বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু ভূগোল, পরিবেশ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ● অধ্যায় |
সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি ব-দ্বীপীয় রাষ্ট্র যেখানে গাঙ্গেয় ও ব্রহ্মপুত্রীয় প্লাবন সমভূমি, প্লাইস্টোসিন সোপান এবং টারশিয়ারি যুগের ভাঁজবিশিষ্ট পাহাড় মিলিয়ে তিনটি প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক ইউনিটে গঠিত। কর্কটক্রান্তি রেখা দেশের মধ্য দিয়ে গেছে, এবং দেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি (Tropical Monsoon) ধরনের, যেখানে ছয় ঋতুর প্রবাহ এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বার্ষিক গড় ২,৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ভূপ্রকৃতির সাথে জলবায়ুর এই অভিন্ন সম্পর্কই বাংলাদেশের কৃষি, নদী ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ ঝুঁকির মূল নিয়ন্ত্রক।
প্রেক্ষাপট আলোচনা
বাংলাদেশের সমগ্র ভূভাগের প্রায় ৮০ শতাংশই প্লাবন সমভূমি, যা সাম্প্রতিক ভূতাত্ত্বিক যুগে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীবাহিত পলিতে গঠিত। সোপান অঞ্চল মাত্র ৮ শতাংশ, যার মধ্যে রয়েছে রাজশাহী-নওগাঁ অঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধুপুর গড় এবং কুমিল্লার লালমাই পাহাড়। বাকি ১২ শতাংশ পাহাড়ি অঞ্চল মূলত চট্টগ্রাম পার্বত্য তিন জেলা ও সিলেট অঞ্চলে অবস্থিত, যা টারশিয়ারি যুগে হিমালয় উত্থানের সময় ভাঁজ পর্বত হিসেবে গঠিত হয়েছিল।
বাংলাদেশের অবস্থান ২০°৩৪ʹ থেকে ২৬°৩৮ʹ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১ʹ থেকে ৯২°৪১ʹ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩.৫° উত্তর) দেশের ঠিক মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, যা ক্রান্তীয় উষ্ণ জলবায়ু নিশ্চিত করে। ভারত থেকে স্থলসীমা ৪,১৫৬ কিলোমিটার, মিয়ানমার থেকে ২৭১ কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলরেখা ৭১১ কিলোমিটার (Bangladesh Survey Department ২০২২)। দেশের মোট আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার।
জলবায়ুগত দিক থেকে বাংলাদেশ ক্রান্তীয় মৌসুমি অঞ্চলের অন্তর্গত যেখানে উষ্ণ গ্রীষ্ম, ভারী বৃষ্টিপাতের বর্ষা এবং অপেক্ষাকৃত শুষ্ক শীতকাল প্রধান বৈশিষ্ট্য। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২,৩০০ মিলিমিটার হলেও সিলেট অঞ্চলের লালাখাল ও সুনামগঞ্জে ৫,০০০ মিলিমিটারের অধিক বৃষ্টিপাত হয়, যা মেঘালয়ের শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাতের প্রভাবেই হয়। রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত মাত্র ১,৪০০ মিলিমিটারের কাছাকাছি (BMD জলবায়ু পরিসংখ্যান ২০২৩)। তাপমাত্রার এই বিন্যাস ও বৃষ্টিপাতের পার্থক্যই দেশের কৃষিজোন ও ফসল বিন্যাস নির্ধারণ করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান ও মৌলিক পরিসংখ্যান
বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচিতি বুঝতে হলে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ, সীমানা ও আয়তন সম্পর্কে নির্দিষ্ট ধারণা প্রয়োজন। নিচের ছকে দেশের ভৌগোলিক মৌলিক তথ্য সমন্বিতভাবে উপস্থাপন করা হলো।
🗺 বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচিতি অক্ষাংশ: ২০°৩৪ʹ থেকে ২৬°৩৮ʹ উত্তর দ্রাঘিমাংশ: ৮৮°০১ʹ থেকে ৯২°৪১ʹ পূর্ব কর্কটক্রান্তি রেখা: ২৩.৫° উত্তর অক্ষাংশ বরাবর দেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে মোট আয়তন: ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার (BBS ২০২৩) ভারত সীমান্ত: ৪,১৫৬ কিলোমিটার (Land Border Agreement ২০১৫ পরবর্তী চূড়ান্ত) মিয়ানমার সীমান্ত: ২৭১ কিলোমিটার উপকূলরেখা: ৭১১ কিলোমিটার (বঙ্গোপসাগর) সামুদ্রিক এলাকা: ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার (ITLOS ২০১২ ও PCA ২০১৪ রায়ের পর) প্রশাসনিক বিভাগ: ৮টি; জেলা ৬৪টি; উপজেলা ৪৯৫টি প্রতিবেশী দেশ: ভারত (পশ্চিম, উত্তর, পূর্ব), মিয়ানমার (দক্ষিণ-পূর্ব) |
কর্কটক্রান্তি রেখা বাংলাদেশের ভেতরে যেসব জেলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে তার মধ্যে রয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, ঝিনাইদহ এবং চুয়াডাঙ্গা। ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার কাছে কর্কটক্রান্তি রেখা ও ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমার সংযোগবিন্দু অতিক্রম করেছে, যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্কটক্রান্তির কারণে দেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় বৈশিষ্ট্যপ্রাপ্ত এবং সূর্যরশ্মি ২১ জুন তারিখে দেশের উপর প্রায় লম্বভাবে পতিত হয়।
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি: তিনটি প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক ইউনিট
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ভূতাত্ত্বিক যুগ ও গঠনপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তিনটি প্রধান অঞ্চলে বিভক্ত। এই বিভাজন SPARRSO ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের মানচিত্র অনুযায়ী সর্বজনস্বীকৃত। প্রতিটি অঞ্চলের গঠন যুগ, ভৌগোলিক বিস্তার, উচ্চতা ও বৈশিষ্ট্য আলাদা।
ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল | ভূতাত্ত্বিক যুগ | মোট আয়তনের অংশ | প্রধান অবস্থান |
টারশিয়ারি যুগের পাহাড়ি অঞ্চল | টারশিয়ারি (সবচেয়ে প্রাচীন) | প্রায় ১২% | চট্টগ্রাম পার্বত্য তিন জেলা ও সিলেট অঞ্চল |
প্লাইস্টোসিন সোপান অঞ্চল | প্লাইস্টোসিন (মধ্যবর্তী) | প্রায় ৮% | বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর গড়, লালমাই-টিপরা গড় |
সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি | হলোসিন/সাম্প্রতিক (নবীনতম) | প্রায় ৮০% | গাঙ্গেয়, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা অববাহিকা |
📘 ভূপ্রকৃতি সংজ্ঞা ভূপ্রকৃতি (Physiography) বলতে কোনো অঞ্চলের ভূমির উচ্চতা, ঢাল, গঠনপ্রণালি, ভূতাত্ত্বিক যুগ ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সমন্বিত রূপকে বোঝায়। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি প্রধানত হিমালয় উত্থান, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা পলি জমা এবং বঙ্গোপসাগরের প্রভাবে গঠিত। |
টারশিয়ারি যুগের পাহাড়ি অঞ্চল
টারশিয়ারি যুগে (প্রায় ৬.৫ কোটি থেকে ২৫ লক্ষ বছর পূর্বে) হিমালয় উত্থানের সাথে সাথে বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ভাঁজ পর্বত গঠিত হয়। এই অঞ্চলই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক একক। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলায় এই পাহাড়ি অঞ্চল বিস্তৃত। চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়সমূহ আরাকান ইয়োমা পর্বতমালার সম্প্রসারণ এবং প্রধানত উত্তর-দক্ষিণ মুখী সমান্তরাল শৈলশ্রেণিতে সাজানো।
বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক ছিল। দীর্ঘকাল সরকারিভাবে স্বীকৃত মান অনুযায়ী তাজিংডং (বিজয়) বান্দরবানে অবস্থিত এবং উচ্চতা ১,২৮০ মিটার ধরা হতো। তবে সাম্প্রতিক GPS-ভিত্তিক জরিপে সাকা হাফং (Mowdok Mual) সর্বোচ্চ শৃঙ্গ হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যার উচ্চতা প্রায় ১,০৫২ মিটার। অন্য উল্লেখযোগ্য শৃঙ্গের মধ্যে রয়েছে কেওক্রাডং (৯৮৬ মিটার) ও ক্রিপ্রাডং বা পিরামিড শৃঙ্গ। সিলেটের পাহাড়সমূহ অপেক্ষাকৃত নিচু এবং হিমছড়ি-কালুরঘাট পাহাড় চট্টগ্রাম মহানগরীর কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত।
শৃঙ্গের নাম | উচ্চতা | অবস্থান | মন্তব্য |
তাজিংডং (বিজয়) | ১,২৮০ মিটার | বান্দরবান | সরকারিভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ |
সাকা হাফং (Mowdok Mual) | ১,০৫২ মিটার | বান্দরবান (মিয়ানমার সীমান্তে) | GPS পরিমাপে সর্বোচ্চ হিসেবে দাবি |
জোগী হাফং | ১,০৩৬ মিটার | বান্দরবান | তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ |
কেওক্রাডং | ৯৮৬ মিটার | বান্দরবান (রুমা উপজেলা) | পর্যটকপ্রিয় শৃঙ্গ |
চিম্বুক | ৭৬৩ মিটার | বান্দরবান | বান্দরবান শহর থেকে নিকটতম উঁচু শৃঙ্গ |
গারো পাহাড় | প্রায় ৩০০-৬০০ মিটার | ময়মনসিংহ-শেরপুর সীমান্ত | ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা |
খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড় | প্রায় ৩০০ মিটার | সিলেট সীমান্ত | মেঘালয় থেকে সম্প্রসারিত |
⚠ বিতর্কিত পরিমাপ: সর্বোচ্চ শৃঙ্গ সরকারিভাবে স্বীকৃত সর্বোচ্চ শৃঙ্গ: তাজিংডং (১,২৮০ মিটার)। বিকল্প হিসাব অনুযায়ী, GPS পরিমাপে সাকা হাফং (Mowdok Mual) উচ্চতর হিসেবে উপস্থাপিত হয় (~১,০৫২ মিটার)। বিতর্কের মূল কারণ পরিমাপ পদ্ধতির পার্থক্য (পুরাতন উচ্চতা চার্ট বনাম স্যাটেলাইট GPS) এবং দুর্গম অবস্থানের কারণে স্বাধীন যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সরকারিভাবে স্বীকৃত উত্তর তাজিংডং দেওয়া নিরাপদ। |
