বাংলা ব্যাকরণ ও এর আলোচ্য বিষয় | ||
১. ভূমিকা | ||
মানুষ সামাজিক জীব। মনের ভাব প্রকাশ করতে মানুষ ভাষা ব্যবহার করে। ভাষার সুষ্ঠু ও নির্ভুল ব্যবহারের জন্য যে শাস্ত্র বা বিজ্ঞান রচিত হয়, তাকেই ব্যাকরণ বলা হয়। একটি ভাষার ব্যাকরণ যত পরিপক্ব ও সুসংহত, সেই ভাষা তত উন্নত। বাংলা ভাষার নিজস্ব ব্যাকরণ আছে — যাকে 'বাংলা ব্যাকরণ' বলা হয়। বাংলা ভাষাভাষী মানুষ হিসেবে বাংলা ব্যাকরণের জ্ঞান অর্জন আমাদের জন্য অপরিহার্য। |
২. ব্যাকরণ শব্দের উৎপত্তি ও অর্থ |
২.১ ব্যুৎপত্তিগত অর্থ |
'ব্যাকরণ' শব্দটি সংস্কৃত। এর ব্যুৎপত্তি: বি + আ + √কৃ + অন = ব্যাকরণ। শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা'। সংস্কৃতে 'ব্যাকরণ' শব্দটি ব্যবহৃত হয় ভাষার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের অর্থে। |
ব্যুৎপত্তি বিশ্লেষণ | বি + আ + √কৃ + অন = ব্যাকরণ |
বিশ্লেষণ | বি = বিশেষভাবে। আ = সম্পূর্ণরূপে। √কৃ = করা/বিশ্লেষণ করা। অন = ক্রিয়াবাচক প্রত্যয়। সুতরাং: 'বিশেষভাবে বা সম্যকরূপে বিশ্লেষণ করা হয় যে শাস্ত্রে।' |
২.২ ইংরেজি প্রতিশব্দ |
ব্যাকরণের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Grammar। Grammar শব্দটি এসেছে গ্রিক Gramma থেকে, যার অর্থ লেখা বা অক্ষর। আরবি ভাষায় ব্যাকরণকে বলা হয় 'নাহু' বা 'ছরফ'।
ভাষা | ব্যাকরণের প্রতিশব্দ | উৎস শব্দ ও অর্থ |
বাংলা/সংস্কৃত | ব্যাকরণ | বি+আ+√কৃ+অন — বিশেষ বিশ্লেষণ |
ইংরেজি | Grammar | গ্রিক Gramma — লেখা/অক্ষর |
আরবি | নাহু / ছরফ | নাহু — দিক/পথ; ছরফ — রূপতত্ত্ব |
ফার্সি | দাস্তুরুল আমল | নিয়মের সংকলন |
৩. ব্যাকরণের সংজ্ঞা |
৩.১ বিভিন্ন ব্যাকরণবিদের সংজ্ঞা |
বিভিন্ন ভাষাবিজ্ঞানী ও ব্যাকরণবিদ বিভিন্নভাবে ব্যাকরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিচে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞাগুলো আলোচনা করা হলো:
◈ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র সংজ্ঞা
যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে। |
◈ ড. মুহম্মদ এনামুল হক-এর সংজ্ঞা
যে বিদ্যার দ্বারা কোনো ভাষাকে বিশেষভাবে বিশ্লেষণ করা যায় এবং সেই ভাষার বিভিন্ন উপাদানের পরস্পর সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়, তাকে ব্যাকরণ বলে। |
◈ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংজ্ঞা
যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার বিভিন্ন উপাদানের প্রকৃতি ও স্বরূপের বিচার-বিশ্লেষণ করা হয় এবং বিভিন্ন উপাদানের পারস্পরিক সম্পর্ক ও শ্রেণিবিন্যাস নির্ণয় করা হয়, তাকে ব্যাকরণ বলে। |
◈ বাংলা একাডেমির সংজ্ঞা
ব্যাকরণ হলো এমন একটি শাস্ত্র বা বিজ্ঞান যেখানে ভাষার বিভিন্ন উপাদান যেমন ধ্বনি, শব্দ ও বাক্যের স্বরূপ, গঠন ও পরিবর্তন এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়। |
⚡ পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা |
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্-র সংজ্ঞাটি BCS ও ব্যাংক পরীক্ষায় বারবার এসেছে: 'যে শাস্ত্র পাঠ করলে বাংলা ভাষা শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায়, তাকে বাংলা ব্যাকরণ বলে।' — এটি অবশ্যই মুখস্থ রাখুন। |
৩.২ ব্যাকরণের সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা |
সহজ কথায়: যে শাস্ত্রে কোনো ভাষার ধ্বনি, শব্দ ও বাক্যের গঠন ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হয় এবং সেই ভাষা শুদ্ধভাবে লেখা ও বলার নিয়ম-কানুন আলোচনা করা হয়, তাকে সেই ভাষার ব্যাকরণ বলে। |
৪. ব্যাকরণ পাঠের প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা |
ব্যাকরণ পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। নিচে ব্যাকরণ পাঠের প্রধান কারণ ও উপকারিতাগুলো বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
◈ (১) শুদ্ধ ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন
ব্যাকরণ পাঠ করলে ভাষার নিয়ম-কানুন জানা যায়, ফলে শুদ্ধভাবে লেখা ও বলা সম্ভব হয়। অশুদ্ধ উচ্চারণ, ভুল বানান এবং অসংগত বাক্য গঠন ব্যাকরণ জ্ঞান দ্বারা শুধরে নেওয়া যায়।
উদাহরণ | অশুদ্ধ: 'আমি কাল গিয়াছিলাম।' শুদ্ধ: 'আমি কাল গিয়েছিলাম।' |
বিশ্লেষণ | ব্যাকরণের নিয়ম জানলে এই ভুল এড়ানো সম্ভব। |
◈ (২) ভাষার সৌন্দর্য উপলব্ধি
ব্যাকরণ জ্ঞান থাকলে সাহিত্যের ছন্দ, অলংকার ও শব্দবিন্যাসের সৌন্দর্য গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। কবিতা ও গদ্যের সৌষ্ঠব বুঝতে ব্যাকরণ অপরিহার্য।
◈ (৩) অন্য ভাষা শিক্ষায় সহায়তা
নিজের ভাষার ব্যাকরণ ভালো জানলে অন্য ভাষা শেখা সহজ হয়। কারণ ভাষার মৌলিক কাঠামোগুলো সম্পর্কে আগেই একটি ধারণা তৈরি হয়ে যায়।
◈ (৪) অনুবাদ ও ভাষান্তরে সহায়তা
এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় সঠিকভাবে অনুবাদ করতে উভয় ভাষার ব্যাকরণ জ্ঞান প্রয়োজন।
◈ (৫) ভাষার ইতিহাস ও বিকাশ বোঝা
ব্যাকরণ পাঠ করলে ভাষার ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও বিকাশের ধারা বোঝা যায়।
উপকারিতা | বিস্তারিত |
শুদ্ধ লেখা | বানান, বিরামচিহ্ন ও বাক্যগঠনে নির্ভুলতা অর্জন |
শুদ্ধ বলা | উচ্চারণ ও শব্দব্যবহারে দক্ষতা |
সাহিত্য রচনা | ভাষার সৌন্দর্যময় ব্যবহার |
ভাষাশিক্ষা | অন্য ভাষা শেখার ভিত্তি তৈরি |
অনুবাদ | নির্ভুল ভাষান্তর সম্পাদন |
ভাষাবিজ্ঞান | ভাষার উৎস ও বিকাশ বোঝা |
৫. ব্যাকরণের শ্রেণিবিভাগ | |||
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাকরণকে শ্রেণিবিভাগ করা হয়। প্রধানত তিনটি ভিত্তিতে ব্যাকরণকে ভাগ করা যায়: (১) বর্ণনামূলক ব্যাকরণ, (২) ঐতিহাসিক ব্যাকরণ ও (৩) তুলনামূলক ব্যাকরণ। | |||
◈ (১) বর্ণনামূলক ব্যাকরণ (Descriptive Grammar)
কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ভাষার স্বরূপ যে ব্যাকরণে বর্ণনা করা হয়, তাকে বর্ণনামূলক ব্যাকরণ বলে। এটি ভাষার বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করে, নিয়ম আরোপ করে না।
উদাহরণ | আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ — যেখানে আজকের বাংলার ধ্বনি, শব্দ ও বাক্য বিশ্লেষণ করা হয়। |
বিশ্লেষণ | বর্তমান মান বাংলার নিয়মকানুন বর্ণনা করা হয়। |
◈ (২) ঐতিহাসিক ব্যাকরণ (Historical Grammar)
কোনো ভাষার কালক্রমে পরিবর্তন ও বিকাশের ইতিহাস যে ব্যাকরণে আলোচনা করা হয়, তাকে ঐতিহাসিক ব্যাকরণ বলে।
উদাহরণ | বাংলা ভাষার উদ্ভব থেকে বর্তমান পর্যন্ত পরিবর্তনের ধারা — প্রাকৃত > অপভ্রংশ > বাংলা। |
বিশ্লেষণ | ভাষার ঐতিহাসিক বিবর্তন অনুসরণ করা হয়। |
◈ (৩) তুলনামূলক ব্যাকরণ (Comparative Grammar)
একই গোত্রভুক্ত দুই বা ততোধিক ভাষার তুলনামূলক আলোচনা যে ব্যাকরণে করা হয়, তাকে তুলনামূলক ব্যাকরণ বলে।
