বাংলা ব্যাকরণ বচন |
০১ বচন: সংজ্ঞা ও পরিচিতি |
সংজ্ঞা | যে ব্যাকরণিক বিভাগ দ্বারা বিশেষ্য বা সর্বনামের সংখ্যা বা পরিমাণ নির্দেশিত হয়, তাকে বচন বলে। |
বাংলা ব্যাকরণে 'বচন' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। এর আক্ষরিক অর্থ 'কথন' বা 'বলা'। ব্যাকরণিক পরিভাষায় বচন বলতে বোঝায় — কোনো নাম-শব্দ (বিশেষ্য বা সর্বনাম) একটি বস্তু বা প্রাণীকে বোঝাচ্ছে, না একাধিককে — সেই বিষয়টি নির্দেশ করার ব্যবস্থা।
ব্যুৎপত্তি | সংস্কৃত: বচ্ (বলা) + অন (প্রত্যয়) = বচন। বাংলায় এই শব্দ ব্যাকরণিক সংখ্যা নির্দেশে ব্যবহৃত। |
০২ বচনের প্রকারভেদ |
বাংলা ভাষায় বচন দুই প্রকার:
বচনের নাম | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
একবচন | যে বিশেষ্য বা সর্বনাম দ্বারা মাত্র একটি ব্যক্তি, বস্তু বা প্রাণী বোঝায় | বই, মানুষ, গাছ, সে, আমি, তুমি |
বহুবচন | যে বিশেষ্য বা সর্বনাম দ্বারা একাধিক ব্যক্তি, বস্তু বা প্রাণী বোঝায় | বইগুলো, মানুষেরা, গাছসব, তারা, আমরা, তোমরা |
★ মনে রাখুন বাংলায় সংস্কৃতের মতো তিনটি বচন নেই। সংস্কৃতে একবচন, দ্বিবচন ও বহুবচন — এই তিনটি বচন থাকলেও বাংলায় কেবল একবচন ও বহুবচন রয়েছে। |
০৩ একবচন: বিস্তারিত আলোচনা |
একবচনে সাধারণত কোনো বিশেষ বিভক্তি বা প্রত্যয় যোগ হয় না — শব্দটি মূল রূপেই থাকে। তবে কিছু বিশেষ উপায়ে একবচন নির্দেশ করা হয়:
একবচন নির্দেশের উপায়সমূহ |
পদ্ধতি | নিয়ম | উদাহরণ |
মূল শব্দ | কোনো পরিবর্তন ছাড়াই একবচন | বই, মানুষ, পাখি, নদী, ছেলে |
টি / টা প্রত্যয় | নির্দিষ্টতা বোঝাতে 'টি' বা 'টা' যোগ | বইটি, মানুষটা, পাখিটি, ছেলেটা |
খানা / খানি | বস্তুবাচক শব্দে নির্দিষ্টতায় | কাপড়খানা, কাগজখানি |
জন / জনা | ব্যক্তিবাচক শব্দে | লোকজন (বহুতে), একজন মানুষ |
গোটা / গোটি | গোলাকার বস্তুতে | গোটা একটা আম |
✦ একবচনের উদাহরণ বিশ্লেষণ বইটি পড়ছি। (বই = একটি নির্দিষ্ট বই — 'টি' নির্দিষ্টতা নির্দেশক) একটি পাখি গান করছে। (একটি = সংখ্যাবাচক, একবচন স্পষ্ট) মানুষটা চলে গেল। (টা = নির্দিষ্ট একজন) নদীখানা পার হলাম। (খানা = নির্দিষ্ট একটি নদী) একজন ভদ্রলোক এলেন। (একজন = স্পষ্টতই একবচন) সে ভালো ছাত্র। (সে = তৃতীয় পুরুষ একবচন সর্বনাম) |
০৪ বহুবচন: বিস্তারিত আলোচনা ও সকল পদ্ধতি |
বাংলায় বহুবচন তৈরির বেশ কয়েকটি পদ্ধতি রয়েছে। প্রতিটি পদ্ধতি আলাদা প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়।
