জটিল বাক্য ও মিশ্র বাক্য |
১. প্রারম্ভিক পর্যালোচনা — বাক্যের শ্রেণিবিভাগ
গঠন বা Structure-এর ভিত্তিতে বাংলা বাক্যকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষায় এই শ্রেণিবিভাগ থেকে বারবার প্রশ্ন আসে। নিচে তিনটি শ্রেণির মৌলিক পরিচয় তুলে ধরা হলো:
বাক্যের ধরন | মূল বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
সরল বাক্য (Simple Sentence) | একটি মাত্র সমাপিকা ক্রিয়া; একটি উদ্দেশ্য ও একটি বিধেয় | সে বাজারে গেল। |
জটিল বাক্য (Complex Sentence) | একটি প্রধান খণ্ডবাক্য + এক বা একাধিক অধীন খণ্ডবাক্য | যে পরিশ্রম করে, সে সুখী হয়। |
মিশ্র বাক্য (Compound-Complex Sentence) | দুই বা ততোধিক প্রধান খণ্ডবাক্য + কমপক্ষে একটি অধীন খণ্ডবাক্য | সে পরিশ্রম করে এবং যা চায় তা পায়। |
⚠ পরীক্ষামূলক সতর্কতা: অনেকে 'মিশ্র বাক্য' ও 'যৌগিক বাক্য' (Compound Sentence) গুলিয়ে ফেলেন। যৌগিক বাক্যে শুধু সমান মর্যাদার দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য থাকে; অধীন খণ্ডবাক্য থাকে না। মিশ্র বাক্যে অবশ্যই কমপক্ষে একটি অধীন খণ্ডবাক্য থাকতে হবে। |
২. জটিল বাক্য (Complex Sentence)
২.১ সংজ্ঞা
জটিল বাক্যের সংজ্ঞা |
যে বাক্যে একটি প্রধান খণ্ডবাক্য (Principal Clause)-এর সাথে এক বা একাধিক অধীন খণ্ডবাক্য (Subordinate Clause) অধীনতামূলক সংযোজক অব্যয় (Subordinating Conjunction) দ্বারা যুক্ত থাকে, তাকে জটিল বাক্য বলে। |
প্রধান খণ্ডবাক্য স্বাধীনভাবে অর্থ প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু অধীন খণ্ডবাক্য একা অর্থ সম্পূর্ণ করতে পারে না — এটিই জটিল বাক্যের মূল বৈশিষ্ট্য। |
২.২ জটিল বাক্যের উপাদান বিশ্লেষণ
জটিল বাক্যে দুটি মূল অংশ থাকে — প্রধান খণ্ডবাক্য ও অধীন খণ্ডবাক্য। এদের মধ্যে সম্পর্ক এবং কার্যভূমিকা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
প্রধান খণ্ডবাক্য (Principal/Main Clause) | অধীন খণ্ডবাক্য (Subordinate Clause) |
স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে | একা অর্থ সম্পূর্ণ করতে পারে না |
সমাপিকা ক্রিয়া বিদ্যমান | অসমাপিকা বা নির্ভরশীল ক্রিয়া থাকে |
বাক্যের কেন্দ্রবিন্দু | প্রধান বাক্যের উপর নির্ভরশীল |
এককভাবে বাক্য হিসেবে দাঁড়াতে পারে | এককভাবে বাক্য হিসেবে দাঁড়াতে পারে না |
উদাহরণ: 'সে সুখী হয়' | উদাহরণ: 'যে পরিশ্রম করে' |
২.৩ জটিল বাক্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ
➤ জটিল বাক্যে সর্বদা একটি মাত্র প্রধান খণ্ডবাক্য থাকে।
