পুঁথি সাহিত্য

Chapter Activity

Rating
New / 5
Reviews
0
Read Sessions
0
Readers
0

বাংলা সাহিত্য

পুঁথি সাহিত্য

Puthi Literature — দোভাষী পুঁথি

মুসলমান কবিদের সাহিত্যবাংলা + আরবি + ফারসি মিশ্রণঘরে ঘরে পঠিত লোকসাহিত্য

১. পুঁথি সাহিত্যসংজ্ঞাপরিচিতি

'পুঁথি' শব্দটি এসেছে সংস্কৃত 'পুস্তিকা' শব্দ থেকেএর নাসিক্য উচ্চারণ পুঁথিহাতে লেখা বইকে আগে 'পুস্তিকা' বলা হতোযেহেতু আগের দিনে ছাপাখানা ছিল না, তাই তখন হাতে পুঁথি লেখা হতোসেই অর্থে প্রাচীনমধ্যযুগের সব সাহিত্যকেই 'পুঁথি সাহিত্য' বলা যায়তবে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষ একটি কালে বিশেষ ধরনের মিশ্র ভাষায় রচিত সাহিত্যকেই 'পুঁথি সাহিত্য' বলা হয়

পুঁথি সাহিত্য হলো মূলত অষ্টাদশ থেকে উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা, আরবি, ফারসি, হিন্দিতুর্কি ভাষার মিশ্রণে রচিত এক বিশেষ শ্রেণির সাহিত্যএর অধিকাংশ রচয়িতা এবং পাঠক ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের আঙিনায় শীতলপাটি বিছিয়ে বসত পুঁথি পাঠের আসরএটাই ছিল সেকালের বিনোদনধর্মশিক্ষার প্রধান মাধ্যম

পুঁথি শব্দের উৎপত্তি: সংস্কৃত 'পুস্তিকা' পুঁথিপুঁথি রচয়িতাদের বলা হয় 'শায়ের'।

পুঁথি সাহিত্যের কালপর্ব: মূলত ১৮শ-১৯শ শতাব্দী (১৭০০-১৯০০ খ্রিস্টাব্দ)।

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর পুঁথি সাহিত্যের ভাষাকে বলেছেন 'যাবনী মিশাল'।

পুঁথি সাহিত্যের বিভিন্ন নামকরণ

নাম

প্রবর্তক / কারণ

ব্যাখ্যা

মুসলমানী বাংলা সাহিত্য

রেভারেন্ড জেমস লং

মুসলমান কবিদের বাংলা রচনা বলে এই নাম

বটতলার পুঁথি

কলকাতার বটতলা

কলকাতার বটতলার ছাপাখানা থেকে প্রচার লাভ করে বলে

দোভাষী পুঁথি

গবেষকগণ

দুই বা ততোধিক ভাষার মিশ্রণে রচিত বলে (তবে শুধু দুটি ভাষা নয়, বহু ভাষার মিশ্রণ)

মিশ্র ভাষারীতির কাব্য

পরবর্তী গবেষকগণ

ভাষাবাক্যরীতির বৈশিষ্ট্য বিচার করে

যাবনী মিশাল

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

যাবনী = আরবি-ফারসি ভাষা; মিশাল = মিশ্রণ

'দোভাষী পুঁথি' মানে শুধু দুটি ভাষার মিশ্রণ নয়এখানে বাংলা, আরবি, ফারসি, হিন্দি, তুর্কিবহু ভাষার শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে

রেভারেন্ড জেমস লং পুঁথির ভাষাকে 'মুসলমানী বাংলা' বলেছেন

২. পুঁথি সাহিত্যের ঐতিহাসিক পটভূমি

বাংলায় মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজস্ব ধর্মীয়সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়েকিন্তু আরবি-ফারসি সাহিত্যের কাহিনিগুলো সাধারণ মানুষ বুঝতে পারতেন নাতাই কবিরা এই কাহিনিগুলো বাংলায় রূপান্তরিত করতে শুরু করেনতবে বাংলার সাথে আরবি-ফারসি শব্দও মিশিয়ে নেনএভাবেই পুঁথি সাহিত্যের জন্ম

পুঁথি সাহিত্যের বিষয়বস্তু মূলত আরব-ইরানের পৌরাণিককাল্পনিক কাহিনি, নবী-রাসুলের জীবন, পীর-আউলিয়ার অলৌকিক কীর্তিকলাপ, ইসলামের ইতিহাস এবং প্রেমোপাখ্যানএই সাহিত্য লেখা হতো তালপাতায় বা কাগজে; পড়া হতো সুর করেপুঁথি পাঠের আসরে

পুঁথি লেখা হতো তালপাতায় বা কাগজেছাপাখানার আগে হাতে লেখা হতো; পরে কলকাতার বটতলার ছাপাখানায় মুদ্রিত হতো

পুঁথি সাহিত্য বাম থেকে ডানে পড়া হলেও প্রথম দিকে আরবি-ফারসি হরফে ডান থেকে বামে ছাপা হতো

পুঁথির বিষয়বস্তু নিম্নবিত্ত চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীশ্রমজীবী মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল

৩. পুঁথি সাহিত্যের সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য

ভাষার বৈশিষ্ট্য

বাংলার সাথে আরবি, ফারসি, হিন্দি, তুর্কি শব্দের মিশ্রণ

ক্রিয়াপদ সাধারণত বাংলা, বিশেষ্যবিশেষণ আরবি-ফারসি

আরবি-ফারসি শব্দকে বাংলা উচ্চারণে ব্যবহারযেমন 'নসিব' = ভাগ্য, 'দুনিয়া' = পৃথিবী

পয়ারমাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত

সুরেলাআবৃত্তিযোগ্যপুঁথি পাঠে সুর দিয়ে পড়া হতো

বিষয়গত বৈশিষ্ট্য

আরব-ইরানের পৌরাণিকঐতিহাসিক কাহিনি অবলম্বনে রচিত

ইসলামি বীরত্বগাথা, নবী-রাসুলের কাহিনি, পীরের মাহাত্ম্য

রোমান্টিক প্রণয়কাহিনিইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনু

হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিফলন নেইমূলত মুসলমান দর্শকের জন্য

সামাজিক বৈশিষ্ট্য

পুঁথি পাঠের আসর ছিল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান

গ্রামের ঘরে ঘরে সন্ধ্যায় পুঁথিপাঠ হতো

সব বয়সের মানুষ আসরে বসতেনশিশু থেকে বৃদ্ধ

পুঁথি ছিল তৎকালীন সমাজের বিনোদনধর্মশিক্ষার মাধ্যম

৪. পুঁথি সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ

বিষয়রস বিচারে পুঁথি সাহিত্যকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা যায়:

ক্র.

শ্রেণি

উদাহরণবিশেষ তথ্য

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

ইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল, গুলে বকাওলী, বেনজির-বদরে মুনীরআরব-ইরান-ভারতের পৌরাণিক প্রেমকাহিনি

জঙ্গনামা বা যুদ্ধকাব্য

আমীর হামজা, সোনাভান, জৈগুনের পুথি, হাতেম তাইআরব-ইরানের বীরপুরুষদের যুদ্ধবিগ্রহইসলাম প্রচারের বর্ণনা

নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য

কাসাসুল আম্বিয়া (নবীদের কাহিনি), মোহররম, মেরাজনামা, নূরনামানবী-রাসুলসাহাবিদের জীবনকথা

লৌকিক পীর পাঁচালি

সত্যপীরের পাঁচালি, বনবিবির জহুরনামা, মানিক পীরের কথাবাংলার লোকদেবতাপীরদের মাহাত্ম্য

শাস্ত্রকাব্য

নসিহতনামা, তাজকিরাতুল আউলিয়া, মেরাজের কাব্যইসলামের ইতিহাস, ধর্মরীতিনীতি বিষয়ক

সমকালীন ঘটনাশ্রিত কাব্য

জালালাতল ফোক্রে (বাউল সম্প্রদায়ের বিরোধিতা)। সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে রচিত; সংখ্যায় কম

পুঁথি সাহিত্যের ৬টি শ্রেণি: রোমান্টিক, জঙ্গনামা, নবী-আউলিয়া জীবনী, পীর পাঁচালি, শাস্ত্রকাব্য, সমকালীন কাব্য

৫. পুঁথি সাহিত্যের পূর্বসূরীপ্রাথমিক পর্যায়

পুঁথি সাহিত্য হঠাজন্ম নেয়নিমধ্যযুগেই কিছু মুসলমান কবি আরবি-ফারসি বিষয়বস্তু নিয়ে বাংলায় কাব্য রচনা করেছিলেনতাঁরাই পুঁথি সাহিত্যের পূর্বপুরুষ

৫.১ শাহ মুহম্মদ সগীরবাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম মুসলিম কবি

শাহ মুহম্মদ সগীর বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন মুসলিম কবিতিনিই প্রথম আরবি-ফারসি বিষয়বস্তু বাংলায় এনেছেন

পরিচয়

তথ্য

সময়কাল

আনু. ১৪শ-১৫শ শতক

পৃষ্ঠপোষক

গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (রাজত্বকাল: ১৩৮৯-১৪০৯/১৩৯৩-১৪০৯)

বিখ্যাত কাব্য

ইউসুফ-জোলেখাবাংলায় আরবি-ফারসি প্রণয়কাব্যের প্রথম সংযোজন

কাব্যের বৈশিষ্ট্য

ধর্মীয় পটভূমিতে রচিত হলেও হয়ে উঠেছে মানবিক প্রেমোপাখ্যান; দেশি ভাষায় ধর্মীয় উপাখ্যান বর্ণনার প্রথম প্রচেষ্টা

অবদান

রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের সূচনা; বাংলায় ইসলামি সাহিত্যের প্রবেশদ্বার

শাহ মুহম্মদ সগীর সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় 'ইউসুফ-জোলেখা' রচনা করেন

৫.২ দৌলত উজির বাহরাম খান

প্রকৃত নাম

বাহরাম খানজমিদার নিজাম শাহ 'দৌলত উজির' উপাধি দেন

পৃষ্ঠপোষক

চট্টগ্রামের জাফরাবাদের জমিদার নিজাম শাহ

পদ

নিজাম শাহের দেওয়ান (প্রধান মন্ত্রী)