ক) গুলো / গুলি — সর্বাধিক প্রচলিত বহুবচন প্রত্যয় |
'গুলো' ও 'গুলি' উভয়ই চলতি ভাষায় বহুল ব্যবহৃত। 'গুলো' আধুনিক চলিত ভাষায় বেশি প্রচলিত।
শ্রেণি | উদাহরণ (মূল → বহুবচন) | ব্যবহারের প্রেক্ষাপট |
প্রাণীবাচক শব্দ | পাখি → পাখিগুলো, গরু → গরুগুলো | নির্দিষ্ট প্রাণীর সমূহ |
বস্তুবাচক শব্দ | বই → বইগুলো, কলম → কলমগুলো | নির্দিষ্ট বস্তুর সমূহ |
ব্যক্তিবাচক (কম মর্যাদা) | লোক → লোকগুলো, ছেলে → ছেলেগুলো | ছোটদের বা নিম্নমর্যাদার ক্ষেত্রে |
ভাববাচক বিশেষ্য | কথা → কথাগুলো, কাজ → কাজগুলো | বিমূর্ত বিষয়ের ক্ষেত্রে |
খ) রা / এরা / দের — প্রাণী ও ব্যক্তিবাচক বহুবচন |
মানুষ ও উচ্চতর প্রাণীর বহুবচনে 'রা' বা 'এরা' ব্যবহৃত হয়। এটি মর্যাদাসম্পন্ন ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
প্রত্যয় | প্রয়োগ-নিয়ম | উদাহরণ |
রা | ব্যঞ্জনান্ত শব্দে সরাসরি 'রা' যোগ | ছাত্র+রা=ছাত্ররা, বালক+রা=বালকেরা |
এরা | স্বরান্ত শব্দে 'রা' → উচ্চারণসুবিধার জন্য 'এরা' | মেয়ে+রা=মেয়েরা, ছেলে+রা=ছেলেরা |
দের / দেরকে | সম্বন্ধ ও কর্ম কারকে ব্যবহার | ছাত্রদের, মেয়েদের, শিশুদের |
গণ | সম্মানজনক বহুবচনে (সাধু ভাষায়) | ছাত্রগণ, নেতৃগণ, জনগণ |
বৃন্দ | কাব্যিক/আনুষ্ঠানিক বহুবচনে | সুধীবৃন্দ, দেবীবৃন্দ |
মণ্ডলী | দলবাচক বহুবচনে | সাহিত্যিকমণ্ডলী, পণ্ডিতমণ্ডলী |
★ মনে রাখুন 'রা' প্রত্যয় সাধারণত মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অন্য প্রাণীতে 'গুলো' বেশি স্বাভাবিক। যেমন: গরুরা (চলে), গরুগুলো (বেশি স্বাভাবিক)। |
গ) সমূহ / সকল / সব / আদি / প্রভৃতি — পদ-সহযোগে বহুবচন |
শব্দ/প্রত্যয় | অর্থ ও প্রয়োগ | উদাহরণ | বিশেষ নিয়ম |
সমূহ | একসাথে / সমস্ত | গাছসমূহ, নদীসমূহ | সাধু ও আনুষ্ঠানিক ভাষায় |
সব / সকল | সমস্ত / সর্বাধিক | সব বই, সকল মানুষ | শব্দের আগে বসে |
আদি | ইত্যাদি বোঝাতে | রবীন্দ্রনাথ আদি কবি | পরিসমাপ্তিমূলক |
প্রভৃতি / ইত্যাদি | এবং আরও বোঝাতে | বই, কলম প্রভৃতি | তালিকা শেষে |
সমেত / সহ | একত্রে বোঝাতে | পরিবারসমেত, বন্ধুসহ | সঙ্গ বোঝায় |
বর্গ | শ্রেণিবাচক বহুবচনে | পণ্ডিতবর্গ, কর্মকর্তাবর্গ | আনুষ্ঠানিক |
কুল | বংশ/প্রজাতিবাচকে | কবিকুল, বীরকুল | কাব্যিক ব্যবহার |
ঘ) সংখ্যাবাচক শব্দ দিয়ে বহুবচন |
সংখ্যাবাচক শব্দ ব্যবহার করলে আলাদাভাবে বহুবচন বিভক্তি দেওয়ার প্রয়োজন নেই — সংখ্যাই বহুবচন নির্দেশ করে।
