তৎসম শব্দ

Chapter Activity

Rating
New / 5
Reviews
0
Read Sessions
0
Readers
0

তৎসম শব্দ

সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, উৎস, প্রকারভেদ, ব্যবহার, উদাহরণঅনুশীলনীসহ আলোচনা

১. ভূমিকা

বাংলা ভাষা একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা হলেও এর শব্দভাণ্ডার বহুস্তরবিশিষ্টবহুমুখীএই শব্দভাণ্ডারের একটি বিশালগুরুত্বপূর্ণ অংশ সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত শব্দ দ্বারা গঠিতসংস্কৃত থেকে বাংলায় আগত শব্দসমূহ ভাষাতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাত্রা অনুযায়ী প্রধানত তৎসমতদ্ভবএই দুই ভাগে আলোচিত হয়তৎসম শব্দ হলো সেই শব্দসমষ্টি, যেগুলো বাংলায় প্রবেশের পরও মূল ধ্বনি, রূপ, বানানঅর্থের নিকটতা অনেকাংশে বজায় রেখেছে

এই ভাষার শব্দভাণ্ডারে সংস্কৃত, প্রাকৃত, অপভ্রংশ, আরবি, ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি এবং বিভিন্ন দেশজ উৎস থেকে আগত বহু শব্দ সহাবস্থান করে। এর মধ্যে সংস্কৃত থেকে সরাসরি গৃহীত যে শব্দগুলো প্রায় অপরিবর্তিত রূপে বাংলায় ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোকেই তৎসম শব্দ বলা হয়। বাংলা সাহিত্যের গাম্ভীর্য, শাস্ত্রীয়তা, আনুষ্ঠানিকতা এবং ভাবগভীরতা প্রকাশে তৎসম শব্দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“তৎসম” শব্দের আক্ষরিক অর্থ “তদ্‌-সম”, অর্থাৎ “তারই সমান” বা “মূলরূপের নিকটবর্তী”। এই ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থেকেই বোঝা যায় যে তৎসম শব্দে সংস্কৃতের ধ্বনি-রূপের ছাপ স্পষ্টভাবে রক্ষিত থাকে।

২. তৎসম শব্দের সংজ্ঞা ও ব্যুৎপত্তি

‘তৎসম’ শব্দটি সংস্কৃত ‘তৎ’ এবং ‘সম’ এই দুই অংশের সমন্বয়ে গঠিত। ‘তৎ’ অর্থ ‘তার’ বা ‘সেই’, আর ‘সম’ অর্থ ‘সমান’ বা ‘অবিকৃতরূপে অনুরূপ’। ব্যাকরণিক অর্থে তৎসম বলতে বোঝায়— যে শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে এবং মূল শব্দরূপে বড় কোনো ধ্বনিগত পরিবর্তন ছাড়াই ব্যবহৃত হয়েছে।

অতএব তৎসম শব্দের মূল পরিচয় দুটি: (ক) উৎস সংস্কৃত, এবং (খ) রূপ প্রায় অপরিবর্তিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়— সূর্য, চন্দ্র, বিদ্যা, ধর্ম, কর্ম, মিত্র, নারী, পুরুষ, গৃহ, জ্ঞান, কৃপা, শান্তি, প্রজ্ঞা, ঋতু, সভা, সমুদ্র, অরণ্য, ভূমি, নগর, বিদ্যালয়, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অধ্যয়ন, প্রার্থনা, উপাসনা, নির্দেশ, সিদ্ধান্ত, সংবাদ, সম্প্রদায়, মানবতা, স্বাধীনতা, সংবিধান, ইতিহাস, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সমাজ, রাষ্ট্র।

আরও উদাহরণ: অমৃত, অশ্ব, অঙ্গ, অক্ষর, অভিজ্ঞতা, উপকার, উপদেশ, করুণা, কিরণ, গতি, গৌরব, চরিত্র, চেতনা, জ্যোতি, তীর্থ, ত্যাগ, দর্শন, ন্যায়, পবিত্র, প্রতিভা, প্রণাম, বেদনা, মঙ্গল, মর্যাদা, যাত্রা, যৌবন, রচনা, লক্ষ্য, শৃঙ্খলা, শ্রদ্ধা, সংযম, সৌন্দর্য, স্মৃতি, হৃदय

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— সংস্কৃতজাত সব শব্দই তৎসম নয়। অনেক শব্দ সংস্কৃত উৎস থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ধ্বনিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাকৃত-অপভ্রংশ হয়ে বাংলায় এসেছে; সেগুলো তদ্ভব শব্দ। যেমন: অগ্নি থেকে আগুন, রাত্রি থেকে রাত, গৃহ থেকে ঘর। কাজেই উৎস এক হলেও রূপগত ইতিহাস অনুযায়ী শব্দের শ্রেণি ভিন্ন হতে পারে

৩. তৎসম শব্দের উৎসইতিহাস

তৎসম শব্দের প্রবেশ বাংলায় একদিনে ঘটেনি; এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক, ধর্মীয়, শিক্ষাগত এবং সাহিত্যিক যোগাযোগের ফলবিশেষভাবে দুটি প্রবাহ এখানে গুরুত্বপূর্ণলিখিতপণ্ডিতসমাজের ঐতিহ্য, এবং ঊনবিংশ শতকের ভাষার প্রমিতকরণ আন্দোলনধর্মগ্রন্থ, দর্শনশাস্ত্র, ব্যাকরণগ্রন্থ, নীতিশাস্ত্র, অনুবাদ-সাহিত্যপাণ্ডিত্যচর্চার মধ্য দিয়ে তৎসম শব্দের বিস্তার ঘটে; পরে গদ্যরীতির শৃঙ্খলায় এগুলো আরও সুসংহত স্থান লাভ করে

