অধ্যায় ক্রিয়া |
ক্রিয়া (Verb)
১. ক্রিয়ার সংজ্ঞা ও স্বরূপ
যে পদ দ্বারা কোনো কাজ করা, হওয়া বা থাকা বোঝায়, তাকে ক্রিয়া পদ বলে।
সংজ্ঞা: বাক্যে কর্তার কার্য, অবস্থা বা অস্তিত্ব প্রকাশকারী পদকে ক্রিয়া বলে। সংস্কৃত: √ ক্রিয়া = কৃ ধাতু + অ (প্রত্যয়) — অর্থাৎ 'যা করা হয়'। |
উদাহরণ বিশ্লেষণ:
বাক্য | ক্রিয়া পদ | ক্রিয়া কী বোঝাচ্ছে |
রহিম বই পড়ে। | পড়ে | কাজ করা (সক্রিয় কাজ) |
ফুলটি সুন্দর। | (আছে — উহ্য) | অবস্থা প্রকাশ |
শিশুটি ঘুমাচ্ছে। | ঘুমাচ্ছে | অবস্থা ও কাজ উভয় |
ঈশ্বর আছেন। | আছেন | অস্তিত্ব প্রকাশ |
পাখিটি গান গায়। | গায় | কাজ করা |
বৃষ্টি পড়ছে। | পড়ছে | প্রাকৃতিক ক্রিয়া |
সূর্য পূর্বে ওঠে। | ওঠে | স্বাভাবিক কার্য |
২. ধাতু (Root / Verbal Root)
ক্রিয়ার মূল রূপকে ধাতু বলে। ধাতু থেকেই বিভিন্ন বিভক্তি যোগ করে ক্রিয়ার নানারকম রূপ তৈরি হয়। ধাতু চেনার সহজ উপায় হলো ক্রিয়ার শেষ থেকে বিভক্তি বাদ দিলে যা থাকে সেটাই ধাতু।
সূত্র: ক্রিয়া = ধাতু + বিভক্তি যেমন: পড়ি = √পড়্ + ই | যাচ্ছে = √যা + চ্ছে | বলেছিলেন = √বল্ + এছিলেন |
২.১ ধাতুর প্রকারভেদ — উৎস অনুযায়ী
ধাতুর প্রকার | উদাহরণ | বিশেষত্ব ও উৎস |
মৌলিক ধাতু (সিদ্ধ ধাতু) | √কর্, √খা, √যা, √দে, √নে, √বল্, √পড়্, √লেখ্, √ধর্, √মার্ | সরাসরি ভাষায় বিদ্যমান; আর বিশ্লেষণ হয় না |
সাধিত ধাতু (কৃদন্ত ধাতু) | √করা-ন = করান, √পড়া-ন = পড়ান, √খাওয়া-ন = খাওয়ান | মৌলিক ধাতু থেকে নির্মিত |
নামধাতু (Denominative) | √লাঠি > লাঠান, √ধুলো > ধুলান, √বেত > বেতান | বিশেষ্য/বিশেষণ থেকে তৈরি ধাতু |
প্রযোজক ধাতু (Causative) | √পড়্ > পড়া-ন > পড়া-নো, √করা-ন > করা-নো | অন্যকে দিয়ে কাজ করানো অর্থ |
তৎসম ধাতু | √গম্, √পঠ্, √লিখ্, √শ্রু, √দৃশ্, √জ্ঞা | সংস্কৃত মূল ধাতু — ব্যাকরণ পরিভাষায় |
বিদেশি ধাতু | √খরিদ্ (ফার্সি), √হুকুম্ (আরবি) | বিদেশি শব্দ থেকে ক্রিয়া তৈরি |
২.২ মৌলিক ধাতুর বিস্তারিত তালিকা
পরীক্ষায় ধাতু চিহ্নিত করার জন্য নিচের তালিকাটি মনে রাখুন:
ধাতুর শ্রেণি | ধাতুসমূহ | উদাহরণ (ক্রিয়া রূপে) |
গমনাত্মক | √যা, √আ, √যাই, √ছুট্, √চল্, √ওঠ্, √নাম্ | যাই, আসি, ছুটি, চলি, উঠি, নামি |
সংযোগাত্মক | √দে, √নে, √পাঠা, √পাঠা-ও, √পাঠা-নো | দিই, নিই, পাঠাই |
কার্যাত্মক | √কর্, √বল্, √লেখ্, √পড়্, √ধর্, √ছাড়্ | করি, বলি, লিখি, পড়ি, ধরি, ছাড়ি |
অনুভূতিবাচক | √ভালোবাস্, √ঘৃণা কর্, √ভয় পা, √ভাব্ | ভালোবাসি, ভয় পাই, ভাবি |
অস্তিত্ববাচক | √আছ্, √থাক্, √হ, √বিরাজ্ কর্ | আছি, থাকি, হই |
পরিবর্তনবাচক | √বাড়্, √কম্, √শুক্না, √শুকা | বাড়ি, কমি |
বোধাত্মক | √জান্, √বোঝ্, √দেখ্, √শোন্, √স্মর্ | জানি, বুঝি, দেখি, শুনি |
২.৩ নামধাতু — বিস্তারিত
বিশেষ্য বা বিশেষণ শব্দের সঙ্গে 'আন/ওয়ান' প্রত্যয় যোগ করে বা সরাসরি ব্যবহারে যে ধাতু তৈরি হয়, তাকে নামধাতু বলে।
মূল শব্দ (বিশেষ্য/বিশেষণ) | নামধাতু | ক্রিয়া রূপ ও অর্থ |
লাঠি (বিশেষ্য) | লাঠান | লাঠাই, লাঠালাম — লাঠি দিয়ে মারা |
বেত (বিশেষ্য) | বেতান | বেতাই — বেত দিয়ে প্রহার |
ধুলো (বিশেষ্য) | ধুলান | ধুলাই — ধুলোয় মাখামাখি করা |
ভালো (বিশেষণ) | ভালান | ভালাই — ভালো করা |
ফাঁকি (বিশেষ্য) | ফাঁকি দেওয়া | ফাঁকি দিই — প্রতারণা করা |
জাদু (বিশেষ্য) | জাদু করা | জাদু করি — ইন্দ্রজাল দেখানো |
খুশি (বিশেষণ) | খুশি করা | খুশি করি |
মাথা (বিশেষ্য) | মাথা নোয়ানো | মাথা নোয়াই — সম্মতি জানানো |
