কর্মকারক
◆ ১. কারক পর্যালোচনা ও কর্মকারকের অবস্থান
বাংলা ব্যাকরণে ছয়টি কারক আছে। কর্মকারক তার মধ্যে দ্বিতীয়। নিচে সংক্ষেপে সব কারকের পরিচয় দিয়ে কর্মকারক চিহ্নিত করা হয়েছে:
কারক | চেনার প্রশ্ন | বিভক্তি | উদাহরণ |
কর্তৃকারক | কে / কারা ক্রিয়া করে? | শূন্য / রা / কর্তৃক | রাহেলা পড়ে |
কর্মকারক ★ | কাকে / কী ক্রিয়া করা হয়? | কে / রে / শূন্য | রাহেলা বই পড়ে |
করণকারক | কীসের সাহায্যে? | দিয়ে / দ্বারা | কলম দিয়ে লেখে |
সম্প্রদানকারক | কার জন্য দেওয়া হয়? | কে / রে / জন্য | ভিখারিকে দাও |
অপাদানকারক | কোথা থেকে / কী থেকে? | থেকে / হতে | গাছ থেকে ফল পড়ে |
অধিকরণকারক | কোথায় / কখন? | তে / এ / য় | ঘরে বসে পড়ি |
◆ ২. কর্মকারক — সংজ্ঞা ও মূল ধারণা
সংজ্ঞা: ক্রিয়া সম্পাদনের ফলে যে পদ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয় বা ক্রিয়ার ফল যার উপর সরাসরি পতিত হয়, তাকে কর্ম বলে — এবং কর্মের সাথে ক্রিয়ার সম্পর্ককে কর্মকারক বলে। চেনার প্রশ্ন: ক্রিয়াকে 'কাকে?' বা 'কী?' প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় — সেটিই কর্মকারক। বিভক্তি: শূন্য বিভক্তি (অপ্রাণিবাচক কর্মে), কে / রে বিভক্তি (প্রাণিবাচক কর্মে)। |
মূল উদাহরণ বিশ্লেষণ:
উদাহরণ ১: রাহেলা বই পড়ে। প্রশ্ন: রাহেলা কী পড়ে? → বই। অতএব, 'বই' কর্মকারকে (শূন্য বিভক্তি)। |
উদাহরণ ২: মা ছেলেকে ভালোবাসেন। প্রশ্ন: মা কাকে ভালোবাসেন? → ছেলেকে। অতএব, 'ছেলেকে' কর্মকারকে (কে-বিভক্তি)। |
উদাহরণ ৩: পুলিশ চোরকে ধরল। প্রশ্ন: পুলিশ কাকে ধরল? → চোরকে। অতএব, 'চোরকে' কর্মকারকে (কে-বিভক্তি)। |
◆ ৩. কর্মকারকের বিভক্তি — বিস্তারিত
বিভক্তি | কখন ব্যবহার হয় | উদাহরণ বাক্য | কর্মপদ |
শূন্য (∅) | অপ্রাণিবাচক কর্মে (সাধারণত) | রাহেলা বই পড়ে। | বই |
শূন্য (∅) | কিছু প্রাণিবাচক কর্মেও | আমি মাছ খাই। | মাছ |
কে | প্রাণিবাচক কর্মে (সচরাচর) | মা ছেলেকে ডাকেন। | ছেলেকে |
কে | গন্তব্য বা প্রেরণে | স্কুলকে চিনি। | স্কুলকে |
রে | কাব্যিক / আঞ্চলিক ব্যবহারে | তোরে দেখিব। | তোরে |
দিগকে / দের | বহুবচন প্রাণিবাচক কর্মে | ছেলেদের পড়াই। | ছেলেদের |
য় / তে | ক্রিয়াবাচক কর্মনামে | পড়ায় মন দাও। | পড়ায় |
পরীক্ষার টিপস: প্রাণিবাচক শব্দে সাধারণত 'কে' বিভক্তি এবং অপ্রাণিবাচক শব্দে শূন্য বিভক্তি হয়। তবে ব্যতিক্রমও আছে — যেমন 'মাছ খাই' (প্রাণী হলেও শূন্য বিভক্তি)। |
◆ ৪. কর্মকারকের প্রকারভেদ
কর্মকারককে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: মুখ্য কর্ম ও গৌণ কর্ম।
