মৃত্যুতে শোক।
⮚ দ্বিতীয় সর্গ 'কৈলাস': বন্ধু কৈলাসের মৃত্যুতে বেদনা।
⮚ তৃতীয় সর্গ 'সরলা': প্রথম স্ত্রী অভয়া দেবীর মৃত্যুতে শোক ('সরলা' ছদ্মনামে)।
⮚ চতুর্থ সর্গ 'রামচন্দ্র': বন্ধু রামচন্দ্রের মৃত্যুতে বিলাপ।
এই কাব্যে বিহারীলাল তাঁর চার বন্ধু ও প্রথম স্ত্রীর বিয়োগবেদনা প্রকাশ করেছেন। 'ঈশ্বরগুপ্তীয়' রচনারীতিতে লেখা এই কাব্যে দেশের ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগও প্রকাশ পেয়েছে।
⭐ বন্ধুবিয়োগ = চার বন্ধু ও প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুতে শোককাব্য। ৪টি সর্গ।
⚡ বন্ধুবিয়োগে 'সরলা' = বিহারীলালের প্রথম স্ত্রী অভয়া দেবী।
✿ প্রেমপ্রবাহিণী — ১৮৭০ [গীতিকাব্য]
▼ কাব্যের পরিচয় ও ভাবার্থ
'প্রেমপ্রবাহিণী' ১৮৭০ সালে 'অবোধবন্ধু পত্রিকা'য় প্রকাশিত হয়। পাঁচটি সর্গে রচিত — পতন, বিরাগ, বিষাদ, অন্বেষণ ও নির্বাণ।
এই কাব্যে প্রেমের বিভিন্ন স্তর তুলে ধরা হয়েছে। প্রেম কীভাবে প্রথমে আসে, তারপর বিরাগ জন্মায়, বিষাদে ডুবে যায়, আবার অন্বেষণ করে এবং শেষ পর্যন্ত 'নির্বাণ' বা মুক্তিতে পৌঁছায় — এই দার্শনিক যাত্রাই কাব্যের বিষয়।
গবেষকরা এই কাব্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও শেলির প্রভাব লক্ষ করেছেন, বিশেষত তৃতীয় ও পঞ্চম সর্গে।
⭐ প্রেমপ্রবাহিণী = প্রেমের দার্শনিক যাত্রা — পতন থেকে নির্বাণ। ৫টি সর্গ।
☀ নিসর্গসন্দর্শন ☀
✿ নিসর্গসন্দর্শন — ১৮৭০ [প্রকৃতিবিষয়ক কাব্য]
▼ কাব্যের পরিচয় ও বিশেষত্ব
'নিসর্গসন্দর্শন' ১৮৭০ সালে 'অবোধবন্ধু পত্রিকা'য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। 'নিসর্গ' মানে প্রকৃতি। সাতটি সর্গে রচিত এই কাব্যে বাংলার প্রকৃতিকে অপূর্বভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
▼ সাতটি সর্গের বিবরণ
সর্গ | বিষয় ও প্রকৃতির চিত্র |
চিন্তা | প্রকৃতির মাঝে কবির ধ্যান ও চিন্তার প্রবাহ |
সমুদ্রদর্শন | বিশাল সমুদ্রের দর্শন ও মানুষের ক্ষুদ্রতার উপলব্ধি |
বীরাঙ্গনা | প্রকৃতির বীরত্বময় রূপের বর্ণনা |
নভোমণ্ডল | আকাশের অনন্ত বিস্তার ও তারার জগৎ |
ঝটিকা রজনী | ঝড়ের রাতের ভয়াবহ সৌন্দর্য |
ঝটিকা সম্ভোগ | ঝড়ের আনন্দ ও উপভোগ — প্রকৃতির সাথে মিলন |
প্রভাত | ভোরের আলোর আগমন — নতুন সূচনার গান |
এই কাব্যে বিহারীলাল জড় প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। প্রকৃতিকে একটি পৃথক ব্যক্তিত্ব দিয়ে চেতন কবি-প্রাণের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন — এটিই গীতিকবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
সুকুমার সেন এই কাব্য প্রসঙ্গে বিশেষ প্রশংসা করেছেন। 'নিসর্গসন্দর্শন'-এ বাংলার প্রকৃতির বর্ণনা এককথায় অভূতপূর্ব।
⭐ নিসর্গসন্দর্শন = বঙ্গপ্রকৃতির সৌন্দর্যের কাব্যিক দলিল। ৭টি সর্গ।
⚡ 'নিসর্গসন্দর্শন' কাব্যে বঙ্গপ্রকৃতির শোভা অপূর্ব ভাব-ভাষায় বর্ণিত।
