বাংলা সাহিত্য
♔
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
♔ সাহিত্য সম্রাট | বাংলা উপন্যাসের জনক | প্রথম সার্থক ঔপন্যাসিক ♔
♔ জীবন পরিচয় ♔
▼ জন্ম ও বংশপরিচয়
১৮৩৮ সালের ২৬ জুন পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার কাঁঠালপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর পিতার নাম যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — যিনি ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। মাতার নাম দুর্গাদেবী। পরিবারটি ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবার।
বঙ্কিমচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে কাঁঠালপাড়া গ্রামে। এই গ্রামের নদী, মাঠ, সবুজ প্রকৃতি তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। শৈশবেই অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন তিনি।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান — কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগনা। বিসিএসে বারবার আসে!
▼ শিক্ষাজীবন — কৃতিত্বময় অধ্যায়
হুগলি কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। একই পরীক্ষায় যোগেন্দ্রচন্দ্র বসুও প্রথম বিভাগে পাস করেন।
১৮৬৯ সালে বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে দীর্ঘ ৩২ বছর সরকারি চাকরি করেন।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিএ পরীক্ষায় প্রথম হন — ১৮৫৭ সালে।
▼ বিবাহজীবন
বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বিবাহ হয় মাত্র ১১ বছর বয়সে — ৫ বছরের মেয়ের সাথে। বাল্যবিবাহের এই প্রথা তখন সাধারণ ছিল। কিছু বছর পর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যু হয়।
দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন রাজলক্ষ্মীদেবীকে। এই বিবাহ সুখের ছিল। তাঁদের তিন কন্যাসন্তান ছিল।
▼ মৃত্যু
১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল (২৬শে চৈত্র ১৩০০ বঙ্গাব্দ) বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা সাহিত্যের এক মহাযুগের অবসান হয়।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যু — ৮ এপ্রিল ১৮৯৪। রোগ — বহুমূত্র।
বিষয় | তথ্য |
পূর্ণ নাম | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
জন্ম | ২৬ জুন ১৮৩৮ |
জন্মস্থান | কাঁঠালপাড়া গ্রাম, চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ |
মৃত্যু | ৮ এপ্রিল ১৮৯৪ (বহুমূত্র রোগে) |
পিতা | যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (ডেপুটি কালেক্টর) |
মাতা | দুর্গাদেবী |
দ্বিতীয় স্ত্রী | রাজলক্ষ্মীদেবী |
শিক্ষা | বিএ (প্রথম, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৫৭), বিএল (১৮৬৯) |
পেশা | ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর (৩২ বছর) |
ছদ্মনাম | কমলাকান্ত |
উপাধি | সাহিত্য সম্রাট, বাংলা উপন্যাসের জনক |
পত্রিকা | বঙ্গদর্শন (প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ১৮৭২) |
মোট উপন্যাস | ১৫টি (১৪টি বাংলা + ১টি ইংরেজি) |
রচনাশৈলী | বঙ্কিমী শৈলী বা বঙ্কিমী রীতি |
♔ Rajmohan's Wife ও দুর্গেশনন্দিনী ♔
✰ Rajmohan's Wife (১৮৬৪) — প্রথম ইংরেজি উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও রচনার ইতিহাস
১৮৬৪ সালে 'Indian Field' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife'। এটি ইংরেজিতে লেখা — বাংলায় নয়। কিন্তু বিশেষ সাফল্য পায়নি।
এরপর বঙ্কিমচন্দ্র বুঝতে পারেন — যদি লিখতে হয়, তাহলে মাতৃভাষা বাংলায় লিখতে হবে। সেই সিদ্ধান্তই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পরিবর্তন করে দেয়।
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
রাজমোহন একজন সাধারণ গ্রামীণ পুরুষ। তার স্ত্রীর নাম মতিলতা। রাজমোহন অত্যন্ত অত্যাচারী ও কুটিল স্বভাবের। মতিলতা বিপরীতে শান্তিপ্রিয়, সৎ ও স্বামীর অত্যাচারে নীরবে কষ্ট পাওয়া একজন নারী।
উপন্যাসে গ্রামীণ বাংলার সামাজিক জীবন চিত্রিত হয়েছে। নারীর অবস্থান, পারিবারিক অত্যাচার, নৈতিকতার দ্বন্দ্ব — এই বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে।
⭐ Rajmohan's Wife = বঙ্কিমচন্দ্রের একমাত্র ইংরেজি উপন্যাস (১৮৬৪)।
⚡ Rajmohan's Wife = প্রথম উপন্যাস কিন্তু ইংরেজিতে। দুর্গেশনন্দিনী = প্রথম বাংলা উপন্যাস।
✰ দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) — বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস ✰