লিখিতপণ্ডিতমণ্ডলীর ঐতিহ্য: ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, ব্যাকরণ, টীকা, অনুবাদপাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিপুল তৎসম শব্দ বাংলায় প্রবেশ করে

প্রমিতকরণ আন্দোলন: ঊনবিংশ শতকে বাংলা গদ্যের বিকাশকালে বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় প্রমুখ ভাষা-সংস্কারক তৎসম শব্দকে প্রমিতশাস্ত্রসম্মত ভাষার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেন

৩.১ ঐতিহাসিক পটভূমি

প্রাচীন যুগ (আনুমানিক ৬৫০–১২০০ খ্রি.): বাংলা ভাষার উদ্ভবপর্ব থেকেই সংস্কৃতের প্রভাব ছিল গভীরচর্যাপদে তৎসমতদ্ভবউভয় শ্রেণির চিহ্ন দেখা যায়

মধ্যযুগ (১২০০–১৮০০ খ্রি.): শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলিমঙ্গলকাব্যে ধর্মীয়আভিজাত্যপূর্ণ প্রসঙ্গে তৎসম শব্দের ব্যবহার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়

আধুনিক যুগ (১৮০০–বর্তমান): পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার, সংস্কৃতপুনর্জাগরণ এবং আধুনিক গদ্যরীতির প্রতিষ্ঠার ফলে বিপুল তৎসম শব্দ বাংলা রচনাপরিভাষায় স্থায়ী আসন পায়

৩.২ সংস্কৃত থেকে আগমনের প্রধান পথ

ধর্মীয় গ্রন্থবাণীবেদ, উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত প্রভৃতির ভাষ্যঅনুবাদের মাধ্যমে

শিক্ষাপণ্ডিতসমাজসংস্কৃত শিক্ষাপদ্ধতি, টোল, পাঠশালাপাণ্ডিত্যচর্চার মাধ্যমে

আইন, রাজকর্মপ্রশাসনপ্রাচীনমধ্যযুগীয় পরিভাষাদলিলের ভাষার মাধ্যমে

সাহিত্যচর্চামধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথসহ বহু সাহিত্যিকের রচনায় সচেতন তৎসম প্রয়োগের মাধ্যমে

৪. বাংলা শব্দভাণ্ডারে তৎসম শব্দের অবস্থান

বাংলা শব্দভাণ্ডার সাধারণভাবে চারটি বড় উৎসভিত্তিক ভাগে আলোচনা করা হয়: তৎসম, তদ্ভব, দেশজ এবং বিদেশি। তৎসম শব্দ এই ব্যবস্থায় একটি প্রধান স্তর, কারণ বাংলা সাহিত্যভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, শাস্ত্রীয় আলোচনার ভাষা এবং শিক্ষাবিষয়ক ভাষায় তৎসম শব্দের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশে, বিশেষত উনিশ শতকের নবজাগরণকালে, তৎসম শব্দের ব্যাপক ব্যবহারে একটি পরিশীলিত গদ্যভঙ্গি গড়ে ওঠে।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে তদ্ভব ও দেশজ শব্দের ব্যবহার বেশি থাকলেও ধর্মীয় গ্রন্থ, কাব্যরীতি, পুরাণানুবাদ, পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা এবং পরবর্তী প্রমিত গদ্যে তৎসম শব্দ দ্রুত গুরুত্ব পায়। বাংলা ভাষায় যেসব বিমূর্ত ধারণা— যেমন ন্যায়, নীতি, স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, সৌন্দর্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, সাহিত্য— এগুলোর বহুল ব্যবহৃত রূপ অধিকাংশই তৎসম। ফলে জ্ঞানচর্চার ভাষা নির্মাণে তৎসম শব্দ অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছে।

৫. তৎসম শব্দের প্রধান বৈশিষ্ট্য

তৎসম শব্দ শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি লক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিচে সেগুলো ব্যাখ্যাসহ তুলে ধরা হলো।

৫.১ সামগ্রিক ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

তৎসম শব্দের শক্তি কেবল বানানে নয়; ধ্বনিগত স্থিরতা, রূপগত নিকটতা, অর্থগত ধারাবাহিকতা এবং লিখিত ভাষায় প্রমিত মর্যাদার সমন্বয়ে এদের স্বাতন্ত্র্য গড়ে ওঠে। নিচের সারণিতে বিষয়টি সংক্ষেপে দেখানো হলো।

বৈশিষ্ট্য

বিবরণ

উদাহরণ

ধ্বনিতাত্ত্বিক স্থিরতা

সংস্কৃতের মূল স্বর, ব্যঞ্জন, যুক্তাক্ষর, ণত্ব/ষত্ব ইত্যাদির ছাপ লেখ্যরূপে বহুলাংশে বজায় থাকে।

বিদ্যালয়, জ্ঞান, ঈশ্বর, পদ্ম, শিক্ষা

রূপতাত্ত্বিক নিকটতা

উপসর্গ, প্রত্যয়, সমাস ও গঠনরীতি সংস্কৃতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে।