বিখ্যাত কাব্য

লাইলী-মজনুফারসি কবি জামির আরবি লোকগাথা থেকে বাংলায় রূপান্তরিত

সময়কাল

আনু. ১৬শ শতক

দৌলত উজির বাহরাম খান = লাইলী-মজনুপৃষ্ঠপোষক = জমিদার নিজাম শাহপ্রকৃত নাম বাহরাম খান

৫.৩ সৈয়দ সুলতান

সময়কাল

আনু. ১৬শ শতক

বিখ্যাত রচনা

নবীবংশ (নবীদের বংশতালিকাজীবনী কাব্য), রাসুলবিজয়, জ্ঞানচৌতিশা

বৈশিষ্ট্য

ইসলামের ইতিহাস বিষয়ক কাব্য; নবী-রাসুলের জীবন বাংলায় রূপদান

৫.৪ আবদুল হাকিম

সময়কাল

আনু. ১৭শ শতক

বিখ্যাত রচনা

ইউসুফ-জোলেখা, নূরনামা, শহরনামা, লালমতি সয়ফুলমুলুক, কারবালা

বিখ্যাত উক্তি

'যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।'

অবদান

বাংলা ভাষার প্রতি গভীর আস্থা প্রকাশ করেছেন; মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক

আবদুল হাকিমের বিখ্যাত উক্তি: 'যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।' — বাংলা ভাষার প্রতি মাতৃভাষাপ্রেমের প্রতীক

৬. পুঁথি সাহিত্যের প্রধান কবি

৬.১ ফকির গরীবুল্লাহপুঁথি সাহিত্যের আদি কবি

পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থকজনপ্রিয় কবিফকির গরীবুল্লাহতাঁকেই পুঁথি সাহিত্যের আদি কবি বলা হয়

জন্ম

আনু. ১৬৭০ বা ১৬৮০ — পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার হাফেজপুরে (কেউ বলেন হুগলির বালিয়া-হাফেজপুর)

মৃত্যু

আনু. ১৭৭০ সাল

উপাধি / পরিচয়

ফকিরসন্ন্যাসী বা দরবেশ অর্থে; 'শায়ের'-দের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ

শিষ্য

সৈয়দ হামজা

ফকির গরীবুল্লাহর রচনাসমূহ

রচনার নাম

ভাষা

বিশেষ তথ্য

ইউসুফ-জোলেখা

সাধু বাংলায়

প্রথম কাব্য; সাধু বাংলায় রচিত; 'মুনসী ফকির মোহাম্মদ' নামে প্রচলিত কিন্তু ভণিতায় 'অধীন ফকির' বা 'গরীব ফকির'

সোনাভান

মিশ্র ভাষায়

দোভাষী পুঁথির ধারায় রচিত; যুদ্ধকাব্য

সত্যপীরের পুথি

মিশ্র ভাষায়

লৌকিক পীর পাঁচালি ধারার কাব্য

জঙ্গনামা

মিশ্র ভাষায়

যুদ্ধকাব্য; হানিফা বীরের কাহিনি

আমীর হামজা (১ম খণ্ড)

মিশ্র ভাষায়

অসম্পূর্ণ; পরবর্তী অংশ সৈয়দ হামজা সম্পন্ন করেন ১৭৯৫ সালে

ফকির গরীবুল্লাহর প্রথম কাব্য 'ইউসুফ-জোলেখা' সাধু বাংলায় লেখাপরে 'মিশ্র ভাষায়' লিখেছেন

আমীর হামজাগরীবুল্লাহ শুরু করেছিলেন; শেষ করতে পারেননিসৈয়দ হামজা ১৭৯৫ সালে সম্পন্ন করেন

ফকির গরীবুল্লাহর কাব্যে মিশ্র ভাষার যে বৈশিষ্ট্যবাংলা ক্রিয়ার সাথে আরবি-ফারসি বিশেষ্যের মিলনতাই পুঁথি সাহিত্যের মৌলিক পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছেতাঁর পথ ধরেই শিষ্য সৈয়দ হামজা এবং পরবর্তী বহু কবি পুঁথি রচনা করেছেন

৬.২ সৈয়দ হামজাগরীবুল্লাহর প্রধান শিষ্য

পরিচয়

ফকির গরীবুল্লাহর প্রধান শিষ্য; পুঁথি সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান কবি

প্রথম কাব্য

মধুমালতীসাধু বাংলায় রচিত

মিশ্র ভাষায় রচনা

জৈগুনের পুথি (১৭৯৮), হাতেম তাই (১৮০৪), আমীর হামজা (গরীবুল্লাহর অসমাপ্ত অংশ ১৭৯৫ সালে সম্পন্ন করেন)

রচনার নাম

রচনাকাল

বিশেষ তথ্য

মধুমালতী

অনির্ধারিত

প্রথম কাব্য; সাধু বাংলায় লেখা

আমীর হামজা (অবশিষ্ট)

১৭৯৫

গরীবুল্লাহর অসম্পূর্ণ কাব্য সম্পূর্ণ করেন

জৈগুনের পুথি

১৭৯৮

মিশ্র ভাষায়; জৈগুন বিবির কাহিনি

হাতেম তাই

১৮০৪

মিশ্র ভাষায়; আরবি বীরের কাহিনি

সৈয়দ হামজার প্রথম কাব্য মধুমালতী (সাধু বাংলায়)। তিনি মিশ্র ভাষায় জৈগুনের পুথি (১৭৯৮) ও হাতেম তাই (১৮০৪) রচনা করেন

৭. প্রধান পুঁথি কাব্যসমূহ

৭.১ ইউসুফ-জোলেখাতিন কবির রচনা

'ইউসুফ-জোলেখা' পুঁথি সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাব্যএই কাহিনি কোরআন শরিফেও আছেইউসুফ একজন নবী এবং জোলেখা মিশরের মন্ত্রীর স্ত্রীতাদের প্রেমকাহিনি আরব-পারসিক সাহিত্যে বহু শতাব্দী ধরে বিখ্যাত

রচয়িতা

সময়কাল

বিশেষ তথ্য

শাহ মুহম্মদ সগীর

১৪শ-১৫শ শতক

প্রাচীনতম সংস্করণ; গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের পৃষ্ঠপোষকতায়

ফকির গরীবুল্লাহ

১৮শ শতক

সাধু বাংলায় রচিত; ভণিতায় 'অধীন ফকির'; 'মুনসী ফকির মোহাম্মদ' নামে প্রচলিত

আবদুল হাকিম

১৭শ শতক

তৃতীয় সংস্করণ

ইউসুফ-জোলেখাশাহ মুহম্মদ সগীর, ফকির গরীবুল্লাহআবদুল হাকিমতিনজনেই আলাদা আলাদাভাবে রচনা করেছেন

ইউসুফ-জোলেখা

ইউসুফ ছিলেন হজরত ইয়াকুবের পুত্রতিনি অতি সুন্দর এবং নবীতাঁর সৎ ভাইয়েরা হিংসায় তাঁকে কূপে নিক্ষেপ করে এবং মিশরের বাজারে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়মিশরের রাজকীয় মন্ত্রী পোতিফার তাঁকে কিনে নেনমন্ত্রীর স্ত্রী জোলেখা ইউসুফের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ভালোবেসে ফেলেনকিন্তু নবী ইউসুফ তাঁর নৈতিকতায় অটল থাকেনজোলেখার মিথ্যা অভিযোগে ইউসুফকে কারাগারে পাঠানো হয়অনেক কষ্টের পর ইউসুফ মিশরের রাজ-সহকারী হনঅবশেষে ইউসুফজোলেখার পুনর্মিলন হয়এই কাহিনি ধর্মীয় হলেও মানবিক প্রেমের এক অপূর্ব আখ্যান

৭.২ লাইলী-মজনু

'লাইলী-মজনু' আরব প্রেমকাহিনির একটি বিখ্যাত রূপআরবের ক্বায়েস নামে এক যুবক লাইলী নামে একটি মেয়েকে ভালোবাসতেনকিন্তু সামাজিক বাধার কারণে তাদের বিয়ে হয়নিক্বায়েস প্রেমের বেদনায় পাগল হয়ে যানতাই তাঁর নাম হয় মজনু (পাগল)। এই কাব্যের রচয়িতা দৌলত উজির বাহরাম খান

৭.৩ আমীর হামজা

'আমীর হামজা' হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর চাচা হামজার বীরত্বের কাহিনিতিনি ইসলাম গ্রহণের আগে এবং পরে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেনএই কাব্যে তাঁর বীরত্বইসলাম প্রচারের গল্প রয়েছেগরীবুল্লাহ শুরু করেছিলেন, সৈয়দ হামজা শেষ করেছিলেন

৭.৪ হাতেম তাই

'হাতেম তাই' আরবের একজন বিখ্যাত দানশীল বীর হাতেমের কাহিনিতিনি তাঁর দানশীলতাবীরত্বের জন্য বিখ্যাতএই কাব্যটি সৈয়দ হামজার রচনা (১৮০৪)।

৭.৫ শিরি-ফরহাদ

'শিরি-ফরহাদ' ফারসি সাহিত্যের একটি বিখ্যাত প্রেমকাহিনিফরহাদ নামে এক রাজমিস্ত্রি শিরি নামে একটি মেয়েকে ভালোবাসতেনরাজা তাকে পাথর কেটে দুধের নদী তৈরির শর্তে দিতে রাজি হনমিথ্যা খবরে শিরি মারা যাওয়ার কথা জেনে ফরহাদ আত্মহত্যা করেন

৮. পুঁথি সাহিত্যের বিখ্যাত কাব্যরচয়িতা

কাব্যের নাম

রচয়িতা

বিশেষ তথ্য

ইউসুফ-জোলেখা

শাহ মুহম্মদ সগীর (প্রাচীনতম)

বাংলায় প্রথম আরবি-ফারসি প্রণয়কাব্য; কোরআনের কাহিনি অবলম্বনে

ইউসুফ-জোলেখা

ফকির গরীবুল্লাহ

সাধু বাংলায়; 'মুনসী ফকির মোহাম্মদ' নামে প্রচলিত

ইউসুফ-জোলেখা

আবদুল হাকিম

তৃতীয় সংস্করণ

লাইলী-মজনু

দৌলত উজির বাহরাম খান

পৃষ্ঠপোষক: জমিদার নিজাম শাহ; ফারসি জামির কাব্য থেকে অনুবাদ

সোনাভান

ফকির গরীবুল্লাহ

যুদ্ধকাব্য; মিশ্র ভাষায় রচিত

সত্যপীরের পুথি

ফকির গরীবুল্লাহ

লৌকিক পীর পাঁচালি

জঙ্গনামা

ফকির গরীবুল্লাহ

যুদ্ধকাব্য

আমীর হামজা

গরীবুল্লাহ (১ম খণ্ড) + সৈয়দ হামজা (বাকি, ১৭৯৫)

