✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ লোকসাহিত্য মাটির মানুষের কণ্ঠের কবিতা — বাংলার অলিখিত ঐতিহ্য |
১. লোকসাহিত্যের সংজ্ঞা ও স্বরূপ
লোকসাহিত্য হলো মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত সেই সাহিত্যসম্পদ, যার কোনো নির্দিষ্ট রচয়িতা নেই, যা লেখার চেয়ে গানে, কথায় ও অভিনয়ে বেশি প্রকাশিত হয় এবং যা কোনো বিশেষ সমাজ বা সম্প্রদায়ের সামষ্টিক সৃষ্টি।
লোকসাহিত্য কোনো রাজসভার দেবদেহী খাসা সাহিত্য নয়। এটি জন্ম নেয় মাটিতে খাওয়া মানুষের ঘামে, কৃষকের লাঙলের ফলায়, মাঝির ঠায় আর গ্রামীণ নারীদের আনন্দ-বেদনার অশ্রুতে। পুরুষানুক্রমে শ্রুতি ও স্মৃতির ওপর ভর করে এটি হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে।
লোকসাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য: • মুখে মুখে প্রচার (Oral Tradition): লেখার আগে মুখে মুখে বাহিত হয়। প্রজন্ম পরম্পরায় কানে কানে পৌঁছায়। • লেখক অজ্ঞাত (Anonymous): নির্দিষ্ট কোনো একজনের রচনা নয় — সমাজের সামষ্টিক সৃষ্টি। • পরিবর্তনশীলতা: প্রতিটি কণ্ঠে বা অঞ্চলে সামান্য পার্থক্য থাকে। • সরলতা ও স্বাভাবিকতা: পণ্ডিতি ভাষা নেই — সাধারণ মানুষের সহজ কথায় গভীর অনুভূতি। • টাইপ চরিত্র: ভালো মানুষ সবসময় ভালো, খারাপ মানুষ সবসময় খারাপ — এটি লোকসাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। • 'সাবল্টার্ন'-এর কণ্ঠস্বর: আধুনিক সাহিত্যে অভিজাত শ্রেণির কথা থাকে, লোকসাহিত্য হলো নিম্নবর্গের মানুষের কণ্ঠস্বর। নায়িকারা রাজকন্যা নয়, বেদেকন্যা বা সাধারণ কৃষক বধূ। |
এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: • 'Folklore' শব্দের প্রথম ব্যবহার: উইলিয়াম জে. থমস — ১৮৪৬ সালে 'অ্যাথেনিয়াম' পত্রিকায়। • আধুনিক Folklore Society প্রতিষ্ঠা: লন্ডনে, ১৮৭৮ সালে। • বাংলা সাহিত্যের লোকড় (শিকড়): লোকসাহিত্যকে বাংলা সাহিত্যের লোকড় বলা হয়। • বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম শাখা: গীতিকা (Ballads)। • বাংলা একাডেমির লোকসাহিত্য সংগ্রহ শুরু: ১৯৫৫ সাল থেকে। • বাংলার লোকসাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিচিতি: ড. দীনেশচন্দ্র সেন এনেছেন। • রবীন্দ্রনাথের লোকসাহিত্য-বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থ: 'লোকসাহিত্য' (১৯০৭)। • বাউল গানের সংকলন 'হারামণি': ৮টি খণ্ড — সংগ্রাহক মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন, প্রথম খণ্ডে ভূমিকা লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। |
২. লোকসাহিত্যের শাখাসমূহ
বাংলা লোকসাহিত্যকে মূলত তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায় — মৌখিক সাহিত্য, সঙ্গীত ও অভিনয়ধর্মী সাহিত্য।
ক) মৌখিক সাহিত্য: • ছড়া: শিশুদের ছড়া, ধাঁধার ছড়া, খেলার ছড়া, মেয়েলি ছড়া। লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম রূপ। • ধাঁধা: বুদ্ধি ও কল্পনার মিশেলে রচিত প্রশ্নোত্তর-পর্ব। • প্রবাদ-প্রবচন: জনজীবনের অভিজ্ঞতালব্ধ সংক্ষিপ্ত জ্ঞানকথা। লোকসাহিত্যের বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তববাদী শাখা। • লোককাহিনি: রূপকথা, পরীকথা, দেবকথা, মিথ, কিংবদন্তি, উপকথা। খ) লোকগান: • বাউল গান: আত্মার সন্ধান, দেহতত্ত্ব, মানবতত্ত্ব — ইউনেস্কো স্বীকৃত। • ভাটিয়ালি: নদীর দেশের মাঝির গান। • ভাওয়াইয়া: উত্তরবঙ্গের গরুর গাড়ির গান। • জারি ও সারি: কারবালার বিষাদগাথা (জারি) ও নৌকাবাইচের গান (সারি)। • গম্ভীরা: চাঁপাইনবাবগঞ্জের নানা-নাতির সমাজ-সচেতন ব্যঙ্গ-গান। • আলকাপ: মুর্শিদাবাদ, রাজশাহী অঞ্চলের গীতিনাট্য। • লেটো গান: রাঢ় বাংলার ভ্রাম্যমাণ গীতিনাট্য — কাজী নজরুল ইসলাম বাল্যকালে এতে যুক্ত ছিলেন। • ভাদু ও টুসু: রাঢ় বাংলার কৃষিভিত্তিক উৎসবের গান। গ) অভিনয়ধর্মী লোকসাহিত্য: • যাত্রা: মুক্তমঞ্চে অভিনীত বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা। • পালা ও পাঁচালি: দেবদেবীর মাহাত্ম্য গেয়ে বলা লোকনাট্য। |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ বাংলা গীতিকা Ballads — লোকসাহিত্যের মুকুট |
গীতিকার পরিচয় ও ভাগ
গীতিকা বা Ballad হলো কাহিনিমূলক লোকগীতি। এর বৈশিষ্ট্য হলো এতে একটি টানা গল্প থাকে এবং এটি সুর করে গাওয়া হয়। বাংলাদেশের সমৃদ্ধতম লোকসাহিত্যের শাখা হলো গীতিকা। বাংলা গীতিকাকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা যায়: ১. নাথ গীতিকা, ২. ময়মনসিংহ গীতিকা, ৩. পূর্ববঙ্গ গীতিকা।
ক. নাথ গীতিকা
নাথ ধর্মাবলম্বীদের (শিবের উপাসক যোগী সম্প্রদায়) গুরুদের মহিমা ও অলৌকিক কাহিনি নিয়ে রচিত। এটি বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ধারা। নাথ ধর্মে কায়াসাধনা বা যোগসাধনার মাধ্যমে দেহকে অমর করার কথা বলা হয়েছে।
• প্রধান পালা: ময়নামতী-গোপীচন্দ্রের গান, গোরক্ষবিজয়। • প্রধান চরিত্র: রাজা গোপীচন্দ্র, রানী ময়নামতী (গোপীচন্দ্রের মা), অদুনা ও পদুনা (গোপীচন্দ্রের দুই স্ত্রী), হাড়িপা (গুরু), মীননাথ, গোরক্ষনাথ। |
◈ গোপীচন্দ্রের সন্ন্যাস — কাহিনিসংক্ষেপ
হেরুক বা কুমিরের রাজা ছিলেন মানিকচন্দ্র। তাঁর মৃত্যুর পর রানী ময়নামতী রাজ্যভার গ্রহণ করেন। ময়নামতী ছিলেন একজন সিদ্ধা নারী (যোগিনী)। তিনি তাঁর জাদুবলে জানতে পারেন যে তাঁর একমাত্র পুত্র রাজা গোপীচন্দ্রের আয়ু খুব কম — মাত্র ১৯ বছর বয়সে মারা যাবেন।
ছেলেকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর একটাই উপায় — তাকে যোগসাধনা করে অমর হতে হবে। তাই রানী ময়নামতী ছেলে গোপীচন্দ্রকে আদেশ দেন দুই রূপবতী স্ত্রী (অদুনা ও পদুনা) এবং বিশাল রাজত্ব ছেড়ে হাড়িপা নামক এক গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সন্ন্যাসী হতে। গোপীচন্দ্র প্রথমে রাজি বিধায় হলেও মায়ের কঠোর আদেশে সেই পথে নামেন।
এই পালায় দেখানো হয়েছে কীভাবে একজন রাজাকে সাধারণ সন্ন্যাসীর মতো পথে পথে ঘুরতে হয়, গুরুর জুতো বওয়াসহ নানা লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে সিদ্ধিলাভ করেন।
মূল থিম: নারী ও সংসার মায়ার বাঁধন। একে ছিন্ন করে গুরুর আদেশে সন্ন্যাস গ্রহণই হলো নাথ ধর্মের মূল কথা। |
খ. ময়মনসিংহ গীতিকা
• সংকলক ও সম্পাদক: চন্দ্রকুমার দে (সংগ্রাহক) ও ড. দীনেশচন্দ্র সেন (সম্পাদক)। • প্রকাশকাল: ১৯২৩ সাল — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত। • সংগ্রাহকের পরিচয়: চন্দ্রকুমার দে — নেত্রকোণার এই মানুষটি অসুস্থ শরীর নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পালা গান সংগ্রহ করতেন। • ইংরেজি অনুবাদ: 'Eastern Bengal Ballads' নামে অনূদিত — ভূমিকা লিখেছেন লর্ড রোনাল্ডসে। • অনুবাদ সংখ্যা: বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনূদিত। • পালার সংখ্যা: ১০টি বিখ্যাত পালা। |
◈ ময়মনসিংহ গীতিকার দশটি পালা — কাহিনিসংক্ষেপ
▸ পালা ১: মহুয়া (রচয়িতা: দ্বিজ কানাই)
• চরিত্র: মহুয়া (নায়িকা), নদের চাঁদ (নায়ক), হুমরা বেদে (ভিলেন/পালক পিতা), সুজন (বেদে দলের যুবক)। |
গারো পাহাড়ের পাদদেশে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিল এক অপূর্ব সুন্দরী কন্যা। কিন্তু মাত্র ছয় মাস বয়সে কুখ্যাত ডাকাত ও বেদে সর্দার হুমরা বেদে তাকে চুরি করে নিয়ে যায় এবং নাম রাখে 'মহুয়া'। বেদে পল্লিতেই মহুয়া বড় হয়। যৌবনে পদার্পণ করলে একদিন হুমরা বেদের দল খেলা দেখাতে আসে বামনকান্দা গ্রামে।
এই গ্রামের তরুণ জমিদার ছিলেন নদের চাঁদ। মহুয়ার রূপ দেখে এবং তার দড়ির ওপর হাঁটার খেলা দেখে নদের চাঁদ প্রথম দর্শনেই তার প্রেমে পড়ে যায়। মহুয়াও মনে মনে মন দেয় জমিদার নদের চাঁদকে। রাতে গোপনে তাদের দেখা হতে থাকে। কিন্তু বেদে সর্দার হুমরা একদিন এই প্রেমের কথা জেনে যায়।
মহুয়ার অনুনয়ে হুমরা বেদে নদের চাঁদকে না মেরে রাতের আঁধারে দলবল নিয়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু প্রেমে পাগল নদের চাঁদ রাজ্য-জমিদারী সব ছেড়ে সন্ন্যাসীর বেশে মহুয়ার পিছে চলে পড়ে। শেষ পর্যন্ত হুমরা বেদে মহুয়ার হাতে একটি বিষমাখা ছুরি দিয়ে বলে নদের চাঁদকে খুন করতে। কিন্তু মহুয়া সেই ছুরি দিয়ে নিজের বুকেই আঘাত করে এবং প্রেমিকের চোখের সামনে আত্মাহুতি দেয়। প্রিয়তমার মৃত্যু সইতে না পেরে নদের চাঁদও সেই ঘাতকদের হাতে প্রাণ বিসর্জন দেয়।
❧ ❧ ❧ যথায় পাব কলসী কন্যা যথায় পাব দড়ি। তুমি হও গহীন গাং আমি ডুইবা মরি।। ❧ ❧ ❧ — মহুয়া — ময়মনসিংহ গীতিকা 📝 মহুয়ার বিখ্যাত উক্তি। |
▸ পালা ২: চন্দ্রাবতী (রচয়িতা: নয়ানচাঁদ ঘোষ)
• চরিত্র: চন্দ্রাবতী, জয়ানন্দ (নায়ক), কমলা (মুসলিম নারী), দ্বিজ বংশীদাস (পিতা)। • বিশেষ তথ্য: চন্দ্রাবতী = বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি। |
কিশোরগঞ্জের পাটোয়ারী গ্রামের বিখ্যাত মনসামঙ্গল রচয়িতা দ্বিজ বংশীদাসের একমাত্র কন্যা চন্দ্রাবতী। ছোটবেলা থেকেই অসামান্য বুদ্ধিমতী ও কবিত্বশক্তির অধিকারী। তার শৈশবের খেলার সাথী ছিল এক অনাথ ব্রাহ্মণ বালক জয়ানন্দ। একসাথে খেলাধুলা, পড়াশোনা এবং কবিতা লিখতে লিখতে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেম।
বিয়ের কিছুদিন আগে জয়ানন্দ ঘটনাক্রমে এক মুসলিম রূপসী কন্যা কমলার রূপে মোহিত হয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে কমলাকে বিয়ে করে চলে যায়। বিয়ের দিন বধূবেশে সজ্জিত চন্দ্রাবতী এই খবর শুনে পাথরের মতো নিথর হয়ে যায়। সে সিদ্ধান্ত নেয়, আজীবন কুমারী থেকে শিবের আরাধনা করবে এবং রামায়ণ রচনা করবে।
দিন যায়, মাস যায়। জয়ানন্দের মোহভঙ্গ হয়। বুঝতে পারে কমলার প্রতি তার টান ছিল শুধুই মোহ, তার আত্মার সম্পর্ক চন্দ্রাবতীর সাথেই। অনুতপ্ত জয়ানন্দ পাগলপ্রায় হয়ে ফিরে আসে। একদিন চন্দ্রাবতী যখন মন্দিরে ধ্যানমগ্ন, জয়ানন্দ দরজায় আঘাত করে কিন্তু চন্দ্রাবতী দরজা খোলেনি। জয়ানন্দ মন্দিরের দরজায় সন্ধ্যামালতী ফুল দিয়ে একটি কবিতা লিখে বিদায় নেয়। পরে চন্দ্রাবতী সেই লেখা পড়ে ছুটে যায় ফুলেশ্বরী নদীর তীরে। কিন্তু ততক্ষণে জয়ানন্দ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। চন্দ্রাবতীও বিরহের অনলে পুড়ে শেষ হয়।
চন্দ্রাবতীর রামায়ণের বিশেষত্ব: তাঁর রামায়ণে সীতার দুঃখ-দুর্দশাই প্রধান হয়ে উঠেছে, রামের বীরত্ব নয়। এটি লোকায়ত দৃষ্টিভঙ্গির এক অনন্য উদাহরণ — পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইরে গিয়ে একজন নারীর দৃষ্টিতে রামায়ণ পাঠ। |
▸ পালা ৩: মলুয়া (রচয়িতা: অজ্ঞাত)
• চরিত্র: মলুয়া, চাঁদ বিনোদ (স্বামী), কাজি (ভিলেন)। • থিম: সমাজের লোভ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বুদ্ধিমতী নারীর প্রতিরোধ। |
সাধারণ গরিব কিন্তু সাহসী যুবক চাঁদ বিনোদ শিকার করতে গিয়ে অপরূপ সুন্দরী মলুয়াকে দেখে প্রেমে পড়ে। বহু কষ্টে তারা বিয়ে করে। কিন্তু তাদের সুখের সংসারে আগুন লাগায় স্থানীয় অত্যাচারী কাজি। মলুয়ার রূপে মুগ্ধ হয়ে কাজি চাঁদ বিনোদকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে কারাবন্দি করে এবং মলুয়াকে জোর করে তার প্রাসাদে নিয়ে যায়।