সমবেদনা, উপদেশ, প্রজ্ঞা, মহাত্মা

অর্থগত ধারাবাহিকতা

মূল সংস্কৃত অর্থ বা তার সাহিত্যিক/দার্শনিক বিস্তৃত অর্থ বাংলায়ও বহাল থাকে।

ধর্ম, কর্ম, অহিংসা, তপস্যা

লেখ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রাধান্য

আনুষ্ঠানিক, একাডেমিক, আইনি, সম্পাদকীয় ও শাস্ত্রীয় আলোচনায় তৎসম শব্দ বেশি মানানসই।

সংবিধান, নির্ধারণ, উপসংহার, প্রার্থনা

সংস্কৃতরূপের নিকটতা: শব্দের বানান ও গঠন সংস্কৃতের মূল রূপের সঙ্গে প্রায় মিলে যায়। যেমন— জ্ঞান, কীর্তি, প্রার্থনা, সংস্কৃতি।

যৌগিক ব্যঞ্জনের উপস্থিতি: তৎসম শব্দে প্রায়ই যুক্তব্যঞ্জন দেখা যায়, যেমন— শ্রদ্ধা, দৃষ্টান্ত, প্রজ্ঞা, ক্ষুদ্র, ত্রাণ, গ্লানি।

শাস্ত্রীয় ও আনুষ্ঠানিক ভাব: কথ্যভাষার তুলনায় লিখিত, আনুষ্ঠানিক বা গম্ভীর প্রসঙ্গে তৎসম শব্দ বেশি ব্যবহৃত হয়। যেমন— নিবেদন, অনুরোধ, প্রস্থান, প্রার্থনা।

বিমূর্ত ধারণা প্রকাশে সক্ষমতা: জ্ঞান, ন্যায়, সংস্কার, নীতি, স্বাধীনতা, দায়িত্ব, কর্তব্য, মানবতা ইত্যাদি তৎসম শব্দ বিমূর্ত অর্থ বহনে উপযোগী।

বাংলা ব্যাকরণে অভিযোজন: শব্দটি তৎসম হলেও বাংলার কারক, বিভক্তি ও বচন যোগ করে ব্যবহার করা হয়— যেমন ‘ধর্মের’, ‘জ্ঞানকে’, ‘বিদ্যালয়গুলো’, ‘সাহিত্যিকতা’।

৫.২ ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য

তৎসম শব্দে সংস্কৃত ধ্বনির চিহ্ন প্রায়ই বানানে সুস্পষ্ট থাকে। যুক্তব্যঞ্জন, ঋ-ধ্বনি, ক্ষ/জ্ঞ/ত্র-জাত রূপ, শ-ষ-স-এর পার্থক্য এবং বিসর্গ বা অনুস্বারের ঐতিহ্যবাহী ব্যবহার তৎসম শব্দকে আলাদা পরিচয় দেয়। উদাহরণ: ঋষি, ঋণ, কৃপণ, তৃণ, জ্ঞান, কক্ষ, ত্রাণ, স্মৃতি, দুঃখ।

তৎসম শব্দে সংস্কৃত ধ্বনির চিহ্ন অনেক সময় বানানে স্পষ্ট থাকে। উদাহরণস্বরূপ— ঋ-ধ্বনি যুক্ত শব্দ (ঋতু, ঋষি, ঋণ, ঋদ্ধি, ঋজু), ক্ষ-যুক্ত শব্দ (ক্ষতি, ক্ষুদ্র, লক্ষ্য, রক্ষা, শিক্ষা, লক্ষ্মী), জ্ঞ-যুক্ত শব্দ (জ্ঞান, বিজ্ঞ, অজ্ঞ, প্রজ্ঞা, বিজ্ঞাপন), ত্র-যুক্ত শব্দ (ত্রাণ, ত্রিভুজ, ত্রুটি, ত্রাস, ত্রিকোণ), শ্র-যুক্ত শব্দ (শ্রদ্ধা, শ্রী, শ্রম, শ্রবণ, শ্রেণি), দ্ব-যুক্ত শব্দ (দ্বার, দ্বন্দ্ব, দ্বীপ, দ্বিগুণ), ক্ত/গ্ন/ন্ড/ষ্ট-ধর্মী রূপ (শক্তি, ভক্তি, অগ্নি, দণ্ড, দৃষ্টি, দৃষ্টান্ত)। এ ধরনের গঠন বাংলা কথ্যভাষায় অনেক সময় দুর্লভ হলেও তৎসম শব্দে তা অক্ষুণ্ণ থাকে।

৫.৩ রূপগত বৈশিষ্ট্য

তৎসম শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হলেও বহু ক্ষেত্রে এদের গঠনরীতি সংস্কৃতধর্মী থাকে। উপসর্গ-প্রত্যয়, সমাসবদ্ধ পদ এবং শব্দমূলের নিকটতা এদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করে। বাংলায় বিভক্তি যোগ হলেও শব্দের মূল রূপ সাধারণত অপরিবর্তিত থাকে— যেমন: বিদ্যালয়, বিদ্যালয়ে, বিদ্যালয়ের; ধর্ম, ধর্মের, ধর্মকে।

তৎসম শব্দে উপসর্গ ও প্রত্যয়ের ব্যবহারও সংস্কৃতধর্মী হতে পারে। যেমন: প্র + জ্ঞান = প্রজ্ঞা, সম + বেদনা = সমবেদনা, উপ + দেশ = উপদেশ, সু + দর্শন = সুদর্শন, নির্ + মল = নির্মল, অধি + কার = অধিকার, প্রতি + দিন = প্রতিদিন, মহা + বিদ্যা = মহাবিদ্যা। আবার বাংলা ভাষায় নতুন শব্দগঠনে তৎসম ধাতু ও প্রত্যয়ও ব্যবহৃত হয়— যেমন মানব + তা = মানবতা, সভ্য + তা = সভ্যতা, সংস্কৃত + ই = সংস্কৃতি, কার্য + ক্রম = কার্যক্রম, জ্ঞান + মূলক = জ্ঞানমূলক, নীতি + নির্ধারণ = নীতিনির্ধারণ।