হজরত মুহম্মদের চাচার বীরত্বের কাহিনি

মধুমালতী

সৈয়দ হামজা

প্রথম কাব্য; সাধু বাংলায়

জৈগুনের পুথি

সৈয়দ হামজা (১৭৯৮)

জৈগুন বিবির কাহিনি; মিশ্র ভাষায়

হাতেম তাই

সৈয়দ হামজা (১৮০৪)

আরবি দানশীল বীরের কাহিনি

নূরনামা

আবদুল হাকিম

আলোর বর্ণনামূলক কাব্য

শহরনামা

আবদুল হাকিম

শহর বর্ণনামূলক কাব্য

নবীবংশ

সৈয়দ সুলতান

নবীদের বংশতালিকাজীবনী

রাসুলবিজয়

সৈয়দ সুলতান

হজরত মুহম্মদের বিজয়গাথা

সয়ফুলমুলুক-বদিউজ্জামাল

দোনাগাজী / গরীবুল্লাহ

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

শিরি-ফরহাদ

বিভিন্ন কবি

ফারসি প্রেমকাহিনির বাংলা রূপ

গুলে বকাওলী

বিভিন্ন কবি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

আলেফ লায়লা (হাজার একরাত)

বিভিন্ন কবি

আরব্য রজনীর বাংলা রূপ; বিশাল আকৃতির পুঁথি

কাসাসুল আম্বিয়া

বিভিন্ন কবি

নবীদের কাহিনি; নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য

৯. পুঁথি সাহিত্যের সংগ্রাহকগবেষক

পুঁথি সাহিত্য দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিলকিছু বিদ্বান ব্যক্তির অক্লান্ত পরিশ্রমে এই অমূল্য সম্পদ সংগৃহীতসংরক্ষিত হয়েছে

গবেষক

অবদান

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ

মধ্যযুগের দেড় শতাধিক কবিকে আবিষ্কার করেছেন; বিপুল পরিমাণ পুঁথি সংগ্রহ করেছেন; পুঁথিচর্চার জনক; আরাকান রাজসভার বাংলা সাহিত্য আবিষ্কার তাঁরই কৃতিত্ব

দীনেশচন্দ্র সেন

পুঁথির ইতিহাস গবেষণায় অগ্রদূত; 'বঙ্গভাষাসাহিত্য' গ্রন্থে পুঁথি সাহিত্যের আলোচনা

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

আলাওলের 'পদ্মাবতী' সম্পাদনা (১৯৫০); মুসলিম সাহিত্যচর্চার গবেষক

আহমদ শরীফ

দৌলত উজির বাহরাম খানের 'লাইলী-মজনু' সম্পাদনা; বিভিন্ন পুঁথি গবেষণা

রেভারেন্ড জেমস লং

পুঁথির ভাষাকে 'মুসলমানী বাংলা' নাম দেন; বিদেশি গবেষক যিনি পুঁথিচর্চায় আগ্রহী ছিলেন

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদপুঁথি সংগ্রহে সর্বোচ্চ অবদানকারীতিনি হিন্দু বাড়ি থেকেও পুঁথি সংগ্রহ করেছেন

'নীলদর্পণ' ইংরেজিতে অনুবাদ করে রেভারেন্ড জেমস লং কারাদণ্ড পেয়েছিলেনএটি পুঁথি সংক্রান্ত নয়, কিন্তু তাঁর পরিচয়ের অংশ

১০. পুঁথি সাহিত্যের গুরুত্বপ্রভাব

সাহিত্যিক গুরুত্ব

বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি বিষয়বস্তুর প্রবেশ প্রথম সার্থকভাবে পুঁথির মাধ্যমে হয়েছে

মুসলমান কবিদের সাহিত্যচর্চার প্রথম স্বীকৃত ধারা

নতুন ভাষারীতির উদ্ভবপরবর্তীকালে বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দ প্রবেশের পথ প্রশস্ত করেছে

লোকসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারা

সামাজিক গুরুত্ব

মুসলমান জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে

সাধারণ মানুষের বিনোদনধর্মশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে

গ্রামীণ সমাজের সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করতে পুঁথিপাঠের আসর সহায়তা করেছে

পুঁথি সাহিত্য বাংলার মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের সেতুবন্ধনছাপাখানা আসার পর পুঁথির স্থানে উপন্যাসগল্পের উদ্ভব হয়

১১. পুঁথি সাহিত্যঅন্যান্য মধ্যযুগীয় সাহিত্যের তুলনা

বৈশিষ্ট্য

পুঁথি সাহিত্য

মঙ্গলকাব্য

বৈষ্ণব পদাবলি

রচয়িতা

মূলত মুসলমান কবি

হিন্দুমুসলমান উভয়

মূলত হিন্দু

ভাষা

মিশ্র বাংলা (আরবি-ফারসি মিশ্রিত)

মধ্যযুগীয় বাংলা

ব্রজবুলিবাংলা

বিষয়বস্তু

আরব-ইরানের কাহিনি, ইসলামি বীরত্ব

হিন্দু দেব-দেবীর মাহাত্ম্য

রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা

উপস্থাপনা

সুর করে পুঁথিপাঠ

পালায় বিভক্ত গান

কীর্তনের সুরে গান

পাঠক

মুসলমান শ্রেণি

সর্বজনীন

বৈষ্ণব সমাজ

সময়কাল

১৮শ-১৯শ শতক

১৫শ-১৮শ শতক

১৪শ-১৭শ শতক

১২. ট্রিকিঅজানা তথ্য

প্রতিটি তথ্য যত্নসহকারে পড়ুন

১. পুঁথি সাহিত্যের আদি কবিফকির গরীবুল্লাহতিনি হাওড়া জেলার (কেউ বলেন হুগলির) হাফেজপুরে জন্মগ্রহণ করেন

২. পুঁথি সাহিত্যের রচয়িতাদের 'শায়ের' বলা হয়

৩. 'দোভাষী পুঁথি' মানে শুধু দুই ভাষা নয়বাংলা + আরবি + ফারসি + হিন্দি + তুর্কিবহু ভাষার মিশ্রণ

৪. রেভারেন্ড জেমস লং পুঁথির ভাষাকে 'মুসলমানী বাংলা' এবং সাহিত্যকে 'মুসলমানী বাংলা সাহিত্য' বলেছেন

৫. ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর পুঁথির ভাষাকে 'যাবনী মিশাল' বলেছেন

৬. ইউসুফ-জোলেখাতিনজন কবি লিখেছেন: শাহ মুহম্মদ সগীর (প্রাচীনতম), ফকির গরীবুল্লাহ, আবদুল হাকিম

৭. বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন মুসলিম কবিশাহ মুহম্মদ সগীরতিনি পুঁথি সাহিত্যের পূর্বসূরী

৮. দৌলত উজির বাহরাম খানের প্রকৃত নাম 'বাহরাম খান'। 'দৌলত উজির' উপাধি দেন জমিদার নিজাম শাহ

৯. লাইলী-মজনুর রচয়িতা দৌলত উজির বাহরাম খান; পৃষ্ঠপোষক জমিদার নিজাম শাহ

১০. আমীর হামজাগরীবুল্লাহ ১ম খণ্ড লেখেন, সৈয়দ হামজা ১৭৯৫ সালে অবশিষ্ট সম্পন্ন করেন

১১. সৈয়দ হামজার প্রথম কাব্যমধুমালতী (সাধু বাংলায়)। পরে মিশ্র ভাষায় লেখেন

১২. আবদুল হাকিমের বিখ্যাত উক্তি: 'যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।' — বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসা

১৩. আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদপুঁথি সংগ্রহে সর্বোচ্চ অবদানতিনি মধ্যযুগের দেড় শতাধিক কবিকে আবিষ্কার করেছেন

১৪. পুঁথি সাহিত্য বাম থেকে ডানে পড়া হলেও প্রথম দিকে আরবি-ফারসি হরফে ডান থেকে বামে ছাপা হতো

১৫. পুঁথি সাহিত্যভাগে বিভক্ত: রোমান্টিক, জঙ্গনামা, নবী-আউলিয়া জীবনী, পীর পাঁচালি, শাস্ত্রকাব্য, সমকালীন

১৬. গরীবুল্লাহর প্রথম কাব্য 'ইউসুফ-জোলেখা' — সাধু বাংলায়পরে মিশ্র ভাষায় লিখতে শুরু করেন

১৭. '৪০তম বিসিএস প্রশ্ন: কোনটি পুঁথি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত নয়? উত্তর: ময়মনসিংহ গীতিকা।'

১৮. শাহ মুহম্মদ সগীর সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ এর রাজত্বে ইউসুফ-জোলেখা লিখেছেন

১৯. পুঁথি পাঠের আসরে সুর করে পুঁথি পড়া হতোএটি তৎকালীন সামাজিক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম

২০. সৈয়দ হামজার হাতেম তাই (১৮০৪) — আরবের দানশীল বীর হাতেমের কাহিনি

১৩. প্রশ্নোত্তর

প্রশ্ন ১: পুঁথি সাহিত্যের প্রথম সার্থকজনপ্রিয় কবি কে?

উত্তর: ফকির গরীবুল্লাহ তাঁকেই পুঁথি সাহিত্যের আদি কবি বলা হয়

প্রশ্ন ২: 'পুঁথি' শব্দটি কোন শব্দ থেকে এসেছে?

উত্তর: সংস্কৃত 'পুস্তিকা' শব্দ থেকে পুস্তিকা পুঁথি

প্রশ্ন ৩: পুঁথি সাহিত্যের রচয়িতাদের কী বলা হয়?

উত্তর: শায়ের শায়ের = পুঁথির কবি

প্রশ্ন ৪: 'দোভাষী পুঁথি' বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: কয়েকটি ভাষার মিশ্রণে রচিত পুঁথি বাংলা + আরবি + ফারসি + হিন্দি + তুর্কি ভাষার মিশ্রণ

প্রশ্ন ৫: পুঁথির ভাষাকে 'মুসলমানী বাংলা' কে বলেছেন?

উত্তর: রেভারেন্ড জেমস লং এটি বিসিএসে বারবার আসে

প্রশ্ন ৬: পুঁথির ভাষাকে 'যাবনী মিশাল' কে বলেছেন?

