রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Chapter Activity

Rating
New / 5
Reviews
0
Read Sessions
0
Readers
0

বাংলা সাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কবিগুরুবিশ্বকবিগুরুদেব

মে ১৮৬১ — ৭ আগস্ট ১৯৪১

আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ

তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূমিকা: যাঁকে নিয়ে শুরু করতে হয়

বাংলা সাহিত্যের কোনো অধ্যাপক যখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি লিখতে বসেন, তিনি সম্ভবত খানিকক্ষণ চুপ করে বসে থাকেনকারণ যাঁর সম্পর্কে তিনি লিখবেন, তিনি একজন মানুষ মাত্র ননতিনি বাংলা সাহিত্য নিজেইরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দিয়ে বাংলা সাহিত্যের কথা বলা যায় না — এ যেন গঙ্গাকে বাদ দিয়ে ভারতবর্ষের ভূগোল রচনা করার মতো

আশ্চর্যের কথা, এই মানুষটি একই জীবনে কতগুলো মানুষ ছিলেন তা ভেবে দেখলে রীতিমতো বিস্ময় জাগেতিনি কবিপঞ্চাশটিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেনতিনি ঔপন্যাসিকতেরোটি উপন্যাসের রচয়িতাতিনি ছোটগল্পকারবাংলা ছোটগল্পের জন্ম তাঁর হাতেইতিনি নাট্যকারআটত্রিশটি নাটক রচনা করেছেনতিনি সংগীতস্রষ্টাদু'হাজারের বেশি গান লিখেছেন এবং সবগুলোতেই নিজে সুর দিয়েছেনতিনি প্রাবন্ধিকসমাজ থেকে দর্শন, রাজনীতি থেকে শিল্পতত্ত্ব, কোনো বিষয় বাদ যায়নিতিনি চিত্রশিল্পীদু'হাজারের কাছাকাছি ছবি এঁকেছেনতিনি দার্শনিক, শিক্ষাব্রতী, সমাজচিন্তক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পীতালিকা এখানেই শেষ নয়

আর শুধু সংখ্যাতে এই বিশালতা ধরা যায় নাগুণে-মানে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি বিশ্বসাহিত্যের সর্বোচ্চ চূড়াকে স্পর্শ করে। ১৯১৩ সালে গীতাঞ্জলির জন্য যখন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন এশিয়া মহাদেশের জন্য সেটা ছিল গর্বের প্রথম মুহূর্ততিনিই হলেন প্রথম এশীয় এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মানুষ যিনি সাহিত্যে নোবেল পেলেনভাবুন একবার, একশো বছরেরও বেশি পেরিয়ে গেছেসারা বিশ্বে কত শত কত হাজার লেখক জন্মেছেন, কিন্তু এই বাঙালি কবির মতো মাপের মানুষ কতজন এসেছেন?

সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম এশীয় ব্যক্তিরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯১৩।নোবেল ফাউন্ডেশন

দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাপৃথিবীর ইতিহাসে এমন উদাহরণ আর নেইভারতের 'জনগণমন' আর বাংলাদেশের 'আমার সোনার বাংলা' — এই দুই দেশই তাঁর কণ্ঠে নিজেদের পরিচয় খুঁজে পেয়েছেতবু এই বিশাল মানুষটি ছিলেন গভীরভাবে একাজীবনে অনেক প্রিয়জন হারিয়েছেনস্ত্রী, কন্যা, পুত্রকিন্তু কখনো ভেঙে পড়েননিবরং প্রতিটি শোককে কবিতায়, গানে, ছবিতে রূপান্তর করেছেনএই ক্ষমতাই তাঁকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করেছে

এই অধ্যায়ে আমরা তাঁকে দেখব ছাত্রের চোখেজানব তাঁর জীবন, তাঁর পরিবার, তাঁর শিক্ষা, তাঁর সাহিত্যকর্মপ্রতিটি বড় উপন্যাসের কাহিনি বলবপ্রধান নাটকগুলোর কথা বলববিখ্যাত কবিতাগুলোর কথা বলবএবং পরীক্ষায় যেসব তথ্য আসেসেগুলোও আলাদা করে চিহ্নিত করবআশা করি, পড়া শেষ করে আপনার মনে হবেকবিগুরুকে একটু ছোঁয়া গেল

জোড়াসাঁকো: যে বাড়িতে একটি যুগ জন্মেছিল

ঠাকুরবাড়ির ঐতিহ্য

রবীন্দ্রনাথের কথা বলতে গেলে শুরুটা করতে হবে তাঁর জন্মস্থান দিয়েউত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো, ৬ নম্বর দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের সেই বিখ্যাত ঠাকুরবাড়িসেই সময় কলকাতার ভৌগোলিক মানচিত্রে দুটি ভাগ ছিলদক্ষিণে 'হোয়াইট টাউন' যেখানে ইউরোপীয়রা থাকতেন, আর উত্তরে 'ব্ল্যাক টাউন' যেখানে বাঙালিরাজোড়াসাঁকো ছিল সেই ব্ল্যাক টাউনের অংশকিন্তু সাদা-কালোর সেই বিভাজন ভেঙে যে বাড়িটি সারা পৃথিবীর কাছে আলোর প্রতীক হয়ে উঠল, সে এই ঠাকুরবাড়িই

ঠাকুরবাড়ির গৌরব শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুরের আমলেব্যবসায় তিনি এমন প্রতাপশালী ছিলেন যে লোকে তাঁকে ডাকত 'প্রিন্স দ্বারকানাথ'। জাহাজব্যবসা, কয়লাখনি, নীলকুঠি, ব্যাংকিংতাঁর ব্যবসার পরিধি ছিল ব্যাপকতিনিই সম্ভবত প্রথম বাঙালি যিনি ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে রানি ভিক্টোরিয়ার সাথে সাক্ষাকরেছিলেনসেই দ্বারকানাথের পুত্র ছিলেন দেবেন্দ্রনাথপরে যিনি 'মহর্ষি' উপাধিতে ভূষিত হন

দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন এক অন্য ধরনের মানুষপিতা যেখানে ব্যবসায় নাম করেছিলেন, তিনি সেখানে আত্মার পথে হাঁটলেনরাজা রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজের নেতৃত্ব এসে পড়ল তাঁরই কাঁধে। 'মহর্ষি' উপাধি পেলেনধর্ম, ধ্যান, পরমেশ্বর-চিন্তাএসব নিয়ে তিনি জীবন কাটাতেনতিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতা

পরিবারভাইবোন

দেবেন্দ্রনাথসারদা দেবীর সংসারে চৌদ্দটি সন্তানরবীন্দ্রনাথ ছিলেন কনিষ্ঠতমঅর্থাচৌদ্দ ভাইবোনের শেষজনএই বিশাল পরিবারের প্রতিটি সদস্যই কোনো না কোনো ক্ষেত্রে অসাধারণ ছিলেনবড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ছিলেন কবি, দার্শনিকগণিতজ্ঞদ্বিতীয় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ভারতের প্রথম ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তাঅর্থাব্রিটিশ আমলে এই সর্বোচ্চ চাকরিতে প্রথম যিনি বাঙালি হিসেবে প্রবেশাধিকার পেলেন, তিনিইমেজোদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারীগান, নাটক, ছবি, ভাষাচর্চা সবেতে দক্ষতিনিই কিশোর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-প্রতিভাকে প্রথম চিনেছিলেন

ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও কম যান নাবোন স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিকজ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী কাদম্বরী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে কাছের মানুষ — 'নতুন বৌঠান'। কিশোর কবির প্রথম পাঠিকা, প্রথম সমালোচক, প্রথম প্রেরণাসব তিনিইদুর্ভাগ্যবশত কাদম্বরী দেবী মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেনসেই শোক রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে

ঠাকুরপরিবারের পরিচয়পত্রপিতামহ: দ্বারকানাথ ঠাকুর ('প্রিন্স দ্বারকানাথ')। পিতা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (মহর্ষি, ব্রাহ্মসমাজের প্রধান)। মাতা: সারদা দেবীচৌদ্দ ভাইবোনের কনিষ্ঠউল্লেখযোগ্য ভাইবোন: দ্বিজেন্দ্রনাথ (কবি), সত্যেন্দ্রনাথ (প্রথম ভারতীয় আইসিএস), জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী দেবী (প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক)।

জন্ম: ২৫ বৈশাখ

১৮৬১ সালেরমেবাংলা ক্যালেন্ডারে ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখসেদিন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে দেবেন্দ্রনাথ-সারদার কোলে এল চৌদ্দ নম্বর সন্তাননাম রাখা হলো 'রবীন্দ্রনাথ' — অর্থ 'সূর্যের অধিপতি'। কে জানত, একদিন এই নামটিই বাংলা সাহিত্যের সূর্য হয়ে উঠবে! আজও বাঙালি মাত্রেই '২৫শে বৈশাখ' শুনলে এক বিশেষ আবেগ অনুভব করেনবাংলায় বছরে দুটি দিন বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয়পয়লা বৈশাখ আর পঁচিশে বৈশাখ

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: জন্ম: ৭ মে ১৮৬১ (২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ)। মৃত্যু: ৭ আগস্ট ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)। দুই তারিখেই '৭' আছেমনে রাখার সহজ চাবি

শৈশবশিক্ষা: যে বালক স্কুল ছেড়ে কবি হলো

ভৃত্যরাজক তন্ত্র

ধনী ঠাকুরবাড়িতে জন্ম নিয়েও রবীন্দ্রনাথের শৈশব ছিল আশ্চর্যজনক বদ্ধকঠিনতিনি নিজেই পরে এই পর্বটিকে বলেছেন — 'ভৃত্যরাজক তন্ত্র'। অর্থাভৃত্যদের শাসনে কাটানো এক রাজত্বকেন এমন হলো? কারণ বাবা দেবেন্দ্রনাথ প্রায়ই ঘরে থাকতেন নাহিমালয়, ইংল্যান্ড, উত্তর ভারতকোথাও না কোথাও ভ্রমণে থাকতেনবড় ভাইবোনেরা যে যার জগতে ব্যস্তমা সারদা দেবীও ছোটছেলের দিকে আলাদা করে নজর দেওয়ার সময় পেতেন নাচৌদ্দ ছেলেমেয়ের দেখাশোনা করা সহজ নয়

ফলে ছোট রবীন্দ্রনাথের জগহয়ে উঠল ভৃত্যদেরআর সেই ভৃত্যরা ছিলেন কঠোর শাসনকর্তাতিনি পরে স্মৃতিকথায় লিখেছেনখেতে দিতে চাইতেন না বেশি, কারণ ছেলেটি যেন বেশি জ্বালাতন না করেকখনো জলের পাত্রে মাথা ডুবিয়ে রাখতেনশ্যাম নামের একজন চাকর তো একটা গণ্ডি কেটে দিতেন সিমেন্টের মেঝেতেসেই গণ্ডির বাইরে বের হলে রামায়ণের রাবণের মতো ডাকাতেরা ধরে নিয়ে যাবেএই ভয় দেখাতেনবালক রবীন্দ্রনাথ ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই গণ্ডির ভেতরে বসে থাকতেন

কিন্তু এই বদ্ধ পরিবেশই বোধহয় তাঁর মধ্যে প্রকৃতির প্রতি অনন্ত আকর্ষণ জাগিয়ে দিয়েছিলজানালা দিয়ে আকাশ দেখতেন, পাশের ঝিল দেখতেন, মেঘ-বৃষ্টি-রোদ দেখতেনবাইরে যাওয়ার অনুমতি ছিল নাতাই প্রকৃতি হয়ে উঠল কল্পনার সঙ্গীতাঁর কাব্যে যে প্রকৃতিসে প্রকৃতি পাঠ্যপুস্তকের নয়, সে প্রকৃতি বদ্ধ বালকের কল্পনায় গড়া

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: শৈশবের দুটি বড় ক্ষতিচৌদ্দ বছর বয়সে মা সারদা দেবীর মৃত্যু (১৮৭৫), পঁচিশ বছর বয়সে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা (১৮৮৪)। এই দুই শোক রবীন্দ্রসাহিত্যকে গভীরভাবে রূপ দিয়েছে

স্কুলের সঙ্গে যুদ্ধ

শিক্ষার ব্যাপারটিতে রবীন্দ্রনাথ একটি অদ্ভুত ছাত্র ছিলেনস্কুল তাঁকে কখনোই ধরে রাখতে পারেনিপ্রথমে গেলেন ওরিয়েন্টাল সেমিনারিতেমন বসল নাগেলেন নর্ম্যাল স্কুলেমন বসল নাবেঙ্গল অ্যাকাডেমি, সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলএকে একে ঘুরলেনকোথাও তিনি স্থিত হতে পারলেন নাশেষে স্কুলে যেতেই অস্বীকার করলেনবাড়িতেই গৃহশিক্ষকের কাছে শুরু হলো শিক্ষা

ভাবতে অবাক লাগেযাঁকে আমরা বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক বলে মানি, তিনি কখনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেননিকোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সার্টিফিকেট দিয়ে 'শিক্ষিত' সিলমোহর দেয়নিঅথচ পরে এই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পৃথিবীর বহু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট দিয়েছেজীবনই তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল

১৮৭৩ সালেযখন রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র বারোহলো উপনয়নতারপর পিতা দেবেন্দ্রনাথ পুত্রকে নিয়ে বের হলেন এক দীর্ঘ ভ্রমণেপ্রথমে শান্তিনিকেতনতারপর অমৃতসরসেখানে স্বর্ণমন্দিরে শিখদের উপাসনা পদ্ধতি দেখলেন কিশোর রবিশেষে গেলেন ডালহৌসির কাছে বক্রোটায়সেখানকার বাংলোয় বসে পিতার কাছে শিখলেন সংস্কৃত ব্যাকরণ, ইংরেজি, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, কালিদাসের কাব্য, উপনিষদ্‌। এই ভ্রমণই তাঁর প্রকৃত শিক্ষাতিনি বুঝে ফেলেছিলেনশিক্ষা মানে বইয়ের পাতা গেলা নয়, প্রকৃতির কোলে গিয়ে জীবনকে অনুভব করা

ব্যারিস্টারি পড়তে লন্ডনে

১৮৭৮ সালবয়স সতেরোপরিবার ঠিক করলরবীন্দ্রনাথকে ইংল্যান্ডে পাঠানো হবে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্যবড়ভাই সত্যেন্দ্রনাথের পরিবারের সঙ্গে গিয়ে প্রথমে উঠলেন ব্রাইটনেসেখানে স্কুলে গেলেন কিছুদিনতারপর ১৮৭৯ সালে গেলেন লন্ডনেইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে আইন বিদ্যা পড়তে শুরু করলেন

কিন্তু তাঁর মন আইনে বসল নাআইন তাঁকে আকৃষ্ট করল নাবরং তিনি লন্ডনের নানা গান-বাজনার আসরে যেতে লাগলেনশেক্সপিয়ার পড়তে লাগলেনইংরেজ সংগীতের সঙ্গে পরিচয় হলোইংরেজ পরিবারের জীবনযাত্রা দেখলেনপরিবারের ধারণা ছিলছেলেটি বুঝি ইংরেজি জগতে মিশে যাবে, ব্যারিস্টার হয়ে দেশে ফিরবেকিন্তু রবীন্দ্রনাথ মাত্র দেড় বছর সেখানে কাটিয়ে ১৮৮০ সালে ফিরে এলেনকোনো ডিগ্রি না নিয়েইদাদা সত্যেন্দ্রনাথ চটেছিলেনকিন্তু ছোট ভাইটি জানত, তার পথ অন্যদিকে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথ কখনো ব্যারিস্টার হননি, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিও অর্জন করেননিঅথচ তিনিই হলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গুরুশিক্ষা যে ডিগ্রিতে নয়, এর প্রমাণ তিনিই

বিবাহজীবনপদ্মাপাড়ের জীবন

ভবতারিণী থেকে মৃণালিনী

১৮৮৩ সালরবীন্দ্রনাথের বয়স বাইশঠাকুরবাড়ির পক্ষ থেকে তাঁর বিয়ে ঠিক করা হলো এক দরিদ্র পিরালি ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যার সাথেনাম ভবতারিণীবয়স মাত্র দশ! তখনকার দিনে এমন বিয়ে অস্বাভাবিক ছিল নাকিন্তু আজকের বিচারে বিস্ময়করবিবাহের পর ভবতারিণীর নাম পরিবর্তন করে রাখা হলো 'মৃণালিনী' — পদ্মফুলঠাকুরবাড়িতে তাঁকে আদর করে বলা হতো 'ছোটবৌ'।

রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনী দম্পতির সংসারে এলো পাঁচটি সন্তানমাধুরীলতা (বেলা), রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরাশমীন্দ্রনাথকিন্তু বিধি বামএই পরিবারের সবাই অকালে চলে যেতে লাগলেন। ১৯০২ সালে স্ত্রী মৃণালিনী মারা গেলেনমাত্র উনত্রিশ বছর বয়সেতখন রবীন্দ্রনাথের বয়স একচল্লিশপরের বছর ১৯০৩ সালে কন্যা রেণুকা যক্ষ্মায় মারা গেলেন। ১৯০৫ সালে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। ১৯০৭ সালে কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ। ১৯১৮ সালে বড় কন্যা মাধুরীলতা

পাঁচ বছরের ভেতরে স্ত্রী, কন্যা, পিতাপুত্রএই চারটি প্রাণ হারানো একটি মানুষের পক্ষে কী ভয়ংকর! অথচ এই সময়েই তিনি লিখছেন গীতাঞ্জলি, খেয়া, গীতিমাল্যযা তাঁকে নোবেল এনে দিয়েছিলশোককে কী করে রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে রূপান্তরিত করতেনসেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় রহস্য

রবীন্দ্রনাথের পরিবারে শোকমৃণালিনী দেবীর মৃত্যু (১৯০২), কন্যা রেণুকার মৃত্যু (১৯০৩), পিতা দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যু (১৯০৫), পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু (১৯০৭), কন্যা মাধুরীলতার মৃত্যু (১৯১৮)। গীতাঞ্জলি (১৯১০) এই শোকপর্বের ফসল

পদ্মার বজরায় জমিদারি

১৮৯০ সালপরিবারের সিদ্ধান্তে রবীন্দ্রনাথের কাঁধে পড়ল ঠাকুরবাড়ির জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্বঠাকুর পরিবারের জমিদারি ছিল তিনটি জায়গায়শিলাইদহ (এখনকার বাংলাদেশের কুষ্টিয়া), শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) ও পতিসর (নওগাঁ)। অর্থাপূর্ববঙ্গের সবচেয়ে উর্বর জনপদে। 'জমিদার বাবু' বলে ডাকতেন প্রজারাতাঁদের অবাক করে এই জমিদার বাবু কঠোর ছিলেন নাবরং প্রজাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন, কথা বলতেন, কষ্টের কথা শুনতেন

শিলাইদহে ঠাকুরবাড়ির ছিল একটি ঢাকাই বজরানাম 'পদ্মা'। সেই বিশাল কাঠের নৌকায় চড়ে রবীন্দ্রনাথ পদ্মা, যমুনা, ইছামতীর জলে ঘুরে বেড়াতেনএক জমিদারি থেকে আরেক জমিদারিআজ শিলাইদহ, কাল শাহজাদপুর, পরশু পতিসরএই বজরাটিই হয়ে উঠল তাঁর ভাসমান লেখার ঘর

এই দশটি বছর — ১৮৯০ থেকে ১৯০১ — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে উর্বর সময়এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ লিখলেন উনষাটটি ছোটগল্প! 'কাবুলিওয়ালা', 'পোস্টমাস্টার', 'ছুটি', 'শাস্তি' — এসব অমর গল্প পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবন থেকে নেওয়া। 'সোনার তরী' (১৮৯৪), 'চিত্রা' (১৮৯৬), 'কথাকাহিনী' — এই কাব্যগ্রন্থগুলোওসময়েরএক কথায় বলা যায়, পদ্মার পাড়ে না গেলে আমরা যে রবীন্দ্রনাথকে চিনি, সেই রবীন্দ্রনাথের জন্ম হতো না

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: পদ্মাপাড়ের জীবন (১৮৯০–১৯০১) — রবীন্দ্রসাহিত্যের 'গ্রামীণ পর্ব'। এই দশ বছরে তিনি ৫৯টি ছোটগল্প লিখেছেনবাংলা ছোটগল্পের জন্ম এই পর্বেই

শান্তিনিকেতন: এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন

পিতার আশ্রম থেকে পুত্রের বিদ্যালয়

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরের কাছে এক রুখু-শুকনো জনপদযেখানে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ, কয়েকটি তালগাছ, লাল মাটির পথ। ১৮৬৩ সালে পিতা দেবেন্দ্রনাথ এই জায়গায় একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেননাম দিয়েছিলেন 'শান্তিনিকেতন'। সেই আশ্রমে তিনি ধ্যান করতে আসতেন

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ পিতার সেই আশ্রমকে রূপ দিলেন একটি বিদ্যালয়েনাম রাখলেন 'ব্রহ্মচর্যাশ্রম'। মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে শুরু হলোপ্রথম ছাত্রদের একজন ছিলেন তাঁরই পুত্র রথীন্দ্রনাথকিন্তু ছোট্ট সংখ্যা দেখে অবাক হবেন নারবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য ছিল গুণমান, সংখ্যা নয়

কেন তিনি এই বিদ্যালয় গড়লেন? কারণ তিনি নিজে স্কুলে যেতে পারেননিবদ্ধ ক্লাসরুমের শাসনে তাঁর মন বসেনিতাঁর বিশ্বাস ছিলশিক্ষা হতে হবে আনন্দময়, প্রকৃতির কোলেবিদ্যালয় হতে হবে এমন এক জায়গা, যেখানে ছাত্র আসবে স্বেচ্ছায়, পড়বে মন দিয়েতাই শান্তিনিকেতনে ক্লাস হতো গাছের নিচে, বটতলায়ছাত্ররা ফুল-পাতা দিয়ে ক্লাসঘর সাজাতেনসকালে প্রার্থনা, তারপর পড়াশোনা, বিকেলে গান-নাচ-অভিনয়এক স্বপ্নের শিক্ষাব্যবস্থা

বিশ্বভারতী: যেখানে পৃথিবী এক বাসায়

১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনের সেই ব্রহ্মচর্যাশ্রম রূপান্তরিত হলো এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়েনাম 'বিশ্বভারতী'। নাম থেকেই বোঝা যায় উদ্দেশ্যশুধু ভারত নয়, সারা পৃথিবী এসে এখানে মিলবেনীতিবাক্য রাখা হলো সংস্কৃতে — 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্'। অর্থযেখানে সমগ্র বিশ্ব এক বাসায় এসে মিলিত হয়এক বাসায়অর্থাসব ভেদাভেদ ভুলে এক হয়েএই দর্শনই বিশ্বভারতীর প্রাণ

নোবেল পুরস্কারের পুরো অর্থইআট হাজার পাউন্ডের কাছাকাছিরবীন্দ্রনাথ ব্যয় করেছিলেন বিশ্বভারতীর কাজেএই বিশ্ববিদ্যালয়ই হয়ে উঠল তাঁর সবচেয়ে আদরের সন্তানচীনের তাও য়ুজান, জাপানের ওকাকুরা, জার্মানির সিলভাঁ লেভিপৃথিবীর নানা দেশের পণ্ডিত এখানে এসে শিক্ষকতা করেছেনবিশ্বভারতী হয়ে উঠল প্রকৃতই এক 'বিশ্ব' — ভারতী মানে জ্ঞানের দেবী

শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠাপিতা দেবেন্দ্রনাথ ১৮৬৩ সালে আশ্রম গড়েন; রবীন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে ব্রহ্মচর্যাশ্রম বিদ্যালয় চালু করেন। ১৯২১ সালে তা রূপান্তরিত হয় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েনীতিবাক্য: 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্'।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: পরীক্ষায় বারবার আসেশান্তিনিকেতন ব্রহ্মচর্যাশ্রম: ১৯০১। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়: ১৯২১। নীতিবাক্য: 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্'। অবস্থান: পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে

গীতাঞ্জলি, নোবেল, এবং বিশ্বনাগরিকত্ব

গীতাঞ্জলির জন্ম

১৯১০ সালরবীন্দ্রনাথের তখন বয়স উনপঞ্চাশজীবনের অর্ধেকেরও বেশি পেরিয়ে গেছেনস্ত্রী, কন্যা, পিতা, পুত্রসবাইকে হারিয়েছেন গত আট বছরেএই গভীর শোকধ্যানের মধ্য থেকেই বেরিয়ে এল 'গীতাঞ্জলি' — গানের অঞ্জলিএই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো পরমেশ্বরের কাছে নিবেদিতকিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের ঈশ্বরের কাছে নয়সর্বজনীন এক পরমাত্মার কাছে

দুই বছর পরে, ১৯১২ সালে, রবীন্দ্রনাথ চিকিৎসার জন্য তৃতীয়বার ইংল্যান্ডে গেলেনসঙ্গে নিয়ে গেলেন গীতাঞ্জলির কিছু কবিতার ইংরেজি অনুবাদযা তিনি নিজেই করেছিলেন, পদ্যের মূল রস বজায় রেখে গদ্যেলন্ডনে এক বন্ধুর বাড়িতে বিখ্যাত আইরিশ কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েটসকে এই কবিতা পড়ে শোনালেনইয়েটস স্তব্ধ হয়ে গেলেনবললেনএমন কবিতা পশ্চিমে আজ লেখা হচ্ছে না

ইয়েটস নিজের হাতে গীতাঞ্জলির ইংরেজি সংস্করণের ভূমিকা লিখে দিলেন। ১৯১২ সালে লন্ডনের 'ইন্ডিয়া সোসাইটি' প্রকাশ করল 'Song Offerings' — ইংরেজি গীতাঞ্জলিমাত্র সাড়ে সাতশো কপি ছাপা হয়েছিল প্রথমেকিন্তু সেই বই লন্ডনের সাহিত্যজগতে ঝড় তুলে দিলইজরা পাউন্ড, রবার্ট ব্রিজেস, এজরা পাউন্ডসবাই মুগ্ধ