✦ সংখ্যা দিয়ে বহুবচনের উদাহরণ পাঁচটি বই (বইগুলো বলার প্রয়োজন নেই) দশজন মানুষ (মানুষেরা বলার দরকার নেই) তিনটি গরু (গরুগুলো বাড়তি হবে) একশত ছাত্র এসেছে (ছাত্ররা বলার দরকার নেই) সাতটি তারা (তারাগুলো — অপ্রয়োজনীয়) কয়েকটি প্রশ্ন করি (কয়েকটি নিজেই বহুবচন নির্দেশক) |
০৫ বিশেষ ও অনিয়মিত বহুবচন শব্দ |
কিছু শব্দের বহুবচন সাধারণ নিয়মে হয় না — এগুলো বিশেষভাবে মনে রাখতে হয়।
একবচন | বহুবচন | বিশেষ নিয়ম / মন্তব্য |
মানুষ | মানুষ / মানুষেরা / মানুষজন | 'মানুষ' শব্দটি নিজেই বহুবচনে ব্যবহৃত হয় |
লোক | লোক / লোকজন / লোকেরা | 'লোকজন' বিশেষ বহুবচন রূপ |
জন | জনগণ / জনতা | বিশেষ পরিবর্তন |
জাতি | জাতিসমূহ / জাতিরা (বিরল) | 'জাতিসমূহ' বেশি প্রচলিত |
পশু | পশুরা / পশুসমূহ | উভয় রূপ প্রচলিত |
বৃক্ষ | বৃক্ষসমূহ / গাছগুলো | সাধু ও চলিতে ভিন্ন রূপ |
শিশু | শিশুরা / শিশুগণ | উভয় প্রচলিত |
নারী | নারীরা / নারীগণ / নারীজাতি | নারীজাতি = সামগ্রিকভাবে |
বীর | বীরেরা / বীরগণ / বীরকুল | কাব্যে 'বীরকুল' ব্যবহৃত |
সাধু | সাধুরা / সাধুজন | 'সাধুজন' = সৎ মানুষেরা (সমষ্টি) |
০৬ সর্বনামের বচন পরিবর্তন |
সর্বনামের একবচন ও বহুবচন রূপ সম্পূর্ণ আলাদা — বিভক্তি যোগে নয়, নতুন শব্দে পরিবর্তন ঘটে।
পুরুষ | একবচন | বহুবচন | বিশেষ রূপ |
উত্তম পুরুষ | আমি | আমরা | আমাদের (কর্ম/সম্বন্ধ) |
মধ্যম পুরুষ (সাধারণ) | তুমি | তোমরা | তোমাদের |
মধ্যম পুরুষ (ঘনিষ্ঠ) | তুই | তোরা | তোদের |
মধ্যম পুরুষ (সম্মান) | আপনি | আপনারা | আপনাদের |
প্রথম পুরুষ (সাধারণ) | সে | তারা | তাদের |
প্রথম পুরুষ (সম্মান) | তিনি | তাঁরা | তাঁদের |
প্রথম পুরুষ (নিকট) | এ/ইনি | এরা/এঁরা | এদের/এঁদের |
প্রথম পুরুষ (দূর) | ও/উনি | ওরা/ওঁরা | ওদের/ওঁদের |
★ মনে রাখুন 'তিনি' সর্বনামের বহুবচন 'তাঁরা' — এখানে 'ঁ' (চন্দ্রবিন্দু) বাধ্যতামূলক। 'তারা' (বিন্দু ছাড়া) হলে সাধারণ তৃতীয় পুরুষ বহুবচন, মর্যাদার নির্দেশ নেই। |
০৭ বিশেষণের বচন |
বাংলায় বিশেষণ সাধারণত বচনের কারণে পরিবর্তিত হয় না। বিশেষ্যের বচন পরিবর্তন হলেই বিশেষণও বহুবচন বোঝায় — তাকে আলাদাভাবে পরিবর্তন করতে হয় না।
✦ বিশেষণের বচন-নিরপেক্ষতার উদাহরণ ভালো ছেলে → ভালো ছেলেরা (বিশেষণ 'ভালো' অপরিবর্তিত) লম্বা গাছ → লম্বা গাছগুলো ('লম্বা' পরিবর্তন নেই) সুন্দর ফুল → সুন্দর ফুলগুলো ('সুন্দর' অপরিবর্তিত) বড় মানুষ → বড় মানুষেরা ('বড়' পরিবর্তন হয় না) বিদেশি মেহমান → বিদেশি মেহমানরা ('বিদেশি' অপরিবর্তিত) |