প্লাইস্টোসিন সোপান অঞ্চল
প্লাইস্টোসিন যুগে (প্রায় ২৫ লক্ষ থেকে ১২ হাজার বছর পূর্বে) যে উঁচু পলি জমা হয়েছিল, পরবর্তীতে নদীর কর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তা সোপান (Terrace) আকারে বর্তমান প্লাবন সমভূমি থেকে কিছুটা উঁচু অবস্থায় টিকে আছে। বাংলাদেশে এই সোপান অঞ্চলে রয়েছে বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর গড়, ভাওয়াল গড় এবং লালমাই-টিপরা গড়। সোপান অঞ্চলের মৃত্তিকা সাধারণত লাল ও বাদামি বর্ণের লৌহসমৃদ্ধ এবং প্লাবন সমভূমির পলি মৃত্তিকার তুলনায় কম উর্বর।
সোপান অঞ্চল | অবস্থান (জেলা/বিভাগ) | গড় উচ্চতা | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
বরেন্দ্রভূমি | রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, বগুড়া, দিনাজপুর | ২০-৪০ মিটার | উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সোপান; লাল মাটি |
মধুপুর গড় | টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, গাজীপুর | ১০-৩০ মিটার | শালবন; ভাওয়াল-মধুপুর জাতীয় উদ্যান |
ভাওয়াল গড় | গাজীপুর | ১০-২০ মিটার | মধুপুরের দক্ষিণ সম্প্রসারণ |
লালমাই-টিপরা গড় | কুমিল্লা, ফেনী | ১৫-৪৫ মিটার | প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্য (ময়নামতি) |
বরেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সোপান অঞ্চল, যার আয়তন প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিলোমিটার। এটি দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং বঙ্গের প্রাচীনতম জনপদ পুণ্ড্রবর্ধনের কেন্দ্রভূমি। বরেন্দ্রভূমির লাল-বাদামি মৃত্তিকা টারশিয়ারি যুগের পাহাড়ের তুলনায় নবীন হলেও প্লাবন সমভূমির চেয়ে অনেক প্রাচীন। মধুপুর গড় টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে বিস্তৃত একটি সোপান যেখানে শাল গাছের বনাঞ্চল গড়ে উঠেছে। লালমাই পাহাড় কুমিল্লায় অবস্থিত এবং এটি প্লাইস্টোসিন যুগের গঠন হিসেবে চিহ্নিত। ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার এই লালমাই-টিপরা গড়ের ওপরই গড়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি
বাংলাদেশের মোট আয়তনের প্রায় ৮০ শতাংশই প্লাবন সমভূমি, যা হলোসিন বা সাম্প্রতিক যুগে (গত ১২ হাজার বছরে) গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা ও তাদের শাখা-উপনদীর পলি জমা হয়ে গঠিত। এই অঞ্চল বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। প্লাবন সমভূমির আবার বহু উপ-শ্রেণি রয়েছে যেমন পার্বত্য পাদদেশীয় সমভূমি, প্লাবিত পলল সমভূমি, ব-দ্বীপীয় সমভূমি এবং উপকূলীয় সমভূমি।
প্লাবন সমভূমি উপ-অঞ্চল | প্রধান অবস্থান | বৈশিষ্ট্য |
পার্বত্য পাদদেশীয় সমভূমি | পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর | হিমালয়ের পাদদেশীয়; পাথুরে-নুড়িযুক্ত পলি |
তিস্তা প্লাবন সমভূমি | রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম | উত্তরাঞ্চলের প্রধান কৃষিভূমি |
ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবন সমভূমি | কুড়িগ্রাম, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল | বালুকাময় পলি; চর গঠনে অগ্রণী |
মেঘনা প্লাবন সমভূমি | কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, নোয়াখালী | মিহি পলি; অত্যন্ত উর্বর |
গঙ্গা প্লাবন সমভূমি | কুষ্টিয়া, যশোর, মাগুরা, ফরিদপুর, রাজবাড়ী | গঙ্গা-পদ্মার পলি; চিনি ও পাটের প্রধান এলাকা |
হাওর অঞ্চল | সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা | নিম্নাঞ্চল; বছরের বড় সময় জলমগ্ন; ৪১৪টি হাওর |
গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ও উপকূলীয় সমভূমি | খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা | লবণাক্ত মাটি; ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল; চর |
মেঘনা প্লাবন সমভূমিতে পদ্মা ও যমুনার মিলিত প্রবাহ চাঁদপুর অঞ্চলে এসে মেঘনা নাম ধারণ করে এবং এই নদীর পলিই বাংলাদেশের সবচেয়ে উর্বর জমি গড়ে তুলেছে। হাওর অঞ্চলকে বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র ভূ-প্রাকৃতিক সাব-ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হয় কারণ এটি ভৌগোলিকভাবে নিম্নাঞ্চল হলেও জলবায়ুগত ও পরিবেশগত দিক থেকে অনন্য। সরকারি হিসাবে দেশে হাওরের সংখ্যা ৪১৪টি এবং এর মোট আয়তন প্রায় ৮,৫৮৫ বর্গকিলোমিটার (Haor Master Plan, BHWDB ২০১২)।
বাংলাদেশের জলবায়ু: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু
বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি (Tropical Monsoon) ধরনের। Köppen জলবায়ু শ্রেণিবিন্যাসে দেশের অধিকাংশ অঞ্চল Aw (ক্রান্তীয় সাভানা) ও Am (ক্রান্তীয় মৌসুমি) শ্রেণিতে পড়ে। এই জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উষ্ণতম মাসের গড় তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অধিক, ঋতু পরিবর্তনের সাথে বায়ুর দিক পরিবর্তন, বছরের অধিকাংশ বৃষ্টিপাত একটি নির্দিষ্ট মৌসুমে কেন্দ্রীভূত এবং শুষ্ক-আর্দ্র দুই ঋতুর সুনির্দিষ্ট পার্থক্য।
📘 জলবায়ু ও আবহাওয়া: পার্থক্য আবহাওয়া (Weather): কোনো নির্দিষ্ট স্থানের অল্প সময়ের (ঘণ্টা থেকে দিন) বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থা; পরিবর্তনশীল। জলবায়ু (Climate): দীর্ঘকালীন (সাধারণত ৩০ বছর বা তার বেশি) আবহাওয়ার গড় অবস্থা; অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল। জলবায়ুর উপাদান: তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ। জলবায়ুর নিয়ামক: অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র সান্নিধ্য, সমুদ্রস্রোত, পর্বতের অবস্থান, বায়ুপ্রবাহ। (দ্রাঘিমাংশ জলবায়ুর নিয়ামক নয়) |
বাংলাদেশের জলবায়ুর নিয়ন্ত্রকসমূহ
বাংলাদেশের জলবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে এমন প্রধান কারণসমূহের মধ্যে রয়েছে কর্কটক্রান্তি রেখার অবস্থান (যা ক্রান্তীয় উষ্ণতা নিশ্চিত করে), হিমালয় পর্বতমালার দেয়ালসদৃশ অবস্থান (যা শীতল উত্তর-পূর্বী মেরু বায়ুকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশে বাধা দেয়), দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্য (যা মৌসুমি বায়ুর উৎস), মেঘালয়ের খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের শৈলোৎক্ষেপ প্রভাব (যা সিলেটে অতিবৃষ্টি ঘটায়), এবং দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু ও উত্তর-পূর্ব শুষ্ক বায়ুর পরিবর্তন।
নিয়ন্ত্রক | প্রভাব |
কর্কটক্রান্তি রেখা | দেশকে ক্রান্তীয় জলবায়ু অঞ্চলে স্থাপন করে; বছরের অধিকাংশ সময় উচ্চ সূর্যকোণ |
হিমালয় পর্বতমালা | শীতকালীন শীতল মেরু বায়ুকে বাধা দেয়; দেশের শীত তীব্রতা কম রাখে |
বঙ্গোপসাগর | দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর উৎস; উপকূলীয় তাপমাত্রা মৃদু রাখে |
মেঘালয়ের পাহাড় | সিলেট অঞ্চলে শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত; চেরাপুঞ্জি বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপ্রবণ স্থান |
দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু | জুন-সেপ্টেম্বর; বার্ষিক বৃষ্টির প্রায় ৮০ শতাংশ এই সময়ে |
উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু | নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি; শুষ্ক ও শীতল; কম বৃষ্টিপাত |
বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় | প্রাক-মৌসুম (এপ্রিল-মে) ও পরবর্তী মৌসুম (অক্টোবর-নভেম্বর) এ ঘূর্ণিঝড় |
বাংলাদেশের ছয় ঋতু
বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান, যদিও আবহাওয়াগতভাবে মূলত তিনটি ঋতু (গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শীত) প্রধান। প্রতিটি ঋতু দুটি বাংলা মাসের সমন্বয়ে গঠিত এবং প্রায় দুই মাস স্থায়ী হয়। ছয় ঋতুর এই বিভাজন বাংলা ক্যালেন্ডার ও কৃষি-ঋতুর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ঋতু | বাংলা মাস | ইংরেজি মাস | প্রধান বৈশিষ্ট্য |
গ্রীষ্ম | বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ | মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন | উচ্চ তাপমাত্রা; কালবৈশাখী ঝড়; প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টি |
বর্ষা | আষাঢ়-শ্রাবণ | মধ্য জুন থেকে মধ্য আগস্ট | দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু; ভারী বৃষ্টিপাত; বন্যা |
শরৎ | ভাদ্র-আশ্বিন | মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর | বৃষ্টি হ্রাস; কাশফুল; শুভ্র মেঘ; দিন-রাত সমান (২৩ সেপ্টেম্বর) |