৩. কর্মের ভিত্তিতে ক্রিয়ার প্রকারভেদ
বাক্যে কর্মের উপস্থিতি ও সংখ্যার ভিত্তিতে ক্রিয়াকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়:
প্রকার | বৈশিষ্ট্য | উদাহরণ |
অকর্মক ক্রিয়া | কর্ম নেই; শুধু কর্তা থাকে। 'কী/কাকে' প্রশ্নের উত্তর নেই। | পাখি ডাকে। শিশু হাসে। বৃষ্টি পড়ে। সূর্য ওঠে। শিশু ঘুমায়। |
সকর্মক ক্রিয়া | একটি কর্ম আছে। 'কী/কাকে' প্রশ্ন করলে উত্তর পাওয়া যায়। | রহিম বই পড়ে। মা ভাত রাঁধেন। সে গান গায়। |
দ্বিকর্মক ক্রিয়া | দুটি কর্ম আছে — মুখ্য কর্ম (বস্তু) ও গৌণ কর্ম (ব্যক্তি)। | মা শিশুকে দুধ খাওয়ায়। শিক্ষক ছাত্রকে বই দেন। |
দ্বিকর্মক ক্রিয়া বিশ্লেষণ — বিশেষ গুরুত্ব |
দ্বিকর্মক ক্রিয়ায় দুটি কর্ম থাকে: মুখ্য কর্ম (Direct Object) = বস্তুবাচক, 'কী' প্রশ্নের উত্তর গৌণ কর্ম (Indirect Object) = ব্যক্তিবাচক, 'কাকে' প্রশ্নের উত্তর উদাহরণ: 'শিক্ষক ছাত্রকে বই দিলেন।' → 'কী দিলেন?' — বই (মুখ্য কর্ম) → 'কাকে দিলেন?' — ছাত্রকে (গৌণ কর্ম) → 'দিলেন' = দ্বিকর্মক সকর্মক ক্রিয়া আরো উদাহরণ: মা আমাকে গল্প বললেন | বাবা আমাকে টাকা দিলেন | রহিম সবাইকে মিষ্টি খাওয়াল |
৩.১ অকর্মক থেকে সকর্মকে রূপান্তর
অনেক ক্রিয়া প্রসঙ্গ অনুযায়ী অকর্মক বা সকর্মক দুইভাবে ব্যবহার হতে পারে:
অকর্মক ব্যবহার | সকর্মক ব্যবহার | ধাতু |
পাখি ডাকে। (কাকে ডাকে? — নেই) | সে বন্ধুকে ডাকে। (বন্ধুকে = কর্ম) | √ডাক্ |
সে হাঁটে। | সে পথ হাঁটে। | √হাঁট্ |
নদী বহে। | নদী জল বহে। | √বহ্ |
শিশু খায়। | শিশু ভাত খায়। | √খা |
সে গান গায়। | সে রবীন্দ্রসংগীত গায়। | √গা |
৪. সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়া
প্রকার | সমাপিকা ক্রিয়া | অসমাপিকা ক্রিয়া |
সংজ্ঞা | যে ক্রিয়া দিয়ে বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ হয়; বাক্যের শেষে থাকে। | যে ক্রিয়া দিয়ে বাক্যের অর্থ সম্পূর্ণ হয় না; আরো ক্রিয়া প্রয়োজন। |
রূপ | পুরুষ ও কাল অনুযায়ী বিভক্তি থাকে। | 'এ/য়ে, ইয়া, তে, ইতে, ইলে, লে, আ, ওয়া' বিভক্তি — কাল ও পুরুষ নির্বিশেষে। |
উদাহরণ | রহিম গান গায়। সে বই পড়ল। তিনি চলে গেলেন। | খেয়ে যাও। গান গাইতে গাইতে চলল। পড়তে বসে ঘুমিয়ে পড়ল। |
পুরুষ/কাল | পুরুষ ও কাল অনুসরণ করে। | পুরুষ বা কাল অনুসরণ করে না। |
৪.১ অসমাপিকা ক্রিয়ার বিভক্তি ও ব্যবহার
বিভক্তি / রূপ | ব্যবহার | উদাহরণ বাক্য |
এ / য়ে | একটি কাজের পর আরেকটি | খেয়ে ঘুমাও। বলে চলে গেল। |
ইয়া (সাধু) | কারণ বা পূর্বকালীন অর্থে | খাইয়া ঘুমাইলাম। বলিয়া গেলেন। |
তে / ইতে | উদ্দেশ্য বা চলমান অর্থে | পড়তে বসেছি। খেলতে গেছে। |
লে / ইলে | শর্তার্থক অর্থে | গেলে দেখতে পাবে। জানলে বলতে। |
আ / ওয়া | বিশেষণীয় অর্থে (Verbal Noun) | পড়া ভালো। যাওয়া উচিত। |
তে তে / তে তে | ক্রমাগত কাজ চলতে থাকলে | গাইতে গাইতে হাঁটছে। |
ইতে ইতে (সাধু) | সাধু ভাষায় একই | গাহিতে গাহিতে চলিল। |
৫. ক্রিয়ার কাল (Tense)
ক্রিয়া কখন সংঘটিত হয়েছে বা হচ্ছে বা হবে — তা বোঝাতে কালের ব্যবহার হয়। বাংলায় মূলত তিনটি কাল — বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।
৫.১ বর্তমান কাল (Present Tense)
বর্তমান কালের ভেদ | সংজ্ঞা | উদাহরণ (আমি) | উদাহরণ বাক্য |
সাধারণ বর্তমান | এখন বা সবসময় সত্য | করি / যাই / পড়ি | সে প্রতিদিন ব্যায়াম করে। |
ঘটমান বর্তমান | এই মুহূর্তে চলছে | করছি / যাচ্ছি | সে এখন পড়ছে। |