০৮ দলবাচক শব্দ ও তাদের বচন |
সংজ্ঞা | যেসব শব্দ নিজেই একাধিক ব্যক্তি বা বস্তুর সমষ্টি বোঝায়, তাকে দলবাচক বা সমষ্টিবাচক বিশেষ্য বলে। এগুলো একবচনের রূপ হলেও বহুত্বের অর্থ বহন করে। |
দলবাচক শব্দ | অর্থ / প্রতিনিধিত্ব | বহুবচনে ব্যবহার |
সেনাবাহিনী | সামরিক দল | সেনাবাহিনীগুলো (একাধিক বাহিনী) |
পরিবার | একটি পরিবারের সবাই | পরিবারগুলো |
দল | একটি গ্রুপ | দলগুলো / দলসমূহ |
সমাজ | মানবগোষ্ঠী | সমাজগুলো |
জনতা | অনেক মানুষ একসাথে | 'জনতা' নিজেই বহুবচনার্থক |
জনগণ | সাধারণ মানুষ সমষ্টি | 'জনগণ' নিজেই বহুবচনার্থক |
সভা | একদল মানুষের সমাবেশ | সভাগুলো |
দেশ | একটি রাষ্ট্র | দেশগুলো / দেশসমূহ |
★ মনে রাখুন 'জনতা' ও 'জনগণ' শব্দ নিজেরাই বহুবাচনিক। এগুলোর সাথে আর 'রা' বা 'গুলো' যোগ করতে হয় না। যেমন: 'জনতারা' বা 'জনগণেরা' ভুল প্রয়োগ। |
০৯ একবচন ও বহুবচনের অর্থগত পার্থক্য |
একই শব্দ একবচন ও বহুবচনে ভিন্ন অর্থ বা ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি করে। নিচের উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করুন:
একবচন প্রয়োগ | বহুবচন প্রয়োগ | অর্থের পার্থক্য |
ছেলেটা চলে গেল | ছেলেরা চলে গেল | একজন বনাম একাধিক |
পাখিটি ডাকছে | পাখিগুলো ডাকছে | নির্দিষ্ট একটি বনাম অনেকগুলো |
বইটি পড়া হয়নি | বইগুলো পড়া হয়নি | একটি বনাম অনেকটি |
সে আসেনি | তারা আসেনি | একজন বনাম অনেকজন |
মানুষটা ভালো | মানুষগুলো ভালো | নির্দিষ্ট একজন বনাম অনেকজন |
ফুলটি ফুটেছে | ফুলগুলো ফুটেছে | একটি বনাম একাধিক |
গরুটি দুধ দেয় | গরুগুলো দুধ দেয় | একটি বনাম অনেকটি |
১০ বচনের অপপ্রয়োগ — ভুল ও শুদ্ধ |
বচনের অপপ্রয়োগ বাংলায় অত্যন্ত প্রচলিত। পরীক্ষায় এ থেকে বহু প্রশ্ন আসে। নিচে বিভিন্ন ধরনের ভুল ও তার সংশোধন দেওয়া হলো:
ক) দ্বিরুক্তিজনিত বচনের অপপ্রয়োগ |
✗ ভুল বচন প্রয়োগ | ✓ শুদ্ধ বচন প্রয়োগ |
গাছগুলো সমূহ | গাছগুলো / গাছসমূহ |
মানুষেরা সবাই | মানুষেরা / সবাই |
ব্যক্তিবর্গ সকলে | ব্যক্তিবর্গ / সকলে |
ছাত্রগণ সকলে | ছাত্রগণ / সকলে |
পাখিগুলোরা | পাখিগুলো |
বইগুলো সব | বইগুলো / সব বই |
ফুলগুলো সমস্ত | ফুলগুলো / সমস্ত ফুল |
দলসমূহ গুলো | দলগুলো / দলসমূহ |
সংবাদসমূহ সব | সংবাদসমূহ / সব সংবাদ |
জনগণেরা | জনগণ |
জনতারা | জনতা |
পরিবারবর্গ গুলো | পরিবারবর্গ / পরিবারগুলো |
