বাংলা সাহিত্য
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য
(১২০১ — ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ)
মঙ্গলকাব্য • বৈষ্ণব পদাবলি • অনুবাদ সাহিত্য • রোমান্টিক কাব্য • চৈতন্য সাহিত্য • লোকসাহিত্য
১. মধ্যযুগ — পরিচিতি, সীমানা ও বিভাজন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে 'মধ্যযুগ' বলা হয়। প্রায় ছয় শত বছরের এই দীর্ঘ সময়ে বাংলা সাহিত্য নানা ধারায় বিকশিত হয়েছে। মুসলমান শাসনের প্রভাব, ভক্তি আন্দোলন, হিন্দু-মুসলমানের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ এবং বাংলার সামাজিক পরিবর্তন — সব মিলিয়ে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য এক অনন্য সৃষ্টির ভাণ্ডার।
★ মধ্যযুগের সময়সীমা: ১২০১ — ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ (প্রায় ৬০০ বছর)। মধ্যযুগকে তিনটি উপবিভাগে ভাগ করা যায়।
পর্যায় | সময়কাল | বৈশিষ্ট্য |
প্রথম মধ্যযুগ | ১২০১-১৩৫০ | 'অন্ধকার যুগ' বা 'তামস যুগ'; সাহিত্যের কোনো উল্লেখযোগ্য নিদর্শন পাওয়া যায় না |
মধ্য মধ্যযুগ | ১৩৫০-১৬০০ | মঙ্গলকাব্যের বিকাশ; বৈষ্ণব পদাবলির উদ্ভব; শ্রীচৈতন্যের প্রভাব |
শেষ মধ্যযুগ | ১৬০০-১৮০০ | রোমান্টিক প্রণয়কাব্য; শাক্ত পদাবলি; ময়মনসিংহ গীতিকা; ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল |
মধ্যযুগের সাহিত্যের প্রধান ধারাসমূহ
মঙ্গলকাব্য — মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল
বৈষ্ণব পদাবলি — চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস
অনুবাদ সাহিত্য — কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কাশীরামের মহাভারত, মালাধর বসুর শ্রীকৃষ্ণবিজয়
রোমান্টিক প্রণয়কাব্য — আলাওল, দৌলত কাজী, মাগন ঠাকুর
নাথ সাহিত্য — গোর্ক্ষবিজয়, গোপীচন্দ্রের গান, ময়নামতীর গান
চৈতন্যজীবনী সাহিত্য — চৈতন্যভাগবত, চৈতন্যচরিতামৃত
লোকসাহিত্য ও গীতিকা — ময়মনসিংহ গীতিকা, পূর্ববঙ্গ গীতিকা
শাক্ত পদাবলি — রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য
২. অন্ধকার যুগ বা তামস যুগ (১২০১-১৩৫০)
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ১২০১ থেকে ১৩৫০ সাল পর্যন্ত দেড়শো বছরকে 'অন্ধকার যুগ' বা 'তামস যুগ' বলা হয়। বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের (১২০৩) পরে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দু রাজ সংস্কৃতির অবসান, বৌদ্ধ মঠ ও পাঠশালার ধ্বংস এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণে এই দীর্ঘ সময়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্যকর্ম তৈরি হয়নি বলে ধারণা করা হয়।
★ 'অন্ধকার যুগ' কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন — ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তবে অনেক গবেষক মনে করেন এই যুগ আসলে 'অন্ধকার' ছিল না — সাহিত্যের নিদর্শন হারিয়ে গেছে মাত্র।
★ অন্ধকার যুগের কারণ: (১) বখতিয়ার খলজির আক্রমণ (১২০৩), (২) হিন্দু পৃষ্ঠপোষকতার অবসান, (৩) বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস, (৪) সামাজিক অস্থিরতা।
★ ট্রিকি: বাংলা সাহিত্যে 'অন্ধকার যুগের একমাত্র নিদর্শন' হিসেবে 'শূন্যপুরাণ' (রামাই পণ্ডিত রচিত) নামটি উল্লেখ করা হয়। এটি ধর্মমঙ্গল ধারার পূর্বসূরি।
৩. মঙ্গলকাব্য — পরিচয় ও বিশ্লেষণ
মঙ্গলকাব্য বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সবচেয়ে বিস্তৃত ও সমৃদ্ধ শাখা। পঞ্চদশ শতকের শেষভাগ থেকে অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ পর্যন্ত মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছিল। পৌরাণিক ও লৌকিক দেব-দেবীর মাহাত্ম্য, পূজা প্রচার ও ভক্তকাহিনি অবলম্বনে রচিত সম্প্রদায়গত প্রচারধর্মী আখ্যানমূলক কাব্যকেই মঙ্গলকাব্য বলা হয়।
'মঙ্গল' শব্দের অর্থ কল্যাণ বা শুভ। মঙ্গলকাব্যের দুটি উৎস-তত্ত্ব আছে: (১) মঙ্গলবার থেকে পরের মঙ্গলবার পর্যন্ত গাওয়া হতো বলে মঙ্গলকাব্য। (২) দেবতার মঙ্গল গান করা হয় বলে মঙ্গলকাব্য।
★ দীনেশচন্দ্র সেনের মতে, প্রায় ৬২ জন কবি মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন।
★ একটি সম্পূর্ণ মঙ্গলকাব্যে সাধারণত ৫টি অংশ থাকে: (১) বন্দনা, (২) আত্মপরিচয়, (৩) দেবখণ্ড, (৪) নরখণ্ড, (৫) সংহিতা।
★ মনসামঙ্গল ৩০টি পালায় এবং চণ্ডীমঙ্গল ১৬টি পালায় বিভক্ত।
মঙ্গলকাব্যের প্রকারভেদ
শ্রেণি | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
পৌরাণিক মঙ্গলকাব্য | অন্নদামঙ্গল, কমলামঙ্গল, দুর্গামঙ্গল | পুরাণের দেবদেবীকেন্দ্রিক; অন্নপূর্ণা, দুর্গা প্রমুখ পৌরাণিক দেবীর মাহাত্ম্য |
লৌকিক মঙ্গলকাব্য | মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল | লৌকিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য; বণিক ও নিম্নবর্গের মানুষের প্রাধান্য |
★ 'মঙ্গল' নামে থাকলেও মঙ্গলকাব্য নয়: চৈতন্যমঙ্গল, গোবিন্দমঙ্গল — এগুলো বৈষ্ণব সাহিত্যের অংশ।
★ বিহারীলাল চক্রবর্তীর 'সারদামঙ্গল' কাব্য মঙ্গলকাব্য নয় — এটি আধুনিক গীতিকাব্য।
