খাঁটি বাংলা উপসর্গ
১. ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিকতা
বাংলা শব্দগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো উপসর্গযোগ। কোনো শব্দ বা ধাতুর আগে একটি অর্থবাহী রূপ যুক্ত হয়ে তার অর্থের পরিবর্তন, সম্প্রসারণ, নিন্দা, অভাব, তীব্রতা, উৎকর্ষ, অপকর্ষ, ভিন্নতা কিংবা পূর্ণতার ধারণা প্রকাশ করলে তাকে উপসর্গ বলা হয়। বাংলা ব্যাকরণে উপসর্গ আলোচনার সময় সাধারণত তিনটি ধারার কথা বলা হয় - তৎসম বা সংস্কৃত উপসর্গ, খাঁটি বাংলা উপসর্গ এবং বিদেশি উপসর্গ। এর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় “খাঁটি বাংলা উপসর্গ” থেকে সরাসরি প্রশ্ন খুবই বেশি আসে।
প্রশ্ন হতে পারে - খাঁটি বাংলা উপসর্গ কয়টি, কোনটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ, কোন শব্দটি খাঁটি বাংলা উপসর্গযোগে গঠিত, একই রূপের তৎসম ও বাংলা উপসর্গের পার্থক্য কোথায়, অথবা একটি উপসর্গের সঠিক অর্থদ্যোতকতা কী। তাই শুধু তালিকা মুখস্থ করলেই হয় না; প্রতিটি উপসর্গ কোন অর্থ প্রকাশ করে, কী ধরনের শব্দ গঠন করে, কোনগুলোর সঙ্গে বিভ্রান্তি বেশি হয় - এসবও জানতে হয়।
১.১ কেন এই অধ্যায়টি আলাদা করে পড়তে হবে
কারণ “উপসর্গ” অধ্যায়ে গণনাভিত্তিক প্রশ্ন সবচেয়ে ঘন আসে; বিশেষ করে খাঁটি বাংলা উপসর্গের সংখ্যা ও উদাহরণ।
কারণ কিছু রূপ - যেমন নি-, বি-, সু- - বাংলা ও তৎসম উভয় ধারায় দেখা যায়; ফলে পরীক্ষার্থী প্রায়ই ভুল করে।
কারণ একেকটি উপসর্গ একাধিক অর্থ প্রকাশ করতে পারে; শুধু একটি অর্থ শিখলে সব প্রশ্ন ধরা যায় না।
কারণ খাঁটি বাংলা উপসর্গের বহু উদাহরণই কথ্য-ভাষা, দেশজ শব্দ, লোকব্যবহার ও প্রাত্যহিক বাংলা থেকে গঠিত - যা সাহিত্য ও সাধারণ ব্যবহারে সমান গুরুত্বপূর্ণ।
১.২ উপসর্গ, প্রত্যয় ও অনুসর্গের পার্থক্য
উপসর্গকে বুঝতে হলে আগে এর অবস্থান ও কাজ বুঝতে হয়। উপসর্গ শব্দের আগে বসে; প্রত্যয় শব্দের পরে বসে নতুন পদ তৈরি করে; আর অনুসর্গ সাধারণত বিশেষ্য/সর্বনামের পরে বসে সম্পর্ক নির্দেশ করে।
রূপ | কোথায় বসে | প্রধান কাজ | উদাহরণ |
উপসর্গ | শব্দ/ধাতুর আগে | অর্থের পরিবর্তন বা সম্প্রসারণ | কু+কাজ = কুকাজ, ভর+পেট = ভরপেট |
প্রত্যয় | মূল শব্দের পরে | নতুন পদ বা রূপ গঠন | মধু+র = মধুর, বন্ধু+তা = বন্ধুত্ব/বন্ধুতা |
অনুসর্গ | বিশেষ্য/সর্বনামের পরে | সম্পর্ক, দিক, কারণ, গন্তব্য ইত্যাদি বোঝায় | বাড়ির পরে, নদীর দিকে, তোমার জন্য |
মনে রাখার কৌশল |
