ণ-ত্ব বিধান
তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ণ-এর শুদ্ধ প্রয়োগবিধির বিশদ আলোচনা
১. ভূমিকা
বাংলা বানানে ন ও ণ-এই দুই বর্ণের ব্যবহার অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বিভ্রান্তিকর। উচ্চারণে অনেক সময় এদের পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না, কিন্তু বানানে পার্থক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তৎসম বা সংস্কৃতমূল শব্দে কোথায় দন্ত্য ন (ন) হবে আর কোথায় মূর্ধন্য ণ (ণ) হবে-তার যে নিয়ম, তাকে বলা হয় ণ-ত্ব বিধান।
বাংলা ভাষার দেশি, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দে সাধারণত এই বিধান প্রযোজ্য নয়। এটি মূলত তৎসম শব্দের শুদ্ধ বানান রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।
২. ণ-ত্ব বিধান কী
যে নিয়মে তৎসম শব্দে দন্ত্য 'ন' পরিবর্তিত হয়ে মূর্ধন্য 'ণ' হয়, তাকে ণ-ত্ব বিধান বলে।
সহজ ভাষায় বললে, কিছু নির্দিষ্ট ধ্বনি বা বর্ণের প্রভাবে শব্দের মধ্যে থাকা ন বদলে ণ হয়। অর্থাৎ, সব ন কখনোই ণ হবে না; আবার সব ক্ষেত্রেই ন থাকবে এমনও নয়। কোথায় কোনটি হবে, তা নির্ভর করে নির্দিষ্ট ব্যাকরণগত নিয়মের উপর।
বর্ণ | উচ্চারণস্থান | প্রকৃতি | প্রযোজ্য ক্ষেত্র |
মূর্ধন্য ণ | মূর্ধা/তালু | মূর্ধন্য ধ্বনি | তৎসম শব্দে নির্দিষ্ট নিয়মে |
দন্ত্য ন | দন্তমূল/দাঁত | দন্ত্য ধ্বনি | সব ধরনের শব্দে সাধারণভাবে |
৩. ধ্বনিগত ভিত্তি
ণ-ত্ব বিধানের পেছনে গভীর ধ্বনিগত কারণ রয়েছে। ণ হলো মূর্ধন্য ধ্বনি এবং ন হলো দন্ত্য ধ্বনি।
মূর্ধন্য ধ্বনি উচ্চারণ করতে জিহ্বার অগ্রভাগ মূর্ধা বা তালুর সামনের উঁচু অংশে ওঠে।
দন্ত্য ধ্বনি উচ্চারণে জিহ্বা দাঁতের গোড়ার দিকে লাগে।
এই কারণে যেসব ধ্বনি মূর্ধন্য প্রকৃতির, তাদের প্রভাবে পরবর্তী ন অনেক সময় ণ হয়ে যায়। তাই র, ঋ, ষ-এর প্রভাব বা ট-বর্গীয় ধ্বনির সান্নিধ্যে ন → ণ রূপান্তর ঘটে।
৪. কোথায় ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য
🔑 অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: ণ-ত্ব বিধান মূলত তৎসম শব্দে প্রযোজ্য। খাঁটি বাংলা শব্দে → প্রযোজ্য নয় তদ্ভব শব্দে → প্রযোজ্য নয় আরবি-ফারসি-ইংরেজি ইত্যাদি বিদেশি শব্দে → প্রযোজ্য নয় তাই 'জার্মান', 'ফরমান', 'কোরআন' ইত্যাদি শব্দে ণ বসবে না। |
৫. ণ-ত্ব বিধানের প্রধান নিয়মসমূহ
নিয়ম ১: ট-বর্গের আগে ন → ণ