☀ সারদামঙ্গল : শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ☀
✨ সারদামঙ্গল (১৮৭৯) — বিহারীলালের মাস্টারপিস ✨
▼ ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রকাশ
'সারদামঙ্গল' বিহারীলাল চক্রবর্তীর সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ। ১৮৭৯ সালে 'আর্যদর্শন' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। বাংলা আধুনিক গীতিকবিতার ইতিহাসে এটি একটি স্তম্ভস্বরূপ।
রবীন্দ্রনাথ এই কাব্য পড়ে বিহারীলালকে 'কাব্যগুরু' বলতে শুরু করেন। 'সারদামঙ্গল' পড়েই তরুণ রবীন্দ্রনাথের কবিচেতনা জেগে ওঠে — রবীন্দ্রনাথের 'বাল্মীকি প্রতিভা'তে বিহারীলালের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
▼ সারদা কে?
'সারদামঙ্গল' কাব্যের 'সারদা' হলো কবির মানসী প্রিয়া। অর্থাৎ কোনো বাস্তব নারী নয় — কবির কল্পনার নারী, তাঁর আদর্শ নারী-মূর্তি।
এই সারদা একই সাথে প্রকৃতির দেবী, সৌন্দর্যের প্রতীক, এবং কবির আত্মার সঙ্গিনী। সারদার মাধ্যমে কবি মৈত্রী, প্রীতি ও সরস্বতীর বিরহের সুর ধ্বনিত করেছেন।
▼ কাব্যের সম্পূর্ণ ভাবার্থ
কাব্যটি পাঁচটি সর্গে বিভক্ত। ঊষা-বন্দনা দিয়ে কাব্যের শুরু — 'চরণ কমলে লেখা আধ আধ রবি রেখা, সর্বাঙ্গে গোলাপ আভা, সীমান্তে শুকতারা জ্বলে।' ভোরবেলার এই অপূর্ব চিত্রদিয়ে কবি সারদাকে আবাহন করেছেন।
কবি তাঁর মানসীকে খুঁজে বেড়ান প্রকৃতির মাঝে। প্রতিটি ফুলে, প্রতিটি আলোর রেখায়, ভোরের শিশিরে — সারদার উপস্থিতি অনুভব করেন।
এই কাব্যে মৈত্রী ও প্রীতির সুর প্রধান। সরস্বতী হলেন জ্ঞান ও শিল্পের দেবী। কবি সরস্বতীর বিরহে কাতর — কারণ তিনি মনে করেন সারদার কাছ থেকে দূরে থাকাটাই তাঁর বিচ্ছেদ।
পাঁচটি সর্গের যাত্রায় কবি ক্রমে গভীর থেকে গভীরতর অনুভূতিতে প্রবেশ করেন। শেষ সর্গে আসে এক ধরনের শান্তি — যেন সারদার সাথে মিলন হয়েছে কল্পনার স্তরে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন — 'সূর্যাস্ত কালের সুবর্ণমন্ডিত মেঘমালার মত সারদামঙ্গলের সোনার শ্লোকগুলি বিবিধ রূপের আভাস দেয়। কিন্তু কোন রূপকে স্থায়ীভাবে ধারণ করিয়া রাখে না। অথচ সুদূর সৌন্দর্য স্বর্গ হইতে একটি অপূর্ণ পূরবী রাগিণী প্রবাহিত হইয়া অন্তরাত্মাকে ব্যাকুল করিয়া তুলিতে থাকে।'
“সূর্যাস্ত কালের সুবর্ণমন্ডিত মেঘমালার মত সারদামঙ্গলের সোনার শ্লোকগুলি বিবিধ রূপের আভাস দেয়... অন্তরাত্মাকে ব্যাকুল করিয়া তুলিতে থাকে। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”
“চরণ কমলে লেখা আধ আধ রবি রেখা, সর্বাঙ্গে গোলাপ আভা, সীমান্তে শুকতারা জ্বলে।”
⭐ সারদামঙ্গলের সারদা = কবির মানসী প্রিয়া — বাস্তব নারী নয়।
⭐ রবীন্দ্রনাথ সারদামঙ্গল পড়েই বিহারীলালকে 'কাব্যগুরু' বলতে শুরু করেন।
⚡ সারদামঙ্গল = কবির শ্রেষ্ঠ কাব্য। সারদা = মানসী প্রিয়া। পাঁচটি সর্গ।
⚡ সারদামঙ্গল 'আর্যদর্শন' পত্রিকায় প্রকাশিত — ১৮৭৯ সালে।
