বাংলা সাহিত্য ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ Fort William College ━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━━ বাংলা গদ্যের সূতিকাগার (১৮০০ – ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ) |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ — প্রথম দৃষ্টিতে |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান। এই কলেজকে বলা হয় 'বাংলা গদ্যের সূতিকাগার' বা জন্মভূমি। বাংলা ভাষায় যে আধুনিক গদ্য আজ আমরা ব্যবহার করি, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল এই কলেজের পণ্ডিত-লেখকদের হাত ধরে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাস্তব প্রয়োজন থেকে জন্ম নিলেও এই কলেজ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে অপরিসীম অবদান রেখেছে।
🏛 এক নজরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ
|
প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও ইতিহাস |
◆ কেন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল? |
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতে ব্রিটিশ শাসন ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু বাণিজ্য করছিল না, শাসনকার্যও পরিচালনা করছিল। কিন্তু একটি বড় সমস্যা ছিল — ইংল্যান্ড থেকে আসা তরুণ সিভিল সার্ভেন্টরা ভারতীয় ভাষা, সংস্কৃতি ও রীতিনীতি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। এই শূন্যতা পূরণ করতেই লর্ড ওয়েলেসলি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ স্থাপন করেন।
প্রতিষ্ঠার গল্প — একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত লর্ড ওয়েলেসলি ছিলেন একজন দূরদর্শী ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেল। তিনি বুঝেছিলেন যে ভারত শাসন করতে হলে এই দেশের মানুষকে জানতে হবে, তাদের ভাষা বুঝতে হবে। ১৮০০ সালের ৪ মে তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার আদেশ জারি করেন। ওই বছরই ২৪ নভেম্বর কলেজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। কলেজটিতে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার বিভাগ ছিল: বাংলা, সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, হিন্দুস্তানি, তেলেগু, মারাঠি ইত্যাদি। তবে সাহিত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা বিভাগ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। ব্রিটিশ সরকারের কাছে এই কলেজটি ছিল প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তা। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বাংলা ভাষার জন্য ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব উপহার — পণ্ডিত-লেখকদের হাতে বাংলা গদ্যসাহিত্য পেল তার প্রথম নিয়মিত রূপ। |
◆ লর্ড ওয়েলেসলি — প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় |
ℹ লর্ড ওয়েলেসলি (Lord Richard Colley Wellesley) পুরো নাম: Richard Colley Wellesley, Marquess Wellesley পদ: ভারতের গভর্নর-জেনারেল (১৭৯৮ – ১৮০৫) জাতীয়তা: ব্রিটিশ/আইরিশ প্রধান অবদান: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা (১৮০০) ডাক নাম: 'সেপয় জেনারেল' — ভারতের ব্যাপক ভূখণ্ড জয় করেন তাঁর ভাই: আর্থার ওয়েলেসলি — পরে Duke of Wellington নামে বিখ্যাত কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য: সিভিলিয়ানদের ভারতীয় ভাষা শেখানো ব্রিটেনে বিরোধিতা: Directors of East India Company-র অনেকে কলেজটির বিরোধিতা করেছিলেন |