উত্তর: ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর যাবনী = আরবি-ফারসি; মিশাল = মিশ্রণ

প্রশ্ন ৭: 'বটতলার পুঁথি' নামকরণের কারণ কী?

উত্তর: কলকাতার বটতলার ছাপাখানা থেকে প্রচার লাভ করেছে বটতলা = কলকাতার প্রাচীন প্রকাশনা কেন্দ্র

প্রশ্ন ৮: ফকির গরীবুল্লাহর প্রথম কাব্যের নাম কী?

উত্তর: ইউসুফ-জোলেখা সাধু বাংলায় রচিত; প্রথম কাব্য

প্রশ্ন ৯: ফকির গরীবুল্লাহ মোট কয়টি কাব্য রচনা করেন?

উত্তর: পাঁচটি ইউসুফ-জোলেখা, সোনাভান, সত্যপীরের পুথি, জঙ্গনামা, আমীর হামজা (১ম খণ্ড)

প্রশ্ন ১০: আমীর হামজা কাব্যটি কারা রচনা করেছেন?

উত্তর: গরীবুল্লাহ ১ম খণ্ড; সৈয়দ হামজা বাকি অংশ (১৭৯৫) গরীবুল্লাহ শেষ করতে পারেননি

প্রশ্ন ১১: বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে প্রাচীন মুসলিম কবি কে?

উত্তর: শাহ মুহম্মদ সগীর ১৪শ-১৫শ শতকের কবি

প্রশ্ন ১২: শাহ মুহম্মদ সগীর কার পৃষ্ঠপোষকতায় ইউসুফ-জোলেখা লেখেন?

উত্তর: সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ গৌড়ের সুলতান

প্রশ্ন ১৩: 'লাইলী-মজনু' কাব্যের রচয়িতা কে?

উত্তর: দৌলত উজির বাহরাম খান তাঁর পৃষ্ঠপোষক জমিদার নিজাম শাহ

প্রশ্ন ১৪: দৌলত উজির বাহরাম খানের প্রকৃত নাম কী?

উত্তর: বাহরাম খান 'দৌলত উজির' উপাধি দেন নিজাম শাহ

প্রশ্ন ১৫: সৈয়দ হামজার প্রথম কাব্যের নাম কী?

উত্তর: মধুমালতী সাধু বাংলায় রচিত

প্রশ্ন ১৬: সৈয়দ হামজার 'জৈগুনের পুথি' কত সালে রচিত?

উত্তর: ১৭৯৮ সালে মিশ্র ভাষায় রচিত

প্রশ্ন ১৭: সৈয়দ হামজার 'হাতেম তাই' কত সালে রচিত?

উত্তর: ১৮০৪ সালে আরবের দানশীল বীর হাতেমের কাহিনি

প্রশ্ন ১৮: আবদুল হাকিমের বিখ্যাত উক্তি কোনটি?

উত্তর: 'যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় না জানি।' বাংলা ভাষার প্রতি ভালোবাসার প্রতীক

প্রশ্ন ১৯: পুঁথি সাহিত্যকে বিষয়রস বিচারে কয় ভাগে ভাগ করা যায়?

উত্তর: ছয়টি ভাগে রোমান্টিক, জঙ্গনামা, নবী-জীবনী, পীর পাঁচালি, শাস্ত্রকাব্য, সমকালীন

প্রশ্ন ২০: পুঁথি সাহিত্যে রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের উদাহরণ কী?

উত্তর: ইউসুফ-জোলেখা, লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ প্রথম শ্রেণির পুঁথি

প্রশ্ন ২১: পুঁথি সাহিত্যে জঙ্গনামার উদাহরণ কী?

উত্তর: আমীর হামজা, হাতেম তাই, সোনাভান বীরত্বের যুদ্ধকাব্য

প্রশ্ন ২২: আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ পুঁথিচর্চায় কী অবদান রেখেছেন?

উত্তর: মধ্যযুগের দেড় শতাধিক কবিকে আবিষ্কার; বিপুল পুঁথি সংগ্রহ পুঁথিচর্চার প্রধান গবেষক

প্রশ্ন ২৩: 'ময়মনসিংহ গীতিকা' কি পুঁথি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত?

উত্তর: না ৪০তম বিসিএসের প্রশ্ন; পুঁথি সাহিত্য ময়মনসিংহ গীতিকা

প্রশ্ন ২৪: ইউসুফ-জোলেখা কতজন কবি লিখেছেন?

উত্তর: তিনজন (শাহ মুহম্মদ সগীর, ফকির গরীবুল্লাহ, আবদুল হাকিম) তিনটি আলাদা সংস্করণ

প্রশ্ন ২৫: পুঁথি সাহিত্যের প্রধান সংগ্রহস্থল কোথায়?

উত্তর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ, এশিয়াটিক সোসাইটি পুঁথি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ স্থান

প্রশ্ন ২৬: সৈয়দ সুলতানের বিখ্যাত রচনা কোনটি?

উত্তর: নবীবংশ নবীদের বংশতালিকাজীবনী কাব্য

প্রশ্ন ২৭: পুঁথি সাহিত্যের কোন কাব্যগুলো 'জঙ্গনামা' শ্রেণির?

উত্তর: আমীর হামজা, হাতেম তাই, সোনাভান, জৈগুনের পুথি যুদ্ধকাব্য

প্রশ্ন ২৮: 'শায়ের' শব্দটি কোন ভাষা থেকে এসেছে?

উত্তর: আরবি ভাষা থেকে শায়ের = আরবি কবি

প্রশ্ন ২৯: পুঁথি সাহিত্যে 'লৌকিক পীর পাঁচালি'র উদাহরণ কী?

উত্তর: সত্যপীরের পাঁচালি, বনবিবির জহুরনামা পীরের মাহাত্ম্যের কাব্য

প্রশ্ন ৩০: ফকির গরীবুল্লাহর পাঁচটি কাব্যের নাম কী?

উত্তর: ইউসুফ-জোলেখা, সোনাভান, সত্যপীরের পুথি, জঙ্গনামা, আমীর হামজা (১ম খণ্ড) পাঁচটি মনে রাখুন

প্রশ্ন ৩১: 'আলেফ লায়লা' কী?

উত্তর: হাজার একরাতআরব্য রজনীর বাংলা রূপ বিশাল আকৃতির পুঁথি কাব্য

প্রশ্ন ৩২: গুলে বকাওলী কোন ধরনের কাব্য?

উত্তর: রোমান্টিক প্রণয়কাব্য পুঁথি সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির অন্তর্গত

প্রশ্ন ৩৩: পুঁথি সাহিত্যে কোন ভাষার শব্দ সবচেয়ে বেশি আছে?

উত্তর: আরবিফারসি বিশেষ্যবিশেষণ মূলত আরবি-ফারসি

প্রশ্ন ৩৪: পুঁথি লেখার উপকরণ কী ছিল?

উত্তর: তালপাতা এবং কাগজ তেরেট নামক তালজাতীয় পাতায়ও লেখা হতো

প্রশ্ন ৩৫: সৈয়দ হামজা গরীবুল্লাহর কোন সম্পর্কে?

উত্তর: শিষ্য গরীবুল্লাহ = গুরু; সৈয়দ হামজা = শিষ্য

প্রশ্ন ৩৬: দৌলত উজির বাহরাম খান কোন পদে কর্মরত ছিলেন?

উত্তর: জমিদার নিজাম শাহের দেওয়ান চট্টগ্রামের জাফরাবাদে

প্রশ্ন ৩৭: 'কাসাসুল আম্বিয়া' কোন শ্রেণির পুঁথি?

উত্তর: নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য নবীদের কাহিনিসংগ্রহ

প্রশ্ন ৩৮: পুঁথি সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন কারা?

উত্তর: হানিফা, হামজা, হাতেম তাই, সোহরাব-রুস্তম, জৈগুন বিবি বীর চরিত্রকেন্দ্রিক পুঁথি

প্রশ্ন ৩৯: 'নূরনামা' কার রচনা?

উত্তর: আবদুল হাকিম আলোর বর্ণনামূলক কাব্য

প্রশ্ন ৪০: পুঁথি পাঠের আসর কখন বসত?

উত্তর: সন্ধ্যায় গ্রামের আঙিনায় শীতলপাটি বিছিয়ে বসত

প্রশ্ন ৪১: 'শিরি-ফরহাদ' কাহিনিটি কোথাকার?

উত্তর: ফারসি সাহিত্যের কাহিনি রাজমিস্ত্রি ফরহাদশিরির প্রেমকাহিনি

প্রশ্ন ৪২: পুঁথি সাহিত্যকে 'মিশ্র ভাষারীতির কাব্য' কে বলেছেন?

উত্তর: পরবর্তী গবেষকগণ ভাষা-বৈশিষ্ট্যবাক্যরীতি বিচার করে

প্রশ্ন ৪৩: আবদুল হাকিম কোন শতকের কবি?

উত্তর: ১৭শ শতক পুঁথি সাহিত্যের পূর্বসূরী

প্রশ্ন ৪৪: পুঁথি সাহিত্য কোন যুগের সেতুবন্ধন?

উত্তর: মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগের ছাপাখানা আসার পর পুঁথির পরিবর্তে উপন্যাসগল্প আসে

প্রশ্ন ৪৫: 'রাসুলবিজয়' কার রচনা?

উত্তর: সৈয়দ সুলতান হজরত মুহম্মদের বিজয়গাথা

প্রশ্ন ৪৬: 'সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল' কোন শ্রেণির পুঁথি?

উত্তর: রোমান্টিক প্রণয়কাব্য প্রথম শ্রেণির পুঁথি

প্রশ্ন ৪৭: পুঁথি সাহিত্যে ক্রিয়াপদ কোন ভাষার?

উত্তর: বাংলা ভাষার বিশেষ্য-বিশেষণ আরবি-ফারসি, ক্রিয়া বাংলা

প্রশ্ন ৪৮: আমীর হামজা কাব্যে কার কাহিনি বর্ণিত হয়েছে?

উত্তর: হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর চাচা হামজার ইসলামি বীরত্বের কাহিনি

প্রশ্ন ৪৯: পুঁথি সাহিত্যের বিষয়বস্তু নির্বাচনের মূল উৎস কোথায়?

