চর্যাপদ
বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন
রচনাকাল: আনুমানিক ৮ম–১২শ শতাব্দী খ্রিষ্টাব্দ
চর্যাপদের পরিচয় |
১.১ চর্যাপদ কী?
চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন। এটি বৌদ্ধ সহজিয়া সম্প্রদায়ের সিদ্ধাচার্যদের রচিত একটি পদ সংকলন। 'চর্যা' শব্দের অর্থ আচরণ বা সাধনা এবং 'পদ' অর্থ গান বা কবিতা। সুতরাং চর্যাপদ হলো সাধনার গান — যেখানে বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় তত্ত্ব সাংকেতিক ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে।
১.২ আবিষ্কারের ইতিহাস
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালা থেকে চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন। ১৯১৬ সালে 'হাজার বছরের পুরাণ বাংলা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা' নামে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক এটি প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে 'দোহাকোষ' ও 'ডাকার্ণব' পাণ্ডুলিপিও পাওয়া গিয়েছিল।
রচনাকাল | আনুমানিক ৬৫০ – ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ |
আবিষ্কারক | মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৯০৭) |
আবিষ্কারের স্থান | নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালা |
প্রথম প্রকাশ | ১৯১৬ সালে, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ |
মোট পদ সংখ্যা | ৫১টি (৪৬টি পূর্ণ, কয়েকটি অখণ্ড বা অনুপস্থিত) |
রচয়িতার সংখ্যা | আনুমানিক ২৩-২৪ জন সিদ্ধাচার্য |
ভাষা | প্রাচীন বাংলা (সন্ধ্যাভাষা বা আলো-আঁধারি ভাষা) |
ধর্ম-সম্প্রদায় | বজ্রযান ও সহজিয়া বৌদ্ধ মত |
টীকাকার | মুনিদত্ত (সংস্কৃতে টীকা রচনা করেন) |
ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ | ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় প্রমাণ করেন এটি প্রাচীন বাংলা |
১.৩ ভাষাগত গুরুত্ব
চর্যাপদের ভাষাকে পণ্ডিতেরা 'সন্ধ্যাভাষা' বা 'আলো-আঁধারি ভাষা' বলেন। এই ভাষার দুটি অর্থ — একটি আক্ষরিক এবং অপরটি রূপক বা সাংকেতিক। বাহ্যিক অর্থে এগুলো সাধারণ জীবনের কথা, কিন্তু আসলে এগুলো গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক তত্ত্বের সাংকেতিক প্রকাশ। ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রমাণ করেন যে চর্যাপদের ভাষাই আধুনিক বাংলার আদিরূপ।
সিদ্ধাচার্যগণ |
চর্যাপদের প্রধান রচয়িতাগণ
চর্যাপদ রচনা করেছেন আনুমানিক ২৩-২৪ জন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য। তাঁরা সকলেই বজ্রযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সাধক এবং তাঁদের অধিকাংশ বাংলা ও বিহারের অধিবাসী ছিলেন।
সিদ্ধাচার্যের নাম | রচিত পদ | আনুমানিক কাল | বিশেষ তথ্য |
লুইপাদ | পদ ১, ২৯ | ৯ম-১০ম শতক | আদিসিদ্ধ; প্রথম পদ রচয়িতা |
কুক্কুরিপাদ | পদ ২, ২০, ৪৮ | ৯ম শতক | উত্তরভারতীয় |
বিরুআপাদ | পদ ৩ | ৯ম শতক | তান্ত্রিক সাধনার প্রবক্তা |
গুণ্ডরিপাদ | পদ ৪ | ৯ম শতক | অজ্ঞাত পরিচয় |
চাটিলপাদ | পদ ৫ | ৯ম শতক | বজ্রযান সাধক |
ভুসুকুপাদ | পদ ৬, ২১, ২৩, ২৭, ৩০, ৪১, ৪৩, ৪৯, ৫০ | ৯ম-১০ম শতক | সর্বাধিক ৯টি পদের রচয়িতা |
কাহ্নপাদ | পদ ৭, ৯-১৩, ১৮, ১৯, ২৪, ৩৬, ৪০, ৪২, ৪৫ | ৯ম-১০ম শতক | দ্বিতীয় সর্বাধিক পদ রচয়িতা |
কঙ্কণপাদ | পদ ৮ | ৯ম শতক | অজ্ঞাত পরিচয় |
ডোম্বিপাদ | পদ ১৪ | ৯ম-১০ম শতক | বিহার অঞ্চলের সাধক |
শান্তিপাদ | পদ ১৫, ২৬ | ৯ম-১০ম শতক | বাংলার সাধক |
মহিধরপাদ | পদ ১৬ | ৯ম শতক | অজ্ঞাত পরিচয় |
তন্ত্রীপাদ | পদ ২৫ | ৯ম শতক | নাদ সাধনার প্রবক্তা |
সরহপাদ | পদ ২২, ৩২, ৩৮, ৩৯ | ৮ম-৯ম শতক | প্রাচীনতম সিদ্ধাচার্য |
ঢেণ্ঢণপাদ | পদ ৩৩ | ৯ম শতক | অজ্ঞাত পরিচয় |
শবরপাদ | পদ ২৮, ৪৬ | ৯ম-১০ম শতক | বাংলা/উড়িষ্যার সাধক |
লুচিকপাদ | পদ ৪৭ | ১০ম শতক | অজ্ঞাত পরিচয় |
চর্যাপদের সমগ্র পদ ও বাংলা অর্থ |
নিচে চর্যাপদের প্রধান পদগুলো মূল পাঠ, শব্দার্থ ও ভাবার্থসহ উপস্থাপন করা হলো। প্রতিটি পদের মূল চর্যাভাষা (সন্ধ্যাভাষা), বাংলা শব্দার্থ এবং বিস্তারিত ভাবার্থ দেওয়া হয়েছে।
পদ ১ | রচয়িতা: লুইপাদ |
কায়া তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চিয়া পইঠো কাল।। দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ। লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: শরীর হলো বৃক্ষ, পাঁচটি ইন্দ্রিয় তার শাখা। চঞ্চল চিত্তে কালের প্রবেশ ঘটেছে। মহাসুখের পরিমাণ দৃঢ়ভাবে নির্ধারণ করো। লুইপাদ বলেন, গুরুকে জিজ্ঞেস করে জানো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: মানবদেহকে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। পাঁচটি ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক) হলো পাঁচটি শাখা। চঞ্চল মনে মৃত্যু প্রবেশ করেছে। গুরুর নির্দেশে মহাসুখ বা নির্বাণের পথ দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করাই সাধনার মূলকথা। এটি চর্যাপদ সংকলনের সূচনাপদ এবং লুইপাদকে আদিসিদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয়। |