উপসর্গ “আগে” বসে, প্রত্যয় “পরে” বসে, আর অনুসর্গ “আলাদা শব্দ” হিসেবে পরে এসে সম্পর্ক দেখায়। |
২. খাঁটি বাংলা উপসর্গ কী
যে উপসর্গ বাংলা ভাষার নিজস্ব ধারা থেকে গড়ে উঠেছে এবং বাংলা শব্দভাণ্ডারে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাকে খাঁটি বাংলা উপসর্গ বলা হয়। বাংলা ব্যাকরণের প্রচলিত তালিকা অনুযায়ী খাঁটি বাংলা উপসর্গের সংখ্যা একুশটি। এই তালিকাই বোর্ডের পাঠ্যব্যাকরণ, নিয়োগপरीক্ষা ও এমসিকিউ বইগুলোতে বহুল গৃহীত।
খাঁটি বাংলা উপসর্গের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো - এগুলো বাংলা ভাষার দেশজ প্রবণতা ও অর্থবৈচিত্র্য প্রকাশে খুব কার্যকর। কখনো অভাব, কখনো নিন্দা, কখনো বক্রতা, কখনো অর্ধতা, কখনো পরিমাণের পূর্ণতা, কখনো ভালো বা মন্দ অর্থ - এভাবে এদের কাজ বহুমুখী।
২.১ খাঁটি বাংলা উপসর্গের স্বীকৃত তালিকা
প্রচলিত ব্যাকরণগ্রন্থে স্বীকৃত ২১টি খাঁটি বাংলা উপসর্গ হলো - অ, অঘা, অজ, অনা, আ, আড়, আন, আব, ইতি, ঊন/উন/উনা, কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা।
৩. ২১টি খাঁটি বাংলা উপসর্গ: সার-তালিকা
উপসর্গ | অর্থদ্যোতকতা | উদাহরণ |
অ- | না-সূচক, খারাপ, অনুচিত, অভাব, অল্প, ক্রমাগত | অকাজ, অচেনা, অজানা, অবেলা, অঝোর, অনড়, অমিল, অকর্মা |
অঘা- | বোকা, মূর্খ, গবেট | অঘারাম, অঘাচণ্ডী |
অজ- | নিতান্ত, একেবারে, প্রত্যন্ত | অজপাড়া, অজমূর্খ, অজপুকুর |
অনা- | অভাব, বর্জিত, অশুভ | অনাবৃষ্টি, অনাদর, অনাচার, অনামুখো |
আ- | অভাব, অপূর্ণতা, বাজে/নিকৃষ্ট | আকাঁড়া, আলুনি, আগাছা |
আড়- | বক্র, অর্ধেক/প্রায়, বিশেষ ভঙ্গি | আড়চোখে, আড়নয়নে, আড়মোড়া, আড়পাগলা, আড়কাঠি |
আন- | নেতিবাচক, অগোছালো/বিক্ষিপ্ত | আনকোড়া, আনচান, আনমনা |
উপসর্গ | অর্থদ্যোতকতা | উদাহরণ |
আব- | আবছা, অস্পষ্ট, ঢাকা-ঢাকা | আবছায়া, আবডাল |
ইতি- | এর, পূর্বের, পুরনো/সমাপ্ত প্রসঙ্গ-সম্পর্কিত | ইতিকর্তব্য, ইতিপূর্বে, ইতিকথা, ইতিহাস |
ঊন-/উন-/উনা- | কম, এক ধাপ কম | উনিশ, ঊনপাঁজুরে, ঊনাভাত |
কদ্- | নিন্দিত, কুৎসিত, খারাপ | কদবেল, কদর্য, কদাকার |
কু- | কুৎসিত, মন্দ, অপকর্ষ | কুকাজ, কুকথা, কুনজর, কুসঙ্গ, কুপ্রথা |
নি- | নেই, ঘাটতি, নেতিবাচক | নিখুঁত, নিখোঁজ, নিলাজ, নিরেট, নিভাঁজ |
পাতি- | ছোট, সাধারণ, নিম্নস্তরের, গৌণ | পাতিহাঁস, পাতিলেবু, পাতিশিয়াল, পাতকুয়ো |
উপসর্গ | অর্থদ্যোতকতা | উদাহরণ |
বি- | ভিন্নতা, বিচ্যুতি, অভাব/ব্যর্থতা | বিভুঁই, বিপথ, বিফল |