৬. তৎসম, তদ্ভব, দেশজ ও বিদেশি শব্দের তুলনা

বাংলা শব্দতত্ত্বে তৎসম শব্দকে বুঝতে গেলে অন্য শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করা প্রয়োজন। কারণ একই ভাব বা বস্তুর জন্য বহু সময় একাধিক উৎসের শব্দ পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়। নিচের সারণিটি বিষয়টি স্পষ্ট করবে।

শ্রেণি

উৎস

মূল বৈশিষ্ট্য

উদাহরণ

ভাষার স্বর

তৎসম

সংস্কৃত

প্রায় অপরিবর্তিত রূপে গৃহীত

ধর্ম, জ্ঞান, সূর্য, চন্দ্র, সংস্কৃতি, বিদ্যালয়, প্রার্থনা

গম্ভীর, আনুষ্ঠানিক

তদ্ভব

সংস্কৃতজাত, কিন্তু ধ্বনিবিকৃত

দীর্ঘ ভাষাগত পরিবর্তনের ফল

আগুন, ঘর, রাত, হাত, কান, নাক, পাতা

স্বাভাবিক, কথ্যঘনিষ্ঠ

দেশজ

দেশীয়/স্থানীয় উৎস

লোকভাষায় জন্ম ও ব্যবহার

ঢেঁকি, কুঁড়েঘর, টুকটাক, খোকা, নেড়া

আন্তরিক, লোকজ

বিদেশি

অ-ভারতীয় ভাষা

ধার করা শব্দ

কাগজ, দপ্তর, স্কুল, টেবিল, চেয়ার, বাজার

প্রসঙ্গনির্ভর

মিশ্র/প্রচলিত

বহু উৎসের সহাবস্থান

প্রসঙ্গভেদে বিভিন্ন স্তরের শব্দ পাশাপাশি ব্যবহৃত

স্বাধীনতা, খবর, ঘর, বিদ্যালয়

সমন্বিত

এখানে লক্ষণীয় যে একই অর্থক্ষেত্রে তৎসম ও তদ্ভব শব্দ পাশাপাশি থাকতে পারে। যেমন— গৃহ/ঘর, অগ্নি/আগুন, রাত্রি/রাত। সাহিত্যিক প্রসঙ্গ, বক্তার অভিপ্রায় ও ভাষার স্তর অনুযায়ী উপযুক্ত শব্দ নির্বাচন করতে হয়।

৭. তৎসম ও তদ্ভবের যুগল উদাহরণ

নিচের সারণিতে কয়েকটি পরিচিত তৎসম শব্দ এবং তাদের তদ্ভব বা সহজতর সমার্থক রূপ দেওয়া হলো। এ ধরনের তুলনা শিক্ষার্থীদের শব্দশ্রেণি বোঝায় বিশেষ সহায়ক।

তৎসম শব্দ

সহজ/তদ্ভব রূপ

অর্থ

উদাহরণ বাক্য

অগ্নি

আগুন

আগুন/জ্বলন্ত তাপ

যজ্ঞে অগ্নি প্রজ্বলিত করা হলো।

গৃহ

ঘর

বাসস্থান

নতুন গৃহ নির্মাণে সবাই আনন্দিত।

রাত্রি

রাত

নিশীথকাল

রাত্রি গভীর হলে নগরী স্তব্ধ হয়।

হস্ত

হাত

কর

শিল্পী নিজের হস্তে মূর্তিটি গড়েছেন।

কর্ণ

কান

শ্রবণেন্দ্রিয়

কর্ণে মৃদু সঙ্গীত ধ্বনিত হচ্ছিল।

নাসিকা

নাক

ঘ্রাণেন্দ্রিয়

নাসিকায় তীব্র গন্ধ এসে লাগল।

চন্দ্র

চাঁদ

উপগ্রহ/চাঁদ

পূর্ণিমার চন্দ্র আকাশ ভরিয়ে তোলে।

মস্তক

মাথা

শির

তিনি মস্তক নত করে প্রণাম করলেন।

মস্তক

মাথা

শিরোভাগ

মস্তকে পবিত্র তিলক অঙ্কিত ছিল।

পদ

পা

পদতল/পা

দীর্ঘ যাত্রায় তার পদ ক্লান্ত হয়ে পড়ল।

দন্ত

দাঁত

দাঁত

দন্তচিকিৎসকের কাছে তাকে যেতে হলো।

নেত্র

চোখ

চক্ষু/চোখ

নেত্রে গভীর বেদনার ছাপ ফুটে উঠল।

জিহ্বা

জিভ

রসনেন্দ্রিয়

অসাবধানতায় জিহ্বায় কামড় লেগেছে।

পত্র

পাতা/চিঠি

পাতা বা লিখিত বার্তা

তিনি গুরুজনের নিকট একটি পত্র প্রেরণ করলেন।

মৃত্তিকা

মাটি

ভূমির মাটি

বর্ষায় মৃত্তিকা স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে।

ভোজন

খাওয়া

আহার গ্রহণ

অতিথিদের জন্য ভোজনের বিশেষ আয়োজন করা হয়েছিল।

৮. ব্যবহারক্ষেত্র অনুযায়ী তৎসম শব্দের শ্রেণিবিন্যাস

তৎসম শব্দকে শুধু উৎসের বিচারে নয়, ব্যবহারক্ষেত্রের বিচারে দেখলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়। নিচে কয়েকটি ক্ষেত্র অনুসারে উদাহরণ দেওয়া হলো।

