বাংলা সাহিত্য
উপন্যাস
বাংলা সাহিত্যের সোনালি আখ্যানভূমি
❝ উপন্যাস হল জীবনের দর্পণ — সমাজ, মানুষ ও কালের এক মহাকাব্যিক আখ্যান ❞
বাংলা সাহিত্যের মহাজগৎ
প্রথম পর্ব: উপন্যাসের সংজ্ঞা, উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য
উপন্যাসের সংজ্ঞা
উপন্যাস হল গদ্যে রচিত এমন একটি দীর্ঘ আখ্যান-সাহিত্য যেখানে জীবনের ব্যাপক ও বিচিত্র অভিজ্ঞতা চরিত্র, ঘটনা ও সংলাপের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়। এটি মানবজীবনের জটিলতা, সমাজের অসঙ্গতি এবং মনের গভীর রহস্যকে সাহিত্যের আলোয় উন্মোচন করে।
ইংরেজি Novel শব্দের উৎপত্তি
ইংরেজি 'Novel' শব্দটি এসেছে ইতালীয় শব্দ 'Novella' থেকে, যার অর্থ 'নতুন কিছু'। ইউরোপে ঔপন্যাসিক ধারার সূচনা ঘটে মিগেল দে সার্ভান্তেসের 'Don Quixote' (১৬০৫) দিয়ে।
উপন্যাসের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ
● গদ্যে রচিত দীর্ঘ কাহিনি-আখ্যান
● বাস্তবজীবনের প্রতিফলন ও চরিত্র-চিত্রণ
● ঘটনার ক্রমপরম্পরা ও কার্যকারণ সম্পর্ক
● সমাজ, পরিবেশ ও কালের প্রেক্ষাপট
● মানসিক দ্বন্দ্ব ও আবেগের গভীর প্রকাশ
● নায়ক-নায়িকার বিকাশ ও পরিণতি
দ্বিতীয় পর্ব: বাংলা উপন্যাসের ক্রমবিকাশ
বাংলা উপন্যাসের ধারাবাহিক ইতিহাস
যুগ / কাল | উল্লেখযোগ্য রচনা ও লেখক | বৈশিষ্ট্য |
আদিপর্ব (১৮৫৫-পূর্ব) | প্যারীচাঁদ মিত্র — আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) | বাংলা গদ্য উপন্যাসের পূর্বসূরি |
বঙ্কিম যুগ (১৮৬৫-১৮৯৪) | দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, আনন্দমঠ | রোমান্টিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক |
রবীন্দ্র যুগ (১৮৮৩-১৯৪১) | গোরা, ঘরে বাইরে, শেষের কবিতা, চোখের বালি | মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক, সামাজিক |
শরৎ যুগ (১৯০০-১৯৩৮) | দেবদাস, শ্রীকান্ত, পথের দাবী, চরিত্রহীন | সমাজ-সংস্কার, মানবতাবাদ |
বিভূতি-মানিক-তারাশঙ্কর (১৯২৯-১৯৫০) | পথের পাঁচালী, পদ্মানদীর মাঝি, গণদেবতা | বাস্তববাদ, প্রকৃতিপ্রেম, কৃষিজীবন |
আধুনিক বাংলাদেশ (১৯৪৭-বর্তমান) | লালসালু, হাজার বছর ধরে, চিলেকোঠার সেপাই | অস্তিত্ববাদ, মুক্তিযুদ্ধ, নগরজীবন |
★ বাংলা উপন্যাসের প্রথম সার্থক উপন্যাস: বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫)।
⚡ বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস: প্যারীচাঁদ মিত্রের 'আলালের ঘরের দুলাল' (১৮৫৮)। তবে প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী'।
তৃতীয় পর্ব: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — বাংলা উপন্যাসের জনক
জন্ম: ২৭ জুন ১৮৩৮, কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগণা | মৃত্যু: ৮ এপ্রিল ১৮৯৪
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা উপন্যাসের জনক। তিনিই প্রথম বাংলা ভাষায় সার্থক উপন্যাস রচনা করেন। তাঁর লেখায় রোমান্টিকতা, ইতিহাস, সমাজ-বিশ্লেষণ এবং জাতীয়তাবাদ একসাথে মিশেছে। তাঁর ১৪টি উপন্যাসের প্রতিটিই বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
বঙ্কিমচন্দ্রের সকল উপন্যাসের তালিকা
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | ধরন ও বিশেষ তথ্য |
দুর্গেশনন্দিনী | ১৮৬৫ | প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাস। ঐতিহাসিক-রোমান্টিক। পটভূমি: মুঘল-পাঠান যুদ্ধ। |
কপালকুণ্ডলা | ১৮৬৬ | রোমান্টিক। বনের মেয়ে কপালকুণ্ডলার বৈবাহিক জীবনের ট্র্যাজেডি। |
মৃণালিনী | ১৮৬৯ | ঐতিহাসিক। বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ-আক্রমণের পটভূমিতে। |
বিষবৃক্ষ | ১৮৭৩ | সামাজিক। বহুবিবাহ-প্রথার বিরুদ্ধে — ইন্দিরা, নগেন্দ্র, সূর্যমুখী চরিত্র। |
ইন্দিরা | ১৮৭৩ | সামাজিক। ছোট উপন্যাস। |
যুগলাঙ্গুরীয় | ১৮৭৪ | রোমান্টিক। |
রাধারানী | ১৮৭৬ | সামাজিক। |
চন্দ্রশেখর | ১৮৭৫ | ঐতিহাসিক-সামাজিক। নবাবী আমলের পটভূমি। |
রজনী | ১৮৭৭ | সামাজিক। অন্ধ মেয়ে রজনীর কাহিনি। |
কৃষ্ণকান্তের উইল | ১৮৭৮ | সামাজিক। সম্পত্তি ও নারীজীবনের দ্বন্দ্ব — রোহিণী চরিত্র। |
রাজসিংহ | ১৮৮২ | ঐতিহাসিক। রাজপুত ও মুঘল সংঘর্ষ। |
আনন্দমঠ | ১৮৮২ | রাজনৈতিক। সন্ন্যাসী বিদ্রোহ; 'বন্দে মাতরম' সংগীত এখানে। ব্রিটিশ আমলে নিষিদ্ধ। |
দেবী চৌধুরাণী | ১৮৮৪ | সামাজিক-ঐতিহাসিক। প্রফুল্ল চরিত্র বিখ্যাত। |
সীতারাম | ১৮৮৭ | ঐতিহাসিক। |
★ বঙ্কিমচন্দ্রের মোট উপন্যাস: ১৪টি। প্রথম: দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)। শেষ: সীতারাম (১৮৮৭)।
⚡ 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে 'বন্দে মাতরম' গানটি আছে। এই গান পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় স্তোত্র হয়।
⚡ 'কৃষ্ণকান্তের উইল' উপন্যাসের রোহিণী চরিত্র বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জটিল নারী চরিত্রগুলোর একটি।