খ) সংখ্যার সাথে অপ্রয়োজনীয় বহুবচন |
✗ সংখ্যা + বহুবচন (ভুল) | ✓ শুধু সংখ্যা (শুদ্ধ) |
দশটি বইগুলো | দশটি বই |
পাঁচজন মানুষেরা | পাঁচজন মানুষ |
তিনটি গরুগুলো | তিনটি গরু |
সাতটি ফুলগুলো | সাতটি ফুল |
কয়েকটি প্রশ্নগুলো | কয়েকটি প্রশ্ন |
একশত ছাত্রেরা | একশত ছাত্র |
বিশটি গাছসমূহ | বিশটি গাছ |
দুটি বইটি | দুটি বই |
গ) লিঙ্গ-বচনের অসংগতি |
✗ দ্বৈত বহুবচন চিহ্ন (ভুল) | ✓ একটিমাত্র বহুবচন চিহ্ন (শুদ্ধ) |
মহিলারা গণ | মহিলারা / মহিলাগণ |
নারীগণেরা | নারীগণ |
সুধীবৃন্দগণ | সুধীবৃন্দ / সুধীগণ |
ছাত্রীরা গণ | ছাত্রীরা / ছাত্রীগণ |
কর্মকর্তাবর্গেরা | কর্মকর্তাবর্গ |
পণ্ডিতমণ্ডলীগণ | পণ্ডিতমণ্ডলী / পণ্ডিতগণ |
১১ বচনের বিশেষ নিয়মাবলী |
✦ নিয়ম ১: 'টি/টা' একবচন নির্দিষ্টতা-বোধক, বহুবচনে 'গুলো/গুলি' একবচন নির্দিষ্ট: বইটি, পাখিটা, মানুষটা বহুবচন নির্দিষ্ট: বইগুলো, পাখিগুলো, মানুষগুলো একবচন অনির্দিষ্ট: একটি বই, একটা পাখি বহুবচন অনির্দিষ্ট: কিছু বই, কয়েকটি পাখি |
✦ নিয়ম ২: বহুবচন-বোধক শব্দের সাথে আর বহুবচন প্রত্যয় যোগ নয় সব (নিজেই বহুবচন) → সব বই ✓ | সব বইগুলো ✗ সকল (নিজেই বহুবচন) → সকল মানুষ ✓ | সকল মানুষেরা ✗ সমস্ত → সমস্ত ফুল ✓ | সমস্ত ফুলগুলো ✗ প্রতিটি (একক বোঝায়) → প্রতিটি বই ✓ | প্রতিটি বইগুলো ✗ অনেক → অনেক মানুষ ✓ | অনেক মানুষেরা ✗ কিছু → কিছু প্রশ্ন ✓ | কিছু প্রশ্নগুলো ✗ |
✦ নিয়ম ৩: সর্বনামে বচন পরিবর্তনে সম্পূর্ণ নতুন শব্দ আমি → আমরা (প্রত্যয় যোগে নয়, নতুন রূপ) তুমি → তোমরা সে → তারা তিনি → তাঁরা (চন্দ্রবিন্দু রক্ষণীয়) ভুল: 'আমিরা', 'তুমিরা', 'সেরা' — এভাবে হয় না |
✦ নিয়ম ৪: মর্যাদা অনুযায়ী বহুবচন প্রত্যয়ের ব্যবহার উচ্চ মর্যাদা: গণ, বৃন্দ, মণ্ডলী, বর্গ → নেতৃগণ, সুধীবৃন্দ, পণ্ডিতমণ্ডলী, কর্মকর্তাবর্গ সাধারণ মানুষ: রা/এরা → ছাত্ররা, মানুষেরা, কৃষকেরা নিম্নমর্যাদা বা বস্তু: গুলো/গুলি → কুকুরগুলো, পাথরগুলো, জিনিসগুলো |
১২ দ্রুত রেফারেন্স: একবচন → বহুবচন রূপান্তর |
★ মনে রাখুন নিচের তালিকায় পরীক্ষায় আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর বহুবচন রূপ দেওয়া হলো। |
ক) মানুষবাচক শব্দের বহুবচন |
শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন |
ছাত্র→ছাত্ররা | ছাত্রী→ছাত্রীরা | শিক্ষক→শিক্ষকেরা |
নেতা→নেতারা | কবি→কবিরা | শিশু→শিশুরা |
বীর→বীরেরা | সাধু→সাধুরা | মেয়ে→মেয়েরা |