▸ ৪.১ মুখ্য কর্ম (Direct Object)
সংজ্ঞা: ক্রিয়ার ফল যার উপর সরাসরি পড়ে — সে পদই মুখ্য কর্ম। ক্রিয়াকে 'কাকে?' বা 'কী?' প্রশ্ন করলে মুখ্য কর্ম পাওয়া যায়। এটি সকর্মক ক্রিয়ার প্রধান কর্ম। |
বাক্য | মুখ্য কর্ম | প্রশ্ন | বিভক্তি |
রাহেলা বই পড়ে। | বই | কী পড়ে? | শূন্য |
মা ভাত রান্না করেন। | ভাত | কী রান্না করেন? | শূন্য |
পুলিশ চোরকে ধরল। | চোরকে | কাকে ধরল? | কে |
শিক্ষক প্রশ্ন করলেন। | প্রশ্ন | কী করলেন? | শূন্য |
সে গান গায়। | গান | কী গায়? | শূন্য |
রাহেলা ছবি আঁকে। | ছবি | কী আঁকে? | শূন্য |
ডাক্তার রোগী দেখেন। | রোগী | কাকে দেখেন? | শূন্য |
কর্মী কাজ করে। | কাজ | কী করে? | শূন্য |
মেয়েটি পুতুল খেলে। | পুতুল | কী খেলে? | শূন্য |
নেতা বক্তৃতা দেন। | বক্তৃতা | কী দেন? | শূন্য |
কৃষক মাঠ চাষ করে। | মাঠ | কী চাষ করে? | শূন্য |
সে বাড়ি বানাচ্ছে। | বাড়ি | কী বানাচ্ছে? | শূন্য |
▸ ৪.২ গৌণ কর্ম (Indirect Object)
সংজ্ঞা: যে কর্মপদ মুখ্য কর্মের সুবিধা বা অসুবিধা লাভ করে — সে পদকে গৌণ কর্ম বলে। ক্রিয়াকে 'কাকে দেওয়া হয়?' প্রশ্ন করলে গৌণ কর্ম পাওয়া যায়। একটি বাক্যে একসাথে মুখ্য ও গৌণ কর্ম থাকতে পারে। |
বাক্য | মুখ্য কর্ম (কী?) | গৌণ কর্ম (কাকে?) | ব্যাখ্যা |
মা ছেলেকে ভাত খাওয়ান। | ভাত | ছেলেকে | ভাত = মুখ্য কর্ম; ছেলে = গৌণ কর্ম |
শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন। | বই | ছাত্রকে | বই = মুখ্য কর্ম; ছাত্র = গৌণ কর্ম |
বাবা মেয়েকে টাকা দিলেন। | টাকা | মেয়েকে | টাকা = মুখ্য; মেয়ে = গৌণ |
রাহেলা বন্ধুকে চিঠি পাঠাল। | চিঠি | বন্ধুকে | চিঠি = মুখ্য; বন্ধু = গৌণ |
নার্স রোগীকে ওষুধ দিল। | ওষুধ | রোগীকে | ওষুধ = মুখ্য; রোগী = গৌণ |
মা শিশুকে দুধ খাওয়ান। | দুধ | শিশুকে | দুধ = মুখ্য; শিশু = গৌণ |
ভিখারিকে ভাত দাও। | ভাত | ভিখারিকে | ভাত = মুখ্য; ভিখারি = গৌণ |
তিনি সবাইকে পুরস্কার দিলেন। | পুরস্কার | সবাইকে | পুরস্কার = মুখ্য; সবাই = গৌণ |
সে আমাকে গল্প শোনাল। | গল্প | আমাকে | গল্প = মুখ্য; আমি = গৌণ |
সরকার জনগণকে সুবিধা দেয়। | সুবিধা | জনগণকে | সুবিধা = মুখ্য; জনগণ = গৌণ |
মুখ্য ও গৌণ কর্মের পার্থক্য: মুখ্য কর্মে 'কী?' প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় — সাধারণত অপ্রাণিবাচক। গৌণ কর্মে 'কাকে?' প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় — সাধারণত প্রাণিবাচক। |
◆ ৫. সকর্মক ও অকর্মক ক্রিয়ার সাথে কর্মকারকের সম্পর্ক
সকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার একটি কর্মপদ থাকে — তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে। কর্মকারক শুধুমাত্র সকর্মক ক্রিয়ার সাথেই সম্পর্কিত। অকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার কর্মপদ নেই — তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে। অকর্মক ক্রিয়ার সাথে কর্মকারক থাকে না। |
ক্রিয়ার ধরন | বাক্য | কর্ম আছে? | ব্যাখ্যা |
সকর্মক (একটি কর্ম) | সে বই পড়ে। | হ্যাঁ — বই | একটি মুখ্য কর্ম |
সকর্মক (একটি কর্ম) | রাহেলা গান করে। | হ্যাঁ — গান | একটি মুখ্য কর্ম |
দ্বিকর্মক ক্রিয়া | শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন। | হ্যাঁ — দুটো | মুখ্য ও গৌণ উভয় |
দ্বিকর্মক ক্রিয়া | মা ছেলেকে ভাত খাওয়ান। | হ্যাঁ — দুটো | মুখ্য ও গৌণ উভয় |
অকর্মক | পাখি উড়ে। | না | কর্মপদ নেই |
অকর্মক | শিশু কাঁদছে। | না | কর্মপদ নেই |
অকর্মক | নদী বহে। | না | কর্মপদ নেই |
অকর্মক | সে হাসছে। | না | কর্মপদ নেই |
◆ ৬. প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক কর্মের বিভক্তি
▸ ৬.১ প্রাণিবাচক কর্ম — 'কে' বিভক্তি
প্রাণী বা মানুষ যখন কর্মপদ হয়, তখন সাধারণত 'কে' বিভক্তি যুক্ত হয়।
বাক্য | কর্মপদ | বিভক্তি | প্রাণীর ধরন |
মা ছেলেকে ডাকলেন। | ছেলেকে | কে | মানুষ |
পুলিশ চোরকে ধরল। | চোরকে | কে | মানুষ |
শিক্ষক ছাত্রকে বকলেন। | ছাত্রকে | কে | মানুষ |
সে বন্ধুকে চেনে। | বন্ধুকে | কে | মানুষ |
শিকারি বাঘকে গুলি করল। | বাঘকে | কে | হিংস্র প্রাণী |
সে কুকুরকে খাবার দিল। | কুকুরকে | কে | গৃহপালিত প্রাণী |
ডাক্তার রোগীকে দেখলেন। | রোগীকে | কে | মানুষ |
মেয়েটি পাখিকে মুক্তি দিল। | পাখিকে | কে | পাখি |
রাহেলা তাকে ভালোবাসে। | তাকে | কে | সর্বনাম |
সে তোমাকে চেনে। | তোমাকে | কে | সর্বনাম |
মা আমাকে ডাকলেন। | আমাকে | কে | সর্বনাম |
শিক্ষক সবাইকে পড়ালেন। | সবাইকে | কে | সর্বনাম |
সে তাদেরকে সাহায্য করল। | তাদেরকে | কে | সর্বনাম |
কোচ খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ দেন। | খেলোয়াড়দের | কে | মানুষ |
▸ ৬.২ অপ্রাণিবাচক কর্ম — শূন্য বিভক্তি
নির্জীব বস্তু বা ধারণা যখন কর্মপদ হয়, তখন সাধারণত শূন্য বিভক্তি হয়।
বাক্য | কর্মপদ | বিভক্তি | বস্তুর ধরন |
রাহেলা বই পড়ে। | বই | শূন্য | লিখিত বস্তু |
সে গান গায়। | গান | শূন্য | শিল্পকলা |
কৃষক মাঠ চাষ করে। | মাঠ | শূন্য | ভূমি |
মা ভাত রান্না করেন। | ভাত | শূন্য | খাদ্য |
সে বাড়ি বানাচ্ছে। | বাড়ি | শূন্য | নির্মাণ |
রাহেলা ছবি আঁকে। | ছবি | শূন্য | শিল্পকলা |
