বাংলা গদ্য — সংজ্ঞা, প্রকৃতি ও যুগবিভাগ |
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পদ্যের পাশাপাশি গদ্যের বিকাশ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মধ্যযুগ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে গদ্যের প্রায় কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতদের হাতে বাংলা গদ্যের প্রথম পদক্ষেপ শুরু হয় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অক্লান্ত পরিশ্রমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে।
বাংলা গদ্যের যুগবিভাগ
|
বাংলা গদ্যের উদ্ভব — পূর্বইতিহাস |
◆ গদ্যের আগে কী ছিল? |
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে গদ্যের কোনো স্থান ছিল না। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলি, রামায়ণ-মহাভারতের অনুবাদ — সবকিছুই রচিত হতো পদ্যে। গদ্য লেখা হতো কেবল দৈনন্দিন চিঠিপত্র, সরকারি দলিল বা পুঁথিপত্রে — যার ছিল না কোনো সাহিত্যিক মান বা শৃঙ্খলা।
ℹ গদ্যের উদ্ভবের কারণসমূহ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন: সিভিল সার্ভেন্টদের বাংলা শেখানোর প্রয়োজনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা। মিশনারিদের কার্যক্রম: খ্রিস্টধর্ম প্রচারের জন্য বাইবেল ও ধর্মগ্রন্থের বাংলা অনুবাদ। মুদ্রণযন্ত্রের আবির্ভাব: ১৭৭৮ সালে হুগলিতে প্রথম বাংলা মুদ্রণ। শিক্ষার বিস্তার: ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বাংলা গদ্যেও শিক্ষামূলক লেখার চাহিদা। সংবাদপত্রের প্রকাশ: বাংলায় সংবাদপত্র প্রকাশ গদ্যলেখার অভ্যাস তৈরি করে। সমাজ-সংস্কার আন্দোলন: রামমোহন রায়ের সংস্কার আন্দোলন গদ্যের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। |
◆ বাংলা মুদ্রণের ইতিহাস — গদ্যের ভিত্তি |
সন | ঘটনা | গুরুত্ব |
১৭৭৮ | হুগলিতে প্রথম বাংলা মুদ্রণ — নাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড-এর 'A Grammar of the Bengal Language' | প্রথম বাংলা মুদ্রণ; চার্লস উইলকিন্স টাইপ তৈরি করেন |
১৭৮১ | 'হিতোপদেশ' বাংলায় মুদ্রণ | প্রাচীন সংস্কৃত গ্রন্থের বাংলা মুদ্রণ |
১৮০০ | শ্রীরামপুর মিশন প্রেস প্রতিষ্ঠা | বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার কেন্দ্র |
১৮১৮ | 'সমাচার দর্পণ' প্রথম বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশ | গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য কর্তৃক |
১৮১৮ | 'বাঙ্গাল গেজেট' প্রকাশ | গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্যের আরেক পত্রিকা |
১৮২১ | 'সংবাদ কৌমুদী' প্রকাশ | রামমোহন রায় সম্পাদিত |
আদি বাংলা গদ্য — ফোর্ট উইলিয়াম থেকে বিদ্যাসাগর |
◆ দুটি ধারা — সহজ ও পণ্ডিতি |
সহজ গদ্যের ধারা | পণ্ডিতি গদ্যের ধারা |
প্রবর্তক: রামরাম বসু ভাষা: সহজ, কথ্য ও প্রবহমান পাঠকশ্রেণি: সাধারণ মানুষ শ্রেষ্ঠ নিদর্শন: 'রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র' পরবর্তী প্রভাব: বিদ্যাসাগরের কথ্যধারায় | প্রবর্তক: মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালংকার ভাষা: সংস্কৃতঘেঁষা, দুর্বোধ্য পাঠকশ্রেণি: শিক্ষিত পণ্ডিত শ্রেষ্ঠ নিদর্শন: 'বত্রিশ সিংহাসন' পরবর্তী প্রভাব: বিদ্যাসাগরের তৎসমধারায় |
◆ রামমোহন রায় — গদ্যের প্রথম সংগ্রামী কণ্ঠস্বর |
রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২ – ১৮৩৩) রামমোহন রায় ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিত ছিলেন না, কিন্তু বাংলা গদ্যের বিকাশে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। তিনি সমাজ-সংস্কার আন্দোলনের জন্য বাংলা গদ্যকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর গদ্য ছিল সরল, যুক্তিনির্ভর ও প্রত্যয়ী।