পদ ২ | রচয়িতা: কুক্কুরিপাদ |
দুলি দুহি পিটা ধরণ না জাই। রোহণ চাপি চাপি ভব নাই পাড়ই।। এ ধন্বা মুই হেরি হারালুম। কাহি বলব গেলা সো বাটালুম।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: দোল দিয়ে দুধ দোহন করে মাখন তোলা যায় না। ভবের বোঝা চেপে ধরে, নামানো যায় না। এই সম্পদ আমি দেখে হারিয়েছি। কাকে বলব, সেই পথ চলে গেছে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: কুক্কুরিপাদের পদে সাধনার কঠিনতা বর্ণিত। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান দিয়ে মুক্তি মেলে না — যেমন দোল দিয়ে মাখন ওঠে না। ভব বা সংসারের মায়া থেকে মুক্তি পেতে সঠিক সহজ সাধনার পথ অনুসরণ অপরিহার্য। |
পদ ৩ | রচয়িতা: বিরুআপাদ |
এক সো পদমা চৌষট্টি পাখুড়ি। তহি চড়ি নাচঅ বাপ ডোম্বি বাপুড়ি।। হাড়ীত ভাতি না পাক ষোলোআনি। এক পাক নাহিং বিঝঅ পাণি।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: একশটি পদ্মের চৌষট্টিটি পাপড়ি। তার উপরে চড়ে ডোম্বী নৃত্য করে। হাঁড়িতে ভাত রান্না হয় না ষোলো আনায়। পানি ছাড়া এক পাকও হয় না। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: বিরুআপাদের পদে তান্ত্রিক বৌদ্ধ সাধনার সাংকেতিক বর্ণনা রয়েছে। পদ্মের পাপড়ি হলো নাড়িচক্রের প্রতীক। ডোম্বী নারী সাধনার শক্তি বা প্রজ্ঞার প্রতীক। পানি (প্রজ্ঞা) ছাড়া যেমন রান্না হয় না, তেমনি প্রজ্ঞা ছাড়া সাধনা সিদ্ধ হয় না। |
পদ ৪ | রচয়িতা: গুণ্ডরিপাদ |
আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভইলী। নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।। সুন্দরী তু কিণ হোসি দুখী। সহজ সুহাবে রহু তুহু সুখী।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: আজ ভুসুকু বাঙালি হয়েছে। নিজের ঘরনি চণ্ডালিনীকে গ্রহণ করেছে। সুন্দরী, তুমি কেন দুঃখী হবে? সহজ সুখে থাকো তুমি সুখী। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: গুণ্ডরিপাদের পদে সহজিয়া সাধনার রহস্য। চণ্ডালিনী হলো প্রজ্ঞার প্রতীক। সমাজের নিচু শ্রেণীর নারীকে গ্রহণ করা মানে অহংকার ত্যাগ করে সহজ সাধনার পথে আসা। 'বাঙালি হওয়া' অর্থ সহজের পথ বেছে নেওয়া। |
পদ ৫ | রচয়িতা: চাটিলপাদ |
কুলিশ ডাকিনী মোহিব কাল। চিঅ সো বজ্র আলো বিআল।। ডাকিনী কো মারিসি কুলিশে। চিঅ বজ্র আলো উদিসে।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: বজ্র ডাকিনী কালকে মোহিত করবে। চিত্তই বজ্র, আলো বিশাল। ডাকিনীকে কে মারবে বজ্রে? চিত্তের বজ্র আলো উদিত হয়। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: চাটিলপাদের পদে বজ্রযান বৌদ্ধ দর্শনের সাংকেতিক ভাষা ব্যবহৃত। ডাকিনী হলো মনের বিভ্রান্তি বা মায়ার প্রতীক। বজ্র হলো জ্ঞান বা বোধির প্রতীক। চিত্তের আলো দিয়েই কালের মোহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। |
পদ ৬ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভইলী। নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।। তোহোরে বাহুড়ি না আইলী। নিঅ মন তু কাহি গেলী।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: আজ ভুসুকু বাঙালি হলো। নিজের ঘরনি চণ্ডালিনীকে গ্রহণ করল। তোমার কাছে ফিরে আসি নি। নিজের মন, তুমি কোথায় গেলে? |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: ভুসুকুপাদ সর্বাধিক পদ রচনা করেছেন। এই পদে নিজের মনকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে। মন কোথায় হারিয়ে যায়? সহজ সাধনায় মনকে খুঁজে পাওয়াই মুক্তির পথ। চণ্ডালিনী এখানে অন্তরের প্রজ্ঞার প্রতীক। |
পদ ৭ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ। ছোই ছোই জাসি ব্রাহ্মণ নাড়িআ।। আলো ডোম্বি তোএ সম করিব মা সাঙ্গ। নিচ ঘরিণী করউ গৃহ কাজ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নগরের বাইরে রে ডোম্বীর কুটির। ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাই ব্রাহ্মণ নাড়িতে। আরে ডোম্বী, তোমার সমতুল্য কাউকে করব না সঙ্গী। নিচু ঘরণী গৃহের কাজ করো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: কাহ্নপাদের সবচেয়ে বিখ্যাত পদ। ডোম্বী (নিচু জাতির মেয়ে) এখানে সহজ জ্ঞানের প্রতীক। নগরের বাইরে থাকা মানে সমাজের প্রচলিত ধর্মাচার থেকে দূরে সহজ সত্যের সাধনা করা। ব্রাহ্মণ্য অহংকার ছেড়ে সহজ জ্ঞানকে গ্রহণ করাই মুক্তির পথ। |