❓ সারদামঙ্গলের সারদা কে? ➤ কবির মানসী প্রিয়া — কল্পিত নারীমূর্তি
❓ সারদামঙ্গল কোন পত্রিকায়? ➤ আর্যদর্শন পত্রিকায় (১৮৭৯)
❓ রবীন্দ্রনাথ সারদামঙ্গল সম্পর্কে কী বলেছেন? ➤ সূর্যাস্ত কালের সুবর্ণমন্ডিত মেঘমালার মত...
☀ সাধের আসন ও অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ ☀
✿ সাধের আসন — ১৮৮৯ [তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য]
▼ কাব্যের পরিচয় ও ভাবার্থ
'সাধের আসন' দশটি সর্গে বিভক্ত তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য। কাব্যগ্রন্থের প্রথম তিনটি সর্গ 'মালঞ্চ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
এই কাব্যে কবি তাঁর কল্পিত নারী মূর্তি 'সারদা'র স্বরূপ আরও স্পষ্টভাবে চিত্রিত করেছেন। 'সারদামঙ্গল'-এ যে সারদার সাথে পরিচয় হয়েছিল, এখানে তার পূর্ণ বিকাশ।
একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তথ্য — এই কাব্যের প্রেক্ষাপটে আছে কবির মানসলক্ষী সম্পর্কে কাদম্বরী দেবীর অনুসন্ধিৎসা এবং কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু (১৮৮৪)। কাব্যগ্রন্থটি কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
⭐ সাধের আসন = তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য। কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গিত।
⚡ সাধের আসন = তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য। কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গিত — গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
▶ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ
কাব্যগ্রন্থ | প্রকাশকাল ও বিষয় |
স্বপ্নদর্শন | ১৮৫৮ — প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ (গদ্য) |
সঙ্গীত শতক | ১৮৬২ — প্রথম কাব্যগ্রন্থ, ১০০টি গান |
বঙ্গসুন্দরী | ১৮৭০ — প্রথম সার্থক গীতিকাব্য, ১০টি সর্গ |
নিসর্গসন্দর্শন | ১৮৭০ — প্রকৃতির কাব্য, ৭টি সর্গ |
বন্ধুবিয়োগ | ১৮৭০ — শোককাব্য, ৪ বন্ধু ও স্ত্রীর মৃত্যুতে |
প্রেমপ্রবাহিণী | ১৮৭০ — প্রেমের দার্শনিক কাব্য, ৫টি সর্গ |
সারদামঙ্গল | ১৮৭৯ — শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ, ৫টি সর্গ |
নিসর্গসঙ্গীত | ১৮৮১ — প্রকৃতিগান |
মায়াদেবী | ১৮৮২ — রহস্যময় নারী চরিত্র |
দেবরাণী | ১৮৮২ — কাহিনিকাব্য |
বাউলবিংশতি | ১৮৮৭ — বাউলসংগীতের প্রভাবিত ২০টি কবিতা |
সাধের আসন | ১৮৮৯ — তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য, ১০টি সর্গ |
ধূমকেতু | ১৮৯৯ — শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ |
☀ কাব্যশৈলী ও বাংলা সাহিত্যে অবদান ☀
▼ গীতিকাব্যের পথিকৃৎ
বিহারীলাল চক্রবর্তী বাংলা গীতিকবিতার প্রথম সচেতন কবি। তাঁর আগে বাংলায় গীতিকবিতার ধারা ছিল — বৈষ্ণব পদাবলী, টপ্পা গান — কিন্তু আধুনিক রোমান্টিক গীতিকবিতার প্রথম যুগান্তকারী রূপায়ণ ঘটে তাঁর হাতেই।