|
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর — বাংলা গদ্যের জনক |
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০ – ১৮৯১)
|
◆ বিদ্যাসাগরের গদ্যের বৈশিষ্ট্য |
কেন বিদ্যাসাগর গদ্যের 'জনক'? বিদ্যাসাগরের আগে বাংলা গদ্যে কোনো ঐক্য ছিল না — একদিকে রামরাম বসুর সহজ গদ্য, অন্যদিকে মৃত্যুঞ্জয়ের কঠিন পণ্ডিতি গদ্য। বিদ্যাসাগর এই দুটো ধারাকে একত্রিত করে বাংলা গদ্যকে দিলেন একটি সুষম, ছন্দোবদ্ধ ও বোধগম্য রূপ। বিদ্যাসাগরের গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি: বাক্যের সুষম গঠন: দীর্ঘ বাক্যকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে ছন্দময় করেছেন। বিরামচিহ্নের নিয়মিত ব্যবহার: দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনের সুশৃঙ্খল প্রয়োগ। তৎসম ও তদ্ভব শব্দের সমন্বয়: সংস্কৃত ও সহজ বাংলা শব্দের মিলন। গদ্যে কাব্যিক সৌন্দর্য: বাক্যে অন্তর্নিহিত সুর ও ছন্দ। স্পষ্টতা ও যুক্তিশীলতা: চিন্তার পরিষ্কার প্রকাশ। অনুবাদে মৌলিকতা: সংস্কৃত ও ইংরেজি অনুবাদে বাংলার নিজস্ব রূপ প্রদান। |
◆ বিদ্যাসাগরের সম্পূর্ণ রচনাতালিকা |
গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল | ধরন | বিশেষ তথ্য |
বেতাল পঞ্চবিংশতি | ১৮৪৭ | অনুবাদ-গল্প | সংস্কৃত 'বেতালপঞ্চবিংশিকা' ও ইংরেজি থেকে অনুবাদ |
বাংলার ইতিহাস | ১৮৪৮ | ইতিহাস | মার্শম্যানের ইতিহাসের অনুবাদ |
জীবনচরিত | ১৮৪৯ | জীবনী | ইংরেজি থেকে অনুবাদ |
বোধোদয় | ১৮৫১ | পাঠ্যপুস্তক | শিশুদের প্রথম পাঠ; বাংলায় সর্বাধিক বিক্রিত |
বর্ণপরিচয় (১ম ও ২য় ভাগ) | ১৮৫৫ | বর্ণমালা | বাংলার প্রথম বৈজ্ঞানিক বর্ণপরিচয় |
সীতার বনবাস | ১৮৬০ | কাব্যগদ্য | সংস্কৃত রামায়ণ অবলম্বনে — অসাধারণ গদ্যকাব্য |
শকুন্তলা | ১৮৫৪ | কাব্যগদ্য | কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলমের অনুবাদ |
বিদ্যাসাগর চরিত | ১৮৯১ | আত্মজীবনী | নিজের লেখা আত্মজীবনী |
বিধবা-বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা | ১৮৫৫ | প্রবন্ধ | বিধবা বিবাহের পক্ষে যুক্তি |
কথামালা | ১৮৫৬ | নীতিকথা | ঈশপের গল্পের অনুবাদ |
আখ্যানমঞ্জরী | ১৮৬৩ | গল্পসংকলন | শিশুপাঠ্য গল্প |
ভ্রান্তিবিলাস | ১৮৬৯ | নাটক | শেক্সপিয়রের 'Comedy of Errors'-এর অনুবাদ |
ব্রজবিলাস | ১৮৮৪ | প্রহসন | সমাজ-সমালোচনামূলক ব্যঙ্গরচনা |
অতি-অল্প হইল | — | প্রহসন | ব্যঙ্গ রচনা |
▸ 'সীতার বনবাস'
কাহিনি-সংক্ষেপ ও সাহিত্যিক বিশ্লেষণ 'সীতার বনবাস' (১৮৬০) বিদ্যাসাগরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। সংস্কৃত রামায়ণের উত্তরকাণ্ড অবলম্বনে রচিত এই গ্রন্থে সীতার বনবাসের করুণ কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। রাবণ বধের পরে অযোধ্যায় ফিরে রামচন্দ্র সীতার অগ্নিপরীক্ষা নিয়ে তাঁকে গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রজাদের অসন্তোষের কারণে লক্ষ্মণকে দিয়ে গর্ভবতী সীতাকে বনে পাঠিয়ে দেন। মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে সীতা লব ও কুশের জন্ম দেন। পরে রামচন্দ্র সীতাকে ফিরিয়ে আনতে চাইলে সীতা মাতৃগর্ভে লীন হয়ে যান। বিদ্যাসাগর অত্যন্ত করুণরসের সাথে সীতার মাতৃত্ব ও আত্মসম্মানের কাহিনি লিখেছেন। সাহিত্যিক গুরুত্ব: এই গ্রন্থটি বাংলায় 'গদ্যকাব্য' রচনার প্রথম সার্থক প্রচেষ্টা। বিদ্যাসাগরের গদ্যের সুরেলা ছন্দ এখানে সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে। |