৩.১ মনসামঙ্গল কাব্য (Manasa Mangal)
মনসামঙ্গল বা পদ্মাপুরাণ মঙ্গলকাব্য ধারার সবচেয়ে প্রাচীন ও প্রধান কাব্য। সর্পদেবী মনসার মাহাত্ম্য প্রচার এই কাব্যের মূল উদ্দেশ্য। পশ্চিমবঙ্গে এটি 'মনসামঙ্গল' এবং পূর্ববঙ্গে 'পদ্মাপুরাণ' নামে পরিচিত।
★ মনসামঙ্গল = আদি মঙ্গলকাব্য। কারণ: এটি সবচেয়ে পুরনো মঙ্গলকাব্যধারা।
★ মনসা দেবীর অপর নাম: কেতকা, পদ্মাবতী, পদ্মা, বিষহরি। এ কারণেই কাব্যটির নাম 'পদ্মাপুরাণ'।
পদ | কবির নাম | বিশেষ তথ্য |
আদি কবি | কানাহরি দত্ত | আনু. ১৩শ-১৪শ শতক; রাঢ় অঞ্চলের কবি; তাঁর কাব্যের বেশিরভাগ হারিয়ে গেছে |
প্রথম পূর্ণাঙ্গ কবি | নারায়ণ দেব | পূর্ববঙ্গের কবি; বর্তমান কিশোরগঞ্জে জন্ম; কাব্যের নাম 'পদ্মপুরাণ' |
শ্রেষ্ঠ কবি (পূর্ববঙ্গ) | বিজয় গুপ্ত | বরিশাল জেলার গৈলা (ফুলশ্রী) গ্রামে জন্ম; কাব্যের নাম 'পদ্মপুরাণ'; সুলতান হুসেন শাহের রাজত্বে রচিত |
শ্রেষ্ঠ কবি (পশ্চিমবঙ্গ) | কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ | উপাধি 'কেতকাদাস'; মূল নাম ক্ষেমানন্দ; জনপ্রিয়তায় সর্বোচ্চ; সপ্তদশ শতক |
পূর্ববঙ্গের বিখ্যাত কবি | দ্বিজ বংশীদাস | পূর্ববাংলার কবি; চাঁদ সদাগর চরিত্রের শ্রেষ্ঠ রূপকার |
অন্যান্য কবি | ষষ্ঠীবর দত্ত, জীবন মৈত্র, রাধানাথ, তন্ত্রবিভূতি | ষষ্ঠীবর দত্তের উপাধি 'গুণরাজ খাঁ'; বিভিন্ন শতকের প্রতিনিধি কবি |
মনসামঙ্গলের প্রধান চরিত্রসমূহ
চরিত্র | পরিচয় |
চাঁদ সদাগর | কেন্দ্রীয় চরিত্র; চম্পকনগরের বণিক; মনসা দেবীর পূজা করতে অস্বীকার করেন — তাই দেবীর রোষে পড়েন |
সনকা | চাঁদ সদাগরের পত্নী; স্বামীর অনুগত কিন্তু মনসার পূজায় বিশ্বাসী |
লখিন্দর (অনিরুদ্ধ) | চাঁদ সদাগরের পুত্র; লোহার বাসরঘরে সাপের কামড়ে মৃত্যু; মনসার ক্রোধের শিকার |
বেহুলা | লখিন্দরের পত্নী; বেহুলার সতীত্ব ও ভালোবাসাই এই কাব্যের প্রধান উপজীব্য; মৃত স্বামীকে নিয়ে ভেলায় স্বর্গে যান; দেবতাদের মন জয় করে স্বামীকে জীবিত ফিরিয়ে আনেন |
মনসা দেবী | সর্পদেবী; পদ্মা বা কেতকা নামেও পরিচিত; চাঁদ সদাগরের কাছ থেকে পূজা চান |
বিজয় সাধু | চাঁদ সদাগরের পিতা |
মনসামঙ্গলের কাহিনি — সংক্ষেপে
মনসামঙ্গলের মূল কাহিনি দুটি —
(১) চাঁদ সদাগরের বিদ্রোহ ও মনসার রোষ এবং
(২) বেহুলা-লখিন্দরের প্রেমকাহিনি। চম্পকনগরের ধনী বণিক চাঁদ সদাগর শিবের উপাসক। মনসা দেবী তাঁর কাছে পূজা চাইলে তিনি অস্বীকার করেন। দেবীর রোষে চাঁদ সদাগরের ব্যবসায় ক্ষতি হয়, সন্তানরা মারা যায়। শেষ পুত্র লখিন্দর লোহার বাসরঘরে বিয়ের রাতে সর্পাঘাতে মারা যায়। পতিভক্ত বেহুলা মৃত স্বামীকে ভেলায় নিয়ে স্বর্গে যান। সেখানে তাঁর সতীত্ব ও নৃত্যে দেবতারা সন্তুষ্ট হন এবং লখিন্দরকে জীবিত করেন। অবশেষে চাঁদ সদাগর বাম হাতে মনসাকে পূজা দেন — দেবীর পূজা স্বীকৃত হয়।
★ ট্রিকি: চাঁদ সদাগর 'বাম হাতে' মনসার পূজা দিয়েছিলেন — এটি অনিচ্ছার প্রতীক। বিসিএসে আসে।
★ মনসার গান রাঢ়বঙ্গে 'ঝাপান' নামে পরিচিত।
৩.২ চণ্ডীমঙ্গল কাব্য (Chandimangal)
চণ্ডীমঙ্গল মনসামঙ্গলের পরেই মঙ্গলকাব্যের দ্বিতীয় প্রধান ধারা। দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য প্রচারই এই কাব্যের উদ্দেশ্য। চণ্ডী ও অন্নদা অভিন্ন — একই দেবীর দুই নাম। চণ্ডীমঙ্গলের সর্বাধিক প্রসার ঘটে ষোড়শ শতকে।
পদ | কবির নাম | বিশেষ তথ্য |
আদি কবি | মানিক দত্ত | চতুর্দশ শতক; মুকুন্দরাম তাঁর পূর্বসূরি স্বীকার করেছেন |
শ্রেষ্ঠ কবি | মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | উপাধি 'কবিকঙ্কন'; ষোড়শ শতক; জমিদার রঘুনাথ রায় 'কবিকঙ্কন' উপাধি দেন; গ্রন্থের নাম 'অভয়ামঙ্গল' বা 'কবিকঙ্কণ চণ্ডী' |
স্বভাব কবি | দ্বিজ মাধব | চণ্ডীমঙ্গলের 'স্বভাব কবি' — সহজাত কাব্যপ্রতিভার জন্য |
অন্য উল্লেখযোগ্য | দ্বিজ রামদেব, হরিরাম, মুকুন্দ | বিভিন্ন সংস্করণের রচয়িতা |
চণ্ডীমঙ্গলের কাহিনির দুটি খণ্ড
আখেটিক খণ্ড — কালকেতু ও ফুল্লরার কাহিনি; ব্যাধ কালকেতু চণ্ডীর কৃপায় রাজা হন
বণিক খণ্ড — ধনপতি সদাগর, তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত ও স্ত্রী খুল্লনার কাহিনি
চণ্ডীমঙ্গলের প্রধান চরিত্রসমূহ
চরিত্র | পরিচয় |
কালকেতু | ব্যাধ (শিকারি); চণ্ডীর কৃপায় গুজরাটেশ্বর রাজা হন; আখেটিক খণ্ডের নায়ক |
ফুল্লরা | কালকেতুর স্ত্রী; প্রেম ও পতিভক্তির প্রতীক |
ধনপতি সদাগর | বণিক খণ্ডের কেন্দ্রীয় চরিত্র; শ্রীমন্তের পিতা |
ভাড়ুদত্ত | চণ্ডীমঙ্গলের খলচরিত্র; ধূর্ত ও প্রতারক; পরীক্ষায় প্রায়ই আসে |
★ মুকুন্দরামের বিখ্যাত উক্তি: 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়' — এটি চণ্ডীমঙ্গল থেকে।
★ মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর কাব্যে 'কালকেতু' চরিত্রটি সমাজের নিম্নবর্গের প্রতিনিধি — এটি মধ্যযুগীয় সাহিত্যে দুর্লভ।
৩.৩ ধর্মমঙ্গল কাব্য
ধর্মমঙ্গল মঙ্গলকাব্যের তৃতীয় প্রধান ধারা। ধর্মঠাকুর একটি লোকদেবতা — যিনি রাঢ়বঙ্গে বিশেষভাবে পূজিত। ধর্মঠাকুর মূলত বৌদ্ধ ধর্মের বুদ্ধের সাথে হিন্দু দেবতার সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া লোকদেবতা।
কবির নাম | উপাধি / বিশেষণ | তথ্য |