▼ ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১৮৬৫ সালে প্রকাশিত 'দুর্গেশনন্দিনী' বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। এই উপন্যাস প্রকাশের সাথে সাথে বাংলা সাহিত্যের একটি নতুন যুগ শুরু হয়। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম মিলকপত্র ভূমিকায় লেখেন — 'এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।'
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
পটভূমি: ষোড়শ শতাব্দীর বাংলা। মুঘল সাম্রাজ্য ও পাঠান বিদ্রোহের সংঘাতের যুগ।
জগৎসিংহ একজন রাজপুত যুবক — সাহসী, সুন্দর এবং সৎ। সে এক অভিযানে বাংলায় আসে। দুর্গমপথে আহত হয়ে বিধ্বস্ত অবস্থায় পৌঁছায় পাঠান সুবেদার কতলু খাঁর দুর্গে।
দুর্গেশনন্দিনী তিলোত্তমা — কতলু খাঁর কন্যা। অসম্ভব সুন্দরী, শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা। আহত জগৎসিংহকে সে আশ্রয় দেয়। সেবা করতে করতে দুজনের মধ্যে প্রেম জন্ম নেয়।
কিন্তু এই প্রেমের পথে বাধা অনেক। জগৎসিংহ মুঘলদের পক্ষের, কতলু খাঁ মুঘলবিরোধী পাঠান। ধর্ম, বংশ, রাজনৈতিক দলাদলি — সব মিলিয়ে দুজনের মিলন কঠিন।
অন্যদিকে আয়েষা — কতলু খাঁর আরেকজন কন্যা। সে মুসলিম নিয়মকানুনে বড় হয়েছে। জগৎসিংহর প্রতি তারও অনুরাগ আছে, কিন্তু সে প্রকাশ করতে পারে না।
নানা ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ, বন্দিত্ব, মৃত্যুর ঝুঁকি — সব পার করে শেষ পর্যন্ত জগৎসিংহ ও তিলোত্তমার মিলন হয়। এটি একটি ঐতিহাসিক রোমান্টিক উপন্যাস।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 জগৎসিংহ: রাজপুত বীর নায়ক। মুঘলদের পক্ষের সৈনিক।
👑 তিলোত্তমা: দুর্গেশনন্দিনী — কতলু খাঁর কন্যা। নায়িকা।
👑 আয়েষা: তিলোত্তমার বোন। মুসলিম নিয়মে লালিত।
👑 কতলু খাঁ: পাঠান সুবেদার। তিলোত্তমার পিতা।
👑 ওসমান: পাঠান সেনাপতি। প্রতিপক্ষ চরিত্র।
⭐ দুর্গেশনন্দিনী = বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস। নায়ক = জগৎসিংহ, নায়িকা = তিলোত্তমা।
⚡ দুর্গেশনন্দিনী বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস — কিন্তু প্রথম উপন্যাস নয় (Rajmohan's Wife আগে)।
❓ দুর্গেশনন্দিনীর নায়ক ও নায়িকা? ➤ জগৎসিংহ ও তিলোত্তমা
❓ দুর্গেশনন্দিনীর ধরন? ➤ ঐতিহাসিক রোমান্টিক উপন্যাস (ষোড়শ শতাব্দীর পটভূমি)
♔ কপালকুণ্ডলা ও মৃণালিনী ♔
✰ কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬) — রোমান্টিক মাস্টারপিস ✰
▼ পটভূমি ও বিশেষত্ব
'কপালকুণ্ডলা' বঙ্কিমচন্দ্রের সবচেয়ে রোমান্টিক উপন্যাস। এটি পাঠকের হৃদয় জয় করেছে কপালকুণ্ডলার রহস্যময় চরিত্রের মাধ্যমে। উপন্যাসটির পটভূমি সপ্তদশ শতাব্দীর বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অরণ্য অঞ্চল।
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
নবকুমার একজন তরুণ যে সমুদ্র থেকে ফিরে আসার পথে একটি দ্বীপে আটকা পড়ে। সেই দ্বীপে বাস করে একজন কাপালিক — তান্ত্রিক সাধক — যে নরবলি দেয়। নবকুমারকেও বলি দেওয়া হবে বলে ঠিক হয়।
কিন্তু সেই দ্বীপে আছে একটি রহস্যময় মেয়ে — কপালকুণ্ডলা। সে কাপালিকের দত্তকপুত্রী। অরণ্যে বড় হয়েছে, সভ্য জগতের সাথে পরিচয় নেই। নিজের ইচ্ছায় নবকুমারকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে নিয়ে পালায়। দুজনের বিবাহ হয়। নবকুমার তাকে সভ্য জগতে নিয়ে আসে। কিন্তু কপালকুণ্ডলা এই সভ্য জগতে মানিয়ে নিতে পারে না। সে অরণ্যের মেয়ে — শহরের নিয়ম-কানুন তার কাছে অসহ্য।
নবকুমারের পূর্বপরিচিত আরেকটি নারী পদ্মাবতী রয়েছে। পদ্মাবতী নবকুমারের প্রতি অনুরক্ত। কিন্তু নবকুমার কপালকুণ্ডলাকে ভালোবাসে।
কাপালিক কপালকুণ্ডলাকে ফিরিয়ে নিতে আসে। সে কপালকুণ্ডলাকে বলে — তোমার স্বামীকে বিষ দিয়ে মারো। কিন্তু কপালকুণ্ডলা রাজি হয় না।
উপন্যাসের শেষে কপালকুণ্ডলা নবকুমারকে বিষ দেওয়ার পরিবর্তে নিজে বনে চলে যায়। এবং সেখানে নদীতে ডুবে মারা যায়। কপালকুণ্ডলার মৃত্যু এই উপন্যাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অংশ।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 কপালকুণ্ডলা: রহস্যময় অরণ্যকন্যা। নায়িকা। কাপালিকের দত্তকপুত্রী।
👑 নবকুমার: নায়ক। কপালকুণ্ডলার স্বামী।
👑 কাপালিক: তান্ত্রিক সাধক। নরবলিকারী।
👑 পদ্মাবতী: নবকুমারের পূর্বপরিচিতা।
“পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ? — কপালকুণ্ডলা”
⭐ কপালকুণ্ডলা = অরণ্যকন্যার প্রেম + সভ্য জগতের সাথে দ্বন্দ্ব + করুণ পরিণতি।
⚡ কপালকুণ্ডলার বিখ্যাত সংলাপ — 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?'