উদাহরণ | বাংলা ও হিন্দি উভয়ই সংস্কৃত থেকে আগত — দুটির তুলনামূলক আলোচনা তুলনামূলক ব্যাকরণ। |
বিশ্লেষণ | ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর মধ্যে তুলনা করা হয়। |
❖ বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয়সমূহ ❖ |
৬. বাংলা ব্যাকরণের আলোচ্য বিষয় |
বাংলা ব্যাকরণে মূলত চারটি প্রধান বিষয় আলোচনা করা হয়: (১) ধ্বনিতত্ত্ব, (২) শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব, (৩) বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম এবং (৪) অর্থতত্ত্ব। এই চারটি বিভাগ মিলে বাংলা ভাষার সম্পূর্ণ ব্যাকরণিক চিত্র উপস্থাপিত হয়। |
ক্রম | আলোচ্য বিষয় | ইংরেজি পরিভাষা | সংক্ষিপ্ত পরিচয় |
১ | ধ্বনিতত্ত্ব | Phonology | ভাষার ধ্বনি ও উচ্চারণ বিষয়ক আলোচনা |
২ | শব্দতত্ত্ব / রূপতত্ত্ব | Morphology | শব্দের গঠন, উৎপত্তি ও রূপান্তর বিষয়ক আলোচনা |
৩ | বাক্যতত্ত্ব / পদক্রম | Syntax | বাক্যের গঠন ও পদ-বিন্যাস বিষয়ক আলোচনা |
৪ | অর্থতত্ত্ব | Semantics | শব্দ ও বাক্যের অর্থ বিষয়ক আলোচনা |
৬.১ ধ্বনিতত্ত্ব (Phonology) |
সংজ্ঞা ও পরিচিতি |
ব্যাকরণের যে বিভাগে ভাষার ধ্বনিসমূহের উৎপত্তি, প্রকৃতি, উচ্চারণ, শ্রেণিবিভাগ, পরিবর্তন এবং লিখিত রূপ (বর্ণ) নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে ধ্বনিতত্ত্ব বলে। |
ধ্বনিতত্ত্বের আলোচ্য উপবিষয়সমূহ |
◈ (ক) ধ্বনি ও বর্ণ
ধ্বনি (Sound) | বর্ণ (Letter/Grapheme) |
মানুষের মুখ থেকে যে শব্দ বায়ুর সাহায্যে উৎপন্ন হয় এবং অন্যের কানে পৌঁছে অর্থ বোঝায়, তাকে ধ্বনি বলে। ধ্বনি হলো ভাষার মূল উপাদান। যেমন: অ, আ, ক, খ ইত্যাদি। | ধ্বনির লিখিত বা দৃশ্যমান রূপকে বর্ণ বলে। বর্ণ হলো ধ্বনির প্রতীক। যেমন: অ, আ, ক, খ — এগুলো বর্ণ। ধ্বনি কানে শোনা যায়, বর্ণ চোখে দেখা যায়। |
◈ (খ) স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি
ধ্বনির প্রকার | সংজ্ঞা | সংখ্যা | উদাহরণ |
স্বরধ্বনি | যে ধ্বনি উচ্চারণে অন্য ধ্বনির সাহায্য লাগে না | ১১টি | অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ, ঋ, এ, ঐ, ও, ঔ |
ব্যঞ্জনধ্বনি | যে ধ্বনি উচ্চারণে স্বরধ্বনির সাহায্য লাগে | ৩৯টি | ক, খ, গ, ঘ, ঙ ... ইত্যাদি |
◈ (গ) ধ্বনি পরিবর্তন
ভাষায় ধ্বনি প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। ধ্বনি পরিবর্তনের প্রধান নিয়মগুলো হলো:
পরিবর্তনের ধরন | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
সমীভবন (Assimilation) | পাশাপাশি দুটি ভিন্ন ধ্বনি একই রকম হওয়া | সত্য > সত্ত, পদ্ম > পদ্দ |
স্বরসংগতি (Vowel Harmony) | একটি স্বরের প্রভাবে অন্য স্বর পরিবর্তন | বিলাতি > বিলিতি, মুলো > মুলু |
অপিনিহিতি (Intrusion) | মূল শব্দে অতিরিক্ত স্বর আসা | আজি > আইজ, রাখিয়া > রাইখ্যা |
অভিশ্রুতি (Umlaut) | ই-কার বা উ-কার পূর্ববর্তী স্বরে প্রভাব ফেলা | করিয়া > করে, বলিয়া > বলে |
অন্ত্যস্বরলোপ (Apocope) | শব্দের শেষ স্বর বাদ পড়া | আজি > আজ, রাতি > রাত |
মধ্যস্বরলোপ (Syncope) | শব্দের মাঝের স্বর বাদ পড়া | বসতি > বস্তি, জানালা > জান্লা |
◈ (ঘ) ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান
তৎসম বা সংস্কৃত শব্দে মূর্ধন্য-ণ ও মূর্ধন্য-ষ কখন ব্যবহৃত হবে তার নিয়মকে যথাক্রমে ণ-ত্ব বিধান ও ষ-ত্ব বিধান বলে। এটি ধ্বনিতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ণ-ত্ব বিধান | ঋ, র, ষ-এর পরে দন্ত্য-ন মূর্ধন্য-ণ হয়। যেমন: রণ, কারণ, বর্ণ, ষণ্ড। |