ছেলে→ছেলেরা | বালক→বালকেরা | বালিকা→বালিকারা |
মানুষ→মানুষেরা | লোক→লোকেরা | নারী→নারীরা |
পুরুষ→পুরুষেরা | কৃষক→কৃষকেরা | শ্রমিক→শ্রমিকেরা |
খ) প্রাণীবাচক শব্দের বহুবচন |
শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন |
পাখি→পাখিগুলো | গরু→গরুগুলো | ঘোড়া→ঘোড়াগুলো |
বিড়াল→বিড়ালগুলো | কুকুর→কুকুরগুলো | মাছ→মাছগুলো |
সাপ→সাপগুলো | ব্যাঘ্র→ব্যাঘ্রগুলো | হাতি→হাতিগুলো |
হরিণ→হরিণগুলো | পিঁপড়া→পিঁপড়াগুলো | মৌমাছি→মৌমাছিগুলো |
গ) বস্তু ও ভাববাচক শব্দের বহুবচন |
শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন | শব্দ → বহুবচন |
বই→বইগুলো | কলম→কলমগুলো | টেবিল→টেবিলগুলো |
চেয়ার→চেয়ারগুলো | গাছ→গাছগুলো | ফুল→ফুলগুলো |
নদী→নদীগুলো | পাহাড়→পাহাড়গুলো | ঘর→ঘরগুলো |
কথা→কথাগুলো | কাজ→কাজগুলো | প্রশ্ন→প্রশ্নগুলো |
উত্তর→উত্তরগুলো | বিষয়→বিষয়গুলো | নিয়ম→নিয়মগুলো |
১৩ বাক্যে বচনের প্রভাব: সমন্বয়-বিধি |
নিয়ম | বাক্যে বিশেষ্যের বচনের সাথে ক্রিয়ার বচন মিলিয়ে চলতে হয়। এই মিলকে বচন-সমন্বয় বলে। |
কর্তা | বচন | ক্রিয়ার রূপ | উদাহরণ |
আমি | একবচন | করি/করেছি | আমি পড়ি। |
আমরা | বহুবচন | করি/করেছি | আমরা পড়ি। (রূপ একই, অর্থ ভিন্ন) |
তুমি | একবচন | করো/কর | তুমি পড়ো। |
তোমরা | বহুবচন | করো/কর | তোমরা পড়ো। |
সে | একবচন | করে | সে পড়ে। |
তারা | বহুবচন | করে | তারা পড়ে। |
তিনি | একবচন (সম্মান) | করেন | তিনি পড়েন। |
তাঁরা | বহুবচন (সম্মান) | করেন | তাঁরা পড়েন। |
★ মনে রাখুন বাংলায় 'আমি করি' ও 'আমরা করি' — উভয়ে ক্রিয়ারূপ একই। তাই প্রেক্ষাপট থেকে বুঝতে হয়। কিন্তু 'সে করে' (একবচন) ও 'তারা করে' (বহুবচন) — এখানেও ক্রিয়া একই রূপে থাকে। |
১৪ পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ: ভুল খুঁজে বের করুন |
নিচের বাক্যগুলোতে বচনের ভুল বিশ্লেষণ করা হয়েছে — এ ধরনের প্রশ্ন BCS ও ব্যাংক পরীক্ষায় প্রায়ই আসে:
ভুল বাক্য | ত্রুটি কোথায় | শুদ্ধ বাক্য |
ছাত্রগণ সকলে পরীক্ষা দিয়েছে | 'গণ' ও 'সকলে' — উভয় বহুবচন নির্দেশক | ছাত্রগণ পরীক্ষা দিয়েছে |
পাঁচটি গাছগুলো বড় হয়েছে | 'পাঁচটি' + 'গুলো' — দ্বিরুক্তি | পাঁচটি গাছ বড় হয়েছে |
জনগণেরা রাস্তায় নেমেছে | 'জনগণ' নিজেই বহুবচনার্থক | জনগণ রাস্তায় নেমেছে |
সব মানুষেরা চলে গেছে | 'সব' ও 'এরা' — দ্বৈত বহুবচন | সব মানুষ / মানুষেরা চলে গেছে |