ভর- | পূর্ণতা, ভরা অবস্থা, সময়ের পূর্ণ রূপ | ভরপেট, ভরপুর, ভরদুপুর, ভরসন্ধ্যা |
রাম- | বড়, প্রকাণ্ড, জোরালো, কখনো উৎকৃষ্ট/বিশেষ | রামদা, রামছাগল, রামশিঙা, রামবোকা |
স- | সঙ্গে, সহিত, জোর/সমগ্রতা | সরাজ, সরব, সজোর, সপাট, সঠিক |
সা- | ভালো, উৎকৃষ্ট, পছন্দনীয়; অল্পপ্রচলিত | সাজিরা, সাজোয়ান |
সু- | ভালো, মঙ্গলজনক, ইতিবাচক | সুখবর, সুদিন, সুনাম, সুনজর, সুকাজ |
হা- | অভাব, শূন্যতা, দীনতা | হাপিত্যেশ, হাভাতে, হাঘরে |
৪. অর্থভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস
সব উপসর্গকে কেবল একটি অর্থে বেঁধে ফেলা যায় না; তবু পরীক্ষার সুবিধার জন্য অর্থভিত্তিক কয়েকটি দল করা যায়। এতে মনে রাখা সহজ হয়।
অর্থের ধরন | উপসর্গ | উদাহরণ |
অভাব/নেই/নেতিবাচক | অ-, অনা-, আ-, আন-, নি-, বি-, হা- | অকাজ, অনাদর, আলুনি, আনকোড়া, নিখোঁজ, বিফল, হাভাতে |
নিন্দা/কুৎসা/খারাপ | অ-, কদ্-, কু- | অকর্মা, কদাকার, কুকাজ |
ভালো/উৎকৃষ্ট/ইতিবাচক | সা-, সু-, কখনো রাম- | সাজোয়ান, সুখবর, রামদা |
পূর্ণতা/বহুলতা | ভর- | ভরপুর, ভরদুপুর, ভরপেট |
বড়/প্রকাণ্ড/বিশেষ | রাম- | রামছাগল, রামশিঙা |
ছোট/গৌণ/সাধারণ | পাতি- | পাতিহাঁস, পাতিলেবু |
বক্র/আড়াআড়ি/অর্ধ | আড়- | আড়চোখে, আড়মোড়া |
অস্পষ্ট/ঢাকা | আব- | আবছায়া, আবডাল |
কম/এক ধাপ কম | ঊন- | উনিশ, ঊনাভাত |
সহিত/সমগ্রতা | স- | সরব, সজোর, সপাট |
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা | ||
কোনো উপসর্গের একটি মাত্র অর্থ মুখস্থ করলে ভুল হবে। যেমন অ- কখনো “না”, কখনো “খারাপ”, কখনো “অল্প”, আবার অঝোরে-তে “ক্রমাগত” ধারণাও দেয়। | ||
৫. প্রতিটি উপসর্গের আলোচনা
৫.১ অ-
অ- সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত খাঁটি বাংলা উপসর্গগুলোর একটি। এটি নানা অর্থে আসে - না-সূচক, খারাপ, অনুচিত, অভাব, অল্প, ক্রমাগত ইত্যাদি। “অকাজ” শব্দে অ- অনুচিত বা মূল্যহীন কাজ বোঝায়; “অচেনা”, “অজানা” ইত্যাদিতে এটি অভাব বা না-সূচক; “অঝোরে” শব্দে ক্রমাগততার ধারণা দেয়। “অবেলা”, “অকর্মা”, “অমিল”, “অনড়” - এ ধরনের শব্দ পরীক্ষায় বেশি আসে।
৫.২ অঘা-
অঘা- সাধারণত বোকা, গবেট, নির্বোধ জাতীয় অর্থ দেয়। উদাহরণ: অঘারাম, অঘাচণ্ডী। এ উপসর্গটি খুব বেশি উৎপাদনশীল নয়; অর্থাৎ নতুন নতুন শব্দে খুব বেশি দেখা যায় না। কিন্তু তালিকাভিত্তিক প্রশ্নে এর নাম বারবার আসে।
৫.৩ অজ-