বাংলা বিভাগ ও উইলিয়াম কেরি |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই বিভাগের নেতৃত্বে ছিলেন ব্যাপটিস্ট মিশনারি উইলিয়াম কেরি। তিনি কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, ছিলেন বাংলা ভাষার একজন গভীর অনুরাগী ও অক্লান্ত কর্মী।
◆ উইলিয়াম কেরি — বাংলা বিভাগের প্রধান |
উইলিয়াম কেরির পরিচয় ও অবদান
|
◆ জন গিলক্রিস্ট — কলেজের পরিচালক |
ℹ জন বর্থউইক গিলক্রিস্ট (John Borthwick Gilchrist) পরিচয়: স্কটিশ ভাষাবিদ ও চিকিৎসক পদ: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রথম সুপারিন্টেন্ডেন্ট (১৮০০–১৮০৪) হিন্দুস্তানি বিভাগের প্রধান হিন্দুস্তানি ভাষায় ব্যাপক কাজ করেছেন উর্দু-হিন্দি ভাষার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন কলেজের পাঠ্যক্রম তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা নেন |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত ও লেখকগণ |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সবচেয়ে বড় অবদান হলো এখানে বাংলার শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের একত্রিত করা হয়েছিল। তাঁরা বাংলায় পাঠ্যপুস্তক, অনুবাদ ও মৌলিক রচনা তৈরি করেছেন যা পরবর্তীকালে বাংলা গদ্যসাহিত্যের ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
◆ রামরাম বসু — কলেজের প্রথম বাংলা পণ্ডিত |
রামরাম বসু (১৭৫৭ – ১৮১৩) রামরাম বসু ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রথম বাংলা পণ্ডিত। উইলিয়াম কেরির সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের মতো। বাংলা গদ্য রচনায় তিনি ছিলেন পথিকৃৎ। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলি বাংলা গদ্যের প্রাথমিক নমুনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি প্রথম বাংলায় জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। |
▸ রামরাম বসুর রচনাসমূহ
গ্রন্থের নাম | প্রকাশ বছর | বিশেষ তথ্য |
রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র | ১৮০১ | প্রথম মৌলিক বাংলা গদ্যগ্রন্থ; প্রতাপাদিত্যের জীবনী |
লিপিমালা | ১৮০২ | চিঠিপত্রের সংকলন; প্রথম বাংলা পত্রসাহিত্য |
▸ 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' — গল্পাকারে পরিচয়
কাহিনি-সংক্ষেপ রাজা প্রতাপাদিত্য ছিলেন ষোড়শ-সপ্তদশ শতকের বাংলার বার ভুঁইয়াদের অন্যতম প্রধান, যশোরের স্বাধীন রাজা। মুঘল সম্রাট আকবরের অধীনতা অস্বীকার করে তিনি স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছিলেন। পরবর্তীতে মুঘল সেনাপতি ইসলাম খাঁর কাছে তিনি পরাজিত ও বন্দী হন। রামরাম বসু এই গ্রন্থে উইলিয়াম কেরির সহযোগিতায় প্রতাপাদিত্যের বীরত্বের কাহিনি সরল বাংলা গদ্যে লিখেছেন। এটি বাংলা সাহিত্যে প্রথম মৌলিক গদ্যগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। সাহিত্যিক গুরুত্ব: এটি বাংলার প্রথম জীবনীমূলক গদ্যগ্রন্থ। রামরাম বসু সংস্কৃতের জটিলতা পরিহার করে সহজ কথ্য বাংলায় এই গ্রন্থ রচনা করেছেন। |
◆ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার — পণ্ডিত কবি |
মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (আনু. ১৭৬২ – ১৮১৯) মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সবচেয়ে পণ্ডিত ও প্রভাবশালী বাংলা লেখক। সংস্কৃতে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী এই মানুষটি বাংলা গদ্যকে দিয়েছেন একটি পরিশীলিত রূপ। তবে তাঁর ভাষায় সংস্কৃতের প্রভাব বেশি থাকায় তা কিছুটা কঠিন ছিল। |
▸ মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের রচনাসমূহ
গ্রন্থের নাম | বছর | বিবরণ |
বত্রিশ সিংহাসন | ১৮০২ | সিংহাসন বত্রিশীর বাংলা অনুবাদ — রাজা বিক্রমাদিত্যের ৩২টি গল্প |
হিতোপদেশ | ১৮০৮ | সংস্কৃত হিতোপদেশের বাংলা গদ্যানুবাদ |