➤ অধীন খণ্ডবাক্য এক বা একাধিক হতে পারে।
➤ অধীনতামূলক সংযোজক অব্যয় দুটি খণ্ডবাক্যকে যুক্ত করে।
➤ অধীন খণ্ডবাক্য বাক্যের বিভিন্ন পদের কাজ করতে পারে (বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া-বিশেষণ)।
➤ বাংলায় অধীন খণ্ডবাক্য সাধারণত 'যে/যা/যখন/যদি/যতক্ষণ/কারণ' ইত্যাদি সংযোজক অব্যয় দিয়ে শুরু হয়।
➤ ইংরেজিতে that, which, who, when, if, because, although, since, as, until ইত্যাদি দিয়ে অধীন খণ্ডবাক্য শুরু হয়।
৩. অধীন খণ্ডবাক্যের শ্রেণিবিভাগ
অধীন খণ্ডবাক্য কাজ বা Function অনুযায়ী প্রধানত তিন প্রকার। কোন ধরনের অধীন খণ্ডবাক্য দিয়ে জটিল বাক্য গঠিত হয়েছে, তা চেনাটা পরীক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩.১ বিশেষ্য উপবাক্য (Noun Clause)
বিশেষ্য উপবাক্য — সংজ্ঞা |
যে অধীন খণ্ডবাক্য প্রধান বাক্যে বিশেষ্যের কাজ করে, তাকে বিশেষ্য উপবাক্য বলে। এটি বাক্যে কর্তা, কর্ম, সম্পূরক বা সম্বোধন পদের ভূমিকা পালন করতে পারে। |
বাংলায় সাধারণত 'যে', 'কী', 'কেন', 'কখন' ইত্যাদি সংযোজক দিয়ে বিশেষ্য উপবাক্য গঠিত হয়। |
বিশেষ্য উপবাক্যের উদাহরণ (কর্তা হিসেবে) |
বাক্য: যে সৎ সে সর্বত্র মান পায়। |
বিশ্লেষণ: 'যে সৎ' — বিশেষ্য উপবাক্য (কর্তার কাজ করছে); 'সে সর্বত্র মান পায়' — প্রধান খণ্ডবাক্য |
বাক্য: সে বলল যে আজ বৃষ্টি হবে। |
বিশ্লেষণ: 'যে আজ বৃষ্টি হবে' — বিশেষ্য উপবাক্য (কর্মের কাজ করছে); 'সে বলল' — প্রধান খণ্ডবাক্য |
বাক্য: তুমি কী খাবে তা বলো। |
বাক্য: সে কোথায় থাকে তা আমি জানি না। |
বাক্য: তার আসল পরিচয় কী তা এখনো অজানা। |
৩.২ বিশেষণ উপবাক্য (Adjective/Relative Clause)
বিশেষণ উপবাক্য — সংজ্ঞা |
যে অধীন খণ্ডবাক্য প্রধান বাক্যের কোনো বিশেষ্য বা সর্বনামকে বিশেষণের মতো বিশেষায়িত বা পরিচয় দেয়, তাকে বিশেষণ উপবাক্য বলে। |
বাংলায় সাধারণত 'যে', 'যা', 'যিনি', 'যার', 'যাকে', 'যেটি' ইত্যাদি সংযোজক সর্বনাম দ্বারা গঠিত হয়। |
ইংরেজিতে who, whom, whose, which, that দ্বারা গঠিত Relative Clause এর সমতুল্য। |
বিশেষণ উপবাক্যের উদাহরণ |
বাক্য: যে লোকটি কাল এসেছিল সে আমার বন্ধু। |
বিশ্লেষণ: 'যে লোকটি কাল এসেছিল' — বিশেষণ উপবাক্য ('লোকটি'কে বিশেষায়িত করছে); 'সে আমার বন্ধু' — প্রধান খণ্ডবাক্য |
বাক্য: যে বইটি হারিয়েছে সেটি আমার প্রিয় ছিল। |
বাক্য: সে যে বাড়িতে থাকে সেটি তার পৈতৃক সম্পত্তি। |
বাক্য: যার মন শান্ত, সে সত্যিকারের সুখী। |
বাক্য: যিনি এই গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক। |