পদ ৮ | রচয়িতা: কঙ্কণপাদ |
তিন্তিণি তরুবর বহুল বিআর। এক কিম্পি ফল না লগ্গই তার।। এই ফুলে কইসে ভমর রহই। বিণু ফুলে গন্ধ মক্কার কহই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: তেঁতুল গাছ অনেক ডালপালা। একটিও ফল ধরে না তাতে। এই ফুলে কীভাবে ভ্রমর থাকে? ফুল ছাড়া গন্ধ কীভাবে হয়? |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: কঙ্কণপাদের পদে মনের অসারতা বর্ণনা। তেঁতুল গাছ অনেক শাখা বিস্তার করে ফল না দিলে যেমন, তেমনি বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানে প্রকৃত জ্ঞান না থাকলে মুক্তি নেই। ভ্রমর যেমন ফুল ছাড়া থাকতে পারে না, তেমনি জ্ঞান ছাড়া সাধনা অর্থহীন। |
পদ ৯ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
পড়মা নাবী সদগুরু জানী। তার উঅর বইসী খিঅ রে পাণী।। এড়িস রে বাহু দূরন্ত বাই। জম্ম জরা মরণ মোক্ষ পাই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: পরম নৌকো সদগুরু জেনো। তার উপর বসে পান করো পানি। ছেড়ে দাও বাহু, দূরের বায়ু। জন্ম-জরা-মরণ থেকে মোক্ষ পাও। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: কাহ্নপাদের পদে সদগুরুর নির্দেশনার গুরুত্ব বর্ণিত। গুরুকে নৌকার সাথে তুলনা করা হয়েছে — যে নৌকায় চড়ে সংসারসমুদ্র পার হতে হয়। দেহ-মনের বাহ্যিক আসক্তি ত্যাগ করে সদগুরুর পথে চললে জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি মেলে। |
পদ ১০ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
এক ধনুকে পঞ্চ সর। বেঁধলে সাধু না করু ডর।। সাধু সিঁধলে পঞ্চ মারিবা। তব অণিমা ভব তরিবা।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: এক ধনুকে পাঁচটি বাণ। সাধু বেঁধে নাও, ভয় করো না। সাধু সিদ্ধ হলে পাঁচজনকে মারবে। তখন অণিমাতে ভব তরবে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: পাঁচ ইন্দ্রিয়কে পাঁচটি বাণ হিসেবে বর্ণনা। সাধক যদি পাঁচ ইন্দ্রিয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তবে পাঁচ ক্লেশকে (রাগ, দ্বেষ, মোহ, অহংকার, ঈর্ষা) জয় করতে পারবেন। তখন অণিমা সিদ্ধি অর্জন করে ভব পার হওয়া সম্ভব। |
পদ ১১ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
ণাণা তরুবর মৌলিল রে বন। পইঠো সঅল পসু পঞ্চানণ।। কুলিশ আহার নিরন্তর খাই। অচ্ছ সত্ত্বের মোহ না জাই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নানা তরুবর মূলিয়ে উঠল বন। পঞ্চানন প্রবেশ করল সকল পশুতে। বজ্র আহার নিরন্তর খায়। সত্ত্বের মোহ যায় না। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: জগতের মায়াময় স্বরূপ বর্ণনা। পঞ্চানন সকল প্রাণীর মধ্যে বিরাজ করেন — অর্থাৎ সকল প্রাণীর মধ্যেই পরম সত্তা বিদ্যমান। তবু মোহ কাটে না। বজ্রজ্ঞান অর্জন করলেই মায়া দূর হওয়া সম্ভব। |
পদ ১২ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
আপণা মাংসে হরিণী পোষে। খায়অ বাঘ সেই মাংসে।। হরিণীর সে দোষ কি আছে। আপনা কর্মে পড়িল ফাঁদে।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নিজের মাংস দিয়ে হরিণী পোষে। বাঘ সেই মাংস খায়। হরিণীর কি কোনো দোষ আছে? নিজের কর্মেই ফাঁদে পড়ল। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: কর্মফলের ধারণা সুন্দরভাবে উপস্থাপিত। হরিণী নিজের মাংস দিয়ে যাকে পোষে, সে-ই তাকে ভক্ষণ করে। আসক্তিই আমাদের বন্ধন তৈরি করে। নিজের কর্মের ফলেই মানুষ সংসারের ফাঁদে আটকে যায়। |
পদ ১৩ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
গাঙ্গা জমুনা মাঝে রে বহই নাই। তহি বুড়িলি মাতঙ্গি পোইআ নাই।। বিণু তড়িতে বলহ কেমন খেলা। সহজ বোঝা কঠিন এক বেলা।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: গঙ্গা যমুনার মাঝে নৌকা বয় না। তাতে ডুবে গেল মাতঙ্গী পোয়াতি না। বিদ্যুৎ ছাড়া বলো কেমন খেলা। সহজ বোঝা কঠিন এক বেলায়। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সাধনার পথের জটিলতা বর্ণনা। গঙ্গা ও যমুনা হলো দুটি নাড়ি — ইড়া ও পিঙ্গলা। এই দুইয়ের মাঝখান দিয়ে সুষুম্না নাড়ির পথে প্রাণশক্তি উঠিয়ে সাধনা সিদ্ধ করতে হয়। বিদ্যুৎ বা বজ্রজ্ঞান ছাড়া এই সাধনা কঠিন। |
পদ ১৪ | রচয়িতা: ডোম্বিপাদ |