উত্তর: আরব-ইরানের পৌরাণিকঐতিহাসিক কাহিনি, ইসলামের ইতিহাস মুসলমান জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

প্রশ্ন ৫০: পুঁথি সাহিত্যের কালপর্ব কত?

উত্তর: মূলত ১৮শ থেকে ১৯শ শতাব্দী (১৭০০-১৯০০ খ্রি.) পরিপক্ক পুঁথি সাহিত্যের যুগ

১৪. মনে রাখার সহজ ট্রিক

ট্রিক ১: গরীবুল্লাহর পাঁচটি কাব্য

ইউ-সো-স-জ-আ = ইউসুফ-জোলেখা + সোনাভান + সত্যপীরের পুথি + জঙ্গনামা + আমীর হামজা (১ম খণ্ড)।

ট্রিক ২: সৈয়দ হামজার তিনটি মিশ্র ভাষার কাব্য

আ-জ-হ (১৭৯৫, ১৭৯৮, ১৮০৪) = আমীর হামজা সম্পন্ন (১৭৯৫) + জৈগুনের পুথি (১৭৯৮) + হাতেম তাই (১৮০৪)।

ট্রিক ৩: নামকরণের ব্যক্তি

ব্যক্তি

নামকরণ

মনে রাখুন

রেভারেন্ড জেমস লং

মুসলমানী বাংলা

বিদেশি = মুসলমানী নাম দিয়েছেন

ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর

যাবনী মিশাল

যাব = যবন = বিদেশি; মিশাল = মিশ্রণ

গবেষকগণ

দোভাষী পুঁথি

দো = দুই (আসলে অনেক ভাষা)

ট্রিক ৪: ইউসুফ-জোলেখার তিন রচয়িতা

'শাহ-ফকির-আবদুল' = শাহ মুহম্মদ সগীর + ফকির গরীবুল্লাহ + আবদুল হাকিমতিনজনেই লিখেছেন

সারসংক্ষেপউপসংহার

পুঁথি সাহিত্য বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়মুসলমান কবিরা তাঁদের ধর্মীয়সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বাংলায় রূপ দিয়েছেনতবে বিশুদ্ধ বাংলায় নয়, আরবি-ফারসির মিশেলেএই মিশেল থেকেই জন্ম নিয়েছে পুঁথি সাহিত্যের স্বতন্ত্র ভাষারীতিগ্রামের আঙিনায় কূপির আলোয় পুঁথিপাঠের আসরএটাই ছিল সেকালের সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র

চূড়ান্ত স্মরণ: পুঁথি = গরীবুল্লাহ (আদি কবি) + সৈয়দ হামজা (শিষ্য) + শাহ মুহম্মদ সগীর (প্রাচীনতম মুসলিম কবি) + আবদুল হাকিম (বাংলার প্রতি ভালোবাসা) + দোভাষী ভাষা + শায়ের

অধ্যায় সমাপ্ত

পুঁথি সাহিত্যসংযোজন

বিখ্যাত পুঁথি কাব্য

বিস্তারিত কাহিনিসাহিত্যিক বিশ্লেষণ

ইউসুফ-জোলেখালাইলী-মজনুআমির হামজাহাতেম তাইশিরি-ফরহাদসোনাভানসয়ফুলমুলুক

বিখ্যাত পুঁথি কাব্যবিস্তারিত বিশ্লেষণ

১. ইউসুফ-জোলেখাপুঁথি সাহিত্যের সেরা প্রণয়োপাখ্যান

ইউসুফ-জোলেখা পুঁথি সাহিত্যের সর্বাধিক জনপ্রিয়বহুলপঠিত প্রণয়কাব্যবাইবেলকোরআনে নৈতিক উপাখ্যান হিসেবে এই কাহিনি সংক্ষেপে বর্ণিত আছেইরানের মহাকবি ফেরদৌসীসুফিকবি জামী এই কাহিনি নিয়ে কাব্য রচনা করেছিলেনবাংলায় শাহ মুহম্মদ সগীর সবচেয়ে আগে এই কাহিনি বাংলায় এনেছেন

মূল উৎস

কোরআন শরিফ (সূরা ইউসুফ) এবং বাইবেল (আদিপুস্তক) — ইরানি কবি ফেরদৌসীজামীর ফারসি কাব্য থেকেও প্রভাবিত

বাংলা রচয়িতা

শাহ মুহম্মদ সগীর (প্রাচীনতম), ফকির গরীবুল্লাহ, আবদুল হাকিম

শ্রেণি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

বৈশিষ্ট্য

ধর্মীয় পটভূমিতে মানবিক প্রেমের কাহিনি; নৈতিকতাপ্রেমের দ্বন্দ্ব; সবচেয়ে বহুলপঠিত পুঁথি

ইউসুফ-জোলেখার পূর্ণ কাহিনিগল্পের আকারে

ইউসুফের পরিচয়বিপদের সূচনা

হজরত ইয়াকুব নবীর বারো পুত্রের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরপ্রিয় পুত্র ছিলেন ইউসুফতাঁর রূপের কথা ছিল অতুলনীয়বলা হতো তিনি মানুষ নাকি ফেরেশতা তা চেনা দুষ্করবাবার এই অতিরিক্ত স্নেহ দেখে তাঁর সৎ ভাইয়েরা প্রচণ্ড হিংসায় জ্বলে উঠলএকদিন তারা পরিকল্পনা করল ইউসুফকে সরিয়ে দেওয়ারমরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে তারা ইউসুফকে একটি গভীর কূপে নিক্ষেপ করল এবং বাবার কাছে মিথ্যা বললবলল বাঘে তাকে খেয়ে ফেলেছে

দাসত্বের জীবন

কূপে পড়ে থাকা ইউসুফকে কিছুক্ষণ পর একটি কাফেলা পথ চলতে গিয়ে দেখতে পেলতারা তাকে মিশরে নিয়ে গেল এবং দাস হিসেবে বিক্রি করে দিলমিশরের রাজকীয় মন্ত্রী পোতিফার ইউসুফকে কিনলেনসেই বাড়িতে ইউসুফ সৎভাবে কাজ করতে লাগলেন এবং তাঁর মেধাসততায় মন্ত্রী সাহেব অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন

জোলেখার মনোলোভন প্রচেষ্টাইউসুফের প্রতিরোধ

মন্ত্রীর স্ত্রী জোলেখা ইউসুফের রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ভালোবেসে ফেললেনবলা হয়জোলেখা স্বপ্নে অনেক আগে এই মুখ দেখেছিলেনতিনি ইউসুফকে নানাভাবে প্রলোভন দিতে লাগলেনএকদিন ঘরের দরজা বন্ধ করে সরাসরি ইউসুফকে কাছে পেতে চাইলেনকিন্তু ইউসুফ নবী ছিলেনতাঁর মনে আল্লাহর ভয় এবং মন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতাতিনি পালাতে গেলেন, জোলেখা পেছন থেকে তাঁর জামার পেছনের অংশ ধরলেনজামা ছিঁড়ে গেল

মিথ্যা অভিযোগকারাবাস

মন্ত্রী সাহেব ফিরে এলে জোলেখা উল্টো অভিযোগ করলেনবললেন ইউসুফই তাঁকে বিব্রত করতে চেয়েছিলকিন্তু ছেঁড়া জামার সত্য বললজামার পেছন ছেঁড়া মানে সে পালাচ্ছিল, সামনে ছেঁড়া থাকলে সে আক্রমণ করেছেমন্ত্রী বুঝলেন সত্য কীতবু প্রতিবেশীদের আলোচনা এড়াতে ইউসুফকে কারাগারে পাঠানো হলোকারাগারেও ইউসুফ তাঁর স্বপ্নব্যাখ্যার অলৌকিক ক্ষমতার কারণে বিখ্যাত হলেন

মিশরের ক্ষমতায় ইউসুফ

মিশরের ফেরাউন একদিন স্বপ্ন দেখলেনসাত মোটা গাভী সাত রোগা গাভীকে গিলে ফেলছেকেউ ব্যাখ্যা করতে পারছিল নাকারাগারের বন্দি ইউসুফ স্বপ্ন ব্যাখ্যা করলেনআসছে সাত বছর শস্যশ্যামল, তারপর সাত বছর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষফেরাউন মুগ্ধ হলেনইউসুফকে কারাগার থেকে মুক্ত করে মিশরের অর্থমন্ত্রী পদে নিয়োগ দিলেনইউসুফ দেশ পরিচালনা শুরু করলেন দক্ষতায়

ভাইদের পুনরাগমনপরিণতি

দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফের সৎ ভাইয়েরা কেনানদেশ থেকে শস্য কিনতে মিশরে এলতারা ইউসুফকে চিনতে পারল নাকিন্তু ইউসুফ ভাইদের চিনলেনতিনি তাদের পরীক্ষা করলেনএবং শেষে নিজেকে পরিচয় দিলেনভাইয়েরা লজ্জিত হলো, ক্ষমা চাইলইউসুফ মহামনে তাদের ক্ষমা করলেনবাবা ইয়াকুবকে আনা হলোসুখেশান্তিতে পরিবার একত্রিত হলো

জোলেখার পরিণতি

এই কাহিনির একটি আলোচিত দিক হলো জোলেখার পরিণতিফারসি কবি জামীর বর্ণনামতেমন্ত্রীর মৃত্যুর পর জোলেখা নিঃস্ব হয়ে ভিখারিনী হনকিন্তু ইউসুফের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অটল থাকেএকদিন জোলেখা ইউসুফকে রাস্তায় দেখেন এবং প্রার্থনা করেনআল্লাহ তাঁর যৌবনরূপ ফিরিয়ে দেনইউসুফ জোলেখাকে বিয়ে করেন এবং তারা সুখে জীবন কাটানতবে কোরআনে এই অংশের উল্লেখ নেই

ইউসুফ-জোলেখা কাব্যের মূল বার্তা: পাপের পরিণতি, নৈতিকতার বিজয় এবং ধৈর্যশীলদের পুরস্কার

বাংলা সাহিত্যে এই কাব্যের তিনটি পৃথক সংস্করণ রয়েছেশাহ মুহম্মদ সগীর, ফকির গরীবুল্লাহআবদুল হাকিমের

২. লাইলী-মজনুপ্রেমের চিরন্তন ট্র্যাজেডি

লাইলী-মজনু বিশ্বের অন্যতম অমর প্রেমকাহিনিইংরেজ কবি লর্ড বায়রন এটিকে 'মধ্যপ্রাচ্যের রোমিও-জুলিয়েট' বলেছেনউপমহাদেশে এই কাহিনি রাধা-কৃষ্ণের মতোই সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত

মূল উৎস

৭ম শতাব্দীর আরবি লোকগাথা; ফারসি কবি নিজামি গানজাবির 'খামসা' গ্রন্থে বিস্তারিত; পরে ফারসিকবি জামীর কাব্য

বাংলা রচয়িতা

দৌলত উজির বাহরাম খান (আনু. ১৫৬০-১৫৭৫ সাল) — বাংলায় প্রথমশ্রেষ্ঠ

পৃষ্ঠপোষক

চট্টগ্রামের জাফরাবাদের জমিদার নিজাম শাহ

শ্রেণি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্যসুফি দর্শনের আভাস আছে (লাইলী = আত্মা, মজনু = মানুষ)

ভাষা

সংলাপবর্ণনায় চমৎকার; রাগ-ছন্দের উল্লেখ আছে; প্রকাশভঙ্গি স্বচ্ছন্দ

লাইলী-মজনুর পূর্ণ কাহিনিগল্পের আকারে

মজনুর জন্মলাইলীর সাথে পরিচয়

আরবের বনু আমির গোত্রের ধনাঢ্য সুলতান সায়িদের দীর্ঘকাল কোনো সন্তান ছিল নাঅনেক প্রার্থনার পর আল্লাহর অশেষ করুণায় তাদের ঘরে একটি পুত্র জন্মালনাম কায়েসছেলেটি দেখতে এত সুন্দর ছিল যেন চাঁদের আলো ঝরত তার মুখ থেকেবাল্যকালে পাঠশালায় যাওয়ার সময় কায়েসের দেখা হলো লাইলীর সাথেএক বণিকের মেয়েদুজনে একই পাঠশালায় পড়তে লাগল এবং পড়াশোনার কথা ভুলে শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকতধীরে ধীরে প্রেম গভীর হলো

মজনু নাম পাওয়াপাগল হওয়া

লাইলীর মা মেয়ের অবস্থা বুঝলেনপাঠশালায় যাওয়া বন্ধ করে দিলেনকায়েস লাইলীকে দেখতে না পেয়ে দিশেহারা হয়ে গেলসে সবখানে লাইলীকে নিয়ে কবিতা লিখত এবং মানুষদের শোনাতধীরে ধীরে তার আচরণ পাগলের মতো হয়ে গেললোকেরা তাকে 'কায়েস' বলা বন্ধ করে 'মজনু' (আরবিতে মাজনুন = পাগল) বলে ডাকতে শুরু করল

বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

মজনুর বাবা লাইলীর বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলেনকিন্তু লাইলীর বাবা পাগলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিতে অস্বীকার করলেনএরপর লাইলীকে বয়স্ক এক ব্যক্তির সাথে বিয়ে দেওয়া হলোলাইলী স্বামীর ঘরে গেল ঠিকই, কিন্তু মনের মজনুকে ভুলতে পারল নাসে তার স্বামীর সাথে কোনো সম্পর্ক রাখতে সম্মত হলো নাশুধু স্ত্রীর কর্তব্য পালন করল

মজনুর বনবাসী জীবন

মজনু পরিবার ছেড়ে বনে-জঙ্গলে চলে গেলবন্য পশু-পাখিরা হলো তার সঙ্গীনিজের কাছে কবিতা আবৃত্তি করত আর বালিতে লাইলীর নাম লিখতযে পথিকেরা বনের ভেতর দিয়ে যেত তারা দেখতএকটি পাগল মানুষ একা একা কবিতা বলছেমজনুর বাবা-মা মনের দুঃখে মারা গেলেনলাইলীর স্বামীও মারা গেলেন

লাইলীর মৃত্যুমজনুর পরিণতি

বিরহের কষ্টে লাইলী অসুস্থ হয়ে পড়লেনমৃত্যুর আগে তিনি শেষবার মজনুকে দেখতে চাইলেনখবর পাঠানো হলো মজনুর কাছেমজনু এলদুজন মুখোমুখি হলো, কিন্তু কোনো কথা বলার শক্তি ছিল না কারোলাইলী চোখ বন্ধ করে মারা গেলেনমজনু লাইলীর কবরের পাশে প্রতিদিন বসতএকদিন সেও কবরের পাশে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেলদুজনকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হলোভালোবাসা পরিপূর্ণ হলো মৃত্যুর মাধ্যমে

সুফি দর্শনে লাইলী-মজনু: সুফিদের মতে লাইলী = পরমাত্মা (আল্লাহ), মজনু = সাধক (মানুষ)। প্রেম এখানে আধ্যাত্মিক মুক্তির পথ

লর্ড বায়রন এই কাহিনিকে 'মধ্যপ্রাচ্যের রোমিও-জুলিয়েট' বলেছেনলাইলী-মজনু বাস্তবে ৭ম শতাব্দীর আরব কবি কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়ালাইলার কাহিনি অবলম্বনে

'মজনু' আসলে কায়েসের প্রকৃত নাম নয় — 'মজনু' বা 'মাজনুন' অর্থ পাগলপ্রেমে পাগল হওয়ার কারণে মানুষ তাকে এই নামে ডাকতে শুরু করে

৩. আমির হামজাইসলামের মহাবীরের যুদ্ধগাথা

'আমির হামজা' পুঁথি সাহিত্যের দ্বিতীয় প্রধান শ্রেণি জঙ্গনামার সবচেয়ে বিখ্যাত কাব্যহজরত মুহম্মদ (সা.)-এর চাচা হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন ইসলামের অন্যতম প্রধান যোদ্ধাবীর

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব

হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবহজরত মুহম্মদ (সা.)-এর চাচাবীর সাহাবি

বাংলা রচয়িতা

ফকির গরীবুল্লাহ (১ম খণ্ড); সৈয়দ হামজা (বাকি অংশ, ১৭৯৫ সালে সমাপ্ত)

শ্রেণি

জঙ্গনামা (যুদ্ধকাব্য) — ইসলামি বীরত্বের কাব্য

আকৃতি

বিশাল কাব্য; একাধিক সংস্করণে প্রকাশিত

আমির হামজার কাহিনিসংক্ষেপে

হামজার পরিচয়

হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব ছিলেন আরবের সবচেয়ে বিখ্যাত শিকারিযোদ্ধাদের একজনইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি ছিলেন আরবের সম্মানিত ব্যক্তিত্বমক্কার কোরাইশ গোত্রের প্রভাবশালী এই মানুষটি একদিন ইসলামে দীক্ষিত হলেনতারপর থেকে ইসলামের পক্ষে তাঁর বীরত্ব ছিল অতুলনীয়

বদরের যুদ্ধহামজার বীরত্ব

বদরের যুদ্ধে (৬২৪ খ্রি.) হামজা ছিলেন মুসলমানদের প্রধান যোদ্ধাদের একজনমাত্র ৩১৩ জন মুসলমানের বিপক্ষে ছিল ১০০০ কোরাইশ সৈন্যসেই ভয়াবহ যুদ্ধে হামজার বীরত্ব ইসলামের ইতিহাসে স্মরণীয়

উহুদের যুদ্ধহামজার শাহাদাত

উহুদের যুদ্ধে (৬২৫ খ্রি.) হামজা শহিদ হনআবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দাযার বাবাকে হামজা বদরে হত্যা করেছিলেনপ্রতিশোধের জন্য আফ্রিকান দাস ওয়াহশিকে হামজাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেনওয়াহশি তীর মেরে হামজাকে হত্যা করেনহিন্দা হামজার বুক চিরে কলিজা বের করেছিলেন বলে বর্ণনা আছেহজরত মুহম্মদ (সা.) এই সংবাদে অত্যন্ত ব্যথিত হন এবং হামজাকে 'সাইয়েদুশ শোহাদা' (শহিদদের সর্দার) উপাধি দেন

পুঁথিতে এই কাহিনি বহুলাংশে কল্পনামিশ্রিতঐতিহাসিক ঘটনার সাথে অলৌকিক বীরত্বের কাহিনি যোগ করা হয়েছেহামজাকে একজন অজেয় বীর হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে

হামজাকে বলা হয় 'আসাদুল্লাহ' (আল্লাহর সিংহ) এবং 'সাইয়েদুশ শোহাদা' (শহিদদের সর্দার)।

আমির হামজা কাব্যে ঐতিহাসিক সত্যের সাথে কাল্পনিক বীরত্বের কাহিনি মিশ্রিত হয়েছে

৪. হাতেম তাইআরবের কিংবদন্তি দানশীল বীর

হাতেম তাই পুঁথি সাহিত্যের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় চরিত্রতাই গোত্রের হাতেম আরব সাহিত্যইতিহাসে দানশীলতার প্রতীক হিসেবে বিখ্যাতসৈয়দ হামজা ১৮০৪ সালে এই কাহিনি নিয়ে বাংলায় কাব্য রচনা করেন

ঐতিহাসিক ভিত্তি

হাতেম আত-তাই — ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আরব কবিনেতা; তাই গোত্রের সদস্য

বাংলা রচয়িতা

সৈয়দ হামজা (১৮০৪ সাল)

শ্রেণি

জঙ্গনামা / বীরত্বের কাব্যদানশীলতাসাহসের গাথা

হাতেম তাইয়ের কাহিনিসংক্ষেপে

হাতেম তাইয়ের দানশীলতা

হাতেম তাই ছিলেন অসাধারণ দানশীলতাঁর সম্পদ যত ছিল, মানুষকে দেওয়ার ইচ্ছা তার চেয়ে বেশি ছিলবলা হয় তিনি কখনো কোনো সাহায্যপ্রার্থীকে খালি হাতে ফেরাননিরাত্রিবেলা গরিবের বাড়ির সামনে গিয়ে খাবার রেখে আসতেনঅতিথি এলে নিজের সর্বস্ব দিয়ে দিতেনএমনকি নিজের প্রিয় ঘোড়া পর্যন্ত অতিথিকে দান করে দিয়েছিলেন বলে কথিত আছে

পুঁথিতে হাতেম তাই

পুঁথিতে হাতেম তাইয়ের দানশীলতার সাথে বীরত্বের কাহিনিও যোগ করা হয়েছেকল্পকাহিনিতে হাতেম নানা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হনবিভিন্ন রাজ্যে যান, বিপদে পড়েন এবং তাঁর বীরত্বসততায় জয়ী হনপ্রতিটি পরীক্ষায় তিনি নিজের স্বার্থের কথা না ভেবে অন্যের কথা ভাবেন