কিন্তু মলুয়া ছিল বুদ্ধিমতী ও সতী নারী। সে কাজিকে কৌশলে বলে নির্দিষ্ট কয়েক মাস ব্রত পালন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজিকে স্পর্শ করতে দেবে না। এই সময়ের মধ্যে মলুয়া কৌশলে কাজির ভাণ্ডার থেকে টাকা চুরি করে, সেই টাকা দিয়ে স্বামীকে জেল থেকে মুক্ত করে এবং কাজির প্রাসাদে আগুন লাগিয়ে স্বামীর সাথে পালিয়ে যায়।
কিন্তু ট্র্যাজেডি শুরু হয় এরপর! সমাজের মাতব্বররা রায় দেয় — যেহেতু মলুয়া কাজির প্রাসাদে রাত কাটিয়েছে, তাই সে আর সতী নয়। শেষ পর্যন্ত স্বামীর সম্মান আর সমাজকে মিথ্যে অপবাদ থেকে মুক্তি দিতে মলুয়া ইচ্ছায় নদীর জলে ডুবে আত্মাহুতি দেয়।
মলুয়া লোকসাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য প্রতিবাদী ও আত্মত্যাগী নারীর প্রতীক।
▸ পালা ৪: দেওয়ানা মদিনা (রচয়িতা: মনসুর বয়াতি)
• চরিত্র: মদিনা, আলাউদ্দিন (স্বামী), দুলাল ও হীরাধর (আলাউদ্দিনের ভাই)। • রচয়িতা বিশেষত্ব: মনসুর বয়াতি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর। তিনি বলেছিলেন — 'আমি না লিখিনু পুঁথি না লিখিনু পাতে / অন্তরে রচিয়া গান গাইলাম সভার মাঝে।' |
বানিয়াচং-এর দেওয়ান বংশের শাসক মারা গেলে তার তিন ছেলে দুলাল, হীরাধর এবং ছোট ছেলে আলাউদ্দিনের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। বড় ভাইদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আলাউদ্দিন বনে পালিয়ে যায়। সেখানে এক সাধারণ কৃষক কন্যা মদিনার সাথে তার পরিচয় হয় এবং তারা বিয়ে করে। মদিনা দেওয়ান বংশের ছেলে আলাউদ্দিনকে নিজের হাতে কাজ শিখিয়ে এক সাধারণ কৃষকের জীবনে মানিয়ে নেয়।
তাদের ঘরে একটি ফুটফুটে পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। এদিকে ভাইয়েরা বুঝতে পারে ছোট ভাইকে ছাড়া রাজ্য চালানো কঠিন। তারা আলাউদ্দিনকে ফিরিয়ে আনতে যায়। শর্ত দেয় — বানিয়াচং-এর দেওয়ান হতে হলে সাধারণ কৃষক কন্যা মদিনাকে তালাক দিতে হবে। আলাউদ্দিন কিছুতেই রাজি হয় না। তখন ভাইয়েরা মদিনার কাছে গিয়ে মিথ্যা গল্প ফাঁদে এবং তাকে বাধ্য করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে, যাতে আলাউদ্দিন তাকে তালাক দিতে বাধ্য হয়। স্বামী পরিত্যক্তা মদিনা এই ধাক্কা সইতে না পেরে কিছুদিন পরই মারা যায়।
❧ ❧ ❧ বাপুজি বাপুজি ব আমি কারে। বাপুজি ঘুমাইয়া রইছে কদমের তলে।। ❧ ❧ ❧ — দেওয়ানা মদিনা 📝 মদিনার শিশুপুত্র যখন তার মাকে জিজ্ঞেস করে — BCS-এ বারবার আসে। |
▸ পালা ৫: কাজলরেখা (রচয়িতা: অজ্ঞাত)
• চরিত্র: কাজলরেখা, সূঁচরাজা, কাঁকণদাসী, শুকপাখি। • ধরন: মূলত একটি রূপকথার পালা। |
এক সওদাগরের কন্যা কাজলরেখা। এক রাজকুমারকে পাওয়া যায়, যার সারা শরীরে ডাইনিরা হাজার হাজার সূঁচ ফুটিয়ে রেখেছিল। একমাত্র কাজলরেখাই পারে সেই সূঁচ তুলে রাজকুমারকে বাঁচাতে। কাজলরেখা দিনরাত না ঘুমিয়ে স্বামীর শরীর থেকে সূঁচ তুলতে থাকে। যখন শেষ দুটি সূঁচ বাকি, তখন সে স্নান করতে যায় — সেই ফাঁকে তার বিশ্বাসঘাতক দাসী কাঁকণদাসী শেষ সূঁচ দুটি তুলে নেয়। রাজকুমার দাসীকেই স্ত্রী ভাবে। শেষমেশ একটি জাদুকরী শুকপাখির মাধ্যমে সত্য প্রকাশ পায় এবং কাজলরেখা তার যথার্থ মর্যাদা ফিরে পায়।
▸ পালা ৬: কঙ্ক ও লীলা (রচয়িতা: দামোদর দাস, রঘুসুত প্রমুখ)
কঙ্ক ছিল এক অনাথ ব্রাহ্মণ বালক। বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এক চণ্ডাল (নিচু জাত) তাকে কুড়িয়ে পায় এবং নিজের সন্তানের মতো বড় করে। কিন্তু এই খবর জানাজানি হলে চণ্ডালকে সমাজচ্যুত করা হয়। নিরুপায় হয়ে চণ্ডাল কঙ্ককে গ্রামের দয়ালু ব্রাহ্মণ গর্গ-এর কাছে রেখে আসে।
গর্গের এক মেয়ে ছিল — লীলা। কঙ্ক ও লীলা একসাথে বড় হয়। কঙ্ক চমৎকার বাঁশি বাজাত এবং কবিতা লিখত। লীলা মুগ্ধ হয়ে তার কবিতা শুনত। তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর প্রেম। কিন্তু সমাজ এই নিষ্কলুষ প্রেমকে মেনে নেয়নি। সমাজের চাপে ও সম্মানের ভয়ে গর্গ একদিন কঙ্কের খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়। শেষমেশ কঙ্ক চিরদিনের জন্য গ্রাম ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। কঙ্কের বিরহে লীলা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ে।
কঙ্ক ও লীলা — সমাজ ও জাতপাতের বিরুদ্ধে লোকসাহিত্যের এক করুণ ট্র্যাজেডি।
▸ পালা ৭: দস্যু কেনারাম (রচয়িতা: কবি চন্দ্রাবতী)
কেনারাম ছিল হাওর অঞ্চলের এক ভয়ংকর দস্যু। একদিন কেনারাম একদল গায়েনকে বন্দি করে মেরে ফেলার নির্দেশ দেয়। গায়েন দলের প্রধান ছিলেন দ্বিজ বংশীদাস (চন্দ্রাবতীর বাবা)। তিনি কেনারামকে বলেন, 'মারার আগে আমাদের শেষ ইচ্ছে পূরণ করো।' কেনারাম রাজি হলে দ্বিজ বংশীদাস সুর করে বেহুলা-লখিন্দরের দুঃখের গান, মনসার মহিমার গান গাইতে শুরু করেন। গানের সুরে পাষাণ দস্যুর হৃদয় গলে যায়। গান শেষ হলে কেনারাম তার সমস্ত অস্ত্র দ্বিজ বংশীদাসের পায়ের কাছে ফেলে দেয় এবং দস্যুবৃত্তি ত্যাগ করে চিরজীবনের জন্য সাধু হয়ে যায়।
মূলত সংগীতের শক্তির এক অবিশ্বাস্য আখ্যান।
▸ পালা ৮: দেওয়ানা ভাবনা, ৯. রূপবতী, ১০. কমলা
দেওয়ানা ভাবনা — প্রেমে পাগল ভাবনার তীব্র ও একনিষ্ঠ প্রেমের বিয়োগান্তক কাহিনি। রূপবতী — অপরূপ সুন্দরী রূপবতীর প্রেম ও আত্মত্যাগের কাহিনি; গ্রামীণ সমাজে নারীর অসহায়ত্ব এবং নৈতিক দৃঢ়তার চিত্র। কমলা — আদর্শ গ্রামীণ নারীর সতীত্ব, সংগ্রাম ও পাতিব্রত্যের গল্প।