পুরাঘটিত বর্তমান | কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে | করেছি / গেছি | সে বই পড়েছে। |
অভিজ্ঞতামূলক | জীবনে কখনো হয়েছে | করেছি / দেখেছি | আমি তাজমহল দেখেছি। |
৫.২ অতীত কাল (Past Tense)
অতীত কালের ভেদ | সংজ্ঞা | উদাহরণ রূপ | উদাহরণ বাক্য |
সাধারণ অতীত | কিছুক্ষণ আগে হয়েছে | করলাম / গেলাম | সে বই পড়ল। |
ঘটমান অতীত | অতীতে চলছিল | করছিলাম / যাচ্ছিলাম | সে পড়ছিল। |
পুরাঘটিত অতীত | অতীতের আগে শেষ | করেছিলাম / গিয়েছিলাম | সে বই পড়েছিল। |
নিত্যবৃত্ত অতীত | অতীতে প্রতিনিয়ত | করতাম / যেতাম | ছোটবেলায় প্রতিদিন মাঠে যেতাম। |
আকাঙ্ক্ষাসূচক অতীত | অতীতের ইচ্ছা | করতাম / পারতাম | যদি যেতাম ভালো হতো। |
৫.৩ ভবিষ্যৎ কাল (Future Tense)
ভবিষ্যৎ কালের ভেদ | সংজ্ঞা | উদাহরণ রূপ | উদাহরণ বাক্য |
সাধারণ ভবিষ্যৎ | পরে হবে | করব / যাব | সে কাল বাড়ি যাবে। |
অনুজ্ঞা (আদেশ/অনুরোধ) | করতে বলা হচ্ছে | করো / করুন / কর | এখানে বসুন। |
সম্ভাবনাসূচক | সম্ভবত হবে | হয়তো করব | সে হয়তো আসবে। |
শর্তসাপেক্ষ ভবিষ্যৎ | শর্তে হবে | যদি যাই তবে দেখব | পড়লে পাস করবে। |
৬. পুরুষ ও বচন অনুযায়ী ক্রিয়ার রূপ
বাংলায় ক্রিয়ার রূপ পুরুষ ও কাল উভয়ের উপর নির্ভরশীল। এটি বাংলা ভাষার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
৬.১ 'করা' ধাতুর সম্পূর্ণ রূপ তালিকা
পুরুষ | সর্বনাম | সাধারণ বর্তমান | ঘটমান বর্তমান | পুরাঘটিত বর্তমান | সাধারণ অতীত | ভবিষ্যৎ |
উত্তম | আমি | করি | করছি | করেছি | করলাম | করব |
উত্তম (বহু) | আমরা | করি | করছি | করেছি | করলাম | করব |
মধ্যম তুচ্ছ | তুই | করিস | করছিস | করেছিস | করলি | করবি |
মধ্যম সাধারণ | তুমি | করো | করছ | করেছ | করলে | করবে |
মধ্যম সম্মান | আপনি | করেন | করছেন | করেছেন | করলেন | করবেন |
নাম সাধারণ | সে/ও | করে | করছে | করেছে | করল | করবে |
নাম সম্মান | তিনি | করেন | করছেন | করেছেন | করলেন | করবেন |
৬.২ 'যাওয়া' ধাতুর সম্পূর্ণ রূপ
পুরুষ | সর্বনাম | সা.বর্তমান | ঘ.বর্তমান | পু.বর্তমান | সা.অতীত | ভবিষ্যৎ |
উত্তম | আমি | যাই | যাচ্ছি | গেছি | গেলাম | যাব |
উত্তম (বহু) | আমরা | যাই | যাচ্ছি | গেছি | গেলাম | যাব |
মধ্যম তুচ্ছ | তুই | যাস | যাচ্ছিস | গেছিস | গেলি | যাবি |
মধ্যম সাধারণ | তুমি | যাও | যাচ্ছ | গেছ | গেলে | যাবে |
মধ্যম সম্মান | আপনি | যান | যাচ্ছেন | গেছেন | গেলেন | যাবেন |
নাম সাধারণ | সে | যায় | যাচ্ছে | গেছে | গেল | যাবে |
নাম সম্মান | তিনি | যান | যাচ্ছেন | গেছেন | গেলেন | যাবেন |
৬.৩ 'হওয়া' ধাতুর সম্পূর্ণ রূপ
পুরুষ | সর্বনাম | সা.বর্তমান | ঘ.বর্তমান | পু.বর্তমান | সা.অতীত | ভবিষ্যৎ |
উত্তম | আমি | হই | হচ্ছি | হয়েছি | হলাম | হব |
উত্তম (বহু) | আমরা | হই | হচ্ছি | হয়েছি | হলাম | হব |
মধ্যম তুচ্ছ | তুই | হিস | হচ্ছিস | হয়েছিস | হলি | হবি |
মধ্যম সাধারণ | তুমি | হও | হচ্ছ | হয়েছ | হলে | হবে |
মধ্যম সম্মান | আপনি | হন | হচ্ছেন | হয়েছেন | হলেন | হবেন |
নাম সাধারণ | সে | হয় | হচ্ছে | হয়েছে | হল | হবে |
নাম সম্মান | তিনি | হন | হচ্ছেন | হয়েছেন | হলেন | হবেন |
৭. অনুজ্ঞা (Imperative Mood)
আদেশ, অনুরোধ, উপদেশ, নিষেধ, প্রার্থনা ইত্যাদি প্রকাশের জন্য ক্রিয়ার যে বিশেষ রূপ ব্যবহৃত হয়, তাকে অনুজ্ঞা বলে। অনুজ্ঞা সাধারণত মধ্যম পুরুষে হয়।
পুরুষ | ধাতু | অনুজ্ঞার রূপ | উদাহরণ বাক্য |
মধ্যম তুচ্ছ (সাধারণ) | √কর্ | কর | এখানে বস্। |