কাহিনিসংক্ষেপ — দুর্গেশনন্দিনী
✍
মুঘল-পাঠান যুদ্ধের ডামাডোলে পাঠান দুর্গের অধিপতির মেয়ে তিলোত্তমা (দুর্গেশনন্দিনী) আর মুঘল সেনাপতির ছেলে জগৎসিংহের প্রেমের গল্প। তাদের ভালোবাসা সত্ত্বেও সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধা। শেষমেশ বীরত্ব ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে পরিণতি। বঙ্কিম এখানে রোমান্টিক আবহে ভারতীয় বীরত্বের মহিমা গেয়েছেন।
কাহিনিসংক্ষেপ — আনন্দমঠ
✍
১৭৭০ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর বাংলায় দুর্ভিক্ষ ও অনাচার চরমে। এই প্রেক্ষাপটে ভবানন্দ ও সত্যানন্দের নেতৃত্বে 'সন্তান' দল গড়ে ওঠে। তারা 'বন্দে মাতরম' ধ্বনিতে মাতৃভূমির জন্য সংগ্রাম করে। মহেন্দ্র ও কল্যাণী এই বিদ্রোহের মধ্যে দিয়ে তাদের জীবন অতিবাহিত করে। মাতৃভক্তি ও জাতীয়তাবাদের এই মহাকাব্যিক উপন্যাস ব্রিটিশ শাসনামলে নিষিদ্ধ হয়েছিল।
কাহিনিসংক্ষেপ — বিষবৃক্ষ
✍
নগেন্দ্রনাথের দুই স্ত্রী — সূর্যমুখী (বৈধ স্ত্রী) আর কুন্দনন্দিনী (দ্বিতীয় স্ত্রী)। তৃতীয় এক নারী হিন্দিনী মেয়ে হলো ইন্দিরা, যে সূর্যমুখীর শাশুড়িরূপে এই পরিবারকে প্রভাবিত করে। বহুবিবাহ-প্রথার ভয়াবহ পরিণতি দেখাতে গিয়ে বঙ্কিম এঁকেছেন তিনটি নারীর জীবনের ট্র্যাজেডি। 'বিষবৃক্ষ' মানে হলো এই পরিবারে যে বিষ ঢুকেছে তা একটি গাছের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
চতুর্থ পর্ব: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস
জন্ম: ৭ মে ১৮৬১ | মৃত্যু: ৭ আগস্ট ১৯৪১ | নোবেল পুরস্কার: ১৯১৩
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক। কবিতার পাশাপাশি তাঁর উপন্যাসগুলো মানবমনের গভীরতম স্তর স্পর্শ করেছে। তাঁর উপন্যাসে জাতীয়তাবাদ, নারীমুক্তি, আত্মা ও সমাজের দ্বন্দ্ব মূর্ত হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস তালিকা
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিষয়বস্তু ও বিশেষ তথ্য |
বৌ-ঠাকুরাণীর হাট | ১৮৮৩ | প্রথম রচিত উপন্যাস। ঐতিহাসিক পটভূমি। |
রাজর্ষি | ১৮৮৭ | ঐতিহাসিক। পরে 'বিসর্জন' নাটকের ভিত্তি। |
চোখের বালি | ১৯০৩ | মনস্তাত্ত্বিক। বিধবা বিনোদিনীর জীবনদ্বন্দ্ব। |
নৌকাডুবি | ১৯০৬ | সামাজিক। পরিচয়ের বিভ্রম ও ভাগ্যের টানাপোড়েন। |
প্রজাপতির নির্বন্ধ | ১৯০৮ | সামাজিক। |
গোরা | ১৯১০ | সামাজিক-দার্শনিক। জাতীয়তাবাদ বনাম মানবতাবাদ। সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস। |
ঘরে বাইরে | ১৯১৬ | রাজনৈতিক। স্বদেশী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপ ত্রিভুজ। |
চতুরঙ্গ | ১৯১৬ | মনস্তাত্ত্বিক। ছোট উপন্যাস। |
যোগাযোগ | ১৯২৯ | সামাজিক। কুমুদিনীর বৈবাহিক জীবনের যন্ত্রণা। |
শেষের কবিতা | ১৯২৯ | রোমান্টিক। কবিতাময় গদ্যে লেখা। অমিত-লাবণ্য প্রেম। |
দুই বোন | ১৯৩৩ | মনস্তাত্ত্বিক। পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা। |
মালঞ্চ | ১৯৩৪ | সামাজিক। |
চার অধ্যায় | ১৯৩৪ | বিপ্লব ও প্রেমের দ্বন্দ্ব। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান। |
★ রবীন্দ্রনাথের মোট উপন্যাস: ১৩টি। প্রথম: বৌ-ঠাকুরাণীর হাট (১৮৮৩)। শেষ: চার অধ্যায় (১৯৩৪)। সবচেয়ে বড়: গোরা।
⚡ 'শেষের কবিতা' উপন্যাস কিন্তু গদ্যে লেখা — তবে এর ভেতরে অনেক কবিতা আছে। অমিত রায় ও লাবণ্যের প্রেম বিখ্যাত।
⚡ 'গোরা' উপন্যাসে গোরা আসলে আইরিশ দম্পতির সন্তান — এই রহস্য পরে উন্মোচিত হয়। তাই গোরার উগ্র হিন্দুত্ব একটি বিড়ম্বনায় পরিণত হয়।
কাহিনিসংক্ষেপ — গোরা
✍
উনিশ শতকের কলকাতা। গোরাউরী চন্দ্রপাল, সংক্ষেপে গোরা — উগ্র হিন্দুত্ববাদী তরুণ। হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি তার অন্ধ আবেগ। তার বন্ধু বিনয় ব্রাহ্মণ সুচরিতার প্রেমে পড়ে এবং ব্রাহ্ম সমাজের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। গোরাও সুচরিতার বোন ললিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়।
গল্পের চমৎকার মোড় আসে শেষে — গোরা জানতে পারে সে আসলে ব্রিটিশ আইরিশ পিতামাতার সন্তান! একজন হিন্দু দম্পতি তাকে পালক সন্তান হিসেবে মানুষ করেছে। যে গোরা জাতি-ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্বিত ছিল, সে আসলে সেই জাতির নয়। এই সত্য উন্মোচনের পর গোরার মুক্তি ঘটে — সে উপলব্ধি করে, সব মানুষই এক।
কাহিনিসংক্ষেপ — ঘরে বাইরে
✍
স্বদেশী আন্দোলনের যুগ। নিখিলেশ একজন আদর্শবাদী জমিদার, তার স্ত্রী বিমলা গৃহবন্দিনী। নিখিলেশ চান বিমলা স্বাধীনচেতা হোক, তাই বন্ধু সন্দীপকে ঘরে আনেন। বাগ্মী ও উদ্দীপনামূলক সন্দীপের স্বদেশী বক্তৃতায় বিমলা মুগ্ধ হয়ে পড়ে — প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সন্দীপ আসলে সুবিধাবাদী — সে বিমলার কাছ থেকে অর্থও নেয়। স্বদেশী আন্দোলনের মোহভঙ্গের মধ্য দিয়ে বিমলা বুঝতে পারে কে সত্যিকারের মানুষ। নিখিলেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় আহত হন। বিমলার অনুশোচনা ও আত্মোপলব্ধিতে উপন্যাস শেষ হয়।
