মীর মশাররফ হোসেন

Chapter Activity

Rating
New / 5
Reviews
0
Read Sessions
0
Readers
0

বাংলা সাহিত্য

মীর মশাররফ হোসেন

বাঙালি মুসলমান সাহিত্যের পথিকৃ

১৩ নভেম্বর ১৮৪৭ — ১৯ ডিসেম্বর ১৯১২

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

পুরো নাম: সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন

ছদ্মনাম: গাজী মিয়াঁ | উদাসীন পথিক

ভূমিকা: একজন অসাধারণ মানুষের সাহিত্যজীবন

ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের আকাশে মীর মশাররফ হোসেন একটি বিস্ময়কর নামযে সময়ে বাংলা সাহিত্য ছিল প্রধানত হিন্দু লেখকদের অধিকারে, যখন মুসলমান লেখকরা আরবি-ফারসি মেশানো দোভাষী পুঁথির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেনঠিক সেই সময়ে মীর মশাররফ হোসেন বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায় উপন্যাস, নাটক, কাব্যপ্রবন্ধ লিখে বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে মুসলমান সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ঘোষণা করলেনতিনি শুধু একজন লেখক ননতিনি একটি আন্দোলন, একটি জাগরণের প্রতীক

মীরের সাহিত্যজীবন কমপক্ষে পঁয়তাল্লিশ বছর বিস্তৃত — ১৮৬৫ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্তএই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তিনি উপন্যাস থেকে শুরু করে নাটক, কাব্য, আত্মজীবনী, প্রবন্ধ, পাঠ্যপুস্তকসাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় কলম চালিয়েছেনরচনা করেছেন ৩৬ থেকে ৪২টি গ্রন্থতাঁর সাহিত্যগুরু ছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদারকুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে প্রকাশিত 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' পত্রিকার সম্পাদক

বঙ্গবাসী মুসলমানদের দেশভাষা বা মাতৃভাষা বাঙ্গালামাতৃভাষায় যাহার আস্থা নাই, সে মানুষ নহেমীর মশাররফ হোসেন

এই উক্তিটি শুধু কথার কথা নয়মীরের সমগ্র সাহিত্যজীবনের মূলসুর এখানে নিহিততিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানরা যদি বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা না করেন, তাহলে বাংলা সাহিত্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবেসেই বিশ্বাসকেই তিনি জীবনের কাজে পরিণত করেছিলেন

জীবন পরিচিতি: মানুষটির পরিচয়

জন্মপরিবার

১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর বর্তমান বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার লাহিনীপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে মীর মশাররফ হোসেনের জন্ম হয়তাঁর পিতা মীর মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন জমিদার, আর মাতা দৌলতুন্নেছাকিন্তু মাতার সৌভাগ্য বেশিদিন ছিল নামীরের মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যানপিতার অবহেলায় মা অকালে চোখ বুজেছিলেন বলে মীর নিজেই লিখেছেনএই বেদনা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল

জমিদার পরিবারে জন্মেছিলেন বলে মীরের প্রারম্ভিক শিক্ষা হয়েছিল নিজ বাড়িতেইএকজন মুনশির কাছে আরবিফারসি ভাষা শিখেছিলেনপরে পাঠশালায় বাংলা ভাষা শিখলেনকুষ্টিয়া স্কুল থেকে শুরু হয়ে কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছিলেন, তারপর কলকাতার কালীঘাট স্কুলেও গিয়েছিলেনকিন্তু পড়াশোনা আর বেশিদূর এগোয়নিঅথচ এই মানুষটিই পরবর্তী জীবনে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গদ্যশিল্পী হয়ে উঠলেন! শুধু পাঁচ শ্রেণির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে এই অসাধারণ সাহিত্যসাধনাএটি নিজেই একটি বিস্ময়

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: মীর মশাররফ হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্তঅথচ তিনিই বাংলা সাহিত্যে মুসলমান সম্প্রদায়ের সেরা সাহিত্যিক! BCS পরীক্ষায় এই তথ্যটি প্রায়ই আসে

বিবাহজীবনব্যক্তিজীবনের নাটকীয়তা

মীরের বিবাহজীবন শুরু হয়েছিল একটি নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়েযেন কোনো উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা কাহিনীসতেরো বছর বয়সে কলকাতায় পিতৃবন্ধু নাদের হোসেনের বাড়িতে উঠেছিলেনসেখানে নাদের সাহেবের বড় মেয়ে লতিফনের প্রেমে পড়ে গেলেনপত্রালাপে গভীর হলো সেই সম্পর্কমনে মনে স্থির করলেনলতিফনকেই বিয়ে করবেন

কিন্তু বিয়ের আসরে যখন বধূ এলো, দেখা গেল সে লতিফন নয়লতিফনের ছোট বোন আজিজুন্নেসা! কনে-বদল হয়ে গেছেবাবার বন্ধুত্ব, চাকরির নিশ্চয়তাএত কিছু ভেবে সেই কনে বদল মেনে নিতে বাধ্য হলেন মীরএই প্রথম বিয়েতে কোনো সন্তান হয়নিদ্বিতীয় বিয়ে হলো বিবি কুলসুমের সাথেপাঁচ পুত্রছয় কন্যার জননী হলেন তিনিবিবি কুলসুম শুধু মীরের স্ত্রী নন, তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্যতম অনুপ্রেরণাও ছিলেন

কর্মজীবনে মীর পিতার জমিদারি দেখাশোনা করেছেন, ফরিদপুর নবাব এস্টেটে চাকরি করেছেন, ১৮৮৫ সালে দেলদুয়ার এস্টেটের ম্যানেজার হয়েছেন, ১৯০৩ থেকে ১৯০৯ পর্যন্ত কলকাতায় থেকেছেন। ১৯১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পদমদী গ্রামে নিজের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়সমাধি হয় সেখানেইপ্রিয়তমা স্ত্রী বিবি কুলসুমের কবরের পাশে

মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতিতে ১৯৭৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নামে একটি আবাসিক হল প্রতিষ্ঠিত হয়এটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য দ্বিতীয় বৃহত্তম আবাসিক হল

সাহিত্যগুরুসাহিত্যারম্ভ

মীরের সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়েছিল সংবাদদাতা হিসেবেছাত্রাবস্থায় তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালি থেকে প্রকাশিত 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা' এবং ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' পত্রিকায় মফস্বলের ছোট ছোট সংবাদ পাঠাতেনএই সুবাদে 'গ্রামবার্তা প্রকাশিকা'-র সম্পাদক কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠেযে ঘনিষ্ঠতা আমৃত্যু টিকে ছিলকাঙাল হরিনাথই হলেন মীরের সাহিত্যগুরু

এই গুরুর হাত ধরেই মীর বুঝতে পারলেনলেখা মানে শুধু কথা বলা নয়, লেখা মানে সমাজকে দেখানো তার আসল মুখএই উপলব্ধিই পরবর্তী জীবনে তাঁকে 'জমিদার দর্পণ'-এর মতো সাহসী নাটক লিখতে অনুপ্রাণিত করেছিল

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: কাঙাল হরিনাথ মজুমদারএই নামটি মনে রাখুনতিনি মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যগুরু। BCS পরীক্ষায় প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয়

ছদ্মনামসম্পাদিত পত্রিকা

মীর মশাররফ হোসেন দুটি ছদ্মনামে লিখেছেন — 'গাজী মিয়াঁ' এবং 'উদাসীন পথিক'। সাহিত্যের দুনিয়ায় তিনি 'গাজী মিয়া' নামেই সবচেয়ে বেশি পরিচিতএই নামটি তাঁর ব্যক্তিত্বের একটা বৈশিষ্ট্যও প্রকাশ করেঅর্ধেক ধার্মিক (গাজী), অর্ধেক সাধারণ মানুষ (মিয়াঁ)।

'উদাসীন পথিক' ছদ্মনামটি আরও গভীর অর্থ বহন করেনিজের কর্মজীবনের ব্যঙ্গাত্মক উপন্যাস 'গাজী মিয়াঁর বস্তানী'-র প্রচ্ছদে তিনি লেখকের নাম দিলেন নাশুধু স্বত্বাধিকারী হিসেবে লিখলেন 'উদাসীন পথিক'। এর মানে কী? বোধহয় এর মানে হলোজীবনের পথে চলতে চলতে সব দেখেছেন, সব বুঝেছেন, কিন্তু নিজেকে কোথাও আবদ্ধ রাখেননি

মীর মশাররফ হোসেনের ছদ্মনাম: (১) গাজী মিয়াঁসাহিত্যে পরিচিত নাম। (২) উদাসীন পথিক — 'গাজী মিয়াঁর বস্তানী'-র প্রচ্ছদে ব্যবহৃত

সম্পাদিত পত্রিকা

মীর দুটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেনপ্রথমটি 'আজিজন নেহার' — ১৮৭৪ সালে প্রকাশিত এই পত্রিকাটি মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা সাহিত্য সাময়িকী হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেদ্বিতীয়টি 'হিতকরী' — ১৮৯০ সালে লাহিনীপাড়া থেকে প্রকাশিত এই পাক্ষিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন কুষ্টিয়ার বিখ্যাত উকিল রাইচরণ দাস

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: 'আজিজন নেহার' (১৮৭৪) — মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা সাহিত্য সাময়িকী। BCS পরীক্ষায় এটি আসে

উপন্যাস: মুসলিম সাহিত্যের নতুন দিগন্ত

মীর মশাররফ হোসেনের উপন্যাস রচনার ইতিহাস বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের একটি মাইলফলকবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫) লিখে বাংলা উপন্যাসের দরজা খুলে দিলেন, তার মাত্র চার বছর পরেই মীর মশাররফ হোসেন লিখলেন 'রত্নবতী' — বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকের প্রথম উপন্যাসসেই সময়ের বাস্তবতা বুঝলে এই কৃতিত্বের মাহাত্ম্য আরও স্পষ্ট হয়

রত্নবতী (১৮৬৯)

প্রকাশকাল: ২ সেপ্টেম্বর ১৮৬৯, কলিকাতা

মীরের প্রথম উপন্যাস 'রত্নবতী' — এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থও বটেউপন্যাসের মলাটে লেখক নিজে এটিকে বলেছেন 'কৌতুকাবহ উপন্যাস'। কিন্তু আসলে রচনাটি একটি রূপকথা জাতীয় শিক্ষামূলক গল্প

কাহিনিটি সহজ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণরাজপুত্র সুকুমার এবং মন্ত্রীপুত্র সুমন্তের মধ্যে একটি প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক হয় — 'ধন বড় না বিদ্যা বড়?' রাজপুত্র সুকুমার ধনের পক্ষে, মন্ত্রীপুত্র সুমন্ত বিদ্যার পক্ষেএই বিতর্কের সমাধান খুঁজতে গিয়েই গল্পটি এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়বিদ্যাই শ্রেষ্ঠ সম্পদ

রত্নবতীমুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস এবং মুসলিম রচিত প্রথম বাংলা গদ্যগ্রন্থবঙ্কিমচন্দ্রের 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫)-এর চার বছর পরে প্রকাশিত

সমালোচকদের মতে, 'রত্নবতী' প্রকৃত অর্থে উপন্যাসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নয়এটি বরং একটি শিক্ষামূলক রূপকথার গল্পকিন্তু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অত্যন্ত মূল্যবান, কারণ এটিই বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঔপন্যাসিকের প্রথম পদচিহ্ন

