বাংলা সাহিত্য
জসীমউদ্দীন
পল্লিকবি | বাংলার মাটির কবি
জীবন পরিচয় ও পটভূমি
◆ জন্ম ও শৈশব
১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জসীমউদ্দীন। তাঁর পুরো নাম মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা। বাংলা সাহিত্যে তিনি 'পল্লিকবি' নামে অমর হয়ে আছেন — গ্রামবাংলার হৃদয়ের কবি।
তাঁর পিতার নাম আনসারউদ্দীন মোল্লা এবং মাতার নাম আমিনা খাতুন। পরিবার ছিল মধ্যবিত্ত মুসলিম। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফরিদপুরের গ্রামীণ পরিবেশে — নদী, মাঠ, পাখি, নৌকা, ধানের শীষ — এই সব কিছুই তাঁর মনে গেঁথে গেছে গভীরভাবে। পরবর্তী জীবনে এই অভিজ্ঞতাই হয়েছে তাঁর কবিতার মূল উপাদান।
ফরিদপুর জেলার পদ্মা নদীর তীরের সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাত্রা, বিচ্ছেদের কান্না, বিবাহের আনন্দ, মৃত্যুর বেদনা — এই সব তাঁর কবিতায় এতটাই জীবন্ত যে মনে হয় পাঠক নিজেই সেই গ্রামে বসে আছেন।
⚡ জসীমউদ্দীনের জন্মস্থান — তাম্বুলখানা গ্রাম, ফরিদপুর। জন্ম — ১ জানুয়ারি ১৯০৩।
◆ শিক্ষাজীবন
ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯২১ সালে। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ১৯২৪ সালে আইএ পাস করেন। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। তিনি ১৯২৫ সালে বিএ পরীক্ষায় থাকাকালীন 'কবর' কবিতাটি রচনা করেন। তাঁর শিক্ষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন এই কবিতাটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেন — তখন জসীমউদ্দীন এখনও ছাত্র! এটি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা।
১৯২৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন। এরপর ড. দীনেশচন্দ্র সেনের গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন। পল্লিগীতি ও লোকসাহিত্য সংগ্রহ করার কাজে বেরিয়ে পড়েন বাংলার গ্রামে গ্রামে।
⚡ ছাত্রাবস্থায় 'কবর' কবিতা পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায় — বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অভূতপূর্ব!
◆ কর্মজীবন ও বিবাহ
১৯৩৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই কাটান। বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকসাহিত্য বিভাগে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন।
তাঁর স্ত্রীর নাম মমতাজ বেগম — যিনি কবির কবিতায় 'মুজনু পাগলা'র মেয়ে হিসেবে উল্লিখিত। তাঁদের বিবাহ হয় ১৯৪৩ সালে। স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা তাঁর অনেক কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জসীমউদ্দীন বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল চাঙা রাখতে কাজ করেন।
◆ মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন জসীমউদ্দীন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। তাঁকে সমাহিত করা হয় ফরিদপুরের গোবিন্দপুর গ্রামে — তাঁর নিজ জেলায়, মাটির কাছে।
জসীমউদ্দীন মারা গেছেন, কিন্তু 'নকশীকাঁথার মাঠ' আর 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' বেঁচে আছে। বাংলার প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি কৃষকের হৃদয়ে তিনি আজও জীবন্ত।
⚡ জসীমউদ্দীনের মৃত্যু — ১৩ মার্চ ১৯৭৬। কবরস্থান — ফরিদপুর।
বিষয় | তথ্য |
পূর্ণ নাম | মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা |
জন্ম | ১ জানুয়ারি ১৯০৩ |
জন্মস্থান | তাম্বুলখানা গ্রাম, ফরিদপুর |
মৃত্যু | ১৩ মার্চ ১৯৭৬, ঢাকা |
পিতা | আনসারউদ্দীন মোল্লা |
মাতা | আমিনা খাতুন |
স্ত্রী | মমতাজ বেগম (বিবাহ ১৯৪৩) |
শিক্ষা | এমএ, বাংলা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২৯) |
পেশা | কবি, অধ্যাপক, লোকসাহিত্য গবেষক |
কর্মক্ষেত্র | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ |
উপাধি | পল্লিকবি |
বিখ্যাত রচনা | নকশীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট, কবর |
পুরস্কার | একুশে পদক (১৯৭৬), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৫৮) |
কাব্যগ্রন্থ
❖ রাখালী (১৯২৭) [প্রথম কাব্যগ্রন্থ]
◆ প্রকাশ ও বিষয়বস্তু