প্রবোধচন্দ্রিকা | ১৮৩৩ | বাংলা ব্যাকরণ; মৃত্যুর পরে প্রকাশিত |
রাজাবলি | ১৮০৮ | ভারতের রাজাদের ইতিহাস — গদ্যে রচিত |
▸ 'বত্রিশ সিংহাসন' — গল্পাকারে পরিচয়
কাহিনি-সংক্ষেপ এটি মূলত সংস্কৃত 'সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা'-র বাংলা অনুবাদ। কাহিনিতে রাজা ভোজ বিক্রমাদিত্যের সিংহাসনে বসতে চাইলে সিংহাসনের ৩২টি পুতুল একের পর এক তাঁকে বিক্রমাদিত্যের বীরত্বের ৩২টি অলৌকিক গল্প শোনায়। প্রতিটি গল্পের শেষে পুতুলেরা প্রশ্ন করে — 'রাজা ভোজ, বিক্রমাদিত্যের মতো গুণ কি তোমার আছে?' মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার এই গল্পগুলি সরল বাংলায় অনুবাদ করেছেন। গুরুত্ব: এটি বাংলা সাহিত্যে গল্প-সাহিত্যের প্রথম উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিশুসাহিত্যের প্রাথমিক নমুনাও বলা যায়। |
◆ চণ্ডীচরণ মুনশী ও অন্যান্য পণ্ডিত |
পণ্ডিত/লেখক | রচনাসমূহ | প্রকাশকাল | বিশেষ তথ্য |
চণ্ডীচরণ মুনশী | তোতা ইতিহাস | ১৮০২ | ফারসি 'তুতিনামা'-র অনুবাদ; তোতাপাখির গল্প |
রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় | মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্ | ১৮০৫ | নদিয়ার রাজার জীবনী; বাংলায় প্রথম জীবনী সাহিত্য |
হরপ্রসাদ রায় | পুরুষ পরীক্ষা | ১৮২০ | বিদ্যাপতির কাব্যের অনুপ্রেরণায় নীতিকথামূলক গল্প |
গোলোকনাথ শর্মা | হিতোপদেশ (অনু.) | ১৮০২ | হিতোপদেশের গদ্যানুবাদ; নীতিকথামূলক |
তারিণীচরণ মিত্র | বাংলা ব্যাকরণ | — | বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় অবদান |
ইশ্বরচন্দ্র (চক্রবর্তী) | কথোপকথন | ১৮০১ | কথ্য বাংলার নমুনা; সংলাপ আকারে |
▸ 'তোতা ইতিহাস' — গল্পাকারে পরিচয়
কাহিনি-সংক্ষেপ 'তোতা ইতিহাস' মূলত ফারসি 'তুতিনামা'-র বাংলা অনুবাদ। মূল গ্রন্থে একটি তোতাপাখি তার মালিকের স্ত্রীকে ৫২টি রাতে ৫২টি গল্প বলে পরপুরুষের সাথে মিলন থেকে বিরত রাখে। প্রতিটি গল্পে নারী-পুরুষের প্রেম, বিশ্বস্ততা ও নৈতিকতার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। চণ্ডীচরণ মুনশী এই গল্পগুলি বাংলায় সুন্দর সরল গদ্যে রূপান্তরিত করেছেন। গুরুত্ব: বাংলা গদ্যে অনুবাদ-সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ফারসি সাহিত্যের বাংলাকরণের প্রাথমিক প্রয়াস। |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে মোট ৫০টিরও বেশি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। নিচে বাংলা ভাষার দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলির তালিকা দেওয়া হলো।
গ্রন্থের নাম | লেখক | বছর | ধরন |
রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র | রামরাম বসু | ১৮০১ | জীবনীমূলক গদ্য |
কথোপকথন | ইশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী | ১৮০১ | সংলাপ-গদ্য |
লিপিমালা | রামরাম বসু | ১৮০২ | পত্রসাহিত্য |
বত্রিশ সিংহাসন | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার | ১৮০২ | অনুবাদ গল্প |
তোতা ইতিহাস | চণ্ডীচরণ মুনশী | ১৮০২ | অনুবাদ গল্প |
হিতোপদেশ (প্রথম) | গোলোকনাথ শর্মা | ১৮০২ | নীতিকথামূলক |
মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র... | রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় | ১৮০৫ | জীবনী |
হিতোপদেশ (দ্বিতীয়) | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার | ১৮০৮ | নীতিকথামূলক অনুবাদ |
রাজাবলি | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার | ১৮০৮ | ইতিহাস |
A Grammar of Bengali | উইলিয়াম কেরি | ১৮০১ | ব্যাকরণ |
পুরুষ পরীক্ষা | হরপ্রসাদ রায় | ১৮২০ | নীতিকথা |