৮.১ শিক্ষা, জ্ঞান ও সংস্কৃতি

বিদ্যা, শিক্ষা, জ্ঞান, বিদ্যালয়, অধ্যয়ন, অনুশীলন, সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষা, ব্যাকরণ, দর্শন, প্রজ্ঞা, সৃজন, গবেষণা— এগুলো সবই জ্ঞানচর্চামূলক পরিবেশে বহুল ব্যবহৃত তৎসম শব্দ।

উদাহরণ: “সুশৃঙ্খল অধ্যয়ন জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধি করে।” এখানে অধ্যয়ন, জ্ঞান, গভীরতা— সবকটি শব্দ তৎসম প্রকৃতির।

আরও উদাহরণ: “বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনের সমন্বিত অধ্যয়ন শিক্ষার্থীর প্রজ্ঞা বিকশিত করে।”

৮.২ সমাজ, নীতি ও রাষ্ট্র

সমাজ, রাষ্ট্র, ন্যায়, নীতি, দায়িত্ব, কর্তব্য, আইন, সংবিধান, নাগরিক, প্রশাসন, সভা, প্রতিনিধি, স্বাধীনতা, সাম্য, মানবাধিকার— এসব শব্দ নাগরিক ও সামাজিক পরিসরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণ: “সংবিধান নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব নির্ধারণ করে।” “সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যায়, নীতি ও জবাবদিহিতা অপরিহার্য।”

৮.৩ ধর্ম, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা

ধর্ম, কর্ম, মোক্ষ, আত্মা, প্রার্থনা, উপাসনা, মন্ত্র, পুরাণ, দেবতা, তীর্থ, সাধনা, চেতনা, ব্রত, পুণ্য, তপস্যা— এগুলো ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় সাহিত্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত তৎসম শব্দ।

উদাহরণ: “প্রার্থনা মানুষের চেতনাকে সংযম ও শান্তির দিকে পরিচালিত করে।” “সাধনা ও তপস্যা আধ্যাত্মিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ।”

৮.৪ প্রকৃতি ও বিজ্ঞান

সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, ভূমি, বায়ু, অণু, জীব, তাপ, গতি, শক্তি, পরমাণু, চিকিৎসা, রসায়ন, জীববিদ্যা, গণিত, জ্যামিতি, ত্রিভুজ, ব্যাসার্ধ— বিজ্ঞান ও প্রকৃতিবিষয়ক পরিভাষার বড় অংশ তৎসমভিত্তিক।

আরও উদাহরণ: “জ্যামিতিতে ত্রিভুজ, ব্যাসার্ধ, পরিধি, কোণ ইত্যাদি পরিভাষা তৎসমভিত্তিক।” “জীববিদ্যা, রসায়ন, পদার্থ, তাপ, গতি, শক্তি— এসব ক্ষেত্রেও তৎসম শব্দের ব্যবহার অত্যন্ত ব্যাপক।”

৯. তৎসম শব্দের বাক্যপ্রয়োগ

শব্দ শেখার সর্বোত্তম উপায় হলো বাক্যে ব্যবহার দেখা। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো, যাতে বোঝা যায় তৎসম শব্দ বাক্যকে কীভাবে গাম্ভীর্য, শুদ্ধতা ও আনুষ্ঠানিকতা প্রদান করে।

বিদ্যালয়ের বার্ষিক সভায় অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন।

মানবতার সেবাই প্রকৃত ধর্ম— এই বাণী আজও সমান প্রাসঙ্গিক।

বিজ্ঞানচর্চা কেবল তথ্য অর্জন নয়; এটি যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের অনুশীলন।

তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুজনের প্রতি প্রণাম নিবেদন করলেন।

স্বাধীনতা অর্জনের পরে রাষ্ট্রগঠনের দায়িত্ব আরও বৃদ্ধি পায়।

সভ্যতার বিকাশে শিক্ষা, নীতি ও সংস্কৃতির ভূমিকা অনস্বীকার্য।

প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে বিনয়, সংযম ও দায়িত্ববোধ শেখায়।

প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনের জন্য অধ্যবসায় ও শৃঙ্খলা অপরিহার্য।

বিপদের মুহূর্তে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও সাহস মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি মানবকল্যাণে এক বিশাল অবদান।

সমবেদনা ও সহমর্মিতা সামাজিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে।

বিদ্যালয়ের প্রার্থনা-সভায় শিক্ষার্থীরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে অংশগ্রহণ করল।

গবেষণাগারে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও পরিমাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

একই ভাবকে সহজতর ভাষায়ও বলা যায়। যেমন— “বিদ্যালয়ের সভায় প্রধান শিক্ষক ছাত্রদের পরিশ্রমের প্রশংসা করলেন।” এখানে তৎসম শব্দ কিছুটা কমে ভাষা অধিক সহজ হয়েছে। সুতরাং ভাষার স্তর নির্বাচন প্রসঙ্গনির্ভর।

১০. তৎসম শব্দ ব্যবহারের সুবিধা

লিখিত ভাষায় গাম্ভীর্য ও মর্যাদা আনে।

বিমূর্ত, দার্শনিক ও জ্ঞানমূলক ভাব প্রকাশে সহায়ক।

বাংলা পরিভাষা নির্মাণে শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।

সাহিত্য, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও একাডেমিক লেখায় শৈল্পিকতা বৃদ্ধি করে।