⚡ বিদ্যাসাগর বিষয়ক ট্রিকি তথ্য 'বর্ণপরিচয়' বাংলার প্রথম বৈজ্ঞানিক বর্ণপরিচয় — বাংলায় সর্বাধিক মুদ্রিত বই। বিদ্যাসাগরের আসল পদবি 'বন্দ্যোপাধ্যায়' — 'বিদ্যাসাগর' উপাধি। 'বেতাল পঞ্চবিংশতি' তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ (১৮৪৭)। বিদ্যাসাগর শেক্সপিয়রের 'Comedy of Errors' অনুবাদ করেন 'ভ্রান্তিবিলাস' নামে। তিনি বিধবাবিবাহ আইন পাসের জন্য অক্লান্ত লড়াই করেন — ১৮৫৬ সালে আইন পাস হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন: 'বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের প্রথম যথার্থ শিল্পী'। বিদ্যাসাগরের 'বোধোদয়' শুধু বইই নয় — বাংলায় আধুনিক শিশুশিক্ষার প্রথম পদক্ষেপ। |
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় — বাংলা উপন্যাসের জনক |
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮ – ১৮৯৪)
|
◆ বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাসমূহ |
গ্রন্থের নাম | প্রকাশকাল | ধরন | বিশেষ তথ্য |
Rajmohan's Wife | ১৮৬৪ | উপন্যাস (ইং) | প্রথম বাংলাদেশি লেখকের ইংরেজি উপন্যাস |
দুর্গেশনন্দিনী | ১৮৬৫ | উপন্যাস | বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস |
কপালকুণ্ডলা | ১৮৬৬ | উপন্যাস | রোমান্টিক-ট্র্যাজিক; বনের নারীর গল্প |
মৃণালিনী | ১৮৬৯ | উপন্যাস | ঐতিহাসিক উপন্যাস |
বিষবৃক্ষ | ১৮৭৩ | উপন্যাস | সামাজিক উপন্যাস; পরকীয়া প্রেমের কাহিনি |
ইন্দিরা | ১৮৭৩ | উপন্যাস | ছোট উপন্যাস |
যুগলাঙ্গুরীয় | ১৮৭৪ | উপন্যাস | ছোট উপন্যাস |
রাধারাণী | ১৮৭৬ | উপন্যাস | সামাজিক উপন্যাস |
চন্দ্রশেখর | ১৮৭৫ | উপন্যাস | ঐতিহাসিক-সামাজিক; বাংলার সেরা উপন্যাসগুলির একটি |
রজনী | ১৮৭৭ | উপন্যাস | অন্ধ নারীর কাহিনি; ব্যতিক্রমী রীতি |
কৃষ্ণকান্তের উইল | ১৮৭৮ | উপন্যাস | সামাজিক উপন্যাস; বিধবা বিবাহ ও নীতিবোধ |
রাজসিংহ | ১৮৮২ | উপন্যাস | ঐতিহাসিক; মুঘল যুগ |
আনন্দমঠ | ১৮৮২ | উপন্যাস | 'বন্দেমাতরম' গান; সন্ন্যাসী বিদ্রোহ |
দেবী চৌধুরানী | ১৮৮৪ | উপন্যাস | ঐতিহাসিক-সামাজিক |
সীতারাম | ১৮৮৭ | উপন্যাস | বঙ্কিমের শেষ উপন্যাস |
লোকরহস্য | ১৮৭৪ | প্রবন্ধ | রম্যরচনা ও সমাজ-সমালোচনা |
কমলাকান্তের দপ্তর | ১৮৭৫ | প্রবন্ধ | ব্যঙ্গাত্মক প্রবন্ধ; 'কমলাকান্ত' চরিত্র |
বিবিধ সমালোচনা | ১৮৭৬ | প্রবন্ধ | সাহিত্য-সমালোচনা |
কৃষ্ণচরিত্র | ১৮৮৬ | গবেষণা | শ্রীকৃষ্ণের জীবনী ও দর্শন |
ধর্মতত্ত্ব | ১৮৮৮ | দর্শন | ধর্ম ও নীতিবোধ বিষয়ক |
▸ 'দুর্গেশনন্দিনী' — বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস
কাহিনি-সংক্ষেপ ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত 'দুর্গেশনন্দিনী' বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। ঐতিহাসিক পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসের কাহিনি মুঘল যুগের। উড়িষ্যার রাজপুত রাজার কন্যা তিলোত্তমা — দুর্গেশনন্দিনী — এর সাথে মোগল সুবেদার পুত্র জগৎসিংহের প্রেমের কাহিনি। পাঠান সেনাপতি কতলু খাঁ তিলোত্তমাকে অপহরণ করেন। জগৎসিংহ তাঁকে উদ্ধার করতে যান, নানা ঘটনার পর শেষে তিলোত্তমার সাথে তাঁর মিলন হয়। উপন্যাসে আরেক চরিত্র মুঘল রাজকন্যা আয়েশা রয়েছে যে জগৎসিংহকে ভালোবাসে। সাহিত্যিক গুরুত্ব: বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার উপন্যাসের পূর্ণাঙ্গ কাঠামো — চরিত্র, কাহিনি, দ্বন্দ্ব, পরিণতি — সুশৃঙ্খলভাবে উপস্থাপিত হলো। এটি বাংলা উপন্যাসের 'শূন্য থেকে সূচনা'র মতো। |
▸ 'কপালকুণ্ডলা' — রোমান্টিক ট্র্যাজেডির শ্রেষ্ঠ নিদর্শন
কাহিনি-সংক্ষেপ নবকুমার একদিন ঝড়ে জাহাজ ডুবে সুন্দরবনের দ্বীপে আটকে যান। সেখানে এক কাপালিকের সাথে বাস করে বনেই মানুষ হওয়া মেয়ে কপালকুণ্ডলার সাথে তাঁর পরিচয় হয়। নবকুমার তাকে বিয়ে করে সভ্য সমাজে নিয়ে আসেন। কিন্তু বনের অরণ্যচারী কপালকুণ্ডলা সমাজের নিয়মকানুনে মানিয়ে নিতে পারে না। পুরনো ভালোবাসার টানে ও নিজের স্বাভাবিকতার আহ্বানে সে এক রাতে মৃত্যুর পথ বেছে নেয়। বিখ্যাত উক্তি: 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ।' — কপালকুণ্ডলার এই উক্তি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিখ্যাত উদ্ধৃতি। |