অজ- নিতান্ত, একেবারে, প্রত্যন্ত বা অপরিচিত ধরনের অর্থ প্রকাশ করে। “অজপাড়া” শব্দটি প্রত্যন্ত গ্রাম বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। “অজমূর্খ”, “অজপুকুর” ইত্যাদিও একই ধাঁচের। অজপাড়া-গাঁ কথাটি সাহিত্য ও সাধারণ ভাষা - উভয় ক্ষেত্রেই পরিচিত।
৫.৪ অনা-
অনা- সাধারণত অভাব, বর্জন, অনুপস্থিতি বা অশুভতার ধারণা দেয়। “অনাবৃষ্টি” মানে বৃষ্টির অভাব; “অনাদর” মানে আদরের অভাব; “অনাচার” মানে সঠিক আচরণের অভাব বা বিচ্যুতি; “অনামুখো” অশুভ বা অনুপযুক্ত অবস্থা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
৫.৫ আ-
খাঁটি বাংলা আ- উপসর্গকে তৎসম আ- এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে ভুল হবে। এখানে আ- সাধারণত অভাব, অপূর্ণতা, বা নিকৃষ্ট অর্থ প্রকাশ করে। “আলুনি” মানে লবণহীন; “আগাছা” মানে অকাজের/অপ্রয়োজনীয় গাছ; “আকাঁড়া” অপূর্ণ বা শুষ্ক-স্বভাবজাত অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে।
৫.৬ আড়-
আড়- খুবই চেনা একটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ। এর অর্থ বক্র, আড়াআড়ি, পাশ ফিরে, অর্ধেক, কিংবা বিশেষ ভঙ্গি। “আড়চোখে” মানে পাশ ফিরে চাওয়া; “আড়নয়নে” একই বক্র-দৃষ্টি; “আড়মোড়া” শরীর মোচড়ানোর ভঙ্গি; “আড়পাগলা” অর্থ প্রায়-পাগল; “আড়কাঠি” বিশেষ পেশাগত/প্রচলিত অর্থে ব্যবহৃত শব্দ।
৫.৭ আন-
আন- সাধারণত নেতিবাচক বা অগোছালো/বিক্ষিপ্ত মানে দেয়। “আনকোড়া” শব্দে আগের ব্যবহারহীনতা বা একেবারে নতুনতার ধারণা আছে। “আনচান” অস্থির বা অস্বস্তিকর নড়াচড়া বোঝায়; “আনমনা” মানে মনোযোগহীন, বিক্ষিপ্ত মন।
৫.৮ আব-
আব- উপসর্গ অস্পষ্টতা, আবছাভাব, ঢাকা-ঢাকা বা আড়াল অর্থে ব্যবহৃত হয়। “আবছায়া” ও “আবডাল” এ দুটি খুব প্রচলিত উদাহরণ। পরীক্ষায় “আবছা” জাতীয় শব্দ দেখে অনেকেই একে সাধারণ ধ্বনি পরিবর্তন মনে করেন; কিন্তু ব্যুৎপত্তিগত আলোচনায় এটি খাঁটি বাংলা উপসর্গের উদাহরণ হিসেবে ধরা হয়।
৫.৯ ইতি-
ইতি- উপসর্গ “এর”, “পূর্বে”, “পূর্ববর্তী/পুরনো”, কিংবা নথিপত্র-সম্পর্কিত সমাপ্তির ভাব বোঝাতে পারে। উদাহরণ: ইতিকর্তব্য, ইতিপূর্বে, ইতিকথা, ইতিহাস। পরীক্ষায় “ইতি” দেখে কেউ কেউ একে স্বতন্ত্র শব্দ ভাবেন, কিন্তু উপসর্গ-আলোচনায় এটি স্বীকৃত।
৫.১০ ঊন-/উন-/উনা-
এই উপসর্গের মূল অর্থ “কম” বা “এক ধাপ কম”। “উনিশ” = বিশের চেয়ে এক কম; “ঊনাভাত” = পুরো সিদ্ধ বা পূর্ণ নয়; “ঊনপাঁজুরে” = শরীরে মাংসের অভাব, অপুষ্ট ধরনের ভাব। সংখ্যা-গঠনে উন/ঊন খুব পরিচিত হওয়ায় এটি মনে রাখা সহজ।
