অধ্যায়
উচ্চারণের স্থান
(Place of Articulation)
১. ভূমিকা ও মূল ধারণা
মানুষের বাক্যন্ত্র থেকে যখন ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তখন বায়ু ফুসফুস থেকে উপরের দিকে উঠে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাথে সংঘর্ষ বা সহযোগিতায় শব্দের সৃষ্টি করে। ধ্বনিবিজ্ঞানে এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলিকে উচ্চারণের অঙ্গ বা বাগযন্ত্র (Organs of Speech) বলা হয়। উচ্চারণের সময় এই অঙ্গসমূহের মধ্যে যেখানে মিলন বা বাধার সৃষ্টি হয়, সেই স্থানকেই বলা হয় উচ্চারণের স্থান (Place of Articulation) বা উচ্চারণস্থান।
ধ্বনিবিজ্ঞানে (Phonetics) ধ্বনির শ্রেণিবিভাগে উচ্চারণের স্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। একটি ধ্বনির পরিচয় নির্ধারণে তিনটি মানদণ্ড ব্যবহৃত হয়: (১) উচ্চারণের স্থান, (২) উচ্চারণের প্রকৃতি বা পদ্ধতি, এবং (৩) ঘোষ-অঘোষ বৈশিষ্ট্য। এর মধ্যে উচ্চারণের স্থান সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।
মূল সংজ্ঞা: উচ্চারণের স্থান বলতে বোঝায় বাক্প্রত্যঙ্গের সেই নির্দিষ্ট অবস্থান বা বিন্দু যেখানে সক্রিয় উচ্চারক (Active Articulator) এবং নিষ্ক্রিয় উচ্চারক (Passive Articulator) পরস্পরের সংস্পর্শে আসে অথবা নিকটবর্তী হয়ে বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং নির্দিষ্ট ধ্বনি উৎপন্ন করে।
২. বাক্যন্ত্র ও উচ্চারক পরিচিতি
বাংলায় ধ্বনি উৎপাদনে যে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি অংশগ্রহণ করে সেগুলিকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
সক্রিয় উচ্চারক (Active Articulators) | নিষ্ক্রিয় উচ্চারক (Passive Articulators) |
নিচের ঠোঁট (Lower Lip) | উপরের ঠোঁট (Upper Lip) |
জিভের ডগা/অগ্রভাগ (Tip/Blade of Tongue) | দাঁত (Teeth) |
জিভের অগ্রভাগ (Blade) | দন্তমূল/মূর্ধা (Alveolar Ridge) |
জিভের সামনের অংশ (Front) | তালু (Hard Palate) |
জিভের পিছনের অংশ (Back/Dorsum) | নরম তালু (Soft Palate/Velum) |
জিভের মূল (Root) | গলার পিছনের প্রাচীর (Pharyngeal Wall) |
গ্লটিস (Glottis) | — |
বাক্যন্ত্রের প্রধান অঙ্গগুলির বিবরণ
(ক) ফুসফুস (Lungs)
ধ্বনি উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি হলো ফুসফুস। শ্বাসগ্রহণের সময় বায়ু ফুসফুসে প্রবেশ করে এবং শ্বাস ত্যাগের সময় বায়ু উপরের দিকে উঠে আসে। এই বায়ুপ্রবাহই ধ্বনি উৎপাদনের মূল উপকরণ। প্রায় সকল বাংলা ধ্বনিই নির্গামী বায়ু (Pulmonic Egressive) দিয়ে উৎপন্ন হয়।
(খ) স্বরযন্ত্র বা কণ্ঠনালী (Larynx / Voice Box)
গলার মধ্যে অবস্থিত স্বরযন্ত্রে দুটি স্বরতন্ত্রী (Vocal Cords/Folds) থাকে। এদের কম্পনেই ঘোষ (Voiced) ধ্বনি তৈরি হয়। স্বরতন্ত্রীর মাঝের ফাঁককে গ্লটিস (Glottis) বলে। গ্লটিস সম্পূর্ণ বন্ধ হলে শ্বাস আটকে যায় এবং হঠাৎ খুলে গেলে মহাপ্রাণ ধ্বনি (Aspirated) তৈরি হয়।
(গ) তালু (Palate)
মুখের ছাদকে তালু বলে। এটি দুই ভাগে বিভক্ত: সামনের শক্ত অংশ হলো কঠিন তালু বা তালু (Hard Palate) এবং পিছনের নরম মাংসল অংশ হলো মৃদু তালু বা নরম তালু (Soft Palate/Velum)। নরম তালুর শেষে ঝুলে থাকা অংশটিকে আলজিভ বা ঘটিকা (Uvula) বলে।
(ঘ) দন্তমূল বা মূর্ধা (Alveolar Ridge)
উপরের দাঁতের ঠিক পিছনের ফুলানো মাংসল স্থানকে দন্তমূল বা মূর্ধা (Alveolar Ridge) বলে। বাংলা ভাষার অনেক ধ্বনি এই স্থানে উচ্চারিত হয়। এটি বাংলা ধ্বনিতত্ত্বে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উচ্চারণস্থান।