বিষাদ সিন্ধু (১৮৮৫–১৮৯১)

প্রকাশকাল: প্রথম পর্ব ১৮৮৫ | দ্বিতীয় পর্ব ১৮৮৭ | তৃতীয় পর্ব ১৮৯১

বিষাদ সিন্ধু: বাংলা সাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি

'বিষাদ সিন্ধু' — শুধু একটি উপন্যাসের নাম নয়, এটি একটি অনুভূতির নামবাংলা সাহিত্যে এমন কোনো বই খুঁজে পাওয়া কঠিন যা এত দীর্ঘ সময় ধরেএকশত চল্লিশ বছরেরও বেশিবাঙালি পাঠকের হৃদয় জয় করে আসছেগ্রামের নিরক্ষর মহিলা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক — 'বিষাদ সিন্ধু' সবার কাছেই প্রিয়

উপন্যাসটি তিনটি পর্বে প্রকাশিত হয়েছিলপ্রথম পর্ব 'মহরম পর্ব' বেরোয় ১৮৮৫ সালে, দ্বিতীয় পর্ব 'উদ্ধার পর্ব' ১৮৮৭ সালে, এবং তৃতীয় পর্ব 'এজিদ বধ পর্ব' ১৮৯১ সালেসেই বছরই তিনটি পর্ব একসাথে একটি গ্রন্থে মুদ্রিত হয়প্রকাশক ছিলেন আফসার ব্রাদার্সউপক্রমণিকাউপসংহারসহ এতে মোট ৬৩টি প্রবাহ বা অধ্যায় রয়েছে

মূল বিষয়বস্তু: হিজরি ৬১ সালের মহররম মাসে কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধমহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসেনের শাহাদতের মর্মান্তিক কাহিনীতবে মীর মশাররফ শুধু ইতিহাস বলেননিতিনি এই ইতিহাসকে কল্পনার রঙে রাঙিয়ে এমন এক সাহিত্যকর্ম তৈরি করেছেন যা একাধারে ইতিহাস, রোমান্স, ট্র্যাজেডি এবং নৈতিক উপদেশের সমন্বয়

প্রথম পর্ব: মহরম পর্বপ্রেম, প্রত্যাখ্যানষড়যন্ত্র

কাহিনি শুরু হয় এক অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েমহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর শিষ্যদের সামনে মলিন মুখে বসে আছেনশিষ্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে কারণ জানতে চাইলেননবী জানালেনতাঁদের মধ্যে মুয়াবিয়া নামে যে শিষ্য আছেন, তাঁর গর্ভে এমন একটি পুত্রের জন্ম হবে, যে হাসানহোসেনের পরম শত্রু হয়ে তাদের প্রাণনাশ করাবেসেই ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্য দিয়ে কাহিনির সূচনা

সেই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হলোমুয়াবিয়ার পুত্র এজিদ কিশোর বয়স থেকে নবীর নাতনি জয়নবের প্রেমে মরিয়া হয়ে উঠলেনকিন্তু জয়নব প্রথমে বিধবা হন, তারপর ইমাম হোসেনের সাথে তাঁর বিবাহ হয়এজিদের প্রেম প্রত্যাখ্যাত হলোএই প্রত্যাখ্যানই তাঁর অন্তরে এমন একটি ক্রোধানল জ্বালিয়ে দিল যা কারবালার মাঠে হাসান-হোসেনের রক্তে নেভানোর চেষ্টা করলেন তিনি

এদিকে ইমাম হাসানকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হলোইমাম হোসেন তখন কুফার মানুষের আমন্ত্রণে সেখানে যাওয়ার পথে কারবালার প্রান্তরে এজিদের বিশাল সৈন্যবাহিনীর সামনে পড়লেনমাত্র সত্তরজন সঙ্গী নিয়ে

দ্বিতীয় পর্ব: উদ্ধার পর্বকারবালার বিষাদময় অধ্যায়

মহররমের দশ তারিখ, কারবালার প্রান্তরএজিদের লক্ষাধিক সৈন্যের সামনে ইমাম হোসেনের মাত্র সত্তরজনজলও নেই, খাবারও নেইফোরাত নদীর জল থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল আগেইএই অসম যুদ্ধে একে একে শহীদ হলেন হোসেনের সঙ্গীরাঅবশেষে ইমাম হোসেন নিজেও শহীদ হলেনসীমার তাঁর মাথা কেটে নিল

কারবালার পরে হোসেনের পরিবার বন্দী হলোনারীশিশুদের ধরে নিয়ে যাওয়া হলো এজিদের দরবারেভাগ্যের কী পরিহাসযে জয়নবকে এজিদ বিয়ে করতে চেয়েছিলেন, সেই জয়নব এখন তাঁর কারাগারে বন্দিনীকারাগারের অন্ধকারে জয়নবের মনে হতে লাগলআমি যদি এজিদকে বিয়ে করতাম, এত মানুষের রক্তপাত হতো নাকিন্তু তখন আর ফেরার পথ নেই

তৃতীয় পর্ব: এজিদ বধ পর্বপ্রতিশোধকরুণ পরিণতি

তৃতীয় পর্বে এলেন মোহাম্মদ হানিফাহোসেনের ভাইতিনি শপথ করলেন এজিদকে হত্যা করবেন, ভাইয়ের রক্তের প্রতিশোধ নেবেনদীর্ঘ সংগ্রামের পর তিনি সফল হলেনএজিদকে বধ করলেনকিন্তু বিধি বামন্যায়ের পক্ষে লড়েও হানিফা রক্ষা পেলেন নাদুই পাহাড়ের মধ্যে তিনি চিরবন্দী হয়ে গেলেনযিনি অন্যায়কারীকে ধ্বংস করলেন, তিনি নিজেও চিরকারাবদ্ধ হলেনএই করুণ পরিণতিতেই শেষ হলো 'বিষাদ সিন্ধু'।