মধ্যম তুচ্ছ (ভবিষ্যৎ) | √যা | যাস | কাল যাস। |
মধ্যম সাধারণ (সাধারণ) | √কর্ | করো | বইটা পড়ো। |
মধ্যম সাধারণ (ভবিষ্যৎ) | √যা | যেও | কাল যেও। |
মধ্যম সম্মান (সাধারণ) | √কর্ | করুন | এদিকে আসুন। |
মধ্যম সম্মান (ভবিষ্যৎ) | √যা | যাবেন | কাল যাবেন। |
নাম পুরুষ (ইচ্ছা) | √কর্ | করুক | সে বই পড়ুক। |
নিষেধাত্মক (না) | √কর্ | করো না / করিস না | মিথ্যা বলো না। |
৮. বাচ্য (Voice)
বাক্যে ক্রিয়ার সাথে কর্তা বা কর্মের সম্পর্ক অনুযায়ী বাচ্য নির্ধারিত হয়। বাংলায় তিন প্রকার বাচ্য আছে:
৮.১ কর্তৃবাচ্য (Active Voice)
বাক্যে কর্তা প্রধান থাকলে এবং ক্রিয়া কর্তার অনুসরণ করলে কর্তৃবাচ্য হয়।
বৈশিষ্ট্য: কর্তা + কর্ম + ক্রিয়া | ক্রিয়া কর্তার পুরুষ মেনে চলে। উদাহরণ: রহিম বই পড়ে। | সে গান গায়। | মা ভাত রান্না করেন। | পাখি গান গায়। |
৮.২ কর্মবাচ্য (Passive Voice)
বাক্যে কর্ম প্রধান থাকলে এবং ক্রিয়া কর্মের অনুসরণ করলে কর্মবাচ্য হয়। কর্তা থাকলে 'দ্বারা/কর্তৃক' বিভক্তি পায়।
বৈশিষ্ট্য: কর্তা (দ্বারা) + কর্ম + ক্রিয়া(হওয়া-যোগ) | ক্রিয়া কর্মের পুরুষ মেনে চলে। উদাহরণ: রহিম কর্তৃক বইটি পড়া হয়। | তার দ্বারা গান গাওয়া হয়। | মা কর্তৃক ভাত রান্না হয়। |
কর্তৃবাচ্য থেকে কর্মবাচ্যে রূপান্তরের নিয়ম:
কর্তৃবাচ্য | → | কর্মবাচ্য |
রহিম বই পড়ে। | → | রহিম কর্তৃক বই পড়া হয়। |
তুমি চিঠি লিখলে। | → | তোমার দ্বারা চিঠি লেখা হল। |
শিক্ষক পাঠ পড়াচ্ছেন। | → | শিক্ষক কর্তৃক পাঠ পড়ানো হচ্ছে। |
সরকার রাস্তা বানাল। | → | সরকার কর্তৃক রাস্তা নির্মিত হল। |
মা ভাত রান্না করেছেন। | → | মা কর্তৃক ভাত রান্না করা হয়েছে। |
৮.৩ ভাববাচ্য (Impersonal Voice)
বাক্যে ক্রিয়ার ভাব বা অর্থ প্রধান হলে ভাববাচ্য হয়। এখানে কর্তা বা কর্ম কোনোটিই প্রধান নয়, বরং ক্রিয়ার 'অবস্থা' বা 'ভাব' প্রকাশ পায়। ক্রিয়া সর্বদা নাম পুরুষ একবচনে থাকে।
বৈশিষ্ট্য: কর্তা 'র/এর' বিভক্তি পায় বা অনুক্ত থাকে | ক্রিয়া = ধাতু + আ/ওয়া + হয়/হচ্ছে। উদাহরণ: এখানে বসা যায় না। | আর সহ্য হয় না। | তার আর যাওয়া হল না। | রোজ পড়া উচিত। |
ভাববাচ্যের উদাহরণ | বিশ্লেষণ |
আমার যাওয়া হবে না। | 'আমার' কর্তা — 'র' বিভক্তি; ক্রিয়া = যাওয়া + হবে না |
এখানে খাওয়া যায়। | কর্তা অনুক্ত; 'খাওয়া যায়' = ভাব প্রকাশ |
তোমার এখানে থাকা ঠিক না। | 'তোমার' কর্তা — 'র' বিভক্তি |
বৃষ্টিতে ভেজা ভালো। | কর্তা অনুক্ত; সাধারণ সত্য প্রকাশ |
শীতে বাইরে যাওয়া কষ্টের। | কর্তা অনুক্ত; সাধারণ অভিজ্ঞতা |
৯. যৌগিক ক্রিয়া (Compound Verb)
দুটি ক্রিয়া একত্রিত হয়ে যখন একটি বিশেষ অর্থ প্রকাশ করে, তখন তাকে যৌগিক ক্রিয়া বলে। প্রথম ক্রিয়াটি মূল অর্থ বহন করে, দ্বিতীয়টি অর্থকে পরিপূর্ণ করে।
৯.১ যৌগিক ক্রিয়ার সহায়ক ধাতু ও তাদের অর্থ
সহায়ক ধাতু | প্রকাশিত ভাব | উদাহরণ |
√ফেল্ (ফেলা) | সম্পন্নতা, হঠাৎ বা সম্পূর্ণভাবে করা | বলে ফেলল, খেয়ে ফেলল, মেরে ফেলল। |
√নে (নেওয়া) | নিজের জন্য করা | বলে নিলাম, খেয়ে নিলাম, দেখে নিলাম। |
√দে (দেওয়া) | অন্যের জন্য করা | বলে দিলাম, খাইয়ে দিলাম, লিখে দিলাম। |
√রাখ্ (রাখা) | ভবিষ্যতের জন্য করা | বলে রাখলাম, লিখে রাখলাম, ধরে রাখো। |
√আয় / আ (আসা) | ক্রমাগত বা ফিরে আসা | বলে আসলাম, করে আসছি। |
√চল্ (চলা) | ক্রমাগত চলতে থাকা | বলে চলল, হেঁটে চলল। |
√উঠ্ (ওঠা) | হঠাৎ আরম্ভ | কেঁদে উঠল, হেসে উঠল, বলে উঠল। |