১৯১৩: নোবেল পুরস্কার

১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বরকলকাতার শান্তিনিকেতনরবীন্দ্রনাথ একটি টেলিগ্রাম পেলেনসুইডিশ অ্যাকাডেমি থেকেতাঁকে দেওয়া হয়েছে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার! গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের জন্যনোবেল কমিটি তাঁর কাব্যগ্রন্থকে বর্ণনা করেছিল 'গভীরভাবে সংবেদনশীল, উজ্জ্বলসুন্দর কাব্যগ্রন্থ' রূপে

ছিল ইতিহাসের এক মুহূর্তসাহিত্যে নোবেল পুরস্কার চালু হয়েছিল ১৯০১ সালেএর আগের বারো বছর সব নোবেল গিয়েছে ইউরোপের লেখকদের কাছেসুলি প্রুদোম, রুডইয়ার্ড কিপলিং ইত্যাদিএই প্রথম এশিয়ার একজন লেখক, এই প্রথম একজন অশ্বেতাঙ্গ মানুষ এই সম্মান পেলেনভারতবর্ষের জন্য তো বটেই, সমগ্র এশিয়ার জন্যছিল গর্বের প্রথম মুহূর্ত

পরের বছর ১৯১৪ সালে রবীন্দ্রনাথ পুরস্কারের পদকসনদ গ্রহণ করেনপুরস্কারের অর্থ ছিল আট হাজার পাউন্ডের কাছাকাছিসেই অর্থ কোনো ব্যক্তিগত কাজে তিনি ব্যয় করলেন নাপুরো অর্থই দিয়ে দিলেন বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার জন্যযে স্বপ্ন তিনি ১৯০১ সাল থেকে বুনছিলেনবিশ্বমানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পুঁজি এসে গেল

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্তসেই স্বর্গে, হে পিতঃ, ভারতেরে জাগায়ে তোলোগীতাঞ্জলি

নোবেল পুরস্কার ১৯১৩ — গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings (১৯১২)-এর জন্যইংরেজি ভূমিকা: W. B. Yeats। প্রকাশক: India Society, London। প্রথম এশীয়, প্রথম অশ্বেতাঙ্গ সাহিত্যিক

নাইটহুড: যে উপাধি ফিরিয়ে দিলেন

১৯১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার রবীন্দ্রনাথকে দিলেন 'নাইটহুড' উপাধিমানে তিনি এখন থেকে 'স্যার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর'। বহু ভারতীয় এই সম্মানের জন্য আকুল ছিলেনকিন্তু রবীন্দ্রনাথ এই সম্মান নিলেন একটি দূরত্ব রেখেতাঁর কাছে এটা যতটা সম্মান, তার চেয়ে বেশি ছিল ব্রিটিশ শাসনের প্রতীক

১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল, পাঞ্জাবের অমৃতসরে জালিয়ানওয়ালাবাগে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটলজেনারেল ডায়ার নির্বিচারে গুলি চালালেন একটি শান্তিপূর্ণ জনসভায়শত শত মানুষ মারা গেলেনভারতবর্ষ স্তব্ধ হয়ে গেলএই গণহত্যার প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯ সালের ৩১ মে ভাইসরয় চেমসফোর্ডকে এক চিঠি লিখলেনতিনি তাঁর নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করছেন!

ছিল এক প্রতীকী প্রতিবাদকিন্তু পৃথিবী জুড়ে সাড়া ফেলে দিলএকজন নোবেল বিজয়ী কবি, যাঁর নাম তখন গোটা পশ্চিমা সাহিত্যজগতে আদরের, তিনি ব্রিটিশ সরকারের সবচেয়ে বড় সম্মান ছুঁড়ে ফেলে দিলেন একটি ভারতীয় গণহত্যার প্রতিবাদেমহাত্মা গান্ধীর সাথেও তাঁর সম্পর্ক জটিল ছিলকখনো বন্ধুত্বপূর্ণ, কখনো মতবিরোধপূর্ণকিন্তু এই দেশের প্রতি ভালোবাসায় কোনো ফাঁক ছিল না

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নাইটহুড উপাধি: ১৯১৫ সালে পান। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে বর্জন করেনএই বর্জন বিসিএসচাকরি পরীক্ষায় নিয়মিত আসে

দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন উদাহরণ আর নেইএকজন কবির লেখা গান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতভারতের 'জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে' রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ১৯১১ সালেবাংলাদেশের 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি' লিখেছিলেন ১৯০৫ সালেবঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়এর বাইরে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সঙ্গীতও রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে রচিতযদিও তা লিখেছিলেন তাঁর শিষ্য আনন্দ সমরাকুন

রবীন্দ্রনাথ দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতাভারতের 'জনগণমন' (১৯১১) এবং বাংলাদেশের 'আমার সোনার বাংলা' (১৯০৫)। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত রচিত হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে

তেরোটি উপন্যাস: চরিত্রের মনের ভেতরে

রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি ছিলেনকিন্তু কবিতার পাশাপাশি গদ্য সাহিত্যেও তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তা যেকোনো শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিকের কীর্তিকে চ্যালেঞ্জ করে। ১৮৮৩ থেকে ১৯৩৪ — পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় জুড়ে তিনি লিখেছেন তেরোটি উপন্যাস (কিশোর বয়সের 'করুণা'কে ধরলে চৌদ্দটি)। প্রতিটি উপন্যাসেই তিনি কিছু না কিছু নতুন চেষ্টা করেছেনবঙ্কিমচন্দ্রের পরে বাংলা উপন্যাসকে যিনি নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তিনি রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যচরিত্রের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণবঙ্কিমচন্দ্র ঘটনাকে যতটা গুরুত্ব দিতেন, রবীন্দ্রনাথ মনের কথাকে ততটাই গুরুত্ব দিয়েছেনতিনি নিজেই বলেছেনসাহিত্যের নবপর্যায় পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনা পরম্পরা বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানোআঁতের কথাঅর্থাঅন্তরের গভীর গোপন কথা

সাহিত্যের নবপর্যায় পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনা পরম্পরা বিবরণ দেওয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানোরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তাঁর নারী চরিত্রগুলোর কথা আলাদা করে বলতে হয়যে যুগে নারীকে গৃহকর্মসংসারের বাইরে দেখা যেত না, সেই যুগে রবীন্দ্রনাথের কলম আঁকল আত্মসচেতন, স্বাধীনচেতা, জটিল মানসিক জগতের অধিকারী নারী চরিত্রের ছবিবিনোদিনী, বিমলা, লাবণ্য, কুমুদিনী, এলাএই নামগুলো বাংলা সাহিত্যের নারী চরিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্যালারিতে চিরকাল ঝলমল করবে

চোখের বালি (১৯০৩) — বাংলা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের সূচনা

প্রথম প্রকাশ: বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৩০৮–১৩০৯ বঙ্গাব্দগ্রন্থাকারে ১৯০৩।

কাহিনির পটভূমি

'চোখের বালি' রবীন্দ্রনাথের চতুর্থ উপন্যাস হলেও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটিকে ধরা হয় বাংলা মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নিদর্শনউপন্যাসের নামটা একটু অদ্ভুত — 'চোখের বালি' মানে চোখের প্রিয়, চোখের মণিআবার চোখে যদি বালি পড়ে, কেমন লাগে সেটাও ভাবুনএক অপরের জ্বালাউপন্যাসের কেন্দ্রে এই দুই অর্থই আছেপ্রিয়তা আর জ্বালা একইসঙ্গে

কাহিনিসার

কলকাতার সম্ভ্রান্ত ঘরের যুবক মহেন্দ্রতার মা রাজলক্ষ্মী, চাচী অন্নপূর্ণাবন্ধু বিহারীমহেন্দ্র বিয়ে করে সরল মেয়ে আশালতাকেসংসার চলছিলহঠাএকদিন মহেন্দ্রের জীবনে এসে পড়লেন বিনোদিনীবিধবা, সুন্দরী, শিক্ষিততাঁর বয়স কম, কিন্তু অভিজ্ঞতা অনেকবুদ্ধিমান, সংবেদনশীল, কিন্তু একাকীত্বে ভরা

বিনোদিনী ভালোবেসেছিলেন বিহারীকেবিহারী তাঁকে চান নাচান আশালতাকেএদিকে আশালতা মহেন্দ্রের স্ত্রীবিনোদিনী আশালতার সঙ্গে গাঢ় বন্ধুত্ব গড়ে তোলেনপরস্পরকে 'চোখের বালি' বলে ডাকতে শুরু করেনকিন্তু এই বন্ধুত্বের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক জটিল খেলাবিনোদিনী মহেন্দ্রকে আকর্ষণ করছেন, প্রতিশোধ নিচ্ছেন বিহারীর প্রত্যাখ্যানেরমহেন্দ্রও দ্বিধাগ্রস্তপত্নী আশালতার প্রতি বাধ্য, কিন্তু বিনোদিনীর প্রতি আকৃষ্টচারটি মানুষের চারটি ভিন্ন আকাঙ্ক্ষাসব মিলিয়ে এক ত্রিকোণ-চতুষ্কোণ প্রেমের জটিলতা

শেষপর্যন্ত বিনোদিনী আত্মত্যাগ করেনতিনি বিহারীকে পাননি, মহেন্দ্রকেও তিনি ধ্বংস করতে চান নানিজেকে সরিয়ে নেনআশালতার সংসার বাঁচেএই উপন্যাসের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্র বিনোদিনীবাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জটিলবহুমাত্রিক নারী চরিত্রগুলোর একটিতাঁর মধ্যে আছে যৌবন, বুদ্ধি, একাকীত্ব, প্রতিশোধস্পৃহা, এবং শেষে আত্মত্যাগ

চরিত্র পরিচিতি

চরিত্র

পরিচয়

মহেন্দ্র

ধনী যুবক; বিনোদিনীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্ত্রীর প্রতি অবিশ্বাসী হয়ে ওঠে

বিনোদিনী

তরুণী বিধবা; উপন্যাসের প্রকৃত নায়িকা; বুদ্ধিমানসংবেদনশীল

আশালতা

মহেন্দ্রের সরলবিশ্বাসী স্ত্রী; বিনোদিনীর 'চোখের বালি'

বিহারী

মহেন্দ্রের বন্ধু; বিনোদিনী যাকে গভীরভাবে ভালোবাসেন; কিন্তু আশালতাকে চান

রাজলক্ষ্মী

মহেন্দ্রের মা

অন্নপূর্ণা

মহেন্দ্রের চাচী

চোখের বালিবাংলা প্রথম পূর্ণাঙ্গ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসবিধবা বিবাহের সমস্যা, সাংসারিক জটিলতা, পরকীয়া। ২০০৩ সালে ঋতুপর্ণ ঘোষ ঐশ্বর্যা রাইকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: চোখের বালির প্রধান চরিত্র সংখ্যা ছয়: মহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশালতা, বিহারী, রাজলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণাউপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রমহেন্দ্রকিন্তু প্রকৃত নায়িকাবিনোদিনী

নৌকাডুবি (১৯০৬) — পরিচয়-সংকটের কাহিনি

প্রথম ধারাবাহিক প্রকাশ: বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৩১০–১১ বঙ্গাব্দ

নৌকাডুবি যেভাবে কাহিনি জন্ম দেয়

'নৌকাডুবি' উপন্যাসের কাহিনি একটা চমৎকার দুর্ঘটনা থেকে শুরুরবীন্দ্রনাথ এটি লিখেছিলেন তাঁর নিজের 'ভগ্নতরী' কবিতার ছায়ায়কাহিনিটা কীভাবে চলে?

নায়ক রমেশকলকাতার যুবকতার পিতার পছন্দে সম্মত হয়ে গ্রামে গিয়ে বিয়ে করতে যানবিয়ের আসর সমাপ্ত হলে কনে নিয়ে নৌকায় ফিরছিলেনপদ্মায় ভয়ংকর ঝড় উঠলনৌকাডুবি ঘটলবহু মানুষ মারা গেলেনবেঁচে গেলেন রমেশ আর এক অচেনা নববধূকমলা

কমলা মনে করল, তার পাশে যিনি বেঁচেছেন, তিনিই তার স্বামীরমেশ বিভ্রান্তসে কাকে বিয়ে করেছিল? কনে দেখা তেমন ভালোভাবে হয়নি, তাই মনে রাখতে পারছে নাঅন্যদিকে তার আসল স্ত্রী হেমনলিনীসেও কোথাও আছেকমলা যাকে স্বামী মনে করছে, সে আসলে অন্য কারো স্বামীএই অদ্ভুত পরিচয়-সংকট থেকেই উপন্যাসের সব নাটকীয়তা

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র চারজনরমেশ, কমলা, নলিনাক্ষ (কমলার আসল স্বামী, ডাক্তার), হেমনলিনী (রমেশের প্রকৃত স্ত্রী)। উপন্যাসটি সামাজিককিন্তু এর কেন্দ্রে আছে সেই চিরন্তন প্রশ্ন: পরিচয় কী? আমরা যাকে আপন ভাবি, সে কি প্রকৃতই আপন? নাকি আমাদের ভ্রম?