প্রণয়, স্ত্রী, রাজ্য, ধনএই কয়েকটি বিষয়ের লোভ বড় ভয়ানকএই লোভে লোকের ধর্ম, পুণ্য, সাধুতা, পবিত্রতা সমস্তই একেবারে সমূলে বিনাশ প্রাপ্ত হয়বিষাদ সিন্ধু

হুতাশনের দাহন আশা, ধরণীর জলশোষণ আশা, ভিখারীর অর্থলোভ আশাহিংসাপূর্ণ পাপ হৃদয়ে দুরাশারও তেমনি নিবৃত্তি নাইবিষাদ সিন্ধু

বিষাদ সিন্ধুর চরিত্র বিশ্লেষণ

বিষাদ সিন্ধুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর চরিত্রচিত্রণপুরো উপন্যাসটি যাঁকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তিনি ইমাম হোসেন ননতিনি এজিদএটি একটি অভূতপূর্ব সাহিত্যিক সাহসযে মানুষটি ইতিহাসে ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত, মীর মশাররফ তাঁকেই কেন্দ্রে রাখলেনরক্তমাংসের একজন জীবন্ত মানুষ হিসেবে

এজিদ অনেকটা গ্রিক ট্র্যাজেডির নায়কের মতোতাঁর একটিমাত্র দুর্বলতা (জয়নবের প্রতি অপ্রতিদান প্রেম) তাঁকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেছেতিনি পাপী, কিন্তু পাথর ননতাঁর মধ্যে মানবিক অনুভূতি আছে, যন্ত্রণা আছে, প্রেমের ব্যর্থতার বেদনা আছেএই জটিলতাই এজিদকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় খলনায়ক করে তুলেছে

চরিত্র

পরিচয়বিশেষত্ব

এজিদ

কেন্দ্রীয় চরিত্রমুয়াবিয়ার পুত্র, দামেস্কের খলিফাজয়নবের অপ্রতিদান প্রেমে পাগলকারবালায় হোসেনকে হত্যা করানএজিদের ট্র্যাজিক পরিণতিতেই উপন্যাস শেষ

ইমাম হোসেন

মহানবীর দৌহিত্রকারবালায় শহীদউপন্যাসে গৌণকাহিনি নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকা ক্ষীণ

ইমাম হাসান

হোসেনের বড় ভাইমহরম পর্বে বিষপ্রয়োগে নিহত হন

মুয়াবিয়া

এজিদের পিতাসিরিয়ার শাসকহাসানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী

জয়নব

হোসেনের বোনএজিদের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেনকারবালার পর এজিদের কারাগারে বন্দিনী

মোহাম্মদ হানিফা

হোসেনের ভাইএজিদকে হত্যা করেন কিন্তু নিজেও চিরবন্দী হন

সীমার

এজিদের নির্মম সেনাপতিহোসেনের মাথা কেটেছিলেন

বিষাদ সিন্ধু: সাফল্যসীমাবদ্ধতা

'বিষাদ সিন্ধু' উপন্যাস হিসেবে কতটা সফল — এ নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছেমুহম্মদ আব্দুল হাই এটিকে বলেছেন 'একাধারে ইতিহাস আশ্রিত রোমান্টিক উপন্যাসগদ্য মহাকাব্য'। মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালও 'গদ্য মহাকাব্য' বলে অভিহিত করেছেনমুনীর চৌধুরী দোভাষী পুঁথির সাথে এর সাদৃশ্য লক্ষ করেছেন

সমালোচকরা ঠিকই বলেছেনবইটিতে প্রচুর অলৌকিক ঘটনা আছে (এজিদের চোখের সামনে হোসেনের খণ্ডিত মাথা অদৃশ্য হওয়া, কারবালার গাছ থেকে রক্তক্ষরণ), ইতিহাসের বিকৃতি আছেকিন্তু এই সব সীমাবদ্ধতার পরেও 'বিষাদ সিন্ধু' টিকে আছেকারণ এর ভাষামীরের গদ্য পুষ্পিত, গতিময়, ধ্বনিতরঙ্গবিশিষ্টসেই ভাষার জাদুই পাঠককে আটকে রাখে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: বিষাদ সিন্ধুর কেন্দ্রীয় চরিত্র হোসেন ননএজিদউপন্যাসটির শুরু এজিদের মনোদুঃখ দিয়ে এবং শেষ এজিদের ট্র্যাজিক পরিণতি দিয়েতাই বলা হয়: সামগ্রিকভাবে 'বিষাদ সিন্ধু' আসলে এজিদেরই কাহিনী

উদাসীন পথিকের মনের কথা (১৮৯০)

প্রকাশকাল: ২৯ আগস্ট ১৮৯০

এই উপন্যাসটি না পুরোপুরি উপন্যাস, না যথার্থ আত্মজীবনীএটি একটি অদ্ভুত মিশ্র রচনা, যেখানে ব্যক্তিজীবনসামাজিক ইতিহাস একসাথে মিলেমিশে গেছেকাহিনির দুটি ধারা সমান্তরালে চলেএক ধারায় আছে নীলকর ইংরেজ কেনীর অত্যাচার এবং সুন্দরপুরের মহিলা জমিদার প্যারী সুন্দরীর সাথে তার দ্বন্দ্ব, নীলবিদ্রোহকেনীর পরিণতিআরেক ধারায় আছে মীরের পিতা মীর মোয়াজ্জম হোসেনের দাম্পত্যজীবন এবং তাঁর নানা সম্পর্কের টানাপোড়েন

এই উপন্যাসের বিশেষ মূল্য হলো এর ঐতিহাসিক সাক্ষ্যনীলচাষের যুগে ইংরেজ নীলকর এবং বাংলার মানুষের মধ্যে যে সংঘাত হয়েছিল, মীর সেই আঞ্চলিক ইতিহাসকে সাহিত্যের ভাষায় ধরে রেখেছেন