প্রবোধচন্দ্রিকা | মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার | ১৮৩৩ | ব্যাকরণ (মরণোত্তর) |
বাংলা গদ্য সাহিত্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা |
◆ গদ্যের আগে ও পরে |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রায় কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মধ্যযুগ থেকে চলে আসা পদ্যসাহিত্যই ছিল বাংলা সাহিত্যের মূলধারা। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, রামায়ণ-মহাভারতের পদ্যানুবাদ — সব কিছুই পদ্যে। গদ্যের চর্চা হতো শুধু পুঁথি ও চিঠিপত্রে, সেটিও অনিয়মিত ও অসংহত।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের গদ্য-বিপ্লব ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরা প্রথমবারের মতো সুশৃঙ্খল ও বিন্যস্ত বাংলা গদ্য রচনা করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় বাংলা গদ্য পেল: একটি নির্দিষ্ট ছন্দ ও ভঙ্গি বাক্যের সঠিক গঠন ও বিরামচিহ্নের ব্যবহার বিভিন্ন বিষয়ে রচনার উপযোগী ভাষা সংস্কৃত ও কথ্য বাংলার মিশেলে একটি সাহিত্যিক মান তবে এই গদ্যের দুটি ধারা ছিল: রামরাম বসুর সহজ ও কথ্য ভাষার ধারা এবং মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের সংস্কৃতঘেঁষা পণ্ডিতি ভাষার ধারা। এই দুই ধারার মিলন ঘটিয়ে পরবর্তীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে পরিপূর্ণ রূপ দেবেন। |
◆ সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা |
ℹ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সীমাবদ্ধতা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত — বাংলা সাহিত্য চর্চা মূল উদ্দেশ্য ছিল না। মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের গদ্য অতিরিক্ত সংস্কৃতঘেঁষা — সাধারণ পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য। উইলিয়াম কেরির বাংলা গদ্যে খ্রিস্টান মিশনারি উদ্দেশ্যের ছাপ স্পষ্ট। বেশিরভাগ রচনাই অনুবাদ বা রূপান্তর — মৌলিক সৃষ্টিশীলতা সীমিত। বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে এই গ্রন্থগুলি পৌঁছানোর সুযোগ ছিল না। ১৮৫৪ সালে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। |
MCQ প্রশ্নোত্তর — BCS প্রস্তুতি |
◆ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ — সম্পূর্ণ প্রশ্নোত্তর পর্ব |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কে প্রতিষ্ঠা করেন? | উত্তর: লর্ড ওয়েলেসলি (Lord Wellesley) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়? | উত্তর: ১৮০০ সালে (৪ মে ১৮০০) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কোথায় অবস্থিত ছিল? | উত্তর: কলকাতায় (ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান কে ছিলেন? | উত্তর: উইলিয়াম কেরি (William Carey) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রথম সুপারিন্টেন্ডেন্ট কে? | উত্তর: জন গিলক্রিস্ট (John Gilchrist) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রথম বাংলা পণ্ডিত কে? | উত্তর: রামরাম বসু |
প্রশ্ন: 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' কে রচনা করেন? | উত্তর: রামরাম বসু (১৮০১) |
প্রশ্ন: 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' কত সালে প্রকাশিত হয়? | উত্তর: ১৮০১ সালে |
প্রশ্ন: 'লিপিমালা' কার রচনা? | উত্তর: রামরাম বসু (১৮০২) |
প্রশ্ন: 'বত্রিশ সিংহাসন' কে রচনা করেন? | উত্তর: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮০২) |
প্রশ্ন: 'বত্রিশ সিংহাসন' কোন গ্রন্থের অনুবাদ? | উত্তর: সংস্কৃত 'সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা'-র বাংলা অনুবাদ |