বিহারীলাল বস্তুতন্ময়তার পরিবর্তে বাংলা কাব্যে আত্মতন্ময়তা প্রবর্তন করেন। অর্থাৎ — আগের কবিরা বাইরের জগৎ বর্ণনা করতেন, বিহারীলাল নিজের মনের জগতের কথা বললেন। এটি বাংলা কবিতায় বিপ্লব।
ইংরেজি সাহিত্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের 'লিরিক্যাল ব্যালাডস' যেমন ইংরেজি কবিতায় নতুন যুগ আনে, তেমনি বিহারীলালের গীতিকাব্য বাংলা কবিতায় নতুন যুগ সূচিত করেছে।
▼ কাব্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ
⮚ প্রেম ও প্রকৃতি — গীতিকাব্যের প্রধান উপাদান।
⮚ আত্মতন্ময়তা — বস্তুর বর্ণনার চেয়ে অনুভূতির প্রকাশ বেশি।
⮚ সহজ-সরল ভাষা — তৎসম ও তদ্ভব শব্দের যুগপৎ ব্যবহার।
⮚ সংগীতময়তা — ছন্দ ও সুরের অপূর্ব মিশ্রণ।
⮚ ভাবের প্রাধান্য — রূপের চেয়ে ভাব বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
⮚ মানসী নারী — কল্পিত নারী মূর্তিকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার।
⮚ প্রকৃতিপ্রেম — বাংলার নিসর্গকে অনন্যভাবে চিত্রিত করা।
▼ রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু
বিহারীলালের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তরুণ রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালের গীতিকবিতা পড়ে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কবিতায় বিহারীলালের প্রভাব স্পষ্ট।
রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বীকার করেছেন বিহারীলালকে কাব্যগুরু হিসেবে। 'বিহারীলাল তখনকার ইংরেজিশিক্ষিত কবিদের ন্যায় যুদ্ধবর্ণনা বা দেশানুরাগমূলক কবিতা লিখিলেন না — তিনি নিভৃতে বসিয়া নিজের মনে নিজের মনের কথা বলিলেন।'
“বিহারীলাল নিভৃতে বসিয়া নিজের মনে নিজের মনের কথা বলিলেন। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”
⭐ বিহারীলাল = রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু। বাংলা গীতিকবিতার পথিকৃৎ।
☀ বিখ্যাত পঙক্তি ও উদ্ধৃতি ☀
“সর্বদাই হু হু করে মন, বিশ্ব যেন মরুর মতন। চারিদিকে ঝালাফালা, উঃ কী জ্বলন্ত জ্বালা, অগ্নিকুন্ডে পতঙ্গপতন।”
⭐ এই চারটি চরণ বিহারীলালের সবচেয়ে বিখ্যাত লাইন।
“চরণ কমলে লেখা আধ আধ রবি রেখা, সর্বাঙ্গে গোলাপ আভা, সীমান্তে শুকতারা জ্বলে।”
⭐ সারদামঙ্গল কাব্যের উদ্বোধনী পঙক্তি — ঊষাবন্দনা।
“সারদামঙ্গল এক অপরূপ কাব্য। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”
“সাধারণের কণ্ঠস্থ শত সহস্র রচনা যখন বিনষ্ট হইয়া যাইবে, সারদামঙ্গল তখন লোকস্মৃতিতে প্রত্যহ উজ্জ্বলতর হইয়া উঠিবে।”
☀ প্রশ্নোত্তর ☀
❓ বিহারীলাল চক্রবর্তীর জন্মতারিখ?
➤ ২১ মে ১৮৩৫
❓ বিহারীলালের জন্মস্থান?
➤ জোড়াবাগান, কলকাতা
❓ বিহারীলালের মৃত্যুতারিখ?
➤ ২৪ মে ১৮৯৪
❓ বিহারীলালের পিতার নাম ও পেশা?
➤ দীননাথ চক্রবর্তী (পুরোহিত)
❓ রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালকে কী বলেছেন?