ডোম্বি তোহোরি সঙ্গে জাইব। লোক লাজ না মানিব।। তোহোরে কারণে মুই হোইব নিরলস। মানব ডোম্বি তোহোরি কোলস।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ডোম্বী, তোমার সঙ্গে যাব। লোকের লজ্জা মানব না। তোমার কারণে আমি হব নিরলস। মানব ডোম্বী, তোমার কোল। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সমাজের রীতি-প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সহজ সাধনার পথে নিষ্ঠার অঙ্গীকার। ডোম্বী (নিচু জাতির নারী) হলো সহজ প্রজ্ঞার প্রতীক। সমাজের লোকলজ্জা উপেক্ষা করে সহজ সত্যকে গ্রহণ করার শপথই পদের মূল বক্তব্য। |
পদ ১৫ | রচয়িতা: শান্তিপাদ |
ভব নাই পার হো ডোম্বি নাবি। সদগুরু পদে লাগঅ ধাবি।। পাপ পুণ্য দুই ছাড়ি রে তুই। সহজ সুহাবে লইঅ মুই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ভবের নৌকা পার হও, ডোম্বী নাবিক। সদগুরুর পদে লাগিয়ে দৌড়াও। পাপ-পুণ্য দুই ছেড়ে দাও তুমি। সহজ সুখে নাও আমাকে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: শান্তিপাদের পদে সহজ সাধনার মূলনীতি ব্যক্ত। ডোম্বী নাবিকরূপী গুরু ভবসাগর পার করিয়ে দেন। পাপ-পুণ্য উভয় থেকেই মুক্ত হয়ে নিষ্পাপ সহজ সত্যের পথে চললেই মোক্ষ লাভ হয়। |
পদ ১৬ | রচয়িতা: মহিধরপাদ |
দুলি দুহি পিটা ধরণ না জাই। সহজ সুহাবে মন থিরু থাই।। বজ্র গুরু মোর মহাসুখ দেই। অমৃত পানে তৃষ্ণা না যাই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: দোল দিয়ে দুধ দোহন করে মাখন তোলা যায় না। সহজ সুখে মন স্থির থাকে। বজ্র গুরু আমার মহাসুখ দেন। অমৃত পানে তৃষ্ণা যায় না। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: মহিধরপাদের পদে সহজ সাধনার প্রকৃত স্বরূপ বর্ণনা। বাহ্যিক ক্রিয়াকাণ্ড দিয়ে মুক্তি নেই। বজ্রযান গুরুর নির্দেশে সহজ সাধনায় মহাসুখ লাভ করা যায়। যে অমৃত পান করে সে আরো তৃষ্ণার্ত হয় — এটি সাধনার অসীম গভীরতার ইঙ্গিত। |
পদ ১৮ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
সমুদ্র চোরী কর চান্দ মারী। চোরী করিঅ নেলা বাহার তারী।। এড়িল পবন গঅণ চড়িআ। গগন মণ্ডলে কেলি করিআ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: সমুদ্রের চোর চাঁদকে মেরে। চুরি করে নেল বাইরে তারী। বায়ু ছেড়ে দিয়ে গগনে চড়িয়া। গগনমণ্ডলে ক্রীড়া করিয়া। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: তান্ত্রিক সাধনার সাংকেতিক বর্ণনা। চাঁদ হলো বিন্দু বা অমৃতের প্রতীক। প্রাণবায়ু ঊর্ধ্বমুখী করে সহস্রারে নিয়ে যাওয়া এবং গগনমণ্ডলে আনন্দ উপভোগ — এটি কুণ্ডলিনী শক্তি জাগরণের সাংকেতিক বর্ণনা। |
পদ ১৯ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
পাণ্ডিতে কি জানই ভেদ। বাজণা বাজাই অতথ বেদ।। পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য জানি। সহজ তত্ত্বে রস না মানি।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: পণ্ডিত কি জানে ভেদ? বেদের অতথ বাজনা বাজায়। পণ্ডিতের পাণ্ডিত্য জানি। সহজ তত্ত্বে রস মানে না। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিতদের শুষ্ক জ্ঞানের সমালোচনা। শুধু বেদ-শাস্ত্র মুখস্থ করে সহজ তত্ত্বের রস উপলব্ধি করা যায় না। প্রকৃত জ্ঞান আসে অন্তরের সাধনা থেকে, গ্রন্থপাঠ থেকে নয়। |
পদ ২০ | রচয়িতা: কুক্কুরিপাদ |
কাহ্ন কহই তুইঁ চেলি। তোর মহাসুখ মোর পেলি।। জিন বন্ধন ডোম্বী মুক্তি দেই। এ মহাসুখ তুইঁ হেরি লেই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: কাহ্নপাদ বলেন তুই শিষ্যা। তোর মহাসুখ আমি পেলাম। জিনের বন্ধন ডোম্বী মুক্তি দেয়। এই মহাসুখ তুই দেখে নাও। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: গুরু-শিষ্য সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে সহজ জ্ঞান সঞ্চারণের কথা বলা হয়েছে। ডোম্বী (প্রজ্ঞা) জিনের (বুদ্ধের) বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়। গুরু শিষ্যকে মহাসুখের পথ দেখিয়ে দেন। |
পদ ২১ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
জো মন গঅণে সো পবন থাকই। জো পবনে সো চন্দ রাখই।। চন্দ সূর একি হোই জাই। তব মহাসুহ উদঅ ভাই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: যে মন গগনে, সে পবন থাকে। যে পবনে, সে চাঁদকে রাখে। চাঁদ-সূর্য এক হয়ে যায়। তখন মহাসুখের উদয় হয় ভাই। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: যোগসাধনার তত্ত্ব বর্ণনা। মন, প্রাণবায়ু এবং চাঁদ-সূর্য (ইড়া-পিঙ্গলা) একত্রিত হলে সুষুম্না নাড়ি জাগ্রত হয় এবং মহাসুখ বা নির্বাণের অনুভূতি লাভ হয়। |
পদ ২২ | রচয়িতা: সরহপাদ |
বাহ পণ্ডিত বাহ তুই মর। শুদ্ধ ভাবে তুই কর বিচার।। পাণ্ডিত্যে মুক্তি নাহি পাই। সহজে মুক্তি ঘরেই থাই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: বাহ পণ্ডিত, বাহ, তুই মরো। শুদ্ধ ভাবে তুই বিচার করো। পাণ্ডিত্যে মুক্তি পাওয়া যায় না। সহজে মুক্তি ঘরেই থাকে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সরহপাদ সবচেয়ে প্রভাবশালী সিদ্ধাচার্য। পাণ্ডিত্যের অসারতা প্রমাণ। শুধু বইপত্র পড়ে মুক্তি মেলে না। মুক্তি ঘরের মধ্যেই — অর্থাৎ দেহের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সহজ সাধনার মাধ্যমে এই মুক্তি লাভ করা যায়। |