৩.৩ ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য (Adverbial Clause)
ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য — সংজ্ঞা |
যে অধীন খণ্ডবাক্য প্রধান বাক্যের ক্রিয়াকে বিভিন্ন দিক থেকে (সময়, কারণ, শর্ত, উদ্দেশ্য, ফল, স্থান, পরিমাণ, ছাড় ইত্যাদি) বিশেষায়িত করে, তাকে ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য বলে। |
এটি সংখ্যায় বিশেষণ উপবাক্যের চেয়ে বেশি প্রকারের হতে পারে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এ থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে। |
ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্যের ধরন | সংযোজক অব্যয় | উদাহরণ |
সময়বাচক (Time) | যখন, যতক্ষণ, যখনই, যেই না, পূর্বে যে, পরে যে | যখন সে এল, আমি চলে গেলাম। |
কারণবাচক (Cause/Reason) | কারণ, যেহেতু, যেজন্য, যে কারণে | যেহেতু সে অসুস্থ, সে আসতে পারেনি। |
শর্তবাচক (Condition) | যদি, যদি না, শর্তে যে, তাহলে | যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে যাব না। |
উদ্দেশ্যবাচক (Purpose) | যাতে, এই উদ্দেশ্যে যে, যেন | সে পড়ে যাতে পাস করতে পারে। |
ফলবাচক (Result/Effect) | এতটাই... যে, এই পরিমাণে যে | সে এত পরিশ্রম করল যে অসুস্থ হয়ে গেল। |
স্থানবাচক (Place) | যেখানে, যেদিকে | যেখানে সে থাকে, সেটি একটি ছোট গ্রাম। |
ছাড়বাচক (Concession) | যদিও, যদ্যপি, তথাপি | যদিও সে গরিব, তবুও সৎ। |
তুলনাবাচক (Comparison) | যত...তত, যেমন...তেমন | যত পড়বে তত জানবে। |
পরিমাণবাচক (Manner/Extent) | যেভাবে, যেমনভাবে | যেভাবে বলবে, সেভাবে করব। |
ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্যের বিচিত্র উদাহরণ |
[সময়] যখন সূর্য অস্ত যায়, তখন পাখিরা নীড়ে ফেরে। |
[কারণ] যেহেতু তুমি মিথ্যা বলেছ, সেহেতু শাস্তি পাবে। |
[শর্ত] যদি তুমি চাও, তাহলে আমিও যাব। |
[উদ্দেশ্য] সে কঠোর পরিশ্রম করছে যাতে পরীক্ষায় ভালো করতে পারে। |
[ফল] সে এতটাই ক্লান্ত হয়ে গেল যে হাঁটতে পারছিল না। |
[ছাড়] যদিও আকাশ মেঘলা ছিল, তবুও আমরা বের হলাম। |
[তুলনা] যত জ্ঞান অর্জন করবে, তত বিনয়ী হবে। |
[স্থান] যেখানে ধর্ম নেই, সেখানে শান্তি নেই। |
৪. অধীনতামূলক সংযোজক অব্যয়ের পূর্ণ তালিকা
জটিল বাক্যের প্রধান খণ্ডবাক্য ও অধীন খণ্ডবাক্যকে সংযুক্ত করার জন্য যে অব্যয় ব্যবহৃত হয়, তাকে অধীনতামূলক সংযোজক অব্যয় বলে। এগুলো মুখস্থ করা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অপরিহার্য।
বাংলা অধীনতামূলক সংযোজক অব্যয় | অর্থ / ব্যবহার |