১৯২৭ সালে প্রকাশিত 'রাখালী' জসীমউদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। 'রাখাল' মানে গরুর রাখাল — যে মাঠে মাঠে গরু চরায়। সেই রাখালের জীবন, তার আনন্দ, তার একাকীত্ব, তার প্রেম — এই সবই এই কাব্যগ্রন্থের বিষয়।
গ্রন্থটিতে বাংলার গ্রামীণ জীবনের যে ছবি আঁকা হয়েছে, তা অতুলনীয়। ধানের মাঠ, নদীর পাড়, গরুর পাল, মেঘলা আকাশ — প্রতিটি চিত্র এতটাই জীবন্ত যে পাঠক নিজেকে সেই মাঠে অনুভব করেন। এই গ্রন্থ প্রকাশের পরেই জসীমউদ্দীন 'পল্লিকবি' হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করেন।
রাখালীর ভাষা একেবারে সরল — গ্রামের মানুষের কথ্য ভাষার মতো। কোনো জটিলতা নেই, কোনো দুর্বোধ্যতা নেই। কিন্তু সেই সরলতার মধ্যে আছে গভীর জীবনদর্শন।
★ রাখালী — জসীমউদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ (১৯২৭)।
⚡ রাখালী প্রকাশের পরই জসীমউদ্দীন 'পল্লিকবি' উপাধি পান।
নকশীকাঁথার মাঠ (১৯২৯) — মাস্টারপিস
◆ ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রকাশ
'নকশীকাঁথার মাঠ' জসীমউদ্দীনের সর্বশ্রেষ্ঠ রচনা এবং বাংলা সাহিত্যের অমর কীর্তিগুলোর একটি। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত এই কাব্যকাহিনি বাংলা সাহিত্যে 'গীতিকাব্য' ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
'নকশীকাঁথা' হলো গ্রামীণ বাংলার নারীদের হাতে বোনা রঙিন নকশার কাঁথা। প্রতিটি কাঁথায় থাকে একটি গল্প, একটি স্বপ্ন, একটি ভালোবাসা। জসীমউদ্দীন এই কাঁথার মতোই তাঁর কাহিনি বুনেছেন — প্রতিটি লাইনে একটি রঙ, প্রতিটি স্তবকে একটি ছবি।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি — পড়লেই পুরো কাহিনি জানা হয়ে যাবে
রুপাই একজন তরুণ কৃষক। বাংলার এক সবুজ গ্রামে তার বাস। সে অত্যন্ত সুন্দর, সরল ও মনের দিক থেকে পরিষ্কার। গ্রামের সবাই তাকে ভালোবাসে।
সাজু একটি মেয়ে — রুপাইয়ের গ্রামেরই মেয়ে। সে-ও সুন্দরী, কোমলমতি। ছোটবেলা থেকেই রুপাই আর সাজুর মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রতিবেশী থেকে শুরু হয়ে সেটা ধীরে ধীরে প্রেমে পরিণত হয়।
গ্রামের মাঠে রুপাই চাষ করে, সাজু ঘরে বসে নকশীকাঁথা বোনে। রুপাইয়ের জন্য কাঁথা বুনতে বুনতে সাজু তার ভালোবাসার কথা প্রতিটি সুতায় বুনে দেয়। প্রতিটি ফুলে, প্রতিটি পাখিতে থাকে তার মনের কথা।
দুজনের বিবাহ হয়। এরপর শুরু হয় সুখের সংসার। কিন্তু সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একদিন রুপাই কৃষিকাজ করতে গিয়ে আঘাত পায়, অথবা অসুখে পড়ে। অবস্থা ক্রমে খারাপ হতে থাকে।
সাজু দিনরাত সেবা করে রুপাইকে। কিন্তু রুপাই আর সুস্থ হয় না। একদিন রুপাই মারা যায়। সাজুর জীবন হয়ে যায় শূন্য। যে নকশীকাঁথা সে বুনেছিল প্রিয়তমের জন্য, সেই কাঁথা এখন তার একমাত্র সঙ্গী।
সাজু বিধবা হয়ে বাঁচতে থাকে রুপাইয়ের স্মৃতি নিয়ে। প্রতিদিন সে রুপাইয়ের কবরের কাছে যায়। কবরের মাটিতে হাত রাখে, কথা বলে। ধীরে ধীরে সে নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়ে।
অবশেষে সাজুও মারা যায় — রুপাইয়ের কবরের পাশে। তাকে সমাহিত করা হয় রুপাইয়ের পাশেই। দুটি প্রেমিক হৃদয় মৃত্যুতেও আলাদা হয়নি। তাদের কবরের উপর দিয়ে বয়ে যায় নকশীকাঁথার মাঠের বাতাস।
★ নকশীকাঁথার মাঠ = রুপাই ও সাজুর প্রেম + বিবাহ + মৃত্যু + চিরন্তন বিচ্ছেদের বেদনা।
কাব্যটির শেষে কবি বলেন — এই কবরের উপর শুধু ঘাস নয়, জমে আছে দুটি প্রাণের ভালোবাসা। নকশীকাঁথার মাঠে আজও সেই প্রেম কাঁদে।
“এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে, / তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দু'নয়নের জলে।”
“ও বাছা, তোমার দাদার এ কবর — এই তার বুকের ভার, / এই মাটিতে মিশায়ে আছে তার সারাটি জীবনের প্রেম সার।”
“নকশীকাঁথার মাঠ জুড়িয়া দুটি প্রেমের কবর শুয়ে, / কেঁদে কেঁদে পাখি ডাকিছে ওই দুটি নামের ধুয়ে।”
⚡ নকশীকাঁথার মাঠ = রুপাই + সাজু। মূলভাব = প্রেম, বিরহ ও মৃত্যু।
⚡ নকশীকাঁথার মাঠ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গীতিকাব্যগুলোর একটি।
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠের কেন্দ্রীয় চরিত্র? ► রুপাই (পুরুষ) ও সাজু (নারী)
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠ প্রথম প্রকাশ? ► ১৯২৯ সালে
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠের ধরন? ► গীতিকাব্য বা কাব্যকাহিনি
সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩) — দ্বিতীয় মাস্টারপিস
◆ পটভূমি ও গুরুত্ব
'সোজন বাদিয়ার ঘাট' জসীমউদ্দীনের আরেকটি অমর গীতিকাব্য। ১৯৩৩ সালে প্রকাশিত। 'বাদিয়া' মানে বেদে — ভাসমান জীবনযাপনকারী মানুষ যারা নৌকায় থাকে ও সাপের খেলা, ওষুধ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
সোজন একজন বেদে যুবক। তার পরিবার নৌকায় বাস করে — নদী থেকে নদীতে ভেসে বেড়ায়। এই ভ্রাম্যমাণ জীবনেই তার বড় হওয়া। সোজন অত্যন্ত সুন্দর ও সাহসী।
দুলি একটি হিন্দু মেয়ে। সে এক গ্রামে থাকে যেখানে সোজনের নৌকা একবার নোঙর করে। দুলির সৌন্দর্য ও সরলতায় মুগ্ধ হয়ে যায় সোজন। দুলিও সোজনের সাহস ও স্নেহে আকৃষ্ট হয়।
কিন্তু এই প্রেমে বাধা আসে ধর্মের দেয়াল। সোজন মুসলিম, দুলি হিন্দু। উভয় পরিবারই এই সম্পর্ক মানতে নারাজ। সমাজ তাদের একত্রে মিলতে দেবে না।
এরপর শুরু হয় বিচ্ছেদের কাহিনি। সোজনের নৌকা চলে যায়, দুলি পড়ে থাকে। দুলির বিবাহ হয়ে যায় অন্য জায়গায়। সোজন বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়ায় — কিন্তু দুলিকে ভুলতে পারে না।
একদিন ঘুরতে ঘুরতে সোজন আবার সেই পুরনো ঘাটে আসে — যেখানে প্রথম দুলিকে দেখেছিল। কিন্তু দুলি আর নেই। তার বিবাহ হয়ে গেছে, সে চলে গেছে। সোজন সেই ঘাটে বসে থাকে — একা, নিঃসঙ্গ।
কাব্যটিতে হিন্দু-মুসলিম প্রেমের ব্যর্থতার গল্পের মাধ্যমে আসলে সাম্প্রদায়িক বিভেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা হয়েছে। দুটি মানুষ পরস্পরকে ভালোবাসে, কিন্তু সমাজের ধর্মীয় বিভেদ তাদের আলাদা করে দেয়।
★ সোজন বাদিয়ার ঘাট = সোজন (মুসলিম) + দুলি (হিন্দু) — হিন্দু-মুসলিম প্রেমের ব্যর্থতার গল্প।
“সোজন বাদিয়া ভাসিছে নদীতে, দুলি কাঁদে একেলা, / কার জন্য সে অপেক্ষা করে, কোন ঘাটে হবে মেলা!”
“ধর্মের নামে দেয়াল উঠেছে, প্রেম করে রে কান্না, / দুটি হৃদয় দুটি নদী পাশে তবু দেখা নাই জানা।”
⚡ সোজন = মুসলিম বেদে। দুলি = হিন্দু মেয়ে। বিষয় = ধর্মীয় বিভেদে প্রেম বিফল।
প্রশ্ন: সোজন বাদিয়ার ঘাটের প্রকাশকাল? ► ১৯৩৩ সালে
প্রশ্ন: সোজন ও দুলির ধর্মীয় পরিচয়? ► সোজন = মুসলিম, দুলি = হিন্দু
❖ বালুচর (১৯৩০) [কাব্যগ্রন্থ]
◆ বিষয়বস্তু ও ভাবার্থ
'বালুচর' মানে বালির চর — নদীর বুকে জেগে ওঠা চর। এই চর যেমন নদীর মাঝে একাকী দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনি মানুষও জীবনে একাকী হয়ে পড়ে।
এই কাব্যগ্রন্থে গ্রামীণ বাংলার নানা দৃশ্য আছে। নদীর বালুচরে বসে মেছো কবিরা গান গায়, জেলেরা মাছ ধরে, কিশোররা খেলে। কিন্তু এই আনন্দের নিচে আছে একটি বিষণ্নতা — সময় চলে যাচ্ছে, জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে।
'বালুচর' কাব্যে জসীমউদ্দীন প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্কটিকে অত্যন্ত কোমলভাবে তুলে ধরেছেন। নদী শুধু জল নয়, সে জীবনের প্রতীক। বালু শুধু বালু নয়, সে স্মৃতির প্রতীক।
★ বালুচর — গ্রামীণ জীবন ও নদীর কাব্যকথন।
❖ ধানখেত (১৯৩৩) [কাব্যগ্রন্থ]
◆ বিষয়বস্তু ও ভাবার্থ
'ধানখেত' — বাংলার সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য। সোনালি ধানের মাঠ, বাতাসে ধানের শীষের দোল, কৃষকের পরিশ্রম ও ফসলের আনন্দ — এই সব নিয়ে তৈরি এই কাব্যগ্রন্থ।
জসীমউদ্দীন ধানখেতকে শুধু শস্যক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি। তিনি দেখেছেন এটিকে জীবনের মেটাফর হিসেবে। ধান যেমন মাটি থেকে জন্ম নিয়ে ফুলে-ফেঁপে ওঠে, তারপর কাটা পড়ে — মানুষের জীবনও তেমনি।
কৃষক ও তার পরিবারের জীবনকাহিনি, তাদের আনন্দ-বেদনা — এই সব মিলিয়ে 'ধানখেত' হয়ে উঠেছে গ্রামীণ বাংলার একটি কাব্যিক দলিল।
❖ রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৩৫) [কাব্যগ্রন্থ]
◆ বিষয়বস্তু ও ভাবার্থ
'রঙিলা নায়ের মাঝি' — রঙিন নৌকার মাঝি। বাংলার নদীতে যে মাঝি নৌকা চালায়, সে শুধু নৌকার চালক নয় — সে একজন কবি, একজন দার্শনিক, একজন জীবনের যাত্রী।
এই কাব্যগ্রন্থে নদীর জীবন, মাঝির গান (ভাটিয়ালি), নৌকার যাত্রা — এই সব অনুষঙ্গ ব্যবহার করে কবি জীবনের গভীর কথা বলেছেন। জীবনটাও তো একটা নদীর যাত্রা — কোথা থেকে আসছি, কোথায় যাচ্ছি জানি না।
“রঙিলা নায়ের মাঝি, কোথায় যাবি তুই, / কোন সুদূরের ডাকে পালটি ভাঁজ দুই!”