প্রশ্ন: 'তোতা ইতিহাস' কে রচনা করেন? | উত্তর: চণ্ডীচরণ মুনশী (১৮০২) |
প্রশ্ন: 'তোতা ইতিহাস' কোন ভাষা থেকে অনুবাদ? | উত্তর: ফারসি 'তুতিনামা' থেকে |
প্রশ্ন: 'হিতোপদেশ' বাংলায় কে অনুবাদ করেন? | উত্তর: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮০৮) ও গোলোকনাথ শর্মা (১৮০২) |
প্রশ্ন: 'প্রবোধচন্দ্রিকা' কার রচনা? | উত্তর: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮৩৩, মরণোত্তর) |
প্রশ্ন: 'রাজাবলি' কার রচনা? | উত্তর: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮০৮) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা গদ্যের প্রথম গ্রন্থ কোনটি? | উত্তর: রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (১৮০১) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ কত সালে বন্ধ হয়? | উত্তর: ১৮৫৪ সালে |
প্রশ্ন: উইলিয়াম কেরি কোন বিভাগের প্রধান ছিলেন? | উত্তর: বাংলা বিভাগ |
প্রশ্ন: উইলিয়াম কেরির 'A Grammar of the Bengali Language' কত সালে প্রকাশ? | উত্তর: ১৮০১ সালে |
প্রশ্ন: 'মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্' কার রচনা? | উত্তর: রাজীবলোচন মুখোপাধ্যায় (১৮০৫) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজকে কী বলা হয়? | উত্তর: বাংলা গদ্যের সূতিকাগার |
প্রশ্ন: রামরাম বসুর জন্ম ও মৃত্যু সাল? | উত্তর: ১৭৫৭ – ১৮১৩ খ্রি. |
প্রশ্ন: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকারের আনুমানিক মৃত্যু সাল? | উত্তর: ১৮১৯ সালে |
প্রশ্ন: উইলিয়াম কেরি কত সালে বাংলায় আসেন? | উত্তর: ১৭৯৩ সালে |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কী? | উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিলিয়ানদের ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানো |
প্রশ্ন: লর্ড ওয়েলেসলি কোন পদে ছিলেন? | উত্তর: ভারতের গভর্নর-জেনারেল (১৭৯৮–১৮০৫) |
প্রশ্ন: কোন গ্রন্থটি বাংলা পত্রসাহিত্যের প্রথম উদাহরণ? | উত্তর: রামরাম বসুর 'লিপিমালা' (১৮০২) |
প্রশ্ন: 'পুরুষ পরীক্ষা' কে রচনা করেন? | উত্তর: হরপ্রসাদ রায় (১৮২০) |
প্রশ্ন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কার্যক্রম কবে শুরু হয়? | উত্তর: ২৪ নভেম্বর ১৮০০ |
ট্রিকি ও অজানা তথ্য |
⚡ তারিখ ও সাল বিষয়ক বিভ্রান্তি কলেজ প্রতিষ্ঠার আদেশ: ৪ মে ১৮০০। কার্যক্রম শুরু: ২৪ নভেম্বর ১৮০০ — দুটো তারিখই আসে। প্রতিষ্ঠার বছর ১৮০০, কিন্তু প্রথম বই 'প্রতাপাদিত্য চরিত্র' ১৮০১ সালে। মৃত্যুঞ্জয়ের 'প্রবোধচন্দ্রিকা' প্রকাশ ১৮৩৩ — তাঁর মৃত্যুর (১৮১৯) ১৪ বছর পর। উইলিয়াম কেরি বাংলায় আসেন ১৭৯৩, কিন্তু কলেজে যোগ দেন ১৮০১ সালে। কলেজ বন্ধ: ১৮৫৪ সাল — কাকতালীয়ভাবে এই বছরই 'Wood's Despatch' শিক্ষানীতি জারি হয়। |
⚡ লেখক ও গ্রন্থ বিষয়ক বিভ্রান্তি 'হিতোপদেশ' দুজনে লিখেছেন — গোলোকনাথ শর্মা (১৮০২) ও মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮০৮)। আলাদা অনুবাদ। রামরাম বসু প্রথম বাংলা পণ্ডিত — কিন্তু উইলিয়াম কেরি বিভাগের প্রধান। 'বত্রিশ সিংহাসন' = সংস্কৃত 'সিংহাসনদ্বাত্রিংশিকা'। 'তোতা ইতিহাস' = ফারসি 'তুতিনামা'। মৃত্যুঞ্জয়ের গদ্য পণ্ডিতি — রামরাম বসুর গদ্য সহজ; দুজনের ভাষার পার্থক্য পরীক্ষায় আসে। উইলিয়াম কেরি ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ছিলেন না — ছিলেন মিশনারি। |
⚡ 'প্রথম' বিষয়ক ট্রিকি তথ্য বাংলার প্রথম মৌলিক গদ্যগ্রন্থ: 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' — রামরাম বসু (১৮০১)। বাংলায় প্রথম পত্রসাহিত্য: 'লিপিমালা' — রামরাম বসু (১৮০২)। প্রথম বাংলা অনুবাদ গল্পগ্রন্থ: 'বত্রিশ সিংহাসন' বা 'তোতা ইতিহাস' (১৮০২) — বিতর্ক আছে। বাংলায় প্রথম বৈজ্ঞানিক ব্যাকরণ: William Carey-র 'A Grammar of the Bengali Language' (১৮০১)। বাংলার প্রথম 'জীবনী সাহিত্য': 'মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রম্' — রাজীবলোচন (১৮০৫)। |