➤ ভোরের পাখি ও কাব্যগুরু
❓ বিহারীলালের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ?
➤ স্বপ্নদর্শন (১৮৫৮) — গদ্যগ্রন্থ
❓ বিহারীলালের প্রথম কাব্যগ্রন্থ?
➤ সঙ্গীত শতক (১৮৬২)
❓ সঙ্গীত শতকে কতটি গান?
➤ একশতটি (১০০টি)
❓ বিহারীলালের প্রথম সার্থক গীতিকাব্য?
➤ বঙ্গসুন্দরী (১৮৭০)
❓ বঙ্গসুন্দরীতে কতটি সর্গ?
➤ ১০টি সর্গ (প্রথম সংস্করণে ৯টি)
❓ বঙ্গসুন্দরীতে নারীকে কীভাবে দেখা হয়?
➤ মাতা-জায়া-কন্যাসহ বিচিত্র রূপে
❓ বিহারীলালের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ?
➤ সারদামঙ্গল (১৮৭৯)
❓ সারদামঙ্গল কোন পত্রিকায়?
➤ আর্যদর্শন পত্রিকায়
❓ সারদামঙ্গলে কতটি সর্গ?
➤ পাঁচটি সর্গ
❓ সারদামঙ্গলের সারদা কে?
➤ কবির মানসী প্রিয়া — কল্পিত নারীমূর্তি
❓ বন্ধুবিয়োগে কতটি সর্গ?
➤ চারটি সর্গ
❓ বন্ধুবিয়োগে 'সরলা' কে?
➤ কবির প্রথম স্ত্রী অভয়া দেবী
❓ প্রেমপ্রবাহিণীতে কতটি সর্গ?
➤ পাঁচটি সর্গ
❓ নিসর্গসন্দর্শনে কতটি সর্গ?
➤ সাতটি সর্গ
❓ সাধের আসন কোন ধরনের কাব্য?
➤ তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য (১০টি সর্গ)
❓ সাধের আসন কাকে উৎসর্গিত?
➤ কাদম্বরী দেবীকে
❓ বিহারীলাল সম্পাদিত পত্রিকা কয়টি?
➤ তিনটি — পূর্ণিমা, অবোধবন্ধু, সাহিত্য-সংক্রান্তি
❓ বিহারীলালের বিশেষ কৃতিত্ব?
➤ বাংলা গীতিকবিতার পথিকৃৎ, আত্মতন্ময়তার প্রবর্তক
❓ বিহারীলালের কাব্যের প্রধান উপাদান?
➤ প্রেম ও প্রকৃতি
❓ বিহারীলালের বিখ্যাত চার চরণ?
➤ সর্বদাই হু হু করে মন, বিশ্ব যেন মরুর মতন...
❓ বিহারীলালের শেষ কাব্যগ্রন্থ?
➤ ধূমকেতু (১৮৯৯)
❓ কাদম্বরী দেবী বিহারীলাল সম্পর্কে কেমন ছিলেন?
➤ তাঁর বিমুগ্ধ ভক্ত
❓ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর কোন গ্রন্থ পড়ে মুগ্ধ হন?
➤ সঙ্গীত শতক
❓ বিহারীলালের প্রথম স্ত্রীর নাম?
➤ অভয়া দেবী
❓ বিহারীলাল বাংলা কাব্যে কী প্রবর্তন করেন?