গোরা (১৯১০) — রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠদীর্ঘতম উপন্যাস

ধারাবাহিক প্রবাসী পত্রিকায় ১৩১৪–১৩১৬ বঙ্গাব্দগ্রন্থাকারে ১৯১০।

কেন গোরা শ্রেষ্ঠ

রবীন্দ্রনাথের তেরোটি উপন্যাসের মধ্যে যদি একটি বেছে নিতে হয়এক বাক্যে সবাই বলবে 'গোরা'। সমালোচক অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন: 'গোরা'-র সমতুল্য আর একখানি উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে খুঁজে পাওয়া যাবে নাএই উপন্যাসকে অনেকে ইউরোপের 'এপিক উপন্যাস'-এর সাথে তুলনা করেছেনসাধু ভাষায় লেখা রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাসও এটি

কেন গোরা শ্রেষ্ঠ? প্রথমত, এতে আছে একটি জাতির আত্মপরিচয় খোঁজার গভীর মন্থনঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগহিন্দু সমাজব্রাহ্মসমাজের সংঘাতের সময়ভারতীয়ত্ব মানে কীহিন্দুত্ব? নাকি অন্য কিছু? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন গোরাকে

কাহিনিসার

নায়ক গৌরমোহনসংক্ষেপে গোরাকেন গোরা? কারণ তার গায়ের রঙ গৌরঅর্থাসাদাএমন সাদা যে অনেকে তাকে ইংরেজ ভাবেগোরা ছেলেবেলা থেকেই ছিল একগুঁয়ে, একনিষ্ঠ হিন্দুসে মনে করতহিন্দুত্বই ভারতীয়ত্বহিন্দুধর্মের গৌরব ফিরিয়ে আনতে হবেব্রাহ্মসমাজযারা পাশ্চাত্যের ছোঁয়ায় ধর্মকে 'নষ্ট' করছেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত গোরা

এদিকে গোরার বন্ধু বিনয়অনেকটা নরম মানুষসে ব্রাহ্ম পরিবার ভালো লাগেসে ভালোবাসে ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা ললিতাকেগোরাও যখন ব্রাহ্ম পরিবারের আরেক কন্যা সুচরিতাকে দেখে, প্রেম জাগেকিন্তু সে দ্বিধাহিন্দু-ব্রাহ্ম বিবাহ কি সম্ভব? গোরার মা আনন্দময়ীউদার, সর্বজনীন মনপরিচারিকার সঙ্গে রান্না করেন, ছোঁয়াছুঁয়ি মানেন নাগোরা মাকে একটু অপ্রীতিকর চোখেই দেখেন

কাহিনির শেষে এক চমকপ্রদ সত্য উন্মোচিত হয়আনন্দময়ী আসলে গোরার পালক মাগোরার আসল পিতা ছিলেন একজন আইরিশ মানুষসিপাহি বিদ্রোহের সময় তিনি মারা যানতাঁর মা মৃত্যুমুখে পতিত হন আনন্দময়ীর কাছেগোরাকে দত্তক দিয়ে যানএই সত্য জেনে গোরা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে যায়সে কে? হিন্দু না? ব্রাহ্মণ না? জাতিচ্যুত? এক বিরাট মুহূর্ত আসে

কিন্তু পরের মুহূর্তেই গোরার মধ্যে এক বিস্ময়কর রূপান্তর ঘটেসে বুঝতে পারেভারতীয়ত্ব কোনো ধর্ম, কোনো জাতিতে আবদ্ধ নয়ভারতীয়ত্ব মানে এই বিশাল মাটির সব মানুষের আপন হয়ে ওঠাসে বলে — 'আজ আমি সত্যিই ভারতবর্ষীয় হয়েছি।' পালক মা আনন্দময়ীকে গভীর শ্রদ্ধায় প্রণাম করেকারণ তিনিই ছিলেন প্রকৃত ভারতীয়ত্বের প্রতীকজাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে একজন মানব-মা

আজ আমি সত্যিই ভারতবর্ষীয় হয়েছিআমার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-ক্রিশ্চানের কোনো বিরোধ নেইগোরাশেষ পরিবর্তনের মুহূর্তে

চরিত্র

পরিচয়

গোরা / গৌরমোহন

নায়ক; কঠোর হিন্দুত্ববাদী; প্রকৃতপক্ষে আইরিশ পিতার সন্তান

আনন্দময়ী

গোরার পালক মা; প্রকৃত ভারতীয় উদারতার প্রতীক

বিনয়

গোরার সবচেয়ে কাছের বন্ধু; সংবেদনশীল

ললিতা

ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা; বিনয়ের প্রেমিকা

সুচরিতা

ব্রাহ্ম পরিবারের কন্যা; গোরার প্রেমিকা

পরেশ বাবু

সুচরিতা-ললিতার পালক পিতা; ব্রাহ্মসমাজের নেতা

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: গোরারবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ, দীর্ঘতম এবং সাধু ভাষায় লেখা শেষ উপন্যাসউপন্যাসের পূর্বনাম ছিল 'দামিনী'। দেশাত্মবোধক উপন্যাস তিনটি: গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়

ঘরে বাইরে (১৯১৬) — যখন স্বদেশী আন্দোলন প্রেমে এসে ঢোকে

সবুজ পত্র পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশ ১৩২২–২৩ বঙ্গাব্দেগ্রন্থাকারে ১৯১৬।

পটভূমিথিম

এই উপন্যাসের পটভূমি ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনকিন্তু রবীন্দ্রনাথ এটিকে নিছক রাজনৈতিক উপন্যাস হতে দেননিতিনি ঢুকে গেছেন ত্রিকোণ প্রেমের জটিলতায়এক কথায় বলা যায়, এটি একটি প্রেমের উপন্যাস যেখানে প্রেক্ষাপট স্বদেশী আন্দোলন; আবার এটি স্বদেশী আন্দোলনের উপন্যাস যেখানে কাহিনি গড়ে উঠেছে প্রেমের চতুর্ভুজে

কাহিনিসার

নিখিলেশউদারমনা জমিদার, ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিতসে মনে করে ব্রিটিশ পণ্য বর্জন করা উচিত নয়কারণ এতে গরিবরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়সে অহিংস স্বদেশীতার স্ত্রী বিমলাগৃহবধূ, লাজুকনিখিলেশ চায় বিমলা 'ঘরের' সীমা পেরিয়ে 'বাইরের' জগতে আসুকনাম বদলে রাখে 'বিমলা' — পদ্মফুল

এই বাড়িতে অতিথি হয়ে আসে নিখিলেশের ছেলেবেলার বন্ধু সন্দীপউগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা, চমকপ্রদ বক্তা, কিন্তু চরিত্রহীন স্বার্থপরসন্দীপ স্বদেশী আন্দোলনের নামে চাঁদা তোলে, ভয় দেখায়, গরিব ব্যবসায়ীদের নিপীড়ন করেকিন্তু তার বক্তৃতা এতই মুগ্ধকর যে বিমলা তাকে দেবতার মতো দেখতে শুরু করে

বিমলা সন্দীপের কথায় মুগ্ধ হয়ে ঘরের গহনাও দান করেস্বামী নিখিলেশ থেকে দূরে চলে যেতে শুরু করেকিন্তু একদিন বিমলা দেখেসন্দীপের প্রকৃত মুখসে দেশপ্রেমিক নয়, স্বার্থলোভীসে বিমলাকেও কামনা করে তার অহংকারের তৃপ্তির জন্যসব দেখে বিমলার চোখ খোলে

শেষে এক দাঙ্গায় নিখিলেশ গুরুতর আহত হনবিমলা ফিরে আসে স্বামীর কাছেকিন্তু এতদিন গড়িয়ে গেছেএই উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ কঠিন প্রশ্ন তুলেছেনদেশপ্রেম যখন উগ্রতায় পরিণত হয়, তখন সেটা ভয়ংকরধর্মের সাথে জাতীয়তাবাদ যখন মেশে, তখন সেটা মানুষকে অন্ধ করে

সন্দীপের বক্তৃতা শুনলে মনে হয় ঐশ্বর্য, প্রতাপ, তেজএই তিনটিই আমাদের সবআমি তখন ভুলে যাইপ্রেম আছে, দয়া আছে, সত্য আছেঘরে বাইরেবিমলার আত্মবিশ্লেষণ

চরিত্র

পরিচয়

নিখিলেশ

উদার জমিদার; বিমলার স্বামী; অহিংস স্বদেশী

বিমলা

নিখিলেশের স্ত্রী; 'ঘর' থেকে 'বাইরে' আসা নারী

সন্দীপ

উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা; স্বার্থপর; ভিলেন

সত্যজিরায় ১৯৮৪ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেনসৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভিক্টর ব্যানার্জীস্বাতীলেখা সেনগুপ্তা অভিনীতচলচ্চিত্রটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত

শেষের কবিতা (১৯২৯) — অমর প্রেমের কাব্যিক উপন্যাস

ব্যাঙ্গালোরে রচিতপ্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিক ১৩৩৪–১৩৩৫ বঙ্গাব্দ

কাব্যিক উপন্যাস

'শেষের কবিতা' রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে রোমান্টিক উপন্যাসঅনেকে এটিকে কবিতার বই ভেবে ভুল করেনকারণ এতে গদ্য আর পদ্য মিশে গেছে এক অপূর্ব রসায়নেসমালোচক সুকুমার সেন একে বলেছেন 'চম্পু কাব্য' — অর্থাসংস্কৃত সাহিত্যের সেই বিশেষ ধারা যেখানে গদ্যপদ্য পাশাপাশি চলেবুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন একটি বিখ্যাত মন্তব্য: 'রবীন্দ্রনাথের নবজন্ম ঘটেছিল শেষের কবিতায়।' রবীন্দ্রনাথের তখন বয়স আটষট্টিসেই বয়সেও তিনি লিখতে পারলেন এক যুবকের প্রেমের গল্প!

কাহিনিসার

কাহিনির পটভূমি শিলং পাহাড়নায়ক অমিত রায়অক্সফোর্ড-ফেরআধুনিক যুবকতার বুদ্ধি তীক্ষ্ণ, কথা চমকপ্রদ, ভাব ভাঙাচোরাসে শ্রোতাদের চমকে দিতে ভালোবাসেতার সঙ্গে শিলং-এ ছিল বোন সিসিতার বন্ধু লিলিএকদিন গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনাঅমিতের গাড়ি ধাক্কা দেয় অন্য একটি গাড়িকেসেই গাড়ির আরোহী লাবণ্যশিক্ষিত, গভীর, শান্ত স্বভাবের তরুণী

এই দুর্ঘটনার মধ্য দিয়েই অমিত-লাবণ্যের পরিচয়তারপর গভীর প্রেমতারা ভেবেছিল বিয়ে করবেকিন্তু বিধি অন্য পথে যায়অমিতের প্রাক্তন প্রেমিকা কেতকী মিত্র এসে পড়েজানা যায়, অমিত আর কেতকী আগে আংটি বদল করেছিলঅন্যদিকে লাবণ্যকে ভালোবাসে শোভনলালতার পুরোনো ছাত্র, এখন গবেষক

শেষে অমিত-লাবণ্য উপলব্ধি করেতাদের প্রেম মহান, কিন্তু বিবাহযোগ্য নয়অমিত বিয়ে করবে কেতকীকে, লাবণ্য বিয়ে করবে শোভনলালকেকিন্তু তাদের প্রেম রয়ে যাবে কাব্য হয়েযা কখনো বিবাহে পরিণত হয় না, কিন্তু চিরকাল হৃদয়ে থেকে যায়

কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও? তারি রথ নিত্যই উধাও জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দনশেষের কবিতা

শেষের কবিতার মজার দিকউপন্যাসের ভেতরে অমিত রায় 'রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর' নামে এক বৃদ্ধসেকেলে কবির কাব্যদর্শনকে আক্রমণ করেন! অর্থারবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের আগের কাব্যচিন্তাকে প্রশ্ন করেছেন এই উপন্যাসে। এ এক বিরল আত্মসমালোচনা

চরিত্র

পরিচয়

অমিত রায়

অক্সফোর্ড-ফেরআধুনিক যুবক; বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের অধিকারী

লাবণ্য

শিক্ষিত, গভীর, শান্ত স্বভাবের নায়িকা

কেতকী মিত্র

অমিতের প্রাক্তন প্রেমিকা; পরে স্ত্রী

শোভনলাল

লাবণ্যর প্রাক্তন ছাত্র; পরে স্বামী

যোগমায়া

লাবণ্যর পরিচালিকা; বিধবা

যোগাযোগ (১৯২৯), দুই বোন (১৯৩৩), মালঞ্চ (১৯৩৪)