যখন ন-এর পরে ট, ঠ, ড, ঢ প্রভৃতি ট-বর্গীয় ধ্বনি আসে, তখন সাধারণত ন → ণ হয়। কারণ ট-বর্গীয় ধ্বনিগুলো মূর্ধন্য প্রকৃতির এবং তাদের প্রভাবে পূর্ববর্তী ন মূর্ধন্য হয়ে পড়ে।
নিয়ম ১ | ট-বর্গের (ট, ঠ, ড, ঢ) আগে ন এলে → সেই ন → ণ হয় 📝 মনে রাখুন: ট-বর্গের আগে → ণ; ত-বর্গের আগে → ন |
ট-বর্গের আগে ণ - উদাহরণ | |
ঘণ্টা | ণ্ট - ট-বর্গের আগে ণ হয়েছে (ঘণ্টা = bell/hour) |
কণ্ঠ | ণ্ঠ - ঠ-এর আগে ণ (কণ্ঠ = throat) |
খণ্ড | ণ্ড - ড-এর আগে ণ (খণ্ড = piece/part) |
বণ্টন | ণ্ট - ট-এর আগে ণ; কিন্তু শেষের ন থাকে কারণ সেটি ট-বর্গের আগে নেই |
লুণ্ঠন | ণ্ঠ - ঠ-এর আগে ণ (লুণ্ঠন = plunder) |
বিশ্লেষণ | ষণ - ষ-এর পরে ণ (বিশ্লেষণ) |
মণ্ডল | ণ্ড - ড-এর আগে ণ (মণ্ডল = region) |
কাণ্ড | ণ্ড - ড-এর আগে ণ (কাণ্ড = incident) |
প্রচণ্ড | ণ্ড - ড-এর আগে ণ (প্রচণ্ড = fierce) |
লণ্ঠন | ণ্ঠ - ঠ-এর আগে ণ (লণ্ঠন = lantern) |
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ: অনেক সময় শিক্ষার্থীরা শব্দের এক জায়গায় ণ দেখে পুরো শব্দেই ণ বসিয়ে দেন, যা ভুল। যেমন 'বণ্টন'-এ শেষে 'ন' থাকবে কারণ সেই ন-এর পরে ট-বর্গ নেই।
নিয়ম ২: ঋ, র, ষ-এর পরে সরাসরি ন এলে → ণ
কোনো তৎসম শব্দে ঋ, র, বা ষ-এর পরে যদি সরাসরি ন আসে, তবে সেই ন সাধারণত ণ হয়ে যায়। এটি ণ-ত্ব বিধানের সবচেয়ে পরিচিত ও মৌলিক নিয়ম।
নিয়ম ২ | তৎসম শব্দে ঋ / র / ষ-এর পরে ন এলে → সেই ন → ণ হয় 📝 স্মরণসূত্র: ঋ-র-ষ দেখলে পরে ণ খুজুন |
ঋ-এর পরে ণ | |
ঋণ | ঋ-এর পরে ণ (debt/loan) |
তৃণ | তৃ = ত+ঋ-কার; ঋ-কারের পরে ণ (grass) |
ঘৃণা | ঘৃ = ঘ+ঋ-কার; ঋ-কারের পরে ণ (hatred) |
মৃণাল | মৃ-এর পরে ণ (lotus stalk) |
ঋণী | ঋ-এর পরে ণ (debtor) |
র-এর পরে ণ | |
বর্ণ | র-এর পরে ণ (letter/color) |
কর্ণ | র-এর পরে ণ (ear; also a name) |
হরণ | র-এর পরে ণ (taking away) |
বরণ | র-এর পরে ণ (welcoming) |
তরণী | র-এর পরে ণ (boat) |
ষ-এর পরে ণ | |
বিষ্ণু | ষ-এর পরে ণ (Vishnu) |
কৃষ্ণ | ষ-এর পরে ণ (Krishna) |
ভূষণ | ষ-এর পরে ণ (ornament) |
দূষণ | ষ-এর পরে ণ (pollution) |
শোষণ | ষ-এর পরে ণ (exploitation) |
নিয়ম ৩: ঋ, র, ষ-এর পর মাঝখানে বিশেষ বর্ণ থাকলেও পরের ন → ণ
অনেক সময় ঋ, র, ষ-এর পর সরাসরি ন আসে না। মাঝখানে অন্য কিছু বর্ণ থাকে। তবুও পরবর্তী ন অনেক ক্ষেত্রে ণ হয়ে যায়।
নিয়ম ৩ | ঋ / র / ষ + (স্বরবর্ণ / ক-বর্গ / প-বর্গ / য / ব / হ / ং) + ন = ণ 📝 মাঝখানে এই বর্ণগুলির যেকোনো একটি থাকলেই পরের ন → ণ হবে |