বিশ্লেষণ | নিয়ম: ঋ, র, ষ + ... + ন = ণ |
ষ-ত্ব বিধান | ই, উ-কারের পর এবং ক, র-এর পরে দন্ত্য-স মূর্ধন্য-ষ হয়। যেমন: বিষ, বর্ষ, কৃষি। |
বিশ্লেষণ | নিয়ম: ই/উ-কার বা ক/র + ... + স = ষ |
◈ (ঙ) সন্ধি
পাশাপাশি দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। সন্ধির মাধ্যমে শব্দ সংক্ষিপ্ত ও সুললিত হয়। |
সন্ধির প্রকার | উদাহরণ |
স্বরসন্ধি | হিম + আলয় = হিমালয়; নর + ইন্দ্র = নরেন্দ্র |
ব্যঞ্জনসন্ধি | দিক্ + গজ = দিগ্গজ; সৎ + জন = সজ্জন |
বিসর্গসন্ধি | নিঃ + ফল = নিষ্ফল; দুঃ + গম = দুর্গম |
নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি | কুল + অটা = কুলটা (নিয়ম ভিন্ন) |
📝 বিশেষ দ্রষ্টব্য: ধ্বনিতত্ত্বে আরও আলোচিত হয়: যুক্তব্যঞ্জন, দ্বিত্বব্যঞ্জন, ব্যঞ্জনচ্যুতি, স্বরভক্তি ইত্যাদি। |
৬.২ শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব (Morphology) |
সংজ্ঞা ও পরিচিতি |
ব্যাকরণের যে বিভাগে ভাষার শব্দসমূহের উৎপত্তি, গঠন, প্রকৃতি, শ্রেণিবিভাগ, রূপান্তর ও পরিবর্তন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়, তাকে শব্দতত্ত্ব বা রূপতত্ত্ব বলে। |
শব্দতত্ত্বের আলোচ্য উপবিষয়সমূহ |
◈ (ক) শব্দের উৎপত্তি অনুযায়ী শ্রেণিবিভাগ
উৎপত্তি ও উৎস অনুযায়ী বাংলা শব্দকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়:
শ্রেণি | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
তৎসম শব্দ | সংস্কৃত থেকে সরাসরি গৃহীত, অপরিবর্তিত | চন্দ্র, সূর্য, নদী, বায়ু, অগ্নি |
তদ্ভব শব্দ | সংস্কৃত থেকে পরিবর্তিত হয়ে আগত | চাঁদ (চন্দ্র), সাপ (সর্প), হাত (হস্ত), দুধ (দুগ্ধ) |
দেশি শব্দ | বাংলার আদিম অধিবাসীদের ভাষা থেকে আগত | কুড়ি, চুলা, ডাব, পেট, মাথা |
বিদেশি শব্দ | বিদেশি ভাষা থেকে আগত | আরবি: আল্লাহ, কিতাব। ফারসি: বাদশাহ, দরজা। ইংরেজি: টেবিল, ডাক্তার |
মিশ্র শব্দ | দুটি ভিন্ন উৎসের শব্দের মিলনে গঠিত | রেলগাড়ি (ইং+বাং), হেডমাস্টার (ইং+ইং), হাসপাতাল (পর্তু+ইং) |
◈ (খ) অর্থ অনুযায়ী শব্দের শ্রেণিবিভাগ
শ্রেণি | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
যৌগিক শব্দ | যে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ও ব্যাবহারিক অর্থ একই | গায়ক (যে গায়), শিক্ষক (যে শেখায়) |
রূঢ়ি শব্দ | যে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত ও ব্যাবহারিক অর্থ ভিন্ন | হস্তী (হস্ত+ইন্ = হাতওয়ালা, কিন্তু অর্থ হাতি) |
যোগরূঢ় শব্দ | সমাসবদ্ধ শব্দ যার অর্থ মূল শব্দের অর্থের সাথে যুক্ত | পঙ্কজ = কাদায় জন্মে, অর্থ পদ্মফুল |
◈ (গ) পদ প্রকরণ (Parts of Speech)
বাক্যে শব্দ যখন ব্যবহৃত হয় তখন তাকে পদ বলে। বাংলা ব্যাকরণে পদকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়:
পদের নাম | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
বিশেষ্য (Noun) | যে পদ কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, ভাব বা গুণের নাম বোঝায় | রহিম, ঢাকা, বই, সততা, দুধ |
বিশেষণ (Adjective) | যে পদ বিশেষ্য বা সর্বনামের দোষ-গুণ-পরিমাণ প্রকাশ করে | ভালো মানুষ, লাল গোলাপ, পাঁচটি বই |
সর্বনাম (Pronoun) | বিশেষ্যের পরিবর্তে ব্যবহৃত পদ | আমি, তুমি, সে, আপনি, এ, ও |