৫.১১ কদ্-
কদ্- নিন্দনীয়, কুৎসিত, নিম্নমানের বা বিকৃত অর্থ দেয়। “কদবেল”, “কদর্য”, “কদাকার” খুব প্রচলিত উদাহরণ। “কদাকার” ও “কদর্য” পরীক্ষায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুটোতেই খারাপ/অসুন্দর ভাব আছে।
৫.১২ কু-
কু- মানে কুৎসিত, মন্দ, অপকর্ষ, খারাপ। উদাহরণ: কুকাজ, কুকথা, কুনজর, কুসঙ্গ, কুপ্রথা। বাংলা ব্যাকরণে এটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ হিসেবে শেখানো হলেও অনেক শিক্ষার্থী তৎসম সু-/দুর্- এর বিপরীত ভেবে বিভ্রান্ত হয়। নিরাপদ কৌশল হলো - কুকাজ, কুকথা, কুসঙ্গ - এগুলোকে খাঁটি বাংলা উদাহরণ হিসেবে মুখস্থ রাখা।
৫.১৩ নি-
খাঁটি বাংলা নি- সাধারণত “নেই”, “অভাব”, “ঘাটতি”, বা নেতিবাচক অর্থ দেয়। যেমন: নিখুঁত, নিখোঁজ, নিলাজ, নিভাঁজ, নিরেট। তবে সতর্ক থাকতে হবে - তৎসম ধারাতেও নি-/নির্-/নিঃ- আছে, যেমন নিবৃত্তি, নির্গমন, নিষ্কাম। কাজেই সব নি- এক শ্রেণির নয়। পরীক্ষায় শব্দ-উৎপত্তি বিচার জরুরি হলে উদাহরণভিত্তিক পার্থক্য ধরতে হবে।
৫.১৪ পাতি-
পাতি- আকারে ছোট, গৌণ, সাধারণ, নিম্নস্তরের বা ছোট জাতের অর্থ দেয়। “পাতিহাঁস”, “পাতিলেবু”, “পাতিশিয়াল”, “পাতকুয়ো” ইত্যাদি এ ধরনের উদাহরণ। গ্রামীণ জীবন, লোকভাষা ও প্রাণী/উদ্ভিদের নামকরণে এটি লক্ষণীয়।
৫.১৫ বি-
খাঁটি বাংলা বি- ভিন্নতা, বিচ্যুতি, ব্যর্থতা বা অভাবজাত অর্থে আসে। উদাহরণ: বিভুঁই, বিপথ, বিফল। কিন্তু এখানেও বিভ্রান্তি আছে, কারণ তৎসম ধারায় “বি-” বিশেষ রূপে, পৃথকীকরণে বা বৈশিষ্ট্য-সূচকে ব্যবহৃত হয় - যেমন বিজ্ঞান, বিশুদ্ধ, বিবরণ। তাই পরীক্ষায় উদাহরণ দেখে শ্রেণি নির্ধারণ করতে হবে।
৫.১৬ ভর-
ভর- মানে ভরা, পূর্ণতা, প্রাচুর্য, কিংবা সময়ের পূর্ণ অবস্থা। “ভরপেট”, “ভরপুর”, “ভরদুপুর”, “ভরসন্ধ্যা” - এগুলো বহুল ব্যবহৃত। “ভরদুপুর” ও “ভরসন্ধ্যা”তে সময়ের মধ্যম বা পূর্ণতা বোঝায়; “ভরপেট” ও “ভরপুর” এ পূর্ণতার স্পষ্ট ভাব।
৫.১৭ রাম-
রাম- উপসর্গ বড়, প্রকাণ্ড, শক্ত, জোরালো বা বিশেষ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অর্থ দিতে পারে। “রামদা”, “রামছাগল”, “রামশিঙা”, “রামবোকা” - এগুলো বিখ্যাত উদাহরণ। সব শব্দে এটি ইতিবাচক নয়; কখনো কৌতুক, কখনো আকার-প্রকাণ্ডতা, কখনো অতিরঞ্জিত ভাব প্রকাশ করে।
৫.১৮ স-
স- উপসর্গ সঙ্গে, সহিত, সমগ্রতা, কিংবা জোরালো উপস্থিতি বোঝায়। উদাহরণ: সরাজ, সরব, সজোর, সপাট, সঠিক। এদের মধ্যে “সরব” ও “সজোর” সবচেয়ে পরিচিত। কখনো “একসঙ্গে/সহিত” ভাব, কখনো “পূর্ণ বা জোরালো উপস্থিতি” বোঝায়।