(ঙ) জিভ (Tongue)
জিভ হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সক্রিয় উচ্চারক। জিভকে কয়েকটি অংশে ভাগ করা হয়: ডগা বা অগ্রভাগ (Tip/Apex), অগ্রপৃষ্ঠ (Blade), সামনের অংশ (Front), পিছনের অংশ (Back/Dorsum), এবং মূল (Root)।
৩. উচ্চারণস্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণিবিভাগ
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলিকে উচ্চারণের স্থান অনুযায়ী নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা হয়:
৩.১ ওষ্ঠ্য ধ্বনি (Labial Sounds)
সংজ্ঞা: যে ধ্বনি উচ্চারণে দুই ঠোঁটের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে, তাকে ওষ্ঠ্য ধ্বনি বলে।
(ক) দ্বিওষ্ঠ্য ধ্বনি (Bilabial Sounds)
উচ্চারণকালে উপরের ঠোঁট ও নিচের ঠোঁট পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন করে তাকে দ্বিওষ্ঠ্য ধ্বনি বলে। এক্ষেত্রে উভয় ঠোঁটই সক্রিয় উচ্চারক হিসেবে কাজ করে।
ধ্বনি | IPA | বাংলা বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
প | /p/ | প | পাখি, পদ্ম, পল্লব | অঘোষ অল্পপ্রাণ |
ফ | /pʰ/ | ফ | ফুল, ফল, ফাঁদ | অঘোষ মহাপ্রাণ |
ব | /b/ | ব | বাঘ, বন, বাড়ি | ঘোষ অল্পপ্রাণ |
ভ | /bʰ/ | ভ | ভালো, ভোর, ভাই | ঘোষ মহাপ্রাণ |
ম | /m/ | ম | মা, মাছ, মানুষ | ঘোষ নাসিক্য |
স্মরণীয়: দ্বিওষ্ঠ্য ধ্বনির উচ্চারণের সময় দুই ঠোঁট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। 'ম' ধ্বনিটি নাসিক্য বলে এর উচ্চারণে বায়ু নাক দিয়ে বের হয়। 'প' এবং 'ফ'-এর মধ্যে পার্থক্য শুধু শ্বাসের পরিমাণে — 'ফ'-তে বেশি শ্বাস নির্গত হয়।
(খ) ওষ্ঠ্যদন্ত্য ধ্বনি (Labiodental Sounds)
যে ধ্বনি উচ্চারণে নিচের ঠোঁট উপরের দাঁতের সাথে স্পর্শ করে বা নিকটবর্তী হয়, তাকে ওষ্ঠ্যদন্ত্য ধ্বনি বলে। বাংলায় এই ধ্বনিটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় কারণ স্বতন্ত্র বর্ণ নেই, তবে ইংরেজি থেকে আগত শব্দে এর ব্যবহার দেখা যায়।
উদাহরণ: ইংরেজি 'f' ধ্বনি (fan, fine, far) — বাংলায় লেখার সময় 'ফ' দিয়ে লেখা হলেও উচ্চারণে অনেকে ওষ্ঠ্যদন্ত্য ধ্বনি ব্যবহার করেন।
৩.২ দন্ত্য ধ্বনি (Dental Sounds)
সংজ্ঞা: জিভের ডগা উপরের দাঁতের পিছনের দিকে বা দাঁতের গোড়ায় স্পর্শ করে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাকে দন্ত্য ধ্বনি বলে। বাংলা ভাষায় যেসব ধ্বনিকে 'দন্ত্য' বলা হয়, সেগুলি আসলে দন্তমূলীয় (Alveolar) বা খাঁটি দন্ত্য (Dental) হতে পারে।
ধ্বনি | IPA | বাংলা বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
ত | /t̪/ | ত, ৎ | তারা, তবু, তক্তা | অঘোষ অল্পপ্রাণ দন্ত্য |
থ | /t̪ʰ/ | থ | থালা, থাকা, থেমে | অঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য |
দ | /d̪/ | দ | দিন, দেশ, দরজা | ঘোষ অল্পপ্রাণ দন্ত্য |
ধ | /d̪ʰ/ | ধ | ধান, ধরন, ধুলো | ঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য |
ন | /n̪/ | ন | নদী, নাম, নিয়ম | ঘোষ নাসিক্য দন্ত্য |
ল | /l/ | ল | লাল, লোক, লেখা | পার্শ্বিক দন্ত্য |
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: বাংলায় 'ত, থ, দ, ধ' — এই চারটি ধ্বনিকে দন্ত্য বলা হলেও ভাষাবিজ্ঞানীদের মতে এগুলি আসলে দন্তমূলীয় (Alveolar) ধ্বনি। তবে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এগুলিকে দন্ত্য হিসেবেই গণ্য করা হয়।