🔥 ট্রিকি তথ্য ও BCS বিশেষ নোট • ময়মনসিংহ গীতিকার দশ পালা মনে রাখার ট্রিক: মহ-চন্দ্র-মল-মদ-কাজল-কঙ্ক-দস্যু-ভাব-রূপ-কমলা। • সংকলক ট্রিক: চন্দ্রকুমার দে (নেত্রকোণা) সংগ্রহ + দীনেশচন্দ্র সেন সম্পাদনা = ১৯২৩। • মহুয়ার রচয়িতা: দ্বিজ কানাই — মনে রাখুন। • দেওয়ানা মদিনার রচয়িতা: মনসুর বয়াতি — সম্পূর্ণ নিরক্ষর কবি! • বিখ্যাত উক্তি: "বাপুজি বাপুজি ব আমি কারে / বাপুজি ঘুমাইয়া রইছে কদমের তলে" = দেওয়ানা মদিনা। • 'যথায় পাব কলসী কন্যা...': = মহুয়া পালা। • চন্দ্রাবতী: প্রথম মহিলা কবি + মনসামঙ্গল রচনা করেছিলেন (অসম্পূর্ণ) + দ্বিজ বংশীদাসের মেয়ে। • ময়মনসিংহ গীতিকা ২৩ ভাষায়: বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনূদিত — গুরুত্বপূর্ণ। |
গ. পূর্ববঙ্গ গীতিকা
• সম্পাদক: ড. দীনেশচন্দ্র সেন • প্রকাশকাল: ১৯২৬ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে — মোট ৩ খণ্ডে, ৭১টি পালা। • পার্থক্য: ময়মনসিংহ বাদে অন্যান্য অঞ্চল (নোয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা) থেকে সংগৃহীত পালা। • বিখ্যাত পালা: মলুয়া সুন্দরী, নিজাম ডাকাতের পালা, কাফন চোর, আয়না বিবি, নুরুন্নেহা। • নিজাম ডাকাতের পালা: চট্টগ্রামের বিখ্যাত সুফি সাধক হজরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া কীভাবে একজন ভয়ংকর ডাকাত থেকে সাধকে পরিণত হলেন তা নিয়ে রচিত। |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ লোকগানের শাখাসমূহ বাংলার নানা সুরের ধারা |
ভাওয়াইয়া গান
নামকরণ: 'ভাওয়াইয়া' শব্দের উৎপত্তি নিয়ে দুটি মত — 'ভাব' বা 'ভাও' (আবেগ) থেকে, অথবা উত্তরাঞ্চলের উষ্ণ বাতাস 'বাওয়া' থেকে। মূলত রংপুর, দিনাজপুর, কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি অঞ্চলের মানুষের প্রাণের গান।
বিষয়বস্তু: বিরহ ও প্রেমের গান। গরুর গাড়ি বা মহিষের গাড়ি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করত যারা (গাড়িয়াল বা মহিষাল), তাদের দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে ঘরে থাকা নারীর একাকীত্ব ও বুকের চাপা কান্নাই এর মূল উপজীব্য।
সুরের বৈশিষ্ট্য: 'ভাঙা সুর' — গরুর গাড়ি এবড়োখেবড়ো পথ দিয়ে চলার সময় গাড়িয়ালের গলার সুর ঝাঁকুনিতে কেঁপে কেঁপে ওঠে, এই প্রাকৃতিক কাঁপুনি বা দীর্ঘ টান থেকেই ভাওয়াইয়া সুরের সৃষ্টি।
বিখ্যাত চরিত্র: গাড়িয়াল ভাই (গরুর গাড়ির চালক), মহিষাল (মহিষের চালক) এবং মাউত (হাতির চালক)।
• কিংবদন্তি শিল্পী: আব্বাসউদ্দিন আহমদ — 'বাংলার লোকগানের রাজা' বলা হয় তাঁকে। |
❧ ❧ ❧ ওকিলামাইয়ারে, ওকিলা, কই গেলা তুই পথ ভুলিয়া। গাড়িয়াল ভাই, কত রব আমি পথ চাইয়া রে। ও তোমারে দেইখ্যা প্রাণ জুড়াইতাম আমি।। ❧ ❧ ❧ — ভাওয়াইয়া গান 📝 উত্তরবঙ্গের বিরহের গান — 'ওকিলামাইয়া' শব্দ ভাওয়াইয়ার বিশেষ পরিচয়। |
ভাটিয়ালি গান
নামকরণ: 'ভাটি' শব্দের অর্থ নিম্নমুখী স্রোত। বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, ফরিদপুর ও ঢাকার ভাটি অঞ্চলের মাঝি মাল্লাদের গানই হলো ভাটিয়ালি।
দর্শন: প্রেম, বিরহ এবং দেহতত্ত্বের গান। নদী হলো 'ভবনদী' আর নৌকার কান্ডারি ঈশ্বর।
সুরের বৈশিষ্ট্য: সুর অত্যন্ত উদাস ও দীর্ঘ। শুরুটা খুব চড়া বা উচ্চগ্রামে হয়, এরপর ঢেউয়ের মতো সুর নেমে আসে। এটি একক কণ্ঠে গাওয়ার গান।
• কিংবদন্তি শিল্পী: আবদুল আলীম — 'মাঝি বাইয়া যাও...' গানের অমর শিল্পী। |
বাউল গান
শব্দের উৎপত্তি: সংস্কৃত 'বাতুল' (পাগল/উন্মদ) বা 'ব্যাকুল' থেকে। এরা স্রষ্টার প্রেমে পাগল।
মূল দর্শন (দেহতত্ত্ব): মানব দেহই হলো পবিত্র ব্রহ্মাণ্ড বা ঈশ্বরের বাসস্থান। তারা ঈশ্বরকে মানুষের নিজের ভেতরে ('মনের মানুষ') খোঁজে। বাউলরা কোনো ধর্ম, জাত বা বর্ণ মানে না।
বাদ্যযন্ত্র: একতারা, দোতারা, খমক — প্রধান বাদ্যযন্ত্র।
• ইউনেস্কো স্বীকৃতি: ২০০৫ সালে 'Masterpiece of the Oral and Intangible Heritage of Humanity' ঘোষণা করা হয়। |
গম্ভীরা গান
উৎপত্তি: চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং মালদহ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী লোকগান। শিবের আরেক নাম 'গম্ভীর' বা 'গম্ভীরাঘর' থেকে এর উৎপত্তি।
প্রধান চরিত্র: নানা (বয়স্ক ও ঐতিহ্যবাহী সমাজের প্রতীক) ও নাতি (তরুণ ও আধুনিক চিন্তাধারার প্রতীক)। তাদের সংলাপের মধ্য দিয়ে গান এগিয়ে যায়।
মূল বিষয়বস্তু: সমাজ-সচেতনতামূলক ব্যঙ্গাত্মক গান। সমাজের দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ভেজাল খাবার ইত্যাদি নানা-নাতির হাস্যরসাত্মক সংলাপের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
সারি গান
'সারি' মানে লাইন বা সারিবদ্ধ হওয়া। এটি বাংলার কর্মসংগীত (Work Song)। নৌকাবাইচ, ছাদ টানা, দলবদ্ধভাবে গাছ কাটা বা ফসল কাটার সময় শ্রমিকরা ক্লান্তি দূর করতে এই গান গায়।
পরিবেশনা: গায়কদের দুটি দল থাকে — বয়াতি (মূল গায়ক) এবং দোহার (কোরাস)। সুর অত্যন্ত দ্রুত তালের, চটুল এবং উদ্দীপনামূলক।
জারি গান
নামের অর্থ: ফারসি 'জারি' অর্থ ক্রন্দন, শোক বা বিলাপ করা। এটি বাংলার লোকগীতি বা মার্সিয়া।
পটভূমি: মহররম মাসে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর মর্মান্তিক শাহাদাৎ বরণকে কেন্দ্র করে গাওয়া হয়। কালক্রমে হিন্দু-মুসলিম সবার কাছে এটি জনপ্রিয় লোকগীতিতে পরিণত হয়।
• জারি গানের বিখ্যাত সংগ্রাহক: পল্লীকবি জসীমউদ্দীন — 'জারী গান' গ্রন্থ সংকলন করেছেন। |
লেটো গান
রাঢ় বাংলার (বর্ধমান, বীরভূম) ভ্রাম্যমাণ গীতিনাট্য বা লোকনাট্য।
• কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক: বাল্যকালে কাজী নজরুল ইসলাম লেটো দলের 'ওস্তাদ' ছিলেন এবং 'চাষার সঙ', 'শকুনি বধ' ইত্যাদি পালা রচনা করেন। এখান থেকেই তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটে। |
🔥 ট্রিকি তথ্য ও বিশেষ নোট • গম্ভীরার নানা-নাতি মনে রাখুন: চাঁপাইনবাবগঞ্জ + নানা ও নাতি + সমাজ-ব্যঙ্গ। • লেটো ও নজরুল: নজরুল লেটো দলের ওস্তাদ ছিলেন — BCS-এ বারবার আসে। • আলকাপ: মুর্শিদাবাদ ও রাজশাহী + সরকার (মাস্টার) + চেলে (নারী চরিত্রে কিশোর)। • জারি গানের সংগ্রাহক: পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। • ভাটিয়ালির শিল্পী: আবদুল আলীম। ভাওয়াইয়ার শিল্পী: আব্বাসউদ্দিন আহমদ। |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ বিখ্যাত লোককবি ও লোকশিল্পী লালন • হাসন রাজা • রাধারমণ • শাহ আব্দুল করিম |
লালন ফকির / লালন শাহ
লালন ফকির (লালন শাহ) — বাউল সম্রাট
জন্ম: ১৭৭২ (আনুমানিক) | মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ | ধারা: বাউল
লালন ফকির বাংলার সবচেয়ে বড় বাউল সাধক ও কবি। তাঁর জীবন রহস্যময় — জন্ম, ধর্ম, পরিচয় সব নিয়ে বিতর্ক আছে। কিন্তু তাঁর গান বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরকালীন স্থান পেয়েছে। তিনি কুষ্টিয়া জেলার ছেঁউড়িয়ায় আখড়া প্রতিষ্ঠা করেন।
লালনের গানে আছে দেহতত্ত্ব, মনের মানুষ, জাতিভেদের বিরোধিতা ও মানবতার জয়গান। রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ করে 'হারামণি' পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন এবং নিজেও বাউল সুরে গান লিখেছেন।
• আখড়া: ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া। • ইউনেস্কো: বাউল গান ২০০৫ সালে ইউনেস্কো স্বীকৃতি পায়। • মৃত্যু: ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ — ১১৬ বছর বয়সে (মতান্তরে ১১৮)। • রবীন্দ্রনাথের সংযোগ: রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহ ও 'হারামণি' পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। |
❧ ❧ ❧ সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে। লালন কয় জাতের কী রূপ দেখলাম না এই নজরে।। কেউ মালা কেউ তসবি গলায়। তাইতে কি জাত ভিন্ন হয়? যাওয়া কিংবা আসার বেলায়। জাতের চিহ্ন রয় কার রে।। ❧ ❧ ❧ — লালন ফকির 📝 লালনের বিখ্যাত গান — জাতিভেদের বিরুদ্ধে মানবতার ঘোষণা। |
❧ ❧ ❧ খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়। ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।। আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা। মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা।। ❧ ❧ ❧ — লালন ফকির — খাঁচার ভিতর অচিন পাখি 📝 লালনের সবচেয়ে বিখ্যাত গান। 'অচিন পাখি' = আত্মা বা পরমাত্মা। |
🔥 ট্রিকি তথ্য ও বিশেষ নোট • লালনের ট্রিক: বাউল সম্রাট + ছেঁউড়িয়া কুষ্টিয়া + ১৮৯০ মৃত্যু। • খাঁচার পাখির অর্থ: 'অচিন পাখি' = আত্মা — দেহ হলো খাঁচা। • লালনের ধর্ম বিতর্ক: লালন কোন ধর্মের ছিলেন এই প্রশ্ন নিয়ে পণ্ডিতদের মতভেদ আছে। তিনি নিজে কখনো নির্দিষ্ট ধর্মের পরিচয় দেননি। |
হাসন রাজা
হাসন রাজা — সুনামগঞ্জের মরমি কবি
জন্ম: ২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ | মৃত্যু: ৬ ডিসেম্বর ১৯২২ | ধারা: বাউল-মরমি
হাসন রাজা সিলেটের সুনামগঞ্জের জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথম জীবনে ভোগবিলাসী ছিলেন। কিন্তু এক রাতে স্বপ্নদর্শনের পর তিনি সম্পূর্ণ বদলে যান। হাসন রাজার গানে আছে দেহতত্ত্ব, মৃত্যুচিন্তা, ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের কথা। তাঁর ভাষা সিলেটি উপভাষায় মিশিয়ে লেখা।
❧ ❧ ❧ লোকে বলে বলে রে ঘর বাড়ি ভালা না আমার। কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার।। ভালা করিয়া ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকমু আর। আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার।। ❧ ❧ ❧ — হাসন রাজা 📝 সংসারের অনিত্যতা নিয়ে হাসন রাজার বিখ্যাত গান। |
রাধারমণ দত্ত
রাধারমণ দত্ত — সিলেটের লোককবি
জন্ম: ১৮৩৩ | মৃত্যু: ১৯১৫ | ধারা: বৈষ্ণব-বাউল
রাধারমণ দত্ত সিলেটের একজন বৈষ্ণব-বাউল কবি। তিনি রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে মানুষের আধ্যাত্মিক সাধনার রূপক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ধামাইল গান সিলেটের বিবাহ অনুষ্ঠানে বহুল গীত।
শাহ আব্দুল করিম
শাহ আব্দুল করিম — বাউলসম্রাট / সুনামগঞ্জের কবি
জন্ম: ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯১৬ | মৃত্যু: ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৯ | ধারা: বাউল
শাহ আব্দুল করিম আধুনিক কালের সবচেয়ে বড় বাউল শিল্পী হিসেবে বিবেচিত। সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এবং সারাজীবন হাওর-বাওরের মানুষের কথা লিখেছেন। তাঁর গানে আছে হাওরের পানি, নৌকার জীবন, গরিব মানুষের ব্যথা আর ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসা।
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ লোককাহিনি ও রূপকথা ঠাকুরমার ঝুলি ও বাংলার চিরন্তন গল্প |
লোককাহিনির প্রকারভেদ
• রূপকথা (Fairy Tales): রাক্ষস-রাক্ষসী, ডাইনি, পরী, জাদুকরী শক্তি — অলৌকিক ঘটনার সমাবেশ। শেষে সত্যের জয় ও মিথ্যার পরাজয়। • উপকথা (Fables): পশু-পাখিরা মানুষের মতো কথা বলে ও আচরণ করে। গল্পের শেষে স্পষ্ট নীতিকথা থাকে। • কিংবদন্তি (Legend): ঐতিহাসিক চরিত্র বা ঘটনার ওপর মানুষের কল্পনার প্রলেপ। যেমন: গাজী পীর ও কালু, ঈশা খাঁর লোককাহিনি। • পুরাকথা (Mythology/Myth): সৃষ্টিতত্ত্ব, দেব-দেবী এবং পৃথিবীর উৎপত্তি নিয়ে প্রাচীন মানুষের বিশ্বাস-নির্ভর গল্প। |
ঠাকুরমার ঝুলি — দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
• প্রকাশকাল: ১৯০৭ সাল। • গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার এগুলো 'লিখেছেন' নয় — সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন। গ্রামের বয়স্ক নারীদের মুখ থেকে শুনে তাদের মুখের ভাষায় গ্রন্থভুক্ত করেন। • রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য: "স্বদেশী জিনিস" — রবীন্দ্রনাথ এর ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। • অন্যান্য গ্রন্থ: ঠাকুরদাদার ঝুলি, ঠানদিদির থলে। |
◈ বিখ্যাত রূপকথার কাহিনিসংক্ষেপ
▸ মহুয়া — (ময়মনসিংহ গীতিকায় আছে)
▸ নীলকমল ও লালকমল
রাজার দুই ছেলে — নীলকমল ও লালকমল। নীলকমল সাহসী ও কর্মঠ; লালকমল কিছুটা আরামপ্রিয়। লালকমলের বিয়ের জন্য রাজকন্যাকে পথে রাক্ষস তুলে নিয়ে যায়। নীলকমল ভাইকে সাহায্য করতে যাত্রা শুরু করে। পথে বাঘ, ভালুক ও সাপকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচায় — তারাই পরে তাকে সাহায্য করে। রাক্ষসের প্রাণ মাছের পেটে লুকানো — সেটি ধ্বংস করে রাক্ষসকে বধ করে রাজকন্যাকে উদ্ধার করে।
নৈতিক শিক্ষা: ভ্রাতৃপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠা, কৃতজ্ঞতা এবং অধ্যবসায়ই সফলতার চাবিকাঠি।
▸ কাঞ্চনমালা ও কাঁকনমালা
রাজা তার পুরনো রাখাল বন্ধুকে মন্ত্রী করার প্রতিজ্ঞা করে ভুলে যান। এই প্রতিজ্ঞাভঙ্গের পাপে রাজার সর্বশরীরে সূঁচ ফুটে যায় — তিনি হন 'সূঁচরাজা'। রানি কাঞ্চনমালা রাজ্য পরিচালনা করেন। একদিন একটি মেয়েকে দাসী হিসেবে নেন — কাঁকনমালা। সেই দাসী কাঁকনমালা ছলনা করে রানির গহনা পরে নেয় এবং রানিকে দাসী বানিয়ে দেয়। শেষমেশ রানির হাতের তৈরি পিঠার স্বাদে রাজা সত্য জানতে পারেন।
শিক্ষা: প্রতিজ্ঞাভঙ্গের কুফল; সত্য ও ন্যায়ের জয়।
▸ ডামরু কুমার (ডাঁইমকুমার)
রাজার একমাত্র পুত্র ডামরু কুমার। রাক্ষসী ছলে রানিকে পাথর বানিয়ে প্রাসাদে রাজত্ব করে। রাক্ষসীর চক্রান্তে ডামরু কুমার অন্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু নিজের উপস্থিত বুদ্ধি ও সাহসে সব বাধা জয় করে রাক্ষসীর প্রাণ বিনাশ করে মাকে ফিরে পায়।
প্রতীক: 'ডামর' হলো প্রাণশক্তি ও পুনর্জন্মের প্রতীক।
উপকথা — পশু-পাখির গল্প
▸ বক ও কাঁকড়া
এক বৃদ্ধ বক কেঁদে কেঁদে মাছেদের বলে সরোবর শুকিয়ে যাবে — তাদের বড় দিঘিতে নিয়ে যাবে। মাছেরা বিশ্বাস করে একে একে বকের পিঠে চড়ে যায়, বক উড়ে গিয়ে পাথরে ফেলে খায়। একদিন এক কাঁকড়াও যেতে চায়। উড়তে উড়তে কাঁকড়া দূর থেকে মাছের কাঁটা দেখে বুঝে ফেলে এটি প্রতারণা। তৎক্ষণাৎ কাঁকড়া তার শক্ত দাঁড়া দিয়ে বকের গলা চেপে ধরে — বক মারা পড়ে।
নীতিকথা: লোভ ও প্রতারণার ফল ভালো হয় না।
▸ সিংহ ও খরগোশ
এক বনে ভয়ংকর সিংহ বাস করত — ইচ্ছামতো পশু মারত। পশুরা ভয়ে প্রতিদিন পালা করে একজন তার কাছে যেতে রাজি হলো। এক বুদ্ধিমান ছোট্ট খরগোশের পালা এলে সে ইচ্ছা করে দেরি করে যায়। ক্ষুধার্ত সিংহকে বলে পথে অন্য একটি সিংহ তাকে বাধা দিয়েছে। অহংকারী সিংহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেখতে চায়। খরগোশ তাকে কুয়োর ধারে নিয়ে যায়, জলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে সিংহ লাফিয়ে পড়ে মারা যায়।
নীতিকথা: বুদ্ধির কাছে পশুশক্তির পরাজয় নিশ্চিত; অহংকার বিনাশের মূল।
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ প্রবাদ • ছড়া • ধাঁধা লোকসাহিত্যের আরো তিন অমূল্য ধারা |
খনার বচন
খনা ছিলেন প্রাচীন বাংলার এক কিংবদন্তি নারী। তাঁর আসল নাম লীলাবতী। তিনি প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের পুত্রবধূ। কৃষিকাজ, আবহাওয়া, বৃক্ষরোপণ এবং জ্যোতিষবিদ্যা নিয়ে খনার বচনগুলো রচিত।
• খনার আসল নাম: লীলাবতী। • খনার শ্বশুর: বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির। • বিষয়: কৃষি, আবহাওয়া, জ্যোতিষ ও দৈনন্দিন জীবন। |
বিখ্যাত খনার বচন:
"যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্য রাজার পুণ্য দেশ।" (মাঘ মাসের শেষে বৃষ্টি হলে দেশের ফসল ভালো হয়।)
"শুন শুন ব্যাঙের ডাক, বৃষ্টি হবে ফাক ফাক।" (ব্যাঙের ডাক শুনে বৃষ্টির পূর্বাভাস।)
"আল চাষে মূলা, তার অর্ধেকে তুলা; তার অর্ধেকে ধান, বিনা চাষে পান।"
ডাকের কথা
'ডাক' ছিলেন একজন জ্ঞানী বা জ্যোতির্বিদ। ডাকের কথাগুলো মূলত জীবনদর্শন, নীতিকথা, মানবচরিত্র এবং সমাজ-সংসার সম্পর্কিত।
"যেকায় খায় ধানের শীষ, ভাইয়ে ভাইয়ে অহ-নিশ।" (ধানগাছে পোকা লাগলে ফসল নষ্ট, ভাইয়ে ভাইয়ে কলহে সংসার ধ্বংস।)
সাধারণ প্রবাদ-প্রবচন
• "অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ।" অতিরিক্ত বা অকারণ বিনয় সন্দেহজনক। • "উলুবনে মুক্তা ছড়ানো।" অযোগ্য লোকে মূল্যবান বস্তু প্রদান। • "কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না।" মানুষের জন্মগত স্বভাব সহজে বদলায় না। • "ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার।" যোগ্যতা বা উপকরণ ছাড়া বড় কাজ করতে চাওয়া। • "নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা।" দক্ষতার অভাবে অন্যকে দোষ দেওয়া। • "অতি লোভে তাঁতি নষ্ট।" লোভের কুফল। |
ছড়া
ছড়া বাংলা লোকসাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো ও প্রাণবন্ত ধারা। ছড়ায় কোনো ব্যাকরণের কড়াকড়ি নেই, শুধু অন্ত্যমিল আর শব্দের ঝংকারই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য।