'হাতেম তাইয়ের মতো দানশীল' — এই বাংলা প্রবাদটি এখনো প্রচলিতদানশীলতার প্রতীক হিসেবে হাতেম তাইয়ের নাম সর্বজনবিদিত

৫. শিরি-ফরহাদঅসম্ভব প্রেমের সাধনা

শিরি-ফরহাদ ফারসি সাহিত্যের একটি বিখ্যাত প্রেমকাহিনিএটিও বাংলায় পুঁথিরূপে অনূদিত হয়েছেকাহিনিটি প্রেমের জন্য অসম্ভব কাজ করার প্রতীক হিসেবে পরিচিত

মূল উৎস

ফারসি কবি নিজামি গানজাবির 'খামসা' গ্রন্থের একটি কাহিনি; 'খুসরুশিরিন' নামে পরিচিত

পটভূমি

পারস্য সাম্রাজ্যের রাজা খুসরু, তাঁর রানি শিরিন এবং রাজমিস্ত্রি ফরহাদ

শ্রেণি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্যএকতরফা প্রেমআত্মত্যাগের কাহিনি

শিরি-ফরহাদের কাহিনিসংক্ষেপে

ফরহাদের পরিচয়প্রেম

ফরহাদ ছিলেন একজন অসাধারণ দক্ষ রাজমিস্ত্রিভাস্করপারস্যের রানি শিরিনের সৌন্দর্য দেখে তিনি প্রেমে পড়ে গেলেনশিরিন ছিলেন রাজা খুসরুর প্রেমিকাপরে রানিরাজা খুসরু ফরহাদের প্রেম সম্পর্কে জানলেনতিনি একটি অসম্ভব শর্ত দিলেনযদি ফরহাদ পাহাড় কেটে দুধের নদী তৈরি করতে পারেন, তাহলে শিরিনকে দেওয়া হবে

অসম্ভব কাজমিথ্যা খবর

ফরহাদ প্রেমের শক্তিতে পাহাড় কাটতে শুরু করলেনবছরের পর বছর কেটে গেলফরহাদের পরিশ্রম দেখে সবাই অবাকশিরিনও তাঁর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করলেনরাজা ভয় পেলেনতিনি এক বৃদ্ধাকে পাঠালেন মিথ্যা খবর দিতেবললেন শিরিন মারা গেছেনএই মিথ্যা খবর শুনে ফরহাদ সহ্য করতে পারলেন নাতিনি তাঁর খোদাইয়ের যন্ত্র মাথায় মেরে আত্মহত্যা করলেন

এই কাহিনি শুনে শিরিনও ব্যথিত হলেন এবং পরবর্তীকালে তিনিও মারা গেলেন। 'শিরি-ফরহাদ' প্রেমের জন্য অসম্ভব সাধনার প্রতীক হয়ে উঠল

'শিরি-ফরহাদের প্রেম' বাংলায় প্রবাদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়এর অর্থ অসম্ভব প্রেম বা একতরফা প্রেমের জন্য আত্মত্যাগ

৬. সোনাভানগরীবুল্লাহর যুদ্ধকাব্য

সোনাভান ফকির গরীবুল্লাহর রচিত একটি জঙ্গনামাইসলামি বীরত্বের কাহিনি নিয়ে রচিত এই কাব্যে মিশ্র ভাষার বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট

রচয়িতা

ফকির গরীবুল্লাহ

শ্রেণি

জঙ্গনামাইসলামি যুদ্ধের কাহিনি

ভাষা

মিশ্র ভাষায় রচিত (দোভাষী পুঁথি)

প্রধান চরিত্র

সোনাভানইসলামি বীর নারী চরিত্র

সোনাভান কাব্যে একজন বীর মুসলিম নারীর কাহিনি বর্ণিত হয়েছেআরব-ইরানের যুদ্ধের পটভূমিতে এই নারী চরিত্র তাঁর বীরত্বে এবং ইসলামের পক্ষে লড়াইয়ে অসাধারণ ভূমিকা রাখেনএই কাব্যে মুসলিম নারীর শক্তিসাহসিকতার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে

৭. সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামালপরির সাথে মানুষের প্রেম

'সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল' আরব্য রজনীর একটি বিখ্যাত কাহিনি যা পুঁথিসাহিত্যে স্থান পেয়েছেএটি রোমান্টিক প্রণয়কাব্যের প্রথম শ্রেণির অন্তর্গত

মূল উৎস

আলেফ লায়লা (আরব্য রজনী) বা হাজার একরাতের গল্প

রচয়িতা (বাংলা)

দোনাগাজী এবং অন্যান্য কবি

শ্রেণি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

কাহিনি সংক্ষেপ

সয়ফুলমুলুক মিশরের রাজপুত্রস্বপ্নে তিনি পরির রানি বদিউজ্জামালকে দেখেনস্বপ্নের সুন্দরী পরির প্রেমে পড়ে যান তিনিসেই পরিকে খুঁজতে তিনি রাজ্য ছেড়ে বেরিয়ে পড়েনদীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এক পর্যায়ে একটি জাদুর পুকুরে তিনি বদিউজ্জামালকে দেখেনপরিরা সেখানে স্নান করতে আসেতিনি বদিউজ্জামালের পোশাক লুকিয়ে রাখেন, পরিটি উড়তে পারে নাঅনেক বাধাপরীক্ষার পর দুজনের প্রেম পরিণয়ে পরিণত হয়

সয়ফুলমুলুক কাব্যটি পরিমানুষের প্রেমের প্রতীকী উপাখ্যানস্বপ্নের সৌন্দর্যের পিছনে সাধনার গল্প

৮. গুলে বকাওলীপুষ্প প্রেমের কাব্য

'গুলে বকাওলী' পুঁথি সাহিত্যের একটি রোমান্টিক প্রণয়কাব্যএটি ফারসি সাহিত্যের কাহিনি থেকে গৃহীত

অর্থ

গুল = ফুল; বকাওলী = একটি জাদুর ফুলের নাম যা অন্ধকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে পারে

কাহিনির মূল

অন্ধ রাজার পুত্র সেই জাদুর ফুল সংগ্রহ করতে বের হয়; পথে নানা বাধাবিপদ; শেষে প্রেমসাফল্য

শ্রেণি

রোমান্টিক প্রণয়কাব্য

একটি রাজ্যে অন্ধ রাজা ছিলেনতাঁর দৃষ্টি ফেরাতে প্রয়োজন 'গুলে বকাওলী' — একটি অত্যন্ত দুর্লভ জাদুর ফুলরাজার চার পুত্র সেই ফুল আনতে গিয়ে ব্যর্থ হনপঞ্চম পুত্র অনেক পরীক্ষা, বিপদপ্রেমের পথ পেরিয়ে সেই ফুল সংগ্রহ করে ফিরে আসেনরাজার দৃষ্টি ফিরে আসে এবং পুত্রের প্রেমিকার সাথে বিয়ে হয়

'গুলে বকাওলী' বীরত্ব, পুত্রভক্তিপ্রেমের সমন্বয়ে রচিত একটি চমৎকার পুঁথিকাব্য

৯. বেনজির-বদরে মুনীররোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান

'বেনজির-বদরে মুনীর' পুঁথি সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির রোমান্টিক কাব্যগুলোর একটিফারসিআরবি উৎস থেকে গৃহীত এই কাহিনিতে দুই প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের পথে নানা বাধা এবং শেষে মিলনের গল্প আছে

'বদরে মুনীর' অর্থ পূর্ণচন্দ্রের মতো উজ্জ্বলএটি নায়িকার নাম। 'বেনজির' অর্থ অতুলনীয়এটি নায়কের নাম বা বিশেষণদুজনের প্রেমকাহিনি নানা বাধাবিঘ্নের পর পরিণতিতে মিলিত হয়

১০. কাসাসুল আম্বিয়ানবীদের কাহিনি

'কাসাসুল আম্বিয়া' অর্থ নবীদের কাহিনিসংগ্রহএটি পুঁথি সাহিত্যের তৃতীয় শ্রেণির (নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য) অন্তর্গতআরবি 'কাসাসুল আম্বিয়া' থেকে বাংলায় রূপান্তরিত এই কাব্যে আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা এবং হজরত মুহম্মদ (সা.) সহ বিভিন্ন নবীর জীবনকথা বর্ণিত হয়েছেএই কাব্য ইসলামি শিক্ষার আলোকে রচিত এবং তৎকালীন মুসলমান সমাজে ব্যাপক পঠিত হতো

'কাসাসুল আম্বিয়া' পুঁথি সাহিত্যের শাস্ত্রকাব্য শ্রেণির প্রধান রচনানবী-রাসুলের কাহিনি সংবলিত

১১. বিখ্যাত পুঁথি কাব্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ

কাব্য

রচয়িতা

শ্রেণি

মূল বার্তা

ইউসুফ-জোলেখা

শাহ মুহম্মদ সগীর প্রমুখ

প্রণয়কাব্য

পাপের পরিণতিধৈর্যের পুরস্কার; নৈতিকতার জয়

লাইলী-মজনু

দৌলত উজির বাহরাম খান

প্রণয়কাব্য

বিরহমিলনের অপেক্ষা; মৃত্যুতেই প্রেমের পূর্ণতা

শিরি-ফরহাদ

বিভিন্ন কবি

প্রণয়কাব্য

প্রেমের জন্য অসম্ভব সাধনা; মৃত্যুতে মিলন

আমির হামজা

গরীবুল্লাহ + সৈয়দ হামজা

জঙ্গনামা

ইসলামের পক্ষে বীরত্ব; শাহাদাতের মহিমা

হাতেম তাই

সৈয়দ হামজা

জঙ্গনামা

দানশীলতাবীরত্বের মহিমা

সোনাভান

ফকির গরীবুল্লাহ

জঙ্গনামা

মুসলিম নারীর বীরত্বইসলাম রক্ষা

সয়ফুলমুলুক

দোনাগাজী

প্রণয়কাব্য

স্বপ্নের প্রেমের সন্ধানে অদম্য যাত্রা

গুলে বকাওলী

বিভিন্ন কবি

প্রণয়কাব্য

পুত্রভক্তি, প্রেমবীরত্বের সমন্বয়

কাসাসুল আম্বিয়া

বিভিন্ন কবি

শাস্ত্রকাব্য

নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা; ইসলামি জ্ঞান প্রচার

১২. বিখ্যাত পুঁথি কাব্যঅতিরিক্ত MCQ (৩০টি)

নিচের প্রশ্নগুলো বিভিন্ন বিসিএসপ্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এসেছে বা আসতে পারে

প্রশ্ন ১: ইউসুফ-জোলেখা কাব্যের মূল উৎস কোথায়?