দন্ত্য ধ্বনির বিস্তারিত উদাহরণ:
বর্গ | ধ্বনি | বিশিষ্ট শব্দ উদাহরণ |
অঘোষ | ত-ধ্বনি | তাল, তীর, তুমি, তোমার, তুলসী, তরুণ, তারকা, তামাশা |
অঘোষ মহাপ্রাণ | থ-ধ্বনি | থলে, থেমে, থাকা, থুতু, থেকে, থোকা, থামা, থানা |
ঘোষ | দ-ধ্বনি | দল, দেশ, দিন, দূর, দেরি, দোয়া, দান, দাবি |
ঘোষ মহাপ্রাণ | ধ-ধ্বনি | ধান, ধুলো, ধারা, ধৈর্য, ধোঁকা, ধরা, ধারণা |
নাসিক্য | ন-ধ্বনি | নাম, নদী, নিজে, নিয়ম, নেতা, নারী, নীল, নৌকা |
৩.৩ মূর্ধন্য ধ্বনি (Retroflex/Cerebral Sounds)
সংজ্ঞা: জিভের ডগা উপরের দিকে বাঁকিয়ে তালুর ভেতরে মূর্ধার দিকে ঠেকিয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাকে মূর্ধন্য ধ্বনি বলে। ইংরেজিতে এই ধ্বনিগুলিকে Retroflex বলা হয় কারণ এই উচ্চারণে জিভের ডগা পিছন দিকে বাঁকানো থাকে।
ধ্বনি | IPA | বাংলা বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
ট | /ʈ/ | ট | টাকা, টেবিল, টুপি | অঘোষ অল্পপ্রাণ মূর্ধন্য |
ঠ | /ʈʰ/ | ঠ | ঠান্ডা, ঠিক, ঠোঁট | অঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য |
ড | /ɖ/ | ড | ডাক, ডিম, ডান | ঘোষ অল্পপ্রাণ মূর্ধন্য |
ঢ | /ɖʰ/ | ঢ | ঢাকা, ঢেউ, ঢোল | ঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য |
ণ | /ɳ/ | ণ | গণনা, মণ, বাণী | ঘোষ নাসিক্য মূর্ধন্য |
ড় | /ɽ/ | ড় | গড়া, মড়া, পড়া | ঘোষ মূর্ধন্য তাড়িত |
ঢ় | /ɽʰ/ | ঢ় | গাঢ়, মাঢ়ি, বাঢ়া | ঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য তাড়িত |
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: মূর্ধন্য ধ্বনি উচ্চারণে জিভের ডগা সরাসরি উপরের তালুতে বা মূর্ধায় ঠেকানো হয়। ড় এবং ঢ় ধ্বনিদ্বয় মূর্ধন্য তাড়িত (Retroflex Flap) — এগুলি উচ্চারণে জিভের ডগা দ্রুত মূর্ধায় একবার আঘাত করে ফিরে আসে।
দন্ত্য বনাম মূর্ধন্য: তুলনামূলক চার্ট
দন্ত্য (Dental/Alveolar) | মূর্ধন্য (Retroflex) | |
ত — তারা, তীর, তাল | ↔ | ট — টাকা, টেবিল, টুপি |
থ — থালা, থানা, থেমে | ↔ | ঠ — ঠান্ডা, ঠোঁট, ঠিক |
দ — দেশ, দিন, দল | ↔ | ড — ডাক, ডিম, ডান |
ধ — ধান, ধুলো, ধারা | ↔ | ঢ — ঢাকা, ঢেউ, ঢোল |
ন — নদী, নাম, নীল | ↔ | ণ — গণনা, বাণী, মণ |
৩.৪ তালব্য ধ্বনি (Palatal Sounds)
সংজ্ঞা: জিভের সামনের অংশ কঠিন তালুর দিকে উঠে স্পর্শ করে বা নিকটবর্তী হয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাকে তালব্য ধ্বনি বলে। এই ধ্বনিগুলিতে জিভের মধ্যভাগ উপরের কঠিন তালুর সাথে সংযোগ স্থাপন করে।
ধ্বনি | IPA | বাংলা বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
চ | /tɕ/ বা /c/ | চ | চাঁদ, চোখ, চাল, চিঠি | অঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য |
ছ | /tɕʰ/ | ছ | ছবি, ছাদ, ছেলে, ছায়া | অঘোষ মহাপ্রাণ তালব্য |
জ | /dʑ/ বা /j/ | জ | জল, জাতি, জীবন | ঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য |
ঝ | /dʑʰ/ | ঝ | ঝড়, ঝরনা, ঝামেলা | ঘোষ মহাপ্রাণ তালব্য |
ঞ | /ɲ/ | ঞ | সঞ্চয়, অঞ্চল, মঞ্চ | ঘোষ নাসিক্য তালব্য |
য | /j/ বা /dʑ/ | য | যাওয়া, যুব, যত্ন | ঘোষ তালব্য অন্তস্থ |
শ | /ɕ/ | শ | শব্দ, শিক্ষা, শীত | অঘোষ তালব্য উষ্মধ্বনি |
তালব্য ধ্বনির বিশেষত্ব: তালব্য ধ্বনিগুলির উচ্চারণে জিভের মধ্যভাগ উপরের কঠিন তালুর দিকে উঠে আসে। 'চ' ও 'জ' ধ্বনিগুলি বাংলায় 'স্পর্শঘর্ষণী' (Affricate) ধ্বনি। 'শ' ধ্বনিটি তালব্য উষ্ম (Palatal Fricative)।
৩.৫ কণ্ঠ্য বা পশ্চাত্তালব্য ধ্বনি (Velar Sounds)