কুকুরগুলোরা ডাকছে | 'গুলো' + 'রা' — দ্বৈত বহুবচন | কুকুরগুলো ডাকছে |
তাঁরা সকলে এসেছেন | 'তাঁরা' ও 'সকলে' — মোটামুটি চলে, তবে | তাঁরা এসেছেন / তাঁদের সবাই এসেছেন |
তিনিরা এলেন | সর্বনামে ভুল বহুবচন — 'তিনিরা' নেই | তাঁরা এলেন |
আমিরা পারব | সর্বনামে ভুল বহুবচন | আমরা পারব |
সুধীবৃন্দগণ উপস্থিত | 'বৃন্দ' ও 'গণ' — দ্বৈত উচ্চমর্যাদার বহুবচন | সুধীবৃন্দ উপস্থিত / সুধীগণ উপস্থিত |
অনেক মানুষেরা এসেছে | 'অনেক' + 'এরা' — দ্বৈত বহুবচন | অনেক মানুষ এসেছে |
১৫ বচন বিভাগের তুলনামূলক সারণি |
বহুবচন প্রত্যয় | ব্যবহারের ক্ষেত্র | মর্যাদার স্তর | উদাহরণ |
গুলো / গুলি | বস্তু, নিম্নমর্যাদার প্রাণী ও ব্যক্তি | নিম্ন / সাধারণ | বইগুলো, কুকুরগুলো, লোকগুলো |
রা / এরা | মানুষ ও উচ্চতর প্রাণী | সাধারণ থেকে মধ্যম | ছাত্ররা, মেয়েরা, বালকেরা |
গণ | উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ | উচ্চ | নেতৃগণ, ছাত্রগণ, পণ্ডিতগণ |
বৃন্দ | অত্যন্ত সম্মানজনক / কাব্যিক | সর্বোচ্চ | সুধীবৃন্দ, দেবীবৃন্দ |
মণ্ডলী | দলবাচক সম্মানজনক | উচ্চ | পণ্ডিতমণ্ডলী, সাহিত্যিকমণ্ডলী |
বর্গ | পেশাগত/আনুষ্ঠানিক | উচ্চ | কর্মকর্তাবর্গ, শিক্ষকবর্গ |
সমূহ | সাধু ভাষায় যেকোনো বহুবচন | আনুষ্ঠানিক | গাছসমূহ, নদীসমূহ |
কুল | বংশ বা প্রজাতিবাচক | কাব্যিক | কবিকুল, বীরকুল |
জন / জনা | ব্যক্তিগণনায় | সাধারণ | পাঁচজন, কতজনা |
দের / দেরকে | কর্ম ও সম্বন্ধ কারকে | যেকোনো | ছাত্রদের, মানুষদের |
১৬ বচনের মূল নীতিসমূহ — সারসংক্ষেপ |
মূলনীতি ১ | একই শব্দে দুটি বহুবচন চিহ্ন ব্যবহার করা যাবে না — এটি দ্বিরুক্তি দোষ। |
মূলনীতি ২ | সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে বহুবচন প্রত্যয় যোগ করতে হয় না। সংখ্যাই বহুবচন নির্দেশ করে। |
মূলনীতি ৩ | 'সব', 'সকল', 'সমস্ত', 'অনেক' — এগুলো নিজেই বহুবচনার্থক, তাই এদের সাথে বহুবচন প্রত্যয় যোগ অপ্রয়োজনীয়। |
মূলনীতি ৪ | সর্বনামের বহুবচন সম্পূর্ণ নতুন শব্দ — 'আমিরা', 'তুমিরা' ইত্যাদি বলা যাবে না। |
মূলনীতি ৫ | মর্যাদা অনুযায়ী সঠিক বহুবচন প্রত্যয় বাছাই করতে হবে — 'গণ/বৃন্দ' উচ্চমর্যাদায়, 'গুলো' নিম্ন বা বস্তুতে। |
মূলনীতি ৬ | 'জনগণ', 'জনতা' শব্দগুলো নিজেই বহুবচনার্থক — এদের সাথে 'রা' বা 'এরা' যোগ করা ভুল। |
মূলনীতি ৭ | বিশেষণ বচনের কারণে পরিবর্তিত হয় না — বিশেষ্যের সাথে বিশেষণ একই রূপে থাকে। |