ক্রিয়া (Verb) | যে পদে কাজ বা অবস্থা বোঝায় | পড়া, লেখা, যাওয়া, আসা, আছে |
অব্যয় (Indeclinable) | যে পদের বিভক্তি হয় না বা রূপান্তর হয় না | এবং, কিন্তু, যদি, কারণ, ওহে |
◈ (ঘ) কারক ও বিভক্তি
বাক্যে ক্রিয়ার সাথে বিশেষ্য বা সর্বনামের সম্পর্ককে কারক বলে। বাংলায় ছয়টি কারক আছে: কর্তৃকারক, কর্মকারক, করণকারক, সম্প্রদান কারক, অপাদান কারক ও অধিকরণ কারক। |
কারক | সংজ্ঞা | বিভক্তি | উদাহরণ |
কর্তৃকারক | ক্রিয়ার কর্তা | শূন্য/এ/রা | রহিম পড়ে। |
কর্মকারক | ক্রিয়ার কর্ম | কে/রে | রহিম বইটি পড়ে। |
করণকারক | ক্রিয়ার উপকরণ | দিয়ে/দ্বারা | কলম দিয়ে লিখি। |
সম্প্রদান কারক | যাকে দান করা হয় | কে/রে | ভিক্ষুককে ভিক্ষা দাও। |
অপাদান কারক | যেখান থেকে বিচ্যুতি | থেকে/হতে | গাছ থেকে ফল পড়ে। |
অধিকরণ কারক | ক্রিয়ার স্থান-কাল | এ/তে/য় | ঘরে থাকি। |
◈ (ঙ) সমাস
পরস্পর সম্পর্কযুক্ত দুই বা ততোধিক পদ মিলে একটি নতুন পদ গঠন করলে তাকে সমাস বলে। সমাসের মাধ্যমে ভাষা সংক্ষিপ্ত ও সাবলীল হয়। |
সমাসের প্রকার | সংক্ষিপ্ত পরিচয | উদাহরণ |
দ্বন্দ্ব সমাস | উভয় পদই প্রধান | মাতা-পিতা, ভালো-মন্দ, দেশ-বিদেশ |
কর্মধারয় সমাস | বিশেষণ + বিশেষ্য | নীলাকাশ, মহাপুরুষ, ক্ষুদ্রাকার |
তৎপুরুষ সমাস | পরের পদের অর্থ প্রধান | রাজপুত্র, ধানক্ষেত, গৃহপ্রবেশ |
বহুব্রীহি সমাস | কোনো পদের অর্থ নয়, তৃতীয় অর্থ | দশানন (দশটি আনন যার = রাবণ) |
দ্বিগু সমাস | সংখ্যাবাচক পূর্বপদ | ত্রিভুজ, সপ্তাহ, চতুর্ভুজ |
অব্যয়ীভাব সমাস | অব্যয় পূর্বপদ | প্রতিদিন, উপকূল, অনুক্ষণ |
◈ (চ) প্রকৃতি ও প্রত্যয়
শব্দের মূল অংশকে প্রকৃতি এবং প্রকৃতির সাথে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠনকারী অংশকে প্রত্যয় বলে। প্রকৃতি দুই প্রকার: নাম-প্রকৃতি ও ক্রিয়া-প্রকৃতি (ধাতু)। |
প্রকৃতি-প্রত্যয়ের উদাহরণ | √পড় + আ = পড়া। √লিখ্ + ক = লেখক। √শিক্ষা + ক = শিক্ষক। ফুল + এলা = ফুলেলা। |
বিশ্লেষণ | ধাতু বা নাম-প্রকৃতির সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ তৈরি হয়। |
◈ (ছ) উপসর্গ
যেসব শব্দাংশ শব্দের পূর্বে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থ প্রদান করে বা অর্থের পরিবর্তন ঘটায়, তাদের উপসর্গ বলে। বাংলায় তিন ধরনের উপসর্গ আছে: সংস্কৃত, বাংলা ও বিদেশি উপসর্গ। |
উপসর্গের ধরন | উদাহরণ |
সংস্কৃত উপসর্গ (২০টি) | প্র-গতি, অনু-কূল, অব-নতি, সু-নাম, বি-বাদ, নির-দোষ |
বাংলা উপসর্গ (২১টি) | আ-কাটা, কু-কাজ, না-বালক, ভর-পেট, রাম-ছাগল |
বিদেশি উপসর্গ | আরবি: আল-আমিন, গর-হাজির। ফারসি: বে-কার, না-মাজ, হর-তাল |
◈ (জ) লিঙ্গ, বচন ও পুরুষ
ব্যাকরণিক বিষয় | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
লিঙ্গ | ব্যাকরণিক স্ত্রী-পুরুষ ভেদ | ছাত্র/ছাত্রী, রাজা/রাণী, বাঘ/বাঘিনী |
বচন | সংখ্যার বোধক রূপান্তর | বই/বইগুলো, ছাত্র/ছাত্ররা, পাখি/পাখিরা |
পুরুষ | বক্তা-শ্রোতা-বিষয়ের ভেদ | আমি (উত্তম), তুমি (মধ্যম), সে (নাম) |
📝 বিশেষ দ্রষ্টব্য: শব্দতত্ত্বে আরও আলোচিত হয়: ক্রিয়ার কাল, পক্ষ, কাল-ক্রম, ধাতুরূপ, অনুসর্গ ইত্যাদি। |
৬.৩ বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম (Syntax) |
সংজ্ঞা ও পরিচিতি |
ব্যাকরণের যে বিভাগে বাক্যের গঠন, উপাদান, পদক্রম, খণ্ডবাক্য এবং বাক্যের প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করা হয়, তাকে বাক্যতত্ত্ব বা পদক্রম বলে। |
বাক্যতত্ত্বের আলোচ্য উপবিষয়সমূহ |
◈ (ক) বাক্যের সংজ্ঞা ও গুণ
যে পদ বা পদসমষ্টি দ্বারা মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় তাকে বাক্য বলে। বাক্যের তিনটি অপরিহার্য গুণ: আকাঙ্ক্ষা, আসত্তি ও যোগ্যতা। |
◈ (খ) বাক্যের প্রকারভেদ
গঠন অনুযায়ী বাক্য তিন প্রকার: (১) সরল বাক্য — একটিমাত্র সমাপিকা ক্রিয়া। (২) জটিল বাক্য — প্রধান ও আশ্রিত খণ্ডবাক্য। (৩) যৌগিক বাক্য — দুই বা তার বেশি স্বাধীন খণ্ডবাক্য।
অর্থ অনুযায়ী বাক্য পাঁচ প্রকার: বিবৃতিমূলক, প্রশ্নবোধক, অনুজ্ঞামূলক, বিস্ময়বোধক ও ইচ্ছামূলক বাক্য।
◈ (গ) উদ্দেশ্য ও বিধেয়
বিশ্লেষণ | রহিম বই পড়ে। |
বিশ্লেষণ | উদ্দেশ্য = রহিম (যার সম্পর্কে বলা হচ্ছে)। বিধেয় = বই পড়ে (যা বলা হচ্ছে)। |
◈ (ঘ) বাচ্য
বাচ্য | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
কর্তৃবাচ্য | ক্রিয়া কর্তার অনুসারী | রহিম বই পড়ে। |
কর্মবাচ্য | ক্রিয়া কর্মের অনুসারী | রহিম কর্তৃক বই পড়া হয়। |
ভাববাচ্য | ক্রিয়ার ভাব প্রধান | এখন পড়া যাচ্ছে না। |
কর্মকর্তৃবাচ্য | কর্ম কর্তার ভূমিকা পালন করে | বইটি পড়া হয়ে গেছে। |
◈ (ঙ) উক্তি পরিবর্তন
বক্তার কথা হুবহু বলা হলে প্রত্যক্ষ উক্তি এবং পরিবর্তিত রূপে বলা হলে পরোক্ষ উক্তি। উক্তি পরিবর্তনে বাক্যের পুরুষ, কাল ও ক্রিয়ারূপ পরিবর্তিত হয়। |
◈ (চ) বাক্যের রূপান্তর
রূপান্তরের উদাহরণ | সরল → জটিল: 'পরিশ্রমীরা সফল হয়।' → 'যে পরিশ্রম করে, সে সফল হয়।' |
বিশ্লেষণ | একই অর্থ প্রকাশ করে বিভিন্ন কাঠামোর বাক্যে রূপান্তর করা যায়। |
📝 বিশেষ দ্রষ্টব্য: বাক্যতত্ত্বে আরও আলোচিত হয়: বাক্যের অর্থ, খণ্ডবাক্য, বাক্যশুদ্ধি, বিরামচিহ্ন ইত্যাদি। |
৬.৪ অর্থতত্ত্ব (Semantics) |
সংজ্ঞা ও পরিচিতি |
ব্যাকরণের যে বিভাগে শব্দ, বাক্যাংশ ও বাক্যের অর্থ নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়, তাকে অর্থতত্ত্ব বলে। শব্দের অর্থের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, সংকোচ এবং বিভিন্ন প্রয়োগ অর্থতত্ত্বে আলোচিত হয়। |
অর্থতত্ত্বের আলোচ্য উপবিষয়সমূহ |
◈ (ক) শব্দের মূল অর্থ ও ব্যাবহারিক অর্থ
মূল অর্থ (Denotation) | ব্যাবহারিক অর্থ (Connotation) |
শব্দের সরাসরি বা আক্ষরিক অর্থ। যে অর্থে শব্দটি সাধারণত অভিধানে পাওয়া যায়। যেমন: 'সাপ' মানে একটি বিশেষ সরীসৃপ। | শব্দের আবেগময় বা প্রাসঙ্গিক অর্থ। সমাজ ও সংস্কৃতিতে ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত অতিরিক্ত অর্থ। যেমন: 'সাপ' মানে বিশ্বাসঘাতক বা ধূর্ত ব্যক্তি। |
◈ (খ) অর্থের পরিবর্তন
পরিবর্তনের ধরন | সংজ্ঞা | উদাহরণ |
অর্থ-সম্প্রসারণ | মূল অর্থের চেয়ে ব্যাপকতর হওয়া | 'মৃগ' আগে শুধু হরিণ, এখন যেকোনো পশু |
অর্থ-সংকোচন | মূল অর্থের চেয়ে সংকুচিত হওয়া | 'পাখি' আগে সব উড়তে পারে; এখন শুধু পাখি |
অর্থের উন্নতি | হীন অর্থ থেকে উচ্চ অর্থে পরিণত হওয়া | 'সৈনিক' আগে ভাড়াটে; এখন সম্মানসূচক |
অর্থের অবনতি | উচ্চ অর্থ থেকে হীন অর্থে পরিণত হওয়া | 'পাজি' আগে পণ্ডিত; এখন দুষ্ট অর্থে |
◈ (গ) সমার্থক ও বিপরীতার্থক শব্দ
সমার্থক শব্দ | চন্দ্র = চাঁদ = শশী = হিমাংশু = রজনীকান্ত = নিশাকর। |
বিশ্লেষণ | একই অর্থ প্রকাশ করে এমন বিভিন্ন শব্দ। |
