বাংলা সাহিত্য
কাজী নজরুল ইসলাম
বিদ্রোহী কবি | জাতীয় কবি | সাম্যের কবি | প্রেমের কবি
জীবন পরিচয় ও পটভূমি
◆ জন্ম ও শৈশব
১৮৯৯ সালের ২৫ মে, বর্ধমান জেলার আসানসোলের অদূরে চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী সেটি ছিল ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ। তাঁর পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ, মাতার নাম জাহেদা খাতুন। পরিবারটি ছিল অত্যন্ত দরিদ্র। বাবা ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও মাজারের খাদেম। সংসারে অভাব-অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী।
এই দারিদ্র্যের কারণেই শিশু নজরুলের নাম হয়ে যায় 'দুখু মিয়া'। দুঃখের মাঝে জন্ম, দুঃখের মাঝে বেড়ে ওঠা — তাই এই ডাকনাম। মাত্র দশ বছর বয়সে পিতৃবিয়োগ হলে পরিবারের হাল ধরার জন্য কিশোর নজরুলকে নানা কাজে হাত দিতে হয়। মক্তবে শিক্ষকতা, মাজারে খেদমত, হাজি পালোয়ানের ডিমের দোকানে কাজ — সব করেছেন তিনি।
⚡ নজরুলের ডাকনাম 'দুখু মিয়া' — পরিবারের চরম দারিদ্র্য ও দুঃখের কারণে।
◆ লেটো দলে নজরুল
কিশোর বয়সে নজরুল যোগ দেন 'লেটো' দলে। লেটো হলো বাংলার এক বিশেষ ধরনের গীতিনাট্যের দল — যেখানে গান, কবিতা ও অভিনয়ের মাধ্যমে পালাগান পরিবেশিত হয়। এই দলে থাকতে থাকতেই নজরুলের মধ্যে কবিতা ও গানের বীজ রোপিত হয়। তিনি নিজেই পালা রচনা করতেন, সুর দিতেন এবং অভিনয় করতেন। লেটো দলের এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী জীবনে তাঁকে সংগীতসাধক করে তোলার ভিত্তি তৈরি করে দেয়।
⚡ লেটো দল হলো বাংলার গীতিনাট্যের দল — নজরুল এখানে গান রচনা ও অভিনয় করতেন।
◆ সেনাজীবন ও সাহিত্যের শুরু
১৯১৭ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে নজরুল ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ৪৯ নং বাঙালি পল্টনে হাবিলদার পদে নিযুক্ত হন তিনি। করাচি সেনানিবাসে থাকাকালীন একটি ঘটনা ঘটে যা পরবর্তী ইতিহাস পাল্টে দেবে — সেখানে পাঞ্জাবি হাবিলদার মৌলভী সাহেবের কাছে ফারসি ও উর্দু শিখতে শুরু করেন নজরুল। পড়তে শুরু করেন রুমি, হাফিজ, ওমর খৈয়ামের কবিতা। এই পাঠাভ্যাসই তাঁর সংগীত ও কাব্যকে দিয়েছে অনন্য ফারসি মেজাজ।
১৯১৯ সালে সেনাবাহিনী থেকে ছাড়া পেয়ে নজরুল লেখালেখিতে পুরোপুরি মনোযোগ দেন। ওই বছরই 'সওগাত' পত্রিকায় প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম গদ্য রচনা 'বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী'। এই একটি লেখাই বাংলা সাহিত্যজগতকে জানিয়ে দিল — এক অসাধারণ কণ্ঠস্বর এসে গেছেন।
⚡ নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা 'বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী' (১৯১৯) — সওগাত পত্রিকায়।
বিষয় | তথ্য |
জন্ম | ২৫ মে ১৮৯৯, চুরুলিয়া, বর্ধমান |
মৃত্যু | ২৯ আগস্ট ১৯৭৬, পিজি হাসপাতাল, ঢাকা |
ডাকনাম | দুখু মিয়া |
পেশা (শুরুতে) | লেটো দলের কর্মী, মক্তবের শিক্ষক, সেনাসদস্য |
সেনা রেজিমেন্ট | ৪৯ নং বাঙালি পল্টন, হাবিলদার পদ |
প্রথম স্ত্রী | নার্গিস — বিয়ের রাতেই বিচ্ছেদ |
দ্বিতীয় স্ত্রী | প্রমীলা দেবী সেনগুপ্তা (১৯২৪) |
বাকহীন হন | ১৯৪২ সালে, পিক'স ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে |
বাংলাদেশে আসেন | ১৯৭২ — শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় সম্মানে আনেন |
কবরস্থান | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ |
কাব্যগ্রন্থ ও কবিতা
অগ্নি-বীণা (১৯২২) — প্রথম কাব্যগ্রন্থ
১৯২২ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত হয় নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'অগ্নি-বীণা'। গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। এই একটি বই বাংলা সাহিত্যে যে ঝড় তুলেছিল, তার তুলনা নেই। প্রথম প্রকাশেই সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। পাঠকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকার শঙ্কিত হয়ে পড়ে। এতে মোট ১২টি কবিতা আছে, প্রতিটিই যেন আগুনের গোলা।
⚡ অগ্নি-বীণা উৎসর্গ — বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। প্রথম কবিতা — প্রলয়োল্লাস।
✦ বিদ্রোহী (১৯২২) [অগ্নি-বীণার অন্তর্গত]
◆ পটভূমি ও রচনার ইতিহাস
১৯২১ সালের শেষে, একটি শীতের রাতে নজরুল কলকাতার ৩/৪সি তালতলা লেনের বাড়িতে একটানা বসে এই কবিতা লেখেন। পরদিন বন্ধু মুজফফর আহমেদকে দেখান। তিনি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে যান। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি 'বিজলী' পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয় কবিতাটি। পরদিনই সারা কলকাতায় হইচই পড়ে যায়। একই সাথে 'মোসলেম ভারত', 'প্রবাসী' ও 'সাধনা' — মোট চারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
কবিতাটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কবি নিজেকে একের পর এক বিশেষণে বর্ণনা করেন। তিনি নিজেকে বলেন — আমি দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস। আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস। আমি মহাপ্রলয়ের নটরাজ। এখানেই শেষ নয়।
কবি নিজেকে তুলনা করেন হিন্দু পুরাণের শিবের সাথে — যিনি ধ্বংস ও সৃষ্টির দেবতা। তুলনা করেন ভৃগু মুনির সাথে — যিনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছিলেন। তুলনা করেন গ্রিক পুরাণের হারকিউলিসের সাথে, অর্ফিউসের সাথে। ইসলামি পুরাণ থেকে আনেন ইসরাফিল ফেরেশতাকে — যিনি কেয়ামতের দিন শিঙায় ফুঁ দেবেন।
কবিতার মূল বক্তব্য হলো — পৃথিবীতে যতদিন অত্যাচার আছে, যতদিন উৎপীড়িত মানুষের কান্না থামেনি, ততদিন কবি শান্ত হবেন না। তিনি বিদ্রোহ করতেই থাকবেন। তিনি হবেন উৎপীড়িতের পক্ষের শক্তি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সামাজিক বৈষম্য — সবকিছুর বিরুদ্ধে এই কবি হলেন এক বিশাল 'না' বলার কণ্ঠস্বর।
কবিতার শেষে কবি বলেন — আমি চিরবিদ্রোহী, কিন্তু আমি শান্ত হব সেদিন, যেদিন আর কোনো উৎপীড়িতের কান্না থাকবে না। এই একটি লাইনেই বোঝা যায় নজরুলের বিদ্রোহ কোনো ধ্বংসের জন্য নয়, মানুষের মুক্তির জন্য।
★ বিদ্রোহী = বিদ্রোহ (ধ্বংসের জন্য নয়) + মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।
“মহা-বিদ্রোহী রণক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত / যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না।”
“আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন!”
