বিশেষ্য
১. বিশেষ্য: ধারণা ও মৌলিক সংজ্ঞা
যে শব্দ দ্বারা কোনো ব্যক্তি, প্রাণী, বস্তু, পদার্থ, স্থান, কাল, গুণ, অবস্থা, ভাব, সমষ্টি, কর্মফল বা ধারণার নাম বোঝায়, তাকে বিশেষ্য বলে। অর্থাৎ “নাম” ধারণাই বিশেষ্যের কেন্দ্রবিন্দু। বাংলা বাক্যে যখন কোনো কিছুকে আমরা চিহ্নিত করি, ডাকি, উল্লেখ করি, নির্দিষ্ট করি বা চিনে নিই - সাধারণত সেখানে বিশেষ্যের উপস্থিতি থাকে।
বিশেষ্যের ক্ষেত্র অত্যন্ত বিস্তৃত। শুধু মানুষ বা জিনিসের নামই নয়; “শৈশব”, “সৌন্দর্য”, “মমতা”, “অন্ধকার”, “সভা”, “দল”, “পদ্মা”, “বাংলাদেশ”, “সকাল”, “গ্রীষ্ম”, “লোহা”, “ধৈর্য”, “বিজয়”, “বিদ্রোহ”, “ভালোবাসা” - এসবও বিশেষ্য। তাই বিশেষ্য বুঝতে গেলে মনে রাখতে হবে: দৃশ্যমান ও অদৃশ্য - উভয় জগতের নামবাচক শব্দই বিশেষ্যের আওতায় আসে।
মনে রাখার শর্টকাট |
“নাম বোঝায়” - এই সূত্রটি বিশেষ্যের মূল চাবিকাঠি। তবে সব “নামের মতো” শব্দ একই শ্রেণির নয়। তাই নামের ধরন বুঝে বিশেষ্যকে প্রকারভেদে আলাদা করতে হবে। |
১.১ ব্যাকরণগতভাবে বিশেষ্যের প্রয়োজনীয়তা
বাক্যের কর্তা, কর্ম, সম্বন্ধপদ, অধিকরণপদ ইত্যাদি রূপে বিশেষ্য ব্যবহৃত হয়।
সর্বনামের পূর্বসূরি বা নির্দেশিত শব্দ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিশেষ্য। যেমন: “রিমা বই পড়ছে। সে খুব মনোযোগী।” এখানে “সে” সর্বনামের পূর্বসূরি “রিমা” একটি বিশেষ্য।
বিশেষণ সাধারণত বিশেষ্যকেই বিশেষিত করে। যেমন: “নীল আকাশ”, “প্রাচীন নগরী”, “মেধাবী ছাত্র”।
কারক-বিভক্তি, বচন, লিঙ্গ ও সম্বোধন - এসব আলোচনায় বিশেষ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
১.২ বিশেষ্য চেনার প্রাথমিক লক্ষণ
কোনো কিছুর নাম বোঝালে শব্দটি বিশেষ্য হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
শব্দটির আগে/পরে “এই”, “ওই”, “একটি”, “সে”, “কয়েকটি”, “অনেক”, “আমার”, “দেশের” ইত্যাদি যোগ করলে যদি বাক্য গঠিত হয়, তবে তা প্রায়ই বিশেষ্য।
শব্দটির সঙ্গে “-রা”, “-গুলো”, “-টি”, “-খানা”, “-য়ের”, “-তে”, “-কে” ইত্যাদি যুক্ত হতে পারলে সেটি বিশেষ্য হতে পারে।
যদি শব্দটি কোনো গুণ, ভাব বা অবস্থার নাম বোঝায় - যেমন দয়া, জ্ঞান, সাহস, নীরবতা - তবুও তা বিশেষ্য।
শব্দ | কী বোঝাচ্ছে | শ্রেণি |
রবীন্দ্রনাথ | এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম | সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য |
শিক্ষক | এক গোত্র/শ্রেণির নাম | জাতিবাচক বিশেষ্য |
সোনা | এক পদার্থের নাম | দ্রব্যবাচক বিশেষ্য |
মিছিল | একত্র জনসমষ্টির নাম | সমষ্টিবাচক বিশেষ্য |
মমতা | একটি অনুভূতি/ভাবের নাম | ভাববাচক বিশেষ্য |
ঢাকা | এক স্থানের নাম | স্থানবাচক বিশেষ্য |
২. বিশেষ্যের বৈশিষ্ট্য
বিশেষ্যকে অন্য পদ থেকে আলাদা করতে তার ব্যবহারগত লক্ষণ জানা দরকার। একই শব্দ কখনো বিশেষ্য, কখনো বিশেষণ, কখনো ক্রিয়াবাচক রূপে ব্যবহৃত হতে পারে; ফলে কেবল শব্দ দেখে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল হতে পারে। বাক্যে ভূমিকা ও অর্থ - দুইটিই বিবেচ্য।
বিশেষ্য নামবাচক; এটি ব্যক্তি, জাতি, বস্তু, পদার্থ, ভাব, সমষ্টি, স্থান বা সময়ের ধারণা বহন করে।
বিশেষ্য সাধারণত বিভক্তি গ্রহণ করে। যেমন: ছেলে-কে, বই-য়ের, মাঠ-এ, নদী-তে।
বিশেষ্য বচনান্তর গ্রহণ করতে পারে। যেমন: ছাত্র → ছাত্ররা; পাখি → পাখিগুলো।
বিশেষ্যকে বিশেষণ বিশেষিত করতে পারে। যেমন: “সৎ মানুষ”, “নরম মাটি”, “মধুর ভাষা”।
বিশেষ্য অনেক ক্ষেত্রে সমাস, উপসর্গ, প্রত্যয় বা যোগের মাধ্যমে নতুন শব্দ গঠনের ভিত্তি হয়।
তুলনা | ব্যাখ্যা |
বিশেষ্য বনাম বিশেষণ | বিশেষ্য কোনো কিছুর নাম বোঝায়; বিশেষণ সেই নামবাচক শব্দের গুণ, অবস্থা বা পরিমাণ বোঝায়। “সুন্দর ফুল”-এ “ফুল” বিশেষ্য, “সুন্দর” বিশেষণ। |
বিশেষ্য বনাম সর্বনাম | বিশেষ্য নিজে নাম বলে; সর্বনাম নামের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়। “করিম এসেছে। সে বসেছে।” এখানে “করিম” বিশেষ্য, “সে” সর্বনাম। |
বিশেষ্য বনাম ক্রিয়া | বিশেষ্য নাম বা ভাব বোঝায়; ক্রিয়া কাজ, হওয়া বা থাকা বোঝায়। “পড়া” শব্দটি “আমি বই পড়ি” বাক্যে ক্রিয়া, কিন্তু “পড়া আমার অভ্যাস” বাক্যে ক্রিয়াবাচক বিশেষ্যসদৃশ নাম। |
বিশেষ্য বনাম অব্যয় | অব্যয় অপরিবর্তনীয় ও সম্পর্কসূচক/ভাবসূচক; বিশেষ্য অর্থবহ নামবাচক পদ। “এবং”, “কিন্তু”, “যদি” অব্যয়; “বন্ধু”, “বৃষ্টি”, “শান্তি” বিশেষ্য। |
৩. অর্থভিত্তিক বিশেষ্যের প্রকারভেদ
বাংলা ব্যাকরণে অর্থ বা বস্তুর প্রকৃতি অনুসারে বিশেষ্যকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করা হয়। পরীক্ষায় এই অংশটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংজ্ঞা-ভিত্তিক প্রশ্নের পাশাপাশি উদাহরণ থেকে শ্রেণি নির্ধারণও প্রায়ই আসে।
৩.১ সংজ্ঞাবাচক বা ব্যক্তিবাচক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থান, নদী, প্রতিষ্ঠান, গ্রন্থ, দেশ, পর্বত, দিবস, মহাকাশীয় বস্তুর স্বতন্ত্র নাম বোঝায়, তাকে সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্য বলে। ইংরেজিতে এটি Proper Noun-এর নিকটতুল্য।
ব্যক্তি: হাসান, সুমাইয়া, নজরুল, জগদীশচন্দ্র
স্থান: রংপুর, ঢাকা, রাজশাহী, সুন্দরবন, কুয়াকাটা
নদী/পর্বত: পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, হিমালয়
প্রতিষ্ঠান: বাংলাদেশ ব্যাংক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি
গ্রন্থ/পত্রিকা/দিবস: গীতাঞ্জলি, আনন্দমঠ, স্বাধীনতা দিবস
সতর্কতা |
সব বড় হাতের বা বিখ্যাত নামই সংজ্ঞাবাচক - এমন নয়; বাংলা লিপিতে বড় হাতের অক্ষরের প্রশ্ন নেই। বরং “নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র সত্তা” কি না - এটাই মূল বিচার। “নদী” জাতিবাচক, কিন্তু “পদ্মা” সংজ্ঞাবাচক। |
৩.২ জাতিবাচক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য দ্বারা একই জাতি, শ্রেণি বা গোত্রভুক্ত বহু ব্যক্তি, প্রাণী বা বস্তুর সাধারণ নাম বোঝায়, তাকে জাতিবাচক বিশেষ্য বলে। এটি বাংলা ব্যাকরণের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত বিশেষ্যশ্রেণি।
মানুষ, নারী, পুরুষ, শিশু, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক
গরু, ঘোড়া, পাখি, মাছ, বাঘ, হাতি
বই, কলম, চেয়ার, দরজা, টেবিল, মোবাইল
“শিক্ষক” বলতে আমরা একটি নির্দিষ্ট শিক্ষককে নয়, শিক্ষক-জাতিকে বুঝি। “পাখি” বললে একটি নির্দিষ্ট পাখি নয়, সব পাখি-জাতির ধারণা আসে। তাই সংজ্ঞাবাচক ও জাতিবাচকের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো - নির্দিষ্টতা বনাম সাধারণতা।
৩.৩ দ্রব্যবাচক বা বস্তুবাচক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো পদার্থ, উপাদান বা দ্রব্যের নাম বোঝায়, তাকে দ্রব্যবাচক বিশেষ্য বলে। এদের অনেক ক্ষেত্রে গণনা সরাসরি করা যায় না; পরিমাপের মাধ্যমে গণনা করতে হয়।
শব্দ | ধরন | উদাহরণমূলক ব্যবহার |
সোনা | ধাতু/দ্রব্য | সোনা দামি ধাতু। |
পানি | তরল পদার্থ | পানি জীবনের জন্য অপরিহার্য। |
লোহা | ধাতু | লোহার দরজা মজবুত। |
কাঠ | উপাদান | কাঠ দিয়ে আসবাব তৈরি হয়। |
দুধ | খাদ্যদ্রব্য | দুধ পুষ্টিকর খাবার। |
বালি | দানা-পদার্থ | বালি দিয়ে ইটের কাজ হয়। |
পরীক্ষার ফাঁদ |
“চাল”, “গম”, “লবণ”, “কাপড়”, “মাটি”, “রূপা”, “তেল” ইত্যাদি শব্দ অনেক পরীক্ষায় দ্রব্যবাচক হিসেবে আসে। তবে বাক্যগত বিশেষ পরিস্থিতিতে এগুলো পরিমাণ বা পণ্যগত অর্থে ভিন্নভাবে বিবেচিত হতে পারে। |
৩.৪ সমষ্টিবাচক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য দ্বারা একই ধরনের বহু ব্যক্তি বা বস্তুর সমষ্টিকে একক রূপে বোঝায়, তাকে সমষ্টিবাচক বিশেষ্য বলে। এখানে পৃথক সদস্য নয়, পুরো দল বা সমাহার বোঝানো হয়।
দল, সভা, সমিতি, জনতা, মিছিল, শ্রেণি, পরিবার, ঝাঁক, বহর, বাহিনী
পাল, গুচ্ছ, মালা, পুঞ্জ, সমাজ, সম্প্রদায়, কুল, মণ্ডলী
উদাহরণ | বিশ্লেষণ |
“দল মাঠে নেমেছে।” | এখানে বহু খেলোয়াড়ের সমষ্টিকে “দল” শব্দে বোঝানো হয়েছে। |
“জনতা স্লোগান দিচ্ছে।” | জনতা বহু মানুষের সম্মিলিত রূপ। |
“ঝাঁক বেঁধে পাখি উড়ল।” | “ঝাঁক” বহু পাখির সমষ্টিবাচক বিশেষ্য। |
“পরিবারটি সুখে আছে।” | পরিবারে অনেক সদস্য থাকলেও একক সত্তা হিসেবে ব্যবহৃত। |
৩.৫ ভাববাচক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য দ্বারা গুণ, ভাব, অনুভূতি, ধর্ম, অবস্থা, কর্মফল, ধারণা বা বিমূর্ত বিষয় বোঝায়, তাকে ভাববাচক বিশেষ্য বলে। এ ধরনের বিশেষ্য দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না; কিন্তু চিন্তা ও অনুভবে ধরা পড়ে।
শব্দ | কী বোঝায় | বিশেষ মন্তব্য |
সাহস | মনের দৃঢ়তা | দৃশ্যমান নয়, অনুভবযোগ্য |
সৌন্দর্য | সুন্দর হওয়ার গুণ | বিশেষণ “সুন্দর” থেকে ভাব |
মমতা | স্নেহধর্মী অনুভূতি | সম্পর্কের আবেগ |
বীরত্ব | বীর হওয়ার গুণ | বিশেষণ/বিশেষ্যজাত ভাব |
শৈশব | জীবনের একটি অবস্থা/কালধাপ | অবস্থাবাচক ভাব |
স্বাধীনতা | স্বাধীন হওয়ার অবস্থা | রাজনৈতিক/সামাজিক বিমূর্ত ধারণা |
বিদ্বেষ | বিরূপ মনোভাব | মানসিক ভাব |
নীরবতা | নীরব অবস্থার নাম | অবস্থাবাচক ভাববাচক |
ভাববাচক বিশেষ্য গঠনে “-তা”, “-ত্ব”, “-পনা”, “-পন”, “-ই”, “-আন”, “-অন”, “-নো”, “-শীলতা”, “-গিরি” ইত্যাদি প্রত্যয় বা রূপান্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন: সুন্দর→সৌন্দর্য, মধুর→মাধুর্য, বীর→বীরত্ব, দয়ালু→দয়া, চুপ→নীরবতা (রূপগত পরিবর্তনে)।
৩.৬ স্থানবাচক বিশেষ্য
অনেক ব্যাকরণে স্থানবাচককে পৃথক শ্রেণি হিসেবে ধরা হয়, আবার কেউ কেউ সংজ্ঞাবাচক/জাতিবাচকের অন্তর্গত বলে বিবেচনা করেন। পরীক্ষার সুবিধার্থে এটি আলাদা করে জানা ভালো। যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো স্থান, অঞ্চল, দিক বা ভূখণ্ড বোঝায়, তাকে স্থানবাচক বিশেষ্য বলা হয়।
গ্রাম, শহর, নগর, দেশ, মহাদেশ, উত্তর, দক্ষিণ, উপকূল, বাজার, বিদ্যালয়
বাংলাদেশ, রংপুর, বঙ্গোপসাগর, পার্বত্য অঞ্চল, মরুভূমি, বন্দর
৩.৭ কালবাচক বিশেষ্য
সময়ের নামবাচক শব্দগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে কালবাচক বিশেষ্য বলা হয়। যেমন: সকাল, দুপুর, বিকেল, রাত, শীত, বসন্ত, বৈশাখ, রবিবার, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। পরীক্ষায় এগুলো ভাববাচক বা সাধারণ নামবাচক থেকে পৃথক করে জানতে হয়।
৩.৮ সংখ্যাবাচক ও পরিমাণবাচক বিশেষ্যের প্রান্তিক আলোচনা
প্রথাগত ব্যাকরণে সব বই সংখ্যাবাচক বিশেষ্যকে আলাদা শ্রেণি হিসেবে গ্রহণ করে না। তবু “জোড়া”, “ডজন”, “শতক”, “জোড়”, “ত্রয়ী”, “দ্বয়”, “অর্ধেক”, “গুচ্ছ” ইত্যাদি শব্দ বিশেষ পরিমাণ বা সংখ্যা-ধারণার নাম বোঝালে বিশেষ্যসুলভ আচরণ করে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কঠোর শ্রেণিবিভাগের চেয়ে ব্যবহারের রূপ বোঝা বেশি জরুরি।
খুব গুরুত্বপূর্ণ তুলনা |
“বাংলাদেশ” সংজ্ঞাবাচক; “দেশ” জাতিবাচক; “মাটি” দ্রব্যবাচক; “জনতা” সমষ্টিবাচক; “স্বাধীনতা” ভাববাচক; “সকাল” কালবাচক। একই অধ্যায়ে এই ছয়টি জোড়া বারবার রিভিশন করলে প্রকারভেদ দ্রুত আয়ত্তে আসে। |
৪. গঠন বা রূপভিত্তিক বিশেষ্যের প্রকারভেদ
অর্থভিত্তিক প্রকারভেদের পাশাপাশি শব্দগঠন বা রূপগত দিক থেকেও বিশেষ্য শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এই অংশ বাংলা শব্দতত্ত্ব, সমাস, প্রত্যয় ও পদরূপান্তর বোঝার জন্য প্রয়োজনীয়।
৪.১ মৌলিক বিশেষ্য
যে বিশেষ্য মূল রূপে ব্যবহৃত হয় এবং সাধারণভাবে সহজে বিশ্লেষণযোগ্য উপাংশে ভাঙা যায় না, তাকে মৌলিক বিশেষ্য বলে। যেমন: জল, মাটি, ফুল, মন, হাত, দেশ, নদী, পাথর, ছেলে, মেয়ে।
৪.২ সাধিত বিশেষ্য
যে বিশেষ্য অন্য শব্দমূল বা ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয়, উপসর্গ বা রূপান্তরের মাধ্যমে গঠিত হয়, তাকে সাধিত বিশেষ্য বলে। বাংলা ব্যাকরণে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানেই বিশেষণ, ক্রিয়া ও অন্যান্য পদ থেকে বিশেষ্য গঠনের কৌশল শেখা যায়।
মূল শব্দ | গঠিত বিশেষ্য | রূপান্তর |
সুন্দর | সৌন্দর্য | বিশেষণ → ভাববাচক বিশেষ্য |
বীর | বীরত্ব | গুণ/অবস্থা বোঝাতে প্রত্যয়যোগ |
বন্ধু | বন্ধুত্ব | সম্পর্ক/অবস্থা বোঝানো |
গরিব | গরিবি | অবস্থা/পরিস্থিতি |
লজ্জা পাওয়া | লজ্জা | ক্রিয়াসূত্রে ভাবের নাম |
চলা | চলন | ক্রিয়া → ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য |
জানা | জ্ঞান | ধাতুমূলভিত্তিক রূপান্তর |
মধুর | মাধুর্য | গুণের নাম |
৪.৩ সমাসবদ্ধ বিশেষ্য
দুই বা ততোধিক পদ সমাসবদ্ধ হয়ে নতুন বিশেষ্য গঠন করলে তাকে সমাসবদ্ধ বিশেষ্য বলা যায়। যেমন: দেশপ্রেম, রাজপথ, হৃদয়বেদনা, লোকসাহিত্য, বিশ্ববিদ্যালয়, জলবায়ু, রাষ্ট্রভাষা, জন্মদিন। এসব শব্দে একাধিক উপাদান মিলে একটি সংহত নাম তৈরি হয়েছে।
৪.৪ যৌগিক/সমন্বিত বিশেষ্য
অনেক সময় দুটি বিশেষ্য পাশাপাশি যুক্ত হয়ে বা হাইফেন/যোজকবিহীনভাবে একটি যৌগিক নাম গঠন করে। যেমন: মা-বাবা, ছেলেমেয়ে, উঠান-বাড়ি, দিনরাত, সুখদুঃখ, জীবনসংগ্রাম, শিক্ষাজীবন। সব ব্যাকরণে এগুলো একভাবে শ্রেণিবদ্ধ না হলেও পরীক্ষামুখী প্রয়োগে যৌগিক রূপ চিনতে পারা দরকার।
৫. বিশেষ্য গঠনের প্রধান উপায়
বাংলা ভাষায় নতুন বিশেষ্য গঠনের পদ্ধতি বহুবিধ। উপসর্গ, প্রত্যয়, ধাতু, বিশেষণ, সমাস, বিদেশি শব্দগ্রহণ, রূপান্তর ও লোকব্যবহারের মাধ্যমে বিশেষ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে। পরীক্ষায় বিশেষ করে “কোনটি ভাববাচক বিশেষ্য”, “কোনটি প্রত্যয়যোগে গঠিত”, “কোনটি বিশেষণ থেকে উৎপন্ন” ইত্যাদি প্রশ্ন দেখা যায়।
৫.১ বিশেষণ থেকে বিশেষ্য
বিশেষণ | গঠিত বিশেষ্য | অর্থ |
মধুর | মাধুর্য | মিষ্টতা বা মধুর গুণ |
সুন্দর | সৌন্দর্য | সুন্দর হওয়ার গুণ |
উদার | উদারতা | উদার হওয়ার ভাব |
মহান | মহত্ত্ব | মহৎ হওয়ার গুণ |
গুরু | গরিমা/গুরুত্ব | গভীরতা বা গুরুত্ব |
নীরব | নীরবতা | চুপ থাকার অবস্থা |
ভদ্র | ভদ্রতা | সভ্য আচরণের গুণ |
সৎ | সততা | নৈতিকতার গুণ |
৫.২ ক্রিয়া বা ধাতু থেকে বিশেষ্য
ক্রিয়া/ধাতু | বিশেষ্য | বিশেষ মন্তব্য |
চলা | চলন | ক্রিয়ার ভঙ্গি/প্রকৃতি |
হাসা | হাসি | কর্মফল/অবস্থা |
কাঁদা | কান্না | আবেগপ্রসূত ক্রিয়াবাচক বিশেষ্য |
লেখা | লেখা/লিখন | কাজ ও ফল উভয় |
পড়া | পাঠ/পড়া | অধ্যয়ন বা অবস্থা |
গড়া | গঠন | নির্মাণের ফল/প্রকরণ |
বলা | বক্তব্য/বলা | কথার বিষয়বস্তু |
জ্বলা | জ্বালা | পোড়া বা দহনজনিত অনুভূতি |
৫.৩ বিশেষ্য থেকে বিশেষ্য
একটি বিশেষ্যের সঙ্গে আরেকটি বিশেষ্য বা প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন বিশেষ্য গঠিত হয়। যেমন: বন্ধু→বন্ধুত্ব, রাজা→রাজত্ব, শিশু→শৈশব, লোক→লোকায়ত, দেশ→দেশীয়তা, শহর→শহুরে জীবন (বিশেষ্য-উৎপন্ন পদগুচ্ছ), কৃষক→কৃষকত্ব।
৫.৪ বহুল ব্যবহৃত বিশেষ্য-গঠনকারী প্রত্যয়
প্রত্যয় | কাজ | উদাহরণ |
-তা | গুণ/অবস্থা | ভদ্রতা, সততা, পবিত্রতা |
-ত্ব | অবস্থা/ধর্ম/সম্পর্ক | বন্ধুত্ব, মানবত্ব, বীরত্ব |
-পনা/পনা | স্বভাব/আচরণ | ছেলেমি, শিশুসুলভতা, বোকাপনা |
-ই/-ি | অবস্থা/প্রকৃতি | গরিবি, ধনী-গরিবি, চালাকি |
-আন/-অন | ক্রিয়াবাচকতা | উত্থান, পতন, গমন, আগমন |
-ন/-নো | কর্মফল/অবস্থা | লিখন, গঠন, বাঁধন |
-শীলতা | স্বভাবগত গুণ | পরিশ্রমশীলতা, সহনশীলতা |
-গিরি | চর্চা/পেশা/আচরণ | দরবেশগিরি, মাতব্বরগিরি |
এখানে ভুল বেশি হয় |
সব “-তা” বা “-ত্ব”-যুক্ত শব্দই যে সবসময় ভাববাচক বিশেষ্য হবে, তা নয় - তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়। প্রশ্নের উত্তরে শব্দের অর্থ যাচাই করতে হবে। যেমন “মানবতা” ভাববাচক; “সদস্যতা” অবস্থাবাচক ভাব; “রাজত্ব” শাসনব্যবস্থার নামও বোঝাতে পারে। |
৬. বিশেষ্য, বচন ও সংখ্যা
বিশেষ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাকরণিক ধর্ম হলো বচন। এক ব্যক্তি/বস্তু বোঝালে একবচন, একাধিক বোঝালে বহুবচন। বাংলা ভাষায় বহুবচন গঠনে নানা প্রকার প্রত্যয় বা চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। সব বিশেষ্যের বহুবচন একইভাবে হয় না।
৬.১ একবচন ও বহুবচন
একবচন | বহুবচন | মন্তব্য |
ছাত্র | ছাত্ররা | প্রাণীবাচক/মানুষবাচকে “-রা” স্বাভাবিক |
বই | বইগুলো | জড়বস্তুতে “-গুলো/গুলি” বেশি ব্যবহৃত |
শিশু | শিশুরা | মানবগোষ্ঠী |
গাছ | গাছগুলো | জড়/উদ্ভিদবাচক |
লোক | লোকজন/লোকেরা | অপ্রমিত-প্রমিত ভিন্নতা থাকতে পারে |
পাখি | পাখিরা/পাখিগুলো | ব্যবহারের ভেদে উভয়ই সম্ভব |
৬.২ বহুবচনসূচক রূপসমূহ
রা: মানুষ, ছেলে, মেয়ে, শিক্ষক, পাখি ইত্যাদির সঙ্গে ব্যবহৃত হয়।
গুলি/গুলো: জড়বস্তু, প্রাণী, এমনকি মানুষবাচকেও কথ্য ভঙ্গিতে ব্যবহৃত হতে পারে - যেমন, “বাচ্চাগুলো”।
গণ: সম্মানসূচক/সাহিত্যিক/প্রাতিষ্ঠানিক - যেমন, ভদ্রলোকগণ, পাঠকগণ।
বৃন্দ: সম্মানসূচক/সমষ্টিগত - যেমন, শিক্ষকবৃন্দ, শিল্পীবৃন্দ।
দল/সমূহ/মালা/ঝাঁক প্রভৃতি শব্দ যোগেও সমষ্টিগত বহুবচন প্রকাশ পায়।
৬.৩ অগণনীয় বিশেষ্য
দুধ, পানি, বালি, সোনা, ধৈর্য, জ্ঞান, ভালোবাসা ইত্যাদি শব্দকে সরাসরি একটি/দুটি/তিনটি বলা সবসময় স্বাভাবিক নয়। এগুলো গণনা করতে একক দরকার হয়: এক গ্লাস পানি, দুই কেজি চাল, অনেক জ্ঞান, একটু ধৈর্য। এই দিকটি পরীক্ষায় “দ্রব্যবাচক” বা “ভাববাচক” বিশেষ্য চেনার ক্ষেত্রে সহায়ক।
৭. বিশেষ্য, লিঙ্গ ও প্রাকৃতিক/ব্যাকরণিক পার্থক্য
বাংলা ভাষায় সংস্কৃতের মতো শক্ত ব্যাকরণিক লিঙ্গব্যবস্থা নেই; তবে শব্দার্থগতভাবে পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ, ক্লীবলিঙ্গ বা উভয়লিঙ্গধর্মী ব্যবহার আলোচিত হয়। বিশেষ্যচর্চায় এটি সহায়ক কারণ অনেক শব্দের লিঙ্গ-রূপ পরীক্ষায় জিজ্ঞেস করা হয়।
প্রকার | উদাহরণ |
পুংলিঙ্গবাচক | পিতা, রাজা, ভাই, বর, পুত্র, কবি (প্রসঙ্গভেদে) |
স্ত্রীলিঙ্গবাচক | মাতা, রানী, বোন, কন্যা, বধূ, কবি/কবিয়ত্রী (প্রচলনভেদে) |
উভয়লিঙ্গ/সাধারণ ব্যবহার | শিক্ষক, বন্ধু, শিল্পী, ডাক্তার, নেতা - প্রসঙ্গভেদে উভয় লিঙ্গে ব্যবহৃত হতে পারে |
জড়/ক্লীব ভাব | টেবিল, আকাশ, নদী, বই, দুধ |
পরীক্ষামুখী দৃষ্টিভঙ্গি |
বাংলা আধুনিক ব্যবহার লিঙ্গনিরপেক্ষতার দিকে এগিয়েছে। তাই লিঙ্গ নির্ধারণের প্রশ্নে শাস্ত্রীয় রূপ, প্রচলিত রূপ ও আধুনিক রীতির পার্থক্য মাথায় রাখতে হবে। |
৮. বিশেষ্য, কারক ও বিভক্তি
কারক হলো বাক্যে বিশেষ্য বা সর্বনামের সঙ্গে ক্রিয়ার সম্পর্ক। বিশেষ্য অধ্যায়ে কারক জানা জরুরি, কারণ বিশেষ্য শব্দই প্রধানত কারকবাচক রূপ ধারণ করে। বিভক্তি সেই সম্পর্ককে শব্দরূপে প্রকাশ করে।
৮.১ প্রধান কারকসমূহ
কারক | চিহ্ন/ধারণা | উদাহরণ |
কর্তা | যে কাজ করে | রিমা বই পড়ে। |
কর্ম | যার উপর কাজ পড়ে | রিমা বই পড়ে। |
করণ | যার দ্বারা কাজ সম্পন্ন | সে কলম দিয়ে লিখে। |
সম্প্রদান | যার জন্য/যাকে দেওয়া হয় | আমি তাকে বই দিলাম। |
অপাদান | যেখান থেকে পৃথক | গাছ থেকে ফল পড়ল। |
অধিকরণ | যেখানে/যাতে কাজ ঘটে | ঘরে আলো জ্বলছে। |
সম্বন্ধ | অধিকার/সম্পর্ক | রহিমের বই। |
সম্বোধন | ডাকা/আহ্বান | হে বন্ধু, শুনো। |
৮.২ বিভক্তির ব্যবহার
কে: কর্ম, সম্প্রদান বা সম্বোধনে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন: শিশুকে ডাকো।
এর/র: সম্বন্ধবাচক। যেমন: দেশের মানুষ, মায়ের স্নেহ।
এ/তে: অধিকরণ। যেমন: ঘরে, মাঠে, নদীতে।
থেকে: অপাদান। যেমন: বাড়ি থেকে, শৈশব থেকে।
দিয়ে: করণ। যেমন: হাত দিয়ে, কলম দিয়ে।
শূন্য বিভক্তিও অনেক ক্ষেত্রে থাকে। যেমন: “পাখি উড়ে”, “ছেলে হাসে”।
একই বিভক্তি একাধিক কারক বোঝাতে পারে; তাই শুধু চিহ্ন নয়, বাক্যের অর্থও বিবেচনা করতে হবে। যেমন “তাকে ডাকো” কর্ম, কিন্তু “তাকে বই দাও” সম্প্রদান অর্থও বহন করতে পারে।
৯. বাক্যে বিশেষ্যের ভূমিকা
একটি বিশেষ্য শুধু নাম নয়; বাক্যের নানা স্থানে তা ভিন্ন ভিন্ন কাজ করে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় পদ-চিহ্নিতকরণ বা পদপরিচয়ে এ অংশটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
বাক্যাংশে ভূমিকা | উদাহরণ | বিশ্লেষণ |
কর্তা | শিশুটি হাসছে। | “শিশুটি” কাজের কর্তা। |
কর্ম | আমি কবিতাটি পড়লাম। | “কবিতাটি” ক্রিয়ার কর্ম। |
অধিকার/সম্বন্ধ | মায়ের কথা মনে পড়ে। | “মায়ের” সম্বন্ধবাচক বিশেষ্য। |
অধিকরণ | বইটি টেবিলে আছে। | “টেবিলে” অধিকরণ। |
সম্বোধন | বন্ধুরা, মন দাও। | “বন্ধুরা” সম্বোধন। |
বর্ণনামূলক বিশেষ্য | সে আমাদের দলের নেতা। | “নেতা” পরিচয়সূচক বিশেষ্য। |
১০. বিশেষ্য চিহ্নিতকরণে বিভ্রান্তিকর দিক
শুধু সংজ্ঞা মুখস্থ থাকলে এখানে ভুল হয়। নিচের বিষয়গুলো আলাদা করে লক্ষ্য করলে পরীক্ষার ফাঁদ এড়ানো যায়।
একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ হতে পারে। “ভালো” বিশেষণ; কিন্তু “ভালোই হয়েছে” বাক্যে ভাবসূচক রূপে ব্যবহৃত।
ক্রিয়াবাচক রূপ ও বিশেষ্যরূপ আলাদা করতে প্রসঙ্গ দেখতে হবে। “পড়া আমার নেশা” - এখানে “পড়া” নামধর্মী; “আমি পড়ি” - এখানে ক্রিয়া।
কিছু সমষ্টিবাচক শব্দ বাইরে থেকে একবচন মনে হলেও অর্থে বহুসত্তা বহন করে। যেমন: জনতা, পরিবার, বাহিনী।
কিছু ভাববাচক বিশেষ্য গুণ-ধর্ম বোঝায়, আবার কিছু অবস্থা বা কালধাপ বোঝায়। যেমন: সততা, শৈশব, নীরবতা, অন্ধকার।
দ্রব্যবাচক বিশেষ্যকে সবসময় গণনীয় ভাবলে ভুল হবে। “একটি পানি” নয়, “এক গ্লাস পানি”।
সংজ্ঞাবাচক ও জাতিবাচকের পার্থক্যে নির্দিষ্টতা যাচাই জরুরি। “বিশ্ববিদ্যালয়” জাতিবাচক; “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” সংজ্ঞাবাচক।
খুব গুরুত্বপূর্ণ কৌশল |
প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন - শব্দটি কি “নাম” বোঝাচ্ছে? যদি হ্যাঁ, তবে পরের প্রশ্ন: এটি কি নির্দিষ্ট, সাধারণ, পদার্থ, সমষ্টি, ভাব, স্থান, না সময়? এই দুই ধাপের চিন্তা করলে অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তর বের হয়ে আসে। |
১১. সাহিত্যিক ও প্রমিত ব্যবহারে বিশেষ্য
বাংলা সাহিত্যে বিশেষ্যের ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা যায়। কবিতায় প্রকৃতিবাচক বিশেষ্য, উপন্যাসে চরিত্র ও স্থানবাচক বিশেষ্য, প্রবন্ধে ভাববাচক বিশেষ্য, নাটকে সম্বোধনমূলক বিশেষ্য - সবই গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্যে বিশেষ্য কেবল তথ্য নয়; পরিবেশ, মেজাজ, রূপক ও ভাবের বাহক।
প্রকৃতিবাচক: আকাশ, মেঘ, নদী, বন, কুয়াশা, ভোর, সন্ধ্যা
দেশপ্রেমমূলক: মাতৃভূমি, স্বাধীনতা, সংগ্রাম, বিজয়, শহীদ, ভাষা
মানসিক ভাব: প্রেম, বিরহ, আনন্দ, বেদনা, সংশয়, আশা, হতাশা
সমাজ-রাজনীতি: রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, অধিকার, বৈষম্য, প্রতিবাদ, জনতা
লোকজ: পাড়া, উঠান, খেজুরগাছ, নকশিকাঁথা, হাট, পালাগান
সাহিত্যিক রচনায় একই বিশেষ্য অনেক সময় প্রতীকী অর্থ ধারণ করে। “মাটি” শুধু পদার্থ নয় - দেশ, শিকড়, জন্মভূমি বা কৃষিজীবনের প্রতীক হতে পারে; “আলো” কেবল পদার্থগত আলো নয় - জ্ঞান, আশা বা মুক্তির প্রতীকও হতে পারে। তবে ব্যাকরণিক শ্রেণি নির্ধারণে শব্দের মূল নামগত প্রকৃতি বিবেচ্য।
১২. প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিশেষ্য অধ্যায়ের বিশেষ প্রস্তুতি
এমসিকিউ পরীক্ষায় সাধারণত তিন ধরনের প্রশ্ন বেশি দেখা যায় - (ক) সংজ্ঞা/শ্রেণি, (খ) উদাহরণ চিহ্নিতকরণ, (গ) রূপান্তর বা প্রত্যয়-ভিত্তিক প্রশ্ন। তাই প্রস্তুতিও তিন স্তরে হওয়া উচিত।
প্রশ্নের ধরন | কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন |
সংজ্ঞাভিত্তিক প্রশ্ন | প্রতিটি শ্রেণির সংজ্ঞা ১-২ লাইনে পরিষ্কারভাবে মুখস্থ করুন এবং সঙ্গে অন্তত ৫টি নিজস্ব উদাহরণ রাখুন। |
উদাহরণ থেকে শ্রেণি নির্ধারণ | একটি শব্দ দেখে তা ব্যক্তি/জাতি/পদার্থ/সমষ্টি/ভাব/স্থান/কাল - কোনটি বোঝাচ্ছে তা তাৎক্ষণিক চিনতে অভ্যাস করুন। |
প্রত্যয় বা রূপান্তরভিত্তিক | বিশেষণ থেকে বিশেষ্য ও ক্রিয়া থেকে বিশেষ্য গঠনের বহুল ব্যবহৃত রূপগুলো আলাদা তালিকায় পড়ুন। |
পদপরিচয়ভিত্তিক প্রশ্ন | বাক্যের ভেতর শব্দের ভূমিকা বুঝুন - একই শব্দ বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ভিন্ন পদ হতে পারে। |
১২.১ বহুল জিজ্ঞাসিত জোড়া
শব্দ | শ্রেণি | যে কারণে মনে রাখবেন |
পদ্মা | সংজ্ঞাবাচক | নির্দিষ্ট নদীর নাম |
নদী | জাতিবাচক | সমস্ত নদীশ্রেণির নাম |
সোনা | দ্রব্যবাচক | পদার্থের নাম |
জনতা | সমষ্টিবাচক | বহু মানুষের সমষ্টি |
সততা | ভাববাচক | নৈতিক গুণের নাম |
বিকেল | কালবাচক | সময়ের নাম |
গ্রাম | স্থানবাচক/জাতিবাচক ব্যবহারে | সাধারণ স্থানধারণা |
বাংলাদেশ | সংজ্ঞাবাচক/স্থানবাচক | নির্দিষ্ট দেশের নাম |
১২.২ ভুলের তালিকা
“বিদ্যালয়” জাতিবাচক; “জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়” সংজ্ঞাবাচক।
“পরিবার” সমষ্টিবাচক; “আত্মীয়তা” ভাববাচক।
“দুধ” দ্রব্যবাচক; “পুষ্টি” ভাববাচক।
“শিশু” জাতিবাচক; “শৈশব” ভাববাচক।
“দেশ” জাতিবাচক; “বাংলাদেশ” সংজ্ঞাবাচক।
“সাহস” ভাববাচক; “সাহসী” বিশেষণ।
১২.৩ বিশ্লেষণী উদাহরণ: বাক্য থেকে বিশেষ্য শনাক্তকরণ
এ অংশে অনুশীলনী নয়; বরং বিশ্লেষণসহ উদাহরণ দেওয়া হলো। এতে বোঝা যাবে কীভাবে একটি শব্দ শুধু নাম বলেই নয়, বাক্যে তার কাজ ও শ্রেণি অনুসারেও বিশেষ্য হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বাক্য | বিশেষ্য | বিশ্লেষণ |
বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। | বাংলাদেশ, দেশ | “বাংলাদেশ” সংজ্ঞাবাচক; “দেশ” জাতিবাচক। |
জনতা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করল। | জনতা, রাস্তায়, প্রতিবাদ | “জনতা” সমষ্টিবাচক; “রাস্তা” স্থানবাচক; “প্রতিবাদ” ভাব/কর্মবাচক বিশেষ্য। |
শৈশব মানুষের জীবনের মধুর সময়। | শৈশব, মানুষ, জীবন, সময় | “শৈশব” ভাববাচক; “মানুষ” জাতিবাচক; “সময়” কালবাচক। |
লোহা দিয়ে মজবুত সেতু বানানো হয়। | লোহা, সেতু | “লোহা” দ্রব্যবাচক; “সেতু” জাতিবাচক বস্তুবাচক। |
রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র। | রবীন্দ্রনাথ, সাহিত্য, নক্ষত্র | “রবীন্দ্রনাথ” সংজ্ঞাবাচক; “সাহিত্য” ভাব/বিষয়ধর্মী বিশেষ্য। |
মায়ের মমতা সন্তানের শক্তি। | মায়ের, মমতা, সন্তানের, শক্তি | “মমতা” ও “শক্তি” ভাববাচক; সম্পর্কবাচক রূপও আছে। |
বাহিনী সীমান্তে অবস্থান নিয়েছে। | বাহিনী, সীমান্ত, অবস্থান | “বাহিনী” সমষ্টিবাচক; “সীমান্ত” স্থানবাচক। |
বিকেলে মাঠে শিশুদের হাসি শোনা গেল। | বিকেল, মাঠ, শিশুদের, হাসি | “বিকেল” কালবাচক; “মাঠ” স্থানবাচক; “হাসি” ক্রিয়াজাত বিশেষ্য। |
সততা মানুষকে সম্মান এনে দেয়। | সততা, মানুষ, সম্মান | “সততা” ভাববাচক; “সম্মান” ভাববাচক ফলার্থক নাম। |
পদ্মার পানি বর্ষায় বৃদ্ধি পায়। | পদ্মা, পানি, বর্ষা | “পদ্মা” সংজ্ঞাবাচক; “পানি” দ্রব্যবাচক; “বর্ষা” কালবাচক। |
১২.৪ বহুল ব্যবহৃত রূপান্তর: দ্রুত মুখস্থের তালিকা
মূল শব্দ | গঠিত বিশেষ্য | ধরন |
মানব | মানবতা | ভাববাচক |
বন্ধু | বন্ধুত্ব | সম্পর্ক/অবস্থা |
মূর্খ | মূর্খতা | স্বভাব/গুণ |
শিশু | শৈশব | অবস্থাবাচক ভাব |
যুবা | যৌবন | জীবনের পর্যায় |
বৃদ্ধ | বার্ধক্য | অবস্থাবাচক ভাব |
নিষ্ঠ | নিষ্ঠা | গুণ/ধর্ম |
সৎ | সততা | নৈতিক ভাব |
ভদ্র | ভদ্রতা | আচরণগত গুণ |
মধুর | মাধুর্য | গুণ |
বীর | বীরত্ব | গুণ/অবস্থা |
চালাক | চালাকি | স্বভাব বা আচরণ |
উঠা | উত্থান | ক্রিয়াজাত বিশেষ্য |
পড়া | পতন/পড়া | প্রসঙ্গভেদে ক্রিয়াজাত বিশেষ্য |
গড়া | গঠন | কর্মফল/প্রক্রিয়া |
লিখা | লিখন | ক্রিয়া → বিশেষ্য |
এই তালিকার উদ্দেশ্য অনুশীলনী দেওয়া নয়; বরং বারবার দেখা যায় এমন রূপান্তরগুলো এক জায়গায় রাখা। পরীক্ষার আগের রাতে শুধু এই অংশটিও দ্রুত পড়ে নিলে বিশেষ্য-গঠনের বড় অংশ ঝালাই হয়ে যায়।
১২.৫ শেষ মুহূর্তের সতর্কতা
শব্দটি “নাম” হলেও সেটি কোন ধরনের নাম - এই দ্বিতীয় ধাপটি ভুলবেন না।
একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তি/দেশ/নদীর নাম দেখলেই সংজ্ঞাবাচক ভাবুন।
দল, বাহিনী, পরিবার, জনতা, সম্প্রদায় - এসব প্রায়ই সমষ্টিবাচক।
দুধ, পানি, তেল, সোনা, লোহা, মাটি - এসব সাধারণত দ্রব্যবাচক।
দয়া, মায়া, জ্ঞান, প্রেম, সাহস, মানবতা, স্বাধীনতা - এসব ভাববাচক।
সকাল, সন্ধ্যা, শীত, বর্ষা, অতীত, বর্তমান - এসব কালবাচক।
দেশ, শহর, গ্রাম, বন, বিদ্যালয়, উপকূল - এসব স্থানবাচক বা সাধারণ নামবাচক ব্যবহার পেতে পারে।
একই শব্দ ভিন্ন বাক্যে ভিন্ন পদ হতে পারে - সবসময় বাক্য দেখে সিদ্ধান্ত নিন।
প্রত্যয়-চেনা দক্ষতা বাড়ালে ভাববাচক বিশেষ্য সহজ হয়।
বিশেষণ থেকে বিশেষ্য রূপান্তরে ধ্বনিগত পরিবর্তন হতে পারে: সুন্দর→সৌন্দর্য, মধুর→মাধুর্য।
ক্রিয়াজাত বিশেষ্য শনাক্তে কাজের নাম, ফল বা অবস্থা আছে কি না দেখুন।
কারক-বিভক্তি বিশেষ্য চিহ্নিত করতে সাহায্য করে, কিন্তু একা যথেষ্ট নয়।
সম্বোধনেও বিশেষ্য ব্যবহৃত হয়: “হে বন্ধু”, “ওগো মা”, “শিক্ষার্থীবৃন্দ”।
জাতিবাচক ও সংজ্ঞাবাচকের পার্থক্য পরীক্ষার সবচেয়ে প্রিয় ক্ষেত্রগুলোর একটি।
কমন উদাহরণ জোড়া করে পড়ুন: পদ্মা/নদী, বাংলাদেশ/দেশ, সোনা/গয়না, জনতা/মানুষ, শৈশব/শিশু।
১৩. দ্রুত পুনরাবৃত্তির সারণি
শ্রেণি | মূল সূত্র | দ্রুত উদাহরণ |
সংজ্ঞাবাচক | নির্দিষ্ট ও স্বতন্ত্র নাম | ঢাকা, পদ্মা, রবীন্দ্রনাথ |
জাতিবাচক | সাধারণ জাতি/শ্রেণির নাম | মানুষ, শহর, পাখি |
দ্রব্যবাচক | পদার্থ/উপাদানের নাম | পানি, লোহা, চাল |
সমষ্টিবাচক | বহু সত্তার সমষ্টি | দল, বাহিনী, জনতা |
ভাববাচক | গুণ/ভাব/অবস্থা/ধারণা | সৌন্দর্য, দয়া, স্বাধীনতা |
স্থানবাচক | স্থানের নাম | গ্রাম, দেশ, উপকূল |
কালবাচক | সময়ের নাম | ভোর, শীত, অতীত |
৩০ সেকেন্ডে রিভিশন |
বিশেষ্য = নাম। নির্দিষ্ট নাম = সংজ্ঞাবাচক; সাধারণ নাম = জাতিবাচক; পদার্থ = দ্রব্যবাচক; দল/সমষ্টি = সমষ্টিবাচক; গুণ/ভাব/অবস্থা = ভাববাচক; স্থান = স্থানবাচক; সময় = কালবাচক। |
১৪. বিস্তৃত উদাহরণভাণ্ডার
১৪.১ সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্যের উদাহরণ
বাংলাদেশ, ভারত, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর, তিস্তা, পদ্মা, যমুনা, বঙ্গবন্ধু, নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সুফিয়া কামাল, বাংলা একাডেমি, জাতিসংঘ, স্বাধীনতা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি, সুন্দরবন, কক্সবাজার, হিমালয়, বঙ্গোপসাগর।
১৪.২ জাতিবাচক বিশেষ্যের উদাহরণ
মানুষ, নাগরিক, শ্রমিক, কৃষক, চিকিৎসক, বিচারক, শিশু, নারী, পুরুষ, কবি, লেখক, পাখি, মাছ, বাঘ, গাছ, ফুল, ফল, শহর, গ্রাম, বিদ্যালয়, নদী, দেশ, বই, বাড়ি, যানবাহন।
১৪.৩ দ্রব্যবাচক বিশেষ্যের উদাহরণ
পানি, দুধ, তেল, ঘি, লবণ, চিনি, মাটি, বালি, লোহা, তামা, রূপা, সোনা, কাঠ, কাগজ, কাপড়, রক্ত, ধান, চাল, গম, ময়দা, কাঁচ, প্লাস্টিক।
১৪.৪ সমষ্টিবাচক বিশেষ্যের উদাহরণ
দল, সভা, সমাবেশ, মিছিল, জনতা, জনগণ, সেনাবাহিনী, পরিবার, শ্রেণি, ঝাঁক, পাল, বহর, মণ্ডলী, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়, পরিষদ, সংসদ, বোর্ড, কমিটি, জুরি।
১৪.৫ ভাববাচক বিশেষ্যের উদাহরণ
সাহস, দয়া, করুণা, সততা, মানবতা, নিষ্ঠা, বিশ্বাস, প্রেম, বিদ্বেষ, আনন্দ, বেদনা, সৌন্দর্য, মাধুর্য, স্বাধীনতা, শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য, নীরবতা, অন্ধকার, আলো (ভাবগত), জ্ঞান, অভিমান, হতাশা, আশা।
১৪.৬ স্থান ও কালবাচক উদাহরণ
স্থান: আঙিনা, বিদ্যালয়, নগর, উপত্যকা, বন, পাহাড়, বাজার, আদালত, কারাগার, উপকূল। কাল: সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাত্রি, শীত, বর্ষা, বৈশাখ, ফাল্গুন, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, মুহূর্ত, যুগ।
১৫. উপসংহার
বিশেষ্য বাংলা ব্যাকরণের কেন্দ্রীয় পদ। এটি শুধু “কিছুর নাম” নয়; ভাষার জগতে সত্তা, ধারণা, অনুভূতি, স্থান, সময়, সমাজ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নামরূপী ভান্ডার। বিশেষ্য ভালোভাবে আয়ত্ত করলে বিশেষণ, সর্বনাম, কারক-বিভক্তি, বচন, লিঙ্গ, সমাস, শব্দগঠন - সব অধ্যায়ই সহজ হয়ে যায়। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য তাই বিশেষ্যের সংজ্ঞা মুখস্থ করার পাশাপাশি তার প্রকারভেদ, উদাহরণ, রূপান্তর ও ব্যবহার বারবার অনুশীলন করা দরকার।
এই অধ্যায়টি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে আপনি তথ্যভিত্তিকভাবে দ্রুত রিভিশন করতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে গভীর ব্যাখ্যাসহ ধারণাও পরিষ্কার করতে পারেন। অনুশীলনী অংশ আলাদা সংযোজনযোগ্য রাখায় এটি বইয়ের মূল অধ্যায় হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য।
শেষ কথা |
বিশেষ্য শেখার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো চারটি প্রশ্ন করা: (১) এটি কি নাম? (২) নামটি কি নির্দিষ্ট? (৩) এটি কি পদার্থ/সমষ্টি/ভাব/স্থান/সময়? (৪) বাক্যে এর ভূমিকা কী? - এই চার ধাপ আপনাকে অধিকাংশ প্রশ্নে সঠিক উত্তর দেবে। |