✰ মৃণালিনী (১৮৬৯) — তৃতীয় উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও সম্পূর্ণ কাহিনি
পটভূমি: ত্রয়োদশ শতাব্দীর বাংলাদেশ — ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খলজির তুর্কী আক্রমণের সময়।
হেমচন্দ্র একজন রাজপুরুষ। মৃণালিনী তার প্রিয়তমা। হেমচন্দ্র দেশরক্ষার জন্য যুদ্ধে যায়। মৃণালিনী অপেক্ষা করে থাকে।
উপন্যাসে তুর্কী আক্রমণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রতিরোধ চিত্রিত হয়েছে। দেশপ্রেম, প্রেম ও ত্যাগের মিলনে রচিত এই উপন্যাস।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 হেমচন্দ্র: নায়ক। দেশপ্রেমী রাজপুরুষ।
👑 মৃণালিনী: নায়িকা। হেমচন্দ্রের প্রেমিকা।
👑 মনোরমা: অন্য গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র।
👑 পশুপতি: গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ চরিত্র।
⭐ মৃণালিনী = তুর্কী আক্রমণের পটভূমিতে প্রেম ও দেশপ্রেমের উপন্যাস।
♔ বিষবৃক্ষ ও ইন্দিরা ♔
✰ বিষবৃক্ষ (১৮৭৩) — সামাজিক উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও গুরুত্ব
'বিষবৃক্ষ' বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সামাজিক উপন্যাস। এটি বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে বিধবা নারীর জীবনের করুণ চিত্র এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্ব অতি জীবন্তভাবে উঠে এসেছে।
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
নগেন্দ্রনাথ একজন জমিদার। তাঁর স্ত্রী সূর্যমুখী — সতী, পতিব্রতা, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ নারী। তাঁদের দাম্পত্যজীবন সুখের।
কুন্দনন্দিনী একটি অনাথ বিধবা মেয়ে। অত্যন্ত সুন্দরী। কুন্দকে তাদের বাড়িতে আশ্রয় দেওয়া হয়। নগেন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে কুন্দের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
সূর্যমুখী বুঝতে পারেন স্বামীর মনের পরিবর্তন। কিন্তু তিনি নিজে থেকে সরে যান। স্বামীর সুখের জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দিতে রাজি।
নগেন্দ্রনাথ কুন্দনন্দিনীকে বিবাহ করেন। কিন্তু এই বিবাহ সুখের হয় না। কুন্দ বুঝতে পারে সে নগেন্দ্রের মনে সূর্যমুখীর স্থান নিতে পারবে না।
অবশেষে কুন্দনন্দিনী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করে। উপন্যাসটির বিখ্যাত বাক্য — 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' — কুন্দের মৃত্যুর পর বলা হয়।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 নগেন্দ্রনাথ: নায়ক। জমিদার। নৈতিক দ্বন্দ্বের শিকার।
👑 সূর্যমুখী: নগেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী। সতী নারীর প্রতীক।
👑 কুন্দনন্দিনী: বিধবা নায়িকা। করুণ পরিণতির শিকার।
“প্রদীপ নিভিয়া গেল।”
⭐ বিষবৃক্ষ = নগেন্দ্রনাথ + সূর্যমুখী + কুন্দনন্দিনী। বিখ্যাত বাক্য = 'প্রদীপ নিভিয়া গেল।'
⚡ বিষবৃক্ষে ও কৃষ্ণকান্তের উইলে — উভয়তেই 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' বাক্যটি আছে।
⚡ বিষবৃক্ষের নায়িকা = কুন্দনন্দিনী। সূর্যমুখী = প্রথম স্ত্রী।
✰ ইন্দিরা (১৮৭৩) ✰
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
'ইন্দিরা' একটি সামাজিক উপন্যাস। ইন্দিরা একজন বাঙালি নারী যে বিয়ের পর স্বামীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন পৃথক থাকার পর আবার মিলন হয়। পারিবারিক ও সামাজিক জটিলতার মাঝে দাম্পত্য প্রেম টিকিয়ে রাখার গল্প।
♔ চন্দ্রশেখর ও রজনী ♔
✰ চন্দ্রশেখর (১৮৭৫) — নৈতিক দ্বন্দ্বের উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও সম্পূর্ণ কাহিনি
পটভূমি: অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা। মীর কাসিমের যুগ। ইংরেজ ও নবাবের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সময়।
চন্দ্রশেখর একজন পণ্ডিত, জ্ঞানী ও ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ। তাঁর স্ত্রী শৈবলিনী — অতি সুন্দরী।