★ অতি গুরুত্বপূর্ণ — প্রায়ই ভুল হয় কলেজটি 'ফোর্ট উইলিয়াম' দুর্গে অবস্থিত ছিল — এটি ঢাকায় নয়, কলকাতায়। প্রতিষ্ঠাতা লর্ড ওয়েলেসলি — লর্ড ক্লাইভ বা ওয়ারেন হেস্টিংস নন। বাংলা গদ্যের জনক কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — কলেজ নয়; কলেজ হলো 'সূতিকাগার'। কলেজ বন্ধ হয় ১৮৫৪ সালে — ১৮৫৭ সালে (সিপাহি বিদ্রোহ) নয়। লর্ড ওয়েলেসলির ভাই আর্থার ওয়েলেসলি = Duke of Wellington (ওয়াটারলু-বিজয়ী)। জন গিলক্রিস্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট — অধ্যক্ষ বা প্রিন্সিপাল নন। |
সাহিত্য |
◆ ঔপনিবেশিকতা ও বাংলা সাহিত্য — একটি দ্বিধাবিভক্ত উত্তরাধিকার |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি জটিল এবং বহুমাত্রিক অধ্যায়। একদিক থেকে এটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের হাতিয়ার — ভারতকে আরও কার্যকরভাবে শাসন করার জন্য তৈরি। অন্যদিক থেকে এটি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি অনন্য উপহার।
যে ব্রিটিশ উদ্দেশ্যে কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্য এবং বাংলার জন্য যা ঘটল — এই দুটো ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। প্রশাসনিক উদ্দেশ্যে পণ্ডিতদের কলমে সৃষ্টি হলো বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপ। বাংলা ভাষার এই বিচিত্র গতিপথ ইতিহাসের এক অনন্য বিদ্রূপ।
◆ রামরাম বসু বনাম মৃত্যুঞ্জয় — দুই ধারার লড়াই |
দুই ধারার তুলনামূলক আলোচনা
|
◆ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ যে গদ্যের বীজ বপন করেছিল, তার পূর্ণ বিকাশ ঘটান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের দুই ধারাকে একত্রিত করে বাংলা গদ্যকে দিলেন এক অসাধারণ ছন্দময় ও বোধগম্য রূপ। এই অর্থে বিদ্যাসাগর ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজেরই যোগ্য উত্তরসূরি।
সারসংক্ষেপ |
★ মনে রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ★ ১. প্রতিষ্ঠাতা: লর্ড ওয়েলেসলি — ৪ মে ১৮০০। ২. কার্যক্রম শুরু: ২৪ নভেম্বর ১৮০০। ৩. বাংলা বিভাগের প্রধান: উইলিয়াম কেরি। ৪. প্রথম পণ্ডিত: রামরাম বসু। ৫. প্রথম গ্রন্থ: রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র — রামরাম বসু (১৮০১)। ৬. সবচেয়ে পণ্ডিত লেখক: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার। ৭. সরল ভাষার লেখক: রামরাম বসু। ৮. 'তোতা ইতিহাস': চণ্ডীচরণ মুনশী (১৮০২) — ফারসি থেকে। ৯. 'বত্রিশ সিংহাসন': মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার (১৮০২) — সংস্কৃত থেকে। ১০. কলেজ বন্ধ: ১৮৫৪ সাল। ১১. গুরুত্ব: বাংলা গদ্যের সূতিকাগার। ১২. Gilchrist: হিন্দুস্তানি বিভাগের প্রধান ও প্রথম সুপারিন্টেন্ডেন্ট। |
📝 পরীক্ষার্থীদের জন্য শেষ পরামর্শ ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে সবচেয়ে বেশি MCQ আসে: প্রতিষ্ঠাতা ও সাল (লর্ড ওয়েলেসলি, ১৮০০) বাংলা বিভাগের প্রধান (উইলিয়াম কেরি) প্রথম গ্রন্থ ও লেখক (প্রতাপাদিত্য চরিত্র, রামরাম বসু, ১৮০১) 'তোতা ইতিহাস' ও 'বত্রিশ সিংহাসন' — লেখক ও মূল ভাষা কলেজ বন্ধের সাল (১৮৫৪) মনে রাখুন: ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ = বাংলা গদ্যের জন্মভূমি, কিন্তু বাংলা গদ্যের জনক = ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। |
━━━━━━━━━━━ অধ্যায় সমাপ্ত ━━━━━━━━━━━