গাজী মিয়াঁর বস্তানী (১৮৯৯)

প্রকাশকাল: ১৮৯৯ (প্রথম অংশ)

'গাজী মিয়াঁর বস্তানী' একটি আত্মজীবনীমূলক নকশাধর্মী রচনাএখানে মীর তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেনরচনাটির একটি আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলোএর প্রচ্ছদে লেখকের নাম নেই! স্বত্বাধিকারী হিসেবে শুধু লেখা আছে 'উদাসীন পথিক'। এতে দুটি সমান্তরাল কাহিনি আছে: কুঞ্জনিকেতনের ভূমি অধিকারিণী পয়জারননেসার অনৈতিক জীবনযাপন এবং দুই শরিক সোনাবিবিমনিবিবির দ্বন্দ্ব

ব্যঙ্গের মাধ্যমে মীর এখানে সমাজের কুৎসিত মুখ দেখিয়েছেননৈতিক অধঃপতন, দুর্নীতি, মানবিকতার অভাবরচনাটির দ্বিতীয় অংশ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়নিতবে 'আমার জীবনী'-তে কিছু অংশ মুদ্রিত হয়েছিল

নাটক: সমাজের আয়না

মীর মশাররফ হোসেনের নাটক রচনার পেছনে একটি সচেতন উদ্দেশ্য ছিলসমাজকে তার নিজের মুখ দেখানো। 'জমিদার দর্পণ' নাটকের ভূমিকায় তিনি নিজেই লিখেছেন: 'নিরপেক্ষভাবে আপন মুখ দর্পণে দেখিলে যেমন ভালমন্দ বিচার করা যায়, পরের মুখে তত ভাল হয় নাজমিদার বংশে আমার জন্ম, আত্মদর্শন করিয়াই লিখিয়াছি।' এই স্বীকারোক্তিটি মীরের সততার প্রমাণ

বসন্তকুমারী (১৮৭৩)

প্রকাশকাল: ১৮৭৩

'বসন্তকুমারী' — বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকের প্রথম নাটকনাটকটি তিনটি অঙ্কে এবং নটনটীর প্রস্তাবনাসহ মোট তেরোটি দৃশ্যে বিভক্তপ্রস্তাবনার একটিসহ মোট আটটি গান আছেমীর এই নাটকটি নওয়াব আব্দুল লতিফকে উৎসর্গ করেছিলেন

কাহিনি অনেকটা ক্লাসিক ট্র্যাজেডির ছাঁচে: বৃদ্ধ রাজা বীরেন্দ্র সিংহের তরুণী স্ত্রী রেবতীরাজার প্রথম পক্ষের ছেলে নরেন্দ্র সিংহকে রেবতী প্রেম নিবেদন করলেননরেন্দ্র সেই প্রেম ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেনপ্রত্যাখ্যাতা রেবতী তখন ষড়যন্ত্রের পথ ধরলেনএই ষড়যন্ত্রের শেষে সমগ্র রাজপরিবারটিই ধ্বংস হয়ে গেলএকটি নারীর অপ্রতিদান প্রেমপ্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেল একটি রাজবংশ

নামকরণে মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'কৃষ্ণকুমারী নাটক'-এর প্রভাব স্পষ্টমীর মধুসূদনকে শ্রদ্ধা করতেনএবং তাঁর মতোই একটি ট্র্যাজিক নাটক লেখার স্বপ্ন দেখেছিলেন

বসন্তকুমারীমুসলমান রচিত প্রথম বাংলা নাটকএটি নওয়াব আব্দুল লতিফকে উৎসর্গকৃত

জমিদার দর্পণ (১৮৭৩)

প্রকাশকাল: ১৮৭৩

'জমিদার দর্পণ' — মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যিক সাহসিকতার সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শনজমিদার পরিবারে জন্মেও তিনি জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাটক লিখলেন। ১৮৭২–৭৩ সালে সিরাজগঞ্জে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিলসেই বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত এই নাটক

কাহিনি হৃদয়বিদারকএক অত্যাচারী লম্পট জমিদারের নাম হায়ওয়ান আলিনামের মধ্যেই তার চরিত্র লুকিয়ে (হায়ওয়ান = পশু)। তার এক গরিব প্রজার স্ত্রী নুরুন্নেহারঅপূর্ব সুন্দরীসেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হায়ওয়ান আলি নুরুন্নেহারকে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেননুরুন্নেহারের নির্দোষ স্বামীকে মিথ্যা অভিযোগে বন্দি করা হলো, অযথা জরিমানা করা হলো, অমানবিক নির্যাতন করা হলো

নুরুন্নেহারের সামনে তখন দুটি পথ: হয় স্বামীকে মুক্ত করতে নিজের সতীত্ব বিসর্জন দাও, অথবা স্বামীর কারাযন্ত্রণা সহ্য করোএই অমানবিক দ্বিধাই নাটকের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: 'জমিদার দর্পণ' নাটকের ভূমিকায় মীর লিখেছেন: 'নিরপেক্ষভাবে আপন মুখ দর্পণে দেখিলে যেমন ভালমন্দ বিচার করা যায়।' এই উক্তিটি BCS পরীক্ষায় আসে

বেহুলা গীতাভিনয় (১৮৯৮)

প্রকাশকাল: ১৮৯৮

'বেহুলা গীতাভিনয়' গদ্যেপদ্যে রচিত একটি গীতিনাট্যমনসামঙ্গলের বেহুলা-লক্ষ্মীন্দরের পুরাণকাহিনী নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়েছে এতেকিন্তু শুধু পুরাণ নয়এই নাটকে মীর ইংরেজ শাসকদের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে তাদের প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়েছেন

নিয়তি কি অবনতি (১৮৮৯)