প্রতাপ একজন তরুণ — চন্দ্রশেখরের পরিচিত। সে শৈবলিনীকে ভালোবাসত বিবাহের আগে থেকে। শৈবলিনীও মনে মনে প্রতাপকে ভালোবাসত।
ইংরেজ অফিসার ফস্টার শৈবলিনীকে দেখে মুগ্ধ হয় এবং তাকে অপহরণ করে। শৈবলিনী ফস্টারের সাথে চলে যায় — কারণ সে ভাবে প্রতাপও সেখানে আছে।
চন্দ্রশেখর স্ত্রীকে উদ্ধার করতে যান। কিন্তু উদ্ধারের পরেও শৈবলিনীকে সমাজে ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়। অবশেষে শৈবলিনী মারা যায়।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 চন্দ্রশেখর: নায়ক। জ্ঞানী ব্রাহ্মণ। স্ত্রীকে উদ্ধারকারী।
👑 শৈবলিনী: চন্দ্রশেখরের স্ত্রী। দ্বন্দ্বময় নারী চরিত্র।
👑 প্রতাপ: শৈবলিনীর পুরনো প্রেমিক।
👑 ফস্টার: ইংরেজ অফিসার। খলনায়ক।
⭐ চন্দ্রশেখর = শৈবলিনী + চন্দ্রশেখর + প্রতাপ + ফস্টার। পটভূমি = মীর কাসিমের যুগ।
✰ রজনী (১৮৭৭) — টার্গেটেড উপন্যাস ✰
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
রজনী একটি অন্ধ মেয়ে। অন্ধকারের মধ্যে থেকেও সে জীবনকে উপলব্ধি করতে পারে তার অন্যান্য ইন্দ্রিয় দিয়ে।
শচীন্দ্র একজন তরুণ যে রজনীকে ভালোবাসে। অন্ধ রজনীর প্রতি তার ভালোবাসা অকৃত্রিম।
কিন্তু সমাজ রজনীকে একজন অন্ধ মেয়ে হিসেবে দেখে — পূর্ণ মানুষ হিসেবে নয়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিবাদ করেছেন।
উপন্যাসটি ভিক্টর হুগোর 'Les Misérables'-এর প্রভাবে রচিত বলে মনে করা হয়।
👑 রজনী: কেন্দ্রীয় চরিত্র। অন্ধ মেয়ে।
👑 শচীন্দ্র: রজনীর প্রেমিক।
⭐ রজনী = অন্ধ মেয়ের জীবনকাহিনি। চরিত্র: রজনী ও শচীন্দ্র।
♔ কৃষ্ণকান্তের উইল ও রাজসিংহ ♔
✰ কৃষ্ণকান্তের উইল (১৮৭৮) — অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও গুরুত্ব
'কৃষ্ণকান্তের উইল' বঙ্কিমচন্দ্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এটি সমকালে বিতর্কিত হয়েছিল — কারণ এতে একজন বিবাহিত পুরুষের পরকীয়া প্রেমের কাহিনি আছে।
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
কৃষ্ণকান্ত একজন বৃদ্ধ জমিদার। তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র গোবিন্দলাল। কৃষ্ণকান্তের বিশাল সম্পত্তির উইল কার পক্ষে যাবে — এটাই উপন্যাসের একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
গোবিন্দলালের স্ত্রী ভ্রমর — সুন্দরী, সতী ও বুদ্ধিমতী। গোবিন্দলাল ভ্রমরকে ভালোবাসে।
রোহিণী একটি বিধবা নারী। সে অত্যন্ত সুন্দরী। গোবিন্দলাল রোহিণীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। এই পরকীয়া প্রেমে সে ভ্রমরকে অবহেলা করতে শুরু করে।
ভ্রমর স্বামীর পরিবর্তন বুঝতে পারে কিন্তু সহ্য করে। সে তার প্রেম ও বিশ্বস্ততা ধরে রাখে।
অবশেষে রোহিণী নিহত হয়। গোবিন্দলাল অনুশোচনায় ভোগে। কিন্তু ভ্রমরের মনে আঘাত লেগে যায় — সে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
এই উপন্যাসেও 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' বাক্যটি আছে।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 গোবিন্দলাল: নায়ক। পরকীয়া প্রেমের শিকার।
👑 ভ্রমর: নায়িকা। গোবিন্দলালের স্ত্রী। সতী নারীর প্রতীক।
👑 রোহিণী: বিধবা। পরকীয়া প্রেমের নায়িকা।
👑 কৃষ্ণকান্ত: বৃদ্ধ জমিদার। উইলের মালিক।
“প্রদীপ নিভিয়া গেল।”
⭐ কৃষ্ণকান্তের উইল = গোবিন্দলাল + ভ্রমর + রোহিণী। বিষয় = পরকীয়া প্রেমের পরিণতি।
⚡ বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল — উভয়তেই 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' বাক্য আছে।
✰ রাজসিংহ (১৮৮২) — ঐতিহাসিক উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও সম্পূর্ণ কাহিনি
পটভূমি: মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের যুগ। এটি মূলত নায়িকা-প্রধান উপন্যাস।
রাজসিংহ রাজপুত রাজা — সাহসী, বীর, স্বাধীনচেতা। তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েন।
জেবুন্নেসা — আওরঙ্গজেবের কন্যা। কবি, শিল্পসুন্দর মনের মেয়ে। সে রাজসিংহের সৌর্যে মুগ্ধ হয়।
মানিকলালা — রাজসিংহের বিশ্বস্ত সঙ্গী। মোবারক — আওরঙ্গজেবের বিশ্বস্ত সৈনিক। দরিয়াবিবি — আরেকটি নারী চরিত্র।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 রাজসিংহ: রাজপুত রাজা। নায়ক।