সে চিঠি লেখে। | চিঠি | শূন্য | লিখিত |
সে পানি পান করে। | পানি | শূন্য | তরল |
বাবা গাড়ি কিনলেন। | গাড়ি | শূন্য | যান |
নেতা বক্তৃতা দেন। | বক্তৃতা | শূন্য | বাচিক |
সে সত্য বলে। | সত্য | শূন্য | বিমূর্ত |
সে ঘুম দিয়েছে। | ঘুম | শূন্য | ক্রিয়াবাচক |
জনগণ ভোট দেয়। | ভোট | শূন্য | ধারণা |
শিশু খেলনা ভেঙেছে। | খেলনা | শূন্য | বস্তু |
▸ ৬.৩ ব্যতিক্রম — প্রাণী কর্মে শূন্য বিভক্তি
বিশেষ ক্ষেত্রে প্রাণিবাচক কর্মেও শূন্য বিভক্তি হয়। সাধারণত খাদ্য হিসেবে বা পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলে, অথবা প্রচলিত বাগধারায়। |
বাক্য | কর্মপদ | বিভক্তি | কারণ |
আমি মাছ খাই। | মাছ | শূন্য | খাদ্য হিসেবে |
সে মুরগি রান্না করল। | মুরগি | শূন্য | খাদ্য হিসেবে |
জেলে মাছ ধরে। | মাছ | শূন্য | পণ্য হিসেবে |
শিকারি হরিণ মারল। | হরিণ | শূন্য | শিকার হিসেবে |
সে গরু বেচল। | গরু | শূন্য | পণ্য হিসেবে |
মেলায় ঘোড়া বিক্রি হয়। | ঘোড়া | শূন্য | পণ্য হিসেবে |
সাপ ব্যাঙ ধরে। | ব্যাঙ | শূন্য | শিকার হিসেবে |
মেয়েটি পুতুল খেলে। | পুতুল | শূন্য | খেলনা হিসেবে (নির্জীব) |
পরীক্ষার টিপস: 'আমি মাছ খাই' — এখানে মাছ প্রাণী হলেও 'কে' বিভক্তি নয়, শূন্য বিভক্তি। কারণ এখানে মাছ খাদ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু 'আমি মাছটিকে বাঁচালাম' — এখানে 'মাছটিকে' কারণ প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষার কথা। |
◆ ৭. কর্মকারকের বিশেষ প্রকারভেদ
▸ ৭.১ সমধাতুজ কর্ম (Cognate Object)
সংজ্ঞা: ক্রিয়ার সাথে একই ধাতু বা একই অর্থের শব্দ থেকে গঠিত কর্মপদকে সমধাতুজ কর্ম বলে। এখানে ক্রিয়া ও কর্ম একই মূল থেকে আসে। |
বাক্য | কর্মপদ | ক্রিয়া | একই ধাতু? |
সে ঘুম দিয়েছে। | ঘুম | ঘুমানো (দিয়েছে) | হ্যাঁ — ঘুম |
সে খেলা খেলে। | খেলা | খেলা | হ্যাঁ — খেলা |
সে গান গায়। | গান | গাওয়া | হ্যাঁ — গান |
সে যুদ্ধ যুদ্ধ করে। | যুদ্ধ | যুদ্ধ করা | হ্যাঁ — যুদ্ধ |
সে হাঁটা হাঁটে। | হাঁটা | হাঁটা | হ্যাঁ — হাঁটা |
সে কান্না কাঁদে। | কান্না | কাঁদা | হ্যাঁ — কান্না |
সে স্বপ্ন দেখে। | স্বপ্ন | দেখা | হ্যাঁ — স্বপ্ন |
সে নাচ নাচে। | নাচ | নাচা | হ্যাঁ — নাচ |
সে দৌড় দৌড়ায়। | দৌড় | দৌড়ানো | হ্যাঁ — দৌড় |
সে লাফ লাফায়। | লাফ | লাফানো | হ্যাঁ — লাফ |
▸ ৭.২ পরিমাণ বা ক্রিয়াবিশেষণাত্মক কর্ম
সংজ্ঞা: কিছু বাক্যে কর্মপদ ক্রিয়ার পরিমাণ, দূরত্ব, সময় বা মাত্রা বোঝায় — এই ধরনের কর্মকে পরিমাণবাচক কর্ম বলা হয়। |
বাক্য | পরিমাণবাচক কর্ম | কী বোঝায় |