কাহিনিসংক্ষেপ — চোখের বালি
✍
বিনোদিনী এক যুবতী বিধবা — জীবনের প্রতি তার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। মহেন্দ্র নামে এক যুবক তার বন্ধু বিহারীকে নিয়ে বিনোদিনীর সংসারে আসে। বিনোদিনী মহেন্দ্রকে প্রলুব্ধ করে, মহেন্দ্রের স্ত্রী আশালতা কষ্ট পায়। পরে বিনোদিনী বিহারীকে ভালোবাসে। এই চতুর্ভুজ সম্পর্কে 'চোখের বালি' মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের এক মাস্টারপিস। বিধবার প্রতি সমাজের অবিচার রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছেন।
পঞ্চম পর্ব: শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — জনপ্রিয়তার রাজা
জন্ম: ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬, দেবানন্দপুর, হুগলি | মৃত্যু: ১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তাঁকে বলা হয় 'অপরাজেয় কথাশিল্পী'। সমাজের বঞ্চিত মানুষ, বিধবা নারী, প্রেম ও মানবিক মর্যাদার সংগ্রাম তাঁর উপন্যাসের প্রধান বিষয়।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাস তালিকা
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
বড়দিদি | ১৯১৩ | প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। |
বিরাজ বৌ | ১৯১৪ | বাংলার গ্রামীণ জীবন। |
পরিণীতা | ১৯১৪ | বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস। শেখর-ললিতার প্রেম। |
পল্লীসমাজ | ১৯১৬ | গ্রামীণ সমাজের সংস্কার ও ষড়যন্ত্র। |
চরিত্রহীন | ১৯১৭ | বিতর্কিত। নারীর অধিকার ও সমাজের কপটতা। |
দেবদাস | ১৯১৭ | অমর প্রেমের গল্প। দেবদাস-পারো-চন্দ্রমুখী। সবচেয়ে বিখ্যাত। |
মেজদিদি | ১৯১৫ | পারিবারিক সম্পর্ক। |
দত্তা | ১৯১৮ | সামাজিক। |
শ্রীকান্ত (৪ খণ্ড) | ১৯১৭-১৯৩৩ | আত্মজীবনীমূলক ধারার মহাকাব্যিক উপন্যাস। সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা। |
গৃহদাহ | ১৯২০ | মনস্তাত্ত্বিক। মহিম-অচলা-সুরেশ ত্রিভুজ। |
দেনা পাওনা | ১৯২৩ | সামাজিক। |
পথের দাবী | ১৯২৬ | রাজনৈতিক। বিপ্লবী সব্যসাচী (ডাক্তার) চরিত্র। ব্রিটিশরা নিষিদ্ধ করেছিল। |
বিপ্রদাস | ১৯৩৫ | সামাজিক। |
শেষ প্রশ্ন | ১৯৩১ | সামাজিক। নারীমুক্তি ও ভালোবাসার স্বরূপ। |
★ শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস: দেবদাস। সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা: শ্রীকান্ত (৪ খণ্ড)। ব্রিটিশ কর্তৃক নিষিদ্ধ: পথের দাবী।
⚡ 'পথের দাবী' উপন্যাসের সব্যসাচী মল্লিক চরিত্র ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীর প্রতীক। এই বইটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল।
⚡ 'দেবদাস' উপন্যাসে তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র: দেবদাস (নায়ক), পারো (শৈশবের প্রেম), চন্দ্রমুখী (বারবণিতা, প্রকৃত প্রেম)।
কাহিনিসংক্ষেপ — দেবদাস
✍
দেবদাস আর পারো ছোটবেলার বন্ধু, বড় হয়ে প্রেম। পারো চায় তাদের বিয়ে হোক, কিন্তু দেবদাসের পরিবার রাজি নয় — পারোর পরিবার নিচু শ্রেণির। দেবদাস ভালোবাসে, কিন্তু মেরুদণ্ডহীন। সে পারোকে ছেড়ে যায়। পারো অন্যত্র বিবাহিত হয়, দেবদাস মদের নেশায় ডুবে যায়।
কলকাতায় গিয়ে দেবদাস বারবণিতা চন্দ্রমুখীর প্রেমে পড়ে। চন্দ্রমুখী তাকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসে। কিন্তু দেবদাসের আত্মধ্বংসী জীবনযাপন চলতে থাকে। অ্যালকোহল তাকে শেষ করে দেয়। মৃত্যুর আগে সে পারোকে একবার দেখার জন্য তার বাড়ির সামনে পৌঁছায় এবং সেখানেই মারা যায়। প্রেমের এই ট্র্যাজেডি বাংলা সাহিত্যের অমর কাহিনি।
কাহিনিসংক্ষেপ — শ্রীকান্ত
✍
শ্রীকান্ত এক মুক্তিপিপাসু তরুণ। চার খণ্ডে বিভক্ত এই মহাউপন্যাসে শ্রীকান্তের দীর্ঘ জীবনযাপন চিত্রিত। প্রথম খণ্ডে রাজলক্ষ্মী নামে এক বারবণিতার সাথে পরিচয় ও তার প্রতি ভালোবাসা। দ্বিতীয় খণ্ডে বর্মায় গিয়ে অভিনব অভিজ্ঞতা। তৃতীয় ও চতুর্থ খণ্ডে পাইথলার সাথে সম্পর্ক। শেষে রাজলক্ষ্মীর কাছে ফিরে আসা। শরৎচন্দ্রের নিজের জীবনের অনেকটাই এই উপন্যাসে আছে বলে মনে করা হয়।
ষষ্ঠ পর্ব: বিভূতিভূষণ · মানিক · তারাশঙ্কর
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০)
বিভূতিভূষণ বাংলা সাহিত্যের প্রকৃতিপ্রেমী লেখক। তাঁর লেখায় গ্রামবাংলার প্রকৃতি অপূর্ব মনোরম। 'পথের পাঁচালী' তাঁর শ্রেষ্ঠকর্ম।
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
পথের পাঁচালী | ১৯২৯ | অপু-দুর্গার শৈশব কাহিনি। সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের ভিত্তি। |
অপরাজিত | ১৯৩১-৩২ | পথের পাঁচালীর সিক্যুয়েল। অপুর যৌবন থেকে পরিপক্বতা। |
আরণ্যক | ১৯৩৯ | বনজীবনের অসাধারণ বর্ণনা। প্রকৃতিপ্রেম ও মানববিচ্ছেদ। |
আদর্শ হিন্দু হোটেল | ১৯৪০ | হাজারি ঠাকুরের জীবনসংগ্রাম। |