৫.১৯ সা-
সা- খুব বেশি ব্যবহৃত নয়, কিন্তু পরীক্ষায় তালিকাভিত্তিক প্রশ্নে এর নাম আসে। এটি উৎকৃষ্ট বা ভালো অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। উদাহরণ: সাজিরা, সাজোয়ান। কমপ্রচলিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রায়ই এটি ভুলে যায়।
৫.২০ সু-
সু- সাধারণত ভালো, শুভ, মঙ্গলজনক, ইতিবাচক অর্থ দেয়। উদাহরণ: সুখবর, সুদিন, সুনাম, সুনজর, সুকাজ। কিন্তু এখানে আরেকটি বড় সতর্কতা আছে - তৎসম ধারাতেও সু- আছে, যেমন সুবিচার, সুদীর্ঘ, সুগভীর। তাই সব সু- শব্দকে খাঁটি বাংলা বলা যাবে না; এমসিকিউতে পাঠ্যভিত্তিক উদাহরণ চিনে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ।
৫.২১ হা-
হা- উপসর্গ অভাব, দীনতা, শূন্যতা বা হাহাকারের ভাব দেয়। “হাপিত্যেশ”, “হাভাতে”, “হাঘরে” - এই তিনটি উদাহরণ খুবই পরিচিত। এদের মধ্যে “হাভাতে” মানে দরিদ্র/অভাবী; “হাপিত্যেশ” মানে দীর্ঘশ্বাসময় আশা বা ব্যাকুল প্রতীক্ষা।
৬. বিভ্রান্তিকর রূপ ও তুলনামূলক আলোচনা
খাঁটি বাংলা উপসর্গের আলোচনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো - কিছু রূপ বাংলা ও তৎসম উভয় ধারায় চোখে পড়ে। পরীক্ষায় সাধারণত স্কুল-কলেজের স্বীকৃত তালিকা ধরে প্রশ্ন করা হয়; কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় শব্দভেদে উৎস আলাদা হতে পারে। তাই রূপ দেখে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।
রূপ | খাঁটি বাংলা ব্যবহারের উদাহরণ | তৎসম/অন্য ধারার উদাহরণ | কীভাবে মনে রাখবেন |
নি- | নিখোঁজ, নিলাজ, নিরেট | নিবৃত্তি, নির্গমন, নিষ্কাম | বাংলা নি- এ “নেই/অভাব” ভাব বেশি; তৎসমে ধাতুগত ও সংস্কৃতমূলক রূপ বেশি |
বি- | বিভুঁই, বিপথ, বিফল | বিজ্ঞান, বিশুদ্ধ, বিবরণ | বাংলা উদাহরণ আলাদা করে মুখস্থ রাখুন |
সু- | সুখবর, সুদিন, সুনাম | সুবিচার, সুদীর্ঘ, সুপ্রসন্ন | পরীক্ষার জন্য পাঠ্যভিত্তিক উদাহরণ আলাদা মনে রাখুন |
আ- | আলুনি, আগাছা | আগমন, আদান, আভাস | সব আ- এক নয়; খাঁটি বাংলায় অভাব/নিকৃষ্টতা ধরনের ভাব খুঁজুন |
পরীক্ষার নিরাপদ নীতি | |||
যে শব্দগুলো স্কুল-কলেজের ব্যাকরণে খাঁটি বাংলা উপসর্গের উদাহরণ হিসেবে বারবার পাওয়া যায় - সেগুলোই আগে পাকাপোক্ত করুন। বিতর্কিত শব্দে ব্যুৎপত্তিগত গভীরে না গিয়ে পাঠ্যসম্মত উত্তর ধরুন। | |||
৭. পরীক্ষায় আসা প্রশ্নের ধরণ