হেমন্ত | কার্তিক-অগ্রহায়ণ | মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য ডিসেম্বর | নবান্ন উৎসব; কুয়াশার সূচনা; আমন কাটার মৌসুম |
শীত | পৌষ-মাঘ | মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি | সর্বনিম্ন তাপমাত্রা; কুয়াশা; শৈত্যপ্রবাহ |
বসন্ত | ফাল্গুন-চৈত্র | মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্য এপ্রিল | মৃদু তাপমাত্রা; পুষ্পবৃষ্টি; দিন-রাত সমান (২১ মার্চ) |
📌 ঋতু গণনার সূত্র বাংলা পঞ্জিকায় ১২টি মাসকে ২ মাস করে ভাগ করে ৬টি ঋতু গঠিত হয়েছে। প্রতি দুই মাসে এক ঋতু। ঋতু বিভাজন বাংলা মাস ভিত্তিক, ইংরেজি মাস ভিত্তিক নয়। উদাহরণ: জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ সপ্তাহ ইংরেজি জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত গ্রীষ্মকালের অন্তর্ভুক্ত। |
গ্রীষ্মকাল ও কালবৈশাখী ঝড়
গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশে তাপমাত্রা সর্বোচ্চে পৌঁছে এবং সাধারণত এপ্রিল মাস উষ্ণতম মাস হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ৪৫.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৭২ সালে রাজশাহীতে পরিমাপ করা হয়েছিল। গ্রীষ্মকালে দেশের পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে (রাজশাহী, নাটোর, যশোর, কুষ্টিয়া) তাপপ্রবাহ সবচেয়ে তীব্র হয়। ২০২৩ সালের এপ্রিলে ৪১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ঈশ্বরদীতে (BMD ২০২৩)।
গ্রীষ্মকালে সংঘটিত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়াগত ঘটনা কালবৈশাখী ঝড় (Nor'wester)। বৈশাখ মাসে সংঘটিত হওয়ায় এর নাম কালবৈশাখী। এই ঝড় প্রধানত উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত হয় বলে ইংরেজিতে Nor'wester বলা হয়। কালবৈশাখী মূলত সংঘর্ষ বৃষ্টিপাতের ধরনের অন্তর্ভুক্ত এবং অল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি প্রবল ঘূর্ণিবাত। এর সাথে শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত এবং প্রবল বায়ুপ্রবাহ থাকে। বাংলাদেশের সকল অঞ্চলেই কালবৈশাখী হয়, তবে রংপুর, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে এর প্রকোপ বেশি।
বর্ষাকাল ও মৌসুমি বায়ু
বর্ষাকালে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সরাসরি প্রভাবে আসে। ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরের উপর দিয়ে জলীয় বাষ্প বহন করে আসা এই বায়ু দেশের অধিকাংশ এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত ঘটায়। মৌসুমি বায়ু একটি সাময়িক বায়ু (Seasonal Wind), নিয়ত বায়ু নয়, কারণ এটি ঋতুভেদে দিক পরিবর্তন করে। মৌসুমি বায়ুর মূল কারণ স্থল ও সমুদ্রের তাপ ও চাপের ভিন্নতা। জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং সেপ্টেম্বর শেষ নাগাদ প্রত্যাহার শুরু হয়। বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ এই সময়ে হয়।
🌍 মৌসুমি বায়ুর প্রকৃতি প্রকার: সাময়িক বায়ু (Seasonal/Periodic Wind); নিয়ত বায়ু নয় মূল কারণ: স্থল ও সমুদ্রের তাপ-চাপের তারতম্য দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি (গ্রীষ্ম): জুন থেকে সেপ্টেম্বর; আর্দ্র ও বৃষ্টিদায়ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমি (শীত): নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি; শুষ্ক ও ঠান্ডা |
শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত
বর্ষাশেষে শরৎকালে আকাশ পরিষ্কার, তুলোর মতো শুভ্র মেঘ, নদীতীরে কাশফুল এবং দিন-রাতের প্রায় সমান দৈর্ঘ্য (২৩ সেপ্টেম্বর বিষুব দিবস) লক্ষণীয়। শরতের পরের ঋতু হেমন্ত বাংলা সাহিত্য ও কৃষি সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঋতু, কারণ এই সময়ে আমন ধান কাটার মৌসুম এবং নবান্ন উৎসব পালিত হয়। শীতকালে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে আসে। বাংলাদেশের সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে পরিমাপ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি তেতুলিয়া (পঞ্চগড়) এ ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয় (BMD)। বসন্তকাল মৃদু আবহাওয়ার ঋতু যেখানে বৃক্ষরাজি নতুন পাতা ও ফুলে সজ্জিত হয়; ২১ মার্চ এই ঋতুতেই বিষুব দিবস পড়ে।
বৃষ্টিপাত: প্রকার, পরিমাণ ও বণ্টন
উদ্ভাবনের প্রকৃতি অনুসারে বৃষ্টিপাত প্রধানত তিন প্রকার, এবং বিশেষ বৃষ্টিপাত হিসেবে ঘূর্ণিবৃষ্টিকেও কখনো আলাদা ধরা হয়। বাংলাদেশে তিন ধরনের বৃষ্টিপাতই দেখা যায়, তবে সবচেয়ে বেশি পরিচলন বৃষ্টিপাত এবং শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টিপাত।
বৃষ্টিপাতের প্রকার | উদ্ভবের কারণ | বাংলাদেশে উদাহরণ |
পরিচলন বৃষ্টি (Convectional Rain) | উষ্ণ-আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে উঠে শীতল হয়ে ঘনীভবন | গ্রীষ্মকালীন দুপুরবেলার বজ্রসহ বৃষ্টি; ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে |
শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি (Orographic Rain) | আর্দ্র বায়ু পর্বতে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে উপরে উঠে শীতল | সিলেট অঞ্চলে মেঘালয়ের প্রভাব; চেরাপুঞ্জি এই কারণেই বৃষ্টিপ্রবণ |
সংঘর্ষ/ফ্রন্টাল বৃষ্টি (Frontal Rain) | শীতল ও উষ্ণ বায়ু সংঘর্ষে আর্দ্র বায়ু উপরে উঠে | কালবৈশাখী ঝড়; নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে সাধারণ |
ঘূর্ণিবৃষ্টি (Cyclonic Rain) | নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্র করে | ঘূর্ণিঝড় সিডর, আম্পান, রিমালের সময় উপকূলীয় অঞ্চলে |
বাংলাদেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২,৩০০ মিলিমিটার, তবে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য অত্যন্ত প্রকট। সিলেট বিভাগের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চলে বার্ষিক ৫,০০০ মিলিমিটারের অধিক, যেখানে রাজশাহী অঞ্চলে মাত্র ১,৪০০ মিলিমিটারের কাছাকাছি। ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বার্ষিক প্রায় ১১,৮০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয় যা বিশ্বের অন্যতম, এবং এই বৃষ্টি বহনকারী বায়ুর আগেকার পথে অবস্থিত হওয়ায় সিলেটের লালাখাল ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলেও অস্বাভাবিক বেশি বৃষ্টিপাত হয়।
অঞ্চল/বিভাগ | গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত | মন্তব্য |
সিলেট (লালাখাল-সুনামগঞ্জ) | ৫,০০০-৫,৫০০ মিলিমিটার | দেশের সর্বোচ্চ; মেঘালয়ের শৈলোৎক্ষেপ প্রভাব |
চট্টগ্রাম উপকূল | ৩,০০০-৩,৫০০ মিলিমিটার | দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সরাসরি প্রভাব |
ঢাকা | ২,০০০-২,২০০ মিলিমিটার | কেন্দ্রীয় বাংলাদেশের গড় |
বরিশাল ও খুলনা উপকূল | ১,৮০০-২,২০০ মিলিমিটার | উপকূলীয় ব-দ্বীপ অঞ্চল |
রংপুর-দিনাজপুর | ১,৫০০-২,০০০ মিলিমিটার | উত্তরাঞ্চলের গড় |
রাজশাহী-নাটোর | ১,৪০০-১,৬০০ মিলিমিটার | দেশের সর্বনিম্ন বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল |
তাপমাত্রা ও বার্ষিক বিন্যাস
বাংলাদেশের তাপমাত্রা বছরব্যাপী মোটামুটি উষ্ণ থাকে, তবে ঋতুভেদে যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাধারণত এপ্রিল মাস উষ্ণতম এবং জানুয়ারি মাস শীতলতম বিবেচিত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্র সান্নিধ্যের কারণে দিবা-রাত্রির তাপমাত্রার পার্থক্য কম, কারণ বেশি জলীয় বাষ্প থাকায় তাপ ধারণ ক্ষমতা বেশি। ভূ-পৃষ্ঠ থেকে উপরের দিকে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে তাপমাত্রা হ্রাস পায়, যাকে গড় বায়ু তাপমাত্রা হ্রাস হার (Normal Lapse Rate) বলা হয়।
পরিমাপ | মান | স্থান ও সাল |
সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা | ৪৫.১° সেলসিয়াস | রাজশাহী, ১৯৭২ |
সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা | ২.৬° সেলসিয়াস | শ্রীমঙ্গল, ১৯৬৮; তেতুলিয়া (পঞ্চগড়) ২০১৮ |
উষ্ণতম মাসের গড় তাপমাত্রা | ২৮-৩২° সেলসিয়াস | এপ্রিল-মে |
শীতলতম মাসের গড় তাপমাত্রা | ১২-১৬° সেলসিয়াস | জানুয়ারি |
বার্ষিক গড় তাপমাত্রা | প্রায় ২৬° সেলসিয়াস | BMD ৩০ বছর গড় (১৯৯১-২০২০) |
গড় বায়ু তাপমাত্রা হ্রাসের হার | ৬.৫° সেলসিয়াস/কিমি | উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে |
⚡ তাপ উৎক্রম (Temperature Inversion) সাধারণত উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে তাপমাত্রা হ্রাস পায়, কিন্তু কখনো এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। উচ্চতা বৃদ্ধি পাবার সাথে সাথে তাপমাত্রা হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পেলে তাকে তাপমাত্রার উৎক্রম বা তাপ উৎক্রম (Temperature Inversion) বলে। এটি প্রধানত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে ঘটে, তবে শীতকালে শান্ত পরিবেশে নিম্ন বায়ুমণ্ডলেও দেখা যায়। |