সংজ্ঞা: জিভের পিছনের অংশ (Dorsum) নরম তালুর (Velum) দিকে উঠে স্পর্শ করে বা নিকটবর্তী হয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাকে কণ্ঠ্য বা পশ্চাত্তালব্য ধ্বনি বলে। এই ধ্বনিগুলি কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত বলে মনে হয়।
ধ্বনি | IPA | বাংলা বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
ক | /k/ | ক | কলম, কাল, কাজ, কথা | অঘোষ অল্পপ্রাণ কণ্ঠ্য |
খ | /kʰ/ | খ | খাওয়া, খেলা, খোলা | অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য |
গ | /g/ | গ | গান, গাছ, গল্প, গরু | ঘোষ অল্পপ্রাণ কণ্ঠ্য |
ঘ | /gʰ/ | ঘ | ঘর, ঘাস, ঘুম, ঘোড়া | ঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য |
ঙ | /ŋ/ | ঙ | বাংলা, রঙ, ঢং, সংখ্যা | ঘোষ নাসিক্য কণ্ঠ্য |
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য: কণ্ঠ্য ধ্বনিগুলি বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্গের ধ্বনি। ক-বর্গীয় ধ্বনিগুলিকে 'কণ্ঠ্য' বলা হলেও এগুলি প্রকৃতপক্ষে পশ্চাত্তালব্য (Velar) ধ্বনি — কণ্ঠনালীতে নয়, নরম তালুতে উৎপন্ন হয়। 'ঙ' একটি বিশেষ ধ্বনি — এটি সাধারণত অন্য ব্যঞ্জনের আগে বা পরে আসে।
৩.৬ কণ্ঠনালীয় বা মহাপ্রাণ ধ্বনি (Glottal Sounds)
সংজ্ঞা: গ্লটিস বা স্বরতন্ত্রীর মধ্যবর্তী স্থানে উৎপন্ন ধ্বনিকে কণ্ঠনালীয় ধ্বনি (Glottal Sound) বলে। বাংলায় 'হ' ধ্বনিটি কণ্ঠনালীয় ঘর্ষণী।
ধ্বনি | IPA | বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
হ | /h/ | হ | হাত, হৃদয়, হাওয়া, হরিণ | কণ্ঠনালীয় উষ্ম (Glottal Fricative) |
ঃ (বিসর্গ) | /h/ | ঃ | দুঃখ, প্রাতঃ, স্বাতঃ | কণ্ঠনালীয় উষ্ম (শব্দান্তে) |
ৎ (খণ্ড-ত) | /t̪/ | ৎ | বাৎসরিক, যৎসামান্য | দন্ত্য স্পর্শধ্বনি |
৩.৭ দন্তমূলীয় বা মূর্ধা-সংলগ্ন ধ্বনি (Alveolar Sounds)
সংজ্ঞা: জিভের ডগা বা অগ্রপৃষ্ঠ দন্তমূলে (Alveolar Ridge — উপরের দাঁতের ঠিক পিছনে) স্পর্শ করে বা নিকটবর্তী হয়ে যে ধ্বনি উৎপন্ন হয়, তাকে দন্তমূলীয় ধ্বনি বলে। বাংলায় এই স্থানে উচ্চারিত প্রধান ধ্বনিগুলি হলো:
ধ্বনি | বর্ণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
স | স, ষ | সময়, সুন্দর, সত্য / ষড়যন্ত্র | অঘোষ দন্তমূলীয় উষ্ম |
র | র | রাত, রঙ, রাজা, রমণী | ঘোষ দন্তমূলীয় কম্পিত |
ল | ল | লাল, লোক, লেখা, লহর | ঘোষ পার্শ্বিক দন্তমূলীয় |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: 'র' ধ্বনিটি বাংলায় কম্পিত (Trill) বা তাড়িত (Flap) — জিভের ডগা দ্রুত কম্পন করে উচ্চারিত হয়। 'ল' হলো পার্শ্বিক (Lateral) ধ্বনি — বায়ু জিভের দুই পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। 'স' ও 'ষ' উভয়ই বাংলায় একই উচ্চারণ [s] পায়, তবে 'শ' একটু ভিন্ন [ɕ]।
৪. স্বরধ্বনি ও উচ্চারণস্থান
স্বরধ্বনির (Vowels) উচ্চারণে বায়ু কোনো বাধা ছাড়াই বের হয়। তবে জিভের অবস্থান এবং ঠোঁটের আকৃতি অনুযায়ী স্বরধ্বনির উচ্চারণ ভিন্ন হয়। স্বরধ্বনিকে তিনটি মানদণ্ডে ভাগ করা হয়:
৪.১ জিভের উচ্চতা অনুযায়ী (Tongue Height)
শ্রেণি | বাংলা স্বর | উদাহরণ | বিবরণ |
উচ্চ বা বন্ধ স্বর (High/Close) | ই, ঈ / উ, ঊ | ইলিশ, ঈদ / উলু, ঊষা | জিভ উপরে তোলা |
মধ্য স্বর (Mid) | এ, ও | এক, ওষুধ | জিভ মাঝামাঝি অবস্থানে |
নিম্ন বা বিবৃত স্বর (Low/Open) | আ, অ | আম, অরণ্য | জিভ নিচে নামানো |
৪.২ জিভের অগ্র-পশ্চাৎ অবস্থান অনুযায়ী (Frontness/Backness)