মাঝে বর্ণ থাকলেও ণ - উদাহরণ | |
হরিণ | র + ি (স্বর) + ণ → হরিণ (deer) |
কৃপণ | ঋ-কার + প (প-বর্গ) + ণ → কৃপণ (miser) |
অর্পণ | র + প (প-বর্গ) + ণ → অর্পণ (offering) |
গ্রহণ | র + হ + ণ → গ্রহণ (receiving) |
লক্ষণ | ষ (ক্ষ-তে) + ণ → লক্ষণ (sign/symptom) |
পাষাণ | ষ + আ (স্বর) + ণ → পাষাণ (stone) |
নির্বাণ | র + ব + ণ → নির্বাণ (nirvana) |
কারণ | র + অ (স্বর) + ণ → কারণ (reason) |
চরণ | র + অ (স্বর) + ণ → চরণ (foot) |
মরণ | র + অ (স্বর) + ণ → মরণ (death) |
শরণ | র + অ (স্বর) + ণ → শরণ (refuge) |
ধারণ | র + অ (স্বর) + ণ → ধারণ (holding) |
পূরণ | র + অ (স্বর) + ণ → পূরণ (fulfillment) |
নিয়ম ৪: উপসর্গযুক্ত তৎসম শব্দে ন → ণ
কিছু তৎসম শব্দে প্র, পরা, পরি, নির্ ইত্যাদি উপসর্গ যুক্ত হলে ন পরিবর্তিত হয়ে ণ হয়। কারণ এই উপসর্গে 'র' আছে, যার প্রভাবে পরের ন → ণ হয়।
নিয়ম ৪ | প্র, পরা, পরি, নির্ ইত্যাদি উপসর্গের পরে ন এলে → ণ হয় (উপসর্গে র থাকার কারণে) |
উপসর্গের পরে ণ - উদাহরণ | |
প্রণাম | প্র (র আছে) + নাম → প্রণাম (salutation) |
পরিণাম | পরি (র আছে) + নাম → পরিণাম (consequence) |
পরিণতি | পরি (র আছে) + নতি → পরিণতি (outcome) |
প্রণাশ | প্র + নাশ → প্রণাশ (destruction) |
নির্ণয় | নির্ (র আছে) + নয় → নির্ণয় (determination) |
প্রণিধান | প্র + নিধান → প্রণিধান (contemplation) |
প্রণিপাত | প্র + নিপাত → প্রণিপাত (prostration) |
পরিণয় | পরি + নয় → পরিণয় (marriage) |
প্রণালী | প্র + নালী → প্রণালী (method/strait) |
প্রণোদনা | প্র + নোদনা → প্রণোদনা (incentive) |
নিয়ম ৫: স্বভাবগতভাবে ণ হয় এমন শব্দ
কিছু শব্দ আছে যেগুলোতে র, ঋ, ষ-এর প্রভাব সরাসরি বোঝা না গেলেও প্রচলিত তৎসম রূপে ণ-ই শুদ্ধ। এই ধরনের শব্দ আলাদা করে মনে রাখা প্রয়োজন।
নিয়ম ৫ | কিছু তৎসম শব্দে স্বভাবগতভাবেই ণ হয় - এগুলো মুখস্থ রাখতে হবে 📝 এই শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের ঐতিহাসিক নিয়মে ণ পেয়েছে। |
স্বভাবগত ণ - গুরুত্বপূর্ণ শব্দ | |
কণা | অণু-কণা (particle) |
গৌণ | গৌণ/অপ্রধান (secondary) |
নিপুণ | দক্ষ (skilled) |
বাণী | কথা/বক্তৃতা (speech) |
বীণা | বাদ্যযন্ত্র (veena/lute) |
মণি | রত্ন (gem) |
বাণিজ্য | ব্যবসা (commerce) |
রাণী | রানি (queen) |
গণনা | সংখ্যা গোনা (counting) |
পণ্য | পণ্যদ্রব্য (commodity) |