√পড়্ (পড়া) | অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটা | ঘুমিয়ে পড়ল, হেসে পড়ল, ভেঙে পড়ল। |
√বস্ (বসা) | হঠাৎ শুরু বা স্থায়িত্ব | বলে বসলাম, খেয়ে বসল। |
√ছাড়্ (ছাড়া) | বিরতিহীনভাবে করা, সম্পূর্ণভাবে | বলে ছাড়ব, করেই ছাড়ব। |
৯.২ মিশ্র ক্রিয়া (Mixed / Conjunct Verb)
বিদেশি বা বাংলা বিশেষ্য/বিশেষণের সাথে 'করা', 'দেওয়া', 'হওয়া', 'পাওয়া' ইত্যাদি ধাতু যুক্ত হয়ে যে ক্রিয়া তৈরি হয়, তাকে মিশ্র ক্রিয়া বলে।
মূল শব্দ | সহায়ক ধাতু | মিশ্র ক্রিয়া | উদাহরণ বাক্য |
ভালোবাসা | করা | ভালোবাসা করা | সে তোমাকে ভালোবাসে। |
আরম্ভ (তৎসম) | করা | আরম্ভ করা | কাজ আরম্ভ হয়েছে। |
শুরু (দেশি) | করা | শুরু করা | পড়া শুরু করো। |
ভয় (বাংলা) | পাওয়া | ভয় পাওয়া | অন্ধকারে ভয় পাই। |
সাহায্য (আরবি) | করা | সাহায্য করা | বন্ধুকে সাহায্য করো। |
খেলা (বাংলা) | করা | খেলা করা | মাঠে খেলা করছে। |
গান (বাংলা) | গাওয়া | গান গাওয়া | সে গান গায়। |
কাজ (আরবি) | করা | কাজ করা | মনোযোগ দিয়ে কাজ করো। |
১০. প্রযোজক ক্রিয়া (Causative Verb)
যখন কর্তা নিজে কাজ না করে অন্যকে দিয়ে করায়, তখন যে ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়, তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে। বাংলায় প্রযোজক ক্রিয়া গঠিত হয় ধাতুর সাথে 'আন/ওয়ান' প্রত্যয় যোগ করে।
নিয়ম: মূল ধাতু + আন/ওয়ান = প্রযোজক ধাতু উদাহরণ: √খা + আন = খাওয়ান | √পড়্ + আন = পড়ান | √কাঁদ্ + আন = কাঁদান |
মূল ধাতু | প্রযোজক ধাতু | প্রযোজক ক্রিয়া | উদাহরণ বাক্য |
√খা (খাওয়া) | খাওয়া-ন | খাওয়াই | মা শিশুকে ভাত খাওয়াচ্ছেন। |
√পড়্ (পড়া) | পড়া-ন | পড়াই | শিক্ষক ছাত্রকে পড়াচ্ছেন। |
√ঘুমা (ঘুমানো) | ঘুমা-ন | ঘুমাই | মা শিশুকে ঘুমাচ্ছেন। |
√দেখ্ (দেখা) | দেখা-ন | দেখাই | সে বাড়িটা দেখাল। |
√শোন্ (শোনা) | শোনা-ন | শোনাই | সে গল্প শুনিয়ে দিল। |
√কাঁদ্ (কাঁদা) | কাঁদা-ন | কাঁদাই | সে আমাকে কাঁদাল। |
√বস্ (বসা) | বসা-ন | বসাই | সে অতিথিকে বসাল। |
√হাঁট্ (হাঁটা) | হাঁটা-ন | হাঁটাই | ডাক্তার রোগীকে হাঁটালেন। |
প্রযোজক ক্রিয়ার বিশেষ নিয়ম |
প্রযোজক ক্রিয়ায় বাক্যে দুটি কর্তা থাকতে পারে — মূল কর্তা (যে করায়) ও প্রযোজ্য কর্তা (যাকে দিয়ে করানো হয়)। উদাহরণ: 'মা শিশুকে ভাত খাওয়াচ্ছেন।' — মা = মূল কর্তা; শিশু = প্রযোজ্য কর্তা। ধাতুতে যদি 'আ' থাকে, প্রযোজক রূপে 'ওয়ান' যোগ হয়: খা → খাওয়ান। ধাতুতে 'আ' না থাকলে শুধু 'আন' যোগ হয়: পড়্ → পড়ান, বস্ → বসান। |
১১. সাধু ও চলিত ভাষায় ক্রিয়ার রূপ
বাংলা সাহিত্যে ও পরীক্ষায় সাধু ও চলিত উভয় রূপের ক্রিয়া দেখা যায়। রূপান্তর করতে পারা অত্যন্ত জরুরি।
১১.১ সাধু → চলিত রূপান্তরের নিয়ম
সাধু থেকে চলিত: মূল পরিবর্তনসমূহ |
সাধুতে 'ইয়া' → চলিতে 'এ/য়ে': খাইয়া → খেয়ে, বলিয়া → বলে, যাইয়া → গিয়ে সাধুতে 'ইতে' → চলিতে 'তে': পড়িতে → পড়তে, যাইতে → যেতে সাধুতে 'ইলে' → চলিতে 'লে': পড়িলে → পড়লে, গেলে → গেলে সাধুতে 'ইয়াছে' → চলিতে 'এছে': পড়িয়াছে → পড়েছে, বলিয়াছে → বলেছে সাধুতে 'ইল' → চলিতে 'ল': পড়িল → পড়ল, বলিল → বলল, গেল → গেল সাধুতে 'ইতেছে' → চলিতে 'ছে': পড়িতেছে → পড়ছে সাধুতে 'ইবে' → চলিতে 'বে': পড়িবে → পড়বে, যাইবে → যাবে সাধুতে 'ইব' → চলিতে 'ব': পড়িব → পড়ব, যাইব → যাব |
১১.২ পুরুষ ও কাল অনুযায়ী সাধু-চলিত তুলনা সারণি