প্রকাশকাল: কোহিনুর পত্রিকায় ১৮৯৮–৯৯

এই নাটকটি 'কোহিনুর' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিলনাটকটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল কিনা, বা সম্পূর্ণ হয়েছিল কিনাতার সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় নাএই রহস্য আজও অমীমাংসিত

কাব্যপ্রবন্ধ: বহুমুখী প্রতিভার ছাপ

গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু (১৮৭৩) — প্রথম কাব্যগ্রন্থ

মীরের প্রথম কবিতার বই 'গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু' ১৮৭৩ সালে প্রকাশিত হয়গোরাই নদীর উপর নির্মিত সেতুকে কেন্দ্র করে এবং স্থানীয় প্রকৃতিজীবনকে নিয়ে লেখা এই কবিতাগুলো পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল

গোরাই-ব্রিজমীর মশাররফ হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ (১৮৭৩)।

ইসলামি কাব্যগ্রন্থ: ধর্মসাহিত্যের মেলবন্ধন

মীরের জীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে আছে ইসলামি বিষয়বস্তুতে রচিত কাব্যগ্রন্থ। 'বিবি খোদেজার বিবাহ' (১৯০৫) — মহানবীর প্রথম স্ত্রী খোদেজার জীবনকাহিনী নিয়ে। 'হজরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ' (১৯০৫) — ইসলামের দ্বিতীয় খলিফার জীবন নিয়ে। 'মদিনার গৌরব' (১৯০৬) — ইসলামের পবিত্র নগরীর মহিমা নিয়েএই কাব্যগুলোর মাধ্যমে মীর মুসলমান পাঠকদের কাছে ইসলামের ইতিহাসঐতিহ্য বাংলা ভাষায় তুলে ধরেছিলেন

গো-জীবন (১৮৮৯) ও 'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা' — সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রকাশ

মীর মশাররফ হোসেনের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মানসিকতা। 'গো-জীবন' (১৮৮৯) এবং 'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা' প্রবন্ধে তিনি হিন্দু সমাজের গরু রক্ষার বিষয়ে উদার দৃষ্টিভঙ্গি দেখিয়েছিলেনমুসলমানদের গরু কোরবানির কারণে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছিল, সে বিষয়ে তিনি সমন্বয়ের পথ খুঁজেছিলেন

এই লেখার ফলাফল? তাঁর নিজের মুসলমান সমাজই তাঁকে নিগৃহীত করল! কিন্তু মীর পিছু হটেননিনিজের সমাজের সমালোচনার শিকার হয়েও তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেনএটি তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে মহদিক

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: 'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা' প্রবন্ধ লিখে মীর নিজের মুসলমান সমাজ কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছিলেনকিন্তু তিনি পিছু হটেননিএই সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মানসিকতাই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে

আত্মজীবনীমূলক রচনা: নিজেই নিজের সাক্ষী

আমার জীবনী (১৯০৮–১৯১০)

মীরের আত্মজীবনী 'আমার জীবনী' তিনটি ভাগে ১৯০৮ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়এতে তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায় বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছেশৈশব, যৌবন, প্রেমের ব্যর্থতা, বিবাহজীবন, সাহিত্যচর্চার সংগ্রামমীর যে কতটা সৎ লেখক ছিলেন, 'আমার জীবনী' পড়লে সেটা স্পষ্ট হয়তিনি নিজের ব্যর্থতাকলঙ্কের কথা লিখতেও দ্বিধা করেননি

আমার জীবনীর জীবনী বিবি কুলসুম (১৯১০)

দ্বিতীয় স্ত্রী বিবি কুলসুমকে নিয়ে লেখা এই গ্রন্থটি 'আমার জীবনী'-র পরিপূরকযেহেতু দুজন একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন, তাই বিবি কুলসুমের কথা লিখতে গিয়ে মীর স্বাভাবিকভাবেই নিজের কথাও বলে গেছেনএই গ্রন্থটি তাই একই সাথে প্রিয়তমার জীবনী এবং লেখকের আত্মকথন

মীরের আত্মজীবনীমূলক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যে আত্মজীবনী ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেনিজের জীবনকে সাহিত্যের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা তখনকার দিনে খুব একটা প্রচলিত ছিল না

সাহিত্যিক মূল্যায়ন: মীর কেন অনন্য?

মীর মশাররফ হোসেনকে বোঝার জন্য তাঁর সময়টা বোঝা দরকারউনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের অনুপস্থিতি ছিল প্রায় সম্পূর্ণতাঁরা তখনও পুঁথি সাহিত্যের মধ্যে আবদ্ধ, পাশ্চাত্য শিক্ষাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন, বাংলা সাহিত্যকে 'হিন্দুদের সাহিত্য' বলে দূরে সরিয়ে রাখছেনএই পরিস্থিতিতে মীর একা এগিয়ে এলেন এবং বিশুদ্ধ বাংলায় সাহিত্য লিখলেন

মীরের গদ্যের একটি বিশেষ গুণ হলো তার গতিসংগীতময়তা। 'বিষাদ সিন্ধু'-র ভাষা পড়তে পড়তে মনে হয় যেন কেউ সুর করে পড়ছেনতাঁর বাক্যের মধ্যে একটা ছন্দ আছে, একটা প্রবাহ আছে যা পাঠককে টেনে ধরেআরবি-ফারসি মেশানো দোভাষী পুঁথির ভাষা ছেড়ে তিনি যে শালীন সাধুগদ্যের পথ ধরলেন, সেটা বাংলা সাহিত্যের একটি বড় পদক্ষেপ

তিনি সমন্বয়ধর্মী ধারার প্রবর্তকহিন্দু পুরাণ, মুসলিম ইতিহাস, ইংরেজ শাসনামলের বাস্তবতাসব কিছুকে তিনি একই কলমের ডগায় এনেছিলেনবাংলা সাহিত্যের হিন্দু-মুসলিম বিভেদের দেওয়ালটা ভাঙতে তিনি প্রথম সাহস দেখিয়েছিলেন

'বিষাদ সিন্ধু' — বাংলা সাহিত্যে অভিনব সৃষ্টিএকাধারে ইতিহাস আশ্রিত রোমান্টিক উপন্যাসগদ্য মহাকাব্যমুহম্মদ আব্দুল হাই

পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর: BCS ও চাকরি প্রস্তুতি

জীবনী সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: মীর মশাররফ হোসেনের পুরো নাম কী?