বণিক | ব্যবসায়ী (merchant) |
কল্যাণ | মঙ্গল (welfare/well-being) |
৬. কোথায় ণ-ত্ব বিধান খাটে না
শুধু কোথায় ণ হবে তা জানলেই হবে না-কোথায় ণ হবে না তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
নিষেধ ১: ত-বর্গের আগে ণ হয় না
ত, থ, দ, ধ-এই ত-বর্গীয় ধ্বনির আগে সাধারণত ণ হয় না; সেখানে ন-ই থাকে।
নিষেধ ১ | ত-বর্গের (ত, থ, দ, ধ) আগে ণ হয় না - সেখানে সবসময় দন্ত্য ন থাকে ⚠️ তুলনা: ট-বর্গের আগে → ণ; ত-বর্গের আগে → ন |
শব্দ | বিশ্লেষণ | কারণ |
গ্রন্থ | ন্থ - থ ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
বৃন্ত | ন্ত - ত ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
বৃন্দ | ন্দ - দ ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
ক্রন্দন | ন্দ - দ ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
বন্ধন | ন্ধ - ধ ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
গন্ধ | ন্ধ - ধ ত-বর্গীয় | ত-বর্গের আগে ন থাকে |
নিষেধ ২: বাংলা ক্রিয়াপদে সাধারণত ণ হয় না
বাংলা ক্রিয়াপদে ভেতরের ন সাধারণত ণ হয় না।
নিষেধ ২ | বাংলা ক্রিয়াপদে র/ঋ/ষ থাকলেও পরের ন → ণ হয় না - ন-ই থাকে |
❌ ভুল বানান | ✔ শুদ্ধ বানান |
করেণ (ভুল) | করেন (শুদ্ধ) |
ধরেণ (ভুল) | ধরেন (শুদ্ধ) |
মারেণ (ভুল) | মারেন (শুদ্ধ) |
যাবেণ (ভুল) | যাবেন (শুদ্ধ) |
খাবেণ (ভুল) | খাবেন (শুদ্ধ) |
নিবেণ (ভুল) | নিবেন (শুদ্ধ) |
নিষেধ ৩: বিদেশি শব্দে ণ হয় না
আরবি, ফারসি, তুর্কি, ইংরেজি বা অন্য বিদেশি উৎসের শব্দে সাধারণত ণ-ত্ব বিধান খাটে না।
নিষেধ ৩ | আরবি/ফারসি/তুর্কি/ইংরেজি বিদেশি শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয় |
❌ ভুল বানান | ✔ শুদ্ধ বানান |
জার্মাণ (ভুল) | জার্মান (শুদ্ধ) |
ফরমাণ (ভুল) | ফরমান (শুদ্ধ) |
নিশাণ (ভুল) | নিশান (শুদ্ধ) |
জবাণ (ভুল) | জবান (শুদ্ধ) |
কোরআণ (ভুল) | কোরআন (শুদ্ধ) |
রিপণ (ভুল) | রিপন (শুদ্ধ) |
নিষেধ ৪: সমাসে এক পদের র/ঋ/ষ অন্য পদের ন-কে সবসময় ণ করে না
সমাসবদ্ধ বা যুক্ত শব্দে পূর্বপদে র/ঋ/ষ থাকলেই পরপদের ন সবসময় ণ হয়ে যায় না। অনেক ক্ষেত্রে দুই পদের স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে, তাই ণ-ত্ব হয় না।
নিষেধ ৪ | সমাসে দুটি পৃথক পদের সীমা অতিক্রম করে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য হয় না |
❌ ভুল বানান | ✔ শুদ্ধ বানান |
দুর্ণাম (ভুল) | দুর্নাম (শুদ্ধ) - দুর্+নাম, পৃথক পদ |