পদ ২৩ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
চিত্ত বিমল সমরসে আলো। সদগুরু বচনে ধর্ম ভালো।। ণান ণ জাণই ততহি বাড়। মহাসুখ পদে করি চাড়।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: চিত্ত বিমল সমরসে আলোকিত। সদগুরুর বচনে ধর্ম ভালো। জ্ঞান না জানলে সেখানেই বাড়ো। মহাসুখ পদে করো আরোহণ। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: চিত্তের বিশুদ্ধতাকে মুক্তির ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন। চিত্ত বিমল ও সমরস হলে প্রজ্ঞার আলো ফুটে ওঠে। সদগুরুর বচনই সঠিক ধর্মের পথ। মহাসুখ পদে আরোহণই চরম লক্ষ্য। |
পদ ২৪ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
আপণা আপু বুঝিলে জানই। পরের কথা কাহাকে মানই।। সহজ তত্ত্বে থির রহু। গুরু বচনে মনু সংলহু।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নিজেকে নিজে বুঝলে জানা যায়। পরের কথা কাকে মানবে? সহজ তত্ত্বে স্থির থাকো। গুরুর বচনে মনকে সংযত করো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: আত্মজ্ঞানের গুরুত্ব বর্ণনা। নিজেকে জানাই সত্যিকারের জ্ঞান — পরের মতামতে নয়। সহজ তত্ত্বে স্থির থেকে গুরুর বচন অনুযায়ী মন নিয়ন্ত্রণ করলেই মুক্তি লাভ সম্ভব। |
পদ ২৫ | রচয়িতা: তন্ত্রীপাদ |
বাজণা বাজাই পবন বেণু। সদগুরু পদে লহু চেণু।। ত্রিভুবন মধ্যে এক নাদ। সহজ সমাধি নিরবাদ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: পবনের বেণু বাজনা বাজায়। সদগুরুর পদে গ্রহণ করো জ্ঞান। তিন ভুবনের মধ্যে এক নাদ। সহজ সমাধি নির্বিবাদ। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: তন্ত্রীপাদের পদে নাদ সাধনার কথা। প্রাণবায়ুর সঞ্চালনে দেহের মধ্যে যে নাদ বা সুর সৃষ্টি হয়, তাই হলো ত্রিভুবনব্যাপী এক অনাহত নাদ। সদগুরুর নির্দেশে এই নাদ অনুসরণ করলে সহজ সমাধি লাভ হয়। |
পদ ২৬ | রচয়িতা: শান্তিপাদ |
পবন পিবন্তি পাণী। গগন মণ্ডলে দিঅ পাণী।। চন্দ্র সূর্য করহ মিলান। তব পাইবা মহাসুখ থান।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: পবন পান করে পানি। গগন মণ্ডলে দাও পানি। চন্দ্র-সূর্যের মিলন করো। তবে পাবে মহাসুখের স্থান। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: শান্তিপাদের দ্বিতীয় পদে প্রাণায়াম ও নাড়ি সাধনার কথা। পবন বা প্রাণবায়ু যখন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় এবং ইড়া (চন্দ্র) ও পিঙ্গলা (সূর্য) নাড়ির মিলন ঘটে, তখন সুষুম্না নাড়িতে প্রাণশক্তি প্রবাহিত হয় এবং মহাসুখ লাভ হয়। |
পদ ২৭ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
ভব সমুদ্র পার হব কেমনে। ডোম্বি নাবিক রাখ এই মনে।। আপনা আপু নৌকা বানাও। সহজ পদে বাড়ি চলে যাও।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ভবের সমুদ্র পার হব কেমনে? ডোম্বী নাবিক, এই মনে রাখো। নিজে নিজে নৌকা বানাও। সহজ পদে ঘরে চলে যাও। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সংসারকে সমুদ্রের সাথে তুলনা। ডোম্বী নাবিক (সহজ সাধনা বা গুরু) এই সমুদ্র পার করিয়ে দেন। নিজের শরীর-মনকে নৌকা বানিয়ে সহজ সাধনার পথে মুক্তির ঘরে পৌঁছানোই লক্ষ্য। |
পদ ২৮ | রচয়িতা: শবরপাদ |
মোক্ষ সোহাগি শবর পাই। ভব বনে খেলঅ ভুলাই।। তিণ বাণে মারিলুম হরিণী। সহজ পদে কিণু মাণিণী।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: মোক্ষ পেল শবরী প্রিয়া। ভবের বনে খেলতে ভুলে গেল। তিন বাণে মারলাম হরিণী। সহজ পদে পেলাম মানিনী। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: শবরপাদের পদে ব্যাধের রূপক ব্যবহার করে সাধনার পথ বর্ণনা। শবর (ব্যাধ) হলো সাধক। হরিণী হলো মন বা মায়া। তিন বাণে (রাগ-দ্বেষ-মোহ জয় করে) মনকে বশে এনে সহজ সাধনায় মুক্তি পাওয়া যায়। |
পদ ২৯ | রচয়িতা: লুইপাদ |
বাজ নাবি বাজ রে। ভব ভান্ডার ভরল রে।। গুরু বচনে ডিঙা ধর। ভব নাই পার করহ বর।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নৌকা বাজাও বাজাও রে। ভবের ভাণ্ডার ভরল রে। গুরুর বচনে নৌকা ধরো। ভবের নৌকা পার করো বরণীয়। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: লুইপাদের দ্বিতীয় পদে সংসার পাড়ি দেওয়ার উপায় বলা হয়েছে। গুরুর বাণীই ডিঙা বা নৌকা — যা ভবসাগর পার করিয়ে দেয়। সংসারের মায়াময় ভাণ্ডার থেকে মুক্ত হতে হলে গুরুর নির্দেশনা অপরিহার্য। |