সমার্থক শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে— একই বিষয়ের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি সম্ভব হয়।

১১. তৎসম শব্দ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা ও সতর্কতা

অতিরিক্ত তৎসম শব্দ ব্যবহারে ভাষা কখনো দুর্বোধ্য, কৃত্রিম বা অতিরিক্ত আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে যেতে পারে। বিশেষত শিশু, সাধারণ পাঠক বা কথ্যপ্রধান প্রসঙ্গে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তৎসম শব্দ ব্যবহার স্বাভাবিক যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই ভাষার উদ্দেশ্য অনুযায়ী শব্দ নির্বাচন সবচেয়ে জরুরি।

যেখানে সহজ শব্দে ভাব স্পষ্ট হয়, সেখানে জটিল তৎসম শব্দ চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।

শুদ্ধ বানান জানা ছাড়া তৎসম শব্দ ব্যবহার করলে ভুলের সম্ভাবনা বেশি। যেমন— “দৃষ্টান্ত”, “শ্রদ্ধা”, “প্রজ্ঞা”, “ঋণ”, “ক্ষুদ্র” ইত্যাদি।

কেবল গাম্ভীর্য দেখাতে গিয়ে বাক্যের স্বাভাবিকতা নষ্ট করা অনুচিত।

রচনার ধরন, পাঠকের বয়স এবং মাধ্যম (প্রবন্ধ, বক্তৃতা, পাঠ্যবই, গল্প) বিবেচনা করা জরুরি।

১১. বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের প্রয়োগের নিয়ম

উচ্চারণ ও বানান

যুক্তবর্ণ সঠিকভাবে লিখতে হয়: স্বপ্ন (শ্ + ব + প + ন) নয়স্বপ্ন (স্ + ব + প + ন) – এখানে ‘স্ব’ এর ‘স’ ও ‘ব’ যুক্ত।

ঋ-যুক্ত শব্দে ঋ-এর উচ্চারণ ‘রি’ বা ‘রি’র কাছাকাছি। যেমন: ঋতু (রিতু)পৃথিবী (পৃথিবী)

বিসর্গ (ঃ) ও অনুস্বার (ং) যথাস্থানে বসে। যেমন: দুঃখ, অংক

বাক্যে ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা

অত্যাধিক তৎসম শব্দ ব্যবহার করলে বাক্য কৃত্রিম ও দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। যেমন: “প্রবল বর্ষণে ভূপৃষ্ঠ আর্দ্রতাপূর্ণ হয়েছে” (সরল: “প্রবল বৃষ্টিতে মাটি ভিজেছে”)।

দৈনন্দিন কথাবার্তায় তৎসম শব্দ অপেক্ষাকৃত কম, আর সাহিত্য ও পত্রিকার ভাষায় বেশি।

সংস্কৃত সন্ধি ও সমাসের প্রভাব

তৎসম শব্দ নিয়ে গঠিত অনেক সমাসবদ্ধ পদ বাংলায় প্রচলিত:

দ্বিগু সমাস: পঞ্চভুজ, ত্রিলোক

বহুব্রীহি সমাস: চতুর্মুখ, দশানন

কর্মধারয় সমাস: নীলকণ্ঠ, মহাত্মা

এগুলো সম্পূর্ণ তৎসম নয়, তবে তৎসম শব্দের সংযোগে গঠিত।

১১.২ সমালোচনাভাষাগত বিতর্ক

অতিরিক্ত তৎসমপ্রয়োগকে অনেক ভাষাবিদ ভাষাগত আড়ম্বর বা কৃত্রিমতা বলে চিহ্নিত করেছেন।

লেখ্য ও কথ্য বাংলার ব্যবধান বৃদ্ধির পেছনে অনাবশ্যক শাস্ত্রীয় শব্দের চাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।

সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সুকুমার সেন প্রমুখ পণ্ডিত তৎসম শব্দের প্রয়োজনভিত্তিক ও স্বাভাবিক ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন; কিন্তু কৃত্রিম আরোপের পক্ষে নন।

আধুনিক প্রমিত বাংলা তৎসম, তদ্ভব, দেশজ ও বিদেশি শব্দের ভারসাম্যপূর্ণ, পাঠকবান্ধব ও প্রসঙ্গোপযোগী ব্যবহারের ওপর জোর দেয়।

১২. তৎসম শব্দ শনাক্ত করার কৌশল

শিক্ষার্থীরা অনেক সময় শব্দটি তৎসম না তদ্ভব— তা বুঝতে বিভ্রান্ত হয়। নিচের কৌশলগুলো অনুসরণ করলে বিষয়টি সহজ হয়।

শব্দে যুক্তব্যঞ্জন আছে কি না দেখো: জ্ঞ, ত্র, ক্ষ, শ্র, দ্ব, স্ত্র, গ্রন্থ, ক্লেশ ইত্যাদি রূপ তৎসম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

শব্দটি খুব শাস্ত্রীয় বা আনুষ্ঠানিক শোনালে তৎসম হতে পারে। যেমন— প্রস্থান, নিবেদন, প্রার্থনা, নির্ধারণ, অনুশাসন।