সে এক মাইল হেঁটেছে। | এক মাইল | দূরত্ব |
সে তিন ঘণ্টা ঘুমাল। | তিন ঘণ্টা | সময় |
সে পাঁচ কেজি চাল কিনল। | পাঁচ কেজি | পরিমাণ |
রাহেলা দশ মিনিট দৌড়াল। | দশ মিনিট | সময় |
সে বিশ টাকা খরচ করল। | বিশ টাকা | পরিমাণ |
সে দুইশত পৃষ্ঠা পড়েছে। | দুইশত পৃষ্ঠা | পরিমাণ |
▸ ৭.৩ ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য কর্মরূপে
সংজ্ঞা: কখনো কখনো একটি ক্রিয়ার বিশেষ্যরূপ অন্য ক্রিয়ার কর্ম হিসেবে কাজ করে। এটি কর্মকারকের একটি বিশেষ ব্যবহার। |
বাক্য | কর্মপদ | মূল ক্রিয়া |
সে পড়া পছন্দ করে। | পড়া | পড়া → বিশেষ্য |
রাহেলা সাঁতার শিখছে। | সাঁতার | সাঁতরানো |
সে নাচ ভালোবাসে। | নাচ | নাচা |
আমি রান্না শিখলাম। | রান্না | রান্না করা |
সে গান শুনতে পছন্দ করে। | গান | গাওয়া |
শিশু খেলা ভালোবাসে। | খেলা | খেলা |
◆ ৮. কর্মকারক ও সম্প্রদানকারকের পার্থক্য
সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর তুলনা: উভয় কারকে 'কাকে?' প্রশ্ন করা যায় এবং উভয়তেই 'কে' বিভক্তি আসে। পার্থক্য নিচে:
কর্মকারক: কর্তা যাকে সরাসরি ক্রিয়ার মাধ্যমে প্রভাবিত করে। সম্প্রদানকারক: কর্তা যাকে স্বেচ্ছায় কিছু দেয় বা উৎসর্গ করে — গ্রহণকারী পক্ষ। |
বাক্য | কে/কাকে পদটি | কারক | পার্থক্যের কারণ |
মা ছেলেকে ভালোবাসেন। | ছেলেকে | কর্মকারক | ভালোবাসার সরাসরি প্রভাব |
ভিখারিকে ভাত দাও। | ভিখারিকে | সম্প্রদানকারক | দানের উদ্দেশ্যে |
শিক্ষক ছাত্রকে মারলেন। | ছাত্রকে | কর্মকারক | মারার সরাসরি প্রভাব |
শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন। | ছাত্রকে | সম্প্রদানকারক | দেওয়ার উদ্দেশ্যে (গৌণ কর্ম) |
সে বন্ধুকে চিনে। | বন্ধুকে | কর্মকারক | চেনার সরাসরি প্রভাব |
সে বন্ধুকে ফুল দিল। | বন্ধুকে | সম্প্রদানকারক | দানের উদ্দেশ্যে |
পুলিশ চোরকে ধরল। | চোরকে | কর্মকারক | ধরার সরাসরি প্রভাব |
দেশকে ভালোবাসো। | দেশকে | কর্মকারক | ভালোবাসার প্রভাব |
পরীক্ষার টিপস: কর্মকারক ও সম্প্রদানকারকের মূল পার্থক্য: সম্প্রদানকারকে 'উদ্দেশ্যে দেওয়া' অর্থ থাকে। কর্মকারকে ক্রিয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে। পরীক্ষায় 'দেওয়া' বা 'প্রদান করা' থাকলে সম্প্রদান সন্দেহ করুন। |
◆ ৯. কর্মকারক ও করণকারকের পার্থক্য
করণকারকে 'দিয়ে' বা 'দ্বারা' থাকে এবং যন্ত্র বা উপায় বোঝায়। কর্মকারকে ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়া বস্তু থাকে।
বাক্য | কর্মকারক | করণকারক | পার্থক্য |
সে কলম দিয়ে বই লেখে। | বই | কলম দিয়ে | বই = কর্ম; কলম = যন্ত্র |