উত্তর: সৈয়দ মীর মশাররফ হোসেন

প্রশ্ন: তাঁর জন্ম কবে, কোথায়?

উত্তর: ১৩ নভেম্বর ১৮৪৭; কুষ্টিয়া জেলার লাহিনীপাড়া গ্রামে

প্রশ্ন: মীরের মৃত্যু কবে, কোথায়?

উত্তর: ১৯ ডিসেম্বর ১৯১২; পদমদী গ্রাম, রাজবাড়ী জেলা

প্রশ্ন: মীরের ছদ্মনাম কী কী?

উত্তর: গাজী মিয়াঁ এবং উদাসীন পথিক

প্রশ্ন: মীরের সাহিত্যগুরু কে?

উত্তর: কাঙাল হরিনাথ মজুমদারগ্রামবার্তা প্রকাশিকার সম্পাদক

প্রশ্ন: মীরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কোন শ্রেণি পর্যন্ত?

উত্তর: পঞ্চম শ্রেণি

প্রশ্ন: মীরের দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম কী?

উত্তর: বিবি কুলসুম

প্রশ্ন: মীরের প্রথম স্ত্রীর নাম?

উত্তর: আজিজুন্নেসা (কোনো সন্তান ছিল না)

প্রশ্ন: মীর কোথায় সমাহিত?

উত্তর: পদমদীতেদ্বিতীয় স্ত্রী বিবি কুলসুমের কবরের পাশে

প্রশ্ন: মীরকে বাংলা সাহিত্যে কোন নামে ডাকা হয়?

উত্তর: গাজী মিয়া

সাহিত্যকর্ম সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: মীরের প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ কোনটি?

উত্তর: রত্নবতী (১৮৬৯)

প্রশ্ন: রত্নবতীর মূল বিতর্কের বিষয় কী?

উত্তর: 'ধন বড় না বিদ্যা বড়'

প্রশ্ন: মীরের প্রথম নাটক কোনটি?

উত্তর: বসন্তকুমারী (১৮৭৩)

প্রশ্ন: বসন্তকুমারী কাকে উৎসর্গ করা হয়?

উত্তর: নওয়াব আব্দুল লতিফকে

প্রশ্ন: বসন্তকুমারীতে কতটি অঙ্ক এবং কতটি গান?

উত্তর: তিনটি অঙ্ক; আটটি গান

প্রশ্ন: জমিদার দর্পণের কেন্দ্রীয় ভিলেনের নাম?

উত্তর: হায়ওয়ান আলি

প্রশ্ন: জমিদার দর্পণের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রের নাম?

উত্তর: নুরুন্নেহার

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধু কত পর্বে প্রকাশিত?

উত্তর: তিনটি পর্বে (১৮৮৫, ১৮৮৭, ১৮৯১)

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধুর তিনটি পর্বের নাম?

উত্তর: মহরম পর্ব, উদ্ধার পর্ব, এজিদ বধ পর্ব

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধুতে মোট কতটি অধ্যায়?

উত্তর: ৬৩টি প্রবাহ (উপক্রমণিকাউপসংহারসহ)

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধুর কেন্দ্রীয় চরিত্র কে?

উত্তর: এজিদ

প্রশ্ন: এজিদ কাকে ভালোবাসতেন?

উত্তর: হোসেনের বোন জয়নবকে

প্রশ্ন: মোহাম্মদ হানিফার পরিণতি কী?

উত্তর: এজিদকে হত্যার পর দুই পাহাড়ের মধ্যে চিরবন্দী

প্রশ্ন: গাজী মিয়াঁর বস্তানীর প্রচ্ছদে লেখকের নাম নেইতার পরিবর্তে কী লেখা?

উত্তর: স্বত্বাধিকারী হিসেবে 'উদাসীন পথিক'

প্রশ্ন: মীরের আত্মজীবনীর নাম?

উত্তর: আমার জীবনী (১৯০৮–১৯১০)

প্রশ্ন: মীরের প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম?

উত্তর: গোরাই-ব্রিজ অথবা গৌরী-সেতু (১৮৭৩)

প্রশ্ন: মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা সাহিত্য সাময়িকীর নাম?

উত্তর: আজিজন নেহার (১৮৭৪)

'প্রথম' সংক্রান্ত MCQ — অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম ঔপন্যাসিক কে?

উত্তর: মীর মশাররফ হোসেন

প্রশ্ন: মুসলিম রচিত প্রথম বাংলা উপন্যাস কোনটি?

উত্তর: রত্নবতী (১৮৬৯)

প্রশ্ন: মুসলিম রচিত প্রথম বাংলা নাটক কোনটি?

উত্তর: বসন্তকুমারী (১৮৭৩)

প্রশ্ন: মুসলমান সম্পাদিত প্রথম বাংলা সাহিত্য পত্রিকা?

উত্তর: আজিজন নেহার (১৮৭৪)

প্রশ্ন: বাঙালি মুসলমান সাহিত্যিকদের পথিকৃকে?

উত্তর: মীর মশাররফ হোসেন

প্রশ্ন: বাংলা সাহিত্যে সমন্বয়ধর্মী ধারার প্রবর্তক?

উত্তর: মীর মশাররফ হোসেন

ট্রিকি প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধু কোন ধরনের রচনা?