বায়ুপ্রবাহ ও বায়ুর প্রকারভেদ
বায়ু একস্থান থেকে অন্যস্থানে প্রবাহিত হওয়ার প্রধান কারণ বায়ুর তাপ ও চাপের পার্থক্য। উচ্চচাপ এলাকা থেকে নিম্নচাপ এলাকার দিকে বায়ু প্রবাহিত হয়। বায়ুপ্রবাহের ওপর পৃথিবীর আবর্তন গতির প্রভাবে ফেরেলের সূত্র (Ferrel's Law) প্রযোজ্য হয়, যার অনুসারে বায়ু উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বাঁকিয়া যায়। সমান চাপবিশিষ্ট বিন্দুসমূহকে যুক্তকারী কাল্পনিক রেখাকে আইসোবার (Isobar) বলা হয়।
বায়ুর প্রকার | বৈশিষ্ট্য | বাংলাদেশে উদাহরণ |
নিয়ত বায়ু (Permanent Wind) | সারাবছর একই দিকে প্রবাহিত; দিক পরিবর্তন করে না | বাণিজ্য বায়ু (Trade Wind), পশ্চিমা বায়ু, মেরু বায়ু |
সাময়িক/ঋতুগত বায়ু (Seasonal Wind) | ঋতুভেদে দিক পরিবর্তন করে | মৌসুমি বায়ু (Monsoon) |
স্থানীয় বায়ু (Local Wind) | স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও তাপমাত্রার কারণে স্বল্প পরিসরে | কালবৈশাখী, লু, চিনুক |
দৈনিক বায়ু (Diurnal Wind) | দিন-রাতের তাপ পার্থক্যের কারণে দৈনিক চক্রে | স্থল বায়ু, সমুদ্র বায়ু |
অনিয়মিত বায়ু (Variable Wind) | কোনো নিয়মিত প্যাটার্ন অনুসরণ করে না | ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো |
স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু
উপকূলীয় অঞ্চলে দিন-রাতের তাপ পার্থক্যের কারণে দুটি বিশেষ বায়ুপ্রবাহ লক্ষ করা যায়। দিনের বেলায় স্থলভাগ দ্রুত উষ্ণ হয়ে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে এবং সমুদ্র থেকে শীতল উচ্চচাপ অঞ্চলের বায়ু স্থলের দিকে প্রবাহিত হয়, যাকে সমুদ্র বায়ু (Sea Breeze) বলে। রাতের বেলায় স্থলভাগ দ্রুত শীতল হয়ে উচ্চচাপ সৃষ্টি করে এবং সমুদ্রের উষ্ণ-নিম্নচাপ অঞ্চলের দিকে স্থলবায়ু (Land Breeze) প্রবাহিত হয়। অর্থাৎ স্থল বায়ু রাত্রিবেলা স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়।
কালবৈশাখী ঝড়ের বৈশিষ্ট্য
কালবৈশাখী ঝড় বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন একটি বিশেষ আবহাওয়াগত ঘটনা। এই ঝড় প্রধানত উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে প্রবাহিত হয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়। স্বল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ক্ষুদ্র প্রবল ঘূর্ণিবাতকে টর্নেডো (Tornado) বলা হয়; ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী টর্নেডো আঘাত হেনেছিল (১,৩০০-এর অধিক মৃত্যু)। চীন-জাপান উপকূলে সংঘটিত ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের নাম টাইফুন (Typhoon), যুক্তরাষ্ট্রে হারিকেন (Hurricane) এবং অস্ট্রেলিয়ায় উইলি-উইলি (Willy-Willy)।
মানচিত্র-বিকল্প ছক: বিভাগওয়ারি ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু
প্রশাসনিক বিভাগ অনুসারে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর তারতম্য বোঝার জন্য নিচের ছকটি কাজে লাগবে। এই ছক ম্যাপের বিকল্প হিসেবে প্রতিটি বিভাগের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, প্রধান নদনদী এবং জলবায়ুগত পরিচিতি একসাথে দেখায়।
বিভাগ | প্রধান ভূপ্রকৃতি | প্রধান নদী | জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্য |
ঢাকা | মধুপুর গড় ও মেঘনা প্লাবন সমভূমি | বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরী, মেঘনা | মাঝারি বৃষ্টিপাত; গ্রীষ্মে উষ্ণ; শীতে কুয়াশা |
চট্টগ্রাম | টারশিয়ারি পাহাড় ও উপকূলীয় সমভূমি | কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ফেনী | উপকূলে অধিক বৃষ্টিপাত; ঘূর্ণিঝড় প্রবণ |
সিলেট | হাওর ও পার্বত্য পাদদেশীয় ভূমি | সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা, সুনাই | দেশের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত; শৈলোৎক্ষেপ প্রভাব |
রাজশাহী | বরেন্দ্রভূমি ও গঙ্গা প্লাবন সমভূমি | পদ্মা, মহানন্দা, করতোয়া, আত্রাই | দেশের সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত; গ্রীষ্মে তীব্র তাপদাহ |
খুলনা | গঙ্গা ব-দ্বীপ ও উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ | রূপসা, ভৈরব, পশুর, শিবসা | লবণাক্ত প্রভাব; ঘূর্ণিঝড় ঝুঁকি |
বরিশাল | উপকূলীয় ও ব-দ্বীপীয় সমভূমি | মেঘনা, তেতুলিয়া, বিষখালী, বুড়িশ্বর | অধিক বৃষ্টিপাত; ঘূর্ণিঝড় প্রবণ |
রংপুর | তিস্তা প্লাবন সমভূমি ও পার্বত্য পাদদেশ | তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, যমুনেশ্বরী | গ্রীষ্মে তাপদাহ; শীতে শৈত্যপ্রবাহ; কম বৃষ্টিপাত |
ময়মনসিংহ | মধুপুর গড়, গারো পাহাড় পাদদেশ | ব্রহ্মপুত্র, কংস, সোমেশ্বরী, কালিগঙ্গা | মাঝারি বৃষ্টিপাত; হাওরের প্রভাব |
বাংলাদেশের জলবায়ু অঞ্চল ভাগ করার ক্ষেত্রে BMD সাতটি জলবায়ু অঞ্চল চিহ্নিত করেছে: দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চল। উত্তর-পূর্বাঞ্চল সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতপ্রবণ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাতপ্রবণ। তেতুলিয়া (পঞ্চগড়) দেশের সবচেয়ে উত্তরের জনপদ এবং সেখানে শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়; তেতুলিয়া মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত।
প্রথম-সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন তথ্যকোষ
🏆 ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু সংক্রান্ত "সর্ব-" তথ্য সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ (সরকারি): তাজিংডং (বিজয়), উচ্চতা ১,২৮০ মিটার, বান্দরবান সর্বোচ্চ শৃঙ্গ (GPS-ভিত্তিক বিকল্প): সাকা হাফং (Mowdok Mual), প্রায় ১,০৫২ মিটার, বান্দরবান সর্বপ্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল: টারশিয়ারি যুগের পাহাড় (চট্টগ্রাম পার্বত্য ও সিলেট অঞ্চল) নবীনতম ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল: সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি (হলোসিন যুগ) বৃহত্তম সোপান অঞ্চল: বরেন্দ্রভূমি (প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিমি, উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশ) সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা: ৪৫.১° সেলসিয়াস, রাজশাহী, ১৯৭২ সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা: ২.৬° সেলসিয়াস, শ্রীমঙ্গল (১৯৬৮); পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া (২০১৮) সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চল: সিলেটের লালাখাল ও সুনামগঞ্জ (৫,০০০-৫,৫০০ মিমি/বছর) সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চল: রাজশাহী-নাটোর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ (১,৪০০-১,৬০০ মিমি/বছর) একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ: সেন্টমার্টিন (নারিকেল জিঞ্জিরা), কক্সবাজার জেলা বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত (দেশজ): ২,৩০০ মিলিমিটার সর্বোত্তরের জনপদ: তেতুলিয়া (পঞ্চগড়), মহানন্দা নদীর তীরে সর্বদক্ষিণের জনপদ: ছেঁড়াদ্বীপ (সেন্টমার্টিনের দক্ষিণে) হাওর সংখ্যা: ৪১৪টি; মোট আয়তন প্রায় ৮,৫৮৫ বর্গকিলোমিটার উষ্ণতম মাস: এপ্রিল (গড়ে ২৮-৩২° সেলসিয়াস) শীতলতম মাস: জানুয়ারি (গড়ে ১২-১৬° সেলসিয়াস) |
জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ-সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক টাইমলাইন
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈশ্বিক ঘটনা পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। নিচের টাইমলাইনে দেশজ ও আন্তর্জাতিক প্রধান মাইলফলকগুলো একসাথে দেওয়া হলো।
সাল | ঘটনা | তাৎপর্য |
১৯৭২ | রাজশাহীতে ৪৫.১° সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড | বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা |
১৯৬৮ | শ্রীমঙ্গলে ২.৬° সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড | বাংলাদেশের সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা |
১৯৭০ | ভোলা সাইক্লোন (১২ নভেম্বর) | বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় |
১৯৭২ | ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (CPP) প্রতিষ্ঠা | BDRCS ও সরকারের যৌথ উদ্যোগ |
১৯৮৮ | IPCC প্রতিষ্ঠা | WMO ও UNEP কর্তৃক জলবায়ু গবেষণা প্যানেল |
১৯৮৯ | পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) প্রতিষ্ঠা | বাংলাদেশের প্রধান পরিবেশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা |
১৯৯২ | রিও আর্থ সামিট; UNFCCC স্বাক্ষরিত | বৈশ্বিক জলবায়ু কাঠামো |
১৯৯৫ | বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন | দেশের প্রধান পরিবেশ আইন |