“আমি চিরদুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, / মহাপ্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস!”
⚡ বিদ্রোহী কবিতায় ১৩৩টি পঙক্তি, ৬টি স্তবক। একসাথে ৪টি পত্রিকায় প্রকাশিত।
প্রশ্ন: বিদ্রোহী কবিতায় কত পঙক্তি? ► ১৩৩টি
প্রশ্ন: বিদ্রোহী কবিতা প্রথম কোন পত্রিকায়? ► বিজলী পত্রিকায়, ৬ জানুয়ারি ১৯২২
✦ প্রলয়োল্লাস (১৯২১) [অগ্নি-বীণার প্রথম কবিতা]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'প্রলয়োল্লাস' হলো অগ্নি-বীণার প্রথম কবিতা। নামটিই বলে দিচ্ছে — প্রলয়ের মাঝে উল্লাস। অর্থাৎ ধ্বংসের মধ্যেই আছে নতুন সৃষ্টির আনন্দ।
কবিতায় কবি একটি প্রশ্ন করেন — এই ভয়ংকর ঝড়-প্রলয় কে এনেছে? এই কালবৈশাখীর নতুন কেতন কে উড়িয়েছে? কবির উত্তর হলো — এ হলো পরিবর্তনের বার্তাবাহক। পুরনো পচা সমাজ, পরাধীনতার শৃঙ্খল, ব্রিটিশ শাসনের অত্যাচার — এসব ধ্বংস হবেই। এবং সেই ধ্বংস হওয়াটাই আনন্দের, কারণ তার পরেই আসবে নতুন সভ্যতা, নতুন ভারত।
কবি তাঁর পাঠকদের বলছেন — ভয় পেও না এই প্রলয়ে। এই ধ্বংসকে স্বাগত জানাও। যে পুরনো গেছে তা যাক, নতুনকে বরণ করো। 'তোরা সব জয়ধ্বনি কর' — এই আহ্বান আসলে নতুন ভারতের জন্য জয়ধ্বনি।
“তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর! / ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়!”
⚡ প্রলয়োল্লাস — অগ্নি-বীণার প্রথম কবিতা। ধ্বংস নয়, নতুন সৃষ্টির আনন্দই মূল বিষয়।
✦ আনন্দময়ীর আগমনে (১৯২২) [ধূমকেতু পত্রিকায় — বিতর্কিত কবিতা]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বরে 'ধূমকেতু' পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এই কবিতা। বাইরে থেকে মনে হয় এটি হিন্দু দেবী দুর্গার আগমনের স্তুতি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এটি একটি রাজনৈতিক কবিতা। দেবী দুর্গাকে নজরুল ব্যবহার করেছেন ব্রিটিশ শাসনের অবসানের প্রতীক হিসেবে।
কবিতায় কবি বলছেন — হে আনন্দময়ী মা (দুর্গা), তুমি এসো। তোমার আগমনে এই দেশের অত্যাচারীরা পালাবে। তোমার তরোয়াল দিয়ে কেটে ফেলো শত্রুর মাথা। ব্রিটিশ সরকার বুঝতে পারে যে এই 'মা' আসলে স্বাধীনতার প্রতীক, আর 'শত্রু' হলো ব্রিটিশ শাসক।
১৯২৩ সালে এই কবিতার জন্য নজরুলকে গ্রেফতার করা হয়। রাজদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে গিয়ে নজরুল অনশন শুরু করেন। টানা চল্লিশ দিন খাবার খাননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরাসরি চিঠি লিখে অনশন ভাঙার অনুরোধ করেন। অবশেষে নজরুল অনশন ভাঙেন।
★ এই কবিতায় দুর্গার আগমন = ব্রিটিশ শাসনের অবসানের রূপক।
⚡ এই কবিতার জন্য নজরুল গ্রেফতার, ৪০ দিন অনশন, রবীন্দ্রনাথ অনশন ভাঙান।
প্রশ্ন: কোন কবিতার জন্য নজরুল গ্রেফতার হন? ► আনন্দময়ীর আগমনে (১৯২২)
প্রশ্ন: নজরুল কারাগারে কতদিন অনশন করেন? ► ৪০ দিন
✦ সাম্যবাদী (কবিতা) (১৯২৫) [সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
১৯২৫ সালে প্রকাশিত 'সাম্যবাদী' কাব্যগ্রন্থের মূল কবিতা হলো 'সাম্যবাদী'। এই কবিতায় নজরুল ঘোষণা করেন — পৃথিবীতে সব মানুষ সমান। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান — কোনো ভেদ নেই। উঁচু জাত, নিচু জাত — এ সব মিথ্যা।
কবিতার শুরুতে কবি বলেন — 'গাহি সাম্যের গান।' তারপর একে একে বলেন: কুলি, মজুর, দাস — যারা পাথর ভাঙে, রাস্তা তৈরি করে, তারাও মানুষ। মাঠের কৃষক যে ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলায়, সে-ও মানুষ। অচ্ছুৎ হরিজন — যাকে সমাজ ছুঁতে পর্যন্ত চায় না — সেও মানুষ। বরং সব মানুষ মিলে এক।
কবিতার সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনটি হলো — 'মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।' এই একটি লাইনেই নজরুলের পুরো দর্শন প্রকাশ পেয়েছে। ঈশ্বরও নয়, মন্দিরও নয়, মসজিদও নয় — মানুষই সবার ওপরে।
“গাহি সাম্যের গান— / মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”
“কুলি মজুর দাস ভাঙিছে পাষাণ, সে জানে না মানুষ-ঈশ্বর আছেন কোথায়।”
✦ মানুষ (কবিতা) (১৯২৫) [সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ ও গল্প
'মানুষ' কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবিতা। কবিতায় একটি বর্ণনামূলক কাহিনি আছে।
এক ক্ষুধার্ত পথিক মসজিদের দরজায় এসে খাবার চায়। কিন্তু মসজিদের মোল্লা বা কাজী তাকে ফিরিয়ে দেয় — 'এখানে খাওয়া দেওয়া হয় না, যাও।' পথিক হতাশ হয়ে মন্দিরে যায়। মন্দিরের পুরোহিতও তাকে বের করে দেয়। এরপর একজন সাধারণ মানুষ — যার নিজেরও বেশি কিছু নেই — সে নিজের খাবার তুলে দেয় ক্ষুধার্ত পথিকের হাতে।
কবি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেন — কোথায় আছেন ঈশ্বর? মসজিদে? মন্দিরে? না। ঈশ্বর আছেন সেই মানুষের মধ্যে যে ক্ষুধার্তকে খেতে দেয়। ধর্মের নামে মানুষকে দূরে ঠেলে দেওয়া আসলে ঈশ্বরকেই অপমান করা।