পদ ৩০ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভইলী। অবধূত হো মন সংলইলী।। জতি কুল মান মুই হেলা। সহজ সুহাবে থির ভইলী।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: আজ ভুসুকু বাঙালি হলো। অবধূত হয়ে মন সংলগ্ন হলো। জাতি-কুল-মান আমি হেলায় ফেললাম। সহজ সুখে স্থির হলাম। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: জাতি-বর্ণের বন্ধন ত্যাগ করে সহজ সাধনার পথে আসার কথা বলা হয়েছে। 'বাঙালি হওয়া' মানে সহজ পথে চলা। অবধূত (সন্ন্যাসী) হয়ে সমস্ত সামাজিক বন্ধন ছেড়ে সহজ সুখে স্থিরতা লাভ করাই পদের মূল বার্তা। |
পদ ৩২ | রচয়িতা: সরহপাদ |
সহজ সুহাবে তহি থাই। গগন চলন্ত পবন না জাই।। চিত্ত চন্দ বোহি রহু। সদগুরু বাক্যে মনু লহু।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: সহজ সুখে সেখানে থাকে। গগনে চলমান পবন যায় না। চিত্তচন্দ্র বোধিতে থাকো। সদগুরুর বাক্যে মন গ্রহণ করো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সহজ সমাধির স্থায়িত্বের কথা বর্ণনা। যে সহজ সুখ লাভ হয় তা চিরস্থায়ী — যেমন গগনে পবন চিরকাল বিচরণ করে। চিত্তকে বোধির চাঁদের মতো স্থির রেখে গুরুর উপদেশে মনকে পরিচালিত করাই মুক্তির পথ। |
পদ ৩৩ | রচয়িতা: ঢেণ্ঢণপাদ |
কিসু ণ বুঝই কিসু ণ জানই। অণিবার কেলি তত্ত্ব মানই।। পিব পিব সুরা মহাসুখ। তব মিলই পরম মুখ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: কিছু বুঝি না কিছু জানি না। অনিবার ক্রীড়ার তত্ত্ব মানি। পান করো পান করো সুরা মহাসুখ। তখন মিলবে পরম মুখ। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সহজ সাধনার অজ্ঞতার ভান করে আসলে গভীর জ্ঞান প্রকাশ। পণ্ডিতি জ্ঞান ত্যাগ করে নিরন্তর ক্রীড়াময় সাধনায় মহাসুখের সুরা পান করলে পরম পুরুষের সাক্ষাৎ মেলে। |
পদ ৩৬ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
দিবসে রবি জোতিঅ নক্ষত্র ণ দেখই। তেমন বুদ্ধ প্রকৃতি পরমার্থ ণ পেখই।। মাহামুদ্রা তত্ত্বে জে বুঝই। সো অই মহাসুখ ভুঞ্জই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: দিনে সূর্যের আলোয় তারা দেখা যায় না। তেমনি বুদ্ধের প্রকৃতি পরমার্থ দেখা যায় না। মহামুদ্রার তত্ত্ব যে বোঝে। সে-ই মহাসুখ ভোগ করে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: মহামুদ্রার তত্ত্ব বর্ণনা। সূর্যের আলোয় যেমন তারা দেখা যায় না, তেমনি প্রচলিত জ্ঞানে বুদ্ধত্বের পরম স্বরূপ উপলব্ধি করা যায় না। মহামুদ্রার গভীর সাধনাতেই এই স্বরূপ অনুভব করা যায় এবং মহাসুখ লাভ হয়। |
পদ ৩৮ | রচয়িতা: সরহপাদ |
মহামুদ্রা সে সহজে পাই। গুরু বচনে মন থিরু থাই।। বিণু সাধনা ন হোই পার। দেহ মনে সাধ করহ সার।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: মহামুদ্রা সহজেই পাওয়া যায়। গুরুর বচনে মন স্থির হয়। সাধনা ছাড়া পার হওয়া যায় না। দেহ-মনে সাধনাই সার করো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: মহামুদ্রা সাধনার সরলতা ও গুরুত্ব উভয়ই বর্ণনা। মহামুদ্রা সহজলভ্য কিন্তু সাধনা ছাড়া পাওয়া যায় না। গুরুর বাণী অনুসরণ করে দেহ-মনে একনিষ্ঠ সাধনাই মুক্তির একমাত্র উপায়। |
পদ ৩৯ | রচয়িতা: সরহপাদ |
মন এব মনুষ্যাণাং কারণং বন্ধমোক্ষয়োঃ। বন্ধস্য বিষয়াসক্তং মুক্তেঃ নির্বিষয়ং মনঃ।। মন রে মনকে বশ করহ। তব মুক্তির পথে চলহ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: মনই মানুষের বন্ধন ও মোক্ষের কারণ। বিষয়াসক্ত মন বন্ধনের এবং নির্বিষয় মন মুক্তির। মন রে, মনকে বশ করো। তবে মুক্তির পথে চলো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: মনের দ্বৈত ভূমিকা বর্ণনা। মনই বন্ধন সৃষ্টি করে, আবার মনই মুক্তি দিতে পারে। বিষয়ের প্রতি আসক্ত মন সংসারে বেঁধে রাখে, নির্লিপ্ত মন মুক্তির পথ খুলে দেয়। তাই মন নিয়ন্ত্রণই সাধনার মূল বিষয়। |
পদ ৪০ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
আপণা আপু বুঝই যে। সে সহজ তত্ত্বে মজই সে।। বাহির খুঁজিস কেন ধরি। সহজ ঘরেই লুকাই আছে পরি।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নিজেকে নিজে যে বোঝে। সে সহজ তত্ত্বে মজে। বাইরে কেন খোঁজো ধরে। সহজ ঘরেই লুকিয়ে আছে পরী। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: আত্মজ্ঞানের গুরুত্ব পুনরায় বলা হয়েছে। সহজ তত্ত্ব বাইরে কোথাও নেই — এটি নিজের মধ্যেই আছে। নিজেকে জানলেই সহজ তত্ত্বের উপলব্ধি হয়। বাহ্যিক তীর্থ বা আচার-অনুষ্ঠানে সত্য খোঁজা অর্থহীন। |
পদ ৪১ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