১৯৯৭ | কিয়োটো প্রোটোকল | গ্রিনহাউস গ্যাস হ্রাসের আইনি বাধ্যবাধকতা; কার্যকর ২০০৫ |
২০০৯ | BCCSAP গৃহীত | বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা |
২০১৫ | প্যারিস চুক্তি; সেন্ডাই কাঠামো | বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫° সেলসিয়াসের লক্ষ্য; ২০১৫-২০৩০ দুর্যোগ ঝুঁকি কাঠামো |
২০১৮ | বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গৃহীত | ১০০ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু-অভিযোজন পরিকল্পনা |
২০২১-২৩ | IPCC AR6 প্রকাশ | বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.১° সেলসিয়াসের অধিক; বাংলাদেশের ঝুঁকি বৃদ্ধি |
২০২২ | সিলেট-সুনামগঞ্জ বন্যা | ১২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পানি স্তর |
২০২৩ | COP28 দুবাই (UAE) | জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার আহ্বান |
২০২৪ | COP29 বাকু (আজারবাইজান) | জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধির ঘোষণা |
২০২৪ | ঘূর্ণিঝড় রিমাল (২৬-২৭ মে) | বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত |
বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু-সংক্রান্ত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সরকার বহুমাত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক, আইনি ও নীতিগত কাঠামো গড়ে তুলেছে। দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠান, আইন ও কর্মসূচির সমন্বিত পরিচিতি নিচে দেওয়া হলো।
প্রতিষ্ঠান/নীতি | প্রতিষ্ঠা/গৃহীত সাল | মূল ভূমিকা |
পরিবেশ মন্ত্রণালয় (MoEFCC) | ১৯৮৯ | পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে নীতি নির্ধারণ |
পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) | ১৯৮৯ | পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ; দূষণ নিয়ন্ত্রণ |
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (BMD) | ১৯৪৭ (পূর্ব পাকিস্তান) | আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিসেবা; পূর্বাভাস; সতর্কীকরণ |
SPARRSO | ১৯৮০ | স্যাটেলাইট ভিত্তিক জরিপ; দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ |
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর (DDM) | ১৯৯৩ (পুনর্গঠন ২০১২) | দুর্যোগ পূর্ব ও পরবর্তী সমন্বয় |
CPP (ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি) | ১৯৭২ | উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্ক; ৭৬,০০০-এর অধিক স্বেচ্ছাসেবী |
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB) | ১৯৫৯ | নদী ও পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা; বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ |
BCCSAP | ২০০৯ | জলবায়ু কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা; ছয় স্তম্ভ |
জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড আইন | ২০১০ | অভ্যন্তরীণ অর্থায়নে জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়ন |
বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ | ২০১৮ | ১০০ বছর মেয়াদি সমন্বিত ব-দ্বীপ পরিকল্পনা |
মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা | ২০২২ | CVF সভাপতিত্বে গৃহীত জলবায়ু-অভিযোজন কাঠামো |
সাংবিধানিক ও আইনি সংযোগ
বাংলাদেশের সংবিধানে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের সরাসরি বিধান রয়েছে। ১৫তম সংশোধনী (২০১১) এর মাধ্যমে সংবিধানে ১৮ক অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয়, যেখানে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নির্দেশনামূলক বিধান রয়েছে।
⚖ সাংবিধানিক বিধান: ১৮ক অনুচ্ছেদ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ (Protection and Improvement of Environment and Biodiversity): সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ (১৫তম সংশোধনী, ২০১১) অনুযায়ী, "রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করিবে, এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবে।" প্রাসঙ্গিক আইন: পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০, ২০২৩); পরিবেশ আদালত আইন ২০১০; বন আইন ১৯২৭; বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২; জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড আইন ২০১০। |
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) সংযোগ
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু সংক্রান্ত বিষয়াবলী জাতিসংঘের ২০৩০ এজেন্ডার অন্তর্গত একাধিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
SDG লক্ষ্যমাত্রা | সম্পর্কিত বিষয় |
SDG ৬: বিশুদ্ধ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন | নদী, ভূগর্ভস্থ পানি, লবণাক্ততা ব্যবস্থাপনা |
SDG ১১: টেকসই শহর ও জনপদ | নগর-পরিবেশ; ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা সহনশীলতা |
SDG ১৩: জলবায়ু কর্মসূচি | অভিযোজন, প্রশমন, IPCC সাথে সমন্বয়; প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন |
SDG ১৪: জলজ জীবন | বঙ্গোপসাগর সংরক্ষণ; সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য |
SDG ১৫: স্থলজ জীবন | বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, সুন্দরবন, হাওর সংরক্ষণ |
মনে রাখার কৌশল ও ট্রিকস
📌 কৌশল ১: ভূপ্রকৃতির তিন অঞ্চল মনে রাখা সূত্র: "পাহাড় ↣ সোপান ↣ সমভূমি"; বয়সের ক্রম: পুরাতন ↣ মধ্যবর্তী ↣ নবীন; আয়তনের অনুপাত: ১২% ↣ ৮% ↣ ৮০%। মনে রাখার সহজ উপায়: পুরাতনের আয়তন কম, নবীনের আয়তন বেশি। |
📌 কৌশল ২: ছয় ঋতুর জোড়া মাস ছন্দ: "গ্রী-বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ; বর্ষা-আষাঢ় শ্রাবণ; শরৎ-ভাদ্র আশ্বিন; হেমন্ত-কার্তিক অগ্রহায়ণ; শীত-পৌষ মাঘ; বসন্ত-ফাল্গুন চৈত্র।" প্রথম-অক্ষর সূত্র: "গ্র-ব-শ-হে-শী-ব" (গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত)। |
📌 কৌশল ৩: তাপমাত্রার চরম মান সর্বোচ্চ ৪৫.১° সেলসিয়াস, রাজশাহী, ১৯৭২ ↣ সংখ্যা ৪৫১৯৭২ মনে রাখা সহজ। সর্বনিম্ন ২.৬° সেলসিয়াস, শ্রীমঙ্গল, ১৯৬৮ ↣ মৌলভীবাজার শব্দে "মৌল" এবং "শ্রীমঙ্গল" শব্দে "শ্রী" থাকায় একই জেলায় হওয়াই স্বাভাবিক। |
📌 কৌশল ৪: কর্কটক্রান্তি রেখার জেলাগুলো পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে: "খা-রা-কু-মু-ফ-রা-মা-ঝি-চু" (খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা)। অথবা কেন্দ্রবিন্দু "ভাঙ্গা" (ফরিদপুর) মনে রাখুন। |
📌 কৌশল ৫: জলবায়ুর নিয়ামক বনাম উপাদান জলবায়ুর "উপাদান" = তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, চাপ (বায়ুমণ্ডলের অংশ)। জলবায়ুর "নিয়ামক" = অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র সান্নিধ্য, পর্বত, সমুদ্রস্রোত (বহিরাগত প্রভাবক)। দ্রাঘিমাংশ জলবায়ুর নিয়ামক নয়, কারণ দ্রাঘিমাংশ শুধু সময় নির্ধারণ করে। |
বিশেষ নোট: পরীক্ষায় বিভ্রান্তিকর তথ্য
⚡ বিশেষ নোট ১: সবচেয়ে প্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল পরীক্ষায় বিকল্পে "বরেন্দ্রভূমি" দেখলে অনেকে বিভ্রান্ত হয়, কিন্তু সঠিক উত্তর "টারশিয়ারি যুগের পাহাড়"। বরেন্দ্রভূমি প্লাইস্টোসিন যুগের, যা টারশিয়ারির পরের যুগ। প্রাচীনত্বের ক্রম: টারশিয়ারি পাহাড় > প্লাইস্টোসিন সোপান (বরেন্দ্রভূমি) > সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি। |
⚡ বিশেষ নোট ২: কর্কটক্রান্তি অতিক্রমকারী জেলা কর্কটক্রান্তি রেখা ৯টি জেলার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। বিকল্পে রাঙামাটি, যশোর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর থাকলে যশোর বা কুষ্টিয়া সঠিক নয়; কুষ্টিয়া কর্কটক্রান্তির দক্ষিণে। কেন্দ্রবিন্দু ফরিদপুরের ভাঙ্গা মনে রাখা সহজ। মূল মধ্যরেখা বাংলাদেশের ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমার কাছে অবস্থিত। |
⚡ বিশেষ নোট ৩: মৌসুমি বায়ু - সাময়িক না নিয়ত মৌসুমি বায়ু একটি "সাময়িক/ঋতুগত বায়ু" (Seasonal/Periodic Wind), "নিয়ত বায়ু" (Permanent Wind) নয়। কারণ এটি ঋতুভেদে দিক পরিবর্তন করে: বর্ষায় দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে, শীতে উত্তর-পূর্ব থেকে। বাণিজ্য বায়ু (Trade Wind) ও পশ্চিমা বায়ু হলো নিয়ত বায়ুর উদাহরণ। |
⚡ বিশেষ নোট ৪: ভূমধ্যসাগরীয় বনাম মৌসুমি জলবায়ু ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য "বৃষ্টিবহুল শীতকাল ও বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকাল"। অপরদিকে মৌসুমি জলবায়ুতে গ্রীষ্মকাল-বর্ষাকালে অধিক বৃষ্টি এবং শীত মৌসুম অপেক্ষাকৃত শুষ্ক। বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, ভূমধ্যসাগরীয় নয়। ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্র মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের বাইরে। |