▸ 'আনন্দমঠ' — জাতীয়তাবাদের মহাকাব্য
কাহিনি-সংক্ষেপ ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের (১৭৭৬) পটভূমিতে রচিত। সন্তানদল নামের এক সন্ন্যাসী বাহিনী মাতৃভূমি রক্ষায় ব্রিটিশ ও মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। মহেন্দ্র সিং এই বাহিনীতে যোগ দেন। উপন্যাসে 'বন্দেমাতরম' গানটি প্রথম প্রকাশ পায় — যা পরে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। বিশেষ তথ্য: 'বন্দেমাতরম' গানটি মূলত এই উপন্যাসে আছে। পরে এটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র হিসেবে মর্যাদা পায়। ১৯৫০ সালে 'জন গণ মন'-এর পাশাপাশি 'বন্দেমাতরম'-এর প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় স্তোত্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। |
⚡ বঙ্কিম বিষয়ক ট্রিকি তথ্য বঙ্কিমচন্দ্র 'সাহিত্যসম্রাট' উপাধি পান রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। প্রথম বাংলা উপন্যাস হিসেবে 'দুর্গেশনন্দিনী' স্বীকৃত — 'আলালের ঘরের দুলাল' নয়। তবে 'আলালের ঘরের দুলাল' (প্যারীচাঁদ মিত্র, ১৮৫৮) বাংলার প্রথম 'কথ্য ভাষায়' উপন্যাস। 'Rajmohan's Wife' (১৮৬৪) প্রথম ইংরেজি উপন্যাস — 'দুর্গেশনন্দিনী' (১৮৬৫) প্রথম বাংলা। 'কপালকুণ্ডলা'-র বিখ্যাত উক্তি: 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ।' 'কমলাকান্তের দপ্তর'-এর 'কমলাকান্ত' বঙ্কিমের সৃষ্ট ব্যঙ্গধারার চরিত্র। 'বঙ্গদর্শন' (১৮৭২) বঙ্কিম সম্পাদিত — বাংলার প্রথম সাহিত্য পত্রিকাগুলির অন্যতম। |
প্যারীচাঁদ মিত্র — চলিত ভাষার প্রবর্তক |
প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪ – ১৮৮৩) প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা সাহিত্যে কথ্যভাষার প্রথম সার্থক প্রয়োগকর্তা। তাঁর ছদ্মনাম 'টেকচাঁদ ঠাকুর'।
|
'আলালের ঘরের দুলাল' — গল্পাকারে মতিলাল নামে এক ধনী জমিদারের ছেলে বাবা-মার অতিরিক্ত আদরে বখে যায়। সে মদ খায়, জুয়া খেলে, কুসঙ্গে মেশে। পরিবারের সম্পদ নষ্ট করে। শেষে নানা বিপদের মুখে পড়ে মতিলাল বুঝতে পারে সৎ জীবনের গুরুত্ব। গুরুত্ব: বাংলা সাহিত্যে প্রথমবার কথ্য ভাষায়, সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় সাহিত্য রচিত হলো। ঢাকাই-বাংলা মিশেলের এই ভাষাকে 'আলালি ভাষা' বলা হয়। |
◆ কালীপ্রসন্ন সিংহ — হুতোম প্যাঁচার নকশা |
কালীপ্রসন্ন সিংহ (১৮৪০ – ১৮৭০) ছদ্মনাম 'হুতোম প্যাঁচা' নামে বিখ্যাত। তাঁর 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' (১৮৬১–৬২) কলকাতার উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজের ব্যঙ্গচিত্র। কথ্যভাষায় ও ব্যঙ্গরসে রচিত এই গ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির ব্যঙ্গরচনা। তিনি মহাভারত বাংলায় অনুবাদ করেন। |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর — বাংলা গদ্যের সর্বোচ্চ শিল্পী |
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু কবিতার ক্ষেত্রে নয়, বাংলা গদ্যসাহিত্যেও অতুলনীয় অবদান রেখেছেন। উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা — সব মাধ্যমে তাঁর গদ্য অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।
◆ রবীন্দ্রনাথের গদ্যরচন |
বিভাগ | প্রধান রচনা | বিশেষ তথ্য |
উপন্যাস | চোখের বালি (১৯০৩), গোরা (১৯১০), ঘরে বাইরে (১৯১৬), শেষের কবিতা (১৯২৯), চতুরঙ্গ, যোগাযোগ, মালঞ্চ, চার অধ্যায় | 'গোরা' শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত |
ছোটগল্প | কাবুলিওয়ালা, হৈমন্তী, পোস্টমাস্টার, নষ্টনীড়, সমাপ্তি, অতিথি, দেনাপাওনা, একরাত্রি | বাংলা ছোটগল্পের জনক; প্রথম ছোটগল্প 'ভিখারিণী' (১৮৭৭) |
নাটক | ডাকঘর, রাজা, রক্তকরবী, বিসর্জন, মুক্তধারা, অচলায়তন | 'ডাকঘর' নোবেল পুরস্কারে উল্লিখিত |
প্রবন্ধ | আধুনিক সাহিত্য, সাহিত্য, বিশ্বসাহিত্য, মানুষের ধর্ম | দার্শনিক ও সাহিত্য-সমালোচনামূলক |
স্মৃতিকথা | জীবনস্মৃতি (১৯১২), ছেলেবেলা (১৯৪০) | নিজের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি |
ভ্রমণকাহিনি | য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি, য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র, পারস্য-যাত্রীর ডায়ারি | বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন |
পত্রসাহিত্য | ছিন্নপত্র (১৮৯৩–৯৫), ছিন্নপত্রাবলী | বাংলা পত্রসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সংকলন |
▸ 'গোরা' উপন্যাস
কাহিনি-সংক্ষেপ ও বিশ্লেষণ 'গোরা' (১৯১০) রবীন্দ্রনাথের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে বিবেচিত। গোরা — গৌরমোহন মৈত্র — একজন উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী। সে ব্রাহ্মণ জন্মের গর্ব করে, পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকে ঘৃণা করে। তার বন্ধু বিনয় ব্রাহ্মসমাজের পরেশবাবুর পরিবারের সাথে মেলামেশা করে। গোরা ব্রাহ্মণকন্যা সুচরিতার প্রেমে পড়ে। কিন্তু একদিন সে জানতে পারে — সে আসলে আইরিশ বংশোদ্ভূত! দাঙ্গার সময় তার মা তাকে বাঁচিয়ে পালিয়ে আনেন। এই পরিচয় জানার পর গোরার সব গর্ব-জাত-ধর্মের ভেদাভেদ ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে — মানুষই মূল পরিচয়। দার্শনিক তাৎপর্য: জাতীয়তাবাদ ও মানবতাবাদের দ্বন্দ্ব; ধর্মের ভেদাভেদ ছাড়িয়ে মানবিক পরিচয়ের সন্ধান — এই বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য গদ্যে উপস্থাপন করেছেন। |
▸ রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প — বাংলা ছোটগল্পের জন্মকথা
বাংলা ছোটগল্পের জনক — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্পের ইতিহাস শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের হাতে। তাঁর প্রথম ছোটগল্প 'ভিখারিণী' (১৮৭৭)। তবে পূর্ণাঙ্গ শিল্পীসত্তায় রচিত ছোটগল্প হিসেবে 'পোস্টমাস্টার' (১৮৯১) প্রথম। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য: গল্পের মধ্যে কবিতার সুর — ভাষায় কাব্যিক মাধুর্য। মানবমনের সূক্ষ্ম অনুভূতির প্রকাশ। প্রকৃতির সাথে মানবজীবনের অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। অনির্বচনীয় মুহূর্তের ধারণ — ছোটগল্পের 'রবীন্দ্রসংজ্ঞা': 'ক্ষণিকের মহিমা'। বাংলার পল্লিজীবন, জমিদারি ব্যবস্থা ও মানবিক সম্পর্কের চিত্র। |
আধুনিক বাংলা গদ্য — বিচিত্র ধারা ও প্রবাহ |
◆ চলিত ভাষার বিজয় — প্রমথ চৌধুরী |
প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮ – ১৯৪৬) — চলিত ভাষার প্রবর্তক প্রমথ চৌধুরী ছদ্মনাম 'বীরবল' নামে পরিচিত। তিনি ১৯১৩ সালে 'সবুজপত্র' পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সাহিত্যে চলিত ভাষার ব্যবহার জনপ্রিয় করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁর প্রভাবে চলিত ভাষায় লেখা শুরু করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি: 'সাহিত্যে চলিত ভাষাই সাহিত্যিক ভাষা।' প্রবন্ধগ্রন্থ: 'তেল-নুন-লকড়ি', 'বীরবলের হালখাতা', 'নানাকথা', 'প্রমথ চৌধুরীর গল্পসংগ্রহ'। |
◆ বাংলাদেশের গদ্য সাহিত্য — স্বাধীনতার পর |
লেখক | প্রধান রচনা | ধরন | বৈশিষ্ট্য |