শ্রেণি | বাংলা স্বর | উদাহরণ |
অগ্র বা সম্মুখ স্বর (Front Vowel) | ই, ঈ, এ | ইচ্ছা, ঈর্ষা, একক |
কেন্দ্রীয় স্বর (Central Vowel) | অ, আ | অনেক, আলো |
পশ্চাৎ বা পিছনের স্বর (Back Vowel) | উ, ঊ, ও | উপর, ঊষা, ওষ্ঠ |
৪.৩ বাংলা স্বরধ্বনির সম্পূর্ণ বর্ণনা
স্বর | IPA | উচ্চতা | অবস্থান | ঠোঁট | উদাহরণ |
অ | /ɔ/ | মধ্য-নিম্ন | পশ্চাৎ | গোলাকার | অনেক, অরণ্য, অতল |
আ | /a/ | নিম্ন | কেন্দ্রীয় | অগোলাকার | আম, আকাশ, আলো |
ই / ঈ | /i/ | উচ্চ | অগ্র | অগোলাকার | ইলিশ, ঈদ, ইচ্ছা |
উ / ঊ | /u/ | উচ্চ | পশ্চাৎ | গোলাকার | উলু, ঊষা, উপর |
এ / ঐ | /e/ বা /æ/ | মধ্য-উচ্চ | অগ্র | অগোলাকার | একক, ঐক্য, এলাকা |
ও / ঔ | /o/ বা /ɔ/ | মধ্য-উচ্চ | পশ্চাৎ | গোলাকার | ওষুধ, ঔষধ, ওপার |
ঋ | /ri/ | বিশেষ | যৌগিক | — | ঋতু, ঋষি, ঋণ |
৫. বাংলা বর্গ ও উচ্চারণস্থান — সমন্বিত বিশ্লেষণ
বাংলা ব্যঞ্জনবর্ণমালায় পাঁচটি বর্গ রয়েছে, প্রতিটি বর্গে পাঁচটি করে ধ্বনি আছে (স্পর্শ + নাসিক্য)। প্রতিটি বর্গের নাম ঐ বর্গের উচ্চারণস্থান অনুযায়ী রাখা হয়েছে:
বর্গ | উচ্চারণস্থান | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ মহাপ্রাণ | ঘোষ অল্পপ্রাণ | ঘোষ মহাপ্রাণ | ঘোষ নাসিক্য |
ক-বর্গ | কণ্ঠ্য / পশ্চাত্তালব্য | ক | খ | গ | ঘ | ঙ |
চ-বর্গ | তালব্য | চ | ছ | জ | ঝ | ঞ |
ট-বর্গ | মূর্ধন্য | ট | ঠ | ড | ঢ | ণ |
ত-বর্গ | দন্ত্য | ত | থ | দ | ধ | ন |
প-বর্গ | ওষ্ঠ্য / দ্বিওষ্ঠ্য | প | ফ | ব | ভ | ম |
মুখস্থকরণ কৌশল: বর্গের নাম মনে রাখুন — ক (কণ্ঠ), চ (তালু), ট (মূর্ধা), ত (দন্ত), প (ওষ্ঠ)। স্মৃতিসহায়ক: 'কচটতপ' — কণ্ঠ-চ(তালু)-ট(মূর্ধা)-ত(দন্ত)-প(ওষ্ঠ)।
৬. অন্তঃস্থ ও উষ্মধ্বনি — উচ্চারণস্থান বিশ্লেষণ
৬.১ অন্তঃস্থ ধ্বনি (Semivowels)
অন্তঃস্থ ধ্বনিগুলি স্বর ও ব্যঞ্জনের মাঝামাঝি ধরনের ধ্বনি। বাংলায় চারটি অন্তঃস্থ বর্ণ রয়েছে: য, র, ল, ব।
অন্তঃস্থ বর্ণ | উচ্চারণস্থান | ধ্বনির ধরন | উদাহরণ |
য (য়) | তালব্য | তালব্য অন্তঃস্থ / তাড়িত | যাওয়া, যুব, মেয়ে, হয় |
র | দন্তমূলীয় | কম্পিত / তাড়িত | রাত, রঙিন, ঘর, ধার |
ল | দন্তমূলীয় | পার্শ্বিক | লাল, লেখা, বল, তাল |
ব | ওষ্ঠ্য / দ্বিওষ্ঠ্য | ওষ্ঠ্য অন্তঃস্থ | বন, বাড়ি, নব, সব |
৬.২ উষ্মধ্বনি বা শ্বাসধ্বনি (Fricatives/Sibilants)
যে ধ্বনি উচ্চারণে বায়ু সরু পথে বেরিয়ে একটি উষ্ণ বা ঘর্ষণ শব্দ সৃষ্টি করে, তাকে উষ্মধ্বনি বা ঘর্ষণধ্বনি (Fricative) বলে। বাংলায় প্রধান উষ্মধ্বনিগুলি হলো: শ, ষ, স, হ।
উষ্মধ্বনি | IPA | উচ্চারণস্থান | ধরন | উদাহরণ |
শ | /ɕ/ | তালব্য | অঘোষ তালব্য ঘর্ষণী | শব্দ, শিক্ষা, শীত, শেষ |
ষ | /s/ বা /ɕ/ | মূর্ধন্য (বর্ণে), দন্তমূলীয় (উচ্চারণে) | অঘোষ ঘর্ষণী | ষড়যন্ত্র, ষোল, ষাট |
স | /s/ | দন্তমূলীয় | অঘোষ দন্তমূলীয় ঘর্ষণী | সময়, সত্য, সুখ, সৃষ্টি |
হ | /h/ | কণ্ঠনালীয় | কণ্ঠনালীয় ঘর্ষণী | হাত, হৃদয়, হাওয়া, হরিণ |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাংলা উচ্চারণে শ, ষ, স — তিনটি বর্ণই অনেক ক্ষেত্রে একই উচ্চারণ পায় [s]। তবে 'শ'-এর উচ্চারণ আরেকটু তালব্য [ɕ]। পরীক্ষায় মনে রাখুন: ষ = মূর্ধন্য (বর্গীয় পরিচয়), স = দন্ত্য, শ = তালব্য।
৭. ঘোষ-অঘোষ ও উচ্চারণস্থান — ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিকে তিনটি বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়: (১) উচ্চারণস্থান, (২) উচ্চারণপ্রকৃতি, (৩) ঘোষ-অঘোষ. নিচের ত্রিমাত্রিক চার্টে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য একসাথে দেখানো হয়েছে:
উচ্চারণস্থান | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ মহাপ্রাণ | ঘোষ অল্পপ্রাণ | ঘোষ মহাপ্রাণ | নাসিক্য |
দ্বিওষ্ঠ্য (Bilabial) | প | ফ | ব | ভ | ম |
ওষ্ঠ্যদন্ত্য (Labiodental) | — | — | — | — | — |
দন্ত্য (Dental) | ত | থ | দ | ধ | ন |
মূর্ধন্য (Retroflex) | ট | ঠ | ড | ঢ | ণ |
তালব্য (Palatal) | চ / শ | ছ | জ / য | ঝ | ঞ |
পশ্চাত্তালব্য (Velar) | ক | খ | গ | ঘ | ঙ |
কণ্ঠনালীয় (Glottal) | হ | — | — | — | — |
৮. বিশেষ ধ্বনিসমূহ — বিস্তারিত আলোচনা
৮.১ নাসিক্য ধ্বনি (Nasal Sounds)
নাসিক্য ধ্বনি উচ্চারণে নরম তালু নেমে আসে এবং বায়ু নাক দিয়ে বেরিয়ে যায়। প্রতিটি উচ্চারণস্থানে একটি করে নাসিক্য ধ্বনি আছে:
নাসিক্য ধ্বনি | উচ্চারণস্থান | IPA | পরিবেশ | উদাহরণ |
ম | দ্বিওষ্ঠ্য | /m/ | সর্বত্র ব্যবহৃত | মা, আম, তাম্র, সম্মান |
ন | দন্ত্য | /n̪/ | সর্বত্র ব্যবহৃত | নদী, বন, ধন, মন |
ণ | মূর্ধন্য | /ɳ/ | মূলত সংস্কৃত শব্দে | বাণী, মণ, কণা, ঘণ্টা |
ঞ | তালব্য | /ɲ/ | চ-বর্গীয় ধ্বনির আগে | সঞ্চয়, অঞ্চল, কুঞ্জ |
ঙ | পশ্চাত্তালব্য | /ŋ/ | ক-বর্গীয় ধ্বনির আগে | বাংলা, সংখ্যা, রং |
৮.২ পার্শ্বিক ধ্বনি (Lateral Sound)
'ল' একটি বিশেষ ধ্বনি। এর উচ্চারণে জিভের ডগা দন্তমূলে ঠেকে, কিন্তু জিভের দুই পাশ দিয়ে বায়ু বেরিয়ে যায়। এটিকে পার্শ্বিক ধ্বনি (Lateral Sound) বলে। IPA: /l/।
উদাহরণ: লাল, লোক, লেখা, বল, তাল, কাল, মাল, শাল, ডাল, পাল, হাল, ঝাল, আলো, খেলা, বেলা, মেলা।
৮.৩ কম্পিত ধ্বনি (Trill)
'র' একটি কম্পিত বা তাড়িত ধ্বনি। এর উচ্চারণে জিভের ডগা দ্রুত কম্পন করে দন্তমূলে বা মূর্ধায় আঘাত করে। IPA: /r/ বা /ɾ/।
উদাহরণ: রাত, রঙ, রাজা, ঘর, ধার, তার, বার, আর, পার, সার, হার, নার, কার, মার, খার।
৮.৪ অনুনাসিক ধ্বনি (Nasalized Vowels)
চন্দ্রবিন্দু (ঁ) দিয়ে চিহ্নিত স্বরধ্বনিগুলি নাসিক্যীকৃত (Nasalized) হয়। এক্ষেত্রে মুখ দিয়ে এবং নাক দিয়ে একসাথে বায়ু বের হয়।
উদাহরণ: চাঁদ, মাঁ, গাঁ, ভাঁও, হাঁটা, কাঁদা, ঢাঁকি, পাঁচ, সাঁতার, বাঁশ, কাঁচা, লাঁটা।
৯. উচ্চারণস্থান — প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দৃষ্টিকোণ
৯.১ প্রায়শই পরীক্ষিত তথ্যসমূহ
প্রশ্ন | উত্তর |
'ট' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | মূর্ধা (Retroflex/Cerebral) |
'চ' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | তালু (Palatal) |
'ক' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | কণ্ঠ বা নরম তালু (Velar) |
'প' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | ওষ্ঠ বা দুই ঠোঁট (Bilabial) |
'ত' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | দন্ত বা দন্তমূল (Dental/Alveolar) |
'হ' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | কণ্ঠনালী বা গ্লটিস (Glottal) |
'শ' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | তালু (Palatal) |
'ষ' ধ্বনির বর্গ অনুযায়ী স্থান? | মূর্ধা (Retroflex) |
'স' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | দন্ত বা দন্তমূল (Dental/Alveolar) |
'ম' ধ্বনির উচ্চারণস্থান কোথায়? | ওষ্ঠ বা দুই ঠোঁট (Bilabial) |
কোন ধ্বনিটি নাসিক্য কণ্ঠ্য? | ঙ |
কোন ধ্বনিটি নাসিক্য তালব্য? | ঞ |