বিপরীতার্থক শব্দ | ভালো ↔ মন্দ, সুখ ↔ দুঃখ, আলো ↔ আঁধার, সত্য ↔ মিথ্যা। |
বিশ্লেষণ | পরস্পর বিপরীত অর্থ প্রকাশকারী শব্দ। |
◈ (ঘ) বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচন
বাগধারা হলো এমন শব্দ-সমষ্টি যার আক্ষরিক অর্থের চেয়ে প্রচলিত বা ব্যঞ্জনামূলক অর্থ ভিন্ন। প্রবাদ-প্রবচন হলো জনপ্রিয় উক্তি যাতে জীবনসত্য নিহিত থাকে। |
বাগধারা | অর্থ |
অন্ধকারে ঢিল মারা | আন্দাজে কাজ করা |
আকাশ কুসুম | অসম্ভব কল্পনা |
উনিশ-বিশ | সামান্য পার্থক্য |
কান পাতল | গোপন কথা ফাঁস করা |
গায়ে পড়া | অকারণে ঝামেলায় জড়ানো |
ঘোড়ার ডিম | অসম্ভব বস্তু |
❖ বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস ❖ |
৭. বাংলা ব্যাকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস |
বাংলা ব্যাকরণ রচনার ইতিহাস প্রায় পাঁচশত বছরের পুরনো। প্রথমে বিদেশি মিশনারিরা বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন। পরে বাঙালি পণ্ডিতরা এই ক্ষেত্রে অবদান রাখেন। |
বছর রচয়িতা / ঘটনা বিশেষ তথ্য | ||
১৭৩৪ খ্রি. | মানুয়েল দা আস্সুম্পসাঁও (পর্তুগিজ) | প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন — ভোকাবুলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা |
১৭৭৮ খ্রি. | ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড (ইংরেজ) | A Grammar of the Bengal Language — মুদ্রিত প্রথম বাংলা ব্যাকরণ |
১৮০১ খ্রি. | উইলিয়াম কেরি (ইংরেজ মিশনারি) | A Grammar of the Bengali Language রচনা করেন |
১৮৩৩ খ্রি. | রাজা রামমোহন রায় | প্রথম বাঙালি কর্তৃক বাংলা ব্যাকরণ — 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ' |
১৮৫৫ খ্রি. | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর | ব্যাকরণ কৌমুদী প্রকাশিত |
১৮৬০ খ্রি. | মহারাজ মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দী | বাংলা ভাষার উৎকর্ষে ভূমিকা |
১৯৩৮ খ্রি. | ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ | বাংলা ব্যাকরণ রচনা — আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে |
১৯৭২ খ্রি. | বাংলা একাডেমি | প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ প্রকাশের উদ্যোগ |
⚡ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা: মানুয়েল দা আস্সুম্পসাঁও (পর্তুগিজ মিশনারি), ১৭৩৪ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম মুদ্রিত বাংলা ব্যাকরণ: ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড, ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে। প্রথম বাঙালি রচিত বাংলা ব্যাকরণ: রাজা রামমোহন রায়ের 'গৌড়ীয় ব্যাকরণ', ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে। |
৮. বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও পরিচয় |
৮.১ ভাষা পরিবার |
বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এই গোষ্ঠীর ভারতীয় শাখার নাম ইন্দো-ইরানীয়, যার একটি উপশাখা হলো ইন্দো-আর্য। বাংলা এই ইন্দো-আর্য শাখার একটি আধুনিক ভাষা। |
স্তর | ভাষার নাম |
ভাষাগোষ্ঠী | ইন্দো-ইউরোপীয় |
শাখা | ইন্দো-ইরানীয় |
উপশাখা | ইন্দো-আর্য |
প্রাচীন স্তর | বৈদিক ও সংস্কৃত |
মধ্য স্তর | প্রাকৃত ও পালি |
অপভ্রংশ স্তর | অপভ্রংশ ও অবহট্ট |
আধুনিক স্তর | বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া, ওড়িয়া ইত্যাদি |