হুমায়ূন আহমেদ | নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, মিসির আলি সিরিজ, হিমু সিরিজ | উপন্যাস | বাংলাদেশের সর্বকালের জনপ্রিয় লেখক |
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস | চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা | উপন্যাস | মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাস; গভীর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি |
সেলিনা হোসেন | হাঙর নদী গ্রেনেড, চাঁদবেনে, পদ্মপুরাণ | উপন্যাস | নারীজীবন ও মুক্তিযুদ্ধ |
শওকত আলী | প্রদোষে প্রাকৃতজন, ওয়ারিশ, দলিল | উপন্যাস | ইতিহাসভিত্তিক ও রাজনৈতিক উপন্যাস |
আব্দুল মান্নান সৈয়দ | সত্যের মতো বদমাশ, উপন্যাস সমগ্র | উপন্যাস ও প্রবন্ধ | আধুনিকতাবাদী গদ্য |
মাহমুদুল হক | কালো বরফ, জীবন আমার বোন | উপন্যাস | সূক্ষ্ম মনোবিশ্লেষণ |
রশীদ করীম | উত্তম পুরুষ, প্রসন্ন পাষাণ | উপন্যাস | শহুরে মধ্যবিত্ত জীবন |
শহীদুল জহির | সে রাতে পূর্ণিমা ছিল, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা | ছোটগল্প ও উপন্যাস | অনন্য গদ্যরীতি; জাদুবাস্তববাদ |
জহির রায়হান | আরেক ফাল্গুন, হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী | উপন্যাস | ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ |
আনোয়ার পাশা | রাইফেল রোটি আওরাত, নীড় সন্ধানী | উপন্যাস | মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক |
◆ বাংলা গদ্যের বিভিন্ন ধারা — তুলনামূলক চিত্র |
গদ্যের ধারা | প্রবর্তক | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
সাধু গদ্য | বিদ্যাসাগর | সীতার বনবাস, বেতাল পঞ্চবিংশতি | তৎসম শব্দবহুল, ক্রিয়াপদে 'করিল-বলিল' |
চলিত গদ্য | প্যারীচাঁদ মিত্র, প্রমথ চৌধুরী | আলালের ঘরের দুলাল | কথ্যভাষা; 'করল-বলল' রূপ |
কাব্যিক গদ্য | রবীন্দ্রনাথ | গোরা, ছোটগল্পসমূহ | গদ্যে কবিতার সুর ও ছন্দ |
ব্যঙ্গ গদ্য | বঙ্কিম, কালীপ্রসন্ন | কমলাকান্তের দপ্তর | ব্যঙ্গরস ও সামাজিক সমালোচনা |
দার্শনিক গদ্য | রামমোহন, বিদ্যাসাগর | বেদান্তগ্রন্থ, বিধবা বিবাহ | যুক্তিনির্ভর, প্রত্যয়ী ভাষা |
মনোবিশ্লেষণী গদ্য | রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র | চোখের বালি, চরিত্রহীন | চরিত্রের মনোজগতের গভীরতা |
আঞ্চলিক গদ্য | বিভূতিভূষণ | পথের পাঁচালী | গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির মিলন |
মুক্তিযুদ্ধের গদ্য | জাহানারা ইমাম, সেলিনা হোসেন | একাত্তরের দিনগুলি, হাঙর নদী গ্রেনেড | ১৯৭১-এর অভিজ্ঞতা ও চেতনা |
প্রথম ও জনক — গদ্যের ইতিহাসে 'প্রথম' |
'প্রথম' বা 'জনক' উপাধি | ব্যক্তি / গ্রন্থ |
বাংলা গদ্যের জনক | ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |
বাংলা উপন্যাসের জনক | বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস | দুর্গেশনন্দিনী (বঙ্কিম, ১৮৬৫) |
বাংলার প্রথম ইংরেজি উপন্যাস | Rajmohan's Wife (বঙ্কিম, ১৮৬৪) |
বাংলার প্রথম কথ্যভাষার উপন্যাস | আলালের ঘরের দুলাল (প্যারীচাঁদ মিত্র, ১৮৫৮) |
বাংলা ছোটগল্পের জনক | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প | ভিখারিণী (১৮৭৭) |
বাংলার প্রথম মৌলিক গদ্যগ্রন্থ | রাজা প্রতাপাদিত্য চরিত্র (রামরাম বসু, ১৮০১) |
বাংলার প্রথম পত্রসাহিত্য | লিপিমালা (রামরাম বসু, ১৮০২) |
বাংলায় কথ্যভাষার প্রবর্তক (সাহিত্যে) | প্যারীচাঁদ মিত্র |
সাহিত্যে চলিত ভাষার প্রবর্তক | প্রমথ চৌধুরী (সবুজপত্র, ১৯১৩) |
বাংলার প্রথম ব্যঙ্গ উপন্যাস | হুতোম প্যাঁচার নকশা (কালীপ্রসন্ন সিংহ, ১৮৬১–৬২) |
বাংলার প্রথম বৈজ্ঞানিক বর্ণপরিচয় | বর্ণপরিচয় (বিদ্যাসাগর, ১৮৫৫) |
বাংলার প্রথম সামাজিক উপন্যাস | বিষবৃক্ষ (বঙ্কিম, ১৮৭৩) |
বাংলার প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাস | দুর্গেশনন্দিনী (বঙ্কিম, ১৮৬৫) |