শেষ পর্বের উপন্যাস

যোগাযোগদুই বিপরীত মানুষের বিচ্ছেদ

'যোগাযোগ' উপন্যাসটির পূর্বনাম ছিল 'মিতা'। বিষয়বস্তুস্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সূক্ষ্ম জটিলতামধুসূদনধনী ব্যবসায়ী, রুক্ষ স্বভাবের, ভাবাবেগে অপ্রবেশ্যকুমুদিনীসংবেদনশীল, কবিতাপ্রিয়া, আভিজাত্যপূর্ণ পরিবারের কন্যাদুই বিপরীত মেরুর মানুষ যখন বিবাহসূত্রে এক হয়তখনই শুরু হয় বিচ্ছেদের ট্র্যাজেডিপ্রধান চরিত্র চারজন: কুমুদিনী, মধুসূদন, বিপ্রদাস (কুমুদিনীর ভাই), শ্যামাসুন্দরী

দুই বোনমালঞ্চএকই থিমের দুই ভিন্ন পরিণতি

রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের ছোট ছোট উপন্যাসদুটিই একই বিষয়ের ওপরস্ত্রীর অসুস্থতার সুযোগে স্বামীর অন্য নারীর প্রতি আসক্তিকিন্তু পরিণতি আলাদা — 'দুই বোন' মিলনান্তক, 'মালঞ্চ' বিয়োগান্তক। 'দুই বোন'-এ আছে শর্মিলাঊর্মিলার গল্পদুই বোন। 'মালঞ্চ'-এ নীরজাসরলা

চার অধ্যায় (১৯৩৪) — শেষ উপন্যাস

রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ উপন্যাস

'চার অধ্যায়' রবীন্দ্রনাথের সবশেষ উপন্যাসবয়স তখন তিয়াত্তরসমসাময়িক বিপ্লবী আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত একটি বিয়োগান্তক প্রেমের উপন্যাসরবীন্দ্রনাথ স্বয়ং একে বলেছেন 'লিরিকের তোড়া' — অর্থাগীতিকাব্যের গুচ্ছ

কাহিনিএলা তরুণী বিপ্লবী, বুদ্ধিমান, দৃঢ়ইন্দ্রনাথ তার বিপ্লবী দলের নেতাকঠোর শৃঙ্খলার পক্ষপাতীঅতীন্দ্রঅতীনএলাকে গভীরভাবে ভালোবাসেকিন্তু এলার ভালোবাসা পেতে হলে তাকেও বিপ্লবী দলে যোগ দিতে হবেঅতীন যোগ দেয়কিন্তু তার মন বিদ্রোহীশৃঙ্খলার নামে যে নৃশংসতা, তার সাথে সে মিল খেতে পারে নাপ্রেম, কর্তব্য, অহিংসা, হিংসাসব একসাথে গুলিয়ে যায়শেষে এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডিঅতীনকে এলার সামনে গুলি করতে হয় (দলীয় আদেশে)। প্রধান চরিত্রঅতীন্দ্র, এলা, ইন্দ্রনাথ, বটু

রবীন্দ্রনাথের তেরোটি উপন্যাসের সম্পূর্ণ তালিকা

ক্র.

উপন্যাস

প্রকাশ

শ্রেণিবিন্যাস

করুণা

১৮৭৭

কিশোরবয়সের রচনা; গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট

১৮৮৩

ঐতিহাসিকপ্রথম প্রকাশিত

রাজর্ষি

১৮৮৭

ঐতিহাসিক

চোখের বালি

১৯০৩

মনস্তাত্ত্বিক/দ্বন্দ্বমূলক

নৌকাডুবি

১৯০৬

সামাজিক

প্রজাপতির নির্বন্ধ

১৯০৮

সামাজিক প্রহসন

গোরা

১৯১০

দেশাত্মবোধক/মহাকাব্যিকশ্রেষ্ঠ

ঘরে বাইরে

১৯১৬

দেশাত্মবোধক/রাজনৈতিক

চতুরঙ্গ

১৯১৬

মিস্টিক/ছোটগল্পধর্মী

১০

যোগাযোগ

১৯২৯

সামাজিক (পূর্বনাম: 'মিতা')

১১

শেষের কবিতা

১৯২৯

রোমান্টিক/চম্পু কাব্য

১২

দুই বোন

১৯৩৩

মিলনান্তক ছোট উপন্যাস

১৩

মালঞ্চ

১৯৩৪

বিয়োগান্তক ছোট উপন্যাস

১৪

চার অধ্যায়

১৯৩৪

দেশাত্মবোধকসর্বশেষ

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: উপন্যাস মনে রাখার পদ: 'বৌ রা বালি নৌকাডুবে পতি গোরা বাইরে, রঙ্গ যোগে শেষের বোন মলল চার অধ্যায়ে।' (বৌ-ঠাকুরাণীর হাট, রাজর্ষি, চোখের বালি, নৌকাডুবি, প্রজাপতির নির্বন্ধ, গোরা, ঘরে বাইরে, চতুরঙ্গ, যোগাযোগ, শেষের কবিতা, দুই বোন, মালঞ্চ, চার অধ্যায়।)

কবিতার জগৎ: পঞ্চাশটি কাব্যগ্রন্থ

কবি রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের কবিতা-জীবন শুরু হয়েছিল আট বছর বয়সেশোনা যায়, প্রথম কবিতা পড়ে পরিবারের লোকজন বলেছিলেন 'আঃ! জল পড়ে, পাতা নড়ে।' সেই থেকে আট দশকেরও বেশিতিনি লিখেই গেছেনমৃত্যুর কয়েকদিন আগে পর্যন্তযেদিন গেলেন, সেদিনও তাঁর শয্যাপাশে কাগজ-কলম প্রস্তুত ছিল

তাঁর কাব্যজীবনকে সাহিত্য-গবেষকরা কয়েকটি পর্বে ভাগ করেছেনপ্রথম পর্বে ছিল উন্মেষকিশোর কবি ছায়া খুঁজছেন। 'কবি-কাহিনী' (১৮৭৮) তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থকিশোর বয়সে 'ভানুসিংহ' ছদ্মনামে তিনি বৈষ্ণব পদাবলির অনুকরণে কবিতা লিখেছিলেন — 'ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী'। এই ছদ্মনামটি BCS-এ বহুবার প্রশ্ন হয়

পদ্মাপাড়ের পর্ব: সোনার তরী থেকে কথাকাহিনী

১৮৯০-এর দশকে শিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার সময় রবীন্দ্রনাথের কবিকণ্ঠ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছাল। 'মানসী' (১৮৯০), 'সোনার তরী' (১৮৯৪), 'চিত্রা' (১৮৯৬), 'চৈতালি' (১৮৯৬), 'কণিকা' (১৮৯৯), 'কথা', 'কাহিনী', 'কল্পনা', 'ক্ষণিকা' (১৯০০) — এক দশকে এত কবিতা! 'সোনার তরী' কাব্যের নাম-কবিতাটি বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টিএক কৃষক তার সারা বছরের পরিশ্রমে ফলানো ফসল সোনার তরীতে তুলে দেয়, কিন্তু তরীতে তার নিজের জায়গা হয় নাকর্ম যায় চিরকালের জন্যমানুষ পড়ে থাকেজীবন আর কর্মের চিরন্তন সম্পর্কের এই কবিতা অসংখ্য ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে

গীতাঞ্জলি (১৯১০) — যে কাব্য নোবেল এনে দিল

বাংলা গীতাঞ্জলি ১৯১০। ইংরেজি Song Offerings ১৯১২।

'গীতাঞ্জলি' রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যযাকে নিয়ে সারা পৃথিবী আজও চর্চা করেবাংলা গীতাঞ্জলিতে আছে ১৫৭টি কবিতাইংরেজি গীতাঞ্জলিতে আছে ১০৩টি কবিতাকিন্তু এই কবিতাগুলো শুধু বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে নয়, আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া (গীতিমাল্য, নৈবেদ্য, খেয়া ইত্যাদি)। অর্থাইংরেজি Song Offerings আসলে রবীন্দ্রনাথের নির্বাচিত কবিতার একটি সংকলন

কী আছে গীতাঞ্জলিতে? ভক্তি, প্রার্থনা, পরমেশ্বরের সাথে মানব আত্মার সংলাপকিন্তু এই ভক্তি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সংকীর্ণতার নয়হিন্দু-মুসলিম-ক্রিশ্চানসবাই এই কবিতায় নিজেদের ঈশ্বরকে খুঁজে পানসর্বজনীনতাই গীতাঞ্জলিকে বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিলতাইকাব্যের জন্যই এসেছিল নোবেল

চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির, জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করিসেই স্বর্গে, হে পিতঃ, ভারতেরে জাগায়ে তোলোগীতাঞ্জলিকবিতা ৩৫

পরবর্তী পর্ব: পূরবী থেকে শেষ লেখা

নোবেলের পর রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষাবিষয়ে বিরাট পরিবর্তন এল। 'বলাকা' (১৯১৬) — গতির কবিতা, ছন্দে নতুনত্ব। 'পূরবী' (১৯২৫) — উৎসর্গ করেন আর্জেন্টিনার লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে। 'মহুয়া' (১৯২৯) — প্রেমের কবিতা

জীবনের শেষ দশকে রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতায় আনলেন এক বিপ্লবগদ্যকবিতাছন্দ-মিল ছেড়ে গদ্যের মুক্ত প্রবাহে কবিতা লিখলেন। 'পুনশ্চ' (১৯৩২) — এই ধারার প্রথম কাব্যতারপর 'শেষ সপ্তক' (১৯৩৫), 'শ্যামলী' (১৯৩৬), 'পত্রপুট' (১৯৩৬)। এই গদ্যকবিতাগুলো বাংলা আধুনিক কবিতার দিকে দরজা খুলে দিল

শেষ মুহূর্তে এসেছিল 'রোগশয্যা' (১৯৪০), 'আরোগ্য' (১৯৪১), 'শেষ লেখা' (১৯৪১) — মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কবি তাঁর শেষ কবিতাগুলো লিখেছিলেনশেষ লেখার শেষ কবিতা — 'প্রথম দিনের সূর্য / প্রশ্ন করেছিল / সত্তার নূতন আবির্ভাবে — / কে তুমি? / মেলেনি উত্তর।'

প্রধান কাব্যগ্রন্থ

প্রকাশ

বিশেষত্ব

কবি-কাহিনী

১৮৭৮

প্রথম প্রকাশিত কাব্য

সন্ধ্যাসঙ্গীত

১৮৮২

কবির প্রথম প্রতিষ্ঠা

প্রভাত সঙ্গীত

১৮৮৩

নতুন আশার গান

ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী

১৮৮৪

ছদ্মনামে রচিত বৈষ্ণব ধাঁচের কবিতা

মানসী

১৮৯০

নবযুগের সূচনা

সোনার তরী

১৮৯৪

পদ্মাপাড়ের অমর সৃষ্টি

চিত্রা

১৮৯৬

শিলাইদহ পর্ব

চৈতালি

১৮৯৬

সংস্কৃতি-ছন্দে

কণিকা

১৮৯৯

ক্ষুদ্র কবিতা সংকলন

কথা / কাহিনী

১৯০০

কাহিনিকাব্য

কল্পনা

১৯০০

রোমান্টিক

ক্ষণিকা

১৯০০

হালকা ছন্দের কবিতা

নৈবেদ্য

১৯০১

ভক্তিমূলক

খেয়া

১৯০৬

গভীর জীবনদর্শন

গীতাঞ্জলি

১৯১০

নোবেল-প্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ কাব্য

গীতিমাল্য

১৯১৪

ভক্তিগীতি

গীতালি

১৯১৪

ভক্তিগীতি

বলাকা

১৯১৬

গতির কবিতাছন্দে নতুনত্ব

পূরবী

১৯২৫

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে উৎসর্গ

মহুয়া

১৯২৯

প্রেমের কবিতা

পুনশ্চ

১৯৩২

গদ্যকবিতার সূচনা

শেষ সপ্তক

১৯৩৫

গদ্যকবিতা

শ্যামলী

১৯৩৬

গদ্যকবিতা

পত্রপুট

১৯৩৬

গদ্যকবিতা

রোগশয্যা

১৯৪০

রোগের সময় রচিত

আরোগ্য

১৯৪১

সুস্থতা-প্রার্থনার কবিতা

শেষ লেখা

১৯৪১

মৃত্যুর পর প্রকাশিত

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী রচয়িতারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 'ভানুসিংহ' তাঁর কিশোর বয়সের ছদ্মনামভারতী পত্রিকায় এই পদাবলী প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৭৭ সালে

নাটক: রঙ্গমঞ্চের দার্শনিক

রবীন্দ্রনাথ আটত্রিশটি নাটক রচনা করেছেননাটকের পরিসর তাঁর কাছে বিশালপৌরাণিক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, প্রতীকী, রূপক, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্যসব ধরনের নাটক তিনি লিখেছেনতাঁর নাটকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো প্রতীকধর্মীতাদার্শনিক গভীরতাবহিরঙ্গের ঘটনার চেয়ে অন্তরের তাৎপর্য বেশি গুরুত্বপূর্ণএই কারণেই তাঁর অনেক নাটক প্রথমে দর্শকের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়েছিলকিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম একে নতুন করে আবিষ্কার করেছে