একই অর্থের সহজ কথ্যরূপ থাকলে তুলনা করো: গৃহ/ঘর, রাত্রি/রাত, কর্ণ/কান।

বাংলা অভিধান বা ব্যাকরণ বইয়ে উৎস দেখার অভ্যাস করো।

শব্দটিকে বাক্যে বসিয়ে দেখো— তা কি গদ্য, প্রবন্ধ, বিজ্ঞপ্তি বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বেশি মানানসই? তবে তৎসম হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

অনুশীলনের জন্য এই শব্দগুলো যাচাই করা যেতে পারে: প্রজ্ঞা, অধ্যবসায়, স্বাধীনতা, সংবিধান, ত্রুটি, শ্রদ্ধা, সমুদ্র, অগ্নি, কর্ণ, নাসিকা, মস্তক, ভোজন, মৃত্তিকা, পত্র।

১৩. তৎসম শব্দ ও শুদ্ধ বানান

তৎসম শব্দ শেখার সঙ্গে শুদ্ধ বানান শিক্ষার সম্পর্ক খুব ঘনিষ্ঠ। কারণ তৎসম শব্দে সংস্কৃতমূলক বানান বজায় থাকে। শ্র, জ্ঞ, ক্ষ, ত্র, ঋ, ধ্য, দ্য, দ্ভ, দ্ম, গ্ধ, ন্ত, ষ্ণ ইত্যাদি যুক্তরূপে শিক্ষার্থীরা প্রায়ই ভুল করে। কয়েকটি বানান-সতর্কতার উদাহরণ নিচে দেওয়া হলো; এগুলোর সঙ্গে আরও কয়েকটি সাধারণ শব্দ আলাদা করে অনুশীলন করা উচিত— যেমন: অদ্বিতীয়, চেতনা, ত্যাগ, দ্যুতি, দ্যোতনা, নির্মাণ, শ্রেণি, ত্রুটি, নিষ্ঠা, স্নিগ্ধ, বিদ্বান, সিদ্ধি।

শুদ্ধ রূপ

ভুল বা বিভ্রান্তিকর রূপ

মন্তব্য

শ্রদ্ধা

স্রদ্ধা

শ্র-যুগ্ম ব্যঞ্জন বজায় রাখতে হবে

দৃষ্টান্ত

দ্রিস্টান্ত

দৃ- এবং ষ্টা অংশ লক্ষণীয়

প্রজ্ঞা

প্রগ্গা/প্রজ্ঞান

জ্ঞ-যুক্ত বানান

ক্ষুদ্র

খুদ্র

ক্ষ-রূপ অক্ষুণ্ণ

ঋণ

রিন/ঋন

ঋ-কারের ব্যবহার

অধ্যয়ন

অদ্যায়ন

ধ্য-যুক্ত রূপে সতর্কতা

অদ্বিতীয়

অদিতীয়/অদ্বিতিয়

দ্বি-ধ্বনি ও দীর্ঘ ঈ-কারে সতর্কতা

নিষ্ঠা

নিস্ঠা

ষ্ঠ-যুক্ত রূপ বজায় রাখতে হবে

ত্রুটি

তুরুটি/ত্রুতি

ত্র-যুক্ত রূপ লক্ষণীয়

শ্রেণি

স্রেণী/শ্রেনি

শ্র-যুক্ত রূপ; চলিত বানান ‘শ্রেণি’

স্নিগ্ধ

স্নিগ্দ/স্নিগদ

গ্ধ-যুক্ত রূপ অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে

বিদ্বান

বিদবান

দ্ব-যুগ্ম ব্যঞ্জন বজায় থাকবে

সিদ্ধি

সিদ্দি

দ্ধ-রূপ সঠিকভাবে লিখতে হবে

১৪. সাহিত্য ও রচনায় তৎসম শব্দের নান্দনিক ভূমিকা

তৎসম শব্দ বাংলা সাহিত্যকে এক ধরনের ধ্বনিসৌন্দর্য ও ভাবগভীরতা প্রদান করে। কবিতায় “নিশীথ”, “অরুণ”, “সুধা”, “মাধুর্য”, “চেতনা”, “প্রাণ”, “অনন্ত”, “সৌন্দর্য”, “অমৃত”, “বেদনা”, “আলোক”, “শুভ্রতা”, “অন্তর” — এ ধরনের তৎসম শব্দ ধ্বনিগত জৌলুস সৃষ্টি করে। প্রবন্ধে “সভ্যতা”, “সংস্কৃতি”, “মানবতা”, “দায়িত্ব”, “অধিকার”, “ঐতিহ্য”, “সমাজচেতনা”, “বিচারবোধ”, “দৃষ্টিভঙ্গি” — এ ধরনের শব্দ বিশ্লেষণধর্মী ভাষাকে প্রাঞ্জল ও তাৎপর্যপূর্ণ করে।

তবে শ্রেষ্ঠ রচয়িতারা সাধারণত তৎসম, তদ্ভব ও দেশজ শব্দের একটি সুষম সমন্বয় বজায় রাখেন। কারণ ভাষার সৌন্দর্য শুধু গাম্ভীর্যে নয়; স্বাভাবিকতা, শ্রুতিমাধুর্য এবং পাঠযোগ্যতার মধ্যেও নিহিত। একটি দক্ষ লেখক জানেন কোথায় “গৃহ” লিখতে হবে, আর কোথায় “ঘর” শব্দটি বেশি জীবন্ত।