বাংলা মুক্তিযুদ্ধের প্রথম উপন্যাস | রাইফেল রোটি আওরাত (আনোয়ার পাশা, ১৯৭১) |
MCQ প্রশ্নোত্তর |
প্রশ্ন: বাংলা গদ্যের জনক কে? | উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর |
প্রশ্ন: বাংলা উপন্যাসের জনক কে? | উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
প্রশ্ন: বাংলা ছোটগল্পের জনক কে? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
প্রশ্ন: বিদ্যাসাগরের প্রথম উল্লেখযোগ্য গদ্যগ্রন্থ কোনটি? | উত্তর: বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭) |
প্রশ্ন: বিদ্যাসাগরের আসল পদবি কী? | উত্তর: বন্দ্যোপাধ্যায় ('বিদ্যাসাগর' উপাধি) |
প্রশ্ন: 'বর্ণপরিচয়' কে রচনা করেন? | উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮৫৫) |
প্রশ্ন: 'সীতার বনবাস' কার রচনা? | উত্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮৬০) |
প্রশ্ন: 'ভ্রান্তিবিলাস' কার অনুবাদ? | উত্তর: বিদ্যাসাগর (শেক্সপিয়রের 'Comedy of Errors') |
প্রশ্ন: বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম বাংলা উপন্যাস কোনটি? | উত্তর: দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) |
প্রশ্ন: বঙ্কিমচন্দ্রের প্রথম ইংরেজি উপন্যাস কোনটি? | উত্তর: Rajmohan's Wife (১৮৬৪) |
প্রশ্ন: বঙ্কিমচন্দ্রের উপাধি কী? | উত্তর: সাহিত্যসম্রাট |
প্রশ্ন: 'সাহিত্যসম্রাট' উপাধি কে দিয়েছেন? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
প্রশ্ন: 'বন্দেমাতরম' গানটি কোন উপন্যাসে? | উত্তর: আনন্দমঠ (বঙ্কিম, ১৮৮২) |
প্রশ্ন: 'পথিক, তুমি পথ হারাইয়াছ' — কোন উপন্যাস থেকে? | উত্তর: কপালকুণ্ডলা (বঙ্কিমচন্দ্র) |
প্রশ্ন: 'কমলাকান্তের দপ্তর' কার রচনা? | উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় |
প্রশ্ন: 'বঙ্গদর্শন' পত্রিকার সম্পাদক কে? | উত্তর: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭২) |
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস কোনটি? | উত্তর: গোরা (১৯১০) |
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প কোনটি? | উত্তর: ভিখারিণী (১৮৭৭) |
প্রশ্ন: 'চোখের বালি' কার রচনা? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০৩) |
প্রশ্ন: 'জীবনস্মৃতি' কার রচনা? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১২) |
প্রশ্ন: প্যারীচাঁদ মিত্রের ছদ্মনাম কী? | উত্তর: টেকচাঁদ ঠাকুর |
প্রশ্ন: 'আলালের ঘরের দুলাল' কার রচনা? | উত্তর: প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮৫৭–৫৮) |
প্রশ্ন: কালীপ্রসন্ন সিংহের ছদ্মনাম কী? | উত্তর: হুতোম প্যাঁচা |
প্রশ্ন: 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' কত সালে প্রকাশিত? | উত্তর: ১৮৬১–৬২ সালে |
প্রশ্ন: প্রমথ চৌধুরীর ছদ্মনাম কী? | উত্তর: বীরবল |
প্রশ্ন: 'সবুজপত্র' পত্রিকা কে প্রকাশ করেন? | উত্তর: প্রমথ চৌধুরী (১৯১৩) |
প্রশ্ন: 'কাবুলিওয়ালা' গল্পের লেখক কে? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
প্রশ্ন: রামমোহন রায়ের সংবাদপত্রের নাম কী? | উত্তর: সংবাদ কৌমুদী (বাংলা), মিরাৎ-উল-আখবার (ফার্সি) |
প্রশ্ন: প্রথম বাংলা সংবাদপত্র কোনটি? | উত্তর: সমাচার দর্পণ (১৮১৮) |
প্রশ্ন: 'দুর্গেশনন্দিনী'তে নায়িকার নাম কী? | উত্তর: তিলোত্তমা |
প্রশ্ন: 'আনন্দমঠ'-এর পটভূমি কোন বিদ্রোহ? | উত্তর: সন্ন্যাসী বিদ্রোহ / ছিয়াত্তরের মন্বন্তর |
প্রশ্ন: বাংলায় প্রথম মুদ্রণ কত সালে? | উত্তর: ১৭৭৮ সালে, হুগলিতে (হ্যালহেড-এর বাংলা ব্যাকরণ) |
প্রশ্ন: শ্রীরামপুর মিশন প্রেস কবে প্রতিষ্ঠিত? | উত্তর: ১৮০০ সালে |
প্রশ্ন: 'হাঙর নদী গ্রেনেড' কার রচনা? | উত্তর: সেলিনা হোসেন |