• রবীন্দ্রনাথ ছড়া সম্পর্কে বলেছেন: "বাঙালির মনের আদিমতম প্রকাশ।" তিনি 'ছেলেভুলানো ছড়া' নামে একটি অসামান্য প্রবন্ধ লিখেছেন। |
❧ ❧ ❧ আয় বৃষ্টি ঝেঁপে, ধান দেব মেপে। দুধ দেব বাটি ভরে, মাছ দেব ঝুড়ি ভরে।। ❧ ❧ ❧ — বাংলা লোকছড়া 📝 কৃষিজীবী মানুষের বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা। |
❧ ❧ ❧ খোকা ঘুমাও, পাড়া জুড়াও। বর্গী এলো দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে। খাজনা দেব কীসে।। ❧ ❧ ❧ — বাংলা লোকছড়া 📝 মারাঠা বর্গী আক্রমণের ঐতিহাসিক স্মৃতি বহন করা বিখ্যাত ছড়া। 'বর্গী' = মারাঠা দস্যু (নবাব আলীবর্দী খানের আমলে, ভাস্কর পন্তের নেতৃত্বে ১৭৪২-৫১)। |
ধাঁধা
ধাঁধা হলো রূপক বা প্রতীকের আড়ালে একটি সাধারণ বস্তুকে লুকিয়ে রেখে তাকে খুঁজে বের করতে বলা। লোকসাহিত্যের সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত শাখা।
• উদাহরণ ১: "উপরে বাঘের ছাল, ভেতরে লাল তুষার / খেতে মিষ্টি লাগে ভার।" — লিচু • উদাহরণ ২: "এক গাছে তিন তরকারি।" — সজনে (ফুল, পাতা, ডাঁটা) • উদাহরণ ৩: "কালা গাই, মাঠে চরে / পানি দেখলে, দৌড় মারে।" — জুতো |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ সংগ্রাহক ও গবেষকগণ যাঁদের শ্রমে লোকসাহিত্য বেঁচে আছে |
প্রধান সংগ্রাহক ও গবেষক
যাঁদের শ্রমে ও ঘামে লোকসাহিত্য আজ আমাদের পাঠ্যবইয়ে স্থান পেয়েছে:
১. ড. দীনেশচন্দ্র সেন: ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকার সম্পাদক। বিখ্যাত গ্রন্থ 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য'। তিনিই প্রথম বাংলা লোকসাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন। ২. চন্দ্রকুমার দে: ময়মনসিংহ গীতিকার প্রধান সংগ্রাহক। নেত্রকোণার এই মানুষটি অসুস্থ শরীর নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামে গ্রামে ঘুরে পালা গান সংগ্রহ করতেন। ৩. দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার: ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদাদার ঝুলি, ঠানদিদির থলে ইত্যাদির সংগ্রাহক ও রূপকথার জাদুকর। ৪. মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন: আজীবন গ্রামে গ্রামে ঘুরে লালনসহ অন্যান্য বাউলদের গান সংগ্রহ করে ৮ খণ্ডে প্রকাশ করেন 'হারামণি' নামে। ৫. পল্লীকবি জসীমউদ্দীন: অসংখ্য জারি গান, সারি গান ও মুর্শিদি গান সংগ্রহ করেছেন। বিখ্যাত সংকলন — 'রঙিলা নায়ের মাঝি', 'জারী গান', 'বাঙালীর হাসির গল্প'। ৬. উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী: 'টুনটুনির বই', 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' এর রচয়িতা। পশুপাখির গল্পকে শিশুদের উপযোগী করে লেখার পথিকৃৎ। ৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: লোকসাহিত্য নিয়ে আলোচনা, গবেষণা এবং 'লোকসাহিত্য' (১৯০৭) নামে স্বতন্ত্র প্রবন্ধগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে এই শাখাকে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যান। ৮. ড. আশরাফ সিদ্দিকী: বাংলাদেশের লোকলোর চর্চার অন্যতম প্রধান গবেষক। বিখ্যাত গ্রন্থ 'লোকসাহিত্য', 'Tales from Bangladesh'। ৯. ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ: বাংলাদেশের লোকলোর চর্চার পথিকৃৎ। ১০. ড. মাজহারুল ইসলাম: আধুনিক লোকলোর তত্ত্ববিদ। |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ MCQ প্রশ্নব্যাংক লোকসাহিত্য |
অংশ-১: মূল পরিচয় ও সংগ্রাহক
নং | প্রশ্ন | উত্তর |
1 | 'Folklore' শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন? | উইলিয়াম জে. থমস (১৮৪৬) |
2 | লোকসাহিত্যের প্রাচীনতম রূপ কোনটি? | ছড়া ও ধাঁধা |
3 | বাংলাদেশের লোকসাহিত্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা কোনটি? | গীতিকা (Ballads) |
4 | বাংলা একাডেমির লোকসাহিত্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয় কত সালে? | ১৯৫৫ সাল |
5 | রবীন্দ্রনাথ রচিত লোকসাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধগ্রন্থের নাম কী? | লোকসাহিত্য (১৯০৭) |
6 | রবীন্দ্রনাথ ছড়াকে কী বলেছেন? | বাঙালির মনের আদিমতম প্রকাশ |
7 | ছড়া সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত প্রবন্ধের নাম কী? | ছেলেভুলানো ছড়া |
8 | 'হারামণি' বাউল গানের সংকলনটি কত খণ্ডে প্রকাশিত? | ৮ খণ্ডে |
9 | 'হারামণি'-র সংগ্রাহক কে? | মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন |
10 | 'হারামণি'-র প্রথম খণ্ডে ভূমিকা লিখেছেন কে? | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
অংশ-২: গীতিকা
নং | প্রশ্ন | উত্তর |
1 | ময়মনসিংহ গীতিকা কত সালে প্রকাশিত হয়? | ১৯২৩ সাল |
2 | ময়মনসিংহ গীতিকার প্রধান সংগ্রাহক কে? | চন্দ্রকুমার দে (নেত্রকোণা) |
3 | ময়মনসিংহ গীতিকার সম্পাদক কে? | ড. দীনেশচন্দ্র সেন |
4 | ময়মনসিংহ গীতিকা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় — সত্য না মিথ্যা? | সত্য |
5 | ময়মনসিংহ গীতিকা বিশ্বের কতটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে? | ২৩টি ভাষায় |
6 | 'Eastern Bengal Ballads'-এর ভূমিকা লিখেছেন কে? | লর্ড রোনাল্ডসে |
7 | 'মহুয়া' পালার রচয়িতা কে? | দ্বিজ কানাই |
8 | 'দেওয়ানা মদিনা' পালার রচয়িতা কে? | মনসুর বয়াতি |
9 | 'বাপুজি বাপুজি ব আমি কারে' উক্তিটি কোন পালার? | দেওয়ানা মদিনা |