ময়ূর ভট্ট | আদি কবি | ধর্মমঙ্গলের প্রথম কবি |
রূপরাম চক্রবর্তী | অষ্টাদশ শতক | ধর্মমঙ্গলের উল্লেখযোগ্য কবি |
ঘনরাম চক্রবর্তী | শ্রেষ্ঠ কবি | 'কবিরঞ্জন' উপাধি; অষ্টাদশ শতক; ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা |
★ ধর্মমঙ্গলের প্রধান কাহিনি: 'লাউসেনের কাহিনি' — রাজা লাউসেন ধর্মঠাকুরের ভক্ত। ধর্মঠাকুরের আরেকটি কাহিনি 'রঞ্জাবতীর কাহিনি'।
★ ঘনরাম চক্রবর্তীর উপাধি 'কবিরঞ্জন' — মঙ্গলকাব্যে পরীক্ষায় প্রায়ই আসে।
৩.৪ অন্নদামঙ্গল কাব্য — মঙ্গলকাব্যের সমাপ্তি
★ অন্নদামঙ্গল রচনার মাধ্যমে মঙ্গলকাব্যের যুগের অবসান ঘটে। রচয়িতা ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর।
অন্নদামঙ্গল ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের সর্বোচ্চ নাট্যকীর্তি এবং বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ পরিপক্ক মঙ্গলকাব্য। এটি রচিত হয় ১৭৫২-৫৩ সালে।
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর
জন্ম | ১৭১২ সালে হাওড়া জেলার পান্ডুয়া গ্রামে (ভুরসুট পরগনার পেড়ো) |
মৃত্যু | ১৭৬০ সালে |
উপাধি | রায়গুণাকর (কৃষ্ণনগর রাজ সভার মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র প্রদত্ত) |
কৌলিক উপাধি | মুখোপাধ্যায় |
পৃষ্ঠপোষক | নবাব আলিবর্দি খান ও কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায় |
'যুগসন্ধির কবি' | একদিকে মধ্যযুগীয় বিষয়বস্তু, অন্যদিকে মানবতাবাদ ও রোমান্টিক প্রণয় — তাই তাঁকে 'যুগসন্ধির কবি' বলা হয় |
প্রধান রচনা | অন্নদামঙ্গল (১৭৫২), বিদ্যাসুন্দর (কালিকামঙ্গলের অন্তর্ভুক্ত), নদীয়াকাহিনি |
অন্নদামঙ্গলের তিনটি খণ্ড
অন্নদামঙ্গল খণ্ড — দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম্য; মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গলের অনুকরণে
বিদ্যাসুন্দর খণ্ড — বিদ্যা ও সুন্দরের প্রেমকাহিনি; রোমান্টিক ও শৃঙ্গারপ্রধান
মানসিংহ ভবানন্দ খণ্ড — ঐতিহাসিক চরিত্র মানসিংহ ও ভবানন্দের কাহিনি
★ ভারতচন্দ্রের বিখ্যাত উক্তি: 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে' — অন্নদামঙ্গল থেকে।
★ ভারতচন্দ্র তাঁর কাব্যকে বলেছেন 'নূতন মঙ্গল'।
★ অন্নদামঙ্গলের সবচেয়ে আলোচিত অংশ হলো 'বিদ্যাসুন্দর' — এর শৃঙ্গার রস ও কাহিনি বিখ্যাত।
৪. বৈষ্ণব পদাবলি — মধ্যযুগের অমর সম্পদ
বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা মধ্যযুগীয় সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা অবলম্বনে রচিত এই গীতিকবিতাগুলো ভক্তি ও প্রেমের এক অপূর্ব সমন্বয়। বৈষ্ণব সমাজে এটি 'মহাজন পদাবলি' নামে পরিচিত।
★ বৈষ্ণব পদাবলির আদি বাঙালি কবি — জয়দেব (গীতগোবিন্দের রচয়িতা)।
★ বৈষ্ণব পদাবলির মহাকবি চতুষ্টয়: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস।
★ বৈষ্ণব পদাবলিতে মুখ্য রস পাঁচটি — শ্রেষ্ঠ হলো শৃঙ্গার বা মধুর রস।
বৈষ্ণব পদাবলির যুগ বিভাজন
যুগ | সময়কাল | প্রধান কবি |
প্রাক্-চৈতন্য যুগ | ১৪শ-১৫শ শতক | বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস |
চৈতন্য যুগ | ১৬শ শতকের প্রথমার্ধ | বাসু ঘোষ, মাধব ঘোষ, গোবিন্দ ঘোষ, নরহরি সরকার, মুরারি গুপ্ত |
চৈতন্যোত্তর যুগ | ১৬শ-১৭শ শতক | জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস, নরোত্তম দাস |
৪.১ বিদ্যাপতি — 'মৈথিলী কোকিল'
পরিচয় | তথ্য |
জন্মস্থান | মিথিলা (বর্তমান বিহার); ১৪শ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভাব |
রাজ পৃষ্ঠপোষক | মিথিলারাজ শিবসিংহ |
উপাধি | 'মৈথিলী কোকিল', 'অভিনব জয়দেব', 'কবি সার্বভৌম', 'খেলন কবি' |
ভাষা | ব্রজবুলি (মৈথিলী + অপভ্রংশের মিশ্রণে তৈরি কৃত্রিম ভাষা) — পদাবলি রচনায় ব্যবহৃত |
পদ সংখ্যা | রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক ৫০০টিরও বেশি পদ |
অন্য রচনা | কীর্তিলতা, পুরুষপরীক্ষা, ভূপরিক্রমা, লিখনাবলী, গঙ্গাবাক্যাবলী (সংস্কৃত ও মৈথিলীতে) |
★ বিদ্যাপতি বাঙালি নন — মিথিলার কবি। তবু বাংলা সাহিত্যে অন্তর্ভুক্তির কারণ: মিথিলার সাথে বাংলার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, জয়দেবের প্রভাব এবং চৈতন্যদেবের দ্বারা তাঁর পদ আস্বাদন।
★ 'অভিনব জয়দেব' — বিদ্যাপতির পদে জয়দেবের গীতগোবিন্দের প্রভাব আছে বলে এই উপাধি।
৪.২ চণ্ডীদাস — 'সব্বার উপরে মানুষ সত্য'
চণ্ডীদাস বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিতর্কিত কবি। 'চণ্ডীদাস সমস্যা' বাংলা সাহিত্যের একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। গবেষকরা মনে করেন 'চণ্ডীদাস' নামে একাধিক কবি থাকতে পারেন।
প্রকৃত নাম | অনিশ্চিত; সম্ভবত ষোড়শ-পঞ্চদশ শতকের কবি |
চণ্ডীদাস সমস্যা | একটি না একাধিক চণ্ডীদাস? তিন বা চারজন চণ্ডীদাস থাকতে পারেন — বড় চণ্ডীদাস, দ্বিজ চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস |
বিখ্যাত উক্তি | 'সব্বার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই' — চণ্ডীদাসের এই মানবতাবাদী বাণী চিরস্মরণীয় |