প্রশ্ন: 'হাজার বছর ধরে' কার রচনা? | উত্তর: জহির রায়হান |
প্রশ্ন: 'খোয়াবনামা' কার রচনা? | উত্তর: আখতারুজ্জামান ইলিয়াস |
প্রশ্ন: 'রাইফেল রোটি আওরাত' কার রচনা? | উত্তর: আনোয়ার পাশা |
প্রশ্ন: বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ আইন কত সালে পাস করান? | উত্তর: ১৮৫৬ সালে |
প্রশ্ন: 'শেষের কবিতা' কার রচনা? | উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর |
প্রশ্ন: 'নন্দিত নরকে' কার রচনা? | উত্তর: হুমায়ূন আহমেদ |
ট্রিকি ও অজানা তথ্য |
⚡ 'প্রথম উপন্যাস' বিষয়ক বিভ্রান্তি বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাস = দুর্গেশনন্দিনী (বঙ্কিম, ১৮৬৫)। বাংলার প্রথম কথ্যভাষায় উপন্যাস = আলালের ঘরের দুলাল (প্যারীচাঁদ, ১৮৫৮)। বঙ্কিমের প্রথম ইংরেজি = Rajmohan's Wife (১৮৬৪) — বাংলা = দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)। 'আলালের ঘরের দুলাল' প্রথম কিন্তু 'সার্থক' নয় — উপন্যাসের পূর্ণ কাঠামো নেই। বাংলার প্রথম মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস = রাইফেল রোটি আওরাত (আনোয়ার পাশা, ১৯৭১)। |
⚡ 'জনক' বিষয়ক বিভ্রান্তি বাংলা গদ্যের জনক = বিদ্যাসাগর। উপন্যাসের জনক = বঙ্কিম। ছোটগল্পের জনক = রবীন্দ্রনাথ। চলিত গদ্যের প্রবর্তক = প্রমথ চৌধুরী (সাহিত্যে); কথ্যভাষার = প্যারীচাঁদ মিত্র। বাংলা গদ্যের 'সূতিকাগার' = ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ। 'জনক' কিন্তু বিদ্যাসাগর। রবীন্দ্রনাথের প্রথম ছোটগল্প = ভিখারিণী (১৮৭৭)। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ = পোস্টমাস্টার (১৮৯১)। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের পথিকৃৎ = রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। |
⚡ সাল ও ছদ্মনাম বিষয়ক বিভ্রান্তি প্যারীচাঁদ মিত্র = টেকচাঁদ ঠাকুর। কালীপ্রসন্ন = হুতোম প্যাঁচা। প্রমথ = বীরবল। দুর্গেশনন্দিনী ১৮৬৫, Rajmohan's Wife ১৮৬৪ — বাংলার আগে ইংরেজিতে লিখেছিলেন। বঙ্কিমের শেষ উপন্যাস = সীতারাম (১৮৮৭)। প্রথম = দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫)। আনন্দমঠ (১৮৮২) — সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমি; বন্দেমাতরম এই উপন্যাসেই আছে। 'কমলাকান্তের দপ্তর' বঙ্কিমের প্রবন্ধ — 'কমলাকান্ত' একটি কাল্পনিক চরিত্র। |
★ অতি গুরুত্বপূর্ণ — প্রায়ই ভুল হয় বিদ্যাসাগরের আসল পদবি 'বন্দ্যোপাধ্যায়' — 'বিদ্যাসাগর' উপাধি (সংস্কৃত কলেজ থেকে)। রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস 'গোরা' (১৯১০) — 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থ, উপন্যাস নয়। 'পথের পাঁচালী' বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের — বঙ্কিমের নয়। 'শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়' বাংলা সাহিত্যের 'অপরাজেয় কথাশিল্পী' — কথাসাহিত্যিক। বিদ্যাসাগর শেক্সপিয়র অনুবাদ করেছেন 'ভ্রান্তিবিলাস' নামে — 'মেঘনাদবধ' নয়। 'মেঘনাদবধ কাব্য' = মাইকেল মধুসূদন দত্ত — বিদ্যাসাগরের নয়। |
সারসংক্ষেপ |
★ একনজরে বাংলা গদ্যের সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ★
|
📝 চূড়ান্ত পরামর্শ 'জনক' প্রশ্নে: গদ্য=বিদ্যাসাগর, উপন্যাস=বঙ্কিম, ছোটগল্প=রবীন্দ্রনাথ — তিনটি আলাদা। 'প্রথম উপন্যাস': সার্থক=দুর্গেশনন্দিনী, কথ্যভাষা=আলালের ঘরের দুলাল। বঙ্কিমের ছদ্মনাম নেই; প্যারীচাঁদ=টেকচাঁদ; কালীপ্রসন্ন=হুতোম প্যাঁচা; প্রমথ=বীরবল। 'বর্ণপরিচয়' ও 'বোধোদয়' বিদ্যাসাগরের। 'মেঘনাদবধ কাব্য' মধুসূদনের। 'চলিত ভাষার প্রবর্তক' = প্রমথ চৌধুরী। 'কথ্যভাষার প্রথম প্রয়োগকর্তা' = প্যারীচাঁদ। |
━━━━━━━━━━━ অধ্যায় সমাপ্ত ━━━━━━━━━━━