▸ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ
কাব্যগ্রন্থ | প্রকাশকাল ও বিষয় |
মাটির কান্না | ১৯৫১ — মাটি ও মানুষের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক |
এক পয়সার বাঁশি | ১৯৫৬ — শিশু কাব্যগ্রন্থ |
সকিনা | ১৯৫৯ — গ্রামীণ নারীজীবনের কাব্য |
সুচয়নী | ১৯৬১ — প্রেম ও প্রকৃতির কবিতা |
ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে | ১৯৭১ — মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক |
মা যে জননী কান্দে | ১৯৬৩ — মায়ের ভালোবাসার কবিতা |
হলুদ বরণী | ১৯৬৬ — গ্রামীণ বিবাহের উৎসবের কবিতা |
জলের লেখন | ১৯৬৯ — নদী ও জীবনের কবিতা |
বিখ্যাত কবিতা
কবর — সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি
◆ রচনার ইতিহাস ও পটভূমি
'কবর' কবিতাটি জসীমউদ্দীনের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা — এবং বাংলা সাহিত্যের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটি। রচিত হয় ১৯২৫ সালে — যখন জসীমউদ্দীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।
এই কবিতাটি তাঁর শিক্ষক ড. দীনেশচন্দ্র সেনের এতটাই মুগ্ধ করে যে তিনি এটি পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেন — যখন কবি এখনও ছাত্র! বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি ও ভাবার্থ
কবিতায় একজন বৃদ্ধ দাদা তার নাতিকে নিয়ে গ্রামের কবরস্থানে যায়। কবরস্থানে একটি ডালিম গাছের তলে আছে তার স্ত্রীর কবর — নাতির দাদির কবর।
বৃদ্ধ দাদা নাতিকে দেখায় — এই যে কবর, এখানে ঘুমিয়ে আছেন তোমার দাদি। তিরিশ বছর ধরে আমি এখানে আসি, কাঁদি। তাঁকে ছাড়া আমার কোনো সুখ নেই।
তারপর দাদা গল্প বলেন — তোমার দাদি কেমন ছিলেন। কত সুন্দর ছিলেন, কত মায়াময় ছিলেন। তাঁর হাতের রান্না, তাঁর স্নেহের কথা — সব মনে পড়ে।
এরপর দাদা দেখান আরেকটি কবর — তার ছেলের কবর। তার ছেলে মারা গেছে অকালে। বৃদ্ধ পিতার কাছে এই দুটি কবর — স্ত্রীর কবর ও ছেলের কবর — তার জীবনের সব থেকে বড় শোক।
কবিতার শেষে বৃদ্ধ দাদা তার নাতিকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন — তুমিই এখন আমার সব। তোমাকে নিয়েই আমার বাকি জীবন।
এই কবিতায় মৃত্যু, বিচ্ছেদ, স্মৃতি এবং পরিবারের প্রতি ভালোবাসা অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে উপস্থাপিত হয়েছে। পাঠক পড়তে পড়তে নিজেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
★ কবর কবিতায় ৩টি কবর: দাদির কবর + ছেলের কবর + ভবিষ্যতে দাদার কবর।
“এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে, / তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দু'নয়নের জলে।”
“এই কবরের পাশে বসিয়া একদিন / কাঁদিয়াছিনু আমি অঝোর নয়নে।”
“কোথা গেল সে দিন, কোথা গেল সে কাল, / কোথা গেল সে মায়া, কোথা হলো হাল!”