রক্তকরবী (১৯২৬) — যন্ত্রসভ্যতার বিরুদ্ধে

রবীন্দ্রনাথের অন্যতম শ্রেষ্ঠবহুল আলোচিত নাটক

কাহিনিপ্রতীক

'রক্তকরবী' একটি প্রতীকী নাটককাহিনির পটভূমি যক্ষপুরীএক কাল্পনিক রাজ্যসেখানে মাটির নিচে আছে অপার সোনার খনিরাজা শ্রমিকদের দিয়ে দিনরাত পাথর কাটান, সোনা তোলানশ্রমিকদের মানুষ হিসেবে দেখা হয় নাতাদের নাম নেই, পরিচয় নেইশুধু সংখ্যা। ৪৭ এফ, ৬৫ পিএমন নম্বরে তাদের ডাকা হয়যন্ত্রসভ্যতার নৃশংসতার এক বিকট প্রতিচ্ছবি

এই যক্ষপুরীতে এসে পড়ে এক অপ্রত্যাশিত মেয়েনন্দিনীসে শ্রমিক নয়, তার শরীরে রক্তকরবী ফুলের মালাসে জীবন্ত, সে আনন্দময়সে প্রশ্ন করেকেন এই শ্রমিকদের নাম নেই? কেন শুধু সংখ্যা? রাজাযিনি জাল্লাদের আড়ালে বসে শাসন করেননন্দিনীর কথায় ক্রমে স্পর্শিত হনশেষে তিনি নিজেই সেই জাল ভাঙেন, পাথরের মূর্তি ভাঙেন, শ্রমিকদের মুক্তি দেন

চরিত্র

পরিচয়

রাজা

যক্ষপুরীর শাসক; প্রথমে নৃশংস, শেষে রূপান্তরিত

নন্দিনী

নাটকের নায়িকা; জীবনআনন্দের প্রতীক

রঞ্জন

নন্দিনীর প্রিয়; স্বাধীনতার প্রতীক

বিশু

গাইয়ে; নন্দিনীর বন্ধু; বিদ্রোহের বার্তাবাহক

পাগল

সত্যকথক; পাগলের ছদ্মবেশে দার্শনিক

ডাকঘর (১৯১২) — বালক অমলের অমর কাহিনি

শান্তিনিকেতনে রচিত

'ডাকঘর' রবীন্দ্রনাথের একটি অসাধারণ প্রতীকী নাটককাহিনি খুবই সরলকিন্তু প্রতিটি স্তরে গভীরবালক অমল গৃহবন্দিমৃত্যুপথযাত্রী রোগীতার পালক বাবা মাধব দত্ত তাকে ভালোবাসেন, কিন্তু বাইরে যেতে দিতে ভয় পানঅমল জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবী দেখেদধিওয়ালা, ফুলওয়ালী, পাহারাদারসবাইকে দেখে এবং কথা বলে

একদিন অমল শোনে, তার বাড়ির পাশে রাজা একটি নতুন ডাকঘর তৈরি করেছেনসেই ডাকঘর থেকে বুঝি একদিন তার নামে চিঠি আসবেসে অপেক্ষায় থাকেশেষে রাজার দূত আসেসাদা পোশাকে, অপূর্ব শান্তি বহনকারীঅমল তখন বিছানায় ম্লানদূত তাকে বলে, রাজা আসছেনঅমল ঘুমিয়ে পড়েচিরঘুমে

নাটকের কেন্দ্রীয় প্রতীকমৃত্যুকিন্তু রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুকে ভয়ংকর হিসেবে দেখাননিমৃত্যু এখানে মুক্তির প্রতীক, রাজার বার্তা পরমের আহ্বানঅমল গৃহবন্দি জীবন থেকে মুক্ত হয়, পরমের কোলে চিরশান্তি পায়

বিসর্জন (১৮৯০) ও চিত্রাঙ্গদা (১৮৯২)

পূর্ববঙ্গের সাজাদপুরে রচিত

বিসর্জনপশুবলির বিরুদ্ধে

'বিসর্জন' নাটকের পটভূমি ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমাণিক্যের সময়কালবিষয়মন্দিরে পশুবলি প্রথামূল সংঘর্ষ রাজা গোবিন্দমাণিক্যপুরোহিত রঘুপতির মধ্যেরঘুপতি চান বলি চলুক, রাজা চান বন্ধ হোকমাঝখানে পরে রঘুপতির পালক পুত্র জয়সিংহযে শেষপর্যন্ত নিজেকেই বলি দেয়অপর্ণাএক ছোট মেয়েযার পোষা ছাগল বলির মুখে পড়েছিলচারটি চরিত্রের সংঘাতে এই নাটক দাঁড়িয়ে

চিত্রাঙ্গদাসৌন্দর্য বনাম ব্যক্তিত্ব

'চিত্রাঙ্গদা' নাট্যকাব্যমহাভারতের চিত্রাঙ্গদাঅর্জুনের প্রেমকাহিনি অবলম্বনেমণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা পুরুষের মতো লালিত-পালিততিনি যোদ্ধা, রাজত্ব চালান, কিন্তু রূপে সাধারণঅর্জুনকে দেখে প্রেমে পড়লেনকিন্তু অর্জুন তাকে দেখে আকর্ষণ অনুভব করেন নাতাঁর মতো একজন বীর সাধারণ চেহারায় কী পান?

চিত্রাঙ্গদা দেবতা মদনের কাছে বর চাইলেনএক বছরের জন্য পরমা সুন্দরী হয়ে যাওয়ার বরঅর্জুন এবার প্রেমে পড়ে গেলেনকিন্তু চিত্রাঙ্গদা ভাবলেন — এ তো প্রকৃত প্রেম নয়, এ তো শুধু রূপের প্রেমশেষে এক যুদ্ধে চিত্রাঙ্গদার অপূর্ব বীরত্ববুদ্ধি দেখে অর্জুন বুঝলেনচিত্রাঙ্গদার বাহ্যিক রূপ নয়, তার অভ্যন্তরীণ গুণই প্রকৃত সৌন্দর্যচিত্রাঙ্গদা দেবতার বর ফিরিয়ে দিয়ে নিজের আসল রূপে দাঁড়ালেনঅর্জুন এবার তাকে গভীর শ্রদ্ধায় গ্রহণ করলেন

১৯৩৬ সালে রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যনাট্যের নৃত্যনাট্য রূপ প্রকাশ করেন। 'শ্যামা' (১৯৩৯) ও 'চণ্ডালিকা' (১৯৩৯) — এই দুটিও তাঁর বিখ্যাত নৃত্যনাট্যচণ্ডালিকার বিষয় অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধেচণ্ডাল-কন্যা প্রকৃতির গৌতম বুদ্ধের শিষ্য আনন্দের প্রতি প্রেম, এবং প্রকৃতির আত্মোপলব্ধি

রবীন্দ্রনাথের প্রধান নাটকসমূহ

নাটক

প্রকাশ

ধরনবিষয়

বাল্মীকি প্রতিভা

১৮৮১

গীতিনাট্যপ্রথম রচনা

কালমৃগয়া

১৮৮২

গীতিনাট্য

বিসর্জন

১৮৯০

পশুবলির বিরুদ্ধে নাটক

চিত্রাঙ্গদা

১৮৯২

নাট্যকাব্য (নৃত্যনাট্য ১৯৩৬)

মালিনী

১৮৯৬

পৌরাণিক

শারদোৎসব

১৯০৮

রূপক

প্রায়শ্চিত্ত

১৯০৯

ঐতিহাসিক

রাজা

১৯১০

রূপক

অচলায়তন

১৯১২

গোঁড়ামির বিরুদ্ধে

ডাকঘর

১৯১২

প্রতীকীঅমলের কাহিনি

ফাল্গুনী

১৯১৬

গীতিনাট্য

মুক্তধারা

১৯২২

যন্ত্রসভ্যতার সমালোচনা

রক্তকরবী

১৯২৬

যক্ষপুরীর কাহিনি

চিরকুমার সভা

১৯২৬

সামাজিক প্রহসন

শাপমোচন

১৯৩১

নৃত্যনাট্য

তাসের দেশ

১৯৩৩

রূপক নৃত্যনাট্য

শ্যামা

১৯৩৯

নৃত্যনাট্য

চণ্ডালিকা

১৯৩৯

অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নৃত্যনাট্য

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নাটক মনে রাখার ছড়া: 'রাজা অচলায়তন চিরকুমারকে ডেকে রক্তকরবী মুক্ত মুকুট নিয়ে অরুণাচল অরূপরতনকে সঙ্গে নিয়ে কালের যাত্রায় বিসর্জন দিতে তাসের দেশে গেলেন।'

ছোটগল্প: বাংলা গল্পের জন্মদাতা

বাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা কে? অধিকাংশ সমালোচকের মতেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরশিলাইদহে জমিদারি দেখাশোনার সময় পদ্মাপাড়ের সাধারণ মানুষের জীবনের ছবি তিনি ক্যামেরার মতো ধরলেন তাঁর গল্পে। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ — এই দশ বছরে লিখেছেন উনষাটটি গল্পসারা জীবনে ১১৯টিরও বেশি। 'গল্পগুচ্ছ' সংকলনে তাঁর ৯৫টি গল্প সংকলিত

বিখ্যাত গল্পগুলো

গল্প

সংক্ষিপ্ত কাহিনি

কাবুলিওয়ালা

কাবুলি ব্যবসায়ী রহমতকলকাতার ছোট মেয়ে মিনির বন্ধুত্বকারাগার থেকে ফিরে রহমত দেখে মিনির বিয়ের দিনসে আর আগের ছোট্ট মেয়ে নেইবাবা-মেয়ের সম্পর্কের মতো কোমল গল্প

পোস্টমাস্টার

কলকাতার এক যুবক পোস্টমাস্টার গ্রামে বদলি হলে অনাথ মেয়ে রতন তাঁর সেবায় নিজেকে নিবেদন করেকিন্তু পোস্টমাস্টার একদিন কলকাতা ফিরে যানরতন থেকে যায় একাপথ চেয়ে

ছুটি

গ্রাম্য বালক ফটিক কলকাতায় মামার বাড়ি যায় পড়াশোনার জন্যশহরের পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়েমৃত্যুর কাছে গিয়ে চিৎকার করে — 'মা, এবার আমার ছুটি হয়েছে!'

শাস্তি

দুই ভাই দুখিরামছিদামদুখিরামের স্ত্রী রাধা চন্দরাকে মেরে ফেলেছিদাম স্ত্রী চন্দরাকে বাঁচাতে চন্দরাকেই দোষী করেঅভিমানে চন্দরা অপরাধ স্বীকার করেফাঁসি হয়

নষ্টনীড়

ভূপতি একজন সম্পাদকপত্রিকার কাজে এত ব্যস্ত যে স্ত্রী চারুলতার দিকে নজর দিতে পারেন নাচাচাতো ভাই অমলের সঙ্গে চারুলতার গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেঅমল চলে গেলে নষ্ট হয় ভূপতিচারুলতার নীড়

মহামায়া

মহামায়ার সঙ্গে রাজীবের প্রেমকিন্তু পরিবার অন্যত্র বিয়ে দেয়বিধবা হলে সে ফিরে আসেকিন্তু আগুনে মুখ পুড়েছেশর্ত দেয়মুখ দেখা চলবে নাশর্ত ভঙ্গ হলে চলে যায় চিরকালের মতো

অতিথি

তারাপদগৃহত্যাগী এক বালকযেখানেই ভালোবাসা পায়, সেখান থেকেই পালিয়ে যায়সে চিরঅতিথিকোথাও থাকতে পারে না

মেঘরৌদ্র

গিরিবালা গরিব ঘরের মেয়েস্বামী মাতালএক ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের প্রভাবে তার জীবন বদলায়

'নষ্টনীড়' গল্প থেকে সত্যজিরায় ১৯৬৪ সালে নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র 'চারুলতা'। চলচ্চিত্রটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। 'কাবুলিওয়ালা' গল্পও একাধিকবার চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথবাংলা ছোটগল্পের জন্মদাতা। ১৮৯১-১৯০১ — তাঁর 'ছোটগল্প পর্ব'। মোট ১১৯+ গল্প; গল্পগুচ্ছে ৯৫টি।

সংগীত: রবীন্দ্রসংগীতের জগ

রবীন্দ্রনাথের সংগীত-সম্পদ এতই বিশাল যে অনেকে বলেনতিনি সাহিত্যিক হিসেবে যত বড়, সংগীতস্রষ্টা হিসেবে ততটাইসারা জীবনে তিনি প্রায় ২২৩২টি গান রচনা করেছেনএবং প্রতিটি গানের সুরও নিজে দিয়েছেন! গানের কথা আর সুরএই দুই-ই একই মানুষের, এমন উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল

এই গানগুলোকে তিনি একটি বইতে সাজিয়ে রাখলেন — 'গীতবিতান'। গীতবিতানে আছে ১৯১৫টি গান (অন্য সূত্রে আরও বেশি)। গানগুলো পাঁচটি বিভাগে ভাগ করা: পূজা (ভক্তিমূলক), প্রেম (মানবিক প্রেম), প্রকৃতি (ছয় ঋতু), স্বদেশ (দেশপ্রেম), এবং আনুষ্ঠানিকছয় ঋতুর প্রতিটি ঋতুতে আলাদা গানগ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্তবর্ষার গানে রবীন্দ্রনাথ যা দিয়েছেনপৃথিবীর কোনো ভাষায় এমন বর্ষাসংগীত নেই

গীতবিতানের পাঁচ বিভাগপূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, আনুষ্ঠানিকমোট ১৯১৫টি গান গীতবিতানেসারা জীবনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন প্রায় ২২৩২টি গান

রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব বিস্ময়করবাঙালির জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথের গান অপরিহার্যপয়লা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, বিয়ে, পূজা, শোক, আনন্দসবেতেতাঁর সবচেয়ে আশ্চর্য কীর্তি — 'আমার সোনার বাংলা' (১৯০৫) ও 'জনগণমন' (১৯১১)। দুটিই দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রসংগীত সংখ্যা: প্রায় ২২৩২। গীতবিতান-এ ১৯১৫টি। পাঁচ বিভাগ: পূজা, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ, আনুষ্ঠানিকদুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত: 'আমার সোনার বাংলা' (বাংলাদেশ, ১৯০৫), 'জনগণমন' (ভারত, ১৯১১)।

প্রবন্ধ, ভ্রমণসাহিত্যচিত্রকলা

প্রবন্ধসমাজচিন্তা

রবীন্দ্রনাথ ৩৬টি প্রবন্ধগ্রন্থ লিখেছেনসমাজ থেকে দর্শন, রাজনীতি থেকে সাহিত্যতত্ত্ব, ইতিহাস থেকে ভাষাবিজ্ঞানকোনো বিষয় বাদ যায়নি। 'সমাজ' (১৯০৮) সংকলনে আছে তাঁর সমাজচিন্তামূলক প্রবন্ধ। 'কালান্তর' (১৯৩৭) সংকলনে রাজনৈতিক প্রবন্ধ। 'ধর্ম' (১৯০৯) ও 'শান্তিনিকেতন' (১৯০৯-১৬) — ধর্মীয়আধ্যাত্মিক ভাষণ। 'সাহিত্য', 'প্রাচীন সাহিত্য', 'আধুনিক সাহিত্য' (সবগুলোই ১৯০৭) — সাহিত্যবিষয়ক। 'চরিত্রপূজা' (১৯০৭) — মনীষী জীবনচরিত। 'ভারতবর্ষ' (১৯০৬) — ইতিহাস বিষয়ক

১৯৩০-এর দশকে তিনি ভারতীয় সমাজের বর্ণাশ্রম প্রথাঅস্পৃশ্যতার তীব্র সমালোচনা করেনগান্ধীজির হরিজন আন্দোলনের সঙ্গে তিনি একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন

ভ্রমণসাহিত্য

রবীন্দ্রনাথ বারো বার বিশ্বভ্রমণে বের হয়েছিলেনপাঁচ মহাদেশের ত্রিশটিরও বেশি দেশ ঘুরেছেনপ্রতিটি ভ্রমণ থেকে সাহিত্যের ফসল। 'য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র' (১৮৮১) — প্রথম ইংল্যান্ড সফরের কাহিনি। 'জাপান যাত্রী' (১৯১৯) — জাপান সফর। 'রাশিয়ার চিঠি' (১৯৩১) — সোভিয়েত রাশিয়া। 'পারস্যে' (১৯৩৬) — ইরান ভ্রমণআত্মজীবনী — 'জীবনস্মৃতি' (১৯১২), 'ছেলেবেলা' (১৯৪০)।

ভ্রমণ/সাল

দেশ

গ্রন্থ

১৮৭৮

প্রথম ইংল্যান্ড

য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১)

১৯১২

তৃতীয় ইংল্যান্ড

গীতাঞ্জলি অনুবাদ পাঠ

১৯১৬-১৭

জাপান, যুক্তরাষ্ট্র

জাপান যাত্রী (১৯১৯)

১৯২৪

চীন, জাপান

১৯২৬

ইতালি

মুসোলিনির সঙ্গে দেখা; পরে সমালোচনা

১৯২৭

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া

জাভা, বালি, সিঙ্গাপুর

১৯৩০

ইংল্যান্ড, সোভিয়েত

রাশিয়ার চিঠি (১৯৩১)

১৯৩২

ইরাক, ইরান

পারস্যে (১৯৩৬)

১৯৩৪

শ্রীলঙ্কা

শেষ বিদেশ সফর

চিত্রকলা

রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রতিভার দিক হলো তাঁর চিত্রকলাআশ্চর্যের কথা, ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন তিনি ৬৭ বছর বয়সে! কিন্তু এই দেরিতে শুরু করেও জীবনে এঁকেছেন প্রায় দু'হাজার ছবিস্বশিক্ষিত হয়েও তাঁর চিত্রশৈলী এতই নিজস্বআধুনিক যে পশ্চিমা সমালোচকরা চমকে গিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালে প্যারিসে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী হয়বার্লিন, লন্ডন, রাশিয়াতেও

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথ মোট ১২ বার বিদেশ ভ্রমণ — ৫টি মহাদেশের ৩০-এর বেশি দেশশেষ বিদেশ সফর: ১৯৩৪ সালে শ্রীলঙ্কাছবি আঁকা শুরু: ৬৭ বছর বয়সেমোট ছবি: প্রায় ২০০০।

শেষ জীবন: রোগশয্যা থেকে আরোগ্য

জীবনের শেষ দশক — ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ — রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে উদ্ভাবনী পর্ববয়স তখন একাত্তর থেকে আশিঅথচ এই দশ বছরে প্রকাশিত হলো ৫০টিরও বেশি গ্রন্থ! গদ্যকবিতা, নৃত্যনাট্য, ছোট উপন্যাস, ছবিসব ক্ষেত্রে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষাতিনটি শেষ উপন্যাস — 'দুই বোন' (১৯৩৩), 'মালঞ্চ' (১৯৩৪), 'চার অধ্যায়' (১৯৩৪) — এই পর্বে রচিততিনটি বিখ্যাত নৃত্যনাট্যচিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬), শ্যামা (১৯৩৯), চণ্ডালিকা (১৯৩৯) — এই সময়ের ফসলঅধিকাংশ ছবিও এই পর্বে আঁকা

কিন্তু শরীর ক্রমে দুর্বল হচ্ছিল। ১৯৪০ সাল থেকে শয্যাশায়ীতাঁর শেষ তিনটি কাব্যগ্রন্থ — 'রোগশয্যা' (১৯৪০), 'আরোগ্য' (১৯৪১), 'শেষ লেখা' (১৯৪১) — মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লেখা

১৯৪১ সালেরআগস্টবাংলা ক্যালেন্ডারে ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ — কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িযেখানে তিনি জন্মেছিলেন, ঠিক সেই বাড়িতেই কবিগুরু মহাপ্রয়াণ করলেনবয়স ৮০ বছরতাঁর শেষ লেখা একটি কবিতাসেদিনই বলেছিলেনকেউ লিখে নিলমৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি সৃষ্টিতে মগ্ন

জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসোরবীন্দ্রনাথের অন্যতম শেষ গান

২২ শ্রাবণসেইদিন থেকে এই দিনটি বাঙালির শোক-দিবসপ্রতি বছর সেদিন বাংলায় রবীন্দ্রস্মরণ অনুষ্ঠান হয়তাঁর গান, কবিতা, চিন্তাসব আজও বাঙালির প্রাণে স্পন্দিততিনি গিয়েছেন, কিন্তু যাননিবাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি একটি স্থায়ী নক্ষত্রযা থাকবে যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে

মৃত্যু: ৭ আগস্ট ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)। স্থান: জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, কলকাতাবয়স: ৮০ বছরশেষ পরিবেশনা: কবিতাগানমৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত

প্রশ্নোত্তর

জীবনী সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম কবে?

উত্তর: মে ১৮৬১ (২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ)

প্রশ্ন: জন্মস্থান?

উত্তর: কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে (৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন)

প্রশ্ন: পিতার নাম?

উত্তর: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (মহর্ষি)

প্রশ্ন: মাতার নাম?

উত্তর: সারদা দেবী

প্রশ্ন: পিতামহের নাম?

উত্তর: দ্বারকানাথ ঠাকুর ('প্রিন্স দ্বারকানাথ')

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ পিতামাতার কততম সন্তান?

উত্তর: চৌদ্দ ভাইবোনের কনিষ্ঠতম

প্রশ্ন: স্ত্রীর নাম?

উত্তর: মৃণালিনী দেবী (পূর্বনাম: ভবতারিণী)

প্রশ্ন: বিবাহের সময় স্ত্রীর বয়স?

উত্তর: মাত্র দশ বছর

প্রশ্ন: কতজন সন্তান ছিল?

উত্তর: পাঁচমাধুরীলতা (বেলা), রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা, শমীন্দ্রনাথ

প্রশ্ন: কিশোর বয়সের ছদ্মনাম?

উত্তর: ভানুসিংহ ('ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী')

প্রশ্ন: কোথায় ব্যারিস্টারি পড়তে যান?

উত্তর: ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (১৮৭৯) — ডিগ্রি না নিয়ে ফিরে আসেন

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের বড় ভাই কে ছিলেন (ভারতের প্রথম আইসিএস)?

উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রশ্ন: সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক কে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বোন?

উত্তর: স্বর্ণকুমারী দেবী

প্রশ্ন: নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী কে ছিলেন?

উত্তর: জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী; কিশোর কবির প্রথম প্রেরণা

প্রশ্ন: মৃত্যু কবে?

উত্তর: আগস্ট ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ)

প্রশ্ন: মৃত্যুস্থান?

উত্তর: জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি, কলকাতা

পুরস্কারসম্মান

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ কত সালে নোবেল পুরস্কার পান?

উত্তর: ১৯১৩

প্রশ্ন: কোন গ্রন্থের জন্য নোবেল?

উত্তর: গীতাঞ্জলি (ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings, ১৯১২)

প্রশ্ন: গীতাঞ্জলির ইংরেজি ভূমিকা লেখক?

উত্তর: ডব্লিউ. বি. ইয়েটস (W. B. Yeats)

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ কোথাকার প্রথম নোবেল বিজয়ী?

উত্তর: সমগ্র এশিয়া মহাদেশের প্রথম এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ

প্রশ্ন: নাইটহুড উপাধি কবে পান?

উত্তর: ১৯১৫ — ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে

প্রশ্ন: নাইটহুড কবে বর্জন করেন?

উত্তর: ১৯১৯ — জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে

প্রশ্ন: কয়টি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা?

উত্তর: দুটিভারতের 'জনগণমন' এবং বাংলাদেশের 'আমার সোনার বাংলা'

প্রশ্ন: 'আমার সোনার বাংলা' কত সালে রচিত?

উত্তর: ১৯০৫ — বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে

প্রশ্ন: 'জনগণমন' কত সালে রচিত?

উত্তর: ১৯১১

শান্তিনিকেতনবিশ্বভারতী

প্রশ্ন: শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম কবে?

উত্তর: ১৯০১

প্রশ্ন: বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কবে?

উত্তর: ১৯২১

প্রশ্ন: বিশ্বভারতীর নীতিবাক্য?

উত্তর: 'যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্' (যেখানে সমগ্র বিশ্ব এক বাসায় মিলিত হয়)

প্রশ্ন: শান্তিনিকেতন কোথায়?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরে

প্রশ্ন: নোবেলের অর্থ কীসের জন্য খরচ করেন?

উত্তর: বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার জন্য

উপন্যাস সংক্রান্ত

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ মোট কয়টি উপন্যাস লিখেছেন?

উত্তর: ১৩টি (করুণা সহ ১৪টি)

প্রশ্ন: প্রথম উপন্যাস?

উত্তর: করুণা (১৮৭৭) — গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিতপ্রথম প্রকাশিত: বৌ-ঠাকুরাণীর হাট (১৮৮৩)

প্রশ্ন: শ্রেষ্ঠ উপন্যাস?

উত্তর: গোরা (১৯১০)

প্রশ্ন: দীর্ঘতম উপন্যাস?

উত্তর: গোরা

প্রশ্ন: সাধু ভাষায় শেষ উপন্যাস?

উত্তর: গোরা

প্রশ্ন: গোরা উপন্যাসের পূর্বনাম কী ছিল?

উত্তর: দামিনী

প্রশ্ন: চোখের বালির প্রধান চরিত্র?

উত্তর: মহেন্দ্র, বিনোদিনী, আশালতা, বিহারী, রাজলক্ষ্মী, অন্নপূর্ণা

প্রশ্ন: চোখের বালি কোন পত্রিকায় ধারাবাহিক?

উত্তর: বঙ্গদর্শন (১৩০৮-১৩০৯ বঙ্গাব্দ)

প্রশ্ন: চোখের বালি কোন ধরনের উপন্যাস?