পুরুষ | সর্বনাম | সা.বর্তমান (সাধু) | সা.বর্তমান (চলিত) | সা.অতীত (সাধু) | সা.অতীত (চলিত) | ভবিষ্যৎ (সাধু) | ভবিষ্যৎ (চলিত) |
উত্তম | আমি | করি | করি | করিলাম | করলাম | করিব | করব |
মধ্যম তুচ্ছ | তুই | করিস | করিস | করিলি | করলি | করিবি | করবি |
মধ্যম সাধারণ | তুমি | করিও | করো | করিলে | করলে | করিবে | করবে |
মধ্যম সম্মান | আপনি | করেন | করেন | করিলেন | করলেন | করিবেন | করবেন |
নাম সাধারণ | সে | করে | করে | করিল | করল | করিবে | করবে |
নাম সম্মান | তিনি | করেন | করেন | করিলেন | করলেন | করিবেন | করবেন |
১১.৩ অসমাপিকা ক্রিয়ার সাধু-চলিত রূপ
বিভক্তি | সাধু রূপ | চলিত রূপ | উদাহরণ (চলিত) |
ক্রিয়াজাত বিশেষণ | করিয়া / বলিয়া | করে / বলে | বলে চলে গেল। |
উদ্দেশ্যবাচক | করিতে / যাইতে | করতে / যেতে | পড়তে বসেছে। |
শর্তার্থক | করিলে / গেলে | করলে / গেলে | গেলে দেখতে পাবে। |
পুরাঘটিত | করিয়াছে | করেছে | বই পড়েছে। |
ঘটমান | করিতেছে | করছে | এখন পড়ছে। |
১২. কৃদন্ত পদ (Participle / Verbal Derivative)
ধাতুর সাথে কৃৎ প্রত্যয় যোগ হয়ে যে পদ তৈরি হয়, তাকে কৃদন্ত পদ বলে। কৃদন্ত পদ বিশেষ্য, বিশেষণ বা ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে কাজ করে।
কৃৎ প্রত্যয় | উদাহরণ | পদ হিসেবে | বাক্যে প্রয়োগ |
অনট্ (অন) | √পড়্ + অন = পড়ন, √কর্ + অন = করণ | বিশেষ্য | পাঠের কারণ বোঝা |
তৃচ্ (তা/তৃ) | √পড়্ + তা = পাঠক, √দা + তা = দাতা | বিশেষ্য/বিশেষণ | পাঠক ভালো মানুষ। |
ক্ত (ত) | √পড়্ + ত = পঠিত, √কৃ + ত = কৃত | বিশেষণ | পঠিত বইটি সুন্দর। |
তব্য | √পড়্ + তব্য = পাঠিতব্য | বিশেষণ | পাঠিতব্য বইয়ের তালিকা। |
অনীয় | √পড়্ + অনীয় = পাঠনীয় | বিশেষণ | পাঠনীয় বিষয়। |
ঘঞ্ (অ) | √পচ্ + অ = পাক, √ভজ্ + অ = ভাজ | বিশেষ্য | খাবার পাক হয়েছে। |
আ (বাংলা) | √পড়্ + আ = পড়া, √লেখ্ + আ = লেখা | বিশেষ্য/বিশেষণ | পড়া শেষ হয়েছে। |
ওয়া (বাংলা) | √যা + ওয়া = যাওয়া, √খা + ওয়া = খাওয়া | বিশেষ্য | যাওয়া উচিত। |
১৩. বিশেষ ক্রিয়া প্রয়োগ ও নিয়ম
১৩.১ 'হওয়া' ক্রিয়ার বিশেষ ব্যবহার
'হওয়া' বাংলায় সর্বাধিক ব্যবহৃত ক্রিয়াগুলির একটি। এর বিভিন্ন প্রয়োগ পরীক্ষায় আসে:
'হওয়া'-র প্রয়োগ | উদাহরণ |
অস্তিত্ব প্রকাশ | ঈশ্বর আছেন। (সমতুল্য: ঈশ্বর হন) |
পরিণতি প্রকাশ | শিশুটি বড় হয়েছে। সে ডাক্তার হয়েছে। |
নির্মাণ প্রকাশ | বাড়িটি তৈরি হচ্ছে। |
ঘটনা প্রকাশ | কী হয়েছে? দুর্ঘটনা হয়েছে। |
সম্পন্নতা প্রকাশ | কাজ হয়ে গেছে। পড়া হয়ে গেছে। |
সহায়ক ক্রিয়া হিসেবে | পড়া হয়েছে। বলা হয়েছে। (কর্মবাচ্য) |
১৩.২ 'দেওয়া' ও 'নেওয়া' — পার্থক্য
যৌগিক ক্রিয়ায় 'দেওয়া' ও 'নেওয়া'-র ব্যবহার গুলিয়ে ফেলা হয়। স্পষ্ট পার্থক্য নিচে:
বৈশিষ্ট্য | দেওয়া (অপরের জন্য) | নেওয়া (নিজের জন্য) |
অর্থ | অন্যের সুবিধার জন্য করা | নিজের সুবিধার জন্য করা |
উদাহরণ ১ | বলে দিলাম (তোমাকে জানালাম) | বলে নিলাম (নিজে জেনে নিলাম) |
উদাহরণ ২ | লিখে দাও (আমার হয়ে লেখো) | লিখে নাও (নিজের জন্য লিখে রাখো) |
উদাহরণ ৩ | খাইয়ে দিলাম (তাকে খাওয়ালাম) | খেয়ে নিলাম (নিজে খেলাম) |
১৩.৩ দ্বিরুক্ত ক্রিয়া ও তার অর্থ
একই ক্রিয়া দুবার ব্যবহারে বিশেষ অর্থ প্রকাশ পায়:
দ্বিরুক্ত ক্রিয়া | অর্থ প্রকাশ | উদাহরণ |
যেতে যেতে | ক্রমাগত চলমান | যেতে যেতে গান গাইছিল। |
পড়তে পড়তে | চলতে থাকা | পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়ল। |