কোন ধ্বনিটি নাসিক্য মূর্ধন্য? | ণ |
'ড়' ও 'ঢ়' কোন ধরনের ধ্বনি? | মূর্ধন্য তাড়িত (Retroflex Flap) |
'ল' কোন ধরনের ধ্বনি? | দন্তমূলীয় পার্শ্বিক (Alveolar Lateral) |
৯.২ বিভ্রান্তিকর ধ্বনি-জুটি — পার্থক্য বিশ্লেষণ
ধ্বনি-জুটি | পার্থক্যের ভিত্তি | উদাহরণ দিয়ে পার্থক্য |
ত বনাম ট | দন্ত্য বনাম মূর্ধন্য | তাল (ফল) vs টাল (টলমল) |
দ বনাম ড | দন্ত্য বনাম মূর্ধন্য | দাক (আহ্বান) vs ডাক (ডাকঘর) |
ন বনাম ণ | দন্ত্য বনাম মূর্ধন্য | নয়ন vs গণনা |
শ বনাম স | তালব্য বনাম দন্ত্য | শান vs সান (আলো) |
চ বনাম জ | অঘোষ বনাম ঘোষ তালব্য | চাল vs জাল |
ক বনাম গ | অঘোষ বনাম ঘোষ কণ্ঠ্য | কাজ vs গাজ |
প বনাম ব | অঘোষ বনাম ঘোষ ওষ্ঠ্য | পাড়া vs বাড়া |
৯.৩ ধ্বনি থেকে উচ্চারণস্থান — দ্রুত চার্ট
উচ্চারণস্থান | সংশ্লিষ্ট ধ্বনি/বর্ণ |
দ্বিওষ্ঠ্য (Bilabial) | প, ফ, ব, ভ, ম |
দন্ত্য (Dental) | ত, থ, দ, ধ, ন, ল, স |
মূর্ধন্য (Retroflex) | ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, ড়, ঢ়, ষ (বর্গীয়) |
তালব্য (Palatal) | চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, য, শ |
পশ্চাত্তালব্য/কণ্ঠ্য (Velar) | ক, খ, গ, ঘ, ঙ |
কণ্ঠনালীয় (Glottal) | হ, ঃ (বিসর্গ) |
দন্তমূলীয় (Alveolar) | র, ল, স (আধুনিক বিশ্লেষণে) |
১০. ধ্বনি পরিবর্তন ও উচ্চারণস্থানের ভূমিকা
১০.১ সমীভবন (Assimilation)
সমীভবনে একটি ধ্বনি পাশের ধ্বনির প্রভাবে তার উচ্চারণস্থান পরিবর্তন করে সেই ধ্বনির মতো হয়ে যায়।
মূল রূপ | পরিবর্তিত রূপ | কারণ |
তৎ + পর = তৎপর | তৎপর | ত্-ধ্বনির আগে প-ধ্বনি — দন্ত্য স্পর্শ বজায় |
জগৎ + নাথ | জগন্নাথ | ত্ → ন্ (নাসিক্য সমীভবন) |
সম্ + বন্ধ | সম্বন্ধ | ম্ → ব-এর আগে ওষ্ঠ্য বজায় |
চন্দ্র + ম | চন্দ্রিমা | উচ্চারণস্থান অনুযায়ী পরিবর্তন |
১০.২ ব্যঞ্জন সন্ধিতে উচ্চারণস্থানের প্রভাব
সন্ধিতে একটি ব্যঞ্জনের পরে অন্য ব্যঞ্জন এলে উচ্চারণস্থান অনুযায়ী নিয়ম প্রযোজ্য হয়:
কণ্ঠ্য ধ্বনির আগে ণ/ন → ঙ হয়: বঙ্গ (বন্+গ), সংখ্যা, রং
তালব্য ধ্বনির আগে ণ/ন → ঞ হয়: সঞ্চয় (সন্+চ), কুঞ্জ (কুন্+জ)
মূর্ধন্য ধ্বনির আগে ণ/ন → ণ হয়: কণ্টক, সন্ট → ণ্ট
দন্ত্য ধ্বনির আগে ন স্বাভাবিক থাকে: বন্ধু, সন্ধ্যা
ওষ্ঠ্য ধ্বনির আগে ণ/ন → ম হয়: সম্পদ, সম্ভব, সম্মান
স্মরণীয় সূত্র: অনুস্বার (ং/ম্) বা অনুনাসিক ধ্বনি পরবর্তী ব্যঞ্জনের উচ্চারণস্থান অনুযায়ী রূপান্তরিত হয় — এটিই সমস্বানস্থান নীতি (Homorganic Assimilation)।
১১. সংস্কৃত, তৎসম ও বাংলা উচ্চারণস্থানের বিবর্তন
সংস্কৃত থেকে বাংলায় আসার পথে অনেক ধ্বনির উচ্চারণস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। সংস্কৃতে মূর্ধন্য 'ণ' ছিল মূর্ধন্য উচ্চারণে, কিন্তু বাংলায় এটি দন্ত্য 'ন'-এর মতোই উচ্চারিত হয়। একইভাবে সংস্কৃতের মূর্ধন্য 'ষ' বাংলায় প্রায়ই দন্তমূলীয় 'স'-এর মতো শোনায়।
সংস্কৃত উচ্চারণ | বাংলা উচ্চারণ | উদাহরণ | মন্তব্য |
মূর্ধন্য ণ [ɳ] | দন্ত্য ন [n] | বাণী, গণনা, মণ | বাংলায় পার্থক্য নেই |
মূর্ধন্য ষ [ʂ] | দন্তমূলীয় স [s] | ষড়যন্ত্র, ষোল | উচ্চারণে প্রায় এক |
দন্ত্য ত [t̪] | অপরিবর্তিত | তারা, তবু | একই রয়েছে |
দন্ত্য স [s] | অপরিবর্তিত | সময়, সত্য | একই রয়েছে |
১২. পরিচয় শনাক্তকরণ — সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ তালিকা
বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনির সম্পূর্ণ পরিচয় নির্ধারণে তিনটি বৈশিষ্ট্য একসাথে বলতে হয়: (১) উচ্চারণস্থান + (২) উচ্চারণপ্রকৃতি + (৩) ঘোষ-অঘোষ।