ইছামতী | ১৯৫০ | ইছামতী নদীকে কেন্দ্র করে কাহিনি। |
★ 'পথের পাঁচালী' (১৯২৯) বিভূতিভূষণের সেরা রচনা এবং এর উপর সত্যজিৎ রায় অস্কার-মনোনীত চলচ্চিত্র বানিয়েছেন।
কাহিনিসংক্ষেপ — পথের পাঁচালী
✍
বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম নিশ্চিন্দিপুর। হরিহর রায় গরিব ব্রাহ্মণ — স্বপ্নবিলাসী, ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল। তার স্ত্রী সর্বজয়া সংসার টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের দুই সন্তান — দুর্গা ও অপু। বৃদ্ধা ইন্দির ঠাকুরণ পরিবারের সদস্য না হয়েও এখানেই বাস করে।
দুর্গা ও অপুর শৈশব কাটে প্রকৃতির কোলে — বন-বাদাড়, পুকুর, মাঠ। দুর্গা দুষ্টু, প্রাণবন্ত। অপু কল্পনাপ্রিয়। দুর্গা বর্ষায় ভিজে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। ইন্দির ঠাকুরণও মারা যায় না খেয়ে। হরিহর ভাগ্য অন্বেষণে বাইরে যায়। ফিরে এসে মেয়ের মৃত্যুসংবাদ পায়। অবশেষে সপরিবারে গ্রাম ছেড়ে কাশীর পথে রওয়ানা দেয় — পথের পাঁচালি শুরু হয় নতুন গন্তব্যের দিকে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬)
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন মার্কসবাদী ও ফ্রয়েডিয় মনস্তত্ত্বের লেখক। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁর উপন্যাসে নির্মোহভাবে চিত্রিত।
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
দিবারাত্রির কাব্য | ১৯৩৫ | প্রথম উপন্যাস। ফ্রয়েডিয় মনস্তত্ত্ব। |
পুতুলনাচের ইতিকথা | ১৯৩৬ | শ্রেষ্ঠকর্ম। গ্রামীণ জীবনের যৌনতা ও মৃত্যুবোধ। শশী ডাক্তার কেন্দ্রীয় চরিত্র। |
পদ্মানদীর মাঝি | ১৯৩৬ | জেলেজীবনের করুণ কাহিনি। কুবের-কপিলার প্রেম। |
শহরতলি | ১৯৪০-৪১ | নগরজীবনের সংকট। |
চিহ্ন | ১৯৪৭ | সামাজিক। |
★ 'পদ্মানদীর মাঝি' মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সর্বাধিক পঠিত উপন্যাস। কুবের ও কপিলার প্রেম এবং হোসেন মিয়ার প্রলোভন বিখ্যাত।
⚡ 'পুতুলনাচের ইতিকথা' — মানুষের জীবন পুতুলের মতো ভাগ্যের হাতে নাচে, এই দার্শনিক থিমে লেখা। শশী ডাক্তার কেন্দ্রীয় চরিত্র।
কাহিনিসংক্ষেপ — পদ্মানদীর মাঝি
✍
পদ্মার পারে জেলেপাড়া। কুবের একজন গরিব মাঝি। তার সংসার আছে, কিন্তু সুখ নেই। কপিলা নামে এক মেয়ের সাথে তার টানাটানি — প্রেম না আসক্তি? এর মধ্যে আসে হোসেন মিয়া — এক রহস্যময় ধনী মানুষ। সে কুবেরকে প্রলুব্ধ করে ময়নাদ্বীপে যেতে — সেখানে নাকি অনেক সুখ। কুবের যায়, কপিলাও যায়। কিন্তু ময়নাদ্বীপ আসলে এক বন্দিশালা — হোসেন মিয়া সেখানে সস্তায় শ্রম নিয়োগ করে। কুবের বুঝতে পারে সে ফাঁদে পড়েছে। কিন্তু ফেরার পথ নেই।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)
তারাশঙ্কর বাঁকুড়া-বীরভূম অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনকে তুলে ধরেছেন। নিম্নবর্গের মানুষের সংগ্রাম তাঁর উপন্যাসের মূল সুর।
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
ধাত্রীদেবতা | ১৯৩৯ | গ্রামীণ দেবতা ও সমাজের ছবি। |
গণদেবতা | ১৯৪৩ | সেরা উপন্যাস। গ্রামীণ গণমানুষের সংগ্রাম। সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার। |
পঞ্চগ্রাম | ১৯৪৪ | গণদেবতার সিক্যুয়েল। |
কবি | ১৯৪৩ | বাউল-কবিওয়ালার জীবন। নিতাই চরিত্র। |
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা | ১৯৪৭ | কাহার সম্প্রদায়ের জীবন। বনোয়ারি চরিত্র বিখ্যাত। |
আরোগ্য নিকেতন | ১৯৫২ | জীবনমশাই চরিত্র। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ও পরিবর্তনের দ্বন্দ্ব। |
সপ্তপদী | ১৯৫২ | হিন্দু-মুসলিম প্রেম কাহিনি। |
★ 'গণদেবতা' তারাশঙ্করের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা এবং এটি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছে। 'হাঁসুলী বাঁকের উপকথা' আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
সপ্তম পর্ব: বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক ও তাঁদের উপন্যাস
মীর মশাররফ হোসেন — বিষাদ সিন্ধু
বিষয় | তথ্য |
লেখক | মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১২) |
প্রকাশকাল | ১৮৮৫-১৮৯১ (তিন খণ্ডে) |
বিষয়বস্তু | কারবালার যুদ্ধ ও হযরত ইমাম হোসাইনের শাহাদতের ঘটনা |
বিশেষত্ব | বাংলা মুসলিম সাহিত্যের মহাকাব্যিক উপন্যাস। ইতিহাস ও আবেগের অনন্য মিশ্রণ। |
গুরুত্ব | মুসলিম বাঙালি লেখকদের মধ্যে প্রথম উল্লেখযোগ্য ঔপন্যাসিক। |
★ 'বিষাদ সিন্ধু' বাংলা সাহিত্যের একমাত্র উপন্যাস যা কারবালার ঘটনা অবলম্বনে লেখা এবং মুসলিম পাঠকদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
✍ কাহিনিসংক্ষেপ — বিষাদ সিন্ধু:
ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের হত্যার পর এজিদ ক্ষমতা দখল করে। কারবালার মাঠে হযরত মুহম্মদ (স)-এর নাতি হযরত ইমাম হোসাইন (রা) তাঁর পরিবার নিয়ে এজিদের বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়ান। অসম যুদ্ধে তারা সবাই শহিদ হন। এই মর্মান্তিক ঘটনাকে মীর মশাররফ হোসেন বাংলায় অনুপম সাহিত্যে রূপান্তরিত করেছেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) — লালসালু
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
লালসালু | ১৯৪৮ | শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। ধর্মীয় প্রতারণা ও গ্রামীণ সমাজ। মজিদ চরিত্র। |
চাঁদের অমাবস্যা | ১৯৬৪ | অস্তিত্ববাদী। ইউসুফ চরিত্র। |
কাঁদো নদী কাঁদো | ১৯৬৮ | প্রতীকী। মানবিক আকাঙ্ক্ষা ও বিষণ্নতার উপন্যাস। |
✍ কাহিনিসংক্ষেপ — লালসালু:
মজিদ এক ধূর্ত ধর্মব্যবসায়ী। সে একটি গ্রামে এসে এক মৃত পীরের মাজার 'আবিষ্কার' করে। লাল সালু (কাপড়) দিয়ে মাজার ঢেকে মানুষকে বিশ্বাস করায় এটি পবিত্র। গ্রামের সরল মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে সে ক্ষমতা ও অর্থ দুটোই পায়। প্রথম স্ত্রী রহিমা নীরবে কষ্ট ভোগ করে। মজিদ দ্বিতীয় স্ত্রী আনে — জমিলা। কিন্তু জমিলা মজিদের মিথ্যা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। উপন্যাসের শেষে মজিদের ভেতর ভয় ও অনিশ্চয়তা জমে ওঠে।
⚡ 'লালসালু' (১৯৪৮) বাংলাদেশের সাহিত্যে অস্তিত্ববাদ ও ধর্মীয় প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রথম শক্তিশালী উপন্যাস।
জহির রায়হান (১৯৩৫-১৯৭২) — হাজার বছর ধরে
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
হাজার বছর ধরে | ১৯৬৪ | আদম আলী ও মতি চরিত্র। গ্রামীণ জীবন ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বাংলা একাডেমি পুরস্কার। |
আরেক ফাল্গুন | ১৯৬৮ | ভাষা আন্দোলনভিত্তিক। (পূর্বের অধ্যায়ে আলোচিত) |
বরফ গলা নদী | ১৯৬৯ | সামাজিক। |
আর কতদিন | ১৯৭০ | সামাজিক। |
★ জহির রায়হানের 'হাজার বছর ধরে' বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৪) পায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হন (১৯৭২)।
✍ কাহিনিসংক্ষেপ — হাজার বছর ধরে:
বাংলার এক গ্রামে আদম আলী বছরের পর বছর একই রুটিনে জীবন কাটায়। তার স্ত্রী মতি। জীবনের একঘেয়েমি, দারিদ্র্য, প্রতিদিনের সংগ্রাম — সব মিলিয়ে হাজার বছর ধরে এই ভূখণ্ডের মানুষ যেভাবে জীবন কাটিয়েছে, সেই চিরন্তন বাস্তবতাই এই উপন্যাসের বিষয়।
শওকত ওসমান (১৯১৭-১৯৯৮)
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
জননী | ১৯৫৮ | গ্রামীণ মায়ের জীবনসংগ্রাম। |
ক্রীতদাসের হাসি | ১৯৬২ | সামাজিক-রাজনৈতিক রূপকথা। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতীকী উপন্যাস। |
দুই সৈনিক | ১৯৭৩ | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। |
নেকড়ে অরণ্য | ১৯৭৩ | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। |
⚡ 'ক্রীতদাসের হাসি' হারুন-উর-রশিদের সময়ের গল্প হলেও আসলে এটি পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের প্রতি বিদ্রূপ।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)
উপন্যাসের নাম | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
চিলেকোঠার সেপাই | ১৯৮৬ | ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি। আবুল খায়ের চরিত্র। বাংলা একাডেমি পুরস্কার। |
খোয়াবনামা | ১৯৯৬ | দেশভাগের ইতিহাস ও তেভাগা আন্দোলনের পটভূমি। সেরা উপন্যাস। |
★ আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক। 'খোয়াবনামা' তাঁর মাস্টারপিস।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক
লেখক | জীবনকাল | বিখ্যাত উপন্যাস | বিশেষ তথ্য |
আবু ইসহাক | ১৯২৬-২০০৩ | সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৫৫) | মুসলিম নারীর জীবন। |
শহীদুল্লাহ কায়সার | ১৯২৭-১৯৭১ | সারেং বৌ, সংশপ্তক | মুক্তিযুদ্ধে শহিদ। |
আলাউদ্দিন আল আজাদ | ১৯৩২-২০০৯ | তেইশ নম্বর তৈলচিত্র | ভাষাসৈনিক। |
রশীদ করীম | ১৯২৫-২০১১ | উত্তম পুরুষ (১৯৬১) | প্রথম পুরুষে লেখা। |
সেলিনা হোসেন | ১৯৪৭-বর্তমান | হাঙর নদী গ্রেনেড (১৯৭৬) | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। |
হুমায়ূন আহমেদ | ১৯৪৮-২০১২ | নন্দিত নরকে, মিসির আলি সিরিজ | বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম লেখক। |
মাহমুদুল হক | ১৯৪০-২০০৮ | কালো বরফ (১৯৭৭) | মুক্তিযুদ্ধ ও দেশভাগ। |
হাসান আজিজুল হক | ১৯৩৯-২০২১ | আগুনপাখি (২০০৬) | দেশভাগের বেদনা। |
ইমদাদুল হক মিলন | ১৯৫৫-বর্তমান | নূরজাহান (১৯৯৫) | জনপ্রিয় ধারার লেখক। |
✍ কাহিনিসংক্ষেপ — সূর্য দীঘল বাড়ী (আবু ইসহাক):
চল্লিশের দশকে বাংলার এক গ্রামে মোসলেম মায়ের কাহিনি। তার স্বামী চলে যাওয়ার পর সে একা সন্তানদের নিয়ে থাকে 'সূর্য দীঘল বাড়ি'তে — যেখানে নানা কুসংস্কার, পরচর্চা, দারিদ্র্য। সে সব সহ্য করে বেঁচে থাকে। একজন মুসলিম নারীর মরিয়া জীবনসংগ্রামের এই গল্প বাস্তববাদী সাহিত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