⚡ কবর কবিতা পড়ানো হয় জসীমউদ্দীন এখনও ছাত্র থাকাকালীন — ১৯২৫ সালে।
⚡ 'কবর' কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র — বৃদ্ধ দাদা ও তার নাতি।
প্রশ্ন: কবর কবিতায় কবরটি কার? ► বৃদ্ধ দাদার স্ত্রীর (দাদির) কবর
প্রশ্ন: কবর কবিতা কোন গাছের নিচে? ► ডালিম গাছের তলে
প্রশ্ন: কবর কবিতা রচনার সময় জসীমউদ্দীন কোথায় পড়তেন? ► কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ছাত্রাবস্থায়)
প্রশ্ন: কবর কবিতা কার পাঠ্যপুস্তকে স্থান পায়? ► ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সম্পাদিত পাঠ্যপুস্তকে
❖ আসমানী [বিখ্যাত কবিতা]
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি ও ভাবার্থ
'আসমানী' জসীমউদ্দীনের আরেকটি বিখ্যাত কবিতা। আসমানী একটি দরিদ্র মেয়ের নাম। আসমান মানে আকাশ — আকাশের মতো স্বপ্নের মেয়ে আসমানী।
কবিতায় আসমানী একটি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে। তার ঘর নেই, ভালো কাপড় নেই, পেটভরে খাবার নেই। তবু তার চোখে স্বপ্ন আছে, মুখে হাসি আছে।
কবি আসমানীকে দেখেন ভাঙা ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকতে — বৃষ্টির রাতে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ছে, কিন্তু আসমানী তবু ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে। তার এই সারল্য ও অজ্ঞতা কবিকে কাঁদায়।
কবিতার শেষে কবি প্রশ্ন করেন — আসমানী কি জানে সে কতটা দরিদ্র? সে কি জানে পৃথিবীতে আরও ভালো জীবন আছে? এই না-জানাটাই কি তার সুখ? এই দার্শনিক প্রশ্নে কবিতা শেষ হয়।
“আসমানীর বাপের ঘর, কান্দে আসমানী, / তার সে ঘরের ছাদ বেয়ে পড়ে বৃষ্টির পানি।”
“পেটে নাই ভাত, গায়ে নাই কাপড়, / তবু সে হাসে, তবু সে জাগে আলোর মতো উজ্জ্বল।”
★ আসমানী = গ্রামীণ দরিদ্র মেয়ের সরলতা ও দারিদ্র্যের মর্মস্পর্শী চিত্র।
❖ পল্লী জননী [বিখ্যাত কবিতা]
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি ও ভাবার্থ
'পল্লী জননী' একটি মায়ের কবিতা। গ্রামের এক মা তার অসুস্থ শিশুকে নিয়ে রাত জাগছেন। বাইরে ঝড়-বৃষ্টি, ঘরে অন্ধকার। কোলের শিশু কাঁদছে।
মা শিশুকে বুকে চাপ দিয়ে বসে আছেন। ঘরে ওষুধ নেই, ডাক্তার ডাকার পয়সা নেই। শুধু আছে মায়ের দোয়া ও ভালোবাসা। মা প্রার্থনা করছেন — হে আল্লাহ, আমার শিশুকে ভালো করে দাও।
কবিতায় মায়ের যন্ত্রণা, তার অসহায়ত্ব এবং শিশুর প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা অত্যন্ত জীবন্তভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। পাঠক মায়ের সেই রাত-জাগানোর বেদনা নিজে অনুভব করতে পারেন।
“রাত নিশিতে ঝড় বৃষ্টিতে, কোলের ছেলে কাঁদে, / মা বসিয়া বুকে চাপিয়া দোলায় তারে কাঁদে।”
★ পল্লী জননী = গ্রামীণ মায়ের রাত-জাগা ও শিশুর প্রতি অসীম ভালোবাসার কবিতা।
❖ কুঁজো বুড়ির গল্প [শিশু-কিশোর কবিতা]
◆ ভাবার্থ
একটি কুঁজো বুড়ির জীবনকাহিনি। সমাজে যাকে কেউ পাত্তা দেয় না, যাকে সবাই উপেক্ষা করে — সেই বুড়ির দৃষ্টি থেকে জীবনকে দেখা। বুড়ির সংগ্রাম, তার স্বপ্ন ও বাস্তবতার টানাপোড়েন।
কবিতাটি শিশু-কিশোরদের জন্য লেখা হলেও এর মধ্যে গভীর সামাজিক বার্তা আছে। সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতি কবির সংবেদনশীলতা এখানে স্পষ্ট।
❖ মামার বাড়ি [বিখ্যাত শিশু কবিতা]
◆ ভাবার্থ
'মামার বাড়ি' জসীমউদ্দীনের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিশু-কবিতা। একটি ছেলে মামার বাড়ি যাবে — এই আনন্দে সে নাচছে, গাইছে।
মামার বাড়িতে কী কী আছে — আম, কাঁঠাল, লিচু, পুকুরে মাছ ধরা, মামির হাতের রান্না — এই সব ভাবতে ভাবতে ছেলেটি পথ হাঁটে। কবিতাটিতে শিশুর নির্মল আনন্দ ও উত্তেজনা জীবন্তভাবে ধরা আছে।
“আমার মামার বাড়ি যাবো / নাইওর নিতে আইসে।”
★ মামার বাড়ি — বাংলার সবচেয়ে প্রিয় শিশু কবিতাগুলোর একটি।
নাটক
বেদের মেয়ে (১৯৫১) — বিখ্যাত নাটক
◆ পটভূমি ও গুরুত্ব
'বেদের মেয়ে' জসীমউদ্দীনের সবচেয়ে বিখ্যাত নাটক। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত। এই নাটকটি পরে চলচ্চিত্রেও রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিশাল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
চাঁপাই একটি বেদে মেয়ে। বেদে পরিবার নৌকায় বাস করে, নদীতে ভেসে বেড়ায়। চাঁপাই অত্যন্ত সুন্দরী ও সাহসী। সাপের খেলা দেখিয়ে ও ওষুধ বিক্রি করে পরিবারের সাথে জীবিকা নির্বাহ করে।
আলম একজন জমিদারের ছেলে। সে গ্রামীণ রাজপুত্রের মতো — সুন্দর, শিক্ষিত, কিন্তু একটু অহংকারী। একদিন নদীর ঘাটে চাঁপাইকে দেখে সে মুগ্ধ হয়ে যায়।
দুজনের মধ্যে প্রেম শুরু হয়। কিন্তু এই প্রেমে বাধা আসে শ্রেণিবৈষম্যের কারণে। আলমের পরিবার মানতে নারাজ — একটি বেদে মেয়ে তাদের বংশে আসবে? জমিদার পরিবার কি কখনো একটি যাযাবর মেয়েকে পুত্রবধূ করতে পারে?