10 | 'যথায় পাব কলসী কন্যা যথায় পাব দড়ি' — কোন পালার উক্তি? | মহুয়া পালা |
11 | পূর্ববঙ্গ গীতিকা কত সালে প্রকাশিত হয়? | ১৯২৬ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে |
12 | পূর্ববঙ্গ গীতিকায় মোট কতটি পালা আছে? | ৭১টি পালা (৩ খণ্ডে) |
13 | চন্দ্রাবতী পালায় চন্দ্রাবতীর পিতার নাম কী? | দ্বিজ বংশীদাস |
14 | চন্দ্রাবতী পালায় জয়ানন্দ কাকে বিয়ে করেছিল? | কমলা নামে মুসলিম নারীকে |
15 | 'কাজলরেখা' পালায় কাজলরেখার প্রতারক দাসীর নাম কী? | কাঁকণদাসী |
অংশ-৩: লোককবি ও লোকগান
নং | প্রশ্ন | উত্তর |
1 | বাউল গান ইউনেস্কো স্বীকৃতি পায় কত সালে? | ২০০৫ সাল |
2 | লালনের আখড়া কোথায় ছিল? | ছেঁউড়িয়া, কুষ্টিয়া |
3 | লালন ফকির কত সালে মারা যান? | ১৭ অক্টোবর ১৮৯০ |
4 | 'খাঁচার ভিতর অচিন পাখি' গানে 'অচিন পাখি' কীসের প্রতীক? | আত্মা বা জীবাত্মার প্রতীক |
5 | হাসন রাজার জন্মস্থান কোথায়? | সুনামগঞ্জ, সিলেট |
6 | হাসন রাজার গানের ভাষার বিশেষত্ব কী? | সিলেটি উপভাষায় মিশ্রিত |
7 | ভাওয়াইয়ার বিখ্যাত শিল্পী কে? | আব্বাসউদ্দিন আহমদ |
8 | ভাটিয়ালির বিখ্যাত শিল্পী কে? | আবদুল আলীম |
9 | 'লেটো গানের ওস্তাদ' ছিলেন কে? | কাজী নজরুল ইসলাম (বাল্যকালে) |
10 | গম্ভীরা গানের প্রধান দুটি চরিত্র কী? | নানা ও নাতি |
অংশ-৪: রূপকথা ও প্রবাদ
নং | প্রশ্ন | উত্তর |
1 | 'ঠাকুরমার ঝুলি' কত সালে প্রকাশিত হয়? | ১৯০৭ সাল |
2 | 'ঠাকুরমার ঝুলি'র সংগ্রাহক কে? | দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার |
3 | 'ঠাকুরমার ঝুলি' সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ কী বলেছিলেন? | 'স্বদেশী জিনিস' বলে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন |
4 | খনার আসল নাম কী? | লীলাবতী |
5 | খনার শ্বশুর কে ছিলেন? | বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির |
6 | 'বর্গী এলো দেশে' ছড়ায় 'বর্গী' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? | মারাঠা দস্যুদের |
7 | 'নাচতে না জানলে উঠান বাঁকা' প্রবাদের অর্থ কী? | দক্ষতার অভাবে অন্যকে দোষ দেওয়া |
8 | নাথ গীতিকার প্রধান পালার নায়কের নাম কী? | গোপীচন্দ্র |
9 | গোপীচন্দ্রের মায়ের নাম কী? | ময়নামতী |
10 | মনসুর বয়াতির বিশেষত্ব কী? | তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর কবি |
✾ বাংলা লোকসাহিত্য ✾ চূড়ান্ত ট্রিক শীট ও বিশেষ তথ্য লোকসাহিত্য — BCS চূড়ান্ত প্রস্তুতি |
🔥 ট্রিকি তথ্য ও বিশেষ নোট ★ চূড়ান্ত ট্রিক শীট : • 'Folklore' প্রথম ব্যবহার: উইলিয়াম থমস, ১৮৪৬, অ্যাথেনিয়াম পত্রিকায় • ময়মনসিংহ গীতিকা: ১৯২৩ + চন্দ্রকুমার দে (সংগ্রহ) + দীনেশচন্দ্র সেন (সম্পাদনা) + ১০ পালা + ২৩ ভাষায় অনূদিত। • পূর্ববঙ্গ গীতিকা: ১৯২৬-৩২ + দীনেশচন্দ্র সেন + ৩ খণ্ড + ৭১ পালা। • চন্দ্রাবতী: বাংলার প্রথম মহিলা কবি + দ্বিজ বংশীদাসের মেয়ে + জয়ানন্দ প্রতারণা করেছিল। • মহুয়া: দ্বিজ কানাই + মহুয়া-নদের চাঁদ-হুমরা বেদে। • দেওয়ানা মদিনা: মনসুর বয়াতি (নিরক্ষর কবি) + 'বাপুজি বাপুজি ব আমি কারে...' • লালন: বাউল সম্রাট + ছেঁউড়িয়া + ১৮৯০ মৃত্যু + ইউনেস্কো ২০০৫। • নজরুল ও লেটো: কাজী নজরুল ইসলাম লেটো দলের ওস্তাদ ছিলেন। • খনার আসল নাম: লীলাবতী। শ্বশুর = বরাহমিহির। • ঠাকুরমার ঝুলি: দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার + ১৯০৭ + 'স্বদেশী জিনিস' (রবীন্দ্রনাথ)। • হারামণি: মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন + ৮ খণ্ড + রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা (প্রথম খণ্ডে)। • গম্ভীরা: চাঁপাইনবাবগঞ্জ + নানা ও নাতি + সমাজ-ব্যঙ্গ। • আব্বাসউদ্দিন: বাংলার লোকগানের রাজা + ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি। |
অজানা কিন্তু -এ আসার মতো তথ্য: ১. মনসুর বয়াতির অক্ষরজ্ঞান: 'দেওয়ানা মদিনা' পালার রচয়িতা মনসুর বয়াতি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরক্ষর — লোকসাহিত্যের স্রষ্টারা পুঁথিগত বিদ্যায় নয়, জীবনমুখী বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। ২. চন্দ্রাবতীর রামায়ণে নারীদৃষ্টি: চন্দ্রাবতীর রামায়ণে সীতার দুঃখই প্রধান, রামের বীরত্ব নয় — পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বাইরে গিয়ে নারীর দৃষ্টিতে রামায়ণ পাঠ। ৩. লোককাহিনির 'টাইপ চরিত্র': লোকসাহিত্যের চরিত্রগুলো 'Type Character' — ভালো মানুষ সবসময় ভালো, খারাপ মানুষ সবসময় খারাপ। ৪. 'বর্গী এলো দেশে' ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: নবাব আলীবর্দী খানের আমলে (১৭৪২-১৭৫১) ভাস্কর পন্তের নেতৃত্বে মারাঠা বর্গীদের বাংলা আক্রমণের ঐতিহাসিক পটভূমি এই ছড়ায় ধরা আছে। ৫. সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ ও আলকাপ: ঔপন্যাসিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ একসময় আলকাপ দলের 'মাস্টার' ছিলেন, যা তাঁর 'মায়া মৃদঙ্গ' উপন্যাসে ফুটে উঠেছে। ৬. ময়মনসিংহ গীতিকার 'লোকসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রত্ন': ময়মনসিংহ গীতিকাকে বাংলা লোকসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রত্ন বলা হয়। ৭. মলুয়া পালার সম্পাদনা: মলুয়া পালার রচয়িতা অজ্ঞাত — কেউ কেউ মনে করেন চন্দ্রাবতী এটির সম্পাদনা করেছিলেন। |
❧ মাটির গান, মানুষের প্রাণ ❧
লালনের মতো সত্য খুঁজুন — বাংলার লোকসাহিত্য চিরকাল আপনার সাথে