✍ কাহিনিসংক্ষেপ — হাঙর নদী গ্রেনেড (সেলিনা হোসেন):
মুক্তিযুদ্ধের সময়। বুড়ি নামে এক মা তার পাগল ছেলে বুধাকে নিয়ে বাস করে। মুক্তিযোদ্ধারা বুধার বাড়িতে আশ্রয় নেয়। পাকবাহিনী সন্ধান পেয়ে ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতে গিয়ে বুধা একটি গ্রেনেড বুকে নিয়ে শহিদ হয়। মায়ের সন্তানকে হারানোর বেদনা ও মুক্তির মূল্য — এই হলো উপন্যাসের মর্মবস্তু।
অষ্টম পর্ব: ট্রিকি ও অজানা তথ্য
⚡ ট্রিক ১: বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস → আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮) — প্যারীচাঁদ মিত্র (টেকচাঁদ ঠাকুর ছদ্মনামে)। প্রথম সার্থক উপন্যাস → দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) — বঙ্কিমচন্দ্র।
⚡ ট্রিক ২: রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপন্যাস 'বৌ-ঠাকুরাণীর হাট' (১৮৮৩), শেষ উপন্যাস 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪)।
⚡ ট্রিক ৩: শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী' ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। বঙ্কিমের 'আনন্দমঠ'ও ব্রিটিশ আমলে নিষিদ্ধ ছিল।
⚡ ট্রিক ৪: 'গোরা' → রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস। 'শেষের কবিতা' → গদ্যে লেখা রোমান্টিক উপন্যাস, তবে ভেতরে কবিতা আছে।
⚡ ট্রিক ৫: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরো নাম প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। 'মানিক' ছিল ডাকনাম।
⚡ ট্রিক ৬: বিভূতিভূষণের 'পথের পাঁচালী' (১৯২৯) → অপু ট্রিলজির প্রথম। 'অপরাজিত' (১৯৩১) → দ্বিতীয়। 'অপুর সংসার' → তৃতীয় (সত্যজিতের চলচ্চিত্র)।
⚡ ট্রিক ৭: শহীদুল্লাহ কায়সার রচিত 'সংশপ্তক' মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এবং 'সারেং বৌ' সমুদ্রযাত্রীর জীবন নিয়ে। তিনি ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যার শিকার।
⚡ ট্রিক ৮: হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে' (১৯৭২)। তাঁর জনপ্রিয় চরিত্র: হিমু, মিসির আলি।
⚡ ট্রিক ৯: রশীদ করীমের 'উত্তম পুরুষ' বাংলাদেশের প্রথম উপন্যাস যা প্রথম পুরুষে (আমি) লেখা।
⚡ ট্রিক ১০: তারাশঙ্করের 'গণদেবতা' সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পায়। এই পুরস্কার বাংলা একাডেমি পুরস্কার থেকে আলাদা।
⚡ ট্রিক ১১: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ ফ্রান্সে কর্মরত অবস্থায় মারা যান (১৯৭১)। তাঁর 'লালসালু' ফরাসি, জার্মান ভাষায় অনূদিত।
⚡ ট্রিক ১২: মীর মশাররফ হোসেন প্রথম বাঙালি মুসলিম ঔপন্যাসিক। তাঁর 'বিষাদ সিন্ধু' (১৮৮৫-৯১) সবচেয়ে বেশি পঠিত মুসলিম সাহিত্যকর্ম।
⚡ ট্রিক ১৩: জহির রায়হান একাধারে ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার। 'জীবন থেকে নেওয়া' তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র।
⚡ ট্রিক ১৪: বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম রচনা ছিল ইংরেজিতে — 'Rajmohan's Wife' (১৮৬৪)। এটি ছিল একটি ইংরেজি উপন্যাস।
⚡ ট্রিক ১৫: 'চোখের বালি' উপন্যাসে বিনোদিনী চরিত্র রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে জটিল নারী চরিত্রগুলোর একটি — সে ভিলেন নাকি ভিকটিম?
নবম পর্ব: MCQ অনুশীলন
1. বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস কোনটি?
(ক) আলালের ঘরের দুলাল
(খ) দুর্গেশনন্দিনী
(গ) কপালকুণ্ডলা
(ঘ) বিষবৃক্ষ
✔ সঠিক উত্তর: (খ) দুর্গেশনন্দিনী — বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৬৫)
2. বাংলা উপন্যাসের জনক কে?
(ক) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
(খ) প্যারীচাঁদ মিত্র
(গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
(ঘ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
✔ সঠিক উত্তর: (গ) বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
3. 'আনন্দমঠ' উপন্যাসে কোন বিখ্যাত গানটি আছে?
(ক) জন গণ মন
(খ) বন্দে মাতরম
(গ) আমার সোনার বাংলা
(ঘ) আমার ভাইয়ের রক্তে
✔ সঠিক উত্তর: (খ) বন্দে মাতরম
4. শরৎচন্দ্রের কোন উপন্যাসটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল?
(ক) দেবদাস
(খ) চরিত্রহীন
(গ) পথের দাবী
(ঘ) শ্রীকান্ত
✔ সঠিক উত্তর: (গ) পথের দাবী (১৯২৬)
5. 'দেবদাস' উপন্যাসের তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনটি?
(ক) দেবদাস-রাধা-কৃষ্ণ
(খ) দেবদাস-পারো-চন্দ্রমুখী
(গ) দেবদাস-অনুরাধা-বিজয়া
(ঘ) দেবদাস-বিলাস-কামিনী
✔ সঠিক উত্তর: (খ) দেবদাস-পারো-চন্দ্রমুখী
6. 'গোরা' উপন্যাসে গোরা আসলে কোন বংশের সন্তান?
(ক) হিন্দু ব্রাহ্মণ
(খ) মুসলিম
(গ) বৌদ্ধ
(ঘ) আইরিশ (ইউরোপীয়)
✔ সঠিক উত্তর: (ঘ) আইরিশ (ইউরোপীয়) বংশের সন্তান — হিন্দু পরিবারে পালিত
7. 'লালসালু' উপন্যাসের রচয়িতা কে?