হাসতে হাসতে | একটানা হাসি | হাসতে হাসতে বলল। |
চলতে চলতে | অবিরাম গতি | চলতে চলতে থামল। |
দেখতে দেখতে | হঠাৎ | দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। |
১৪. সাহিত্যে ক্রিয়ার ব্যবহার
১৪.১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গীতাঞ্জলি ও অন্যান্য রচনায় ক্রিয়া বিশ্লেষণ |
'আমারে তুমি অশেষ করেছ, এমনি লীলা তব' — গীতাঞ্জলি অশেষ করেছ = সকর্মক ক্রিয়া; পুরাঘটিত বর্তমান; মধ্যম পুরুষ সম্মান 'করেছ' = কর্ তৃবাচ্য; কর্তা 'তুমি', কর্ম 'আমারে' 'যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে' — শেষ লেখা পড়বে না = অকর্মক ক্রিয়া; নেতিবাচক ভবিষ্যৎ; নাম পুরুষ 'পড়বে' = ভবিষ্যৎকালীন সাধারণ 'আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি' — আমার সোনার বাংলা 'হতে' = অসমাপিকা ক্রিয়া; অপাদান অর্থে ('থেকে') এখানে 'হতে' ক্রিয়া নয়, বিভক্তির ভূমিকায় |
১৪.২ কাজী নজরুল ইসলাম
বিদ্রোহী ও অন্যান্য কবিতায় ক্রিয়া বিশ্লেষণ |
'আমি বিদ্রোহী ভৃগু, ভগবান বুকে এঁকে দিই পদ-চিহ্ন!' এঁকে দিই = যৌগিক ক্রিয়া; 'এঁকে' অসমাপিকা + 'দিই' সমাপিকা 'দিই' = দেওয়া ক্রিয়া; উত্তম পুরুষ বর্তমান; অর্থ: অন্যের জন্য করা 'মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত' হব = ভবিষ্যৎকাল; উত্তম পুরুষ একবচন 'হব শান্ত' = মিশ্র ক্রিয়া (বিশেষণ + হওয়া) 'জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি।' — সাম্যবাদী জুড়িয়া = সাধু ভাষার অসমাপিকা ক্রিয়া (চলিতে: জুড়িয়ে) আছে = অকর্মক ক্রিয়া; অস্তিত্ব প্রকাশ; নাম পুরুষ বর্তমান |
১৪.৩ মাইকেল মধুসূদন দত্ত
মেঘনাদবধ কাব্য থেকে ক্রিয়া বিশ্লেষণ |
'সিন্ধুতীরে রহি তুমি ভাব হে রাঘব' — মেঘনাদবধ কাব্য রহি = অসমাপিকা ক্রিয়া (সাধু); 'থেকে' অর্থে ভাব = অনুজ্ঞা (সাধারণ মধ্যম); উপদেশমূলক 'কাঁদিছেন বিধবা কোথায়ও, শোকে মুহ্যমান' — মেঘনাদবধ কাঁদিছেন = ঘটমান বর্তমান (সাধু); নাম পুরুষ সম্মান চলিত রূপ: কাঁদছেন |
১৪.৪ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
বর্ণপরিচয় ও অন্যান্য রচনা থেকে |
'অদ্য আমরা বিদ্যালয়ে যাইব।' — বর্ণপরিচয় যাইব = ভবিষ্যৎ কাল (সাধু); উত্তম পুরুষ বহুবচন চলিত রূপ: যাব 'বালকেরা মনোযোগ দিয়া পড়িতেছে।' — বর্ণপরিচয় দিয়া = সাধু অসমাপিকা ক্রিয়া (চলিত: দিয়ে) পড়িতেছে = সাধু ঘটমান বর্তমান (চলিত: পড়ছে) |
১৫. ক্রিয়া সংক্রান্ত বিশেষ নিয়ম ও ব্যতিক্রম
১৫.১ সংখ্যা অনুসরণ না করা ক্রিয়া
ব্যতিক্রম: বহুবচনেও একবচনের ক্রিয়া |
উত্তম পুরুষে একবচন ও বহুবচনে একই ক্রিয়া: আমি যাই / আমরা যাই মধ্যম সম্মান: আপনি যান / আপনারা যান — একই রূপ নাম সম্মান: তিনি যান / তাঁরা যান — একই রূপ তুচ্ছার্থ বহুবচন: তোরা যা (একবচনের মতো) |
১৫.২ অনুক্ত কর্তার ক্ষেত্রে ক্রিয়া
বাক্যে কর্তা উহ্য থাকলে ক্রিয়ার রূপ কর্তার অনুমানিত পুরুষ অনুযায়ী হয়:
বাক্য (উহ্য কর্তা) | বিশ্লেষণ |
(আমি) যাচ্ছি। | কর্তা 'আমি' উহ্য; ক্রিয়া উত্তম পুরুষ ঘটমান বর্তমান |
(তুমি) খেয়ে যাও। | কর্তা 'তুমি' উহ্য; অনুজ্ঞা মধ্যম পুরুষ |
(সে) আসছে। | কর্তা 'সে' উহ্য; নাম পুরুষ ঘটমান |
(আমরা) পারব না। | কর্তা 'আমরা' উহ্য; উত্তম পুরুষ ভবিষ্যৎ নেতিবাচক |
১৫.৩ নেতিবাচক ক্রিয়া গঠন
ক্রিয়ার কাল | নেতিবাচক রূপ | উদাহরণ |
বর্তমান | ক্রিয়া + না | যাই না, করি না, বলি না। |
অতীত | ক্রিয়া + নি / নাই / নি | যাইনি, করিনি, বলিনি। |
ভবিষ্যৎ | ক্রিয়া + না/ব না | যাব না, করব না, বলব না। |