রাহেলা কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটে। | কাগজ | কাঁচি দিয়ে | কাগজ = কর্ম; কাঁচি = যন্ত্র |
কৃষক লাঙল দিয়ে মাঠ চাষ করে। | মাঠ | লাঙল দিয়ে | মাঠ = কর্ম; লাঙল = যন্ত্র |
সে হাত দিয়ে মুখ মোছে। | মুখ | হাত দিয়ে | মুখ = কর্ম; হাত = উপায় |
পুলিশ বন্দুক দিয়ে গুলি করল। | গুলি | বন্দুক দিয়ে | গুলি = কর্ম; বন্দুক = যন্ত্র |
সে সুই দিয়ে কাপড় সেলাই করে। | কাপড় | সুই দিয়ে | কাপড় = কর্ম; সুই = যন্ত্র |
◆ ১০. কর্মকারক ও অধিকরণকারকের পার্থক্য
অধিকরণে স্থান বা কাল বোঝায় — কর্মে ক্রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়া বস্তু বোঝায়।
বাক্য | কর্মকারক (কী?) | অধিকরণকারক (কোথায়?) | পার্থক্য |
সে স্কুলে পড়ে। | — | স্কুলে | স্কুল — স্থান |
সে বই পড়ে। | বই | — | বই — কর্ম |
মাছ পানিতে সাঁতরায়। | — | পানিতে | পানি — স্থান |
সে পানি পান করে। | পানি | — | পানি — কর্ম |
রাহেলা ঘরে ঘুমায়। | — | ঘরে | ঘর — স্থান |
সে ঘর বানাচ্ছে। | ঘর | — | ঘর — কর্ম |
◆ ১১. বিগত BCS ও ব্যাংক পরীক্ষায় আসা প্রশ্ন
প্রশ্ন / বাক্য | উত্তর | ব্যাখ্যা |
'রাহেলা বই পড়ে' — 'বই' কোন কারকে? | কর্মকারকে | কী পড়ে? → বই |
'মা ছেলেকে ডাকেন' — 'ছেলেকে' কোন কারক? | কর্মকারক | কাকে ডাকেন? → ছেলেকে |
'শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন' — কোনটি মুখ্য কর্ম? | বই | কী দিলেন? → বই |
'শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন' — 'ছাত্রকে' কোন কারক? | সম্প্রদানকারক | দানের উদ্দেশ্যে |
'আমি মাছ খাই' — 'মাছ' কোন কারক? | কর্মকারক | কী খাই? → মাছ (শূন্য) |
'সে ঘুম দিয়েছে' — কোন ধরনের কর্ম? | সমধাতুজ কর্ম | ঘুম = ঘুমানো থেকে |
কর্মকারকের চেনার প্রশ্ন কোনটি? | 'কাকে?' / 'কী?' | ক্রিয়াকে প্রশ্ন |
প্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত কোন বিভক্তি? | 'কে' বিভক্তি | যেমন: তাকে, ছেলেকে |
অপ্রাণিবাচক কর্মে সাধারণত কোন বিভক্তি? | শূন্য বিভক্তি | যেমন: বই, ভাত, গান |
'ভিখারিকে ভাত দাও' — 'ভিখারিকে' কোন কারক? | সম্প্রদানকারক | দানের উদ্দেশ্য |
'পুলিশ চোরকে ধরল' — 'চোরকে' কোন কারক? | কর্মকারক | সরাসরি প্রভাব |
দ্বিকর্মক ক্রিয়া কাকে বলে? | দুটি কর্ম যেখানে | মুখ্য ও গৌণ |
'সে গান গায়' — 'গান' কোন ধরনের কর্ম? | সমধাতুজ কর্ম | গান = গাওয়া |
◆ ১২. বিষয়ভিত্তিক বিস্তারিত উদাহরণ সমগ্র
► বিভাগ ক — পেশা ও কর্মসংক্রান্ত বাক্য
বাক্য | কর্মপদ | কর্মের ধরন |