(ক) আবু ইসহাক
(খ) শওকত ওসমান
(গ) জহির রায়হান
(ঘ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
✔ সঠিক উত্তর: (ঘ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯৪৮)
8. 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ভাই-বোন দুটির নাম কী?
(ক) নিতাই-বিলু
(খ) অপু-দুর্গা
(গ) হরি-কালি
(ঘ) শ্যামু-রানু
✔ সঠিক উত্তর: (খ) অপু ও দুর্গা
9. 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
(খ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
✔ সঠিক উত্তর: (গ) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
10. 'হাজার বছর ধরে' উপন্যাসটি কে লিখেছেন?
(ক) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
(খ) জহির রায়হান
(গ) শওকত ওসমান
(ঘ) আবু ইসহাক
✔ সঠিক উত্তর: (খ) জহির রায়হান (১৯৬৪), বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী
11. 'বিষাদ সিন্ধু' কোন বিষয়বস্তুর উপর লেখা?
(ক) ভাষা আন্দোলন
(খ) মুক্তিযুদ্ধ
(গ) কারবালার যুদ্ধ
(ঘ) সিপাহী বিদ্রোহ
✔ সঠিক উত্তর: (গ) কারবালার যুদ্ধ ও ইমাম হোসাইনের শাহাদত
12. রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস কোনটি?
(ক) ঘরে বাইরে
(খ) গোরা
(গ) শেষের কবিতা
(ঘ) চোখের বালি
✔ সঠিক উত্তর: (খ) গোরা
13. 'চিলেকোঠার সেপাই' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) হুমায়ূন আহমেদ
(খ) শওকত ওসমান
(গ) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
(ঘ) সেলিনা হোসেন
✔ সঠিক উত্তর: (গ) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
14. 'হাঙর নদী গ্রেনেড' উপন্যাসটি কোন বিষয়ে?
(ক) ভাষা আন্দোলন
(খ) মুক্তিযুদ্ধ
(গ) দেশভাগ
(ঘ) তেভাগা আন্দোলন
✔ সঠিক উত্তর: (খ) মুক্তিযুদ্ধ — সেলিনা হোসেন রচিত
15. বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম রচনা কোন ভাষায় লেখা?
(ক) বাংলা
(খ) সংস্কৃত
(গ) উর্দু
(ঘ) ইংরেজি
✔ সঠিক উত্তর: (ঘ) ইংরেজি — 'Rajmohan's Wife' (১৮৬৪)
16. 'শেষের কবিতা' উপন্যাসের দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনটি?
(ক) অমিত-সুচরিতা
(খ) অমিত-লাবণ্য
(গ) নিখিলেশ-বিমলা
(ঘ) মহেন্দ্র-বিনোদিনী
✔ সঠিক উত্তর: (খ) অমিত রায় ও লাবণ্য
17. 'সূর্য দীঘল বাড়ী' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) শওকত ওসমান
(খ) জহির রায়হান
(গ) আবু ইসহাক
(ঘ) রশীদ করীম
✔ সঠিক উত্তর: (গ) আবু ইসহাক (১৯৫৫)
18. মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস কোনটি?
(ক) পুতুলনাচের ইতিকথা
(খ) পদ্মানদীর মাঝি
(গ) দিবারাত্রির কাব্য
(ঘ) শহরতলি
✔ সঠিক উত্তর: (গ) দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫)
19. 'গণদেবতা' উপন্যাস কে লিখেছেন?
(ক) বিভূতিভূষণ
(খ) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) সত্যেন সেন
✔ সঠিক উত্তর: (গ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় — সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার বিজয়ী
20. 'ক্রীতদাসের হাসি' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) আলাউদ্দিন আল আজাদ
(খ) শওকত ওসমান
(গ) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
(ঘ) জহির রায়হান
✔ সঠিক উত্তর: (খ) শওকত ওসমান (১৯৬২)
21. রবীন্দ্রনাথের 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসের তিনটি কেন্দ্রীয় চরিত্র কোনগুলো?
(ক) গোরা-সুচরিতা-পানুবাবু
(খ) নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপ
(গ) মহেন্দ্র-আশালতা-বিনোদিনী
(ঘ) অমিত-লাবণ্য-কেতকী
✔ সঠিক উত্তর: (খ) নিখিলেশ-বিমলা-সন্দীপ
22. হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস কোনটি?
(ক) শঙ্খনীল কারাগার
(খ) নন্দিত নরকে
(গ) আগুনের পরশমণি
(ঘ) জোছনা ও জননীর গল্প
✔ সঠিক উত্তর: (খ) নন্দিত নরকে (১৯৭২)
23. 'খোয়াবনামা' উপন্যাসের পটভূমি কী?
(ক) মুক্তিযুদ্ধ
(খ) ভাষা আন্দোলন
(গ) দেশভাগ ও তেভাগা আন্দোলন
(ঘ) গণঅভ্যুত্থান
✔ সঠিক উত্তর: (গ) দেশভাগ ও তেভাগা আন্দোলন — আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
24. 'কাঁদো নদী কাঁদো' কার লেখা?
(ক) জহির রায়হান
(খ) শওকত ওসমান
(গ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
(ঘ) আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
✔ সঠিক উত্তর: (গ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯৬৮)
25. 'আরণ্যক' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
(খ) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
(গ) তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
(ঘ) বঙ্কিমচন্দ্র
✔ সঠিক উত্তর: (খ) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯৩৯)
26. বঙ্কিমচন্দ্রের মোট উপন্যাসের সংখ্যা কত?
(ক) ১২
(খ) ১৩
(গ) ১৪
(ঘ) ১৫
✔ সঠিক উত্তর: (গ) ১৪টি
27. রবীন্দ্রনাথের কোন উপন্যাস স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত?
(ক) গোরা
(খ) চোখের বালি
(গ) ঘরে বাইরে
(ঘ) যোগাযোগ
✔ সঠিক উত্তর: (গ) ঘরে বাইরে (১৯১৬)
28. 'সংশপ্তক' উপন্যাসের লেখক কে?
(ক) জহির রায়হান
(খ) শহীদুল্লাহ কায়সার
(গ) রশীদ করীম
(ঘ) আবু ইসহাক
✔ সঠিক উত্তর: (খ) শহীদুল্লাহ কায়সার
29. 'পুতুলনাচের ইতিকথা' উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র কে?
(ক) কুবের
(খ) হারু ঘোষ
(গ) শশী ডাক্তার
(ঘ) বনোয়ারি
✔ সঠিক উত্তর: (গ) শশী ডাক্তার
30. 'আগুনপাখি' উপন্যাসটি কে লিখেছেন?