খাঁটি বাংলা উপসর্গ কয়টি? - উত্তর: ২১টি।
নিচের কোনটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ? - বিকল্পে রাম, ইতি, হা, সা, কু, নি ইত্যাদি থাকতে পারে।
কোন শব্দটি খাঁটি বাংলা উপসর্গযোগে গঠিত? - যেমন অকেজো/অকাজ, ভরপেট, রামদা, হাভাতে, পাতিহাঁস।
নিচের কোন উপসর্গ “অভাব” বোঝায়? - অনা-, নি-, হা-, কখনো আ- বা অ-।
“পূর্ণতা” বা “ভরা অবস্থা” কোন উপসর্গে বোঝায়? - ভর-।
“বড়/প্রকাণ্ড” বোঝায় কোনটি? - রাম-।
“ছোট/সাধারণ/গৌণ” বোঝায় কোনটি? - পাতি-।
“কম” অর্থে কোনটি? - ঊন-/উন-/উনা-।
“বক্র/পাশ ফিরে/আড়াআড়ি” অর্থে কোনটি? - আড়-।
৭.১ পরীক্ষার ফাঁদ
অনেকেই “উপসর্গ” আর “প্রত্যয়” গুলিয়ে ফেলে; অবস্থান দেখে ধরুন - আগে বসলে উপসর্গ।
নি-, বি-, সু-, আ- - এগুলো দেখে তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেবেন না; উদাহরণ মিলিয়ে দেখুন।
“ইতি” দেখে কেউ কেউ স্বতন্ত্র শব্দ ভাবে; কিন্তু উপসর্গ-তালিকায় এটি আছে।
“কু-” ও “কদ্-” উভয়েই খারাপ অর্থ দেয়, কিন্তু দুটিকে এক মনে করা ঠিক নয়।
“রাম-” সবসময় ভালো বোঝায় না; অনেক সময় বড়, প্রকাণ্ড, জোরালো বা অতিরঞ্জিত ভাব দেয়।
৮. স্মরণকৌশল
একুশটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ একসঙ্গে মনে রাখতে অনেকে ধ্বনিগত গুচ্ছ করে পড়েন। যেমন - (ক) অ-গোষ্ঠী: অ, অঘা, অজ, অনা; (খ) আ-গোষ্ঠী: আ, আড়, আন, আব; (গ) মধ্যগোষ্ঠী: ইতি, ঊন; (ঘ) ক-গোষ্ঠী: কদ, কু; (ঙ) নি, পাতি, বি, ভর, রাম; (চ) স-গোষ্ঠী: স, সা, সু; (ছ) হা। এভাবে গোষ্ঠীভাগ করলে তালিকা দ্রুত মনে থাকে।
গোষ্ঠী | উপসর্গ |
অ-গোষ্ঠী | অ, অঘা, অজ, অনা |
আ-গোষ্ঠী | আ, আড়, আন, আব |
মধ্যগোষ্ঠী | ইতি, ঊন |
ক-গোষ্ঠী | কদ, কু |
স্বতন্ত্র গোষ্ঠী | নি, পাতি, বি, ভর, রাম |
স-গোষ্ঠী | স, সা, সু |
শেষ রূপ | হা |
৯. দ্রুত পুনরাবৃত্তি
খাঁটি বাংলা উপসর্গ = ২১টি।
পূর্ণতা বোঝায় = ভর-।
বড়/প্রকাণ্ড বোঝায় = রাম-।
ছোট/গৌণ বোঝায় = পাতি-।
কম বোঝায় = ঊন-/উন-/উনা-।
অভাব বা নেতিবাচক ভাবের সাধারণ উপসর্গ = অ-, অনা-, নি-, হা-।
বক্র/আড়াআড়ি ভাব = আড়-।
খারাপ/কুৎসিত ভাব = কদ্-, কু-, কখনো অ-।
ভালো/মঙ্গলজনক ভাব = সা-, সু-।
বিভ্রান্তিকর রূপ = নি-, বি-, সু-, আ-।
১০. উপসর্গভিত্তিক অতিরিক্ত উদাহরণভাণ্ডার
নিচের অংশে প্রতিটি উপসর্গের জন্য আরও কয়েকটি শব্দ একসঙ্গে সাজানো হলো, যাতে দ্রুত পুনরাবৃত্তি করা যায়। সব উদাহরণ সমানভাবে সমসাময়িক বা সমমাত্রায় প্রচলিত নাও হতে পারে; তবে ব্যাকরণচর্চার দৃষ্টিতে এগুলো উপযোগী।