যে, যা, যিনি, যাঁরা, যাদের, যাকে, যেটি, যেগুলো | নামবাচক ও বিশেষণবাচক অধীন উপবাক্যে |
যখন, যখনই, যেইমাত্র, যেই না | সময়বাচক অধীন উপবাক্যে |
যেখানে, যে দিকে, যে পথে | স্থানবাচক অধীন উপবাক্যে |
যদি, যদিও, যদ্যপি | শর্ত ও ছাড়বাচক অধীন উপবাক্যে |
যেহেতু, কারণ, যে কারণে, যে জন্য | কারণবাচক অধীন উপবাক্যে |
যাতে, এই উদ্দেশ্যে যে | উদ্দেশ্যবাচক অধীন উপবাক্যে |
যত...তত, যেমন...তেমন, যতটা...ততটা | তুলনাবাচক অধীন উপবাক্যে |
যতক্ষণ, যতদিন, যতক্ষণ পর্যন্ত | সময়সীমাবাচক অধীন উপবাক্যে |
যদ্যপি, তথাপি / যদিও, তবুও | ছাড়বাচক যুগ্ম অব্যয় |
যেভাবে, যেমনভাবে, যেরূপ | পদ্ধতি বা রীতিবাচক উপবাক্যে |
💡 গুরুত্বপূর্ণ: বাংলায় 'যে-সে', 'যা-তা', 'যদি-তাহলে', 'যেহেতু-সেহেতু', 'যদিও-তবুও', 'যত-তত', 'যখন-তখন' এই ধরনের যুগ্ম সম্পর্কমূলক সংযোজক (Correlative Conjunctions) সাধারণত জটিল বাক্যের বৈশিষ্ট্য। এদের প্রথম অংশটি অধীন খণ্ডবাক্যে এবং দ্বিতীয় অংশটি প্রধান খণ্ডবাক্যে বসে। |
৫. মিশ্র বাক্য (Compound-Complex Sentence)
৫.১ সংজ্ঞা
মিশ্র বাক্যের সংজ্ঞা |
যে বাক্যে দুই বা ততোধিক সমন্বিত (Co-ordinate) প্রধান খণ্ডবাক্য-এর সাথে কমপক্ষে একটি অধীন (Subordinate) খণ্ডবাক্য যুক্ত থাকে, তাকে মিশ্র বাক্য বলে। অর্থাৎ, মিশ্র বাক্য = যৌগিক বাক্য + জটিল বাক্য-এর সমন্বয়। |
৫.২ মিশ্র বাক্যের গঠনসূত্র
মিশ্র বাক্যের গঠনসূত্র |
গঠনসূত্র: [প্রধান খণ্ডবাক্য ১] + সমন্বয়ী সংযোজক + [প্রধান খণ্ডবাক্য ২] + অধীনতামূলক সংযোজক + [অধীন খণ্ডবাক্য] |
বা: [অধীন খণ্ডবাক্য + প্রধান খণ্ডবাক্য ১] + সমন্বয়ী সংযোজক + [প্রধান খণ্ডবাক্য ২] |
সমন্বয়ী সংযোজক: এবং, ও, কিন্তু, তবে, তথাপি, অথবা, বরং, নতুবা, তাই, সুতরাং, অতএব |
অধীনতামূলক সংযোজক: যে, যা, যখন, যদি, যদিও, যেহেতু, যাতে ইত্যাদি |
৫.৩ মিশ্র বাক্যের উদাহরণ ও বিশ্লেষণ
মিশ্র বাক্যের বিশ্লেষণ — উদাহরণ ১ |
বাক্য: রাহেলা পরিশ্রমী এবং সে যা করে তা সফলভাবে সম্পন্ন করে। |
প্রধান খণ্ডবাক্য ১: 'রাহেলা পরিশ্রমী' |
সমন্বয়ী সংযোজক: 'এবং' |
প্রধান খণ্ডবাক্য ২: 'সে ... সফলভাবে সম্পন্ন করে' |
অধীন খণ্ডবাক্য: 'যা করে' (বিশেষণ উপবাক্য — 'তা'-কে বিশেষায়িত করছে) |
মিশ্র বাক্যের বিশ্লেষণ — উদাহরণ ২ |
বাক্য: যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে আমরা যাব না এবং ঘরেই থাকব। |
অধীন খণ্ডবাক্য: 'যদি বৃষ্টি হয়' (শর্তবাচক ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য) |
প্রধান খণ্ডবাক্য ১: 'আমরা যাব না' |