(ক) সেলিনা হোসেন
(খ) হাসান আজিজুল হক
(গ) মাহমুদুল হক
(ঘ) ইমদাদুল হক মিলন
✔ সঠিক উত্তর: (খ) হাসান আজিজুল হক (২০০৬)
দশম পর্ব: সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর
প্র-1: বাংলা উপন্যাসের ক্রমবিকাশে বঙ্কিমচন্দ্রের ভূমিকা কী?
উ: বঙ্কিমচন্দ্র বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস রচনা করেন (দুর্গেশনন্দিনী, ১৮৬৫)। তাঁর ১৪টি উপন্যাসে রোমান্টিকতা, ঐতিহাসিকতা, সামাজিকতা ও জাতীয়তাবাদ এক অনন্য সমন্বয় তৈরি করেছে। তিনি আধুনিক বাংলা উপন্যাসের ভিত্তি গড়েছেন।
প্র-2: রবীন্দ্রনাথের 'গোরা' উপন্যাসের মূল বিষয় কী?
উ: জাতীয়তাবাদ বনাম মানবতাবাদের দ্বন্দ্ব। গোরা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী, কিন্তু শেষে জানে সে আইরিশ পিতামাতার সন্তান। এই সত্য তাকে মুক্তি দেয় — সে বুঝতে পারে মানুষের পরিচয় জাতি বা ধর্মে নয়, মানবতায়।
প্র-3: শরৎচন্দ্রকে 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' কেন বলা হয়?
উ: শরৎচন্দ্রের উপন্যাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাঠকদের মনে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। সমাজের বঞ্চিত মানুষ, বিধবা নারী, পতিত জীবনের মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে অজেয় করে রেখেছে। তাঁর জনপ্রিয়তা কখনো কমেনি, তাই 'অপরাজেয়'।
প্র-4: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর 'লালসালু'-তে মজিদ কী ধরনের চরিত্র?
উ: মজিদ একজন ধূর্ত ধর্মব্যবসায়ী। সে মাজার জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রামের সরল মানুষকে শোষণ করে। কিন্তু ভেতরে সে ভীরু ও অনিশ্চিত। এই চরিত্র ধর্মীয় ভণ্ডামি ও সামাজিক শোষণের প্রতীক।
প্র-5: 'পথের পাঁচালী' ও 'অপরাজিত' উপন্যাস দুটির সম্পর্ক কী?
উ: বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু ট্রিলজির প্রথম দুটি উপন্যাস। 'পথের পাঁচালী'তে অপুর শৈশব ও দুর্গার মৃত্যু। 'অপরাজিত'তে অপুর যৌবন, কলকাতায় আসা ও পরিপক্বতা। দুটোই একসূত্রে গাঁথা।
প্র-6: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মূল বৈশিষ্ট্য কী?
উ: মানিকের সাহিত্যে মার্কসবাদী শ্রেণিসংগ্রাম ও ফ্রয়েডিয় যৌন-মনস্তত্ত্বের সমন্বয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা নির্মোহভাবে চিত্রণ তাঁর বৈশিষ্ট্য। সমাজের নিচুতলার মানুষ — জেলে, কৃষক — তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রে।
প্র-7: 'বিষাদ সিন্ধু' কেন বাংলা সাহিত্যে অনন্য?
উ: মীর মশাররফ হোসেনের এই উপন্যাস ইসলামি ইতিহাস ও ট্র্যাজেডিকে বাংলা সাহিত্যের আলোয় উপস্থাপন করেছে। বাংলা মুসলিম সাহিত্যের প্রথম মহাকাব্যিক উপন্যাস হিসেবে এটি অনন্য।
প্র-8: আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'খোয়াবনামা' কোন প্রেক্ষাপটে লেখা?
উ: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ ও ১৯৪৬-৪৭ সালের তেভাগা কৃষক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। বাংলার গ্রামীণ মানুষের স্বপ্ন, ইতিহাস ও সংগ্রামের মহাকাব্য।
প্র-9: রবীন্দ্রনাথের 'চোখের বালি' উপন্যাসের মূল সমস্যা কী?
উ: বিধবা বিনোদিনীর জীবনের ট্র্যাজেডি। সমাজের বিধবা-প্রথার শিকার বিনোদিনী জীবনের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষী হয়ে ওঠে। মহেন্দ্র, আশালতা ও বিনোদিনীর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাই মূল বিষয়।
প্র-10: জহির রায়হান কীভাবে নিখোঁজ হন?
উ: ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় মিরপুরে নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীদের সন্ধানে গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন। ধারণা করা হয় তিনিও পাকবাহিনীর সহযোগী রাজাকারদের হাতে নিহত হন।
একাদশ পর্ব: মাস্টার রেফারেন্স — সকল তথ্য এক নজরে
বাংলাদেশের উপন্যাস — বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিজয়ী
সাল | লেখক | উপন্যাস |
১৯৬৪ | জহির রায়হান | হাজার বছর ধরে |
১৯৬৭ | সৈয়দ শামসুল হক | খেলারাম খেলে যা |
১৯৮৬ | আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | চিলেকোঠার সেপাই |
গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস ও রচয়িতার মিলকরণ সারণি
উপন্যাস | লেখক | প্রকাশকাল |
দুর্গেশনন্দিনী | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৮৬৫ |
কপালকুণ্ডলা | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৮৬৬ |
আনন্দমঠ | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৮৮২ |
গোরা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯১০ |
ঘরে বাইরে | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯১৬ |
শেষের কবিতা | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | ১৯২৯ |
দেবদাস | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৯১৭ |
শ্রীকান্ত | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৯১৭-৩৩ |
পথের দাবী | শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় | ১৯২৬ |
পথের পাঁচালী | বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯২৯ |
পুতুলনাচের ইতিকথা | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯৩৬ |
পদ্মানদীর মাঝি | মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯৩৬ |
গণদেবতা | তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় | ১৯৪৩ |
বিষাদ সিন্ধু | মীর মশাররফ হোসেন | ১৮৮৫-৯১ |
লালসালু | সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ | ১৯৪৮ |
সূর্য দীঘল বাড়ী | আবু ইসহাক | ১৯৫৫ |
হাজার বছর ধরে | জহির রায়হান | ১৯৬৪ |
চিলেকোঠার সেপাই | আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | ১৯৮৬ |
খোয়াবনামা | আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | ১৯৯৬ |
হাঙর নদী গ্রেনেড | সেলিনা হোসেন | ১৯৭৬ |
নন্দিত নরকে | হুমায়ূন আহমেদ | ১৯৭২ |
❝ উপন্যাস পড়া মানে হাজার মানুষের জীবন বাঁচা — প্রতিটি উপন্যাস একটি পূর্ণ জীবন। ❞