চরিত্র | মরমিয়া সাধক কবি; রামী নামে এক তন্তুবায়ী রমণীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল বলে কথিত |
বিখ্যাত পদ | 'কি মোহিনী জান বঁধু কি মোহিনী জান' (আক্ষেপানুরাগ পর্যায়) |
★ 'চণ্ডীদাস সমস্যা' বিসিএসে প্রায়ই আসে। একজন না একাধিক চণ্ডীদাস — এটি এখনও বিতর্কিত।
৪.৩ জ্ঞানদাস — 'চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য'
জন্মস্থান | বর্ধমান জেলার কাটোয়ার নিকট কাঁদড়া গ্রামে; আনু. ১৫৩০ খ্রি. |
যুগ | চৈতন্যোত্তর; ষোড়শ শতকের কবি |
বিশেষণ | 'চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য', 'গীতিকবি', 'আক্ষেপানুরাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি' |
পদ সংখ্যা | 'পদকল্পতরু'তে ১৮৬টি পদ; বাংলা পদ ৮১টি, ব্রজবুলি পদ ১০৫টি |
বিখ্যাত পদ | 'রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর'; 'সুখের লাগিয়ে এ ঘর বাঁধিনু' |
৪.৪ গোবিন্দদাস — 'দ্বিতীয় বিদ্যাপতি'
জন্ম | মুর্শিদাবাদের তেলিয়াবুধুরি গ্রামে; আনু. ১৫৩৭ খ্রি.; পিতা চিরঞ্জীব সেন |
উপাধি | 'কবিরাজ' (শ্রীনিবাস আচার্য প্রদত্ত), 'কবীন্দ্র' (জীব গোস্বামী প্রদত্ত), 'দ্বিতীয় বিদ্যাপতি' (কবি বল্লভদাস প্রদত্ত) |
বিশেষত্ব | 'শাব্দিক কবি' — পদে শব্দ ও অনুপ্রাসের ঝংকার বিখ্যাত; 'অভিসার' পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ |
বিখ্যাত পদ | 'কন্টক গাড়ি কমল-সম পদ তল' (অভিসার); 'ঢল ঢল কাঁচা অঙ্গের লাবণী অবনী বহিয়া যায়' |
★ গোবিন্দদাসকে 'দ্বিতীয় বিদ্যাপতি' বলেন — কবি বল্লভদাস।
★ জ্ঞানদাস = আক্ষেপানুরাগ পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ। গোবিন্দদাস = অভিসার পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ।
ব্রজবুলি ভাষা
ব্রজবুলি বৈষ্ণব পদাবলি রচনার উদ্দেশ্যে তৈরি একটি কৃত্রিম সাহিত্যিক ভাষা। মৈথিলী ও অবহট্ঠের মিশ্রণে এই ভাষা তৈরি। 'ব্রজবুলি' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন কবি ঈশ্বরগুপ্ত।
★ 'ব্রজবুলি' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন — কবি ঈশ্বরগুপ্ত।
★ ব্রজবুলি ভাষায় পদ রচয়িতা: বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস, বলরাম দাস, জ্ঞানদাস।
পদাবলির পর্যায়সমূহ
পর্যায় | বিষয়বস্তু | শ্রেষ্ঠ কবি |
পূর্বরাগ | প্রথম মিলনের আগে আকর্ষণ | চণ্ডীদাস |
অনুরাগ | মিলনের পর গভীর ভালোবাসা | বিদ্যাপতি |
অভিসার | প্রেমিকের সাথে মিলনের উদ্দেশ্যে গমন | গোবিন্দদাস |
মিলন | দুইজনের মিলনের বর্ণনা | বিদ্যাপতি, গোবিন্দদাস |
বিরহ বা বিপ্রলম্ভ | মিলনের পর বিচ্ছেদের বেদনা | চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস |
মাথুর | কৃষ্ণের মথুরা যাত্রার পর রাধার বিরহ | চণ্ডীদাস |
আক্ষেপানুরাগ | রাগে ক্ষোভে কৃষ্ণকে উপালম্ভ | জ্ঞানদাস |
ভাবসম্মিলন | মিলনের আকাঙ্ক্ষায় মানসিক মিলন |
★ গৌরচন্দ্রিকার জনক — নরহরি সরকার। গৌরচন্দ্রিকা = চৈতন্যের প্রশংসামূলক পদ।
★ ঘোষ ভাতৃত্রয়: গোবিন্দ ঘোষ + মাধব ঘোষ + বাসু ঘোষ।
৫. অনুবাদ সাহিত্য — সংস্কৃত থেকে বাংলায়
মধ্যযুগে মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ও হিন্দু কবিদের উদ্যোগে সংস্কৃত মহাকাব্যগুলো বাংলায় অনূদিত হয়। এই অনুবাদগুলো হুবহু অনুবাদ নয় — ভাবানুবাদ ও লোকায়ত রূপান্তর।
৫.১ কৃত্তিবাসী রামায়ণ (শ্রীরাম পাঁচালী)
★ বাংলা ভাষায় রামায়ণের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ অনুবাদক — কৃত্তিবাস ওঝা।
পূর্ণ নাম | কৃত্তিবাস ওঝা |
জন্মস্থান | নদিয়া জেলার ফুলিয়া গ্রামে; পঞ্চদশ শতাব্দীর কবি |
গ্রন্থের নাম | শ্রীরাম পাঁচালী (কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামে পরিচিত) |
ভিত্তি | মহর্ষি বাল্মিকীর সংস্কৃত রামায়ণ; তবে হুবহু অনুবাদ নয় — ভাবানুবাদ |
বৈশিষ্ট্য | পাঁচালির ঢঙে লেখা; সাধারণ মানুষের ভাষায়; ৭টি কাণ্ডে বিভক্ত |
উক্তি | 'সাত কাণ্ড রামায়ণ, দেবেরা সৃজিত। লোক বুঝাইতে কহিলো, কৃত্তিবাস পণ্ডিত।' |
৫.২ কাশীদাসী মহাভারত
★ বাংলা ভাষায় মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক — কাশীরাম দাস।
পূর্ণ নাম | কাশীরাম দাস |
জন্মস্থান | বর্ধমান জেলার সিঙ্গি গ্রামে; সপ্তদশ শতকের কবি |
গ্রন্থ | 'ভারত-পাঁচালী' বা 'মহাভারত' (কাশীদাসী মহাভারত নামে পরিচিত) |
বিশেষ তথ্য | সম্পূর্ণ অনুবাদ করতে পারেননি; মাঝপথে মৃত্যু হয়; পরে ভাই, ভাতিজারা সম্পন্ন করেন |
৫.৩ মালাধর বসু — শ্রীকৃষ্ণবিজয়
রচয়িতা | মালাধর বসু |
উপাধি | 'গুণরাজ খাঁ' — সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ প্রদত্ত |
গ্রন্থ | শ্রীকৃষ্ণবিজয় — ভাগবত পুরাণের ১০ম ও ১১শ স্কন্ধের অনুবাদ |
বিশেষ তথ্য | প্রথম বাংলা কাব্যে মুসলমান সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতার নিদর্শন |
★ মালাধর বসুর উপাধি 'গুণরাজ খাঁ' — মুসলমান সুলতান কর্তৃক প্রদত্ত। ষষ্ঠীবর দত্তের উপাধিও 'গুণরাজ খাঁ' — গুলিয়ে ফেলবেন না।
★ পরাগল খানের নির্দেশে মহাভারত রচনা করেন — কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাস।
৬. রোমান্টিক প্রণয়কাব্য — মুসলমান কবিদের অবদান