উত্তর: মহাকাব্যিক ঐতিহাসিক উপন্যাস / গদ্য মহাকাব্য

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধুর মূল বিষয়বস্তু হোসেন না এজিদের কাহিনী?

উত্তর: এজিদেরশুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এজিদকে ঘিরেই কাহিনি

প্রশ্ন: মীর কোন যুগের সাহিত্যিক?

উত্তর: বঙ্কিমযুগেরউনিশ শতকের

প্রশ্ন: বিষাদ সিন্ধুতে বর্ণিত কারবালার যুদ্ধ হিজরি কত সালে?

উত্তর: হিজরি ৬১ সালের মহররম মাসে

প্রশ্ন: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মীরের নামে হল কখন প্রতিষ্ঠিত?

উত্তর: ১৯৭৮ সালেদক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম আবাসিক হল

প্রশ্ন: মীরের মোট গ্রন্থ সংখ্যা?

উত্তর: ৩৬ থেকে ৪২টি (বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নমত)

প্রশ্ন: 'গোকুল নির্মূল আশঙ্কা' প্রবন্ধ লিখে কী হয়েছিল?

উত্তর: মীর নিজের মুসলমান সমাজ কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছিলেন

সম্পূর্ণ রচনাতালিকা

ক্র.

রচনার নাম

প্রকাশ

ধরন

রত্নবতী

১৮৬৯

মুসলিম রচিত প্রথম উপন্যাস; মীরের প্রথম গ্রন্থ

গোরাই-ব্রিজ / গৌরী-সেতু

১৮৭৩

প্রথম কাব্যগ্রন্থ

বসন্তকুমারী

১৮৭৩

মুসলমান রচিত প্রথম নাটক

জমিদার দর্পণ

১৮৭৩

সামাজিক প্রতিবাদী নাটক

আজিজন নেহার (পত্রিকা)

১৮৭৪

মুসলিম সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য পত্রিকা

এর উপায় কি

১৮৭৫

প্রবন্ধ

বিষাদ সিন্ধু (প্রথম পর্ব: মহরম পর্ব)

১৮৮৫

মহাকাব্যিক উপন্যাস

বিষাদ সিন্ধু (দ্বিতীয় পর্ব: উদ্ধার পর্ব)

১৮৮৭

মহাকাব্যিক উপন্যাস

সঙ্গীত লহরী

১৮৮৭

সঙ্গীত বিষয়ক

১০

গো-জীবন

১৮৮৯

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিমূলক

১১

নিয়তি কি অবনতি

১৮৮৯

নাটক (পত্রিকায় প্রকাশিত)

১২

উদাসীন পথিকের মনের কথা

১৮৯০

আত্মকথামূলক উপন্যাস

১৩

হিতকরী (পত্রিকা)

১৮৯০

পাক্ষিক পত্রিকা

১৪

বিষাদ সিন্ধু (তৃতীয় পর্ব: এজিদ বধ পর্ব)

১৮৯১

মহাকাব্যিক উপন্যাস

১৫

তহমিনা

১৮৯৭

উপন্যাস

১৬

টালা অভিনয়

১৮৯৭

প্রহসন

১৭

বেহুলা গীতাভিনয়

১৮৯৮

গীতিনাট্য

১৮

গাজী মিয়াঁর বস্তানী

১৮৯৯

আত্মজীবনীমূলক নকশা

১৯

মৌলুদ শরীফ

১৯০৩

ধর্মগ্রন্থ

২০

মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা (১ম)

১৯০৩

পাঠ্যপুস্তক

২১

বিবি খোদেজার বিবাহ

১৯০৫

ইসলামি কাব্য

২২

হজরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ

১৯০৫

ইসলামি কাব্য

২৩

মদিনার গৌরব

১৯০৬

ইসলামি কাব্য

২৪

মুসলমানদের বাঙ্গালা শিক্ষা (২য়)

১৯০৮

পাঠ্যপুস্তক

২৫

বাজীমা

১৯০৮

কবিতায় রচিত নকশা

২৬

আমার জীবনী

১৯০৮–১০

আত্মজীবনী

২৭

আমার জীবনীর জীবনী বিবি কুলসুম

১৯১০

স্ত্রীর জীবনী

Review this chapter

You Can Also Read

Chapters closely related to the one you are reading now.

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

মঙ্গলকাব্য

No reviews
0 students
Read chapter

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

No reviews
0 students
Read chapter

Most Read by Students

Popular picks getting the strongest student traffic right now.

অসহযোগ আন্দোলন (মার্চ ১৯৭১)

No reviews
1 student
Read chapter

নদী, সেতু, পাহাড়, দ্বীপ, বন, সমুদ্রবন্দর

No reviews
1 student
Read chapter

বাংলা ভাষার রীতি

No reviews
1 student
Read chapter

Others Who Read This Also Read

Behavior-based suggestions from student reading patterns where available.

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

মঙ্গলকাব্য

No reviews
0 students
Read chapter

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

No reviews
0 students
Read chapter

Best Reviewed

Chapters earning the strongest student feedback.

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

মঙ্গলকাব্য

No reviews
0 students
Read chapter

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

No reviews
0 students
Read chapter

Course Suggestions

Want a more guided path after this chapter? These courses are the closest fit.

Browse all courses
Learner fit৳1,999

Bangla

Bangla Language Mastery

Popular with BCS learners who want guided study.

6 lessons8.5h4.9 (186)1.3K students

By Sadia Rahman

View course
Learner fit৳2,999

Platform Building

Teacher Marketplace Blueprint

Popular with BCS learners who want guided study.

5 lessons6.8h4.9 (28)410 students

By Sadia Rahman

View course
FreeFree

English

Admission English Playbook

Free guided course with lessons you can jump into anytime.

4 lessons4.2h4.8 (91)2.8K students

By Rayan Akter

View course