সমন্বয়ী সংযোজক: 'এবং' |
প্রধান খণ্ডবাক্য ২: 'ঘরেই থাকব' |
আরও মিশ্র বাক্যের উদাহরণ |
সে গান গায় এবং যখন গায় তখন সবাই মুগ্ধ হয়। |
আমি তাকে চিনি কিন্তু যে কারণে সে এসেছে তা আমি জানি না। |
যদিও সে দরিদ্র, তবুও সে সৎ এবং সবার শ্রদ্ধার পাত্র। |
তুমি পরিশ্রম করো অথবা যা ফল হওয়ার তা হোক। |
যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছে, তাই আমরা ঘরে বসলাম এবং গল্প করলাম। |
রাকিব পড়াশোনায় মনোযোগ দেয় এবং সে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা অর্জন করবেই। |
তারা আসবে না, কারণ আজ ছুটি এবং সবাই বাড়িতে আছে। |
যদিও পথ কঠিন, তবুও আমরা এগিয়ে যাব এবং সফল হব। |
৬. সরল, জটিল ও মিশ্র বাক্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বিচার্য বিষয় | জটিল বাক্য | মিশ্র বাক্য |
প্রধান খণ্ডবাক্য | শুধু একটি | দুই বা তার বেশি |
অধীন খণ্ডবাক্য | এক বা একাধিক (আবশ্যিক) | কমপক্ষে একটি (আবশ্যিক) |
সমন্বয়ী সংযোজক | থাকে না | অবশ্যই থাকে |
অধীনতামূলক সংযোজক | অবশ্যই থাকে | অবশ্যই থাকে |
গঠন জটিলতা | মধ্যম | সর্বোচ্চ |
উদাহরণ | যে পড়ে, সে শেখে। | সে পড়ে এবং যা শেখে তা প্রয়োগ করে। |
৭. বাক্য রূপান্তর কৌশল
পরীক্ষায় একটি বাক্যকে সরল থেকে জটিল, জটিল থেকে সরল বা মিশ্রে রূপান্তর করার প্রশ্ন আসে। এটি একটি বিশেষ দক্ষতা এবং নিয়মিত অনুশীলনের বিষয়। নিচে বিভিন্ন কৌশল ও উদাহরণ দেওয়া হলো:
৭.১ সরল → জটিল বাক্যে রূপান্তর
সরল বাক্যের অসমাপিকা ক্রিয়াকে সমাপিকা ক্রিয়ায় পরিণত করে এবং উপযুক্ত অধীনতামূলক সংযোজক যোগ করে জটিল বাক্য গঠন করতে হয়।
সরল → জটিল রূপান্তর উদাহরণ |
সরল: সৎ লোক সর্বত্র সম্মানিত হয়। |
জটিল: যে লোক সৎ, সে সর্বত্র সম্মানিত হয়। |
সরল: অসুস্থ হওয়ার কারণে সে আসতে পারেনি। |
জটিল: যেহেতু সে অসুস্থ, সেহেতু সে আসতে পারেনি। |
সরল: বৃষ্টি পড়লে আমি যাব না। |
জটিল: যদি বৃষ্টি পড়ে, তাহলে আমি যাব না। |
সরল: গরিব হওয়া সত্ত্বেও সে সৎ। |
জটিল: যদিও সে গরিব, তথাপি সে সৎ। |
সরল: ভোর হওয়ার সাথে সাথে পাখি ডাকে। |
জটিল: যখনই ভোর হয়, তখনই পাখি ডাকে। |
৭.২ জটিল → সরল বাক্যে রূপান্তর
জটিল বাক্যের অধীন খণ্ডবাক্যকে অসমাপিকা ক্রিয়া বা বিশেষ্যপদে রূপান্তর করে সরল বাক্য গঠন করতে হয়।
জটিল → সরল রূপান্তর উদাহরণ |
জটিল: যে মিথ্যা বলে সে অধম। |
সরল: মিথ্যাবাদী অধম। |
জটিল: যেহেতু বৃষ্টি হচ্ছিল, তাই সে বের হয়নি। |
সরল: বৃষ্টির কারণে সে বের হয়নি। |
জটিল: যদি তুমি পড়ো, তাহলে পাস করবে। |