এরপর কবি আরেকটি মার্মিক কথা বলেন — কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যেরে? এই মানসিক অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত মানবতার মধ্যেই সমাধান খুঁজে পায়।
“মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই / যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জেনের আযান শুনতে পাই।”
⚡ মানুষ কবিতায় মসজিদ ও মন্দির উভয়েই ক্ষুধার্তকে ফেরায় — কিন্তু সাধারণ মানুষ খাওয়ায়।
✦ নারী (কবিতা) (১৯২৫) [সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থ]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'নারী' কবিতায় নজরুল পৃথিবীর সমস্ত মহান সৃষ্টিতে নারীর অবদানের কথা বলেন। তিনি বলেন — পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহাপুরুষ জন্মেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে একজন নারীর অবদান আছে। যত মহাকাব্য লেখা হয়েছে, যত আবিষ্কার হয়েছে, যত যুদ্ধে বিজয় এসেছে — সব ক্ষেত্রেই নারী পুরুষের পাশে থেকেছেন।
তবু পুরুষ-শাসিত সমাজ নারীকে কখনো সমান মর্যাদা দেয়নি। কবি এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন — নারী ও পুরুষ একই গাছের দুটি শাখা। একটি ছাড়া অপরটি অসম্পূর্ণ।
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর / অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
⚡ 'নারী' কবিতা বাংলা সাহিত্যে নারী মুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
✦ দারিদ্র্য (কবিতা) [বিখ্যাত কবিতা]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'দারিদ্র্য' কবিতায় নজরুল তাঁর নিজের দরিদ্র জীবনকে মহিমান্বিত করেন। এটি আত্মজীবনীমূলক কবিতা। কবি বলেন — হে দারিদ্র্য, তুমি আমাকে কষ্ট দিয়েছ বটে, কিন্তু তুমিই আমাকে মহান করেছ। তোমার কারণেই আমি মানুষের কথা বুঝতে পেরেছি, তাদের ব্যথা অনুভব করতে পেরেছি।
দারিদ্র্যকে তিনি অভিশাপ মনে করেন না। বরং তুলনা করেন যীশু খ্রিষ্টের সাথে — যিনিও দরিদ্র ছিলেন, তবু মানবজাতির ত্রাণকর্তা হয়েছিলেন। তুলনা করেন মহানবী (স.) এর সাথে, যিনি অতি সাধারণ জীবন যাপন করতেন।
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান, / তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।”
✦ কাণ্ডারী হুঁশিয়ার (১৯২৬) [বিখ্যাত দেশপ্রেমের কবিতা]
◆ কবিতার সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'কাণ্ডারী হুঁশিয়ার' কবিতায় নজরুল জাতির নেতাদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেন। কাণ্ডারী মানে জাহাজের চালক বা পথপ্রদর্শক। এখানে কাণ্ডারী হলো জাতির নেতা।
কবি বলছেন — হে কাণ্ডারী, সামনে ঘন অন্ধকার। জোয়ারের ঢেউ তোমার নাবিকদের ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। ঘুমাবার সময় নেই। যদি তুমি অসাবধান হও, জাহাজ ডুবে যাবে — অর্থাৎ জাতি ধ্বংস হবে। তাই হুঁশিয়ার থাকো, সতর্ক থাকো।
এটি শুধু সেই সময়ের কথা নয়। আজও যে কোনো জাতির নেতৃত্বের জন্য এই সতর্কবার্তা প্রাসঙ্গিক।
“কাণ্ডারী হুঁশিয়ার! দেখ সামনে আঁধার ঘন।”
✦ রবিহারা (১৯৪১) [রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে রচিত]
◆ কবিতার পটভূমি ও ভাবার্থ
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট মারা যান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নজরুল তাঁকে 'গুরুদেব' বলে ডাকতেন। গুরুর মৃত্যুতে নজরুল লেখেন 'রবিহারা' কবিতা। এই কবিতায় তাঁর গভীর শোক ও বেদনার প্রকাশ ঘটে।
কবি বলেন — রবি (সূর্য) হারিয়ে গেছেন, তাই সন্ধ্যা এসেছে আঁধার নিয়ে। কিন্তু সেই রবির আলো কখনো মেলায় না — তাঁর রচনা, তাঁর সুর চিরকাল থাকবে। নজরুল রবীন্দ্রনাথকে শুধু কবি হিসেবে নয়, তাঁর সাহিত্যের আলোকবর্তিকা হিসেবে দেখতেন।
“রবি হারা এই সন্ধ্যা আকাশে / নামিল আঁধার শোকের বরষে।”
⚡ 'রবিহারা' — রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে নজরুলের শোকগাথা (১৯৪১)।
উপন্যাস
বাঁধনহারা (১৯২৭) — প্রথম উপন্যাস
◆ পটভূমি ও ধরন
'বাঁধনহারা' নজরুলের প্রথম উপন্যাস। এটি রচিত হয়েছে 'পত্রোপন্যাস' বা Epistolary Novel আকারে — অর্থাৎ পুরো উপন্যাসটি চিঠির মাধ্যমে বলা হয়েছে। নজরুলের নিজের সেনাজীবনের অভিজ্ঞতা এই উপন্যাসের ভিত্তি।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
মোহাম্মদ সুবহান একজন বাঙালি মুসলিম তরুণ। দেশকে ভালোবাসেন, কিন্তু পরিবারের টানা দারিদ্র্যের কারণে জীবিকার সন্ধানে বাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরেই শুরু হয় তার বন্দিত্বের জীবন — শারীরিক নয়, মানসিক বন্দিত্ব।
দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে বসে সুবহান চিঠি লেখেন তার বন্ধু, পরিবার ও প্রেমিকার কাছে। সেই চিঠিগুলোতে উঠে আসে তার মনের কথা — প্রবাসী সৈনিকের যন্ত্রণা, দেশের জন্য বুকভরা আকুলতা, প্রেমের বিরহ। যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও সুবহানের মনে ঘুরপাক খায় দেশের মাটির গন্ধ।