মধ্যযুগে মুসলমান শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবি-ফারসি প্রণয়কাব্যগুলো বাংলায় অনূদিত ও রূপান্তরিত হয়। চট্টগ্রামের আরাকান রাজসভায় এই ধারা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়েছিল।
৬.১ আলাওল — রোমান্টিক কাব্যের সম্রাট
★ আলাওল মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।
জন্ম | আনু. ১৬০৭ সালে ফতেয়াবাদ (বর্তমান ফরিদপুর) পরগনায় |
মৃত্যু | আনু. ১৬৮০ সালে |
আশ্রয় | আরাকান (রোসাং) রাজসভা; রাজমন্ত্রী মাগন ঠাকুরের পৃষ্ঠপোষকতায় |
প্রধান রচনা | পদ্মাবতী, সতীময়না-লোরচন্দ্রানী, সপ্তপয়কর, সিকান্দারনামা, তোহফা |
বিখ্যাত কাব্য | পদ্মাবতী — হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর 'পদুমাবৎ' অবলম্বনে রচিত |
ধর্ম | মুসলমান |
৬.২ দৌলত কাজী
বিখ্যাত কাব্য | সতীময়না-লোরচন্দ্রানী — বাংলা রোমান্টিক কাব্যের প্রথম রচয়িতা |
পৃষ্ঠপোষক | আরাকান রাজসভার কোরেশী মাগন ঠাকুর |
মৃত্যুর আগে | কাব্যটি অসম্পূর্ণ রেখে যান; পরে আলাওল সম্পন্ন করেন |
★ 'সতীময়না-লোরচন্দ্রানী' — দৌলত কাজী শুরু করেন, আলাওল শেষ করেন।
★ আলাওলের সেরা কাব্য 'পদ্মাবতী' — হিন্দি কবি মালিক মুহম্মদ জায়সীর 'পদুমাবৎ' অবলম্বনে রচিত।
৭. চৈতন্যজীবনী সাহিত্য
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬-১৫৩৩) বাংলার ধর্মীয় ও সাহিত্যিক জীবনে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল জীবনীসাহিত্য তৈরি হয়।
গ্রন্থের নাম | রচয়িতা | বিশেষ তথ্য |
চৈতন্যভাগবত | বৃন্দাবন দাস | প্রথম বাংলা চৈতন্যজীবনী; চৈতন্যকে 'নিমাই সন্ন্যাস' পর্যন্ত বর্ণনা |
চৈতন্যচরিতামৃত | কৃষ্ণদাস কবিরাজ | সর্বশ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী; সংস্কৃত ও বাংলায় রচিত |
চৈতন্যমঙ্গল | লোচন দাস | চৈতন্যের জীবনী গীতিকাব্যের আকারে |
★ চৈতন্যের পূর্ণ নাম: বিশ্বম্ভর মিশ্র। জন্ম ১৪৮৬ সালে নবদ্বীপে। মৃত্যু ১৫৩৩ সালে পুরীতে।
★ চৈতন্যের গুরু: ঈশ্বরপুরী। চৈতন্যের পত্নী: বিষ্ণুপ্রিয়া ও লক্ষ্মীপ্রিয়া।
৮. শাক্ত পদাবলি — দেবীমাতার গান
শাক্ত পদাবলি হলো দেবী কালী বা শক্তির উদ্দেশ্যে রচিত ভক্তিমূলক পদাবলি। বাংলার পরবর্তী মধ্যযুগে শাক্ত পদাবলির বিশেষ বিকাশ ঘটে।
রামপ্রসাদ সেন — শাক্ত পদাবলির শ্রেষ্ঠ কবি
জন্ম | আনু. ১৭২০ সালে হালিশহরে (উত্তর ২৪ পরগনা) |
মৃত্যু | ১৭৮১ সালে |
উপাধি | 'রায়গুণাকর' (মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র প্রদত্ত) |
বিখ্যাত রচনা | শাক্ত পদাবলি; বিদ্যাসুন্দর কাব্য; কবিরঞ্জন নামে সংকলিত পদ |
বৈশিষ্ট্য | সন্তান হিসেবে মায়ের কাছে অভিযোগ করার ভঙ্গিতে কালীর কাছে ভক্তি নিবেদন; সরল বাংলায় রচিত |
★ রামপ্রসাদ সেন ও ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর — উভয়ের উপাধি 'রায়গুণাকর' কিন্তু দুজন দুজন।
★ কমলাকান্ত ভট্টাচার্য — শাক্ত পদাবলির আরেক বিখ্যাত কবি; মহারাজ তেজচন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় রচনা।
৯. ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকা
ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলার লোকসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। এগুলো মুখে মুখে প্রচলিত বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের লোকগান ও কাহিনিকাব্য। সংগ্রাহক ও সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেন এগুলো সংকলিত করে 'ময়মনসিংহ গীতিকা' নামে প্রকাশ করেন।
গীতিকার নাম | প্রধান চরিত্র | বিশেষ তথ্য |
মহুয়া | মহুয়া, নদের চাঁদ | নেত্রকোণা জেলার পটভূমিতে; বেদের মেয়ে মহুয়ার প্রেমকাহিনি |
মলুয়া | মলুয়া, চাঁদ বিনোদ | মলুয়া ও চাঁদ বিনোদের প্রেমকাহিনি; সামাজিক বাধার বিরুদ্ধে সংগ্রাম |
কমলা | কমলা | বিদেশ গমনকারী স্বামীর জন্য অপেক্ষার কাহিনি |
দেওয়ানা মদিনা | মদিনা | প্রেম ও বিয়োগের কাহিনি |
★ দীনেশচন্দ্র সেন 'ময়মনসিংহ গীতিকা' ও 'পূর্ববঙ্গ গীতিকা' সংকলন ও প্রকাশ করেন। তাঁকে 'বাংলা লোকসাহিত্যের জনক' বলা হয়।
★ চন্দ্রকুমার দে ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেছিলেন এবং দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা করেছিলেন।
★ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহ গীতিকা ১৯২৩ সালে প্রকাশ করে।
১০. মধ্যযুগের প্রধান কব
কবির নাম | রচনা | শতক | বিশেষ পরিচয় |
কানাহরি দত্ত | মনসামঙ্গল (আদিরূপ) | ১৩শ-১৪শ | মনসামঙ্গলের আদি কবি |
মানিক দত্ত | চণ্ডীমঙ্গল | ১৪শ | চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি |
বিদ্যাপতি | বৈষ্ণব পদাবলি | ১৪শ-১৫শ | মৈথিলী কোকিল; অভিনব জয়দেব |
কৃত্তিবাস ওঝা | শ্রীরাম পাঁচালী | ১৫শ | বাংলা রামায়ণের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ অনুবাদক |
মালাধর বসু | শ্রীকৃষ্ণবিজয় | ১৫শ | উপাধি গুণরাজ খাঁ |
বিজয় গুপ্ত | পদ্মপুরাণ | ১৫শ | মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ পূর্ববঙ্গীয় কবি; বরিশালে জন্ম |
চণ্ডীদাস | বৈষ্ণব পদাবলি | ১৪শ-১৫শ | সব্বার উপরে মানুষ সত্য; মরমিয়া কবি |