➤ আত্মতন্ময়তা — বস্তুতন্ময়তার পরিবর্তে
☀ ⚡ ট্রিকি ও অজানা তথ্য ☀
⚡ বিহারীলালের প্রথম গ্রন্থ 'স্বপ্নদর্শন' (১৮৫৮) — গদ্যগ্রন্থ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'সঙ্গীত শতক' (১৮৬২)।
⚡ রবীন্দ্রনাথ বিহারীলালকে দুটি উপাধি দিয়েছেন — 'ভোরের পাখি' এবং 'কাব্যগুরু'।
⚡ বিহারীলালের প্রথম স্ত্রী অভয়া দেবী — 'বন্ধুবিয়োগ' কাব্যে 'সরলা' নামে।
⚡ সারদামঙ্গলের 'সারদা' কোনো বাস্তব নারী নয় — কবির মানসী প্রিয়া।
⚡ সাধের আসন কাব্য কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গিত।
⚡ বঙ্গসুন্দরীতে ১০টি সর্গ — প্রথম সংস্করণে ছিল মাত্র ৯টি।
⚡ বিহারীলাল নিজের নামে স্বাক্ষর করতেন 'বেহারীলাল' — 'বিহারীলাল' রবীন্দ্রনাথের লেখার কারণে প্রচলিত।
⚡ বিহারীলালের পারিবারিক পদবি মূলত 'চট্টোপাধ্যায়' — পরে 'চক্রবর্তী' হয়।
⚡ সারদামঙ্গল 'আর্যদর্শন' পত্রিকায় — 'পূর্ণিমা' বা 'অবোধবন্ধু' নয়।
⚡ বিহারীলালের সম্পাদিত পত্রিকা ৩টি: পূর্ণিমা, অবোধবন্ধু, সাহিত্য-সংক্রান্তি।
⚡ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর 'সঙ্গীত শতক' পড়ে বিহারীলালের সাথে প্রথম আলাপ করেন।
⚡ বিহারীলালের কাব্যের প্রধান উপাদান 'প্রেম ও প্রকৃতি' — এক্ষেত্রে তিনি কালিদাসের সহধর্মী।
⚡ কিন্তু 'কালিদাস নৈর্বক্তিক, বিহারীলাল ব্যক্তিনিষ্ঠ' — এই পার্থক্য মনে রাখুন।
⚡ বিহারীলাল বাংলায় 'আত্মতন্ময়তা' প্রবর্তন করেন — 'বস্তুতন্ময়তা' নয়।
⚡ রবীন্দ্রনাথের 'বাল্মীকি প্রতিভা'তে বিহারীলালের প্রভাব লক্ষণীয়।
⚡ বিহারীলাল মাত্র ৫৯ বছর বেঁচেছিলেন। জন্ম ২১ মে, মৃত্যু ২৪ মে — প্রায় জন্মদিনেই মৃত্যু।
⚡ বিহারীলালের শেষ কাব্যগ্রন্থ 'ধূমকেতু' (১৮৯৯) — মৃত্যুর পর প্রকাশিত।
☀ চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ তালিকা ☀
বিষয় | উত্তর |
পূর্ণ নাম | বিহারীলাল চক্রবর্তী |
জন্ম | ২১ মে ১৮৩৫, জোড়াবাগান, কলকাতা |
মৃত্যু | ২৪ মে ১৮৯৪ |
পিতা | দীননাথ চক্রবর্তী (পুরোহিত) |
প্রথম স্ত্রী | অভয়া দেবী ('সরলা' নামে কাব্যে) |
উপাধি | ভোরের পাখি (রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক) |
পরিচিতি | রবীন্দ্রনাথের কাব্যগুরু |
বিশেষ অবদান | বাংলা গীতিকবিতার পথিকৃৎ, আত্মতন্ময়তার প্রবর্তক |
প্রথম গ্রন্থ | স্বপ্নদর্শন (১৮৫৮) — গদ্যগ্রন্থ |
প্রথম কাব্যগ্রন্থ | সঙ্গীত শতক (১৮৬২) — ১০০টি গান |
প্রথম সার্থক গীতিকাব্য | বঙ্গসুন্দরী (১৮৭০) — ১০টি সর্গ |
শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ | সারদামঙ্গল (১৮৭৯) — ৫টি সর্গ |
সারদা কে? | মানসী প্রিয়া — কল্পিত নারী |
সারদামঙ্গল পত্রিকা | আর্যদর্শন |
তত্ত্বাশ্রয়ী কাব্য | সাধের আসন (১৮৮৯) — কাদম্বরী দেবীকে উৎসর্গিত |
শেষ কাব্যগ্রন্থ | ধূমকেতু (১৮৯৯) |
সম্পাদিত পত্রিকা | পূর্ণিমা, অবোধবন্ধু, সাহিত্য-সংক্রান্তি |
বিখ্যাত পঙক্তি | সর্বদাই হু হু করে মন, বিশ্ব যেন মরুর মতন... |
কাব্যের উপাদান | প্রেম ও প্রকৃতি |