সতর্কতা: পরীক্ষায় ফাঁদ হিসেবে আসা জোড়া তথ্য
বিভ্রান্তিকর জোড়া | সঠিক ব্যাখ্যা |
কর্কটক্রান্তি বনাম মকরক্রান্তি | কর্কটক্রান্তি ২৩.৫° উত্তর; মকরক্রান্তি ২৩.৫° দক্ষিণ। বাংলাদেশের উপর দিয়ে কর্কটক্রান্তি অতিক্রম করেছে। |
স্থল বায়ু বনাম সমুদ্র বায়ু | স্থল বায়ু রাতে স্থল থেকে সমুদ্রে; সমুদ্র বায়ু দিনে সমুদ্র থেকে স্থলে। |
বরেন্দ্রভূমি বনাম পাহাড়ি অঞ্চল | বরেন্দ্রভূমি প্লাইস্টোসিন সোপান; পাহাড়ি অঞ্চল টারশিয়ারি যুগের, অধিকতর প্রাচীন। |
মৌসুমি বনাম নিয়ত বায়ু | মৌসুমি = সাময়িক/ঋতুগত; বাণিজ্য বায়ু = নিয়ত। |
জলবায়ুর উপাদান বনাম নিয়ামক | উপাদান অভ্যন্তরীণ (তাপমাত্রা, বৃষ্টি, আর্দ্রতা); নিয়ামক বহিরাগত (অক্ষাংশ, উচ্চতা)। দ্রাঘিমাংশ কোনোটিই নয়। |
তাজিংডং বনাম সাকা হাফং | সরকারিভাবে সর্বোচ্চ তাজিংডং (১,২৮০ মি); বিকল্প হিসাবে সাকা হাফং (~১,০৫২ মি)। পরীক্ষায় সরকারি মান দেওয়া নিরাপদ। |
মধুপুর গড় বনাম ভাওয়াল গড় | মধুপুর টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহে; ভাওয়াল গাজীপুরে, মধুপুরের দক্ষিণ সম্প্রসারণ। |
পরিচলন বনাম শৈলোৎক্ষেপ বৃষ্টি | পরিচলন: উষ্ণ বায়ু উপরে ওঠা; শৈলোৎক্ষেপ: পাহাড়ের বাধায় বায়ু উঠা। |
জলবায়ু-ভিত্তিক দুর্যোগ চক্র
বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর কারণে দেশটি একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, ভূমিধস বাংলাদেশের প্রধান জলবায়ুজনিত দুর্যোগ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় চার-ধাপ চক্রটি অনুসরণ করা হয়।
দুর্যোগ চক্রের ধাপ | উদ্দেশ্য | বাংলাদেশে উদাহরণ কর্মসূচি |
প্রস্তুতি (Preparedness) | দুর্যোগ পূর্বে প্রস্তুতি গ্রহণ | CPP স্বেচ্ছাসেবী, পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মহড়া |
প্রশমন (Mitigation) | দুর্যোগের প্রভাব হ্রাস | উপকূলীয় বাঁধ, ম্যানগ্রোভ পুনঃবনায়ন, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র |
সাড়াদান (Response) | দুর্যোগ চলাকালীন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা | উদ্ধার, আশ্রয়, ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসা সেবা |
পুনরুদ্ধার (Recovery) | দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন | বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, কৃষি সহায়তা, জীবিকা পুনঃস্থাপন |
জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক ঝুঁকি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। IPCC AR6 (২০২১-২০২৩) অনুযায়ী, ১৮৫০-১৯০০ এর তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা সম্প্রসারণ, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধি, খরা ও বন্যার পরিবর্তিত ধরন এবং জলবায়ু-উদ্বাস্তু সংকটের সম্মুখীন।
⚠ বাংলাদেশের জলবায়ু-ঝুঁকির পরিসংখ্যান বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক: Germanwatch Global Climate Risk Index অনুসারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০টি সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের একটি। প্রক্ষেপিত সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধি: ২১০০ সাল নাগাদ ০.৫ থেকে ১.০ মিটার বৃদ্ধির আশঙ্কা, যা উপকূলীয় ১৭% এলাকা ডুবিয়ে দিতে পারে। লবণাক্ততা সম্প্রসারণ: বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূলীয় কৃষিজমিতে লবণাক্ততা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু উদ্বাস্তু: World Bank প্রক্ষেপণ অনুসারে ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৩ কোটি বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসী হতে পারে। বার্ষিক GDP ঝুঁকি: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বার্ষিক GDP-র প্রায় ২ শতাংশ ক্ষতি হচ্ছে (ADB ২০২৩ অনুমান)। |
লিখিত পরীক্ষার জন্য বিশ্লেষণ
✍ লিখিত পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর অনন্যতা এর তিনটি ভূ-প্রাকৃতিক স্তরের ভৌগোলিক বিন্যাসে নিহিত: হিমালয়জাত পলির অবিরাম সঞ্চয়, প্লাইস্টোসিন সোপানের অবশিষ্ট উচ্চতা এবং টারশিয়ারি ভাঁজ পর্বতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রাচীর: এই তিনের সমন্বয়েই দেশের ৮০ শতাংশ এলাকা পৃথিবীর বৃহত্তম সক্রিয় ব-দ্বীপে পরিণত হয়েছে। কর্কটক্রান্তি রেখার অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের সান্নিধ্য এবং মেঘালয়ের শৈলোৎক্ষেপ প্রভাব মিলে বাংলাদেশের জলবায়ুকে ক্রান্তীয় মৌসুমি ধরনের আদর্শ উদাহরণে পরিণত করেছে; ছয় ঋতুর জীবন্ত পরিবর্তন এর সাংস্কৃতিক প্রকাশ। তবে IPCC AR6 প্রতিবেদনে চিহ্নিত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি, লবণাক্ততা সম্প্রসারণ ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুই দেশের বৃহত্তম পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০, BCCSAP ও মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনার সমন্বিত বাস্তবায়ন অপরিহার্য। |
বিগত পরীক্ষার প্রশ্ন
নিচে বিগত BCS, ব্যাংক জব ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু বিষয়ে আসা প্রশ্নসমূহ মিশ্রিতভাবে দেওয়া হলো। প্রশ্নসমূহ চ্যাপ্টারের বিষয়বস্তুর প্রবাহ অনুসারে সাজানো।
ভৌগোলিক অবস্থান ও কর্কটক্রান্তি
প্রশ্ন: বাংলাদেশের উপর দিয়ে নিম্নের কোন রেখাটি অতিক্রম করেছে?
উত্তর: কর্কটক্রান্তি রেখা।
প্রশ্ন: কর্কটক্রান্তি রেখার অবস্থান কোন অক্ষাংশে?
উত্তর: ২৩.৫ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে।
প্রশ্ন: কর্কটক্রান্তি ও ৯০° পূর্ব দ্রাঘিমা রেখার সংযোগবিন্দু বাংলাদেশের কোন অঞ্চলের উপর দিয়ে অতিক্রম করেছে?
উত্তর: ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার কাছাকাছি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের অক্ষাংশগত বিস্তার কত?
উত্তর: ২০°৩৪ʹ থেকে ২৬°৩৮ʹ উত্তর অক্ষাংশ।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের দ্রাঘিমাংশগত বিস্তার কত?
উত্তর: ৮৮°০১ʹ থেকে ৯২°৪১ʹ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মোট আয়তন কত?
উত্তর: ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সীমান্ত দৈর্ঘ্য (ভারতের সাথে) কত?
উত্তর: প্রায় ৪,১৫৬ কিলোমিটার।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের উপকূলরেখার দৈর্ঘ্য কত?
উত্তর: ৭১১ কিলোমিটার।
প্রশ্ন: মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত দৈর্ঘ্য কত?
উত্তর: ২৭১ কিলোমিটার।
প্রশ্ন: ২৩ জুন সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয় কোন রেখার উপর?
উত্তর: কর্কটক্রান্তি রেখা।
প্রশ্ন: বছরের কোন দিনে পৃথিবীর সর্বত্র দিন-রাত্রি প্রায় সমান হয়?
উত্তর: ২১ মার্চ ও ২৩ সেপ্টেম্বর।
প্রশ্ন: ভূপৃষ্ঠের ওপর অঙ্কিত যে রেখা ১৮০° মধ্যরেখার কাছাকাছি, তাকে কী বলে?
উত্তর: আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা।
প্রশ্ন: মকরক্রান্তি রেখার মান কত?
উত্তর: ২৩.৫° দক্ষিণ অক্ষাংশ।
ভূপ্রকৃতি ও ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল সবচেয়ে প্রাচীন?
উত্তর: টারশিয়ারি যুগের পাহাড়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের পাহাড়সমূহ কোন ভূতাত্ত্বিক যুগে গঠিত?
উত্তর: টারশিয়ারি যুগে।
প্রশ্ন: বরেন্দ্রভূমি কোন যুগের সোপান?
উত্তর: প্লাইস্টোসিন যুগের।
প্রশ্ন: বরেন্দ্রভূমি বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে অবস্থিত?
উত্তর: উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে।
প্রশ্ন: বরেন্দ্রভূমির সাথে নিচের কোনটি সম্পৃক্ত?
উত্তর: সোপানভূমি (Terrace)।
প্রশ্ন: ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলার উঁচু ভূমিকে কী বলে?
উত্তর: মধুপুর গড়।
প্রশ্ন: মধুপুর গড় কোন যুগের ভূ-প্রকৃতি?
উত্তর: প্লাইস্টোসিন যুগের সোপান।
প্রশ্ন: লালমাই পাহাড় কোন জেলায় অবস্থিত?
উত্তর: কুমিল্লা জেলায়।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের সরকারিভাবে স্বীকৃত নাম কী?
উত্তর: তাজিংডং (বিজয়), বান্দরবান; উচ্চতা ১,২৮০ মিটার।
প্রশ্ন: সাকা হাফং পর্বতশৃঙ্গ কোথায় অবস্থিত?
উত্তর: বান্দরবান জেলার পূর্বাঞ্চলে (মিয়ানমার সীমান্তের কাছে)।
প্রশ্ন: কেওক্রাডং পর্বতশৃঙ্গের উচ্চতা কত?
উত্তর: ৯৮৬ মিটার, বান্দরবান।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপের নাম কী?
উত্তর: সেন্ট মার্টিন (নারিকেল জিঞ্জিরা)।
প্রশ্ন: বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত প্রবালদ্বীপ কোনটি?
উত্তর: সেন্টমার্টিন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন অঞ্চল হাওড় এলাকা নামে পরিচিত?