নিদ্রা করই জাগন্ত ভেলা। ঘর থাকিঅ বন বিহরন খেলা।। বিষয় বিরতি হোই মহাসুখ। অনুভবে জান রে পরম মুখ।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ঘুমে জাগার বেলা। ঘরে থেকে বনে বিহার খেলা। বিষয় বিরতি হলে মহাসুখ। অনুভবে জানো রে পরম মুখ। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সহজ সাধনার বৈশিষ্ট্য বর্ণনা। সহজ সাধকের জন্য ঘুম ও জাগরণে, ঘরে ও বনে — সর্বত্র সাধনা চলে। বিষয়ের প্রতি বিরক্তি তৈরি হলে মহাসুখ লাভ হয়। এই মহাসুখ শুধু অনুভবেই জানা যায়, বাক্যে প্রকাশ করা যায় না। |
পদ ৪২ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
ডোম্বি তুই মোর সখী। তোহোরে বিনু মোর কাজ নখী।। তোহোরে পদে পড়িআ রই। সহজ মহাসুখ পাই গই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ডোম্বী তুই আমার সখী। তোমাকে ছাড়া আমার কাজ নেই। তোমার পদে পড়ে থাকি। সহজ মহাসুখ পেয়ে গেলাম। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: ডোম্বী (প্রজ্ঞা বা সহজ জ্ঞান) কে সখী হিসেবে সম্বোধন। প্রজ্ঞার সাথে মিলন ছাড়া সাধকের কোনো কাজ সম্পন্ন হয় না। প্রজ্ঞার পাদপদ্মে শরণ নিয়ে সহজ মহাসুখ লাভ করাই পদের বক্তব্য। |
পদ ৪৩ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
সুণ রে ভাই সহজ ধরম। অনুভব জান পরম মরম।। গুরু পদে কর বিস্বাস। তব পাইবা মুক্তির আস।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: শোনো ভাই সহজ ধর্ম। অনুভবে জানো পরম মর্ম। গুরুর পদে করো বিশ্বাস। তবে পাবে মুক্তির আশ। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সহজ ধর্মের মূলকথা সরলভাবে উপস্থাপিত। সহজ ধর্ম হলো অনুভবের ধর্ম — শুধু কানে শুনলে বা বইয়ে পড়লে হয় না। গুরুর প্রতি বিশ্বাস রেখে অনুভবের পথে এগিয়ে গেলেই মুক্তি লাভ সম্ভব। |
পদ ৪৫ | রচয়িতা: কাহ্নপাদ |
কাহ্ন বলই শুণ রে ভাই। মায়া মোহ ছাড়ি দে যাই।। সহজে থির মন রাখ। তব মুক্তি পাইবা ডাক।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: কাহ্নপাদ বলেন শোনো ভাই। মায়া-মোহ ছেড়ে দিয়ে যাও। সহজে স্থির মন রাখো। তবে মুক্তির ডাক পাবে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: সহজ সাধনার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন। মায়া-মোহের বন্ধন ছেড়ে, মনকে সহজ অবস্থায় স্থির রাখলে মুক্তির ডাক আসে। এটি সমগ্র চর্যাপদ সাধনার নির্যাস। |
পদ ৪৬ | রচয়িতা: শবরপাদ |
উঁচে উঁচে পাবত ভাষই। তহি বসই শবর বাজ তাষই।। কানে কুণ্ডল মুণ্ডে জটা। পীনবর পাণী মদনগটা।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: উঁচু উঁচু পাহাড়ে ভাষণ। সেখানে বসে শবর বাজ তাষণ। কানে কুণ্ডল, মাথায় জটা। পীনবর পাণি মদনগোটা। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: শবরপাদের পদে শবর (ব্যাধ) রূপক সাধকের বর্ণনা। উঁচু পাহাড়ে বসে থাকা মানে উচ্চ সাধনা অবস্থায় থাকা। বাজপাখি দিয়ে শিকার মানে মন দিয়ে জ্ঞান শিকার করা। কুণ্ডল ও জটা হলো সিদ্ধ সাধকের প্রতীক। |
পদ ৪৭ | রচয়িতা: লুচিকপাদ |
উড়িআ বসন্তে কেলি কর মাতিআ। সবর শবরী মোহিল চিত্তা।। তোহর দর্শনে মন ভইলা। সহজ সুহাবে থির ভইলা।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: উড়িয়া বসন্তে মাতিয়ে ক্রীড়া করো। শবর শবরীতে চিত্ত মোহিত। তোমার দর্শনে মন হলো। সহজ সুখে স্থির হলো। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: প্রকৃতির সাথে সাধনার যোগ বর্ণনা। বসন্তকালে পাখির মতো মুক্ত হয়ে ওড়া — এটি আত্মার মুক্তির প্রতীক। শবর ও শবরীর মিলন হলো উপায় ও প্রজ্ঞার মিলন, যার ফলে সহজ সুখে স্থির হওয়া যায়। |
পদ ৪৮ | রচয়িতা: কুক্কুরিপাদ |
একণা হংসো ভমই রে দিঅহে। লাখ লাখ পদ্মে রমই রে নিঅহে।। সে হংসো বিণু কারে গমনে। গুরু বচনে সদা মনে।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: একটি হাঁস ঘুরে বেড়ায় দিনে। লক্ষ লক্ষ পদ্মে রমণ করে নিজে। সেই হাঁস কার কাছে গমন করে। গুরুর বচন সদা মনে। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: হাঁস হলো আত্মা বা চিত্তের প্রতীক। আত্মা অজস্র ইন্দ্রিয়ানুভূতির (লক্ষ পদ্ম) মধ্যে বিচরণ করে, কিন্তু সঠিক গন্তব্য খুঁজে পায় না। গুরুর বচনই পথ দেখিয়ে দিতে পারে। |
পদ ৪৯ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
নাহি সুরা নাহি মাংস। নাহি দেবতা নাহি যজ্ঞ।। সহজ বিনু কিসু না সাজই। এ তত্ত্বে গুরু আগে রাজই।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: নেই সুরা নেই মাংস। নেই দেবতা নেই যজ্ঞ। সহজ ছাড়া কিছুই সাজে না। এই তত্ত্বে গুরু আগে রাজেন। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: বাহ্যিক ধর্মাচারের অসারতা প্রমাণ। সুরা-মাংস, দেবতা-যজ্ঞ — এগুলো সাধনার পথে প্রয়োজন নেই। শুধু সহজ সাধনাই প্রকৃত ধর্ম এবং গুরুই এই তত্ত্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞাতা। |