👑 জেবুন্নেসা: আওরঙ্গজেবের কন্যা। নায়িকা।
👑 মানিকলালা: রাজসিংহের বিশ্বস্ত সঙ্গী।
👑 মোবারক: মুঘল পক্ষের চরিত্র।
👑 দরিয়াবিবি: মুসলিম নারী চরিত্র।
⭐ রাজসিংহ = আওরঙ্গজেবের যুগ + রাজপুত বীরের সংগ্রাম + জেবুন্নেসার ভালোবাসা।
⚡ রাজসিংহ মূলত নায়িকা-প্রধান উপন্যাস — নায়িকা জেবুন্নেসা।
♔ আনন্দমঠ : বন্দে মাতরম ♔
✰ আনন্দমঠ (১৮৮২) — সর্বাধিক আলোচিত উপন্যাস ✰
▼ ঐতিহাসিক গুরুত্ব
'আনন্দমঠ' বঙ্কিমচন্দ্রের সবচেয়ে রাজনৈতিক ও বিতর্কিত উপন্যাস। এটি ১৮৮২ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকায়, তারপর গ্রন্থাকারে। এই উপন্যাসেই আছে বিখ্যাত গান 'বন্দে মাতরম' — যা পরবর্তীতে ভারতের জাতীয় স্তোত্র হয়।
▼ পটভূমি
পটভূমি: ১৭৭০ সালের ভয়াবহ বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত।
▼ সম্পূর্ণ কাহিনি
বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ চলছে। মানুষ অনাহারে মরছে। ব্রিটিশ শাসন ও কোম্পানির অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে একদল সন্ন্যাসী 'সন্তান' নামে পরিচিত — দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সংগঠিত হয়।
মহেন্দ্র একজন সাধারণ গৃহস্থ। দুর্ভিক্ষে তার সংসার বিপর্যস্ত। স্ত্রী কল্যাণী ও মেয়েকে নিয়ে সে পালাচ্ছে।
কল্যাণী মহেন্দ্রের স্ত্রী। দুর্ভিক্ষের মাঝে পরিবার নিয়ে বাঁচার সংগ্রাম করছেন।
ভবানন্দ — সন্ন্যাসীদের নেতা। দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন।
সত্যানন্দ — আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ সন্ন্যাসী চরিত্র।
মহেন্দ্র ক্রমে সন্তান দলে যোগ দেয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।
উপন্যাসে মা দুর্গার রূপে মাতৃভূমিকে দেখানো হয়েছে। 'বন্দে মাতরম' গানটি এই উপন্যাসে সন্তান দলের প্রার্থনাগীত হিসেবে ব্যবহৃত।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 মহেন্দ্র: নায়ক। সাধারণ গৃহস্থ থেকে সন্তান।
👑 কল্যাণী: মহেন্দ্রের স্ত্রী। নায়িকা।
👑 ভবানন্দ: সন্ন্যাসী নেতা।
👑 সত্যানন্দ: গুরুত্বপূর্ণ সন্ন্যাসী।
👑 শান্তি: নারী সন্ন্যাসী চরিত্র। পুরুষ ছদ্মবেশে যুদ্ধ করে।
▼ বন্দে মাতরম — ঐতিহাসিক গান
'আনন্দমঠ' উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র 'বন্দে মাতরম' গানটি রচনা করেন। গানটি বাংলা ও সংস্কৃত ভাষার মিশ্রণে লেখা। মাতৃভূমিকে মা হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে।
১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এই গানটিকে 'জাতীয় স্তোত্র' হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তীকালে এটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গৃহীত হয়।
“বন্দে মাতরম! সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম।”
⭐ বন্দে মাতরম = আনন্দমঠ উপন্যাস থেকে নেওয়া। পরে ভারতের জাতীয় স্তোত্র।
⚡ বন্দে মাতরম গানটি কোথায় আছে? — আনন্দমঠ উপন্যাসে। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত।
⚡ বন্দে মাতরম কবে জাতীয় স্তোত্র হয়? — ১৯৩৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস স্বীকৃতি দেয়।
❓ আনন্দমঠ কোন পত্রিকায় প্রকাশিত? ➤ বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (১৮৮২)
❓ আনন্দমঠের পটভূমি? ➤ ১৭৭০ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
♔ দেবী চৌধুরাণী ও সীতারাম ♔
✰ দেবী চৌধুরাণী (১৮৮৪) — নারী বীরত্বের উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও সম্পূর্ণ কাহিনি
পটভূমি: অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলা। ব্রিটিশ শাসনের প্রারম্ভিক পর্যায়।
প্রফুল্ল একজন সাধারণ বাঙালি মেয়ে। বিবাহের পর স্বামীর পরিবার তাকে সহজে গ্রহণ করে না। একসময় বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
অসহায় প্রফুল্ল দস্যু সর্দার ভবানী পাঠকের সাথে পরিচিত হয়। ভবানী পাঠক একজন সন্ন্যাসী দস্যু — তবে দেশের মানুষের জন্য লড়াই করেন। তিনি প্রফুল্লকে শিক্ষা দেন — লড়াই করতে, জীবন যাপন করতে।