১৫. শিক্ষার্থীদের সাধারণ ভুল

সংস্কৃতজাত সব শব্দকে তৎসম ধরে নেওয়া।

তৎসম ও তদ্ভবের যুগল শব্দ আলাদা করতে না পারা।

শুদ্ধ বানানে জ্ঞ, ক্ষ, ত্র, শ্র, ঋ ইত্যাদিতে ভুল করা।

সব প্রসঙ্গে তৎসম শব্দ ব্যবহার করলে ভাষা নাকি “ভালো” হয়— এই ভুল ধারণা পোষণ করা।

আনুষ্ঠানিক ভাষা ও কথ্যভাষার পার্থক্য না বোঝা।

এই ভুলগুলো এড়াতে উদাহরণভিত্তিক চর্চা, অভিধান-ব্যবহার, তুলনামূলক তালিকা তৈরি এবং নিজে বাক্য রচনা করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

১৫.১ তৎসম শব্দ নিয়ে কিছু প্রচলিত ভুল

তৎসম শব্দের ক্ষেত্রে ভুল সাধারণত বানান, যুক্তব্যঞ্জন, ঋ-কার, বিসর্গ এবং উচ্চারণনির্ভর সরলীকরণে দেখা যায়। নিচে কয়েকটি প্রচলিত উদাহরণ দেওয়া হলো।

ভুল রূপ

শুদ্ধ তৎসম রূপ

স্বাস্থ

স্বাস্থ্য

কৌতুহল

কৌতূহল

দুখ

দুঃখ

দৃস্টান্ত / দৃষ্টান্তু

দৃষ্টান্ত

প্রগ্যা

প্রজ্ঞা

টিপস: সন্দেহ হলে অভিধান, ব্যাকরণগ্রন্থ বা প্রমিত শব্দতালিকা দেখে নেওয়া ভালো। বিশেষত পরীক্ষামূলক লেখা, প্রবন্ধ, ভাষণ ও আনুষ্ঠানিক রচনায় শুদ্ধ তৎসম বানান আলাদা গুরুত্ব বহন করে।

১৬. মনে রাখার সহজ সূত্র

তৎসম = সংস্কৃত থেকে প্রায় “তেমনই” এসেছে।

তদ্ভব = সংস্কৃত থেকে এসেছে, কিন্তু বহু ধ্বনি-পরিবর্তনে নতুন রূপ পেয়েছে।

যৌগিক ব্যঞ্জন, শাস্ত্রীয় ভাব ও গম্ভীর ব্যবহার = তৎসম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

একই অর্থের সহজ কথ্যরূপ থাকলে তুলনা করো।

. উপসংহার

তৎসম শব্দ বাংলা ভাষার এক অনন্য সম্পদ। এগুলো কেবল সংস্কৃত উৎসের স্মারক নয়; বাংলা ভাষার জ্ঞানভিত্তিক, সাহিত্যিক, শাস্ত্রীয় ও আনুষ্ঠানিক প্রকাশভঙ্গির শক্তিশালী অবলম্বন। তৎসম শব্দ জানলে ভাষার রুচি, শুদ্ধতা, ব্যঞ্জনা ও গভীরতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ে। আবার তদ্ভব, দেশজ ও বিদেশি শব্দের সঙ্গে তুলনা করলে বোঝা যায়— বাংলা ভাষার সৌন্দর্য তার বহুমাত্রিকতাতেই নিহিত।

অতএব তৎসম শব্দ শেখার উদ্দেশ্য কেবল সংজ্ঞা মুখস্থ করা নয়; বরং ভাষার উৎস, রূপান্তর, শৈলী এবং প্রয়োগবোধ অর্জন করা। যে শিক্ষার্থী বুঝে-শুনে তৎসম শব্দ ব্যবহার করতে পারে, তার ভাষা হয় আরও পরিশীলিত, সুনির্দিষ্ট এবং প্রভাববহ।

Review this chapter

You Can Also Read

Chapters closely related to the one you are reading now.

অর্ধ-তৎসম শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

শব্দ ও শব্দের শ্রেণিবিভাগ

No reviews
0 students
Read chapter

তদ্ভব শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

ষ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

ণ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

Most Read by Students

Popular picks getting the strongest student traffic right now.

বাংলা ভাষার রীতি

No reviews
1 student
Read chapter

অসহযোগ আন্দোলন (মার্চ ১৯৭১)

No reviews
1 student
Read chapter

নদী, সেতু, পাহাড়, দ্বীপ, বন, সমুদ্রবন্দর

No reviews
1 student
Read chapter

Others Who Read This Also Read

Behavior-based suggestions from student reading patterns where available.

অর্ধ-তৎসম শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

শব্দ ও শব্দের শ্রেণিবিভাগ

No reviews
0 students
Read chapter

তদ্ভব শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

ষ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

ণ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

Best Reviewed

Chapters earning the strongest student feedback.

অর্ধ-তৎসম শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

শব্দ ও শব্দের শ্রেণিবিভাগ

No reviews
0 students
Read chapter

তদ্ভব শব্দ

No reviews
0 students
Read chapter

ষ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

ণ-ত্ব বিধান

No reviews
0 students
Read chapter

Course Suggestions

Want a more guided path after this chapter? These courses are the closest fit.

Browse all courses
Best match৳1,999

Bangla

Bangla Language Mastery

A structured Bangla Language path to continue after this chapter.

6 lessons8.5h4.9 (186)1.3K students

By Sadia Rahman

View course
Good fit৳2,999

Platform Building

Teacher Marketplace Blueprint

A structured Bangla Language path to continue after this chapter.

5 lessons6.8h4.9 (28)410 students

By Sadia Rahman

View course
FreeFree

English

Admission English Playbook

Free guided course with lessons you can jump into anytime.

4 lessons4.2h4.8 (91)2.8K students

By Rayan Akter

View course