উত্তর: মনস্তাত্ত্বিক/দ্বন্দ্বমূলক

প্রশ্ন: ঘরে বাইরের পটভূমি?

উত্তর: ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলন

প্রশ্ন: ঘরে বাইরের প্রধান চরিত্র?

উত্তর: নিখিলেশ, বিমলা, সন্দীপ

প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের শেষ উপন্যাস?

উত্তর: চার অধ্যায় (১৯৩৪)

প্রশ্ন: চার অধ্যায়কে কী বলেছেন?

উত্তর: 'লিরিকের তোড়া'

প্রশ্ন: শেষের কবিতা কী ধরনের?

উত্তর: উপন্যাস (অনেকে কবিতার বই ভেবে ভুল করেন)

প্রশ্ন: শেষের কবিতাকে সুকুমার সেন কী বলেছেন?

উত্তর: 'চম্পু কাব্য'

প্রশ্ন: শেষের কবিতার নায়ক-নায়িকা?

উত্তর: অমিত রায়লাবণ্য

প্রশ্ন: দেশাত্মবোধক উপন্যাস তিনটি?

উত্তর: গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়

প্রশ্ন: যোগাযোগ-এর পূর্বনাম?

উত্তর: মিতা

প্রশ্ন: নৌকাডুবি কোন কবিতা অবলম্বনে?

উত্তর: নিজের 'ভগ্নতরী' কবিতা

কাব্যগ্রন্থ সংক্রান্ত

প্রশ্ন: কত কাব্যগ্রন্থ?

উত্তর: ৫২টি

প্রশ্ন: প্রথম কাব্যগ্রন্থ?

উত্তর: কবি-কাহিনী (১৮৭৮)

প্রশ্ন: ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী কে রচনা করেন?

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (ছদ্মনাম 'ভানুসিংহ')

প্রশ্ন: 'খেয়া' কী ধরনের গ্রন্থ?

উত্তর: কাব্যগ্রন্থ (১৯০৬)

প্রশ্ন: 'পুনশ্চ' কী ধরনের?

উত্তর: গদ্যকবিতার সংকলন (১৯৩২)

প্রশ্ন: পূরবী কাকে উৎসর্গ?

উত্তর: ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো (আর্জেন্টাইন লেখিকা)

প্রশ্ন: সোনার তরী কত সালে?

উত্তর: ১৮৯৪

প্রশ্ন: গীতাঞ্জলি (বাংলা)?

উত্তর: ১৯১০

প্রশ্ন: গীতাঞ্জলি (ইংরেজি Song Offerings)?

উত্তর: ১৯১২

প্রশ্ন: গদ্যকবিতার সংকলন কোনগুলি?

উত্তর: পুনশ্চ, শেষ সপ্তক, শ্যামলী, পত্রপুট

নাটক সংক্রান্ত

প্রশ্ন: কতগুলো নাটক?

উত্তর: ৩৮টি

প্রশ্ন: প্রথম গীতিনাট্য?

উত্তর: বাল্মীকি প্রতিভা (১৮৮১)

প্রশ্ন: রক্তকরবীর কেন্দ্রীয় চরিত্র?

উত্তর: রাজানন্দিনী

প্রশ্ন: রক্তকরবী কত সালে?

উত্তর: ১৯২৬

প্রশ্ন: ডাকঘরের প্রধান চরিত্র?

উত্তর: অমল (রোগী বালক)

প্রশ্ন: ডাকঘর কত সালে?

উত্তর: ১৯১২

প্রশ্ন: চিত্রাঙ্গদা কী?

উত্তর: নাট্যকাব্য (১৮৯২), পরে নৃত্যনাট্য (১৯৩৬)

প্রশ্ন: তিনটি নৃত্যনাট্য?

উত্তর: চিত্রাঙ্গদা (১৯৩৬), শ্যামা (১৯৩৯), চণ্ডালিকা (১৯৩৯)

প্রশ্ন: চণ্ডালিকার বিষয়?

উত্তর: অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

প্রশ্ন: বিসর্জন নাটকের বিষয়?

উত্তর: ত্রিপুরার পশুবলির বিরুদ্ধে

ছোটগল্পঅন্যান্য

প্রশ্ন: কতটি ছোটগল্প?

উত্তর: ১১৯+; গল্পগুচ্ছে ৯৫টি

প্রশ্ন: বাংলা ছোটগল্পের জনক?

উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রশ্ন: কাবুলিওয়ালার চরিত্র?

উত্তর: রহমত (কাবুলি ব্যবসায়ী) ও মিনি

প্রশ্ন: ছুটির প্রধান চরিত্র?

উত্তর: ফটিক

প্রশ্ন: নষ্টনীড় থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র?

উত্তর: সত্যজিরায়ের 'চারুলতা' (১৯৬৪)

প্রশ্ন: কতটি গান?

উত্তর: প্রায় ২২৩২ (গীতবিতানে ১৯১৫)

প্রশ্ন: আত্মজীবনী?

উত্তর: জীবনস্মৃতি (১৯১২), ছেলেবেলা (১৯৪০)

প্রশ্ন: রবীন্দ্র রচনাবলী কত খণ্ডে?

উত্তর: ৩২ খণ্ডে

প্রশ্ন: কতবার বিদেশ ভ্রমণ?

উত্তর: ১২ বার (৫ মহাদেশ, ৩০+ দেশ)

প্রশ্ন: শেষ বিদেশ সফর?

উত্তর: ১৯৩৪ — শ্রীলঙ্কা

প্রশ্ন: কতটি ছবি এঁকেছিলেন?

উত্তর: প্রায় ২০০০

ট্রিকি তথ্য সংকলন

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যুদুই তারিখেই '৭' আছেজন্ম: ৭ মেমৃত্যু: ৭ আগস্ট

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথ কখনো ব্যারিস্টার হননি, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করেননি

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্রনাথ মাত্র দশ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে করেছিলেনমৃণালিনী দেবী (পূর্বনাম ভবতারিণী)।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: চৌদ্দ ভাইবোনের কনিষ্ঠতম রবীন্দ্রনাথবড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ, দ্বিতীয় সত্যেন্দ্রনাথ (ভারতের প্রথম আইসিএস), মেজোদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীরবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রেরণা — ১৮৮৪ সালে আত্মহত্যা করেন

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নোবেল পুরস্কার ১৯১৩ — সমগ্র এশিয়ার প্রথম, প্রথম অশ্বেতাঙ্গকাব্য: গীতাঞ্জলি (ইংরেজি)। ভূমিকা: W. B. Yeats।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নাইটহুড: ১৯১৫ বর্জন: ১৯১৯ (জালিয়ানওয়ালাবাগ গণহত্যার প্রতিবাদে)।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: গোরারবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ, দীর্ঘতম, এপিকধর্মী, সাধু ভাষায় শেষ উপন্যাসপূর্বনাম 'দামিনী'।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: ভানুসিংহরবীন্দ্রনাথের কিশোর বয়সের ছদ্মনামপদাবলী 'ভারতী' পত্রিকায় ১৮৭৭ সালে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: শান্তিনিকেতন: ১৯০১ (ব্রহ্মচর্যাশ্রম)। বিশ্বভারতী: ১৯২১। নীতিবাক্য: যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: দুই দেশের জাতীয় সঙ্গীত: 'আমার সোনার বাংলা' (বাংলাদেশ, ১৯০৫) — বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে। 'জনগণমন' (ভারত, ১৯১১)।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: শেষের কবিতাউপন্যাস, কবিতার বই নয়সুকুমার সেন একে বলেছেন 'চম্পু কাব্য'। বুদ্ধদেব বসু: 'রবীন্দ্রনাথের নবজন্ম শেষের কবিতায়'।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: দেশাত্মবোধক উপন্যাস তিনটি: গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায়

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: ছবি আঁকা শুরু ৬৭ বছর বয়সেমোট ২০০০ ছবিসম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: পূরবী কাব্য উৎসর্গকৃত আর্জেন্টিনার লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: পদ্মাপাড়ের জীবন (১৮৯০-১৯০১) — শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরবাংলা ছোটগল্পের জন্ম এই পর্বে

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: রবীন্দ্র রচনাবলী ৩২ খণ্ডেগান প্রায় ২২৩২ — গীতবিতানে ১৯১৫। ছোটগল্প ১১৯+ — গল্পগুচ্ছে ৯৫।

পরীক্ষার জন্য মনে রাখুন: নৌকাডুবির ভিত্তিরবীন্দ্রনাথের নিজের 'ভগ্নতরী' কবিতা

চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ তালিকা

বিষয়

উত্তর

জন্ম

মে ১৮৬১ (২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ); জোড়াসাঁকো, কলকাতা

মৃত্যু

আগস্ট ১৯৪১ (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮); জোড়াসাঁকো

পিতা

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (মহর্ষি)

মাতা

সারদা দেবী

পিতামহ

দ্বারকানাথ ঠাকুর ('প্রিন্স')

স্ত্রী

মৃণালিনী দেবী (পূর্বে ভবতারিণী)

সন্তান

৫ — মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা, শমীন্দ্রনাথ

ছদ্মনাম

ভানুসিংহ

উপাধি

কবিগুরু, বিশ্বকবি, গুরুদেব

নোবেল

১৯১৩ — গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদের জন্য

প্রথম এশীয়

সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী

নাইটহুড

১৯১৫ বর্জন ১৯১৯ (জালিয়ানওয়ালাবাগ)

শান্তিনিকেতন

১৯০১ (ব্রহ্মচর্যাশ্রম)

বিশ্বভারতী

১৯২১

নীতিবাক্য

যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্

মোট কাব্যগ্রন্থ

৫২টি

মোট নাটক

৩৮টি

মোট উপন্যাস

১৩টি (করুণা সহ ১৪)

মোট প্রবন্ধগ্রন্থ

৩৬টি

মোট গান

প্রায় ২২৩২ (গীতবিতানে ১৯১৫)

মোট ছোটগল্প

১১৯+ (গল্পগুচ্ছে ৯৫)

মোট ছবি

প্রায় ২০০০

রবীন্দ্র রচনাবলী

৩২ খণ্ডে

প্রথম কাব্যগ্রন্থ

কবি-কাহিনী (১৮৭৮)

প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস

বৌ-ঠাকুরাণীর হাট (১৮৮৩)

শ্রেষ্ঠ উপন্যাস

গোরা (১৯১০)

শেষ উপন্যাস

চার অধ্যায় (১৯৩৪)

শ্রেষ্ঠ কাব্য

গীতাঞ্জলি (১৯১০)

প্রথম নাটক

বাল্মীকি প্রতিভা (১৮৮১) — গীতিনাট্য

আত্মজীবনী

জীবনস্মৃতি (১৯১২), ছেলেবেলা (১৯৪০)

জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা

ভারতবাংলাদেশদুই দেশের

আমার সোনার বাংলা

১৯০৫ — বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে

জনগণমন

১৯১১

বিদেশ ভ্রমণ

১২ বার, ৫ মহাদেশ, ৩০+ দেশ

শেষ বিদেশ সফর

১৯৩৪ — শ্রীলঙ্কা

━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━

কবিগুরুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আছি, আছি, আছিসর্ব রূপে আছি, সকল কালে আছি।”

Review this chapter

You Can Also Read

Chapters closely related to the one you are reading now.

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

লেখকদের ছদ্মনাম ও উপাধি

No reviews
0 students
Read chapter

মীর মশাররফ হোসেন

No reviews
0 students
Read chapter

লোকসাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

Most Read by Students

Popular picks getting the strongest student traffic right now.

অসহযোগ আন্দোলন (মার্চ ১৯৭১)

No reviews
1 student
Read chapter

নদী, সেতু, পাহাড়, দ্বীপ, বন, সমুদ্রবন্দর

No reviews
1 student
Read chapter

বাংলা ভাষার রীতি

No reviews
1 student
Read chapter

Others Who Read This Also Read

Behavior-based suggestions from student reading patterns where available.

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

লেখকদের ছদ্মনাম ও উপাধি

No reviews
0 students
Read chapter

মীর মশাররফ হোসেন

No reviews
0 students
Read chapter

লোকসাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

Best Reviewed

Chapters earning the strongest student feedback.

মুনীর চৌধুরী

No reviews
0 students
Read chapter

রোমান্টিক প্রণয়োপখ্যান

No reviews
0 students
Read chapter

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

লেখকদের ছদ্মনাম ও উপাধি

No reviews
0 students
Read chapter

মীর মশাররফ হোসেন

No reviews
0 students
Read chapter

লোকসাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

Course Suggestions

Want a more guided path after this chapter? These courses are the closest fit.

Browse all courses
Learner fit৳1,999

Bangla

Bangla Language Mastery

Popular with BCS learners who want guided study.

6 lessons8.5h4.9 (186)1.3K students

By Sadia Rahman

View course
Learner fit৳2,999

Platform Building

Teacher Marketplace Blueprint

Popular with BCS learners who want guided study.

5 lessons6.8h4.9 (28)410 students

By Sadia Rahman

View course
FreeFree

English

Admission English Playbook

Free guided course with lessons you can jump into anytime.

4 lessons4.2h4.8 (91)2.8K students

By Rayan Akter

View course