কৃষক মাঠ চাষ করে। | মাঠ | মুখ্য কর্ম |
ডাক্তার রোগী দেখেন। | রোগী | মুখ্য কর্ম |
শিক্ষক পাঠ পড়ান। | পাঠ | মুখ্য কর্ম |
ইঞ্জিনিয়ার ব্রিজ তৈরি করেন। | ব্রিজ | মুখ্য কর্ম |
পুলিশ অপরাধী ধরে। | অপরাধী | মুখ্য কর্ম (প্রাণী) |
লেখক উপন্যাস লেখেন। | উপন্যাস | মুখ্য কর্ম |
চিত্রশিল্পী ছবি আঁকেন। | ছবি | মুখ্য কর্ম |
সংগীতশিল্পী গান গান। | গান | সমধাতুজ কর্ম |
নার্স রোগীকে ওষুধ দেন। | ওষুধ (মুখ্য), রোগীকে (গৌণ) | দ্বিকর্মক |
ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রি করেন। | পণ্য | মুখ্য কর্ম |
জেলে মাছ ধরে। | মাছ | মুখ্য কর্ম (শূন্য বিভক্তি) |
দর্জি কাপড় সেলাই করেন। | কাপড় | মুখ্য কর্ম |
► বিভাগ খ — পারিবারিক ও সামাজিক বাক্য
বাক্য | কর্মপদ | কর্মের ধরন |
মা ছেলেকে ভালোবাসেন। | ছেলেকে | মুখ্য কর্ম (প্রাণী) |
বাবা সন্তান মানুষ করেন। | সন্তান | মুখ্য কর্ম |
ভাই বোনকে সাহায্য করে। | বোনকে | মুখ্য কর্ম |
মা শিশুকে দুধ খাওয়ান। | দুধ (মুখ্য), শিশুকে (গৌণ) | দ্বিকর্মক |
বাবা মেয়েকে টাকা দিলেন। | টাকা (মুখ্য), মেয়েকে (গৌণ) | দ্বিকর্মক |
দাদা নাতিকে গল্প শোনান। | গল্প (মুখ্য), নাতিকে (গৌণ) | দ্বিকর্মক |
রাহেলা বন্ধুকে চিঠি পাঠাল। | চিঠি (মুখ্য), বন্ধুকে (গৌণ) | দ্বিকর্মক |
বৃদ্ধ মানুষটি সবাইকে চেনেন। | সবাইকে | মুখ্য কর্ম |
► বিভাগ গ — প্রাকৃতিক ও বিমূর্ত বাক্য
বাক্য | কর্মপদ | কর্মের ধরন |
সূর্য আলো দেয়। | আলো | মুখ্য কর্ম |
বৃষ্টি মাটি ভেজায়। | মাটি | মুখ্য কর্ম |
বন্যা ঘরবাড়ি ভাসায়। | ঘরবাড়ি | মুখ্য কর্ম |
ঝড় গাছ উপড়ে দেয়। | গাছ | মুখ্য কর্ম |
শিক্ষা মানুষ গড়ে। | মানুষ | মুখ্য কর্ম |
সত্য মানুষ জয় করে। | মানুষ | মুখ্য কর্ম |
ভালোবাসা দুঃখ দূর করে। | দুঃখ | মুখ্য কর্ম |
অজ্ঞতা ক্ষতি ডেকে আনে। | ক্ষতি | মুখ্য কর্ম |
► বিভাগ ঘ — মানসিক ক্রিয়ার কর্ম
বাক্য | কর্মপদ | মানসিক ক্রিয়া |
সে সত্য জানে। | সত্য | জানা |
রাহেলা তাকে ভালোবাসে। | তাকে | ভালোবাসা |
আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। | তোমাকে | বিশ্বাস করা |
সে মিথ্যা ঘৃণা করে। | মিথ্যা | ঘৃণা করা |
তুমি তাকে ভুলে গেছ। | তাকে | ভুলে যাওয়া |
সে বিপদ বোঝে। | বিপদ | বোঝা |
মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। | মৃত্যুকে | ভয় পাওয়া |
সে আনন্দ পায়। | আনন্দ | পাওয়া |
রাহেলা সাফল্য চায়। | সাফল্য | চাওয়া |
সে স্বাধীনতা পছন্দ করে। | স্বাধীনতা | পছন্দ করা |
► বিভাগ ঙ — সমধাতুজ কর্মের বিস্তারিত উদাহরণ
বাক্য | সমধাতুজ কর্ম | ক্রিয়ার ধাতু |