৮.২ বাংলা ভাষার বিকাশের ধাপ |
কালপর্ব | সময়কাল | বৈশিষ্ট্য |
প্রাচীন বাংলা | ৯০০–১২০০ খ্রি. | চর্যাপদের ভাষা — সন্ধ্যা ভাষায় রচিত |
মধ্য বাংলা | ১২০০–১৮০০ খ্রি. | মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, অনুবাদ সাহিত্য |
আধুনিক বাংলা | ১৮০০ – বর্তমান | গদ্যের বিকাশ, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা |
বাংলা ভাষার বিশেষ পরিচয় |
বাংলা পৃথিবীর ৬ষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। বক্তার সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এই ভাষা প্রচলিত। বাংলা বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা এবং একমাত্র ভাষার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। |
৯. ব্যাকরণ ও ভাষার পারস্পরিক সম্পর্ক |
ব্যাকরণ ও ভাষার মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। ভাষা আগে আসে, ব্যাকরণ পরে। মানুষ প্রথমে ভাষা ব্যবহার করে, পরে পণ্ডিতরা সেই ভাষার নিয়মকানুন বিশ্লেষণ করে ব্যাকরণ রচনা করেন। |
ভাষার বৈশিষ্ট্য | ব্যাকরণের বৈশিষ্ট্য |
ভাষা স্বাভাবিকভাবে গড়ে ওঠে। ভাষা পরিবর্তনশীল। ভাষা ব্যাকরণের আগে। সমাজের সব মানুষ ভাষা ব্যবহার করেন। ভাষা জীবন্ত ও প্রবাহমান। | ব্যাকরণ পণ্ডিতকৃত বিশ্লেষণ। ব্যাকরণ অপেক্ষাকৃত স্থির। ব্যাকরণ ভাষার পরে। ব্যাকরণ ভাষাবিদ কর্তৃক রচিত। ব্যাকরণ বর্ণনামূলক বা নিয়ামক। |
📝 বিশেষ দ্রষ্টব্য: একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়: ব্যাকরণ ভাষা তৈরি করে না, বরং ভাষার নিয়ম বিশ্লেষণ করে। ভাষার পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যাকরণও পরিবর্তিত হয়। |
❖ পরীক্ষা-প্রস্তুতিমূলক সারসংক্ষেপ ❖ |
১০. পরীক্ষামুখী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
১০.১ সংজ্ঞা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
বিষয় | গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
ব্যাকরণ শব্দের ব্যুৎপত্তি | বি + আ + √কৃ + অন = ব্যাকরণ (বিশেষভাবে বিশ্লেষণ) |
ব্যাকরণের ইংরেজি | Grammar (গ্রিক Gramma থেকে) |
শহীদুল্লাহ্-র সংজ্ঞা | শুদ্ধরূপে লিখতে, পড়তে ও বলতে পারা যায় |
ব্যাকরণের প্রধান বিষয় | ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব |
প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা | মানুয়েল দা আস্সুম্পসাঁও, ১৭৩৪ খ্রি. |
প্রথম বাঙালি ব্যাকরণবিদ | রাজা রামমোহন রায় ('গৌড়ীয় ব্যাকরণ', ১৮৩৩) |
বাংলা ভাষার উৎস | ইন্দো-ইউরোপীয় → ইন্দো-আর্য → প্রাকৃত → বাংলা |
পদের সংখ্যা | পাঁচটি: বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া, অব্যয় |
কারকের সংখ্যা | ছয়টি: কর্তৃ, কর্ম, করণ, সম্প্রদান, অপাদান, অধিকরণ |
সমাসের প্রকার | দ্বন্দ্ব, তৎপুরুষ, কর্মধারয়, বহুব্রীহি, দ্বিগু, অব্যয়ীভাব |
১০.২ মনে রাখার সহজ সূত্র |
সহজ স্মৃতিসহায়ক সূত্র |
ব্যাকরণের ৪টি বিষয়: 'ধ-শ-বা-অ' → ধ্বনিতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব, অর্থতত্ত্ব। পদের ৫ প্রকার: 'বি-সর্ব-বিশে-ক্রি-অব্য' → বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া, অব্যয়। কারকের ৬ প্রকার: 'কর্তা-কর্ম-করণ-সম্প্র-অপা-অধিকরণ'। বাচ্যের ৪ প্রকার: 'কর্তৃ-কর্ম-ভাব-কর্মকর্তৃ'। বাক্যের ৩ গুণ: 'আকাঙ্ক্ষা-আসত্তি-যোগ্যতা'। |