উত্তর: সিলেট-সুনামগঞ্জ অঞ্চল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে হাওরের সংখ্যা কত?
উত্তর: ৪১৪টি (সরকারি হিসাব)।
প্রশ্ন: পর্বত-পাদদেশীয় সমভূমি বাংলাদেশের কোন এলাকায় অবস্থিত?
উত্তর: ঠাকুরগাঁও-পঞ্চগড় এলাকায়।
প্রশ্ন: দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ স্থান কী ধরনের মৃত্তিকা দ্বারা গঠিত?
উত্তর: পাদদেশীয় পলল মৃত্তিকা।
প্রশ্ন: সাঙ্গু নদী বাংলাদেশের কোন ভূপ্রকৃতি অঞ্চলের অন্তর্গত?
উত্তর: পাহাড়ি ভূমি অঞ্চলের।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন অঞ্চল পীট কয়লায় সমৃদ্ধ?
উত্তর: গোপালগঞ্জ-খুলনা অঞ্চল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় কোন ধরনের বন্যা হয়?
উত্তর: আকস্মিক বন্যা (Flash Flood)।
প্রশ্ন: তেতুলিয়া কোন নদীর তীরে অবস্থিত?
উত্তর: মহানন্দা নদীর তীরে।
প্রশ্ন: মহাস্থানগড় কোন নদীর তীরে অবস্থিত?
উত্তর: করতোয়া নদীর তীরে।
জলবায়ু ও ঋতু
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কোন ধরনের জলবায়ু বিরাজমান?
উত্তর: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু (Tropical Monsoon)।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জলবায়ুর নাম কী?
উত্তর: ক্রান্তীয়-মৌসুমি জলবায়ু।
প্রশ্ন: দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহ প্রধানত কোন জলবায়ুর অন্তর্গত?
উত্তর: মৌসুমি জলবায়ু।
প্রশ্ন: কোন দেশ মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয়?
উত্তর: যুক্তরাষ্ট্র।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কত?
উত্তর: প্রায় ২,৩০০ মিলিমিটার।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়?
উত্তর: সিলেটের লালাখাল ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে সর্বনিম্ন বৃষ্টিপাত হয়?
উত্তর: রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা কত এবং কোথায়?
উত্তর: ৪৫.১° সেলসিয়াস, রাজশাহী, ১৯৭২।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা কত এবং কোথায়?
উত্তর: ২.৬° সেলসিয়াস, শ্রীমঙ্গল (১৯৬৮) এবং পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া (২০১৮)।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের উষ্ণতম মাস কোনটি?
উত্তর: এপ্রিল।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের শীতলতম মাস কোনটি?
উত্তর: জানুয়ারি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কালবৈশাখী ঝড় কখন হয়?
উত্তর: প্রাক-মৌসুমি বায়ু ঋতুতে (মার্চ-মে)।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে কালবৈশাখী ঝড় কোন দিক থেকে প্রবাহিত হয়?
উত্তর: উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড় কখন হয়?
উত্তর: মৌসুমি বায়ু প্রবাহের পূর্বে ও পরে (এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর)।
প্রশ্ন: ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রতি কিলোমিটার উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে গড় তাপমাত্রা হ্রাসের হার কত?
উত্তর: ৬.৫° সেলসিয়াস।
প্রশ্ন: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: বৃষ্টিবহুল শীতকাল ও বৃষ্টিহীন গ্রীষ্মকাল।
প্রশ্ন: কোন জলবায়ু অঞ্চলে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয়?
উত্তর: ভূমধ্যসাগরীয় জলবায়ু অঞ্চলে।
প্রশ্ন: কোন অঞ্চলে সাধারণত সারা বছর বৃষ্টিপাত হয়?
উত্তর: নিরক্ষীয় অঞ্চলে।
প্রশ্ন: ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে কোন ধরনের বৃষ্টিপাত হয়?
উত্তর: পরিচলন বৃষ্টিপাত।
প্রশ্ন: পৃথিবীর কোন অঞ্চলে দিবা-রাত্রির দৈর্ঘ্য প্রায় সমান হয়?
উত্তর: বিষুবীয় অঞ্চলে।
প্রশ্ন: শীতকালে ভেজা কাপড় দ্রুত শুকায় কেন?
উত্তর: বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায়।
প্রশ্ন: উচ্চতা বৃদ্ধি পাবার সাথে তাপমাত্রা হ্রাস না পেয়ে বৃদ্ধি পেলে তাকে কী বলে?
উত্তর: তাপমাত্রার উৎক্রম (Temperature Inversion)।
প্রশ্ন: তাপ উৎক্রম বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে সংঘটিত হয়?
উত্তর: স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে।
প্রশ্ন: উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চল বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: উভয় গোলার্ধের ২৩.৫° থেকে ৩৫° অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা।
বায়ু, বৃষ্টিপাত ও বায়ুপ্রবাহ
প্রশ্ন: মৌসুমি বায়ু কী ধরনের বায়ু?
উত্তর: সাময়িক বায়ু (Seasonal Wind), নিয়ত বায়ু নয়।
প্রশ্ন: মৌসুমি বায়ু সৃষ্টির মূল কারণ কী?
উত্তর: স্থল ও সমুদ্রের তাপ ও বায়ুচাপের তারতম্য।
প্রশ্ন: বর্ষাকালে বাংলাদেশে মৌসুমি বায়ু কোন দিক থেকে প্রবাহিত হয়?
উত্তর: দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে।
প্রশ্ন: সারাবছর একই দিকে প্রবাহিত হয় কোন বায়ু?
উত্তর: নিয়ত বায়ু (Permanent Wind)।
প্রশ্ন: আয়ন বায়ু কোন ধরনের বায়ুপ্রবাহের অন্তর্গত?
উত্তর: নিয়ত বায়ু।
প্রশ্ন: সাধারণত রাত্রিবেলা স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে যে বায়ু প্রবাহিত হয় তা কী?
উত্তর: স্থল বায়ু (Land Breeze)।
প্রশ্ন: Land Breeze কী?
উত্তর: স্থল থেকে সমুদ্রে প্রবাহিত এক ধরনের বায়ু।
প্রশ্ন: কোন সময় স্থল বায়ু প্রবাহিত হয়?
উত্তর: রাতের বেলায়।
প্রশ্ন: পার্বত্য অঞ্চলে প্রবাহিত স্থানীয় বায়ুকে কী বলা হয়?
উত্তর: ফন (Foehn)।
প্রশ্ন: ফেরেলের সূত্র অনুসারে ভূ-পৃষ্ঠের বায়ুপ্রবাহ উত্তর গোলার্ধে কোন দিকে বাঁকিয়া যায়?
উত্তর: ডান দিকে।
প্রশ্ন: ফেরেলের সূত্র অনুসারে দক্ষিণ গোলার্ধে বায়ু কোন দিকে বাঁকিয়া যায়?
উত্তর: বাম দিকে।
প্রশ্ন: স্বল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ক্ষুদ্র প্রবল ঘূর্ণিবাতকে কী বলে?
উত্তর: টর্নেডো।
প্রশ্ন: জাপান উপকূলে যে ঘূর্ণিঝড় হয় তার নাম কী?
উত্তর: টাইফুন (Typhoon)।
প্রশ্ন: পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের নাম কী?
উত্তর: হারিকেন (Hurricane)।
প্রশ্ন: বৃষ্টিপাত সাধারণত কত প্রকার?
উত্তর: প্রধানত ৩ প্রকার: পরিচলন, শৈলোৎক্ষেপ ও সংঘর্ষ; ঘূর্ণিবৃষ্টিসহ ধরলে ৪ প্রকার।
প্রশ্ন: Orographic (শৈলোৎক্ষেপ) বৃষ্টিপাত কোথায় হয়?
উত্তর: পাহাড়ি এলাকায়।
প্রশ্ন: Convectional (পরিচলন) বৃষ্টিপাত কখন হয়?
উত্তর: উষ্ণ আর্দ্র বায়ু উপরে উঠলে।
প্রশ্ন: Frontal (সংঘর্ষ) বৃষ্টিপাত কখন হয়?
উত্তর: শীতল ও উষ্ণ বায়ুর সংঘর্ষ হলে।
প্রশ্ন: কোন মেঘ বজ্রসহ বৃষ্টিপাত ঘটায়?
উত্তর: কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)।
প্রশ্ন: Isohyet দ্বারা মানচিত্রে কী প্রদর্শন করা হয়?
উত্তর: বৃষ্টিপাত।
প্রশ্ন: বায়ুর সমান চাপবিশিষ্ট স্থানগুলিকে যুক্তকারী কাল্পনিক রেখাকে কী বলে?
উত্তর: আইসোবার (Isobar)।
প্রশ্ন: কোন কারণে বায়ু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হয়?
উত্তর: বায়ুর তাপ ও চাপের পার্থক্যের কারণে।
প্রশ্ন: কোনটি আবহাওয়ার উপাদান নয়?
উত্তর: বন্যা।
প্রশ্ন: জলবায়ুর উপাদান কোনটি?
উত্তর: বৃষ্টিপাত (এবং তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা)।
প্রশ্ন: জলবায়ুর নিয়ামক নয় কোনটি?
উত্তর: দ্রাঘিমাংশ।
প্রশ্ন: তাপমাত্রা, বায়ুর চাপ, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা: এগুলোকে কী বলে?
উত্তর: জলবায়ুর উপাদান।
প্রশ্ন: ভূ-সংস্থানিক প্রভাবক কোনটি?
উত্তর: সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা।
প্রশ্ন: সমুদ্রের নিকটবর্তী স্থানে দিন-রাতের তাপের পার্থক্য কম হয় কেন?
উত্তর: বেশি জলীয় বাষ্প থাকার কারণে।
বায়ুমণ্ডল ও সাধারণ ভূগোল
প্রশ্ন: বায়ুমণ্ডলে কোন উপাদানের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: নাইট্রোজেন (প্রায় ৭৮%)।
প্রশ্ন: ট্রপোমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য কোনটি?
উত্তর: উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে বায়ুর তাপমাত্রা হ্রাস।
প্রশ্ন: বায়ুমণ্ডলের কোন স্তরে বজ্রপাত ঘটে?