মুকুন্দরাম চক্রবর্তী | চণ্ডীমঙ্গল (অভয়ামঙ্গল) | ১৬শ | কবিকঙ্কন; চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি |
জ্ঞানদাস | বৈষ্ণব পদাবলি | ১৬শ | চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য; আক্ষেপানুরাগে শ্রেষ্ঠ |
গোবিন্দদাস | বৈষ্ণব পদাবলি | ১৬শ-১৭শ | দ্বিতীয় বিদ্যাপতি; অভিসারে শ্রেষ্ঠ |
দৌলত কাজী | সতীময়না-লোরচন্দ্রানী | ১৭শ | আরাকান রাজসভার কবি |
কাশীরাম দাস | মহাভারত | ১৭শ | বাংলা মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক |
আলাওল | পদ্মাবতী, সপ্তপয়কর | ১৭শ | রোমান্টিক কাব্যের সম্রাট; আরাকান রাজসভার কবি |
কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ | মনসামঙ্গল | ১৭শ | মনসামঙ্গলের জনপ্রিয়তম কবি |
ঘনরাম চক্রবর্তী | ধর্মমঙ্গল | ১৭শ-১৮শ | কবিরঞ্জন; ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি |
রামপ্রসাদ সেন | শাক্ত পদাবলি | ১৮শ | রায়গুণাকর; শাক্ত পদাবলির শ্রেষ্ঠ কবি |
ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর | অন্নদামঙ্গল | ১৮শ | রায়গুণাকর; যুগসন্ধির কবি; মঙ্গলকাব্যের পরিসমাপ্তি |
১১. ট্রিকি ও অজানা তথ্
★ প্রতিটি তথ্য যত্নসহকারে পড়ুন — বিসিএস ও বিভিন্ন পরীক্ষায় এসেছে।
★ ১. মধ্যযুগের সময়সীমা: ১২০১-১৮০০। 'অন্ধকার যুগ' কথাটি প্রথম ব্যবহার করেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ।
★ ২. মনসামঙ্গলের আদি কবি কানাহরি দত্ত, শ্রেষ্ঠ পূর্ববঙ্গীয় কবি বিজয় গুপ্ত (বরিশাল), জনপ্রিয়তম কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ।
★ ৩. চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি মানিক দত্ত, শ্রেষ্ঠ কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (কবিকঙ্কন), স্বভাব কবি দ্বিজ মাধব।
★ ৪. ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি ঘনরাম চক্রবর্তী — উপাধি 'কবিরঞ্জন'।
★ ৫. ভারতচন্দ্র ও রামপ্রসাদ সেন — উভয়ের উপাধি 'রায়গুণাকর'। দুটো আলাদা উপাধি আলাদা দাতা থেকে।
★ ৬. 'সব্বার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই' — চণ্ডীদাসের উক্তি। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত মানবতাবাদী উক্তি।
★ ৭. গোবিন্দদাসকে 'দ্বিতীয় বিদ্যাপতি' বলেন কবি বল্লভদাস। 'কবিরাজ' উপাধি দেন শ্রীনিবাস আচার্য। 'কবীন্দ্র' দেন জীব গোস্বামী।
★ ৮. মালাধর বসুর উপাধি 'গুণরাজ খাঁ' (সুলতান প্রদত্ত)। ষষ্ঠীবর দত্তের উপাধিও 'গুণরাজ খাঁ' — দুজন ভিন্ন ব্যক্তি।
★ ৯. 'পদ্মাবতী' কাব্য আলাওল রচিত — হিন্দি 'পদুমাবৎ' অবলম্বনে। 'সতীময়না-লোরচন্দ্রানী' দৌলত কাজী শুরু করেন, আলাওল শেষ করেন।
★ ১০. চৈতন্যভাগবতের রচয়িতা বৃন্দাবন দাস। চৈতন্যচরিতামৃতের রচয়িতা কৃষ্ণদাস কবিরাজ।
★ ১১. 'ব্রজবুলি' শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন কবি ঈশ্বরগুপ্ত। ব্রজবুলি = মৈথিলী + অবহট্ঠের মিশ্রণে তৈরি।
★ ১২. ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেন চন্দ্রকুমার দে। সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন দীনেশচন্দ্র সেন (১৯২৩ সালে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়)।
★ ১৩. মনসামঙ্গলে 'চাঁদ সদাগর বাম হাতে মনসার পূজা দেন' — অনিচ্ছাকৃত পূজার প্রতীক।
★ ১৪. মুকুন্দরামের বিখ্যাত উক্তি: 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়' — চণ্ডীমঙ্গল থেকে।
★ ১৫. ভারতচন্দ্রের বিখ্যাত উক্তি: 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে' — অন্নদামঙ্গল থেকে।
★ ১৬. বৈষ্ণব পদাবলিতে পূর্বরাগ, অনুরাগ, অভিসার, মিলন, বিরহ, মাথুর — এই পর্যায়গুলো পরীক্ষায় আসে।
★ ১৭. গৌরচন্দ্রিকার জনক নরহরি সরকার। ঘোষ ভাতৃত্রয়: গোবিন্দ ঘোষ + মাধব ঘোষ + বাসু ঘোষ।
★ ১৮. শ্রীচৈতন্যের জন্ম: ১৪৮৬, নবদ্বীপ। মৃত্যু: ১৫৩৩, পুরী। পূর্ণ নাম: বিশ্বম্ভর মিশ্র। গুরু: ঈশ্বরপুরী।
★ ১৯. কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাস পরাগল খানের নির্দেশে মহাভারত রচনা করেন।
★ ২০. পদ্মাবতী = আলাওল। কৃত্তিবাসী রামায়ণ = কৃত্তিবাস ওঝা। কাশীদাসী মহাভারত = কাশীরাম দাস। এই তিনটি গুলিয়ে ফেলবেন না।
১২. প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ১: বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের সময়সীমা কত?
✔ উত্তর: ১২০১-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ → প্রায় ৬০০ বছর
প্রশ্ন ২: 'অন্ধকার যুগ' বা 'তামস যুগ' কাকে বলা হয়?
✔ উত্তর: ১২০১-১৩৫০ খ্রিস্টাব্দকে → সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন নেই
প্রশ্ন ৩: 'অন্ধকার যুগ' কথাটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?
✔ উত্তর: ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ → বিসিএসে বারবার আসা প্রশ্ন
প্রশ্ন ৪: মঙ্গলকাব্যের আদি ধারা কোনটি?
✔ উত্তর: মনসামঙ্গল → সবচেয়ে পুরনো মঙ্গলকাব্যধারা
প্রশ্ন ৫: মনসামঙ্গলের আদি কবি কে?
✔ উত্তর: কানাহরি দত্ত → ১৩শ-১৪শ শতকের কবি
প্রশ্ন ৬: মনসামঙ্গলের শ্রেষ্ঠ পূর্ববঙ্গীয় কবি কে?