সরল: পড়লে পাস করবে। |
জটিল: যদিও সে ছোট, তবুও সে বুদ্ধিমান। |
সরল: ছোট হওয়া সত্ত্বেও সে বুদ্ধিমান। |
৭.৩ যৌগিক → জটিল বাক্যে রূপান্তর
যৌগিক বাক্যের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রধান খণ্ডবাক্যকে অধীন খণ্ডবাক্যে রূপান্তর করে এবং উপযুক্ত অধীনতামূলক সংযোজক যোগ করে জটিল বাক্য গঠন করতে হয়।
যৌগিক → জটিল রূপান্তর উদাহরণ |
যৌগিক: সে পরিশ্রমী, তাই সে সফল। |
জটিল: যেহেতু সে পরিশ্রমী, সেহেতু সে সফল। |
যৌগিক: বৃষ্টি হলো, তবুও আমরা বের হলাম। |
জটিল: যদিও বৃষ্টি হলো, তবুও আমরা বের হলাম। |
৮. BCS ও ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষা-কেন্দ্রিক বিশেষ আলোচনা
বিভিন্ন BCS প্রিলিমিনারি, ব্যাংক নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় জটিল ও মিশ্র বাক্য থেকে কোন ধরনের প্রশ্ন আসে এবং কীভাবে উত্তর করতে হয়, তা নিচে আলোচনা করা হলো।
৮.১ বাক্য চেনার কৌশল (পরীক্ষায় দ্রুত সমাধান)
বাক্য চেনার ধাপ-ভিত্তিক পদ্ধতি |
ধাপ ১: বাক্যে সমাপিকা ক্রিয়া কতগুলো আছে তা গণনা করুন। |
ধাপ ২: সমাপিকা ক্রিয়া একটি হলে — সরল বাক্য। |
ধাপ ৩: দুটি বা তার বেশি সমাপিকা ক্রিয়া আছে কি না দেখুন। |
ধাপ ৪: সমাপিকা ক্রিয়া একাধিক থাকলে — কোনো অধীনতামূলক সংযোজক (যে, যা, যদি ইত্যাদি) আছে কি না দেখুন। |
ধাপ ৫: শুধু সমন্বয়ী সংযোজক (এবং, ও, কিন্তু) থাকলে — যৌগিক বাক্য। |
ধাপ ৬: অধীনতামূলক সংযোজক থাকলে এবং একটি মাত্র প্রধান খণ্ডবাক্য থাকলে — জটিল বাক্য। |
ধাপ ৭: অধীনতামূলক সংযোজক + সমন্বয়ী সংযোজক উভয়ই থাকলে এবং দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য থাকলে — মিশ্র বাক্য। |
৮.২ ঘন ঘন পরীক্ষায় আসা বাক্য-শ্রেণি নির্ণয় প্রশ্ন
বাক্য | শ্রেণি | ব্যাখ্যা |
যে মিথ্যা বলে, সে অধম। | জটিল বাক্য | 'যে মিথ্যা বলে' — অধীন উপবাক্য; 'সে অধম' — প্রধান |
সে গান গায় এবং নাচে। | যৌগিক বাক্য | দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য, কোনো অধীন নেই |
যদিও বৃষ্টি হলো, তবুও আমরা গেলাম। | জটিল বাক্য | 'যদিও' — অধীনতামূলক; একটি প্রধান খণ্ডবাক্য |
পরিশ্রমী ব্যক্তি সুখী হয়। | সরল বাক্য | একটি সমাপিকা ক্রিয়া, একটি উদ্দেশ্য |
যেহেতু সে মিথ্যা বলেছে, তাই শাস্তি পাবে। | জটিল বাক্য | কারণবাচক অধীন উপবাক্য |
সে লেখে এবং যা লেখে তা অর্থবহ। | মিশ্র বাক্য | দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য + একটি অধীন উপবাক্য |
মেহনত করো, নইলে ব্যর্থ হবে। | যৌগিক বাক্য | দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য — নির্দেশবাচক |