মৃগণাভি (ভুল) | মৃগনাভি (শুদ্ধ) - মৃগ+নাভি, পৃথক পদ |
ত্রিণেত্র (ভুল) | ত্রিনেত্র (শুদ্ধ) - ত্রি+নেত্র, পৃথক পদ |
সর্বণাম (ভুল) | সর্বনাম (শুদ্ধ) - সর্ব+নাম, পৃথক পদ |
দুর্ণীতি (ভুল) | দুর্নীতি (শুদ্ধ) - দুর্+নীতি, পৃথক পদ |
৭. ণ-ত্ব বিধান বোঝার সহজ সূত্র
সূত্র ১ - র / ঋ / ষ-এর প্রভাব থাকলে ন → ণ হতে পারে সূত্র ২ - ট-বর্গের (ট/ঠ/ড/ঢ) আগে ন → ণ সূত্র ৩ - ত-বর্গের (ত/থ/দ/ধ) আগে ন → ন-ই থাকবে সূত্র ৪ - দেশি, চলিত, বিদেশি ও ক্রিয়াপদে ণ বসানোর আগে খুব সতর্ক হতে হবে |
৮. ন ও ণ পার্থক্য বোঝার কৌশল
উচ্চারণে যখন পার্থক্য কম শোনা যায়, তখন শব্দের উৎপত্তি, গঠন এবং বর্ণসংযোগ দেখে সঠিক বানান নির্ধারণ করতে হবে।
ধাপ | যা দেখতে হবে | ফলাফল |
ধাপ ১ | শব্দটি তৎসম কি না? | তৎসম হলে পরের ধাপে যান |
ধাপ ২ | শব্দে র / ঋ / ষ আছে কি? | থাকলে পরের ন → ণ হওয়ার সম্ভাবনা |
ধাপ ৩ | ন-এর পরে ট-বর্গ আছে কি? | থাকলে সেই ন → ণ হবে |
ধাপ ৪ | ন-এর পরে ত-বর্গ আছে কি? | থাকলে ন-ই থাকবে, ণ হবে না |
ধাপ ৫ | শব্দটি বিদেশি কি? | বিদেশি হলে সবসময় ন |
ধাপ ৬ | এটি কি বাংলা ক্রিয়াপদ? | ক্রিয়াপদ হলে সাধারণত ন |
৯. বহুল প্রচলিত ভুল ও শুদ্ধ রূপ
নিচে পরীক্ষায় বারবার আসে এমন বানান ভুল ও শুদ্ধ রূপ দেওয়া হলো:
❌ ভুল বানান | ✔ শুদ্ধ বানান |
লক্ষন | লক্ষণ |
প্রনাম | প্রণাম |
বন্টন | বণ্টন |
অর্পন | অর্পণ |
পরিনাম | পরিণাম |
পরিনতি | পরিণতি |
গ্রণ্ঠ | গ্রন্থ |
জার্মাণ | জার্মান |
দুর্ণাম | দুর্নাম |
দুর্ণীতি | দুর্নীতি |
নির্নয় | নির্ণয় |
পরিনয় | পরিণয় |
নিপুন | নিপুণ |
বানিজ্য | বাণিজ্য |
কল্যান | কল্যাণ |
১০. বিশ্লেষণসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ
শব্দ | বিশ্লেষণ | শুদ্ধ রূপ |
লক্ষণ | ক্ষ-তে ষ-এর প্রভাব আছে → পরে ণ হয়েছে | লক্ষণ ✔ |
অর্পণ | র আছে, পরে প-বর্গীয় প, তারপর ন → ণ হয়েছে | অর্পণ ✔ |
বণ্টন | ণ্ট - ট-বর্গের আগে ণ; কিন্তু শেষে ন কারণ সেখানে ট-বর্গ নেই | বণ্টন ✔ |
গ্রন্থ | ন-এর পরে থ (ত-বর্গীয়) → ণ হয় না, ন-ই থাকে | গ্রন্থ ✔ |
দুর্নাম | সমাসবদ্ধ - দুর্+নাম, পৃথক পদ → ণ-ত্ব হয় না | দুর্নাম ✔ |
হরিণ | র + ি (স্বর) + ণ → মাঝে স্বর থাকলেও ণ হয় | হরিণ ✔ |
গ্রহণ | র + হ + ণ → মাঝে হ থাকলেও ণ হয় | গ্রহণ ✔ |
বণিক | বণিক - র-এর প্রভাবে তৎসম শব্দে ণ | বণিক ✔ |
১১. সারসংক্ষেপ
নিয়ম/নিষেধ | শর্ত | উদাহরণ |