চাঁপাই-এর পরিবারও প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু চাঁপাই তার প্রেমের জন্য সব বাধা অতিক্রম করতে রাজি।
নানা টানাপোড়েন, বাধা-বিপত্তি, ভুল-বোঝাবুঝি পার হয়ে শেষ পর্যন্ত দুজনের মিলন হয়। শ্রেণিবৈষম্যের দেয়াল ভেঙে প্রেমের জয় হয়।
★ বেদের মেয়ে = চাঁপাই (বেদে মেয়ে) + আলম (জমিদারপুত্র) — শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রেমের জয়।
⚡ 'বেদের মেয়ে' পরে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হয়ে বিশাল জনপ্রিয়তা পায়।
প্রশ্ন: বেদের মেয়ে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র? ► চাঁপাই (বেদে মেয়ে) ও আলম (জমিদারপুত্র)
প্রশ্ন: বেদের মেয়ে প্রথম প্রকাশ? ► ১৯৫১ সালে
পদ্মাপার (১৯৫০) — নাটক
◆ সম্পূর্ণ কাহিনি
'পদ্মাপার' পদ্মা নদীর পাড়ের মানুষদের জীবনকাহিনি। পদ্মা কেবল নদী নয় — সে একটি চরিত্র। প্রতি বছর ভাঙন দেয়, গ্রাম ডুবিয়ে দেয়, আবার নতুন চর জাগায়।
নাটকে একটি পরিবারের গল্প আছে যারা পদ্মার পাড়ে বাস করে। প্রতি বছর বন্যায় তাদের বাড়ি ডুবে যায়, আবার নতুন করে গড়ে তোলে। এই পরিবারের মধ্য দিয়ে ফরিদপুর অঞ্চলের পদ্মাপারের মানুষের সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে।
পদ্মার মতোই মানুষের জীবন — কখনো ভরা যৌবন, কখনো শুকনো। কখনো বন্যা, কখনো শান্ত। এই নিরন্তর পরিবর্তনের মাঝেই মানুষ বেঁচে থাকে।
★ পদ্মাপার = পদ্মার পাড়ের মানুষের সংগ্রাম ও জীবনকাহিনি।
▸ অন্যান্য নাটক
নাটকের নাম | প্রকাশকাল ও বিষয় |
গ্রামের মেয়ে | ১৯৫৯ — গ্রামীণ নারীজীবনের নাটক |
ওগো পুস্পধনু | ১৯৬৮ — প্রেম বিষয়ক নাটক |
মধুমালা | ১৯৫১ — রূপকথার নাটক |
গদ্য সাহিত্য ও লোকসাহিত্য গবেষণা
জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা ও ভ্রমণকাহিনি
◆ যাদের দেখেছি (১৯৫১)
'যাদের দেখেছি' জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত স্মৃতিকথাগ্রন্থ। এতে তিনি সেইসব মানুষদের কথা লিখেছেন যাদের তিনি জীবনে দেখেছেন — রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, বিভিন্ন সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
রবীন্দ্রনাথের সাথে জসীমউদ্দীনের সাক্ষাতের বিবরণ এই বইয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতা পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন — 'এ কবি আমাদের আশা।'
⚡ রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে 'আমাদের আশা' বলেছিলেন।
◆ ঠাকুর বাড়ির আঙিনায় (১৯৬১)
রবীন্দ্রনাথের ঠাকুর পরিবারের সাথে জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা। শান্তিনিকেতনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা, রবীন্দ্রনাথের সাথে কথোপকথন, ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কথা।
◆ যে দেশে মানুষ বড় (১৯৬৮) — ভ্রমণকাহিনি
ইউরোপ ভ্রমণের কাহিনি। পাশ্চাত্য সভ্যতার সাথে পরিচয়, সেখানকার মানুষ ও সংস্কৃতির বিবরণ। একজন গ্রামের কবির চোখে আধুনিক ইউরোপ কেমন দেখায় — সেই অভিজ্ঞতা।
◆ চলে মুসাফির (১৯৫২) — ভ্রমণকাহিনি
পাকিস্তান ভ্রমণের কাহিনি। বিভাগ-উত্তর পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা।
◆ লোকসাহিত্য গবেষণা
জসীমউদ্দীন শুধু কবি নন, একজন নিষ্ঠাবান লোকসাহিত্য গবেষকও। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের সহকারী হিসেবে বাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে পল্লীগীতি ও লোকগল্প সংগ্রহ করেছেন।
• 'বাংলাদেশের হাসির গল্প' — লোকগল্প সংকলন।
• 'বাংলাদেশের পল্লীগীতি' — লোকগান সংকলন।
• 'জারি গান' — বাংলার জারি গানের সংকলন ও গবেষণা।
• মুর্শিদী, ভাটিয়ালি ও বাউল গানের সংগ্রহ ও গবেষণা।
★ জসীমউদ্দীন বাংলার লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও গবেষণায় অতুলনীয় অবদান রেখেছেন।
পল্লীগীতি ও জসীমউদ্দীনের গান
◆ জসীমউদ্দীনের গান ও তাঁর বৈশিষ্ট্য
জসীমউদ্দীন শুধু কবিতা লেখেননি, গানও লিখেছেন। তাঁর গানে পল্লীগীতির ঢং আছে — ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, বাউল সুরের প্রভাব।
❖ আমার সোনার ময়না পাখি [বিখ্যাত গান]
◆ গানের পূর্ণ ভাবার্থ
এই গানটি বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পল্লীগীতি। 'সোনার ময়না পাখি' — এটি প্রিয়তমার রূপক। কবি তাঁর প্রিয়তমাকে সোনার ময়না পাখির সাথে তুলনা করেছেন।
গানে বলা হচ্ছে — হে সোনার ময়না পাখি, তুমি কোথায় আছ? তোমার ডাক শুনতে পাচ্ছি না। তোমার বিরহে আমার মন উদাস। প্রেমের বিরহ ও বিচ্ছেদের বেদনা এই গানের মূল বিষয়।