অনুজ্ঞা (নিষেধ) | ক্রিয়া + না | যেও না, করো না, বলো না। |
ঘটমান | ক্রিয়া + না/চ্ছি না | যাচ্ছি না, করছি না। |
পুরাঘটিত | ক্রিয়া + নি/এনি | যাইনি, করিনি। |
১৫.৪ ক্রিয়ার সাথে 'ই' যোগে জোর প্রকাশ
মূল ক্রিয়া | জোরযুক্ত রূপ | অর্থ পরিবর্তন |
যাই | যাই-ই বা যাবই | অবশ্যই যাব |
করল | করলই | ঠিকই করল, অবাক করার মতো |
বলেছি | বলেছিই | আগেই বলেছি |
জানি | জানিই | নিশ্চিতভাবে জানি |
১৬. গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর রূপান্তর সারণি
নিচের ধাতুগুলি অনিয়মিতভাবে রূপান্তরিত হয় — পরীক্ষায় এগুলো থেকে বারবার প্রশ্ন আসে:
ধাতু | সা.বর্তমান | ঘ.বর্তমান | পু.বর্তমান | নি.বৃ.অতীত | সা.অতীত | ঘ.অতীত | ভবিষ্যৎ |
√যা | যাই | যাচ্ছি | গেছি | যেতাম | গেলাম | যাচ্ছিলাম | যাব |
√আ (আসা) | আসি | আসছি | এসেছি | আসতাম | এলাম | আসছিলাম | আসব |
√হ (হওয়া) | হই | হচ্ছি | হয়েছি | হতাম | হলাম | হচ্ছিলাম | হব |
√দে (দেওয়া) | দিই | দিচ্ছি | দিয়েছি | দিতাম | দিলাম | দিচ্ছিলাম | দেব |
√নে (নেওয়া) | নিই | নিচ্ছি | নিয়েছি | নিতাম | নিলাম | নিচ্ছিলাম | নেব |
√খা | খাই | খাচ্ছি | খেয়েছি | খেতাম | খেলাম | খাচ্ছিলাম | খাব |
√পা (পাওয়া) | পাই | পাচ্ছি | পেয়েছি | পেতাম | পেলাম | পাচ্ছিলাম | পাব |
√দেখ্ | দেখি | দেখছি | দেখেছি | দেখতাম | দেখলাম | দেখছিলাম | দেখব |
√বল্ | বলি | বলছি | বলেছি | বলতাম | বললাম | বলছিলাম | বলব |
√জান্ | জানি | জানছি | জেনেছি | জানতাম | জানলাম | জানছিলাম | জানব |
১৭. দ্রুত পুনরাবৃত্তি ও স্মরণীয় সূত্র
ক্রিয়ার প্রকারভেদ — এক নজরে |
■ কর্মের ভিত্তিতে: অকর্মক | সকর্মক | দ্বিকর্মক ■ সম্পূর্ণতার ভিত্তিতে: সমাপিকা | অসমাপিকা ■ গঠনের ভিত্তিতে: যৌগিক | মিশ্র | প্রযোজক | নামধাতুজ ■ বাচ্যের ভিত্তিতে: কর্তৃবাচ্য | কর্মবাচ্য | ভাববাচ্য ■ কালের ভিত্তিতে: বর্তমান (৩ ভেদ) | অতীত (৫ ভেদ) | ভবিষ্যৎ (৪ ভেদ) ■ ভাষার ভিত্তিতে: সাধু রূপ | চলিত রূপ |
পরীক্ষায় বারবার আসা ৮টি মূলসূত্র |
ধাতু + বিভক্তি = ক্রিয়া | বিভক্তি পুরুষ ও কাল অনুসারে পরিবর্তিত হয়। অকর্মক ক্রিয়া: 'কী/কাকে' প্রশ্নের উত্তর নেই | সকর্মক: আছে। সমাপিকা = বাক্য শেষে + পুরুষ/কাল মেনে চলে | অসমাপিকা = বাক্য শেষে নয় + পুরুষ/কাল মানে না। কর্তৃবাচ্য → কর্মবাচ্য: কর্তায় 'দ্বারা/কর্তৃক' যোগ + 'হওয়া' ধাতু। ভাববাচ্য: কর্তায় 'র/এর' বিভক্তি + ক্রিয়া সর্বদা নাম পুরুষ। প্রযোজক: ধাতু + আন/ওয়ান = অন্যকে দিয়ে কাজ করানো। যৌগিক ক্রিয়া: দুই ক্রিয়া মিলে একটি বিশেষ অর্থ; দ্বিতীয়টি সহায়ক। সাধু → চলিত: ইয়া→এ, ইতে→তে, ইল→ল, ইয়াছে→এছে, ইতেছে→ছে। |
১৮. অধ্যায় সারসংক্ষেপ
বিষয় | মূল কথা |
সংজ্ঞা | কাজ/অবস্থা/অস্তিত্ব প্রকাশকারী পদ |
ধাতু | ক্রিয়ার মূল; মৌলিক, নামধাতু, প্রযোজক, সাধিত |
কর্ম ভিত্তিক ভেদ | অকর্মক, সকর্মক, দ্বিকর্মক |
সমাপিকা / অসমাপিকা | বাক্য শেষ করে / করে না |
কাল | বর্তমান (৩), অতীত (৫), ভবিষ্যৎ (৪) |
পুরুষ ও বচন | ৩ পুরুষ × ৩ স্তর অনুযায়ী ক্রিয়ার ভিন্ন রূপ |
বাচ্য | কর্তৃ, কর্ম, ভাববাচ্য |
যৌগিক ক্রিয়া | দুই ক্রিয়া মিলে বিশেষ অর্থ |
প্রযোজক | ধাতু + আন/ওয়ান; অন্যকে দিয়ে করানো |
সাধু-চলিত | ইয়া→এ, ইতে→তে, ইল→ল, ইয়াছে→এছে প্রধান পরিবর্তন |
পরীক্ষার প্রস্তুতি — চূড়ান্ত পরামর্শ ধাতু চিনুন → কাল নির্ণয় করুন → পুরুষ সনাক্ত করুন → বাচ্য নির্ধারণ করুন → সাধু/চলিত রূপান্তর করুন |