যখন ডাকবে, তখন যাব। | জটিল বাক্য | সময়বাচক অধীন উপবাক্য |
৮.৩ প্রায়ই বিভ্রান্তিকর বাক্যের বিশ্লেষণ
বিভ্রান্তিকর উদাহরণ ১: 'যত গর্জে তত বর্ষে না' — এটি জটিল বাক্য, কারণ 'যত...তত' একটি তুলনাবাচক অধীন সম্পর্কমূলক সংযোজক দিয়ে গঠিত এবং একটিই প্রধান খণ্ডবাক্য আছে। |
বিভ্রান্তিকর উদাহরণ ২: 'সে পরিশ্রমী এবং সৎ' — এটি সরল বাক্য, কারণ 'এবং' এখানে দুটি বিশেষণ যুক্ত করছে, দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য নয়। কোনো আলাদা সমাপিকা ক্রিয়া নেই। |
বিভ্রান্তিকর উদাহরণ ৩: 'সূর্য উঠলে আঁধার কাটে' — এটি জটিল বাক্য। 'উঠলে' এখানে অসমাপিকা ক্রিয়া হলেও পুরো ভাবনাটি একটি শর্ত প্রকাশ করছে। তবে গঠনতভাবে অনেক ব্যাকরণবিদ একে সরল বাক্যও বলেন — পরীক্ষায় 'জটিল' উত্তর দেওয়া নিরাপদ। |
৯. সাধারণ ভুল ও সংশোধন
ভুল ধারণা / ভুল বাক্য | সংশোধন ও ব্যাখ্যা |
ভুল: 'যেহেতু সে ভালো, সেহেতু পুরস্কার পাবে এবং সে খুশি হবে' — এটি জটিল বাক্য। | সঠিক: এটি মিশ্র বাক্য। দুটি প্রধান খণ্ডবাক্য ('পুরস্কার পাবে' ও 'খুশি হবে') এবং একটি অধীন খণ্ডবাক্য আছে। |
ভুল: মিথ্যাবাদী ব্যক্তি অধম — এটি জটিল বাক্য। | সঠিক: এটি সরল বাক্য — একটি সমাপিকা ক্রিয়া ও একটি বিশেষণযুক্ত বিশেষ্যপদ। |
ভুল: সে এলো, দেখলো, জয় করলো — এটি যৌগিক বাক্য। | সঠিক: এটি যৌগিক বাক্য তখনই হবে যদি স্পষ্ট সমন্বয়ী সংযোজক থাকে। এভাবে সমান্তরাল ক্রিয়া থাকলেও যৌগিক হয়। |
ভুল: 'যদিও' দিয়ে গঠিত বাক্যমাত্রই মিশ্র বাক্য। | সঠিক: 'যদিও সে গরিব, তবুও সৎ' — এটি জটিল বাক্য, কারণ একটিই প্রধান খণ্ডবাক্য আছে। |
১০. মনে রাখার সহজ সূত্র ও পরীক্ষা কৌশল
মনে রাখার সংক্ষিপ্ত সূত্র |
✔ সরল বাক্য = ১টি সমাপিকা ক্রিয়া = ১টি মূল ভাব |
✔ জটিল বাক্য = ১টি প্রধান খণ্ডবাক্য + ১ বা বেশি অধীন খণ্ডবাক্য → 'যে-সে', 'যদি-তাহলে', 'যখন-তখন' |
✔ যৌগিক বাক্য = ২+ প্রধান খণ্ডবাক্য → সমন্বয়ী সংযোজক (এবং, ও, কিন্তু, তাই, অথবা) |
✔ মিশ্র বাক্য = ২+ প্রধান + ১+ অধীন = জটিল + যৌগিক একসাথে |
✔ 'যে/যা/যদি/যখন/যদিও/যেহেতু' → জটিল বা মিশ্র বাক্যের চিহ্ন |
✔ পরীক্ষায়: আগে সমন্বয়ী সংযোজক আছে কিনা দেখুন → তারপর অধীনতামূলক সংযোজক |
BCS/Bank পরীক্ষায় কমন আসা ৩০টি জটিল ও মিশ্র বাক্য |
১. যে পরিশ্রম করে সে সুখী হয়। (জটিল) |
২. যদিও তুমি ছোট, তবুও তুমি বুদ্ধিমান। (জটিল) |
৩. যখন মেঘ করে, তখন বৃষ্টি হয়। (জটিল) |
৪. যেহেতু সে মিথ্যুক, তাই তাকে বিশ্বাস করা যায় না। (জটিল) |