উপন্যাসটির নাম 'বাঁধনহারা' — যার মানে বাঁধন থেকে মুক্ত। কিন্তু বিচিত্রভাবে সুবহান আসলে বাঁধনহারা নয় — সে সেনাবাহিনীর বাঁধনে, প্রেমের বাঁধনে, দেশের টানের বাঁধনে আটকে আছে। সে চায় মুক্তি, কিন্তু পারছে না।
উপন্যাসটির আরেকটি দিক হলো তৎকালীন মুসলিম সমাজের ছবি। শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম সম্প্রদায়ের তরুণদের সংকট, তাদের স্বপ্ন ও হতাশা — সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক দলিল।
★ বাঁধনহারা = পত্রোপন্যাস (চিঠির আকারে লেখা) + সেনাজীবনের বেদনা + দেশপ্রেম।
⚡ বাঁধনহারা নজরুলের প্রথম উপন্যাস (১৯২৭) — পত্রোপন্যাস ধরনের।
প্রশ্ন: বাঁধনহারা কোন ধরনের উপন্যাস? ► পত্রোপন্যাস (Epistolary Novel)
প্রশ্ন: বাঁধনহারার মূল চরিত্র? ► মোহাম্মদ সুবহান — বাঙালি মুসলিম সৈনিক
মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩০) — দ্বিতীয় উপন্যাস
◆ পটভূমি
১৯৩০ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসের পটভূমি কলকাতার এক বস্তি এলাকা। হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পাশাপাশি বাস করে। দারিদ্র্য তাদের সাধারণ শত্রু, কিন্তু ধর্মের পার্থক্য কখনো কখনো তাদের আলাদা করে দেয়।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
আনার — একটি হিন্দু মেয়ে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে সে বড় হয়েছে একটি মুসলিম পরিবারে। তার ধর্মীয় পরিচয় হিন্দু, কিন্তু সংস্কৃতি মুসলিম। এই দ্বিধার মাঝে আনারের পুরো জীবন।
আছিয়া — আনারের মুসলিম বান্ধবী। দুজনে একসাথে বড় হয়েছে, একসাথে খেলেছে, কাঁদেছে। কিন্তু সমাজ বারবার তাদের মনে করিয়ে দেয় — তোমরা দুটি আলাদা ধর্মের মানুষ।
বস্তির জীবন অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিন খাবারের জন্য সংগ্রাম। 'মৃত্যুক্ষুধা' নামটি এখান থেকেই — ক্ষুধা এতটাই তীব্র যে মনে হয় মৃত্যু এসে গেছে। এই ক্ষুধা শুধু পেটের নয়, আত্মসম্মানের ক্ষুধা, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির ক্ষুধা।
উপন্যাসে নজরুল দেখিয়েছেন — ধর্মের পার্থক্য থাকলেও দারিদ্র্য সমান। ক্ষুধা হিন্দু-মুসলিম চেনে না। কষ্ট সবার একই। তাই সাম্প্রদায়িক বিভেদ আসলে কৃত্রিম — উপরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া।
মেজ বউ চরিত্রটি এই উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সে একজন বাস্তববাদী নারী যে জীবনের কঠোর সত্যকে মেনে নিয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেও মানবতার আলো আছে।
★ মৃত্যুক্ষুধা = দারিদ্র্য + ধর্মীয় পরিচয়ের সংকট + হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বার্তা।
⚡ মৃত্যুক্ষুধার মূল চরিত্র আনার — হিন্দু মেয়ে যে মুসলিম পরিবারে মানুষ হয়েছে।
প্রশ্ন: মৃত্যুক্ষুধার পটভূমি কোথায়? ► কলকাতার বস্তি এলাকায়
প্রশ্ন: মৃত্যুক্ষুধার মূল চরিত্র? ► আনার (হিন্দু মেয়ে) ও আছিয়া (মুসলিম মেয়ে)
কুহেলিকা (১৯৩১) — তৃতীয় উপন্যাস
◆ পটভূমি ও নামের অর্থ
'কুহেলিকা' মানে কুয়াশা বা ধোঁয়াশা। ১৯৩০-৩১ সালের ভারতবর্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন তুঙ্গে। মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবী কার্যক্রম — সব মিলিয়ে একটি ধোঁয়াশার পরিবেশ। সেই পটভূমিতেই এই উপন্যাস।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
জাহাঙ্গীর একজন বিপ্লবী তরুণ। দেশকে ভালোবাসেন, ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামী। কিন্তু তার জীবনে কুহেলিকা বা ধোঁয়াশা আছে — কোন পথে যাবেন? সশস্ত্র বিপ্লব, না শান্তিপূর্ণ আন্দোলন? ব্যক্তিগত জীবনের প্রেম, পরিবার — এসব কীভাবে সামলাবেন?
উপন্যাসে একটি প্রেমের সম্পর্কও আছে। জাহাঙ্গীর একটি মেয়েকে ভালোবাসেন। কিন্তু বিপ্লবী জীবনে প্রেম পোষা সম্ভব কি? দেশের জন্য সব ছেড়ে দিতে হয় — এই দ্বন্দ্বে ছটফট করে জাহাঙ্গীর।
কুহেলিকার আরেকটি বিষয় হলো — বিপ্লবী আন্দোলনের ভেতরকার দ্বন্দ্ব। সবাই দেশ চান, কিন্তু পথ নিয়ে মতভেদ। কেউ চান রক্তপাতের পথ, কেউ চান শান্তির পথ। এই ধোঁয়াশাতেই উপন্যাসের চরিত্ররা হাঁটছেন।
★ কুহেলিকা = কুয়াশা = বিপ্লবী তরুণের জীবনের অনিশ্চয়তা ও পথের দ্বন্দ্ব।
⚡ কুহেলিকা নজরুলের তৃতীয় ও শেষ পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস।
গল্পগ্রন্থ
ব্যথার দান (১৯২২) — প্রথম গল্পগ্রন্থ
নজরুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ। এতে কয়েকটি গল্প আছে। প্রতিটিতে প্রেম, বিরহ ও মানবিক সম্পর্কের কাহিনি।
✦ হেনা (গল্প) (১৯২২) [ব্যথার দান গ্রন্থভুক্ত]
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
হেনা একটি সুন্দর, সরল মুসলিম মেয়ে। সে ভালোবাসে পাশের বাড়ির একটি ছেলেকে। কিন্তু সে প্রেম পরিবারের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় — পরিবার ভিন্ন সম্প্রদায় বা ভিন্ন আর্থিক অবস্থার।
হেনা বুঝতে পারে তার ভালোবাসা কোনোদিন পূর্ণতা পাবে না। সামাজিক বাধা অতিক্রম করার ক্ষমতা তার নেই। ধীরে ধীরে সে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। বাইরে হাসি, ভেতরে কান্না।