নিয়ম ১ | ট-বর্গের আগে → ণ | ঘণ্টা, খণ্ড, বণ্টন, লুণ্ঠন |
নিয়ম ২ | ঋ/র/ষ-এর পরে সরাসরি → ণ | ঋণ, বর্ণ, বিষ্ণু, ঘৃণা |
নিয়ম ৩ | ঋ/র/ষ + বিশেষ বর্ণ + → ণ | হরিণ, কৃপণ, অর্পণ, গ্রহণ |
নিয়ম ৪ | প্র/পরি/নির্ উপসর্গের পরে → ণ | প্রণাম, পরিণাম, নির্ণয় |
নিয়ম ৫ | স্বভাবগতভাবে তৎসম শব্দে → ণ | কল্যাণ, বাণী, নিপুণ, মণি |
নিষেধ ১ | ত-বর্গের আগে → ন | গ্রন্থ, বৃন্ত, বন্ধন |
নিষেধ ২ | বাংলা ক্রিয়াপদে → ন | করেন, যাবেন, নিবেন |
নিষেধ ৩ | বিদেশি শব্দে → ন | জার্মান, কোরআন, নবাব |
নিষেধ ৪ | পৃথক পদে সমাসে → ন | দুর্নাম, সর্বনাম, দুর্নীতি |
১২. উপসংহার
ণ-ত্ব বিধান বাংলা বানানের একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি কেবল মুখস্থের বিষয় নয়; বরং শব্দের উৎপত্তি, ধ্বনিগত প্রকৃতি, উপসর্গ, সমাস, এবং ব্যতিক্রম বুঝে আয়ত্ত করতে হয়।
মনে রাখার জন্য মূল কথা তিনটি: ১. র / ঋ / ষ-এর প্রভাবে ন অনেক সময় ণ হয় ২. ট-বর্গের আগে ণ হয় ৩. ত-বর্গ, বিদেশি শব্দ, ক্রিয়াপদ ও বহু সমাসবদ্ধ গঠনে ণ হয় না এই নিয়মগুলো ভালোভাবে বুঝে অনুশীলন করলে আপনি খুব সহজে ন ও ণ-এর সঠিক ব্যবহার আয়ত্ত করতে পারবেন। |
পরীক্ষার জন্য সংক্ষিপ্ত নোট
ণ-ত্ব বিধান হলো তৎসম শব্দে দন্ত্য ন-এর মূর্ধন্য ণ-এ পরিবর্তনের নিয়ম। সাধারণত ঋ, র, ষ-এর প্রভাবে, অথবা ট-বর্গীয় ধ্বনির আগে ন হয়ে ণ হয়। যেমন - ঋণ, বর্ণ, ঘৃণা, লক্ষণ, অর্পণ, বণ্টন। তবে ত-বর্গের আগে, বাংলা ক্রিয়াপদে, বিদেশি শব্দে, এবং অনেক সমাসবদ্ধ শব্দে এ বিধান খাটে না। যেমন - গ্রন্থ, করেন, জার্মান, দুর্নাম।
১৩. বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (MCQ)
নিচে BCS ও ব্যাংক পরীক্ষায় আসার মতো গুরুত্বপূর্ণ MCQ দেওয়া হলো:
০১. নিচের কোন শব্দটিতে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য হয়েছে?
ক) নদী
খ) নাম
গ) চরণ
ঘ) নেতা
উত্তর: গ) - চরণ তৎসম শব্দ; 'র'-এর পরে ণ হয়েছে।
০২. 'প্রণাম' শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য হয়েছে কারণ -
ক) শব্দটি বিদেশি
খ) 'প্র' উপসর্গে 'র' আছে
গ) 'ষ'-এর পরে ণ হয়েছে
ঘ) এটি তদ্ভব শব্দ
উত্তর: খ) - 'প্র' উপসর্গে 'র' থাকায় পরবর্তী 'ন' → 'ণ' হয়েছে।
০৩. ট-বর্গের আগে ন → ণ হয়-এই নিয়মে কোনটি গঠিত?
ক) গ্রন্থ
খ) বণ্টন
গ) দুর্নাম
ঘ) জার্মান
উত্তর: খ) - বণ্টন - ণ্ট (ট-বর্গের আগে ণ)। 'গ্রন্থ'-এ ত-বর্গ, 'দুর্নাম'-এ পৃথক পদ, 'জার্মান' বিদেশি।
০৪. কোন শব্দটির বানান সঠিক?