উত্তর: কোরআন শরিফ (সূরা ইউসুফ) এবং বাইবেল (আদিপুস্তক) ফারসি কবি ফেরদৌসীজামীর কাব্য থেকেও প্রভাব

প্রশ্ন ২: ইউসুফের সৎ ভাইয়েরা তাঁকে কোথায় ফেলে দিয়েছিল?

উত্তর: কূপে (মরুভূমির কূপে) তারপর দাস হিসেবে মিশরে বিক্রি করা হয়

প্রশ্ন ৩: জোলেখা কার স্ত্রী ছিলেন?

উত্তর: মিশরের মন্ত্রী পোতিফারের স্ত্রী ইউসুফকে কিনে নিয়েছিলেন পোতিফার

প্রশ্ন ৪: ফেরাউনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে ইউসুফ কোন পদ পান?

উত্তর: মিশরের অর্থমন্ত্রী পদ সাত মোটাসাত রোগা গাভীর স্বপ্ন

প্রশ্ন ৫: লাইলী-মজনু কাহিনির মূল নায়কের প্রকৃত নাম কী?

উত্তর: কায়েস ইবনে আল-মুলাওয়া মজনু তার প্রকৃত নাম নয়; মজনু = পাগল

প্রশ্ন ৬: 'মজনু' শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: পাগল (আরবিতে মাজনুন) প্রেমে পাগল হওয়ার কারণে এই নাম

প্রশ্ন ৭: লর্ড বায়রন লাইলী-মজনুকে কী বলেছেন?

উত্তর: মধ্যপ্রাচ্যের রোমিও-জুলিয়েট বিখ্যাত ইংরেজ কবির মন্তব্য

প্রশ্ন ৮: লাইলী-মজনু কাহিনির মূল উৎস কোথায়?

উত্তর: আরবি লোকগাথা (৭ম শতাব্দী) পরে ফারসিকবি নিজামিজামী বিস্তারিত লেখেন

প্রশ্ন ৯: সুফিদের মতে লাইলী কীসের প্রতীক?

উত্তর: পরমাত্মা বা আল্লাহর প্রতীক মজনু = সাধক মানুষ; লাইলী = সৃষ্টিকর্তা

প্রশ্ন ১০: শিরি-ফরহাদ কাহিনির পটভূমি কোথায়?

উত্তর: পারস্য সাম্রাজ্য ফারসি কবি নিজামির 'খামসা' থেকে গৃহীত

প্রশ্ন ১১: ফরহাদকে কীসের শর্তে শিরিন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল?

উত্তর: পাহাড় কেটে দুধের নদী তৈরি করলে অসম্ভব শর্ত দিয়েছিলেন রাজা খুসরু

প্রশ্ন ১২: ফরহাদ কীভাবে মারা যান?

উত্তর: মিথ্যা খবরে শিরিন মারা গেছেন জেনে আত্মহত্যা মাথায় নিজের যন্ত্র মেরেছিলেন

প্রশ্ন ১৩: হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব কার চাচা?

উত্তর: হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর চাচা তিনি ইসলামের অন্যতম প্রধান যোদ্ধা

প্রশ্ন ১৪: হামজাকে কোন যুদ্ধে শহিদ করা হয়?

উত্তর: উহুদের যুদ্ধে (৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) ওয়াহশি নামে দাসের তীরে শহিদ হন

প্রশ্ন ১৫: হামজার উপাধি কী ছিল?

উত্তর: সাইয়েদুশ শোহাদা এবং আসাদুল্লাহ সাইয়েদুশ শোহাদা = শহিদদের সর্দার; আসাদুল্লাহ = আল্লাহর সিংহ

প্রশ্ন ১৬: হাতেম তাই কোন গোত্রের মানুষ ছিলেন?

উত্তর: তাই (আরব) গোত্রের তাই গোত্রের নেতাকবি

প্রশ্ন ১৭: হাতেম তাই বাংলায় কার রচনায় পুঁথি হয়েছে?

উত্তর: সৈয়দ হামজার (১৮০৪ সাল) মিশ্র ভাষায় রচিত

প্রশ্ন ১৮: সোনাভান কোন শ্রেণির পুঁথি কাব্য?

উত্তর: জঙ্গনামা (যুদ্ধকাব্য) মুসলিম নারী বীরের কাহিনি

প্রশ্ন ১৯: 'গুল' ও 'বকাওলী' শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: গুল = ফুল; বকাওলী = জাদুর ফুলের নাম অন্ধকে দৃষ্টি দেয় এই ফুল

প্রশ্ন ২০: 'সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল' কোন উৎস থেকে নেওয়া?

উত্তর: আলেফ লায়লা (আরব্য রজনী) হাজার একরাতের গল্প

প্রশ্ন ২১: 'কাসাসুল আম্বিয়া' শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: নবীদের কাহিনিসংগ্রহ কাসাস = কাহিনি; আম্বিয়া = নবীগণ

প্রশ্ন ২২: 'কাসাসুল আম্বিয়া' কোন শ্রেণির পুঁথি?

উত্তর: নবী-আউলিয়ার জীবনীকাব্য পুঁথি সাহিত্যের তৃতীয় শ্রেণি

প্রশ্ন ২৩: ইউসুফের ছেঁড়া জামার রহস্য কী প্রমাণ করেছিল?

উত্তর: ইউসুফ পালাচ্ছিলেন; তিনি নির্দোষ পেছনে ছেঁড়া = সে পালাচ্ছিল, আক্রমণকারী নয়

প্রশ্ন ২৪: পুঁথি সাহিত্যে 'বেনজির' শব্দের অর্থ কী?

উত্তর: অতুলনীয় বেনজির-বদরে মুনীর কাব্যের নায়কের নাম/বিশেষণ

প্রশ্ন ২৫: লাইলী-মজনু কাব্যে সুফিতত্ত্বের দিক থেকে মজনু কীসের প্রতীক?

উত্তর: সৃষ্টির প্রতীকযে সৃষ্টিকর্তাকে খোঁজে সুফিরা এই কাহিনিকে আধ্যাত্মিকভাবে ব্যাখ্যা করেন

প্রশ্ন ২৬: দৌলত উজির বাহরাম খান লাইলী-মজনু ছাড়া আর কী কাব্য রচনা করেছেন?

উত্তর: ইমামবিজয় (কারবালা কাহিনি) তাঁর দ্বিতীয় বিখ্যাত কাব্য

প্রশ্ন ২৭: ইউসুফ-জোলেখা কাব্যে ফেরাউনের স্বপ্নে কী দেখা যায়?

উত্তর: সাত মোটা গাভী সাত রোগা গাভীকে গিলে ফেলছে ইউসুফ ব্যাখ্যা করেন: সাত বছর প্রাচুর্য, তারপর দুর্ভিক্ষ

প্রশ্ন ২৮: সোনাভানের রচয়িতা কে?

উত্তর: ফকির গরীবুল্লাহ পুঁথি সাহিত্যের আদি কবির রচনা

প্রশ্ন ২৯: 'আসাদুল্লাহ' উপাধিটি কার?

উত্তর: হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিবের আসাদুল্লাহ = আল্লাহর সিংহ

প্রশ্ন ৩০: হাতেম তাইয়ের দানশীলতার গল্পটি কোথায় সবচেয়ে বিখ্যাত?

উত্তর: সমগ্র আরব বিশ্বে এবং উপমহাদেশে 'হাতেম তাইয়ের মতো দানশীল' বাংলায় প্রবাদ হয়েছে

সারসংক্ষেপ

পুঁথি সাহিত্যের বিখ্যাত কাব্যগুলো কেবল বিনোদনের উপকরণ ছিল নাএগুলো ছিল তৎকালীন মুসলিম সমাজের সাহিত্য-সংস্কৃতির মেরুদণ্ডইউসুফ-জোলেখার নৈতিকতা, লাইলী-মজনুর বিরহ-প্রেম, আমির হামজার বীরত্ব, হাতেম তাইয়ের দানশীলতাএই সব চরিত্রকাহিনি বাংলার মানুষের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল

পুঁথির মূল বার্তা: ভালোবাসা, বীরত্ব, ত্যাগ এবং ন্যায়ের জয়এই চারটি থিম পুঁথি সাহিত্যের সকল বিখ্যাত কাব্যে বিদ্যমান

বিখ্যাত পুঁথি কাব্যঅধ্যায় সমাপ্ত

Review this chapter

You Can Also Read

Chapters closely related to the one you are reading now.

প্যারীচাঁদ মিত্র

No reviews
0 students
Read chapter

নাথ সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

প্রাচীন যুগ

No reviews
0 students
Read chapter

Most Read by Students

Popular picks getting the strongest student traffic right now.

অসহযোগ আন্দোলন (মার্চ ১৯৭১)

No reviews
1 student
Read chapter

নদী, সেতু, পাহাড়, দ্বীপ, বন, সমুদ্রবন্দর

No reviews
1 student
Read chapter

বাংলা ভাষার রীতি

No reviews
1 student
Read chapter

Others Who Read This Also Read

Behavior-based suggestions from student reading patterns where available.

প্যারীচাঁদ মিত্র

No reviews
0 students
Read chapter

নাথ সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

প্রাচীন যুগ

No reviews
0 students
Read chapter

Best Reviewed

Chapters earning the strongest student feedback.

প্যারীচাঁদ মিত্র

No reviews
0 students
Read chapter

নাথ সাহিত্য

No reviews
0 students
Read chapter

প্রাচীন যুগ

No reviews
0 students
Read chapter

Course Suggestions

Want a more guided path after this chapter? These courses are the closest fit.

Browse all courses
Learner fit৳1,999

Bangla

Bangla Language Mastery

Popular with BCS learners who want guided study.

6 lessons8.5h4.9 (186)1.3K students

By Sadia Rahman

View course
Learner fit৳2,999

Platform Building

Teacher Marketplace Blueprint

Popular with BCS learners who want guided study.

5 lessons6.8h4.9 (28)410 students

By Sadia Rahman

View course
FreeFree

English

Admission English Playbook

Free guided course with lessons you can jump into anytime.

4 lessons4.2h4.8 (91)2.8K students

By Rayan Akter

View course