উপসর্গ | অতিরিক্ত উদাহরণ |
অ- | অকাজ, অকেজো, অচেনা, অজানা, অমিল, অনড়, অবেলা, অঝোরে |
অঘা- | অঘারাম, অঘাচণ্ডী |
অজ- | অজপাড়া, অজমূর্খ, অজগাঁ, অজপুকুর |
অনা- | অনাবৃষ্টি, অনাদর, অনাচার, অনামুখো |
আ- | আলুনি, আগাছা, আকাঁড়া |
আড়- | আড়চোখে, আড়নয়নে, আড়মোড়া, আড়কাঠি, আড়পাগলা |
আন- | আনকোড়া, আনচান, আনমনা |
উপসর্গ | অতিরিক্ত উদাহরণ |
আব- | আবছায়া, আবডাল, আবছা |
ইতি- | ইতিকর্তব্য, ইতিপূর্বে, ইতিকথা, ইতিহাস |
ঊন- | উনিশ, ঊনাভাত, ঊনপাঁজুরে |
কদ্- | কদবেল, কদর্য, কদাকার |
কু- | কুকাজ, কুকথা, কুনজর, কুসঙ্গ, কুপ্রথা |
নি- | নিখুঁত, নিখোঁজ, নিলাজ, নিরেট, নিভাঁজ |
পাতি- | পাতিহাঁস, পাতিলেবু, পাতিশিয়াল, পাতকুয়ো |
উপসর্গ | অতিরিক্ত উদাহরণ |
বি- | বিভুঁই, বিপথ, বিফল |
ভর- | ভরপেট, ভরপুর, ভরদুপুর, ভরসন্ধ্যা |
রাম- | রামদা, রামছাগল, রামশিঙা, রামবোকা |
স- | সরাজ, সরব, সজোর, সপাট, সঠিক |
সা- | সাজিরা, সাজোয়ান |
সু- | সুখবর, সুদিন, সুনাম, সুনজর, সুকাজ |
হা- | হাপিত্যেশ, হাভাতে, হাঘরে |
১১. গুরুত্বপূর্ণ জোড়া ও সূক্ষ্ম পার্থক্য
জোড়া | মূল পার্থক্য | মনে রাখুন |
কু- / কদ্- | দুটিই খারাপ অর্থ দেয়; কু- বেশি উৎপাদনশীল, কদ্- অপেক্ষাকৃত সীমিত ও বিশেষ কিছু শব্দে স্থির | কুকাজ, কুকথা বনাম কদাকার, কদর্য |
রাম- / ভর- | রাম- আকার/প্রকাণ্ডতা বা জোরালো ভাব দেয়; ভর- দেয় পূর্ণতা বা ভরা অবস্থা | রামদা ≠ ভরদা; ভরপেট, ভরদুপুর |
আড়- / আব- | আড়- বক্র/পাশ ফিরে/অর্ধ ভাব; আব- আবছা/আড়াল/অস্পষ্ট ভাব | আড়চোখে বনাম আবছায়া |
অনা- / নি- | দুটিই অভাবজাত অর্থ দিতে পারে; অনা- সাধারণত অনুপস্থিতি/বর্জন, নি- নেই/ঘাটতি/নেতিবাচকতা | অনাদর বনাম নিখোঁজ |
পাতি- / রাম- | পাতি- ছোট/সাধারণ; রাম- বড়/প্রকাণ্ড | পাতিহাঁস বনাম রামছাগল |
সা- / সু- | দুটিতেই ইতিবাচকতা থাকতে পারে; সু- বহুল প্রচলিত, সা- অল্পপ্রচলিত | সুখবর, সুদিন বেশি পরিচিত |
আরও একটি পরীক্ষামুখী পরামর্শ | ||
যে রূপগুলো সবচেয়ে কম প্রচলিত - অঘা-, সা-, আব-, আন- - সেগুলোই প্রায়ই এমসিকিউতে “কোনটি খাঁটি বাংলা উপসর্গ” ধরনের প্রশ্নে বিকল্প হিসেবে আসে। | ||
শেষ কথা | ||
খাঁটি বাংলা উপসর্গ অধ্যায়টি মুখস্থের অধ্যায় হলেও অন্ধ মুখস্থে নয় - অর্থদ্যোতকতা, উদাহরণ, এবং বিভ্রান্তিকর রূপের পার্থক্য বুঝে পড়লে এমসিকিউ, লিখিত উত্তর ও ব্যাকরণ-বিশ্লেষণ - তিন ক্ষেত্রেই ভালো করা যায়। | ||