“আমার সোনার ময়না পাখি, কোথায় গেলি উড়ে, / তোরে খুঁজি আমি দেশ বিদেশ, ঘুরি ঘুরে ঘুরে।”
❖ বাজাও বাজাও প্রেমের বাঁশি [বিখ্যাত গান]
◆ গানের পূর্ণ ভাবার্থ
এই গানে প্রেমের আহ্বান আছে। বাঁশির সুর হলো প্রেমের সুর — যে সুর শুনলে মন উদাস হয়, চোখে জল আসে। কবি বলছেন — বাজাও সেই বাঁশি, আসুক প্রেম, আসুক ভালোবাসা।
◆ জারি গান ও মুর্শিদী
জসীমউদ্দীন কর্তৃক সংগ্রহিত ও লেখা জারি গান ও মুর্শিদী বাংলার লোকসংগীতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জারি গান সাধারণত কারবালার শোকগাথা নিয়ে — ইমাম হুসেনের শাহাদতের স্মরণে। মুর্শিদী হলো মুর্শিদ বা গুরুর প্রতি ভক্তিগীত।
★ জসীমউদ্দীন বাংলার লোকগান সংরক্ষণে অতুলনীয় ভূমিকা রেখেছেন।
পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
পুরস্কার / সম্মান | বিশেষ তথ্য |
প্রেসিডেন্ট পুরস্কার | ১৯৫৮ — পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত |
বাংলা একাডেমি পুরস্কার | ১৯৬০ |
একুশে পদক | ১৯৭৬ — বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পুরস্কার |
রবীন্দ্র পুরস্কার | পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রদত্ত |
মুক্তধারা পুরস্কার | কলকাতা থেকে প্রদত্ত |
সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু পুরস্কার | আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি |
রবীন্দ্রনাথের প্রশংসা | রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে 'আমাদের আশা' বলেছিলেন |
◆ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
জসীমউদ্দীনের 'নকশীকাঁথার মাঠ' ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে 'Field of the Embroidered Quilt' নামে। তাঁর কবিতা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পঠিত ও প্রশংসিত।
⚡ নকশীকাঁথার মাঠের ইংরেজি অনুবাদ — 'Field of the Embroidered Quilt'।
কাব্যশৈলীর বৈশিষ্ট্য
◆ জসীমউদ্দীনের সাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য
জসীমউদ্দীনের কবিতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাঁর পল্লিগ্রামের প্রতি গভীর ভালোবাসা। নগরজীবনের কোনো ছোঁয়া নেই তাঁর কবিতায়। তিনি একেবারে গ্রামের মাটির কবি।
দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হলো কাহিনিকবিতা বা narrative poetry। তাঁর কবিতায় গল্প আছে — শুরু আছে, মাঝ আছে, শেষ আছে। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল থেকে আলাদা করে।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো সরল ভাষা। জসীমউদ্দীনের কবিতা পড়তে শিক্ষিত হওয়া লাগে না — গ্রামের অশিক্ষিত মানুষও পড়তে বোঝে। এই সার্বজনীনতাই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি।
চতুর্থ বৈশিষ্ট্য হলো গ্রামীণ নারীর প্রতি সংবেদনশীলতা। তাঁর কবিতায় নারী শুধু প্রেমের পাত্রী নয় — সে একজন সংগ্রামী মানুষ, একজন মা, একজন কন্যা।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো লোকজ উপাদানের ব্যবহার। ভাটিয়ালি, মুর্শিদী, জারির সুর তাঁর কবিতায় মিশে আছে। পল্লীগীতির মেজাজ তাঁর কবিতাকে সংগীতময় করে তুলেছে।
• পল্লীজীবনের অপার ভালোবাসা।
• কাহিনিকবিতা (Narrative Poetry) রচনায় দক্ষতা।
• সহজ, সরল ও কথ্য ভাষার ব্যবহার।
• গ্রামীণ নারীজীবনের প্রতি সংবেদনশীলতা।
• লোকজ সুর ও সংগীতের প্রভাব।
• প্রকৃতিকে মানবজীবনের রূপক হিসেবে ব্যবহার।
• হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির বার্তা।
প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের পূর্ণ নাম?
► মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের জন্মতারিখ?
► ১ জানুয়ারি ১৯০৩
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের জন্মস্থান?
► তাম্বুলখানা গ্রাম, ফরিদপুর
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের মৃত্যুতারিখ?
► ১৩ মার্চ ১৯৭৬
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের উপাধি কী?
► পল্লিকবি
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ?
► রাখালী (১৯২৭)
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠ প্রথম প্রকাশ?
► ১৯২৯ সালে
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠের কেন্দ্রীয় চরিত্র?
► রুপাই ও সাজু
প্রশ্ন: সোজন বাদিয়ার ঘাটের প্রকাশকাল?
► ১৯৩৩ সালে
প্রশ্ন: সোজন ও দুলির ধর্ম?
► সোজন = মুসলিম, দুলি = হিন্দু
প্রশ্ন: 'কবর' কবিতা কোথায় আছে?
► রাখালী কাব্যগ্রন্থে
প্রশ্ন: 'কবর' কবিতায় কবর কার?
► বৃদ্ধ দাদার স্ত্রীর (দাদির)
প্রশ্ন: 'কবর' কবিতায় গাছটির নাম?