ক) কারন
খ) চরন
গ) হরিন
ঘ) মরণ
উত্তর: ঘ) - মরণ - তৎসম শব্দ, 'র'-এর পরে ণ হয়। অন্যগুলোর বানানে 'ণ' হবে।
০৫. ণ-ত্ব বিধান অনুযায়ী কোন শব্দে 'ণ' হবে না?
ক) চরণ
খ) মরণ
গ) নবাব
ঘ) কারণ
উত্তর: গ) - নবাব - আরবি শব্দ; বিদেশি শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়।
০৬. 'হরিণ' শব্দে ণ হওয়ার কারণ কোনটি?
ক) ট-বর্গের প্রভাব
খ) র + স্বর + ণ
গ) ষ-এর প্রভাব
ঘ) উপসর্গের কারণে
উত্তর: খ) - হরিণ - র + ি (স্বর) + ণ; নিয়ম ৩ অনুযায়ী মাঝে স্বর থাকলেও ণ হয়।
০৭. কোন শব্দে ণ-ত্ব বিধান লঙ্ঘিত হয়েছে?
ক) বর্ণ
খ) কারণ
গ) পরিনাম
ঘ) চরণ
উত্তর: গ) - 'পরিনাম' ভুল - সঠিক হবে 'পরিণাম'; পরি উপসর্গে র আছে বলে ণ হবে।
০৮. কোন ক্ষেত্রে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়?
ক) তৎসম শব্দে
খ) ঋ-কারের পরে
গ) বিদেশি শব্দে
ঘ) ষ-এর পরে
উত্তর: গ) - বিদেশি শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়; সেখানে সবসময় দন্ত্য ন ব্যবহার হয়।
০৯. 'গ্রন্থ' শব্দে ণ হয়নি কারণ -
ক) এটি বিদেশি শব্দ
খ) ন-এর পরে থ (ত-বর্গীয়) আছে
গ) ন-এর পরে ট-বর্গ নেই
ঘ) এটি ক্রিয়াপদ
উত্তর: খ) - ন-এর পরে 'থ' (ত-বর্গীয়) আছে - ত-বর্গের আগে ণ হয় না, ন-ই থাকে।
১০. 'বিষণ্ন' শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য হয়েছে কারণ -
ক) 'র'-এর পরে ণ
খ) 'ষ'-এর পরে ণ
গ) ট-বর্গীয় কারণে
ঘ) ঋ-কারের কারণে
উত্তর: খ) - 'বিষণ্ন' = বিষ + ণ্ন - 'ষ'-এর পরে 'ন' আসায় ণ হয়েছে।
১১. কোনটি ণ-ত্ব বিধানের সঠিক প্রয়োগ?
ক) দুর্নাম
খ) সর্বনাম
গ) নির্ণয়
ঘ) পরনারী
উত্তর: গ) - নির্ণয় - 'নির্' উপসর্গে র আছে বলে ণ হয়েছে। অন্যগুলোতে পৃথক পদ বলে ন থাকে।
১২. ণ-ত্ব বিধান বোঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কোনটি?
ক) শব্দটি দেশি না বিদেশি
খ) শব্দটি তৎসম কি না
গ) শব্দের দৈর্ঘ্য
ঘ) শব্দটি ক্রিয়াপদ কি না
উত্তর: খ) - ণ-ত্ব বিধান কেবল তৎসম শব্দে প্রযোজ্য - এটাই মূল ভিত্তি।
১৩. নিচের কোন শব্দটি ভুল বানানে লেখা হয়েছে?
ক) লক্ষণ
খ) অর্পণ
গ) গ্রণ্ঠ
ঘ) প্রণাম
উত্তর: গ) - 'গ্রণ্ঠ' ভুল - সঠিক হবে 'গ্রন্থ'; ন-এর পরে থ (ত-বর্গ) বলে ণ হয় না।
১৪. 'কৃপণ' শব্দে ণ হওয়ার কারণ?
ক) র-এর পরে
খ) ষ-এর পরে
গ) ঋ-কার + প-বর্গ + ণ
ঘ) ট-বর্গের আগে
উত্তর: গ) - কৃপণ - ঋ-কার + প (প-বর্গ) + ণ; নিয়ম ৩ অনুযায়ী।
★ সমাপ্ত ★