সে সুন্দর ঘুম দিয়েছে। | ঘুম | ঘুম |
শিশু মিষ্টি হাসি হাসল। | হাসি | হাসা |
সে দীর্ঘ কান্না কাঁদল। | কান্না | কাঁদা |
তারা জোরে গান গেয়েছে। | গান | গাওয়া |
খেলোয়াড় ভালো খেলা খেলল। | খেলা | খেলা |
শিশু লম্বা লাফ দিল। | লাফ | লাফানো |
সে মনের দৌড় দৌড়াল। | দৌড় | দৌড়ানো |
কবি অপূর্ব কবিতা লিখলেন। | কবিতা | লেখা |
নেতা জোশালো বক্তৃতা দিলেন। | বক্তৃতা | বলা |
শিল্পী সুন্দর নাচ নাচলেন। | নাচ | নাচা |
◆ ১৩. সম্পূর্ণ তুলনামূলক পার্থক্য — সব কারকের সাথে
একই শব্দ ভিন্ন কারকে | কারক | প্রশ্ন | বিভক্তি |
রাহেলা স্কুলে যায়। → 'স্কুলে' | অধিকরণকারক | কোথায়? | এ |
রাহেলা স্কুল চেনে। → 'স্কুল' | কর্মকারক | কী চেনে? | শূন্য |
স্কুল থেকে ফিরল। → 'স্কুল থেকে' | অপাদানকারক | কোথা থেকে? | থেকে |
— | — | — | — |
পানিতে মাছ থাকে। → 'পানিতে' | অধিকরণকারক | কোথায়? | তে |
সে পানি পান করে। → 'পানি' | কর্মকারক | কী পান করে? | শূন্য |
পানি থেকে উঠল। → 'পানি থেকে' | অপাদানকারক | কোথা থেকে? | থেকে |
— | — | — | — |
সে বন্ধুকে সাহায্য করল। | কর্মকারক | কাকে? | কে |
সে বন্ধুকে বই দিল। | সম্প্রদান | কার জন্য দিল? | কে (দেওয়ার উদ্দেশ্যে) |
◆ ১৪. অভ্যাস প্রশ্ন — সমাধানসহ
বাক্য | কর্মপদ | বিভক্তি | মুখ্য/গৌণ |
রাহেলা প্রতিদিন বই পড়ে। | বই | শূন্য | মুখ্য |
মা শিশুকে দুধ খাওয়ান। | দুধ ও শিশুকে | শূন্য/কে | মুখ্য ও গৌণ |
পুলিশ ডাকাতকে ধরল। | ডাকাতকে | কে | মুখ্য |
শিক্ষক ছাত্রদের পাঠ বোঝালেন। | পাঠ ও ছাত্রদের | শূন্য/কে | মুখ্য ও গৌণ |
সে গান গায়। | গান | শূন্য | সমধাতুজ |
আমি মাছ খাই। | মাছ | শূন্য | মুখ্য (ব্যতিক্রম) |
বাবা মেয়েকে ভালোবাসেন। | মেয়েকে | কে | মুখ্য |
বন্ধুকে ফুল দাও। | ফুল ও বন্ধুকে | শূন্য/কে | মুখ্য ও গৌণ |
সে স্বপ্ন দেখে। | স্বপ্ন | শূন্য | মুখ্য (সমধাতুজ) |
কৃষক লাঙল দিয়ে মাঠ চাষ করে। | মাঠ | শূন্য | মুখ্য |
নেতা জনগণকে আশ্বাস দিলেন। | আশ্বাস ও জনগণকে | শূন্য/কে | মুখ্য ও গৌণ |
সে তোমাকে ভয় পায়। | তোমাকে | কে | মুখ্য |
মা ছেলেকে গল্প শোনালেন। | গল্প ও ছেলেকে | শূন্য/কে | মুখ্য ও গৌণ |
শিক্ষক বোর্ডে অঙ্ক কষলেন। | অঙ্ক | শূন্য | মুখ্য |
রাহেলা তাকে চেনে। | তাকে | কে | মুখ্য |
সে একমাইল হেঁটেছে। | একমাইল | শূন্য | পরিমাণবাচক |
জেলে মাছ ধরে। | মাছ | শূন্য | মুখ্য (শূন্য বিভক্তি) |
বাবা আমাকে বাজারে পাঠালেন। | আমাকে | কে | গৌণ কর্ম |
সে নাচ ভালোবাসে। | নাচ | শূন্য | ক্রিয়াবাচক কর্ম |
ভালোবাসা মানুষ জয় করে। | মানুষ | শূন্য | মুখ্য |