বর্ণ | উচ্চারণস্থান | উচ্চারণপ্রকৃতি | ঘোষতা | পূর্ণ পরিচয় |
ক | পশ্চাত্তালব্য | স্পর্শ | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ অল্পপ্রাণ পশ্চাত্তালব্য স্পর্শ |
খ | পশ্চাত্তালব্য | স্পর্শ | অঘোষ মহাপ্রাণ | অঘোষ মহাপ্রাণ পশ্চাত্তালব্য স্পর্শ |
গ | পশ্চাত্তালব্য | স্পর্শ | ঘোষ অল্পপ্রাণ | ঘোষ অল্পপ্রাণ পশ্চাত্তালব্য স্পর্শ |
ঘ | পশ্চাত্তালব্য | স্পর্শ | ঘোষ মহাপ্রাণ | ঘোষ মহাপ্রাণ পশ্চাত্তালব্য স্পর্শ |
ঙ | পশ্চাত্তালব্য | নাসিক্য | ঘোষ | ঘোষ পশ্চাত্তালব্য নাসিক্য |
চ | তালব্য | স্পর্শঘর্ষণী | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য স্পর্শঘর্ষণী |
ট | মূর্ধন্য | স্পর্শ | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ অল্পপ্রাণ মূর্ধন্য স্পর্শ |
ত | দন্ত্য | স্পর্শ | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ অল্পপ্রাণ দন্ত্য স্পর্শ |
প | দ্বিওষ্ঠ্য | স্পর্শ | অঘোষ অল্পপ্রাণ | অঘোষ অল্পপ্রাণ দ্বিওষ্ঠ্য স্পর্শ |
ম | দ্বিওষ্ঠ্য | নাসিক্য | ঘোষ | ঘোষ দ্বিওষ্ঠ্য নাসিক্য |
ন | দন্ত্য | নাসিক্য | ঘোষ | ঘোষ দন্ত্য নাসিক্য |
ণ | মূর্ধন্য | নাসিক্য | ঘোষ | ঘোষ মূর্ধন্য নাসিক্য |
ঞ | তালব্য | নাসিক্য | ঘোষ | ঘোষ তালব্য নাসিক্য |
র | দন্তমূলীয় | কম্পিত/তাড়িত | ঘোষ | ঘোষ দন্তমূলীয় কম্পিত |
ল | দন্তমূলীয় | পার্শ্বিক | ঘোষ | ঘোষ দন্তমূলীয় পার্শ্বিক |
শ | তালব্য | উষ্ম/ঘর্ষণী | অঘোষ | অঘোষ তালব্য উষ্ম |
স | দন্তমূলীয় | উষ্ম/ঘর্ষণী | অঘোষ | অঘোষ দন্তমূলীয় উষ্ম |
হ | কণ্ঠনালীয় | উষ্ম/ঘর্ষণী | অঘোষ | অঘোষ কণ্ঠনালীয় উষ্ম |
ড় | মূর্ধন্য | তাড়িত | ঘোষ | ঘোষ মূর্ধন্য তাড়িত |
১৩. BCS ও ব্যাংক পরীক্ষায় উচ্চারণস্থান-সংক্রান্ত প্রশ্নের ধরন
বিসিএস ও বিভিন্ন ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় উচ্চারণের স্থান থেকে সরাসরি এবং প্রচ্ছন্নভাবে প্রশ্ন আসে। নিচে প্রশ্নের ধরন ও উত্তর কৌশল আলোচনা করা হলো:
সরাসরি প্রশ্নের ধরন
প্রশ্নের ধরন | উদাহরণ | উত্তরের কৌশল |
উচ্চারণস্থান জিজ্ঞাসা | 'ট' কোথায় উচ্চারিত হয়? | মূর্ধা/মূর্ধন্য — সরাসরি উত্তর দিন |
বর্গ থেকে স্থান | চ-বর্গীয় ধ্বনির উচ্চারণস্থান? | তালু — বর্গের নাম = উচ্চারণস্থান |
প্রকৃতি নির্ণয় | 'শ' কোন ধরনের ধ্বনি? | তালব্য উষ্মধ্বনি |
পার্থক্য নির্ধারণ | ত ও ট-এর পার্থক্য কী? | ত=দন্ত্য, ট=মূর্ধন্য |
জোড় মিলানো | বর্ণ ↔ উচ্চারণস্থান মেলান | ছক মুখস্থ রাখুন |
সন্ধিতে ধ্বনি পরিবর্তন | সন্+জীব = সঞ্জীব কেন? | তালব্য আগে তালব্য নাসিক্য |
সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ — শেষ মুহূর্তের পুনর্দর্শন:
# | তথ্য | মনে রাখার উপায় |
১ | ক-বর্গ = কণ্ঠ্য (পশ্চাত্তালব্য) | ক দিয়ে কণ্ঠ |
২ | চ-বর্গ = তালব্য | চ দিয়ে তালু চাটা |
৩ | ট-বর্গ = মূর্ধন্য | ট দিয়ে মাথা/মূর্ধা |
৪ | ত-বর্গ = দন্ত্য | ত দিয়ে দাঁত |
৫ | প-বর্গ = ওষ্ঠ্য (দ্বিওষ্ঠ্য) | প দিয়ে ঠোঁট (lips) |
৬ | হ = কণ্ঠনালীয় (Glottal) | হাঁফানো = গলা থেকে |
৭ | শ = তালব্য উষ্ম, স = দন্তমূলীয় উষ্ম | শ → তালু, স → দন্ত |
৮ | ণ = মূর্ধন্য নাসিক্য, ন = দন্ত্য নাসিক্য | ণ → মূর্ধা, ন → দন্ত |
৯ | ড়, ঢ় = মূর্ধন্য তাড়িত | ড় এর ডগা উল্টা = মূর্ধন্য |
১০ | ল = পার্শ্বিক, র = কম্পিত | ল দিয়ে পাশ, র দিয়ে রর কম্পন |