৫. সে বলল যে আর আসবে না। (জটিল — বিশেষ্য উপবাক্য) |
৬. যত জ্ঞান অর্জন করবে, তত বিনয়ী হবে। (জটিল) |
৭. যে সত্য বলে, সে সর্বত্র সম্মানিত হয়। (জটিল) |
৮. যেখানে বই আছে, সেখানে জ্ঞান আছে। (জটিল — স্থানবাচক) |
৯. যদি তুমি আসো, তাহলে আমিও আসব। (জটিল) |
১০. সে এতটাই রোগা যে হাঁটতে পারে না। (জটিল — ফলবাচক) |
১১. সে পড়াশোনা করে এবং যা পড়ে তা মনে রাখে। (মিশ্র) |
১২. যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে আমরা যাব না এবং ঘরে বসব। (মিশ্র) |
১৩. সে সৎ কিন্তু যে কারণে চাকরি হারাল তা অন্যায়। (মিশ্র) |
১৪. যদিও পথ কঠিন, তবুও সে এগিয়ে গেল এবং সফল হলো। (মিশ্র) |
১৫. তুমি ডাকলে আমি আসতাম এবং সাহায্য করতাম। (মিশ্র) |
১৬. যে ছাত্র মনোযোগ দেয় সে পরীক্ষায় ভালো করে। (জটিল) |
১৭. যতক্ষণ বাঁচব, ততক্ষণ সংগ্রাম করব। (জটিল) |
১৮. যেই সে এলো, অমনি বৃষ্টি থামল। (জটিল) |
১৯. তুমি যা বলো তাই করব। (জটিল — বিশেষ্য উপবাক্য) |
২০. যার বিদ্যা আছে তার মান আছে। (জটিল) |
২১. সে পরিশ্রমী এবং যা করে মনোযোগ দিয়ে করে। (মিশ্র) |
২২. বই পড়ো যাতে জ্ঞান বাড়ে এবং জীবনে এগিয়ে যেতে পারো। (মিশ্র) |
২৩. যে দেশে জন্মেছি সে দেশ আমার প্রিয়। (জটিল) |
২৪. যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি, তথাপি আমার গুরু নিত্যানন্দ। (জটিল — প্রবাদ) |
২৫. এমন কেউ নেই যে তাকে চেনে না। (জটিল) |
২৬. সকলেই জানে যে সূর্য পূর্বে ওঠে। (জটিল) |
২৭. যখন ভোর হলো তখন সে উঠল এবং বাজারে গেল। (মিশ্র) |
২৮. যেভাবে বলবে সেভাবে করব এবং ফলাফলও জানাব। (মিশ্র) |
২৯. সে যে বাড়িতে থাকে সেটি সুন্দর এবং পুরনো। (মিশ্র) |
৩০. তুমি কী ভাবছ তা আমি জানি কিন্তু বলব না। (মিশ্র) |
১১. অধ্যায়-সারসংক্ষেপ
জটিল বাক্য — মূলকথা |
একটি প্রধান খণ্ডবাক্য + এক বা একাধিক অধীন খণ্ডবাক্য। |
অধীন খণ্ডবাক্য তিন প্রকার: বিশেষ্য, বিশেষণ ও ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য। |
ক্রিয়া-বিশেষণ উপবাক্য সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় (সময়, কারণ, শর্ত, উদ্দেশ্য, ফল, স্থান, ছাড়, তুলনা)। |
অধীনতামূলক সংযোজক: যে, যা, যদি, যখন, যদিও, যেহেতু, যাতে, যত, যতক্ষণ ইত্যাদি। |
মিশ্র বাক্য — মূলকথা |
দুই বা তার বেশি প্রধান খণ্ডবাক্য + কমপক্ষে একটি অধীন খণ্ডবাক্য। |
সমন্বয়ী (এবং, ও, কিন্তু, তবে, অথবা) ও অধীনতামূলক উভয় সংযোজক থাকে। |
মিশ্র বাক্য = যৌগিক + জটিল বাক্যের সমন্বয়। |
সব মিশ্র বাক্যে প্রথমে সমন্বয়ী সংযোজক খুঁজুন, তারপর অধীনতামূলক সংযোজক। |