প্রফুল্ল ক্রমে 'দেবী চৌধুরাণী' নামে পরিচিত হয়। সে একজন বীরাঙ্গনা — যে একদিকে দরিদ্রদের সাহায্য করে, অন্যদিকে ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে।
কিন্তু প্রফুল্লের স্বামী ব্রজেশ্বর এখনও তাকে ভালোবাসে। শেষ পর্যন্ত স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আসে।
▶ চরিত্রসমূহ
👑 প্রফুল্ল (দেবী চৌধুরাণী): নায়িকা। সাধারণ মেয়ে থেকে বীরাঙ্গনা।
👑 ভবানী পাঠক: সন্ন্যাসী দস্যু। প্রফুল্লের গুরু।
👑 ব্রজেশ্বর: প্রফুল্লের স্বামী।
⭐ দেবী চৌধুরাণী = প্রফুল্ল + ভবানী পাঠক। নারী বীরত্বের উপন্যাস।
✰ সীতারাম (১৮৮৭) — বঙ্কিমের শেষ উপন্যাস ✰
▼ পটভূমি ও সম্পূর্ণ কাহিনি
'সীতারাম' বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস। ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত। পটভূমি: মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের যুগ।
সীতারাম একজন হিন্দু জমিদার যিনি নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রথমে ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন।
শ্রী — সীতারামের স্ত্রী। ভালো ও সতী নারী।
কিন্তু সীতারাম এক মুসলিম নারীর প্রেমে পড়ে নৈতিকভাবে অধঃপতিত হন। এই অধঃপতনের কারণেই তার রাজ্যের পতন ঘটে।
উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র দেখিয়েছেন — ব্যক্তিজীবনের নৈতিক দুর্বলতা জাতীয় পতনের কারণ হতে পারে।
👑 সীতারাম: নায়ক। হিন্দু জমিদার ও রাজা।
👑 শ্রী: সীতারামের স্ত্রী।
⭐ সীতারাম = বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস (১৮৮৭)।
⚡ সীতারাম বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস — ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত।
♔ অন্যান্য উপন্যাস ♔
উপন্যাস | প্রকাশকাল, ধরন ও প্রধান চরিত্র |
Rajmohan's Wife | ১৮৬৪ — ইংরেজি, একমাত্র ইংরেজি উপন্যাস |
দুর্গেশনন্দিনী | ১৮৬৫ — ঐতিহাসিক। চরিত্র: জগৎসিংহ, তিলোত্তমা, আয়েষা |
কপালকুণ্ডলা | ১৮৬৬ — রোমান্টিক। চরিত্র: কপালকুণ্ডলা, নবকুমার, কাপালিক |
মৃণালিনী | ১৮৬৯ — ঐতিহাসিক (তুর্কী আক্রমণ)। চরিত্র: হেমচন্দ্র, মৃণালিনী |
বিষবৃক্ষ | ১৮৭৩ — সামাজিক। চরিত্র: নগেন্দ্র, সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী |
ইন্দিরা | ১৮৭৩ — সামাজিক। চরিত্র: ইন্দিরা |
যুগলাঙ্গুরীয় | ১৮৭৪ — সামাজিক। চরিত্র: পুরন্দর, ধনদাস, অমলা, হিরণ্ময়ী |
চন্দ্রশেখর | ১৮৭৫ — ঐতিহাসিক (মীর কাসিম)। চরিত্র: চন্দ্রশেখর, শৈবলিনী, প্রতাপ |
রাধারাণী | ১৮৭৬ — সামাজিক। চরিত্র: রাধারাণী, কামাক্ষাবাবু |
রজনী | ১৮৭৭ — সামাজিক। চরিত্র: রজনী (অন্ধ), শচীন্দ্র |
কৃষ্ণকান্তের উইল | ১৮৭৮ — সামাজিক। চরিত্র: গোবিন্দলাল, ভ্রমর, রোহিণী |
রাজসিংহ | ১৮৮২ — ঐতিহাসিক (আওরঙ্গজেব)। চরিত্র: রাজসিংহ, জেবুন্নেসা |
আনন্দমঠ | ১৮৮২ — রাজনৈতিক। বন্দে মাতরম। চরিত্র: মহেন্দ্র, কল্যাণী, ভবানন্দ |
দেবী চৌধুরাণী | ১৮৮৪ — ঐতিহাসিক। চরিত্র: প্রফুল্ল, ভবানী পাঠক |
সীতারাম | ১৮৮৭ — ঐতিহাসিক, শেষ উপন্যাস। চরিত্র: সীতারাম, শ্রী |
⚡ বঙ্কিমচন্দ্র মোট ১৫টি উপন্যাস লেখেন — ১৪টি বাংলা + ১টি ইংরেজি।
♔ প্রবন্ধ, পত্রিকা ও বঙ্গদর্শন ♔
✰ বঙ্গদর্শন পত্রিকা (১৮৭২) ✰
১৮৭২ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যপত্রিকা। ১৮৭২ থেকে ১৮৭৬ পর্যন্ত তিনি এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমচন্দ্রের অনেক বিখ্যাত উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকাই বাংলা সাহিত্যে নতুন ধারা সৃষ্টি করে।
⚡ বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রতিষ্ঠা = ১৮৭২ সাল। বঙ্কিমচন্দ্র = প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
✰ গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধগ্রন্থ ✰
প্রবন্ধগ্রন্থ | প্রকাশকাল ও বিষয় |
লোকরহস্য | ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ সংকলন |