✔ উত্তর: বিজয় গুপ্ত → বরিশাল জেলার গৈলা গ্রামে জন্ম
প্রশ্ন ৭: মনসামঙ্গলের জনপ্রিয়তম কবি কে?
✔ উত্তর: কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ → মূল নাম ক্ষেমানন্দ, উপাধি কেতকাদাস
প্রশ্ন ৮: মনসা দেবীর অপর নাম কী?
✔ উত্তর: পদ্মাবতী, কেতকা, পদ্মা, বিষহরি → যেকোনো একটি লিখলেই হবে
প্রশ্ন ৯: মনসামঙ্গলে 'চাঁদ সদাগর' কীভাবে মনসার পূজা দেন?
✔ উত্তর: বাম হাতে → অনিচ্ছার প্রতীক
প্রশ্ন ১০: চণ্ডীমঙ্গলের আদি কবি কে?
✔ উত্তর: মানিক দত্ত → চতুর্দশ শতকের কবি
প্রশ্ন ১১: চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: মুকুন্দরাম চক্রবর্তী → কবিকঙ্কন উপাধি
প্রশ্ন ১২: মুকুন্দরাম চক্রবর্তীকে 'কবিকঙ্কন' উপাধি কে দেন?
✔ উত্তর: জমিদার রঘুনাথ রায় → চণ্ডীমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি
প্রশ্ন ১৩: চণ্ডীমঙ্গলের 'স্বভাব কবি' কে?
✔ উত্তর: দ্বিজ মাধব → সহজাত কবিপ্রতিভার জন্য
প্রশ্ন ১৪: চণ্ডীমঙ্গলের খলচরিত্র কে?
✔ উত্তর: ভাড়ুদত্ত → ধূর্ত ও প্রতারক চরিত্র
প্রশ্ন ১৫: 'অভাগা যদ্যপি চায় সাগর শুকায়ে যায়' — কোন কাব্য থেকে?
✔ উত্তর: চণ্ডীমঙ্গল; রচয়িতা মুকুন্দরাম → কবিকঙ্কনের বিখ্যাত উক্তি
প্রশ্ন ১৬: ধর্মমঙ্গলের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: ঘনরাম চক্রবর্তী → উপাধি 'কবিরঞ্জন'
প্রশ্ন ১৭: অন্নদামঙ্গলের রচয়িতা কে?
✔ উত্তর: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর → ১৭৫২ সালে রচিত
প্রশ্ন ১৮: ভারতচন্দ্রের উপাধি কে দেন?
✔ উত্তর: মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র → উপাধি 'রায়গুণাকর'
প্রশ্ন ১৯: 'আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে' — কোন কাব্য থেকে?
✔ উত্তর: অন্নদামঙ্গল; ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর → বাংলার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রার্থনা
প্রশ্ন ২০: ভারতচন্দ্রকে 'যুগসন্ধির কবি' বলা হয় কেন?
✔ উত্তর: মধ্যযুগীয় বিষয়বস্তু ও আধুনিক মানবতাবাদ একসাথে → একদিকে পুরাতন, অন্যদিকে নতুন
প্রশ্ন ২১: বৈষ্ণব পদাবলির আদি বাঙালি কবি কে?
✔ উত্তর: জয়দেব → গীতগোবিন্দের রচয়িতা
প্রশ্ন ২২: বৈষ্ণব পদাবলির মহাকবি চতুষ্টয় কারা?
✔ উত্তর: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস → চারজনই বৈষ্ণব পদাবলির শীর্ষ কবি
প্রশ্ন ২৩: বিদ্যাপতির উপাধি কী কী?
✔ উত্তর: মৈথিলী কোকিল, অভিনব জয়দেব, কবি সার্বভৌম → যেকোনো একটি লিখলেই হবে
প্রশ্ন ২৪: বিদ্যাপতি কোন ভাষায় পদাবলি লিখেছেন?
✔ উত্তর: ব্রজবুলি → মৈথিলী ও অবহট্ঠের মিশ্রণ
প্রশ্ন ২৫: 'সব্বার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই' — কার উক্তি?
✔ উত্তর: চণ্ডীদাস → মানবতাবাদী এই বাণীটি বাংলা সাহিত্যের সেরা উক্তিগুলোর একটি
প্রশ্ন ২৬: 'চণ্ডীদাস সমস্যা' কী?
✔ উত্তর: একটি না একাধিক চণ্ডীদাস — এটি অমীমাংসিত বিতর্ক → বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিতর্কিত প্রশ্ন
প্রশ্ন ২৭: জ্ঞানদাসকে কার 'ভাবশিষ্য' বলা হয়?
✔ উত্তর: চণ্ডীদাসের → কিন্তু জ্ঞানদাস একজন স্বতন্ত্র কবি
প্রশ্ন ২৮: জ্ঞানদাসের বিখ্যাত পদ কোনটি?
✔ উত্তর: 'রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর' → আক্ষেপানুরাগ পর্যায়ের পদ
প্রশ্ন ২৯: গোবিন্দদাসকে 'দ্বিতীয় বিদ্যাপতি' কে বলেন?
✔ উত্তর: কবি বল্লভদাস → গোবিন্দদাস = কবিরাজ = কবীন্দ্র
প্রশ্ন ৩০: গোবিন্দদাসকে 'কবিরাজ' উপাধি কে দেন?
✔ উত্তর: শ্রীনিবাস আচার্য → খেতুরীর মহোৎসবে
প্রশ্ন ৩১: 'ব্রজবুলি' শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?
✔ উত্তর: কবি ঈশ্বরগুপ্ত → ব্রজবুলি = মৈথিলী + অবহট্ঠ
প্রশ্ন ৩২: গৌরচন্দ্রিকার জনক কে?
✔ উত্তর: নরহরি সরকার → চৈতন্যের প্রশংসামূলক পদ
প্রশ্ন ৩৩: ঘোষ ভাতৃত্রয় কারা?
✔ উত্তর: গোবিন্দ ঘোষ, মাধব ঘোষ ও বাসু ঘোষ → বৈষ্ণব পদকর্তা
প্রশ্ন ৩৪: বাংলায় রামায়ণের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কে?
✔ উত্তর: কৃত্তিবাস ওঝা → কাব্যের নাম শ্রীরাম পাঁচালী
প্রশ্ন ৩৫: বাংলায় মহাভারতের শ্রেষ্ঠ অনুবাদক কে?
✔ উত্তর: কাশীরাম দাস → কাশীদাসী মহাভারত
প্রশ্ন ৩৬: মালাধর বসুর উপাধি কী?
✔ উত্তর: গুণরাজ খাঁ → সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ প্রদত্ত
প্রশ্ন ৩৭: 'শ্রীকৃষ্ণবিজয়' কার রচনা?
✔ উত্তর: মালাধর বসু → ভাগবত পুরাণের অনুবাদ
প্রশ্ন ৩৮: রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: আলাওল → আরাকান রাজসভার কবি
প্রশ্ন ৩৯: আলাওলের সেরা কাব্যের নাম কী?
✔ উত্তর: পদ্মাবতী → হিন্দি 'পদুমাবৎ' অবলম্বনে রচিত
প্রশ্ন ৪০: 'সতীময়না-লোরচন্দ্রানী' কাব্য কে শুরু করেন?
✔ উত্তর: দৌলত কাজী → আলাওল শেষ করেন
প্রশ্ন ৪১: চৈতন্যভাগবতের রচয়িতা কে?
✔ উত্তর: বৃন্দাবন দাস → প্রথম বাংলা চৈতন্যজীবনী
প্রশ্ন ৪২: চৈতন্যচরিতামৃতের রচয়িতা কে?
✔ উত্তর: কৃষ্ণদাস কবিরাজ → সর্বশ্রেষ্ঠ চৈতন্যজীবনী
প্রশ্ন ৪৩: শাক্ত পদাবলির শ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: রামপ্রসাদ সেন → উপাধি রায়গুণাকর
প্রশ্ন ৪৪: ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেন কে?
✔ উত্তর: চন্দ্রকুমার দে → দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা করেন
প্রশ্ন ৪৫: ময়মনসিংহ গীতিকা কোন বছর প্রকাশিত হয়?
✔ উত্তর: ১৯২৩ সালে (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়) → দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদিত
প্রশ্ন ৪৬: ময়মনসিংহ গীতিকার সবচেয়ে বিখ্যাত পালা কোনটি?
✔ উত্তর: মহুয়া → নেত্রকোণার বেদের মেয়ে মহুয়ার কাহিনি
প্রশ্ন ৪৭: মনসামঙ্গলের কেন্দ্রীয় চরিত্র কে?
✔ উত্তর: চাঁদ সদাগর → চম্পকনগরের বণিক
প্রশ্ন ৪৮: বেহুলার পিতার নাম কী?
✔ উত্তর: সায় বেনে → মনসামঙ্গলের চরিত্র
প্রশ্ন ৪৯: চণ্ডীমঙ্গলের আখেটিক খণ্ডের নায়ক কে?
✔ উত্তর: কালকেতু → ব্যাধ থেকে রাজা
প্রশ্ন ৫০: 'দীনেশচন্দ্র সেন' সম্পর্কে কোন তথ্যটি সঠিক?
✔ উত্তর: ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক ও বাংলা লোকসাহিত্যের গবেষক → তাঁকে বাংলা লোকসাহিত্যের জনক বলা হয়
প্রশ্ন ৫১: বৈষ্ণব পদাবলিতে 'অভিসার' পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: গোবিন্দদাস → অভিসার = প্রেমিকের সাথে মিলনের উদ্দেশ্যে গমন
প্রশ্ন ৫২: 'আক্ষেপানুরাগ' পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ কবি কে?
✔ উত্তর: জ্ঞানদাস → আক্ষেপানুরাগ = রাগে ক্ষোভে কৃষ্ণকে উপালম্ভ
প্রশ্ন ৫৩: বৈষ্ণব পদাবলির স্বর্ণযুগ কোন শতক?
✔ উত্তর: ষোড়শ শতক → চৈতন্য পরবর্তী যুগে সর্বোচ্চ বিকাশ
প্রশ্ন ৫৪: শ্রীচৈতন্যের জন্ম কোথায় ও কখন?
✔ উত্তর: ১৪৮৬ সালে নবদ্বীপে → মৃত্যু ১৫৩৩ সালে পুরীতে
প্রশ্ন ৫৫: মনসামঙ্গলের গান রাঢ়বঙ্গে কী নামে পরিচিত?
✔ উত্তর: ঝাপান → লোকগীতির বিশেষ রূপ
প্রশ্ন ৫৬: কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাস কার নির্দেশে মহাভারত রচনা করেন?
✔ উত্তর: পরাগল খান (চট্টগ্রামের সেনানী শাসক) → মধ্যযুগের পৃষ্ঠপোষকতার নিদর্শন
প্রশ্ন ৫৭: ভারতচন্দ্রের কৌলিক উপাধি কী?
✔ উত্তর: মুখোপাধ্যায় → পরিবারের বংশোপাধি
প্রশ্ন ৫৮: মনসামঙ্গলের পূর্ববঙ্গ সংস্করণ কী নামে পরিচিত?
✔ উত্তর: পদ্মাপুরাণ → পশ্চিমবঙ্গে মনসামঙ্গল
প্রশ্ন ৫৯: 'মঙ্গলকাব্যে মঙ্গল' শব্দের দুটি অর্থ কী?
✔ উত্তর: (১) কল্যাণ/শুভ ও (২) মঙ্গলবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত গাওয়া → দুটো ব্যাখ্যাই প্রচলিত
প্রশ্ন ৬০: মনসামঙ্গল কাব্যে লখিন্দরের মৃত্যু হয় কীভাবে?
✔ উত্তর: বাসরঘরে সর্পাঘাতে → লোহার বাসরঘর বানানো হয়েছিল তবুও মনসা পথ বের করেন
১৩. মনে রাখার সহজ ট্রিক
ট্রিক ১: মঙ্গলকাব্যের তিনটি প্রধান ধারা
মন-চণ্ড-ধর্ম = মনসামঙ্গল + চণ্ডীমঙ্গল + ধর্মমঙ্গল — তিনটিই লৌকিক মঙ্গলকাব্য।
ট্রিক ২: আদি-শ্রেষ্ঠ কবি মনে রাখুন
কাব্যধারা | আদি কবি | শ্রেষ্ঠ কবি |
মনসামঙ্গল | কানাহরি দত্ত | কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ (জনপ্রিয়তায়) / বিজয় গুপ্ত (পূর্ববঙ্গে) |
চণ্ডীমঙ্গল | মানিক দত্ত | মুকুন্দরাম চক্রবর্তী (কবিকঙ্কন) |
ধর্মমঙ্গল | ময়ূর ভট্ট | ঘনরাম চক্রবর্তী (কবিরঞ্জন) |
অন্নদামঙ্গল | ভারতচন্দ্র | ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর (একমাত্র) |
ট্রিক ৩: বৈষ্ণব পদাবলির কে কোন পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ
বিদ্যা-পতি = পূর্বরাগ-অনুরাগ | চণ্ডী-দাস = বিরহ-মাথুর | জ্ঞান-দাস = আক্ষেপানুরাগ | গোবিন্দ-দাস = অভিসার
ট্রিক ৪: অনুবাদ সাহিত্য
রামায়ণ = কৃত্তিবাস (কৃ-রা) | মহাভারত = কাশীরাম (কা-ম) | ভাগবত = মালাধর বসু (মা-ভা) — প্রথম অক্ষর মিলিয়ে মনে রাখুন।
সারসংক্ষেপ ও উপসংহার
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য বাংলার মানুষের ধর্ম, প্রেম, সংগ্রাম ও জীবনদর্শনের অনন্য প্রতিফলন। মনসামঙ্গলের বেহুলার অটুট প্রেম, চণ্ডীমঙ্গলের কালকেতুর সংগ্রাম, বৈষ্ণব পদাবলির রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, আলাওলের রোমান্টিক কাব্য, ভারতচন্দ্রের 'দুধে-ভাতে' থাকার প্রার্থনা — এই সব মিলে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য হয়ে উঠেছে বাংলার সংস্কৃতির অমূল্য ঐতিহ্য।
★ চূড়ান্ত মনে রাখার কথা: মধ্যযুগ = মঙ্গলকাব্য + বৈষ্ণব পদাবলি + অনুবাদ সাহিত্য + রোমান্টিক কাব্য + চৈতন্য সাহিত্য + লোকসাহিত্য — এই ছয়টি ধারাই মধ্যযুগের মূল সম্পদ।
— অধ্যায় সমাপ্ত —