উত্তর: ট্রপোমণ্ডল।
প্রশ্ন: বায়ুমণ্ডলের কোন স্তর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীর জীবমণ্ডলকে রক্ষা করে?
উত্তর: ওজনস্ফিয়ার বা ওজোন স্তর।
প্রশ্ন: ভূপৃষ্ঠের সবচেয়ে নিকটবর্তী বায়ুস্তর কোনটি?
উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ার।
প্রশ্ন: ট্রপোপজ কোথায় দেখা যায়?
উত্তর: ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের মাঝে।
প্রশ্ন: বেতার তরঙ্গ কোথায় প্রতিফলিত হয়?
উত্তর: আয়োনোস্ফিয়ারে।
প্রশ্ন: বায়ুমণ্ডলের গভীরতা কত কিলোমিটার?
উত্তর: প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার।
প্রশ্ন: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ কোনটি?
উত্তর: বাংলাদেশ (এবং মালদ্বীপ)।
চটজলদি রিভিশন
পরীক্ষার আগে দ্রুত পুনরাবৃত্তির জন্য এই অধ্যায়ের সকল মূল তথ্য নিচে ঘন বুলেট আকারে সাজানো হলো।
বাংলাদেশের আয়তন ১,৪৭,৫৭০ বর্গকিলোমিটার; অবস্থান ২০°৩৪ʹ-২৬°৩৮ʹ উত্তর, ৮৮°০১ʹ-৯২°৪১ʹ পূর্ব।
কর্কটক্রান্তি রেখা (২৩.৫° উত্তর) বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে; কেন্দ্রবিন্দু ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা।
কর্কটক্রান্তি অতিক্রমকারী জেলা ৯টি: খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা।
ভারত সীমান্ত ৪,১৫৬ কিমি; মিয়ানমার সীমান্ত ২৭১ কিমি; উপকূলরেখা ৭১১ কিমি।
প্রশাসনিক বিভাগ ৮টি; জেলা ৬৪টি; উপজেলা ৪৯৫টি।
ভূপ্রকৃতির তিন অঞ্চল: টারশিয়ারি পাহাড় (১২%), প্লাইস্টোসিন সোপান (৮%), সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি (৮০%)।
সবচেয়ে প্রাচীন ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল টারশিয়ারি যুগের পাহাড়; নবীনতম সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমি।
পাহাড়ি অঞ্চল মূলত চট্টগ্রাম পার্বত্য তিন জেলা (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি) ও সিলেট অঞ্চলে।
সরকারিভাবে সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ তাজিংডং (বিজয়), ১,২৮০ মিটার, বান্দরবান; বিকল্প সাকা হাফং (~১,০৫২ মিটার)।
কেওক্রাডং ৯৮৬ মিটার; চিম্বুক ৭৬৩ মিটার, উভয়ই বান্দরবানে।
প্লাইস্টোসিন সোপানের প্রধান চারটি অংশ: বরেন্দ্রভূমি, মধুপুর গড়, ভাওয়াল গড়, লালমাই-টিপরা গড়।
বৃহত্তম সোপান বরেন্দ্রভূমি (প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিমি, রাজশাহী বিভাগ)।
মধুপুর গড় টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-গাজীপুরে; ভাওয়াল গড় গাজীপুরে; লালমাই কুমিল্লায়; ময়নামতি লালমাইয়ের ওপর।
প্লাবন সমভূমির উপ-অঞ্চল: পার্বত্য পাদদেশীয়, তিস্তা প্লাবন, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবন, মেঘনা প্লাবন, গঙ্গা প্লাবন, হাওর অঞ্চল, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ ও উপকূলীয়।
হাওর সংখ্যা ৪১৪টি; মোট আয়তন প্রায় ৮,৫৮৫ বর্গকিলোমিটার; সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ প্রধান।
একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ ও একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন (নারিকেল জিঞ্জিরা), কক্সবাজার।
বাংলাদেশের সর্বোত্তরের জনপদ তেতুলিয়া (পঞ্চগড়), মহানন্দা নদীর তীরে।
বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের জনপদ ছেঁড়াদ্বীপ, সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণে।
বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমি (Tropical Monsoon); Köppen শ্রেণিতে Aw ও Am।
জলবায়ুর পাঁচ উপাদান: তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ।
জলবায়ুর প্রধান নিয়ামক: অক্ষাংশ, উচ্চতা, সমুদ্র সান্নিধ্য, সমুদ্রস্রোত, পর্বতের অবস্থান, বায়ুপ্রবাহ। দ্রাঘিমাংশ নিয়ামক নয়।
বাংলাদেশে ছয় ঋতু: গ্রীষ্ম (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ), বর্ষা (আষাঢ়-শ্রাবণ), শরৎ (ভাদ্র-আশ্বিন), হেমন্ত (কার্তিক-অগ্রহায়ণ), শীত (পৌষ-মাঘ), বসন্ত (ফাল্গুন-চৈত্র)।
বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ২,৩০০ মিলিমিটার; সিলেট-সুনামগঞ্জে ৫,০০০ মিমি+; রাজশাহীতে ১,৪০০ মিমি।
সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ৪৫.১° সেলসিয়াস, রাজশাহী, ১৯৭২।
সর্বনিম্ন রেকর্ডকৃত তাপমাত্রা ২.৬° সেলসিয়াস, শ্রীমঙ্গল (১৯৬৮); পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া (২০১৮)।
বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ২৬° সেলসিয়াস; উষ্ণতম মাস এপ্রিল; শীতলতম মাস জানুয়ারি।
উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে গড় তাপমাত্রা হ্রাসের হার ৬.৫° সেলসিয়াস/কিলোমিটার (Normal Lapse Rate)।
তাপমাত্রা উৎক্রম (Temperature Inversion): উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে তাপ বৃদ্ধি; প্রধানত স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে।
বৃষ্টিপাতের তিন প্রকার: পরিচলন (Convectional), শৈলোৎক্ষেপ (Orographic), সংঘর্ষ/ফ্রন্টাল (Frontal)। ঘূর্ণিবৃষ্টি বিশেষ ধরন।
বৃষ্টিদায়ক বজ্রসহ মেঘ কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus)।
বায়ু চারটি প্রকার: নিয়ত (বাণিজ্য বায়ু), সাময়িক/ঋতুগত (মৌসুমি বায়ু), স্থানীয় (কালবৈশাখী, লু), দৈনিক (স্থল-সমুদ্র বায়ু)।
মৌসুমি বায়ু সাময়িক বায়ু; নিয়ত বায়ু নয়; ঋতুভেদে দিক পরিবর্তন করে।
মৌসুমি বায়ু সৃষ্টির মূল কারণ স্থল ও সমুদ্রের তাপ-চাপের তারতম্য।
বর্ষায় মৌসুমি বায়ু দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে; শীতে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে।
বার্ষিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫-৮০% দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর সময়।
কালবৈশাখী উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত গ্রীষ্মকালীন প্রবল ঘূর্ণিবাত; প্রাক-মৌসুম ঋতুতে সংঘটিত।
টর্নেডো স্বল্প পরিসরে সংঘটিত ক্ষুদ্র প্রবল ঘূর্ণিবাত; ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল সাটুরিয়ায় বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী টর্নেডো।
চীন-জাপান উপকূলে ঘূর্ণিঝড়ের নাম টাইফুন; যুক্তরাষ্ট্রে হারিকেন; অস্ট্রেলিয়ায় উইলি-উইলি; ভারতীয় উপমহাদেশে সাইক্লোন।
স্থল বায়ু রাতে স্থল থেকে সমুদ্রের দিকে; সমুদ্র বায়ু দিনে সমুদ্র থেকে স্থলের দিকে।
ফেরেলের সূত্র: উত্তর গোলার্ধে বায়ু ডান দিকে, দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বাঁকিয়া যায়।
আইসোবার = সমান বায়ুচাপের রেখা; আইসোহাইট = সমান বৃষ্টিপাতের রেখা; আইসোথার্ম = সমান তাপমাত্রার রেখা।
বায়ুমণ্ডলের ৭৮% নাইট্রোজেন, ২১% অক্সিজেন, ০.৯৩% আর্গন, ০.০৪% কার্বন ডাই-অক্সাইড।
বায়ুমণ্ডলের পাঁচ স্তর: ট্রপোস্ফিয়ার, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার, মেসোস্ফিয়ার, থার্মোস্ফিয়ার, এক্সোস্ফিয়ার।
বজ্রপাত ট্রপোস্ফিয়ারে; বেতার তরঙ্গ প্রতিফলন আয়নোস্ফিয়ারে; ওজোন স্তর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে।
ট্রপোপজ ট্রপোস্ফিয়ার ও স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের মধ্যবর্তী সীমা।
সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদ (১৫তম সংশোধনী, ২০১১) পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়।
পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) প্রতিষ্ঠা ১৯৮৯; পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (BCCSAP) ২০০৯; বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গৃহীত ২০১৮।
IPCC প্রতিষ্ঠা ১৯৮৮ (WMO ও UNEP); AR6 প্রতিবেদন ২০২১-২০২৩; বৈশ্বিক উষ্ণতা ইতোমধ্যে ১.১° সেলসিয়াসের অধিক।
প্যারিস চুক্তি ২০১৫ (COP21); লক্ষ্য ১.৫° সেলসিয়াসের নিচে উষ্ণতা সীমিত রাখা।
সম্পর্কিত SDG: ৬ (পানি), ১১ (টেকসই শহর), ১৩ (জলবায়ু), ১৪ (জলজ), ১৫ (স্থলজ)।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ ১.৩ কোটি বাংলাদেশি অভ্যন্তরীণ জলবায়ু-অভিবাসী হতে পারে (World Bank)।
২০২২ সালের সিলেট-সুনামগঞ্জ বন্যা ১২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পানি স্তরের রেকর্ড।
ঘূর্ণিঝড় রিমাল ২৬-২৭ মে ২০২৪; বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত।
COP28 দুবাই (UAE) ২০২৩; COP29 বাকু (আজারবাইজান) ২০২৪।