পদ ৫০ | রচয়িতা: ভুসুকুপাদ |
ভাব না ভাবনা ভইলা একই। সহজ আনন্দে মন নিমেখই।। ভুসুকু ভণই এ তত্ত্ব সার। সদগুরু পদে কর নমস্কার।। |
শব্দার্থ ও আক্ষরিক অনুবাদ: ভাব ও ভাবনা এক হয়ে গেল। সহজ আনন্দে মন নিমগ্ন। ভুসুকু বলেন এই তত্ত্বই সার। সদগুরুর পদে করো নমস্কার। |
ভাবার্থ ও ব্যাখ্যা: ভুসুকুপাদের শেষ পদে সাধনার পূর্ণতার কথা। যখন ভাব (সত্তা) ও ভাবনা (চিন্তন) এক হয়ে যায়, তখন সহজ আনন্দের মধ্যে মন বিলীন হয়। ভুসুকুপাদ বলছেন এটিই সমগ্র চর্যাপদ সাধনার সারতত্ত্ব এবং সদগুরুর পদে প্রণামই শেষ কথা। |
চর্যাপদের বিষয়বস্তু ও দার্শনিক তত্ত্ব |
১. সহজযান দর্শন চর্যাপদের মূল দর্শন হলো সহজযান — সহজ পথে সাধনা। বাইরের আচার-অনুষ্ঠান নয়, ভেতরের জ্ঞানই মুক্তির পথ। |
২. মহামুদ্রা তত্ত্ব মহামুদ্রা হলো চরম বোধির অবস্থা — যেখানে চিত্ত সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও মুক্ত। সরহপাদ ও কাহ্নপাদ এই তত্ত্ব ব্যাপকভাবে আলোচনা করেছেন। |
৩. সন্ধ্যাভাষার প্রয়োগ চর্যাপদ 'আলো-আঁধারি ভাষায়' রচিত — প্রতিটি শব্দের আক্ষরিক ও রূপক দুটি অর্থ আছে। ডোম্বী, শবর, হরিণী — সবই প্রতীকী চরিত্র। |
৪. বর্ণবৈষম্যের বিরোধিতা সিদ্ধাচার্যরা সামাজিক বর্ণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। ডোম্বী ও চণ্ডালিনীকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। |
৫. গুরু-শিষ্য সম্পর্ক সকল পদেই গুরুর প্রতি ভক্তি ও তাঁর নির্দেশনার গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুই হলেন ভবসাগরের নাবিক। |
৬. দেহতত্ত্ব ও যোগসাধনা কুণ্ডলিনী, নাড়িচক্র, প্রাণায়াম ও নাদসাধনা — এই দেহতত্ত্বের বিষয়গুলো সাংকেতিকভাবে চর্যাপদে উপস্থাপিত হয়েছে। |
৭. প্রকৃতিচিত্রণ চর্যাপদে বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি — নদী, পাহাড়, বন, পাখি — সুন্দরভাবে চিত্রিত হয়েছে এবং প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে দার্শনিক সত্য প্রকাশ পেয়েছে। |
৮. মহাসুখ তত্ত্ব নির্বাণ বা চরম আনন্দকে 'মহাসুখ' বলা হয়েছে। সহজ সাধনার মাধ্যমে এই মহাসুখ লাভই চর্যাপদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
পরীক্ষায় প্রায়ই জিজ্ঞাসিত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর:
প্রশ্ন | উত্তর |
চর্যাপদ আবিষ্কার করেন কে? | মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৯০৭ সালে নেপাল থেকে) |
চর্যাপদের প্রথম পদ কার রচনা? | লুইপাদের — 'কায়া তরুবর পঞ্চ বি ডাল' |
সর্বাধিক পদ রচনা করেছেন কে? | ভুসুকুপাদ (৯টি পদ) |
দ্বিতীয় সর্বাধিক পদ রচনা করেছেন কে? | কাহ্নপাদ (১৩টি পদ) |
চর্যাপদের ভাষাকে কী বলা হয়? | সন্ধ্যাভাষা বা আলো-আঁধারি ভাষা |
চর্যাপদের মোট পদ সংখ্যা কত? | ৫১টি (কয়েকটি খণ্ডিত বা অনুপস্থিত) |
চর্যাপদের টীকাকার কে? | মুনিদত্ত (সংস্কৃতে টীকা রচনা করেছিলেন) |
চর্যাপদকে বাংলা সাহিত্য প্রমাণ করেন কে? | ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় (ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে) |
চর্যাপদ কোন ধর্মের সাহিত্য? | বজ্রযান বৌদ্ধ ধর্ম (সহজিয়া মত) |
চর্যাপদ প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়? | বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, ১৯১৬ সালে |
চর্যাপদের সবচেয়ে প্রাচীন সিদ্ধাচার্য কে? | সরহপাদ (৮ম-৯ম শতক) |
'নগর বাহিরি রে ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ' কার রচনা? | কাহ্নপাদের রচনা (পদ ৭) |
চর্যাপদে 'ডোম্বী' কীসের প্রতীক? | সহজ প্রজ্ঞা বা সাধনার শক্তির প্রতীক |
চর্যাপদের পাণ্ডুলিপি কোথায় পাওয়া যায়? | নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালায় |
'আজি ভুসুকু বঙ্গালি ভইলী' কার বিখ্যাত উক্তি? | ভুসুকুপাদের |
চর্যাপদে 'মহাসুখ' কীসের প্রতীক? | নির্বাণ বা পরম আনন্দের প্রতীক |
চর্যাপদে কতজন সিদ্ধাচার্যের পদ আছে? | আনুমানিক ২৩-২৪ জন সিদ্ধাচার্যের পদ |
চর্যাপদে বাংলার কোন দিক চিত্রিত হয়েছে? | তৎকালীন সমাজচিত্র, প্রকৃতি ও দার্শনিক চিন্তা |
চর্যাপদ — বাংলা সাহিত্যের সোনালি শিকড় চর্যাপদ শুধু সাহিত্যের আদিগ্রন্থ নয় — এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের দলিল। হাজার বছর আগে এই পদগুলো রচনা করে সিদ্ধাচার্যরা প্রমাণ করেছিলেন যে বাংলা ভাষা কত সমৃদ্ধ ও প্রকাশক্ষম। আজও চর্যাপদ আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও দার্শনিক ঐতিহ্যের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। |