বিজ্ঞানরহস্য | বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ |
কমলাকান্তের দপ্তর | ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গ ও দার্শনিক প্রবন্ধ — বিখ্যাত |
সাম্য | সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক প্রবন্ধ |
কৃষ্ণচরিত্র | শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র বিশ্লেষণ |
বিবিধ প্রবন্ধ (১ম ও ২য় খণ্ড) | বিভিন্ন বিষয়ে প্রবন্ধ |
ধর্মতত্ত্ব | ধর্মীয় দর্শন বিষয়ক |
শ্রীমদ্ভগবদগীতা | গীতার ব্যাখ্যা ও অনুবাদ |
বিবিধ সমালোচনা | সাহিত্য সমালোচনা |
▼ কমলাকান্তের দপ্তর — বিশেষ আলোচনা
'কমলাকান্তের দপ্তর' বঙ্কিমচন্দ্রের অনন্যসাধারণ ব্যঙ্গাত্মক রচনা। 'কমলাকান্ত' হলো তাঁর ছদ্মনাম।
কমলাকান্ত একজন আফিমখোর মানুষ। তার দপ্তর মানে তার লেখার জায়গা। আফিমের নেশায় অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় সে যে চিন্তা করে সেই চিন্তাগুলো লিখেছেন বঙ্কিমচন্দ্র।
এই রচনায় সমাজ, রাজনীতি, মানুষের স্বভাব — সব কিছুর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ আছে। বাংলা ব্যঙ্গসাহিত্যে এটি একটি অনন্য রচনা।
⭐ কমলাকান্তের দপ্তর = বঙ্কিমচন্দ্রের ছদ্মনামে লেখা ব্যঙ্গ রচনা।
⚡ কমলাকান্ত = বঙ্কিমচন্দ্রের ছদ্মনাম। কমলাকান্তের দপ্তর = বিখ্যাত ব্যঙ্গ প্রবন্ধ সংকলন।
♔ প্রশ্নোত্তর ♔
♔ প্রতিটি প্রশ্ন বিসিএসে এসেছে বা আসতে পারে ♔
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি?
➤ সাহিত্য সম্রাট এবং বাংলা উপন্যাসের জনক
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মতারিখ?
➤ ২৬ জুন ১৮৩৮
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মস্থান?
➤ কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগনা, পশ্চিমবঙ্গ
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুতারিখ?
➤ ৮ এপ্রিল ১৮৯৪
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর কারণ?
➤ বহুমূত্র রোগ
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের ছদ্মনাম?
➤ কমলাকান্ত
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের মোট উপন্যাস?
➤ ১৫টি (১৪টি বাংলা + ১টি ইংরেজি)
❓ বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস?
➤ দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস?
➤ দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের একমাত্র ইংরেজি উপন্যাস?
➤ Rajmohan's Wife (১৮৬৪)
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস?
➤ সীতারাম (১৮৮৭)
❓ দুর্গেশনন্দিনীর নায়ক ও নায়িকা?
➤ জগৎসিংহ ও তিলোত্তমা
❓ কপালকুণ্ডলার বিখ্যাত সংলাপ?
➤ পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?
❓ বিষবৃক্ষের চরিত্র?
➤ নগেন্দ্রনাথ, সূর্যমুখী, কুন্দনন্দিনী
❓ 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' কোন কোন উপন্যাসে?
➤ বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল
❓ কৃষ্ণকান্তের উইলের চরিত্র?
➤ গোবিন্দলাল, ভ্রমর, রোহিণী
❓ আনন্দমঠ প্রকাশকাল?
➤ ১৮৮২ সালে (বঙ্গদর্শন পত্রিকায়)
❓ আনন্দমঠের পটভূমি?
➤ ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ ও সন্ন্যাসী বিদ্রোহ
❓ আনন্দমঠের চরিত্র?
➤ মহেন্দ্র, কল্যাণী, ভবানন্দ, সত্যানন্দ
❓ বন্দে মাতরম কোন উপন্যাসে?
➤ আনন্দমঠ (১৮৮২)
❓ বন্দে মাতরম জাতীয় স্তোত্র হয়?
➤ ১৯৩৭ সালে (ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস)
❓ দেবী চৌধুরাণীর নায়িকা?
➤ প্রফুল্ল (দেবী চৌধুরাণী)
❓ রাজসিংহ নায়িকা?
➤ জেবুন্নেসা
❓ চন্দ্রশেখরের পটভূমি?
➤ মীর কাসিমের যুগ (অষ্টাদশ শতাব্দী)
❓ বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রতিষ্ঠা?
➤ ১৮৭২ সালে
❓ কমলাকান্তের দপ্তর কী?
➤ বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গ প্রবন্ধ সংকলন (ছদ্মনামে)
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের পেশা?
➤ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর
❓ বঙ্কিমচন্দ্র বিএ পরীক্ষায় কত সালে প্রথম?
➤ ১৮৫৭ সালে
❓ মৃণালিনীর পটভূমি?