গল্পের শেষে হেনার ভাগ্যে যা ঘটে তা হলো সমাজের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া — পরিবার নির্বাচিত পাত্রের সাথে বিয়ে। কিন্তু সেই রাতে হেনার চোখের কোণে যে জল, তা কেউ দেখে না।
★ হেনা গল্পের মূলভাব: সামাজিক বাধায় প্রেম বিফল হওয়ার যন্ত্রণা।
✦ ব্যথার দান (গল্প) (১৯২২) [গ্রন্থের নামগল্প]
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
এই গল্পে কবি একটি দার্শনিক প্রশ্ন তোলেন — জীবনে কোন জিনিসটি সবচেয়ে বড় উপহার? সুখ? সম্পদ? না। ব্যথা — কষ্ট।
গল্পের কেন্দ্রে আছেন দুটি মানুষ। একজন দিচ্ছেন, অন্যজন নিচ্ছেন। যিনি দিচ্ছেন তিনি ভাবছেন — আমি তাকে কী দেব? যিনি নিচ্ছেন তিনি জানেন না কী পাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় — যা দেওয়া হয়েছে তা ব্যথা, কষ্টের অনুভূতি।
নজরুল এখানে বলতে চান — যে মানুষ কষ্ট পেয়েছে, ব্যথা পেয়েছে, সে-ই সত্যিকারের বড়। কারণ ব্যথা মানুষকে সংবেদনশীল করে, অনুভূতি দেয়, মানবিক করে। সুখে থাকা মানুষ অন্যের কষ্ট বোঝে না — কিন্তু যে কষ্ট পেয়েছে, সে বোঝে।
★ ব্যথার দান গল্পের মূলভাব: কষ্ট ও বেদনাই মানুষকে মহৎ ও সংবেদনশীল করে।
✦ রিক্তের বেদন (গল্পগ্রন্থ) (১৯২৫) [দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ]
◆ গ্রন্থ পরিচয় ও কাহিনি
'রিক্তের বেদন' মানে শূন্য হয়ে যাওয়ার বেদনা। এই গল্পগ্রন্থে নজরুল এঁকেছেন তাদের জীবন যারা সব হারিয়ে রিক্তহস্ত। প্রেম হারানো মানুষ, সম্পদ হারানো মানুষ, স্বপ্ন হারানো মানুষ।
প্রতিটি গল্পে একটি সাধারণ সূত্র — কেউ কিছু পেয়েছিল, তারপর হারিয়েছে। হারানোর পরে কী? সেই শূন্যতার মাঝে বেঁচে থাকার চেষ্টা। নজরুল দেখিয়েছেন — শূন্যতাও একটি অনুভূতি, রিক্ততাও একটি অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা মানুষকে ভেঙে দেয়, কিন্তু আবার গড়েও দেয়।
✦ শিউলিমালা (গল্পগ্রন্থ) (১৯৩১) [তৃতীয় গল্পগ্রন্থ]
◆ গ্রন্থ পরিচয় ও কাহিনি
শিউলি ফুল শরৎকালে ফোটে এবং সকালে ঝরে পড়ে। তার জীবনকাল অতি সংক্ষিপ্ত, কিন্তু সুগন্ধ অতুলনীয়। নজরুল এই প্রতীকে তুলে ধরেছেন সেই সব মানুষের কথা যাদের জীবন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু প্রভাব অসীম।
এই গল্পগ্রন্থের বিশেষত্ব হলো নারী চরিত্রের প্রাধান্য। প্রতিটি গল্পে একজন নারী আছেন যিনি সমাজের অবিচারের শিকার। শিউলির মতো সুন্দর এই নারীরা ঝরে পড়েন অকালে — কেউ স্বামীর নির্যাতনে, কেউ সমাজের চাপে, কেউ দারিদ্র্যে।
নাটক ও গীতিনাট্য
আলেয়া (১৯৩১) — গীতিনাট্য
◆ নামের অর্থ ও পটভূমি
'আলেয়া' বলতে বোঝায় ভুতুড়ে আলো — মাঠে বা জলাভূমিতে রাতে যে রহস্যময় আলো দেখা যায়। মানুষ ভাবে সেটা কোনো আলো, অনুসরণ করে এবং পথ হারিয়ে ফেলে। এই আলেয়াই হলো এই গীতিনাট্যের প্রতীক।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
একজন যুবক — সুনীল। সে স্বপ্নময় আদর্শবাদী। জীবনে সে খুঁজে বেড়ায় 'সত্যিকারের সুখ', 'পরিপূর্ণ প্রেম', 'নিখুঁত সৌন্দর্য'। কিন্তু যা পায় তাই তার কাছে সত্যিকারের মনে হয় না।
একদিন সুনীল দেখতে পায় দূরে একটি আলো জ্বলছে। সে ভাবে — ওই আলোই সত্য। ওই দিকে গেলেই পাবো আমার কাঙ্ক্ষিত সুখ। সে ছোটে। আলোটা সরে যায়। আবার ছোটে। আবার সরে যায়। এভাবে সে জলাভূমিতে আটকে যায়।
আলেয়ার অনুসরণ করতে করতে সুনীল হারিয়ে ফেলে তার আসল জীবন, আসল মানুষ, আসল সুখ। যা সামনে ছিল, যা হাতের কাছে ছিল — সেই সত্যিকারের ভালোবাসা, সেই পরিবার — সব হারিয়ে যায়।
নজরুল এই গীতিনাট্যে বলতে চেয়েছেন — দূরের অলীক আলো (অর্থাৎ ভুল স্বপ্ন, মিথ্যা মোহ) পিছনে ছুটলে জীবন নষ্ট হয়। সামনে যা আছে, যা সত্যিকারের, তাকে চিনতে শেখাই জ্ঞান।
★ আলেয়া = ভুল পথে চলার বিপদ + মিথ্যা মোহের পরিণতি।
⚡ আলেয়া একটি গীতিনাট্য — নাটক ও গানের সমন্বয়ে রচিত (১৯৩১)।
মধুমালা (১৯৬০) — গীতিনাট্য
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
'মধুমালা' একটি রূপকথাধর্মী গীতিনাট্য। এতে আছে রাজকন্যা মধুমালার গল্প। মধুমালা এক দূরের রাজ্যের রাজকন্যা — সুন্দরী, প্রতিভাবান, স্বাধীনচেতা।
একজন রাজকুমার মধুমালার প্রেমে পড়েন। কিন্তু তাদের মিলন সহজ নয়। রাজনৈতিক বাধা, পারিবারিক বিরোধ, ভিন্ন রাজ্যের শত্রুতা — সব মিলিয়ে পথ কঠিন। রাজকুমারকে নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রেমের জয় হয়। মধুমালা ও রাজকুমারের মিলন হয়। কিন্তু এই গীতিনাট্যে প্রেমের গল্পটি শুধু প্রেমের গল্প নয় — এটি মানুষের সংগ্রাম, স্বপ্ন ও লক্ষ্য অর্জনের গল্পও বটে।
★ মধুমালা = রূপকথার গল্পে মোড়া মানবিক প্রেম ও সংগ্রামের কাহিনি।
পুতুলের বিয়ে (১৯৩৩) — শিশু নাটক
শিশুদের জন্য রচিত হাস্যরসাত্মক নাটক। একটি পাড়ায় ছেলেমেয়েরা মিলে পুতুলের বিয়ে দেওয়ার খেলা খেলছে। বর পুতুল এক বাড়ির, কনে পুতুল আরেক বাড়ির। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের আলোচনা হয়, যৌতুকের দাবি ওঠে, বরযাত্রী আসে — সব কিছু একেবারে বড়দের বিয়ের মতো।
কিন্তু এই খেলার মধ্যে দিয়ে নজরুল দেখাচ্ছেন বড়দের সমাজের অসংগতি — যৌতুকপ্রথা, লোক দেখানো অনুষ্ঠান, হুজুগ। শিশুরা অনুকরণ করছে বড়দের, এবং সেই অনুকরণের মধ্য দিয়ে বড়দের ভুলগুলো যেন আয়নায় দেখা যাচ্ছে।
নজরুলসংগীত
✦ কারার ওই লৌহকপাট (১৯২১) [বিখ্যাত বিদ্রোহী গান]
◆ গানের ইতিহাস ও সম্পূর্ণ ভাবার্থ
এই গানটি লেখা হয়েছিল বিপ্লবীদের মনোবল বৃদ্ধির জন্য। ব্রিটিশ কারাগারে বন্দি স্বাধীনতাকামীরা এই গান গাইতেন। লোহার কারাগারের দরজাকে ভেঙে ফেলার আহ্বান আসলে রূপকঅর্থে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান।
গানে কবি বলছেন — এই কারাগারের লোহার দরজা কতটুকু শক্তিশালী? মানুষের ইচ্ছাশক্তির সামনে সব লোহা গলে যায়। এসো, একসাথে ভেঙে দিই এই কপাট। রক্তে জমাট হয়ে যাওয়া শিকল — যে শিকল আমাদের পূর্বজন্মের পাপের মতো আটকে রেখেছে — তাও ভেঙে দাও।
গানের প্রতিটি লাইনে আছে অদম্য মনোবল। কারাগার, শিকল, লোহার দরজা — এসব ব্যর্থ হবে মানুষের জাগরণের সামনে।
“কারার ওই লৌহকপাট / ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট / রক্তজমাট শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!”
⚡ 'কারার ওই লৌহকপাট' — 'ভাঙার গান' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত।
✦ চল্ চল্ চল্ (১৯২৮) [বাংলাদেশের রণসংগীত]
◆ গানের ইতিহাস ও সম্পূর্ণ ভাবার্থ
'চল্ চল্ চল্' গানটি রচিত হয়েছিল অদম্য যাত্রার অনুপ্রেরণা হিসেবে। থামলে হবে না, পিছিয়ে যাওয়া যাবে না — সামনে এগিয়ে যেতেই হবে।
গানের প্রথম লাইনেই আছে চলার আহ্বান — 'চল্ চল্ চল্'। তিনবার একই শব্দ — যেন পা ফেলার তাল, যেন সৈনিকের পদযাত্রার শব্দ। উপরে আকাশে মাদল বাজছে — অর্থাৎ মহাকাল নিজেই আহ্বান করছে এগিয়ে যেতে। নিচে পৃথিবী উতলা হয়ে আছে।
গানে আছে আলো ও আঁধারের দ্বন্দ্ব — পুরনো পচা ব্যবস্থার আঁধার কাটিয়ে নতুন আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া। এটি শুধু সামরিক গান নয় — এটি জীবনের যেকোনো সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার গান।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই গান মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর এটি বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
“চল্ চল্ চল্! ঊর্ধ্বগগনে বাজে মাদল, / নিম্নে উতলা ধরণি-তল।”
⚡ চল্ চল্ চল্ = বাংলাদেশের রণসংগীত। আমার সোনার বাংলা = জাতীয় সংগীত (রবীন্দ্রনাথের)।
✦ ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে [ঈদের বিখ্যাত গান]
◆ গানের ভাবার্থ ও সামাজিক প্রভাব
এই গানটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে ঈদের সময় সবচেয়ে বেশি গাওয়া হয়। গানটির মূল বার্তা হলো — রমজান মাসে দীর্ঘ এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের যে আনন্দ আসে, তা শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ নয় — সেটা ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ।
গানে কবি বলছেন — হে মন, তুমি কি জানো এই ঈদের তাৎপর্য? এই দিনে নিজেকে বিলিয়ে দাও। যে ক্ষুধার্ত তাকে খাওয়াও, যে বঞ্চিত তাকে দাও। আল্লাহর হুকুম মেনে সবার সাথে মিলে আনন্দ করো।
“ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ, / তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানি তাগিদ।”
⚡ এই গানটি নজরুলের রচনা — বাংলাদেশে ঈদের দিনে সবার আগে বাজে।
✦ মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান [সম্প্রীতির গান]
◆ গানের ভাবার্থ
এই গানটি নজরুলের হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির দর্শনের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। তিনি বলছেন — হিন্দু আর মুসলমান একই গাছের দুটি ফুল। একটি ফুল ছিঁড়ে নিলে গাছটা অসম্পূর্ণ। দুটো ফুল একসাথে থাকলেই গাছটা সুন্দর।
এই গানে নজরুল যে রূপক ব্যবহার করেছেন — 'একই বৃন্তে দুটি কুসুম' — তা অতি সুন্দর। বৃন্ত মানে ডাঁটা, গাছের ডাঁটা। একই ডাঁটায় দুটি ফুল ফোটে — তারা আলাদা, কিন্তু এক শিকড়ের। হিন্দু ও মুসলমান তেমনই — ধর্ম আলাদা, কিন্তু মানবতার শিকড় এক।
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান, / মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তার প্রাণ।”
⚡ এই গানটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক — নজরুলের মানবতাবাদের সেরা প্রকাশ।
✦ গজল — বাংলায় নতুন ধারা [গজলের বিস্তারিত]
◆ গজল কী ও নজরুলের অবদান
গজল হলো আরবি-ফারসি সাহিত্যের এক বিশেষ কাব্যরীতি। প্রতিটি শের বা দ্বিপদী স্বতন্ত্র অর্থপূর্ণ। শেষ শেরে কবির নাম বা ছদ্মনাম থাকে — যাকে বলে 'মকতা'। বিষয়বস্তু সাধারণত প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা।
নজরুলের আগে বাংলায় গজল ছিল না। তিনিই প্রথম আরবি-ফারসি গজলকে বাংলায় রূপান্তরিত করেন। করাচি সেনানিবাসে থাকার সময় ফারসি শেখার কারণেই তিনি এই ঘরানার সাথে পরিচিত হন।
তাঁর গজলে যেমন আছে প্রেমের বেদনা, তেমনই আছে আল্লাহর প্রতি ভক্তি, নবীর প্রতি ভালোবাসা। বাংলা গজলে নজরুলই পথিকৃৎ।
“বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে, কাঁদে কেন সে গভীর রজনে।”
⚡ নজরুল বাংলা সাহিত্যে গজলের প্রবর্তক — করাচিতে ফারসি শিক্ষাই কারণ।
✦ শ্যামাসংগীত — মুসলিম কবির হিন্দু ভক্তিগীত [অসাধারণ ধর্মীয় সহনশীলতা]
◆ শ্যামাসংগীত কী ও নজরুলের অবদান
নজরুল একজন মুসলিম। কিন্তু তিনি হিন্দু দেবী কালী বা শ্যামা মায়ের উপর ৯০০-এর বেশি ভক্তিগীত রচনা করেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে অভূতপূর্ব।
নজরুলের কাছে মানবতার ধর্মই প্রধান। তিনি বিশ্বাস করতেন — আল্লাহ, ঈশ্বর, ভগবান — সবই এক সত্তার ভিন্ন নাম। ভক্তির পথ আলাদা হলেও গন্তব্য এক।
তাঁর শ্যামাসংগীতে মা কালীকে তিনি দেখেছেন মাতৃরূপে — সন্তানের ব্যর্থতা ও কষ্টে যিনি পাশে থাকেন। এই মাতৃভাব হিন্দু ধর্মের অতল থেকে তুলে এনেছেন নজরুল।
★ নজরুলের শ্যামাসংগীত হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
⚡ নজরুল মুসলিম হয়েও ৯০০-এর বেশি শ্যামাসংগীত রচনা করেন।
প্রবন্ধ ও পত্রিকা সম্পাদনা
✦ রাজবন্দীর জবানবন্দী (১৯২৩) [ঐতিহাসিক বিবৃতি]
◆ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
১৯২২ সালে 'আনন্দময়ীর আগমনে' কবিতা প্রকাশিত হওয়ার পর ব্রিটিশ সরকার নজরুলকে গ্রেফতার করে। ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হয়।
আদালতে নজরুল নিজে নিজের পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। এটিই 'রাজবন্দীর জবানবন্দী'। এই বিবৃতিতে নজরুল বলেন — আমি কবি। কবির কাজ সত্য বলা। আমি সত্য বলেছি। যে রাজা প্রজার শত্রু, তার বিরুদ্ধে কথা বলাই ধর্ম।
নজরুল আরও বলেন — আমার লেখা রাজদ্রোহী নয়, মানবমুক্তির গান। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ যদি আমার কলমকে ভয় পায়, তাহলে বুঝতে হবে আমার কলমে শক্তি আছে। আমাকে জেলে দিলেও আমার কবিতা জেলে যাবে না।
এই বিবৃতিতে নজরুলের অসাধারণ সাহস ও বাগ্মিতার পরিচয় পাওয়া যায়। আদালতকে ভয় না পেয়ে সরাসরি বলেছেন তাঁর কথা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি অনন্য দলিল।
“আমি কবি, তাই আমি বলেছি আমার কথা। আমার কলম নিষেধ মানে না।”
“যে রাজা প্রজার শত্রু, তার বিরুদ্ধে কথা বলাই ধর্ম।”
⚡ রাজবন্দীর জবানবন্দী — আদালতে দেওয়া বিবৃতি, বাংলা গদ্যের ঐতিহাসিক দলিল।
✦ ধূমকেতু পত্রিকা (১৯২২) [নজরুলের নিজের পত্রিকা]
১৯২২ সালের ১২ আগস্ট নজরুল নিজে প্রতিষ্ঠা করেন 'ধূমকেতু' পত্রিকা। সাপ্তাহিক এই পত্রিকায় প্রকাশিত হতো সাহিত্য, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক লেখা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই পত্রিকার জন্য বিশেষ আশীর্বাণী পাঠিয়েছিলেন কবিতায় লিখে — 'আয় চলে আয় রে ধূমকেতু।' এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা — বাংলা সাহিত্যের দুই মহারথীর মিলনবিন্দু।
'ধূমকেতু' পত্রিকায় প্রথমবারের মতো পরিষ্কারভাবে ভারতের 'পূর্ণ স্বাধীনতার' দাবি তোলা হয়। এর আগে নেতারা স্বায়ত্তশাসনের কথা বলতেন, কিন্তু নজরুল বললেন — সম্পূর্ণ স্বাধীনতা চাই।
“আয় চলে আয় রে ধূমকেতু / আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু। — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”
⚡ ধূমকেতু পত্রিকায় প্রথমবার পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি তোলা হয়।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: নজরুলের জন্মসাল?
► ১৮৯৯ সাল (২৫ মে)
প্রশ্ন: নজরুলের জন্মস্থান?
► চুরুলিয়া, বর্ধমান, পশ্চিমবঙ্গ
প্রশ্ন: নজরুলের ডাকনাম?
► দুখু মিয়া
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম কাব্যগ্রন্থ?
► অগ্নি-বীণা (১৯২২)
প্রশ্ন: অগ্নি-বীণার প্রথম কবিতা?
► প্রলয়োল্লাস
প্রশ্ন: অগ্নি-বীণা কাকে উৎসর্গ করা হয়?
► বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে
প্রশ্ন: বিদ্রোহী কবিতায় কত পঙক্তি?
► ১৩৩টি
প্রশ্ন: বিদ্রোহী প্রথম কোন পত্রিকায়?
► বিজলী পত্রিকায় (৬ জানুয়ারি ১৯২২)
প্রশ্ন: বিদ্রোহী মোট কতটি পত্রিকায় প্রকাশ?
► ৪টি পত্রিকায়
প্রশ্ন: কোন কবিতায় নজরুল গ্রেফতার হন?
► আনন্দময়ীর আগমনে (১৯২২)
প্রশ্ন: নজরুল কারাগারে কতদিন অনশন করেন?
► ৪০ দিন
প্রশ্ন: কে অনশন ভাঙতে চিঠি লেখেন?
► রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম উপন্যাস?
► বাঁধনহারা (১৯২৭)
প্রশ্ন: বাঁধনহারা কোন ধরনের উপন্যাস?
► পত্রোপন্যাস (চিঠির আকারে)
প্রশ্ন: মৃত্যুক্ষুধার মূল চরিত্র?
► আনার (হিন্দু মেয়ে)
প্রশ্ন: কুহেলিকার অর্থ?
► কুয়াশা বা ধোঁয়াশা
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ?
► ব্যথার দান (১৯২২)
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম নাটক?
► ঝিলিমিলি (১৯৩০)
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম সংগীতগ্রন্থ?
► বুলবুল (১৯২৮)
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা?
► বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (১৯১৯)
প্রশ্ন: বাংলাদেশের রণসংগীত?
► চল্ চল্ চল্ (নজরুল রচিত)
প্রশ্ন: বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত?
► আমার সোনার বাংলা (রবীন্দ্রনাথ রচিত)
প্রশ্ন: বাংলায় গজলের প্রবর্তক?
► কাজী নজরুল ইসলাম
প্রশ্ন: নজরুল মোট কতটি গান রচনা করেন?
► ৩০০০-এর বেশি
প্রশ্ন: নজরুল মোট কতটি শ্যামাসংগীত লেখেন?
► ৯০০-এর বেশি
প্রশ্ন: নজরুলের মস্তিষ্কের রোগের নাম?
► পিক'স ডিজিজ (Pick's Disease)
প্রশ্ন: নজরুল কত বছর বাকহীন ছিলেন?
► ৩৪ বছর (১৯৪২-১৯৭৬)
প্রশ্ন: নজরুলের কবর কোথায়?
► ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণ
প্রশ্ন: নজরুল বাংলাদেশে আসেন কত সালে?
► ১৯৭২ সালে
প্রশ্ন: কোন নাটক নজরুলকে উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথ?
► বসন্ত নাটক
প্রশ্ন: নজরুলের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ?
► যুগবাণী (১৯২২) — বাজেয়াপ্ত
প্রশ্ন: কতটি গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়?
► ৫টি
প্রশ্ন: বাজেয়াপ্ত ৫ গ্রন্থের নাম?
► বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, যুগবাণী, জিঞ্জির, প্রলয়শিখা
প্রশ্ন: নজরুল কোন সেনাবাহিনীতে ছিলেন?
► ৪৯ নং বাঙালি পল্টন
প্রশ্ন: ধূমকেতু পত্রিকায় কার আশীর্বাদ ছিল?
► রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের
প্রশ্ন: নজরুলের জগত্তারিণী স্বর্ণপদক কে দেয়?
► কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৪৫)
প্রশ্ন: পদ্মভূষণ কে দেয়?
► ভারত সরকার (১৯৬০)
প্রশ্ন: একুশে পদক কে দেয়?
► বাংলাদেশ সরকার (১৯৭৬) — মরণোত্তর
প্রশ্ন: সাম্যবাদী কবিতার বিখ্যাত লাইন?
► মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান
প্রশ্ন: নারী কবিতার বিখ্যাত লাইন?
► বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর...
⚡ ট্রিকি তথ্য সংকলন
⚡ নজরুল ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
⚡ 'চল্ চল্ চল্' বাংলাদেশের রণসংগীত — 'আমার সোনার বাংলা' জাতীয় সংগীত (রবীন্দ্রনাথের)।
⚡ বিদ্রোহী কবিতা একই সাথে ৪টি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
⚡ নজরুলের প্রথম বিয়ে বিয়ের রাতেই ভেঙে যায় — নার্গিসের পরিবার চাকরি ছাড়তে বলে।
⚡ নজরুল মাত্র ২৩ বছর বয়সে 'বিদ্রোহী' কবিতা লেখেন।
⚡ অগ্নি-বীণা উৎসর্গ করা হয় বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে — কোনো নারী চরিত্রকে নয়।
⚡ বাঁধনহারা পত্রোপন্যাস — চিঠির আকারে লেখা নজরুলের প্রথম উপন্যাস।
⚡ রবীন্দ্রনাথ 'বসন্ত' নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন।
⚡ নজরুল মুসলিম হয়েও ৯০০-এর বেশি শ্যামাসংগীত রচনা করেছেন।
⚡ নজরুলের কবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে — তাঁর নিজের ইচ্ছানুযায়ী।
⚡ লেটো দল হলো বাংলার গীতিনাট্যের দল — নজরুল এতে গান লিখতেন ও অভিনয় করতেন।
⚡ 'বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী' নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা — সওগাত পত্রিকায় (১৯১৯)।
⚡ ধূমকেতু পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদ — 'আয় চলে আয় রে ধূমকেতু'।
⚡ রাজবন্দীর জবানবন্দী — কারাগার থেকে আদালতে দেওয়া বিবৃতি — বাংলার ঐতিহাসিক দলিল।
⚡ নজরুলের বাজেয়াপ্ত ৫ গ্রন্থ: বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, যুগবাণী, জিঞ্জির, প্রলয়শিখা।
⚡ 'মরু-ভাস্কর' কাব্যগ্রন্থ — হযরত মুহাম্মদ (স.) কে নিয়ে রচিত।
⚡ নজরুল বাংলায় গজলের প্রবর্তক — করাচিতে ফারসি শেখার ফলে।
⚡ মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসে আনার হিন্দু মেয়ে কিন্তু মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠেছে।
⚡ কুহেলিকা মানে কুয়াশা — বিপ্লবী জীবনের অনিশ্চয়তার প্রতীক।
⚡ নজরুল ১৯৪২ থেকে ১৯৭৬ পর্যন্ত ৩৪ বছর বাকশক্তিহীন — পিক'স ডিজিজে।
চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ
বিষয় | উত্তর |
জন্ম | ২৫ মে ১৮৯৯, চুরুলিয়া, বর্ধমান |
মৃত্যু | ২৯ আগস্ট ১৯৭৬, পিজি হাসপাতাল, ঢাকা |
উপাধি | বিদ্রোহী কবি, জাতীয় কবি (বাংলাদেশ) |
প্রথম কাব্য | অগ্নি-বীণা (১৯২২) — বারীন ঘোষকে উৎসর্গ |
প্রথম গল্পগ্রন্থ | ব্যথার দান (১৯২২) |
প্রথম উপন্যাস | বাঁধনহারা (১৯২৭) — পত্রোপন্যাস |
প্রথম নাটক | ঝিলিমিলি (১৯৩০) |
প্রথম সংগীতগ্রন্থ | বুলবুল (১৯২৮) |
প্রথম গদ্য | বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (১৯১৯) |
প্রথম প্রবন্ধ | যুগবাণী (১৯২২) — বাজেয়াপ্ত |
মোট গান | ৩,০০০-এর বেশি |
শ্যামাসংগীত | ৯০০-এর বেশি |
বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ | ৫টি |
রণসংগীত | চল্ চল্ চল্ |
কারাদণ্ড | ১৯২৩ — আনন্দময়ীর আগমনে কবিতায় |
অনশন | ৪০ দিন — রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখে ভাঙান |
বাকহীন | ১৯৪২ — পিক'স ডিজিজ — ৩৪ বছর |
কবর | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণ |
পুরস্কার | জগত্তারিণী, পদ্মভূষণ, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক |
ডি.লিট | ঢাকা বি.বি (১৯৭৪), রবীন্দ্রভারতী (১৯৬৯) |
গজলের প্রবর্তক | কাজী নজরুল ইসলাম |