► ডালিম গাছ
প্রশ্ন: 'কবর' পাঠ্যপুস্তকে রাখেন কে?
► ড. দীনেশচন্দ্র সেন
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীন কখন 'কবর' লেখেন?
► ১৯২৫ সালে — ছাত্রাবস্থায়
প্রশ্ন: নকশীকাঁথার মাঠের ইংরেজি নাম?
► Field of the Embroidered Quilt
প্রশ্ন: বেদের মেয়ে নাটকের প্রকাশকাল?
► ১৯৫১ সালে
প্রশ্ন: বেদের মেয়ে নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র?
► চাঁপাই (বেদে মেয়ে) ও আলম (জমিদারপুত্র)
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীন কোথায় অধ্যাপনা করেন?
► ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের এমএ ডিগ্রি কোথা থেকে?
► কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২৯)
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে কী বলেছিলেন?
► 'আমাদের আশা'
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত স্মৃতিকথাগ্রন্থ?
► যাদের দেখেছি (১৯৫১)
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের বাংলা একাডেমি পুরস্কার?
► ১৯৬০ সালে
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের একুশে পদক?
► ১৯৭৬ সালে
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের স্ত্রীর নাম?
► মমতাজ বেগম
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীনের শিক্ষক ছিলেন কে?
► ড. দীনেশচন্দ্র সেন
প্রশ্ন: পল্লী জননী কবিতায় কার কথা?
► রাত জাগা গ্রামীণ মায়ের কথা
প্রশ্ন: 'আসমানী' কবিতার বিষয়?
► দরিদ্র গ্রামীণ মেয়ের জীবন
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীন কোন লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছেন?
► পল্লীগীতি, জারি গান, মুর্শিদী
প্রশ্ন: জসীমউদ্দীন কার সহকারী ছিলেন?
► ড. দীনেশচন্দ্র সেনের গবেষণা সহকারী
⚡ ট্রিকি ও অজানা তথ্য
⚡ জসীমউদ্দীনের পূর্ণ নাম 'মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা' — শুধু 'জসীমউদ্দীন' নয়।
⚡ 'কবর' কবিতা রচনার সময় জসীমউদ্দীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র — পরীক্ষার আগেই পাঠ্যবই!
⚡ নকশীকাঁথার মাঠের কেন্দ্রীয় চরিত্র রুপাই ও সাজু — সোজন ও দুলি নয় (ওটা সোজন বাদিয়ার ঘাটে)।
⚡ সোজন = মুসলিম বেদে, দুলি = হিন্দু মেয়ে — ধর্মীয় বিভেদে প্রেম বিফল।
⚡ নকশীকাঁথার মাঠের ইংরেজি নাম 'Field of the Embroidered Quilt'।
⚡ জসীমউদ্দীনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'রাখালী' (১৯২৭) — 'নকশীকাঁথার মাঠ' নয়।
⚡ রবীন্দ্রনাথ জসীমউদ্দীনকে 'আমাদের আশা' বলেছিলেন।
⚡ বেদের মেয়ে = চাঁপাই (বেদে মেয়ে) + আলম — শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রেম।
⚡ জসীমউদ্দীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন।
⚡ জসীমউদ্দীনের কবরস্থান ফরিদপুরে — ঢাকায় নয়।
⚡ 'কবর' কবিতায় কবর ডালিম গাছের তলে — কোনো ফুল গাছের তলে নয়।
⚡ জসীমউদ্দীনের একুশে পদক মৃত্যুর বছরেই পান — ১৯৭৬।
⚡ জসীমউদ্দীনের শিক্ষক ড. দীনেশচন্দ্র সেন — এঁর অধীনেই পল্লীগীতি সংগ্রহ করেন।
⚡ জসীমউদ্দীন বাউল, ভাটিয়ালি, মুর্শিদী ও জারি গান সংগ্রহ ও গবেষণা করেছেন।
⚡ 'আসমানী' কবিতা শিশু-কিশোর পাঠ্যক্রমে পড়ানো হয় — কিন্তু এটি আসলে দারিদ্র্যের গুরুগম্ভীর চিত্র।
চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ
বিষয় | উত্তর |
পূর্ণ নাম | মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন মোল্লা |
জন্ম | ১ জানুয়ারি ১৯০৩, তাম্বুলখানা, ফরিদপুর |
মৃত্যু | ১৩ মার্চ ১৯৭৬, ঢাকা |
উপাধি | পল্লিকবি |
প্রথম কাব্যগ্রন্থ | রাখালী (১৯২৭) |
শ্রেষ্ঠ কাব্যকাহিনি | নকশীকাঁথার মাঠ (১৯২৯) — রুপাই ও সাজু |
দ্বিতীয় বিখ্যাত কাব্য | সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩) — সোজন ও দুলি |
বিখ্যাত কবিতা | কবর, আসমানী, পল্লী জননী, মামার বাড়ি |
বিখ্যাত নাটক | বেদের মেয়ে (১৯৫১) |
বিখ্যাত স্মৃতিকথা | যাদের দেখেছি (১৯৫১) |
বাংলা একাডেমি | ১৯৬০ সালে |
একুশে পদক | ১৯৭৬ সালে (মৃত্যুর বছর) |
শিক্ষক | ড. দীনেশচন্দ্র সেন |
রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য | 'আমাদের আশা' |
ইংরেজি অনুবাদ | Field of the Embroidered Quilt |
কর্মস্থান | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা বিভাগ |
কবরস্থান | ফরিদপুর (নিজ জেলায়) |
শুভকামনা!