➤ ত্রয়োদশ শতাব্দী, তুর্কী আক্রমণ
❓ রজনীর নায়িকা কেমন?
➤ অন্ধ মেয়ে
❓ বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাশৈলীর নাম?
➤ বঙ্কিমী শৈলী বা বঙ্কিমী রীতি
❓ কৃষ্ণচরিত্র কী ধরনের রচনা?
➤ প্রবন্ধ — শ্রীকৃষ্ণের চরিত্র বিশ্লেষণ
❓ সাম্য কী?
➤ বঙ্কিমচন্দ্রের সামাজিক ন্যায়বিচার বিষয়ক প্রবন্ধ
❓ রাজসিংহের পটভূমি?
➤ আওরঙ্গজেবের যুগ
❓ দুর্গেশনন্দিনীর পটভূমি?
➤ ষোড়শ শতাব্দী — মুঘল-পাঠান দ্বন্দ্ব
♔ ⚡ ট্রিকি ও অজানা তথ্য ♔
♔ সাহিত্য সম্রাটের সাম্রাজ্য থেকে ♔
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম উপন্যাস 'Rajmohan's Wife' (১৮৬৪) — ইংরেজিতে। প্রথম বাংলা উপন্যাস 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫)।
⚡ 'প্রদীপ নিভিয়া গেল' — উভয় উপন্যাসে: বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল।
⚡ বন্দে মাতরম = আনন্দমঠ উপন্যাস (১৮৮২)। জাতীয় স্তোত্র হয় ১৯৩৭ সালে।
⚡ কমলাকান্ত = বঙ্কিমচন্দ্রের ছদ্মনাম। কমলাকান্তের দপ্তর = বিখ্যাত ব্যঙ্গ রচনা।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বিএ পরীক্ষায় প্রথম হন — ১৮৫৭ সালে।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের মোট উপন্যাস ১৫টি — ১৪টি বাংলা + ১টি ইংরেজি।
⚡ সীতারাম বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস (১৮৮৭)।
⚡ রাজসিংহ = নায়িকা-প্রধান উপন্যাস। নায়িকা = জেবুন্নেসা।
⚡ দুর্গেশনন্দিনী প্রথম উপন্যাস হিসেবে ভূমিকায় লেখেন: 'এই প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখিলাম।'
⚡ বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ১৮৭২ — বঙ্কিমচন্দ্র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।
⚡ কপালকুণ্ডলার বিখ্যাত সংলাপ: 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ?'
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাশৈলী 'বঙ্কিমী শৈলী' বা 'বঙ্কিমী রীতি' নামে পরিচিত।
⚡ চন্দ্রশেখরের পটভূমি মীর কাসিমের যুগ — আওরঙ্গজেবের নয়।
⚡ মৃণালিনী = তুর্কী আক্রমণ (বখতিয়ার খলজির সময়) — ত্রয়োদশ শতাব্দী।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম স্ত্রী মারা যান — দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম রাজলক্ষ্মীদেবী।
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম ২৬ জুন, মৃত্যু ৮ এপ্রিল ১৮৯৪।
⚡ সাম্য (প্রবন্ধ) = বঙ্কিমচন্দ্র। সাম্যবাদী (কবিতা) = নজরুল — এই পার্থক্য মনে রাখুন!
⚡ বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন।
⚡ বিষবৃক্ষের নায়িকা = কুন্দনন্দিনী (বিধবা মেয়ে)। সূর্যমুখী = প্রথম স্ত্রী।
⚡ আনন্দমঠ = সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমি + বন্দে মাতরম + ১৮৮২ সালে প্রকাশিত।
♔ চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ ♔
বিষয় | উত্তর |
পূর্ণ নাম | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
জন্ম | ২৬ জুন ১৮৩৮, কাঁঠালপাড়া, চব্বিশ পরগনা |
মৃত্যু | ৮ এপ্রিল ১৮৯৪ (বহুমূত্র রোগ) |
ছদ্মনাম | কমলাকান্ত |
উপাধি | সাহিত্য সম্রাট, বাংলা উপন্যাসের জনক |
মোট উপন্যাস | ১৫টি (১৪ বাংলা + ১ ইংরেজি) |
প্রথম উপন্যাস (ইং) | Rajmohan's Wife (১৮৬৪) |
প্রথম বাংলা উপন্যাস | দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) |
শেষ উপন্যাস | সীতারাম (১৮৮৭) |
বিখ্যাত উপন্যাস | আনন্দমঠ (বন্দে মাতরম) |
রোমান্টিক মাস্টারপিস | কপালকুণ্ডলা (১৮৬৬) |
বন্দে মাতরম | আনন্দমঠ (১৮৮২) — জাতীয় স্তোত্র ১৯৩৭ |
বিখ্যাত বাক্য | প্রদীপ নিভিয়া গেল (বিষবৃক্ষ ও কৃষ্ণকান্তের উইল) |
বিখ্যাত সংলাপ | পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ? (কপালকুণ্ডলা) |
পত্রিকা | বঙ্গদর্শন (প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ১৮৭২) |
রচনাশৈলী | বঙ্কিমী শৈলী বা বঙ্কিমী রীতি |
বিএ পরীক্ষায় | প্রথম (কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, ১৮৫৭) |
পেশা | ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর |