মৌলিক শব্দ ও সাধিত শব্দ Primitive Words & Derived Words |
মৌলিক শব্দ ও সাধিত শব্দ
অধ্যায় পরিচিতি ও গুরুত্ব |
বাংলা ব্যাকরণের শব্দতত্ত্ব (Morphology) বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হলো শব্দের গঠন ও উৎস। ব্যাকরণবিদগণ শব্দকে গঠনের দিক থেকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করেন - মৌলিক শব্দ ও সাধিত শব্দ। এই বিভাজনটি বুঝতে পারলে শব্দের ব্যুৎপত্তি, প্রকৃতি-প্রত্যয়, সন্ধি, সমাস ইত্যাদি বিষয়গুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। BCS পরীক্ষার বিগত আসরে এই বিষয় থেকে গড়ে ৪-৬টি প্রশ্ন আসে। ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষায় (BB, সোনালী, জনতা, অগ্রণী) প্রতিটিতে ৩-৫টি প্রশ্ন সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর এই বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। |
১. শব্দের গঠন-ভিত্তিক শ্রেণিবিভাগ
গঠন বা উৎপত্তির দিক থেকে বাংলা শব্দকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
মৌলিক শব্দ (Primitive / Root Word) | সাধিত শব্দ (Derived / Secondary Word) |
যে শব্দকে আর ভাঙা যায় না, বিশ্লেষণ করা যায় না, অর্থ ও রূপ উভয়ই অপরিবর্তিত থাকে। উদাহরণ: গরু, মাঠ, পাখি, হাত, রাত, চাঁদ, নদী, বন | যে শব্দকে বিশ্লেষণ করলে প্রকৃতি ও প্রত্যয়ে আলাদা করা যায়; অর্থাৎ মূল শব্দের সাথে উপসর্গ/প্রত্যয়/অন্য শব্দ যোগ হয়ে তৈরি। উদাহরণ: গৌরব, মাঠিয়া, পাখিত্ব, হাতল, রাতুল |
২. মৌলিক শব্দ (Primitive Word / মূল শব্দ)
২.১ সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য
মৌলিক শব্দ হলো সেই শব্দ যা কোনো প্রকৃতি ও প্রত্যয়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়। এগুলো স্বয়ংসম্পূর্ণ শব্দ এবং ভাষার মূল উপাদান। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-র মতে, মৌলিক শব্দ হলো সেই শব্দ 'যাহার পদ-বিশ্লেষণ হয় না'।
মৌলিক শব্দের বৈশিষ্ট্যসমূহ |
এগুলো অবিভাজ্য - আর ভাঙা যায় না প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের দ্বারা নির্মিত নয় ভাষার আদিম ও স্বাভাবিক শব্দ শব্দের ভান্ডারে এগুলো 'মূল' হিসেবে কাজ করে সাধারণত দ্রাবিড়, মুন্ডা বা আর্য মূল থেকে আগত তৎসম/তদ্ভব/দেশি শব্দ এদের সাথে প্রত্যয় যোগ করে সাধিত শব্দ তৈরি হয় |
২.২ মৌলিক শব্দের বিশদ উদাহরণ
শ্রেণি | মৌলিক শব্দ | বাক্যে প্রয়োগ |
প্রাণীবাচক | গরু, ঘোড়া, পাখি, মাছ, বাঘ, হাতি, সিংহ, হরিণ, কাক, ময়ূর | মাঠে গরু চরছে। |
স্থানবাচক | নদী, মাঠ, পাহাড়, বন, গ্রাম, শহর, পথ, ঘর, দেশ | নদীর পাড়ে বসে আছি। |
ক্রিয়ামূল | যা, খা, দে, নে, পড়, লেখ, ধর, মার, বল, শোন | বইটি পড়। |
প্রকৃতিবাচক | আলো, জল, বায়ু, আগুন, মেঘ, বৃষ্টি, রোদ, ঝড়, তুষার | আকাশে মেঘ জমেছে। |
দেহাঙ্গবাচক | হাত, পা, মাথা, চোখ, কান, নাক, মুখ, বুক, পেট | হাত ধুয়ে খাও। |
সম্পর্কবাচক | মা, বাবা, ভাই, বোন, পুত্র, কন্যা, বন্ধু, শত্রু | মা ডাকছেন। |
গুণবাচক | ভালো, মন্দ, সুন্দর, কুৎসিত, বড়, ছোট, নতুন, পুরোনো | ফুলটি সুন্দর। |
সংখ্যাবাচক | এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ, দশ, শত, হাজার | পাঁচটি আম দাও। |
কালবাচক | রাত, দিন, কাল, আজ, সন্ধ্যা, সকাল, দুপুর, বিকেল | আজ ছুটি। |
ক্রিয়াবিশেষণ | আবার, তবু, কিন্তু, এখন, তখন, এখানে, সেখানে | এখন বৃষ্টি হচ্ছে। |
২.৩ সংস্কৃত ব্যাকরণে মৌলিক শব্দ - ধাতু ও প্রাতিপদিক
সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী মৌলিক শব্দের মূল হলো ধাতু (root verb) এবং প্রাতিপদিক (nominal base)। বাংলা ব্যাকরণও এই ধারণাকে গ্রহণ করেছে।
ধাতু (Verbal Root) | উৎপন্ন মৌলিক রূপ |
√গম্ (যাওয়া) | গমন (তৎসম), যাওয়া (বাংলা) |
√পঠ্ (পড়া) | পাঠ, পঠন |
√লিখ্ (লেখা) | লেখা, লিখন |
√কৃ (করা) | কার্য, করণ, কর্ম |
√ভূ (হওয়া) | ভব, ভাব, ভবন |
√দৃশ্ (দেখা) | দর্শন, দৃষ্টি |
√শ্রু (শোনা) | শ্রবণ, শ্রুতি |
√জ্ঞা (জানা) | জ্ঞান, জানা |
৩. সাধিত শব্দ (Derived / Secondary Word)
৩.১ সংজ্ঞা ও প্রকৃতি
যে শব্দকে বিশ্লেষণ করলে মূল শব্দ (প্রকৃতি) এবং তার সাথে যুক্ত প্রত্যয়, উপসর্গ বা অন্য শব্দ পাওয়া যায়, তাকে সাধিত শব্দ বলে। অর্থাৎ এক বা একাধিক মৌলিক উপাদান মিলে যে নতুন শব্দ তৈরি হয়, তাই সাধিত শব্দ।
সূত্র: সাধিত শব্দ = প্রকৃতি (মূল শব্দ / ধাতু) + প্রত্যয় / উপসর্গ / অন্য শব্দ |
উদাহরণ বিশ্লেষণ:
সাধিত শব্দ | বিশ্লেষণ | গঠনপ্রক্রিয়া |
গৌরব | গুরু + অ (অ-প্রত্যয়) | তৎসম কৃৎ প্রত্যয় |
মধুর | মধু + র (র-প্রত্যয়) | বিশেষণ গঠন |
মানবিক | মানব + ইক (ইক-প্রত্যয়) | তদ্ধিত প্রত্যয় |
অজানা | অ + জানা (উপসর্গ) | বাংলা উপসর্গ যোগ |
প্রতিদিন | প্রতি + দিন | সংস্কৃত উপসর্গ |
চালকল | চাল + কল | সমাস (দ্বন্দ্ব) |
ঘরবাড়ি | ঘর + বাড়ি | দ্বন্দ্ব সমাস |
রাজপুত্র | রাজার + পুত্র | ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস |
বনফুল | বনে + ফোটা ফুল | সপ্তমী তৎপুরুষ |
মহাকাশ | মহান + আকাশ | কর্মধারয় সমাস |
৩.২ সাধিত শব্দের প্রকারভেদ
সাধিত শব্দকে গঠনপ্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:
৩.২.১ প্রত্যয়-সাধিত শব্দ
মূল শব্দ বা ধাতুর সাথে প্রত্যয় যোগ করে যে সাধিত শব্দ তৈরি হয় তাকে প্রত্যয়-সাধিত শব্দ বলে। প্রত্যয় দুই প্রকার: কৃৎ প্রত্যয় ও তদ্ধিত প্রত্যয়।
ক) কৃৎ প্রত্যয় (Verbal suffix) - ক্রিয়া-মূল + কৃৎ প্রত্যয়
প্রত্যয় | উদাহরণ | অর্থ/ব্যবহার |
অনট্ (অন) | পঠ্+অন = পঠন, কৃ+অন = করণ, গম্+অন = গমন | ক্রিয়ার ভাব প্রকাশ |
অনীয় | পঠ্+অনীয় = পঠনীয়, দৃশ্+অনীয় = দর্শনীয় | যোগ্য/কর্তব্য অর্থে |
ক্ত (ত) | পঠ্+ত = পঠিত, লিখ্+ত = লিখিত, কৃ+ত = কৃত | কর্মবাচ্য ভূতকালীন |
তব্য | পঠ্+তব্য = পঠিতব্য, কৃ+তব্য = কর্তব্য | করণীয় অর্থে |
তৃচ্ (তা) | পঠ্+তা = পাঠক, দা+তা = দাতা, নে+তা = নেতা | কর্তৃবাচ্য |
ঘঞ্ (অ) | পচ্+অ = পাক, ভজ্+অ = ভাজ, শুচ্+অ = শোক | ভাব ও কর্মবাচক |
ল্যুট (অন) | দৃশ্+অন = দর্শন, শ্রু+অন = শ্রবণ | ভাববাচক |
আ (বাংলা) | কাঁদ্+আ = কাঁদা, ধর্+আ = ধরা, বল্+আ = বলা | ক্রিয়ার নাম |
খ) তদ্ধিত প্রত্যয় (Nominal suffix) - বিশেষ্য/বিশেষণ + তদ্ধিত প্রত্যয়
প্রত্যয় | উদাহরণ | অর্থ |
ইক (ঈয়) | মানব+ইক = মানবিক, সমাজ+ইক = সামাজিক, নীতি+ইক = নৈতিক | সম্পর্কিত |
তা (ত্ব) | মহৎ+তা = মহত্তা, গুরু+ত্ব = গুরুত্ব, মানব+তা = মানবতা | গুণ প্রকাশ |
ইয়া (বাংলা) | ধান+ইয়া = ধানিয়া, বাঘ+ইয়া = বাঘিয়া, ঢাকা+ইয়া = ঢাকাইয়া | সম্পর্ক ও বৈশিষ্ট্য |
আর (বাংলা) | সোনা+আর = সোনার, রুপা+আর = রুপার | উপাদান |
ওয়ালা | চা+ওয়ালা = চাওয়ালা, গাড়ি+ওয়ালা = গাড়িওয়ালা | পেশাজীবী |
আনি | মেয়ে+আনি = মেয়েমানুষ, ঠাকুর+আনি = ঠাকুরানি | স্ত্রীবাচক |
পনা (পণ) | বালক+পনা = বালকপনা, শয়তান+পনা = শয়তানপনা | ভাব/আচরণ |
দার (ফার্সি) | হিসাব+দার = হিসাবদার, দুকান+দার = দোকানদার | অধিকারী |
বাজ (ফার্সি) | ধোঁকা+বাজ = ধোঁকাবাজ, কান+বাজ = কানবাজ | কর্তৃবাচক |
খোর (ফার্সি) | ঘুষ+খোর = ঘুষখোর, সুদ+খোর = সুদখোর | আসক্ত/ভোক্তা |
৩.২.২ উপসর্গ-সাধিত শব্দ
মূল শব্দের আগে উপসর্গ যোগ হয়ে যে সাধিত শব্দ তৈরি হয়। উপসর্গ নিজে কোনো অর্থ প্রকাশ করে না, কিন্তু শব্দের অর্থ পরিবর্তন বা বিশেষায়িত করে।
ক) বাংলা উপসর্গ (২১টি)
উপসর্গ | উদাহরণ (সাধিত শব্দ) | অর্থের পরিবর্তন |
অ/অনা | অজানা, অচেনা, অনাদর, অনাহার | না-বাচক, অভাব |
আ | আগাছা, আধোয়া, আলগা, আকাঁড়া | বিশেষ অর্থ |
সু | সুনাম, সুকাজ, সুপথ | ভালো |
কু | কুকাজ, কুপথ, কুনজর | খারাপ |
আড় | আড়চোখ, আড়ঘাট, আড়পাশ | তির্যক/বাঁকা |
ভর | ভরপেট, ভরদুপুর, ভরসন্ধ্যা | পরিপূর্ণ |
রাম | রামছাগল, রামধনু, রামশালা | বৃহৎ/বিশেষ |
নি | নিখরচা, নিখুঁত, নিপাতনে | অভাব/রহিত |
খ) সংস্কৃত উপসর্গ (২০টি প্রধান)
উপসর্গ | উদাহরণ | মূল অর্থ |
প্র | প্রকাশ, প্রগতি, প্রবাহ, প্রভাব, প্রেম | গতি, বিশেষভাবে |
পরা | পরাজয়, পরাক্রম, পরাবর্তন | বিপরীত, পরিপূর্ণ |
অপ | অপকার, অপবাদ, অপমান, অপব্যয় | বিকৃতি, নিকৃষ্ট |
সম্/সং | সংগীত, সংস্কার, সম্পর্ক, সম্মান | সম্পূর্ণ, একত্র |
নি | নিবেদন, নিষেধ, নির্মল, নিশ্চিত | নিচে, না |
অনু | অনুগামী, অনুকূল, অনুভব, অনুসরণ | পরে, অনুসারে |
অব | অবস্থান, অবতরণ, অবনতি, অবকাশ | নিচে, বিচ্যুতি |
অধি | অধিকার, অধিপতি, অধ্যয়ন, অধিবেশন | উপরে, বিশেষভাবে |
সু | সুন্দর, সুকর্ম, সুবিধা, সুবাস | সহজ, ভালো |
উৎ/উদ্ | উৎপত্তি, উদয়, উদ্যম, উদ্বোধন | উপরে, বাইরে |
দুর্/দুস্ | দুর্দশা, দুর্নাম, দুষ্কর, দুস্থ | কঠিন, খারাপ |
বি | বিকাশ, বিরোধ, বিভাগ, বিশেষ | বিভিন্নতা, বিশেষ |
আ | আহরণ, আগমন, আহার, আকার | পর্যন্ত, থেকে |
প্রতি | প্রতিদিন, প্রতিবাদ, প্রতিনিধি | বিরুদ্ধ, প্রতিটি |
পরি | পরিবার, পরিচালনা, পরিবেশ | চারদিক, পূর্ণ |
অতি | অতিক্রম, অতিরিক্ত, অত্যাচার | অতিশয়, অতিক্রান্ত |
উপ | উপমহাদেশ, উপাচার্য, উপহার | নিকট, গৌণ |
অভি | অভিমান, অভিযান, অভিনয় | সম্মুখে, প্রতি |
নির্ | নির্দোষ, নির্ভীক, নিরাপদ, নিরীক্ষণ | রহিত, বাইরে |
বহির্ | বহিরাগত, বহির্গমন, বহির্মুখী | বাইরে |
গ) বিদেশি উপসর্গ
উপসর্গ (ভাষা) | উদাহরণ | অর্থ |
না (ফার্সি) | নাখোশ, নারাজ, নামঞ্জুর, নাপাক | না/অস্বীকৃতি |
বে (ফার্সি) | বেকার, বেআইনি, বেচারা, বেশরম | বিনা/রহিত |
বদ (ফার্সি) | বদনাম, বদমাশ, বদঅভ্যাস | খারাপ |
হাম (ফার্সি) | হামদর্দ, হামজুলুস | সমতুল্য |
আন্ (ইংরেজি) | আনফেয়ার, আনলাকি (সরাসরি ব্যবহারে) | না/বিপরীত |
হেড (ইংরেজি) | হেডমাস্টার, হেডকোয়ার্টার | প্রধান |
৩.২.৩ সমাস-সাধিত শব্দ
দুই বা ততোধিক পদ মিলে যখন একটি নতুন পদ তৈরি হয়, তখন তাকে সমাস-সাধিত শব্দ বলে। এটি সাধিত শব্দের একটি বিশেষ ও বিস্তৃত শ্রেণি।
সমাসের প্রকার | উদাহরণ | ব্যাখ্যা |
দ্বন্দ্ব সমাস | ভাইবোন, মাবাবা, ঘরবাড়ি, হাটবাজার, আকাশবাতাস | উভয় পদের অর্থ প্রধান |
তৎপুরুষ সমাস | রাজপুত্র, দেশসেবা, মনোযোগ, বিদ্যালয়, কর্মক্ষেত্র | শেষ পদের অর্থ প্রধান |
কর্মধারয় সমাস | মহাপুরুষ, নীলকমল, চালাকচতুর, মহাকাশ | বিশেষণ-বিশেষ্য সম্পর্ক |
দ্বিগু সমাস | ত্রিভুজ, পঞ্চভূত, সপ্তাহ, তেমাথা, চৌরাস্তা | সংখ্যাবাচক সমাহার |
বহুব্রীহি সমাস | লম্বোদর, নীলকণ্ঠ, চতুর্ভুজ, সহোদর, মৃগনয়না | ভিন্ন অর্থ নির্দেশ |
অব্যয়ীভাব সমাস | প্রতিদিন, উপবন, অনুক্ষণ, আমরণ, যথাশক্তি | অব্যয়-পূর্বক বিশেষ অর্থ |
৪. মৌলিক ও সাধিত শব্দের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বৈশিষ্ট্য | মৌলিক শব্দ | সাধিত শব্দ |
বিশ্লেষণযোগ্যতা | বিশ্লেষণ করা যায় না | প্রকৃতি+প্রত্যয়ে বিশ্লেষণযোগ্য |
গঠন | একক অখণ্ড একক | একাধিক রূপমূল (morpheme) দিয়ে গঠিত |
উদ্ভব | স্বাভাবিকভাবে ভাষায় বিদ্যমান | মৌলিক শব্দ থেকে নির্মিত |
পরিবর্তনশীলতা | রূপ অপরিবর্তনীয় (মূলত) | বিভিন্ন প্রত্যয়ে পরিবর্তিত হয় |
উদাহরণ | মাঠ, নদী, পাখি, হাত, রাত | মাঠিয়া, নদীয়া, পাখিত্ব, হাতল |
সংখ্যা | সীমিত | অসীম (নতুন শব্দ নির্মাণ সম্ভব) |
ভাষিক ভূমিকা | ভাষার ভিত্তি | ভাষার বিস্তার ঘটায় |
শনাক্তকরণ পদ্ধতি | 'কি থেকে এলো?' প্রশ্নের উত্তর নেই | 'কি থেকে এলো?' প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আছে |
৫. বিস্তারিত উদাহরণ বিশ্লেষণ - সাহিত্য থেকে
৫.১ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে উদাহরণ
'আমার সোনার বাংলা' - জাতীয় সংগীত |
'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' - এই লাইনে: সোনার = সোনা + র (তদ্ধিত প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ ভালোবাসি = ভালো + বাস + ই → সাধিত শব্দ (যৌগিক ক্রিয়া) আমার = আমি + র → বিভক্তিযুক্ত শব্দ বাংলা = মৌলিক শব্দ (ভৌগোলিক নাম, অবিভাজ্য) 'ছায়া ঢাকা, মায়া ভরা মরি হায় হায় রে' - এই লাইনে: ছায়া = মৌলিক শব্দ ঢাকা = ঢাক্ + আ (কৃৎ প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ মায়া = মৌলিক শব্দ (মূল অর্থে) ভরা = ভর্ + আ (কৃৎ প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ |
কবিতা 'সোনার তরী' - রবীন্দ্রনাথ |
'গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা' - এই লাইনে: গগনে = গগন + এ (বিভক্তি) → মৌলিক শব্দ + বিভক্তি গরজে = গর্জন + এ → সাধিত শব্দ (কৃৎ প্রত্যয়জাত ক্রিয়া) মেঘ = মৌলিক শব্দ বরষা = বর্ষা (তৎসম মৌলিক) → তদ্ভব রূপান্তর 'শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি' - এই লাইনে: শূন্য = মৌলিক শব্দ (তৎসম) নদীর = নদী + র → মৌলিক শব্দ + বিভক্তি রহিনু = রহ্ + ইনু → সাধিত শব্দ (ধাতু + ক্রিয়া বিভক্তি) |
৫.২ কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে
'বিদ্রোহী' কবিতা - নজরুল ইসলাম |
'মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত আমি' - এই লাইনে: মহা = সংস্কৃত উপসর্গ → উপসর্গ-সাধিত অংশ বিদ্রোহী = বি + দ্রোহ + ই (তদ্ধিত প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ রণ = মৌলিক শব্দ (তৎসম) ক্লান্ত = ক্লম্ + ক্ত (কৃৎ প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ 'আমি চিরতরে দূর করে যাব জঞ্জাল' - এই লাইনে: চিরতরে = চির + তর + এ → সমাস-সাধিত শব্দ দূর = মৌলিক শব্দ জঞ্জাল = মৌলিক শব্দ (বিদেশি আরবি মূল, তবে বাংলায় অবিভাজ্য) |
৫.৩ মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য' থেকে
মেঘনাদবধ কাব্য |
'সিন্ধুতীরে রহি তুমি ভাব, হে রাঘব' - বিশ্লেষণ: সিন্ধুতীরে = সিন্ধু (তৎসম মৌলিক) + তীর (মৌলিক) + এ = সমাস-সাধিত + বিভক্তি রাঘব = রঘু + অ (গোত্রার্থে তদ্ধিত প্রত্যয়) → সাধিত শব্দ 'আহে রে, মেঘনাদ বীর, শূরবর সুত' - বিশ্লেষণ: মেঘনাদ = মেঘের নাদ → কর্মধারয় সমাস-সাধিত শব্দ বীর = মৌলিক শব্দ (তৎসম) শূরবর = শূর + বর → কর্মধারয় সমাস সুত = মৌলিক শব্দ (তৎসম, পুত্র অর্থে) |
৬. শনাক্তকরণ কৌশল (পরীক্ষার জন্য দ্রুত পদ্ধতি)
মৌলিক শব্দ চেনার ৫টি নির্ভরযোগ্য উপায় |
'এটা কোথা থেকে এলো?' প্রশ্নের উত্তর দেওয়া না গেলে → মৌলিক শব্দ শব্দটি প্রকৃতি+প্রত্যয়ে ভাঙা না গেলে → মৌলিক শব্দ তৎসম একক শব্দ যার মূল ধাতু সরাসরি বাংলায় প্রচলিত নয় → মৌলিক শব্দ দেশি শব্দ (যা সংস্কৃত/আরবি/ফার্সি নয়, নিজস্ব গঠন) → মৌলিক শব্দ খাঁটি বাংলা প্রাত্যহিক শব্দ - গরু, মাঠ, নদী, পাখি ইত্যাদি → মৌলিক শব্দ |
সাধিত শব্দ চেনার ৫টি নির্ভরযোগ্য উপায় |
শব্দে পরিচিত প্রত্যয় দেখা গেলে (+ইক, +তা, +ত্ব, +তি, +অন ইত্যাদি) → সাধিত শব্দ শব্দের শুরুতে পরিচিত উপসর্গ দেখা গেলে (প্র, বি, অ, সু, কু ইত্যাদি) → সাধিত শব্দ দুটি পদ মিলে একটি নতুন অর্থ প্রকাশ করলে → সমাস-সাধিত শব্দ শব্দটিকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হলে → সাধিত শব্দ শব্দে যৌগিক বা রূঢ় বা যোগরূঢ় বৈশিষ্ট্য থাকলে → সাধিত শব্দ |
৭. বিশেষ শ্রেণির সাধিত শব্দ
৭.১ যোগরূঢ় শব্দ (Compound Etymological)
যে সাধিত শব্দের অর্থ মূল উপাদানগুলির সম্মিলিত অর্থ থেকে ভিন্ন হয়ে যায়, তাকে যোগরূঢ় শব্দ বলে।
যোগরূঢ় শব্দ | মূল অর্থ vs প্রকৃত অর্থ |
পঙ্কজ | পঙ্ক (কাদা) + জ (জাত) = কাদায় জন্মানো জিনিস - কিন্তু অর্থ: পদ্মফুল |
জলধি | জল + ধি (ধারণকারী) = জল ধারণকারী - কিন্তু অর্থ: সমুদ্র |
হস্তী | হস্ত + ইন্ = হাতবিশিষ্ট - কিন্তু অর্থ: হাতি (শুঁড় হাতের মতো) |
দ্বিজ | দ্বি + জ = দুইবার জন্মানো - অর্থ: পাখি বা ব্রাহ্মণ |
রাজহংস | রাজার হংস - অর্থ: এক বিশেষ প্রজাতির পাখি |
মৃগেন্দ্র | মৃগদের ইন্দ্র - অর্থ: সিংহ |
কমলা | কমল + আ - অর্থ: লক্ষ্মী বা কমলালেবু |
৭.২ রূঢ়ি শব্দ (Idiomatic Derived Word)
যে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ থাকলেও প্রচলিত অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছে, তাকে রূঢ়ি শব্দ বলে।
রূঢ়ি শব্দ | ব্যুৎপত্তিগত অর্থ vs প্রচলিত অর্থ |
সন্দেশ | সন্ + দেশ (সংবাদ/খবর) → বর্তমানে: মিষ্টান্নবিশেষ |
গবেষণা | গো + এষণা (গাভী খোঁজা) → বর্তমানে: গভীর অনুসন্ধান |
আলোচনা | আ + লোচন + আ (চোখ দিয়ে দেখা) → বর্তমানে: মতামত বিনিময় |
কুশল | কুশ (ঘাস) + ল → বর্তমানে: ভালো থাকা/নিপুণ |
ব্যবসা | বি + অব + সা → বর্তমানে: বাণিজ্য |
আঁতুড় | আঁত + উড় → বর্তমানে: প্রসবঘর |
৮. শব্দ পরিবার - মৌলিক থেকে সাধিতের বিস্তার
একটি মৌলিক শব্দ বা ধাতু থেকে বিভিন্ন প্রত্যয় যোগে কতভাবে সাধিত শব্দ তৈরি হয় - তার বিশদ উদাহরণ:
মৌলিক শব্দ / ধাতু | সাধিত শব্দসমূহ | গঠনপ্রক্রিয়া |
√জ্ঞা (জানা) | জ্ঞান, জ্ঞানী, জ্ঞানত, জ্ঞানান্বেষী, অজ্ঞ, বিজ্ঞ, বিজ্ঞান, বিজ্ঞানী, প্রজ্ঞা, সুজ্ঞান | প্রত্যয় + উপসর্গ + সমাস |
মানুষ (মনুষ্য) | মানবিক, মানবতা, মানবীয়, অমানবিক, মানবপ্রেমী, মানবসেবা, মানবজাতি | তদ্ধিত প্রত্যয় + উপসর্গ + সমাস |
রাজ (রাজা) | রাজত্ব, রাজ্য, রাজকীয়, রাজনীতি, মহারাজ, রাজপথ, রাজদণ্ড, উপরাজ | তদ্ধিত + সমাস + উপসর্গ |
√পড় (পঠ্) | পাঠ, পঠন, পাঠক, পাঠিকা, পাঠশালা, পাঠ্যক্রম, পাঠ্যপুস্তক, পঠনীয়, পাঠকপ্রিয় | কৃৎ + তদ্ধিত + সমাস |
দেশ | দেশীয়, দেশি, দেশপ্রেম, দেশসেবা, দেশান্তর, বিদেশ, বিদেশি, স্বদেশ, মাতৃদেশ | উপসর্গ + তদ্ধিত + সমাস |
√ভালোবাস | ভালোবাসা, ভালোবাসি, ভালোবাসেন, ভালোবেসে, ভালোবাসার, ভালোবাসাময় | ক্রিয়া বিভক্তি + কৃৎ প্রত্যয় |
√শিক্ষ্ (শেখা) | শিক্ষা, শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষার্থী, শিক্ষিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বশিক্ষা, অশিক্ষিত | কৃৎ + তদ্ধিত + উপসর্গ + সমাস |
৮. দ্রুত পুনরাবৃত্তি তালিকা
৮.১ গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক শব্দ তালিকা (পরীক্ষায় বারবার আসে)
আকাশ | বাতাস | পানি | মাটি | আগুন |
গরু | ঘোড়া | পাখি | মাছ | বাঘ |
হাত | পা | মাথা | চোখ | কান |
মাঠ | নদী | বন | পাহাড় | সমুদ্র |
মা | বাবা | ভাই | বোন | বন্ধু |
৮.২ গুরুত্বপূর্ণ সাধিত শব্দ ও বিশ্লেষণ তালিকা
সাধিত শব্দ | বিশ্লেষণ | প্রকার |
মানবতা | মানব + তা | তদ্ধিত প্রত্যয় |
সামাজিক | সমাজ + ইক | তদ্ধিত প্রত্যয় |
পঠনীয় | পঠ্ + অনীয় | কৃৎ প্রত্যয় |
অপ্রয়োজনীয় | অপ + প্রয়োজন + ইয় | উপসর্গ + তদ্ধিত |
বিশ্ববিদ্যালয় | বিশ্বের বিদ্যালয় | তৎপুরুষ সমাস |
মহাবিশ্ব | মহান বিশ্ব | কর্মধারয় সমাস |
দোকানদার | দোকান + দার (ফার্সি) | বিদেশি প্রত্যয় |
নিখুঁত | নি + খুঁত | বাংলা উপসর্গ |
প্রতিবাদ | প্রতি + বাদ | সংস্কৃত উপসর্গ |
ঘরবাড়ি | ঘর + বাড়ি | দ্বন্দ্ব সমাস |
চৌরাস্তা | চার + রাস্তা | দ্বিগু সমাস |
লম্বোদর | লম্বা উদর যার | বহুব্রীহি সমাস |
ঘুষখোর | ঘুষ + খোর (ফার্সি) | বিদেশি প্রত্যয় |
বেকার | বে + কার (ফার্সি) | বিদেশি উপসর্গ |
অজানা | অ + জানা | বাংলা উপসর্গ |
৯. অধ্যায় সারসংক্ষেপ ও স্মরণীয় সূত্র
মনে রাখার সহজ সূত্র |
১. মৌলিক শব্দ = ভাঙা যায় না + প্রকৃতি-প্রত্যয় নেই + ভাষার ভিত্তি ২. সাধিত শব্দ = ভাঙা যায় + প্রকৃতি+প্রত্যয়/উপসর্গ/সমাস থেকে তৈরি ৩. সাধিত শব্দের ৩ রাস্তা: (ক) প্রত্যয়-সাধিত, (খ) উপসর্গ-সাধিত, (গ) সমাস-সাধিত ৪. কৃৎ প্রত্যয় → ধাতু/ক্রিয়ামূলের সাথে | তদ্ধিত প্রত্যয় → বিশেষ্য/বিশেষণের সাথে ৫. যোগরূঢ় = সাধিত কিন্তু অর্থ ভিন্ন | রূঢ়ি = সাধিত কিন্তু মূল অর্থ লুপ্ত ৬. বাংলা উপসর্গ ২১টি | সংস্কৃত উপসর্গ ২০টি | ফার্সি-আরবি উপসর্গ কয়েকটি |
পরীক্ষায় সাফল্যের মূলমন্ত্র প্রতিটি শব্দকে বিশ্লেষণ করুন → প্রকৃতি-প্রত্যয় খুঁজুন → উৎস নির্ধারণ করুন → শ্রেণি চিহ্নিত করুন |
-